ঢাকা শিশু হাসপাতালে করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে একটি শিশুর। ছবি: আসিফ মাহমুদ অভি

করোনাভাইরাস অতিমারী বাংলাদেশে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছিল। ভ্যাকসিন কার্যক্রম চালু হবার পরে অনেকেই আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই এপ্রিলে পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত ২ হাজার ৪০৪ জনের মৃত্যু ঘটে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিনে মারা যান ৮০ জন। সরকারী হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েকদিন যাবত শতাধিক হতে থাকে। নতুন করে কোভিড আতঙ্ক গোটা জাতিকে পেয়ে বসে। যদিও পরিস্থিতি এখন আবার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। 

এসবের পাশাপাশি ভারতে করোনাভাইরাস মহামারী ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। ভারত পরিণত হয়েছে করোনা অতিমারীর ‘এপিসেন্টার’ বা কেন্দ্রবিন্দুতে। “করোনা সুনামি” ১৯৪৭ পরবর্তী ইতিহাসে ভারতকে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে নিমজ্জিত করেছে। কোভিড সংক্রমণের প্রথম দিকে বিশেষজ্ঞরা যে ভয় পাচ্ছিলেন, দক্ষিণপন্থী “হিন্দুত্ববাদী” ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের ব্যর্থতার ফলে  ভারতকে শেষ পর্যন্ত সে পরিণতিই বরণ করতে হয়েছে।

কোভিড মোকাবেলা, স্বাস্থ্য খাত এবং মানবিক উন্নয়নের বদলে বিজেপি, আরএসএস এবং শিবসেনার কাছে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি অধিক প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, যার নির্মম বলি হচ্ছেন ভারতের সাধারণ জনগণ।  

বাংলাদেশ প্রায় চারদিক থেকে ভারত পরিবেষ্টিত বলে করোনাভাইরাসের বিপদজনক বিভিন্ন ধরনের ‘ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট’ বাংলাদেশের চলমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতিকে আরও জটিলতার দিকে ঠেলে দেয় কিনা—সেটি এখন অনেককে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।   

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের লকডাউন নীতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উপর প্রবল চাপ তৈরি করেছে। জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ করোনা সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দরিদ্র এবং হতদরিদ্র হয়ে পড়েছে। 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে, করোনাভাইরাস মহামারীর অর্থনৈতিক প্রতিঘাতে দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। অতি দারিদ্রের হার ২০১৮ সালের ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে বেড়ে হয়েছে ২৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। বেসরকারি সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জরিপ বলছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর আগে মার্চে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ।

এসবের সাথে জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে সার্বিক ভাবে ম্যাক্রো অর্থনীতির উপর এক প্রচণ্ড অভিঘাত তৈরি করেছে এ মহামারী। এমতাবস্থায় যে প্রশ্নগুলি উঠে এসেছে সেগুলি হল: কোন পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ? এই যে দুঃসময় চলছে,তা কি হঠাৎ করে এসেছে, নাকি অবশ্যম্ভাবী ছিলএ দুঃসময় কি এড়ানো যেত?

এমন একটা দুঃসময় যে আসতে যাচ্ছে তা অনেকেই অনুমান করছিলেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। সেসময়েই নানা দেশের বিশেষজ্ঞরা তাদের নিজ নিজ দেশের সরকারকে সাবধান করে দিয়েছিলেন যে, এ ভাইরাস যদি কোনওভাবে দেশে ঢোকে তাহলে ভয়াবহ পরিণতি সে দেশকে বহন করতে হতে পারে। 

বাংলাদেশ চীনের খুব কাছে। চীনের সাথে বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য ভাবে বাংলাদেশ খুব নিবিড়ভাবে যুক্ত বলে শুরু থেকেই করোনা সংক্রমণের একটা ভয়াবহ ঝুঁকির মাঝে ছিল। কিন্তু তখন পর্যন্ত আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টাকে সেভাবে আমলে নেয়নি; অথবা অন্যভাবে বললে, সেই সময়ে আমলে নেয়ার মত ধীশক্তি সম্পন্ন লোকের অভাব সেখানে ছিল।

স্বাস্থ্য খাতে অতীতের তুলনায় উন্নতি করলেও ১৭ কোটি মানুষকে পাশ্চাত্যের মানদণ্ডে উন্নত চিকিৎসা দেবার মত প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাংলাদেশ এখনো গড়ে তুলতে পারেনি। বিশ্বের যে সমস্ত রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যখাত খুব দুর্বল, বাংলাদেশ হচ্ছে তার অন্যতম। 

