কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির স্বীকৃতি দিয়ে সংসদে আইন পাস করায় প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দিতে ২০১৮ সালের নভম্বরের ৪ তারিখে এক মাহফিলের আয়োজন করে কওমির ছয় বোর্ডের সমন্বিত সংস্থা আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যাহ বাংলাদেশ।

‘কনশাস আনকাপলিং’ এ শব্দ সমষ্টি প্রথম মূল ধারায় আসে বছর সাতেক আগে। পশ্চিমা দেশে সব ক্ষেত্রেই কন্সালটেন্ট থাকে।  এমনকি শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য বিচ্ছেদের জন্যও আছে ‘বিচ্ছেদ গুরু’। ক্যাথরিন উডয়ার্ড থমাস তেমনি একজন, যিনি হলিউড সেলিব্রেটি গিনেথ প্যালেট্রা আর ক্রিস মরিসের দাম্পত্য বিচ্ছেদের ইস্যুতে পৌরহিত্য করেন তিনিই প্রথম ‘কনশাস আনকাপলিং’ বিষয়টিকে আলোচনায় আনেন। ‘ডিভোর্সিং হ্যাপিলি’ ট্যাগলাইন দিয়ে এ ধরনের বাণিজ্যিক সেবা এখন বেশ স্বাভাবিক পশ্চিমা দেশে কনজুগাল ইস্যুতে। বিয়ের মতো স্বর্গীয় বন্ধন বিচ্ছিন্ন করতে পেশাদার মেডিয়েটরের ভূমিকা জানা গেলেও রাজনৈতিক দলগুলোর জোট বা অ্যালায়েন্স ছিন্ন করতে এমন কোন পলিটিক্যাল মেডিয়েটরের বিষয়ে বিশেষ কিছু জানা যায় না। আওয়ামী লীগের সাথে হেফাজতের সাম্প্রতিক সম্পর্কের নিরিখে ‘কনশাস আনকাপলিং’ বিষয়টিকে বেশ প্রাসঙ্গিক মনে হওয়া স্বাভাবিক।

গত কয়েক বছরের নিরুত্তাপ রাজনীতিতে বিরোধীদলের কার্যকর অংশগ্রহণবিহীন অবস্থায় হেফাজত আর সমমনা কিছু ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ‘আপসরফা’ বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। আর এখন আলোচনায় স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজতের অনিয়ন্ত্রিত আন্দোলন এবং অহেতুক একাধিক প্রাণ ক্ষয়ের পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে।

আগ্রহ ছিল সরকার এর প্রতিক্রিয়ায় কি করে তা দেখার এবং এর প্রেক্ষিতে সরকার যথাযথ রাজনৈতিক ও প্রসাশনিক প্রতিক্রিয়াই দেখিয়েছে। যার ভিত্তিতে আরাজনৈতিক হয়েও রাজনীতিতে ক্রীড়ানকের ভূমিকা পালন করতে যাওয়া হেফাজত তাদের কমিটিই বিলুপ্ত করেছে (পরে আহ্বায়ক কমিটি করেছে যদিও)। এতে আওয়ামী লীগের সাথে হেফাজতের দূরত্ব আরো স্পষ্ট হলো। প্রতিষ্ঠাতা  আমীর আল্লামা শফির অনুপস্থিতিতে সংগঠনটি অস্তিত্ব সংকটে। তবে রাজনীতির সে আপ্ত সত্য ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না, যেকোনও সময় যেকোনও কিছু ঘটতে পারে। সন্দেহবাদীরা যদি এ প্রশ্ন তোলেন যে,  আওয়ামী লীগের সাথে হেফাজতের দূরত্ব ‘কনশাস আন কাপলিং’ না ভবিতব্য? এর উত্তরের জন্য অপেক্ষাই শ্রেয়তর। কারণ আমরা ভুলে যাই না হেনরি জন টেম্পেলের অভ্রান্ত কথা- There are no permanent alliances, only permanent interests...

ভোটের জন্য জোট কিংবা আন্দোলনের অ্যালায়েন্স আমাদের উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশদের বিপক্ষে একাট্টা একজোট হয়ে আন্দোলন করেছিল কংগ্রেস মুসলিমলীগসহ আরো অন্যান্য রাজনৈতিক দল। ব্রিটিশ বিতাড়নের পর ভাগ হয় ভারত-পাকিস্তান ।পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে  বৈষম্যের কারণে বিরোধ দেখা দেয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে  রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। পূর্ব বাংলার জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয় পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। একজোট হন শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। প্রতিষ্ঠা করেন যুক্তফ্রন্ট। । ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার লক্ষ্যে তারা প্রতিষ্ঠা করেন যুক্তফ্রন্ট। জোটের ফলও পাওয়া যায়। তার প্রতিফলন ভোটে সে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছিল। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৩টি আসন। শেরেবাংলার কৃষক-শ্রমিক পার্টি ৪৮, নেজামে ইসলাম পার্টি ১৯ এবং গণতন্ত্রী পার্টি পেয়েছিল ১৩টি আসন। আর মুসলিম লীগ পেয়েছিল মাত্র ৯টি আসন। এরপর থেকেই জোটের রাজনীতির রমরমা।