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত এখনো মন্ত্রী, আমলা, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং উচ্চবিত্ততো বটেই, এমনকি মধ্যবিত্তেরও আস্থাভাজন হতে পারেনি। সরকারী আমলা এবং দেশি এলিটদের যখন তাদের নিজ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থা থাকে না, তখন যে বিষয়টা স্পষ্ট হয় সেটা হল, সে দেশের স্বাস্থ্যখাত খুব দুর্বল। 

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কেউই এরকম একটি দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে করোনাভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে তার পরিণতি কী মারাত্মক হতে পারে- এ বিষয়টি নিয়ে ভাবিত ছিলেন না। এছাড়া এলিট সমাজের মাঝে কিছু হলে দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা বিদেশে যেয়ে চিকিৎসা নেওয়া- এ ধরনের  টিপিক্যাল মনোবৃত্তির প্রাধান্যশীল উপস্থিতি ছিল।     

চীন বুঝতে পেরেছিল ভাইরাসটিকে যদি একটি শহরের মধ্যে আটকে রাখা না যায় তাহলে সেটা গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। আর সেরকম কিছু হলে কোভিড সংক্রমণ আর নিয়ন্ত্রণ করা যম্ভব হবে না। তাই তারা যে কাজটি করেছিল সেটা হল, উহান শহরকে লকডাউন করা। কেননা একটা শহর বা অঞ্চলকে সফল ভাবে লকডাউন করা সম্ভব, কিন্তু পুরো দেশকে একযোগে লকডাউন করা সম্ভব নয়।  

লকডাউন মানে হল শহর থেকে কেউ বের হতে পারবে না এবং শহরে কেউ ঢুকতেও পারবে না। এ সময় শহরের সমস্ত বাসিন্দা ‘স্বেচ্ছায়’ নিজেদের গৃহবন্দী অবস্থায় রাখবেন। দোকান পাট, হাট, বাজার সব কিছু বন্ধ থাকবে। 

পুলিশ, কমিউনিস্ট পার্টির স্বেচ্ছাসেবক এবং ড্রোন দিয়ে সরকার মনিটর করেছে কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে কিনা। এর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন কোন মানুষ যাতে খাদ্য সংকটে না ভোগে তার দায়িত্ব নিয়েছিল। উল্লেখ্য, উহানের জনসংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখের উপরে।    

এসবের পাশাপাশি সারা দেশ থেকে ৪২ হাজার ডাক্তার এবং নার্সকে উহানে পাঠান হয়েছিল। সাথে ছিল রোবট। রোবটের মাধ্যমে অসুস্থ্য ব্যক্তিদের খাবার এবং ওষুধ দেওয়া হয়। খুব দ্রুততম সময়ে স্থাপন করা হয় বিশাল দুটি ফিল্ড হাসপাতাল। 

উহানে অ্যাপের মাধ্যমে যেকোন ব্যক্তি জানতে পারতেন তার থেকে কত দূরে একজন করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি অবস্থান করছেন। বেইজিং এবং সাংহাইতেও এ ধরণের অ্যাপ চালু করা হয়। এছাড়া খুব দ্রুততম সময়ে শহরের সকল অধিবাসীর করোনা পরীক্ষা করা হয়। 

করোনাভাইরাস নির্মূল হয়ে যাবার পর পরবর্তীতে আবার যখন মাত্র ৬ জনের দেহে করোনা পাওয়া গেল, তখনো খুব অল্প সময়ে পুরো উহান শহরের সব বাসিন্দাদের কোভিড পরীক্ষা করা হয়। এসবের সাথে যে কাজটা চীন এখনো করে যাচ্ছে সেটা হল, সমস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলিতে কঠোর স্ক্রিনিং। বস্তুত এ হল করোনা মোকাবেলার চাইনিজ মডেল। 

যে মডেলে করোনা মোকাবেলায় দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার কোটি টাকা ‘প্রণোদনা প্যাকেজ’ দিতে হয়নি। ভ্যাকসিনের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হয়নি। অর্থাৎ, কাউকে ভ্যাকসিন না দিয়েই খুব অল্প সময়ের মধ্যে চীন তার দেশে করোনা সংক্রমণ পুরো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। বিশ্বের যে সমস্ত রাষ্ট্র করোনা মোকাবেলায় কম/বেশী সফল, তারা সবাই মোটা দাগে গণচীনের এ মডেলটি অনুসরণ করছে।

চীনের সামনে কোভিড মোকাবেলার অন্য কোন মডেল বা দৃষ্টান্ত ছিল না। চীনের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন, কোভিড একটি দেশে ছড়িয়ে পড়লে তার কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ফলে তারা যে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন সেটি হল, এ ভাইরাস যাতে ছড়িয়ে না পরে এবং একটি জায়গাতে থাকতেই সেটিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। 

চীনের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ভিয়েতনাম, কিউবা, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, ভুটান, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদির পাশাপাশি আফ্রিকার অনেক দেশ যারা করোনা মোকাবেলায় এখন পর্যন্ত কমবেশি সফল তারা দ্রুত শিক্ষা নেয়। তারা যে বিষয়টা বুঝতে পারে সেটা হল, একটি দেশের শক্তশালী স্বাস্থ্য অবকাঠামো থাকলেও করোনাভাইরাস একটা অঞ্চলের বাইরে ছড়িয়ে পরলে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা অনেকটাই অসম্ভব। 

ফলে তারা তাদের দেশের পাশ্চাত্যের তুলনায় তুলনামূলক বিচারে দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামো বিবেচনায় করোনাভাইরাস যাতে কোন অবস্থায় দেশে ঢুকতে না পারে সে ব্যাপারে সচেতন হয়। আর ঢুকে পরলে যাতে একটি শহর বা অঞ্চলের মধ্যে কঠোর লকডাউন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে ব্যাপারেও সর্বোচ্চ উদ্যোগী হয়। 

তারা যেটা আরো বুঝতে পারে সেটা হল, তাদের মত দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলিতে ভাইরাস ছড়িয়ে পরলে জীবন ও জীবিকা, এ দুটোর উপরেই মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হবে। ফলে উহানে করোনাভাইরাস দেখা দেয়া মাত্র এ সমস্ত দেশের সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় করোনাভাইরাস প্রতিরোধের বিষয়টিতে। 

এ দেশগুলি যে কাজটি অত্যন্ত সফলতার সাথে করতে সক্ষম হয় সেটি হল, সব রকমের বন্দরে কঠোর স্ক্রিনিং। এছাড়া বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারান্টাইন, কোন একটি শহরে বা এলাকায় করোনাভাইরাস দেখা দেওয়া মাত্র সঙ্ক্রমণ শুন্যতে না আসা পর্যন্ত কঠোর লকডাউন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলি শুরু থেকে চীনের এ কঠোর লকডাউনের বিষয়টি নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে আসছিল। তারা এটিকে ব্যক্তি জীবনের উপর স্বৈরাচারী কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে। 

পশ্চিম যাদেরকে ‘তৃতীয় বিশ্ব’ বলে, সেই তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশ করোনাভাইরাস দেশের ভিতরে ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া চীনের অভিজ্ঞতা থেকে দ্রুত বুঝতে পারে। কিন্তু পশ্চিমা দুনিয়া তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে অস্বীকার করে। ফলে এখনো মূলধারার পাশ্চাত্যের মিডিয়া এমনকি কমিউনিস্ট ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশকে করোনা মোকাবেলার সফল দেশ হিসেবে তুলে ধরলেও, গণচীনকে এ তালিকায় রাখতে আগ্রহী নয়। 

 অবস্থাটা এমন দাঁড়ায় যে, গণচীন যা করেছে তার সবই ভুল, এ ধরনের একটা অ্যাপ্রোচ পশ্চিমা দুনিয়া, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে নেয়। বিজ্ঞানকে বিজ্ঞান দিয়ে না বুঝে পুঁজিবাদী রাজনীতির চোখ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা হয়। 

চীনে করোনা সংক্রমণের সাথে সাথে মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক করা হয় এবং সবাই মাস্ক পড়ছে কিনা তার তদারকির দায়িত্ব রাষ্ট্র নেয়। কিন্তু আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কনট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)  এর মাস্ক যে করোনা প্রতিরোধ করতে পারে সেটি বুঝতেই বেশ দীর্ঘ সময় লেগে যায়। দেশটিতে  করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয়ে যাবার পরেও প্রথম কয়েক মাস সিডিসি বলে আসছিল, ভাইরাস প্রতিরোধে মাস্ক পড়বার দরকার নেই। এখন অবশ্য সিডিসি বলছে করোনা প্রতিরোধে সিঙ্গেল নয়, ডবল মাস্ক অধিক কার্যকর।   