বিচ্ছিন্নভাবে ডানপন্থি রাজনৈতিক সংগঠনের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। তবে ২০০৯ সালে প্রথম জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার প্রবল বিরোধিতার মধ্য দিয়ে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম আলোচনায় আসে। এর পর তারা আওয়াজ তোলে জাতীয় শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে। কওমি মাদ্রাসার লাখ লাখ শিক্ষার্থী নির্ভর সংগঠনটি ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরের অবস্থান করে দেশ অচলের হুমকি দেয়। ১৩ দফা দাবি উপস্থাপন করে সরকারের কাছে,তার অনেকগুলোই ছিল পশ্চাদমুখী।

এরপর থেকে আওয়ামী মানসের বিপরীত অবস্থান নিয়ে হেফাজতের  সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা  করে গেছে সরকার। ইসলামের উদার দার্শনিক দিকগুলোর শিক্ষাবঞ্চিত সংগঠনটি পাঠ্য বইয়ে তাদের মন মতো বিষয়ের সংযোজন-বিয়োজন নিয়ে আবার সরব হয়। ২০১৭ সালে হেফাজতে ইসলামের দাবির প্রেক্ষিতে বেশ কিছু বিষয় যোগ করে ও বাদ দেয় সরকার, যেন কোনওভাবেই তাদের চটানো যাবে না!

তারা শুধু দাবি পূরণ নয় স্বীকৃতিও চায়। তার প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের এপ্রিলে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান শাহ আহমদ শফিসহ বহু  আলেমের উপস্থিতিতে গণভবনে  কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমমর্যাদার ঘোষণা দেওয়া হয়। যেটি দেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু তাই নয় জাতীয় সংসদে আইন পাস করে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তর সমমান দেওয়া হয়। নিলে দিতেও হয়। বিনিময়ে  ‘শোকরানা মাহফিলের’ আয়োজন করে ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর । ‘আল হাইআতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়্যাহ’ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে  ‘শোকরানা মাহফিলের’ আয়োজন করে  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেয়। সব ভালো চলছিল। প্রতিষ্ঠাতা শাহ আহমদ শফির মৃত্যুর পর নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়র পর সব জটিলতার শুরু।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে হেফাজতের কাপলিং বা জোটকে অনেকেই উল্টো যাত্রা ঠাওরেছিলেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে হেফাজতের  যোগাযোগকে কেন্দ্র করে  রাজনৈতিক অঙ্গনে সে সময়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। আওয়ামী লীগ এর সাথে সংশ্লিষ্ট জন সমাজ এবং  যারা ক্রিটিক্যাল সমর্থক কেবল তারাই নন, যারা দলটির হার্ডকোর সমর্থক তারাও  নানা ধরনের প্রশ্ন তুলেছিলেন। এবং তা খুব যৌক্তিকও বটে। যদিও দলটির মাঝারি সারির নেতারা এ ধরনের প্রশ্ন আমলে নেননি। সেসময়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “এখানে অস্বস্তি বোধ করার বিষয় নাই। একটা অংশ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা সরকারি কাঠামোর বাইরে ছিল। সেটাকে শেখ হাসিনা তাদের সঙ্গে আলোচনা বা মতবিনিময়ের মাধ্যমে কাঠামোর ভেতরে আনলেন।”

মতিয়া চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে আরো বলেন, “আওয়ামী লীগ স্বাধীনতাবিরোধীদের বাদ দিয়ে সকলকে নিয়েই  চলেছে। আমরাই বলবো, ইনক্লুসিভ সোসাইটি। আবার স্বাধীনতাবিরোধী বিষাক্তদের বাদ দিয়ে যখন সকলকে নিয়ে চলার কথা আসে, তখন বলা হয় আওয়ামী লীগ আপস করছে। আমরা কিছু করলেই প্রশ্ন তোলা হয়। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ চলছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও অনেকটা অনুসমর্থনের সুরে বলেন, দেশের বাস্তবতা মানতে হবে এবং সিংহভাগ মানুষের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হবে।”

রাজনৈতিক পর্বেক্ষকরা বলেন ইতিহাস  থেকে শিক্ষা নিতে। কারণ ১৯৯৬ সালে জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী দোস্তির পর ক্ষমতায় আসলেও তার ইতি ঘটে গেছে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে। দেড় দশক আগের সুসম্পর্ক ভুলে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কথা মাথায় রেখে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ হাতে নেয়। সেটা বরং এক ধরনের ‘পাপস্খলন’  আওয়ামী লীগের জন্য। একথা অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগই সে দল যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শেষ প্রতিভূ।

নোবেল লরিয়েট মনস্তত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল কানেম্যান সারা বছরের অচরিতার্থ কাজগুলো করতে না পারার বিষয়টির নাম দিয়েছেন ‘প্ল্যানিং ফ্যালাসি’। ব্যক্তির মতো রাজনৈতিক দলগুলোরও ‘টু ডু লিস্ট’ থাকে। তালিকা অনুযায়ী করতে না পারা মানে ‘প্ল্যানিং ফ্যালাসি’র কবলে পড়া। কখনো কখনো সে তালিকা মেনে কাজ করতে হয়। তবে এর অন্যথা হয় না যে এমন না। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগ ‘প্ল্যানিং ফ্যালাসি’ শোধরানোর একটা সুযোগ পেয়েছে হেফাজতের সাথে সাম্প্রতিক বিচ্ছেদে। বিচ্ছেদ দীর্ঘজীবী হোক- চান অনেকেই।

এম এম খালেকুজ্জামানআইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—