আন্তর্জাতিক বন্দরগুলি কঠোরভাবে মিনিটর করা, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারান্টাইন, করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে এমন শহরকে ভাইরাস নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত লকডাউন করতে পারবার ব্যর্থতার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা পশ্চিমা দুনিয়াতে কোভিডের ভয়াবহ সংক্রমণ ঘটে। 

উন্নয়নশীল বিশ্বের বাসিন্দাদের বিশ্বে কোভিড সংক্রমণের শুরুতে একটা সাধারণ ধারণা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো পাশ্চাত্য যেহেতু চিকিৎসা বিজ্ঞানে অত্যন্ত অগ্রসর এবং তাদের চিকিৎসা অবকাঠামোও খুব শক্তিশালী, তাই তারা খুব অল্প সময়েই কোভিড নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। পাশ্চাত্যের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চিন্তার মূল সুরটাও অনেকটা এরকমই ছিল। তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে এর কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, এ বিষয়ে। 

চীনের অভিজ্ঞতা থেকে না শিখে  তারা যে বিষয়টা তখন বুঝতে পারেননি, সেটা হল শুধু ব্যক্তি রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে এ ভাইরাস মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সফলতা নির্ভর করছে- একটি রাষ্ট্র তার অন্তর্ভুক্ত কমিউনিটিকে বা জনগণকে কতটুকু মোবিলাইজ করতে পারছে- তার উপর। অর্থাৎ, লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব, মাস্ক পরা, বন্দরগুলোতে নিখুঁত স্ক্রিনিং, কন্টাক্ট ট্রেসিং, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারাইন্টাইনের মাধ্যমে আইসোলেশন, লকডাউন চলাকালীন সময় খাবার-চাকরীর নিশ্চয়তা বজায় রাখা ইত্যাদি কাজগুলো কমিউনিটি বা জনগণকে সাথে নিয়ে রাষ্ট্র করতে পারছে কিনা। 

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিম ইউরোপ “তৃতীয় দুনিয়ার” যে সমস্ত রাষ্ট্রের দুর্বল চিকিৎসা অবকাঠামো নিয়ে ভয় পাচ্ছিল, তাদের মধ্যে থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাষ্ট্র অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পুরো কমিউনিটিকে মোবিলাইজ করতে পারার ফলে সংক্রমণ মোকাবেলায় কম-বেশি সফল। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়া সংক্রমণ মোকাবেলায় ব্যক্তি-কেন্দ্রিক অ্যাপ্রোচ নেবার ফলে করোনা প্রতিরোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, যার করুণ পরিণতিতে এখন পর্যন্ত খোদ আমেরিকাতেই প্রায় ৬ লাখ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

গণচীনের পর প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে থাইল্যান্ডে। চীনের একজন কোভিড আক্রান্ত নারী থাইল্যান্ডে এসে শনাক্ত হন করোনা পজিটিভ হিসেবে। এরপর ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র হয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। করোনাভাইরাসের ভয়াবহ সঙ্ক্রমণে ইতালি ততদিনে বিপর্যস্ত। আস্তে আস্তে পুরো যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়েছে। 

করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের সামনে দুটি মডেল তখন স্পষ্ট। একটি হল পুরো কমিউনিটিকে অন্তর্ভুক্ত করে করোনা মোকাবেলার গণচীনের মডেল এবং আরেকটি হল ব্যক্তি আক্রান্ত হলে চিকিৎসা করবার পশ্চিমা মডেল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভাইরাস মোকাবেলা করতে পশ্চিমা মডেলকে বেছে নেয়। 

এতে অবশ্য অবাক হবার কিছু নেই। বাংলাদেশসহ যেসমস্ত রাষ্ট্রে উপনিবেশিক শাসন ছিল, সে সমস্ত রাষ্ট্রে শুধু নীতিনির্ধারকদের নয়, জনগণের বড় অংশের মাঝেও উপনিবেশিক মানসিকতার কারণে পশ্চিমা দুনিয়ার যে কোন বিষয়কে ভালোভাবে নেওয়া এবং এর বাইরের অন্য কিছুকে খাটো করে দেখার মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের করোনা মোকাবেলার অ্যাপ্রোচেও এ মনস্তত্ত্ব প্রাধান্য বিস্তার করেছে। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটা দেশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হলেও এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নয়। কিন্তু করোনা অতিমারীর কালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হয়ে উঠতে যাচ্ছে, সেটা এ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে হয়ত বুঝে উঠতে পারেননি। তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত, দিক নির্দেশনা এবং কর্মপদ্ধতির উপরে সামনের দিনে গোটা দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করবে—এ বিষয়টি তারা চীন হয়ে করোনা ততদিনে নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ার পরেও বুঝতে পারেননি। 

আর বুঝতে না পারার ফলে করোনা মোকাবেলায় তাদের অ্যাপ্রোচ আর দশটা রুটিন কাজের মতই জনগণের কাছে প্রতিভাত হয়েছে। নিজেদের গুরুত্ব বুঝে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবার ব্যর্থতা মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশকে যেমন একদিকে কঠিন সংকটে নিপতিত করেছে, তেমনি আওয়ামী লীগ সরকারকেও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে।  

রুটিন কাজের মত করে মহামারী মোকাবেলার পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে শুরু থেকেই ধেয়ে আসা বিপদকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খাটো করে দেখার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। তেমনি এ প্রবণতা জনগণের কিছু অংশের মাঝেও দেখা যায়। 

জনগণের এ সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী এবং ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করেন তারা ‘এ রোগ বাংলাদেশের মত মুসলিম প্রধান দেশে আসবে না’ বলে ক্রমাগত প্রচারণা চালাতে থাকেন। তারা এটাকে কমিউনিস্ট চীনের উপর “আল্লহর গজব” ইত্যাদি বলেন। দেশের শিক্ষিত সমাজেরও কেউ কেউ ‘এটা ইউরোপ বা আমেরিকার রোগ’, ‘শীত প্রধান দেশের অসুখ’, এসব বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন। 

গত বছরের জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারি মাসে কেউ কেউ ফেইসবুকে এসে তাদের এলাকায় করোনা উপসর্গ দেখা যাচ্ছে এসব যখন বলেন বা পোস্ট করেন, রুটিন কাজে অভ্যস্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একে অপপ্রচার বলে ধরে নেয়। তাদের কাউকে কাউকে এজন্য এমনকি গ্রেপ্তারও করা হয়।

ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে বাংলাদেশে করোনা সঙ্ক্রমণের যে Projection Model তৈরি করে তা উপেক্ষা করা হয়; অথবা তার গুরুত্ব মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তখন বুঝতে পারেননি। 

আমেরিকাতে সংক্রমণ কীরকম রূপ নিতে পারে তা বোঝার জন্য এ ধরনের নানা মডেল বিভিন্ন মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান করোনা সংক্রমণের শুরুতেই করেছে। এ সমস্ত কোন কোন মডেলে দেখান হয়েছে করোনা সংক্রমণে দেশটিতে ১০ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটতে পারে এবং দুই তৃতীয়াংশের মত মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। 

এ সমস্ত মডেলের উদ্দেশ্য হল করোনা পরিস্থিতি কোন দিকে রূপ নিতে পারে সরকারকে তা বুঝতে সাহায্য করে তা মোকাবেলার রোডম্যাপ তৈরি করা। আমেরিকার মূলধারার মিডিয়াগুলো এ সমস্ত মডেলে করোনা সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি নিয়ে কী বলা হয়েছে তা ক্রমাগত প্রচার করতে থাকে।     

সেই সময় ইতালিতে করোনার ভয়াবহ সঙ্ক্রমণের ফলে ইতালি প্রবাসীদের মাধ্যমে দেশে করোনা ভাইরাস আসার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। দাবি ওঠা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতালি থেকে ফ্লাইট বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা বুঝে উঠতে পারেনি। এর পরিবর্তে তারা বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং করবার উদ্যোগ নেয়।   

আমি সেসময় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় তিন সপ্তাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আসি। বিমানবন্দরে নেমে দেখলাম তাপমাত্রা মাপবার গেইটটি কাজ করছে না। গেইট অতিক্রম করবার পর দেখাতে পেলাম এক আধজনকে ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে তাপ মাপা হচ্ছে। যারা কাজ করছেন তাদের সবার মধ্যে একটা ঢিলেঢালা ভাব। সবাইকেই ইমিগ্রেশন অতিক্রম করে চলে আসতে দেওয়া হচ্ছে। 

মার্চের প্রথম সপ্তাহে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসলাম তখন দেখলাম আটলান্টা বিমানবন্দরে আগত যাত্রীদের তাপ পরীক্ষা বা কোয়ারেন্টিন এর কোনও ব্যবস্থাই নেই, যদিও ততদিনে করোনা সিয়াটল থেকে অন্যান্য অঙ্গরাজ্যে ছড়ান শুরু হয়ে গিয়েছে। 

একটা বিষয় পরিস্কার যে, সামনে ততদিনে বেশ কিছু উদাহারণ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মত একটি দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামোর দেশে, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধ করবার উদ্যোগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তখনো নেওয়া হয়নি। ফলে এ ধরনের কোনও কিছু যাতে না ঘটে, সে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে তখনো অতটা সক্রিয়ভাবে দেখা যায়নি। 

বিদেশ ফেরত যাত্রীদের যাদের সামর্থ্য আছে তাদের নিজ খরচে তারকা হোটেলে ২১ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন এবং যাদের সামর্থ্য নাই তাদেরকে সরকারী ব্যবস্থাপনায় কোয়ারেন্টিনে নিয়ে যাবার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরিবর্তে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা না বুঝে ‘হোম কোয়ারেন্টিন’ এর কথা বলা হয়—যেটি কার্যত অনেকটাই ব্যর্থ হয়।

বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং এবং হোম কোয়ারেন্টিন ব্যর্থ হবার পর প্রথমে ঢাকার টোলারবাগসহ দুই একটি এলাকায় করোনা সংক্রমণ দেখা দেয়। তখন চাইলে এ অল্প জায়গাতে উহানের মত কঠিন লকডাউন এবং বাধ্যতামূলকভাবে সবার করোনা পরীক্ষা সম্ভব ছিল। কিন্তু তখন এ ধরনের কোন উদ্যোগ নিয়ে সংক্রমণ অল্প জায়গায় আটকে রেখে করোনা নির্মূল করবার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি। 

টোলারবাগসহ ঢাকার দুই/তিনটা জায়গায় করোনা আটকে রাখতে পারার ব্যর্থতায় সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় মাত্র ৩৯টি পিসিআর ল্যাব দিয়ে দেশকে কোভিড মোকাবেলায় নামতে হয়—যার অধিকাংশই ছিল ঢাকাতে। ঢাকার বাইরে ২/৪টি জেলা ছাড়া করোনা পরীক্ষা করবার ব্যবস্থা তখন আর কোথাও ছিল না। 

এ পরিস্থিতিতে গণস্বাস্থ্যসহ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা র‍্যাপিড টেস্টিং কিট ব্যবহার করে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে পরীক্ষার আওতায় আনবার আহ্বান জানায়। কেননা কোভিড নিয়ন্ত্রণের মূল সূত্রটাই হচ্ছে যত বেশি সংক্রমিত চিহ্নিত করা যাবে, তত দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা যাবে। কিন্তু র‍্যাপিড টেস্টিং হলে “ফলস পজিটিভ,” “ফলস নেগেটিভ” রেজাল্ট আসতে পারে, এসব বলে  বিষয়টা  এড়িয়ে যাওয়া হয়।   

জনমানসে শুরু থেকে প্রতিভাত হয়েছে যে, অধিক সংক্রমণ চিহ্নিত করতে মন্ত্রণালয় আগ্রহী নয়। অধিক চিহ্নিত হওয়া মানে মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা, এ ধরনের একটা সাবেকী মনোভাব তাদের মধ্যে কাজ করছে। কিন্তু কোভিড সময়ে যত বেশি সংক্রমিত ব্যক্তি চিহ্নিত করা যাবে, সেটি যে মন্ত্রণালয়ের সফলতা, সাবেকী মানসিকতা দ্বারা পরিচালিত হবার ফলে সেটি তারা বুঝে উঠতে পারেননি বলে অনেকে মনে করছেন। ফলে এখনো শুধু যারা পরীক্ষা করতে আসছে, তাদের উপর নির্ভর করেই করোনা সংক্রমণের সংখ্যা নির্ণয় করা হচ্ছে। অর্থাৎ পুরো কমিউনিটিকে মোবালাইজ করে নয়, ব্যক্তি রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে করোনাবাইরাস নির্মূল করার পশ্চিমা মডেল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুসরণ করে যাচ্ছে।

 ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে পরীক্ষা আওতায় না আনতে চাইলেও ইতিবাচক যে উদ্যোগ দেরিতে হলেও নেওয়া হয়েছে সেটা হল, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হবার পর ব্র্যাককে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে কিছুটা সীমিত পরিসরে র‍্যাপিড টেস্ট করবার অনুমতি দেওয়া। এছাড়া যে র‍্যাপিড টেস্টিং কিট গত বছর বিদেশ থেকে আমদানীর ব্যাপারে অনীহা ছিল, সে জায়গা থেকে সরে এসে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানীর উদ্যোগ নেওয়া।

কোভিড শুরুর প্রাক্কালে বাংলাদেশকে নিয়ে যে আশঙ্কা পশ্চিমা দুনিয়ার ছিল তা অনেক সীমাবদ্ধতা এবং ভুল করে করে কিছুটা হলেও শেখার নীতি অবলম্বন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত সে ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করতে পেরেছে—যেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক উন্নত পশ্চিমা দেশ পারেনি। করোনা সংক্রমণের সাথে সাথে সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালের সমন্বয়ে চিকিৎসা প্রদান, প্রয়োজনমত ‘মেইকশিফট’ হাসপাতাল তৈরি এবং পিসিআর ল্যাবের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে শতাধিকে উন্নীত করে বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে রক্ষার উদ্যোগ মন্ত্রণালয় নিতে পেরেছে। 

তবে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর এখনো করেনি সেটা হল, বিভিন্ন হাইপোথেটিক্যাল সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে, দেশে কোভিডের কারণে কী পরিমাণ মানুষ মারা যেতে পারে এবং সংক্রমিত হতে পারে, বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তার একটা  প্রজেকশন মডেল তৈরি করা। এ ধরনের মডেল একদিকে যেমন জনসচেতনতা তৈরি করবে; আরেকদিকে, তেমনি এ মডেলের উপর ভিত্তি করে করোনা নিয়ন্ত্রণের রোডম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হবে। এ রোডম্যাপ না থাকার ফলে আনুমানিক কবে নাগাদ, কী কী পন্থায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশ থেকে করোনাভাইরাস সম্পূর্ণরূপে নির্মূলের চিন্তা করছে, সেটা জাতির কাছে পরিষ্কার নয়। 

রোডম্যাপ সামনে না থাকার কারণেই ভ্যাকসিন আমদানী এবং উৎপাদনের বিষয়েও দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিতে পারেনি। টিকা নিয়ে করোনা আক্রান্ত বিশ্বে পরাশক্তি সমূহের ‘সফট পাওয়ার’ প্রদর্শনের রাজনীতি সম্পর্কে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঠিক কতটা অবহিত ছিল, এটিও প্রশ্নবোধক। আর এ অবহিত না থাকার ফলে ডিসেম্বরে রাশিয়া যখন স্থানীয় পর্যায়ে স্পুৎনিক ভ্যাকসিন উৎপাদনের প্রস্তাব দেয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) অনুমোদন নেই, এ অভিযোগে প্রস্তাবটি তখন গ্রহণ করা হয়নি। 

এ প্রস্তাব গ্রহণ না করে যুক্তরাজ্যে উদ্ভাবিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা- ভারতে স্থানীয়ভাবে যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘কোভিশিল্ড,’ শুধু সেটি আমদানী করে দেশের ১৩ কোটির বেশি মানুষকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু জনমানসের বড় অংশের কাছে, একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায়িক সুবিধা দেবার জন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিভাত হয়। 

এছাড়া উপনিবেশিক মানসিকতার কারণে, ব্রিটিশ কোন কিছু মানেই ভালো, আর পশ্চিমা দুনিয়ার বাইরে কোন কিছু অত ভালো হবে না- এ মানসিকতা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাইরেও অনেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মাঝেও কাজ করে।

টিকা আমদানীর বিকল্প উৎসের সন্ধান না করে শুধু একটি উৎসের উপর নির্ভর করে টিকা কর্মসূচি চালালে জাতি যে সংকটে পড়তে পারে- এ ধরনের সুদুর প্রসারী চিন্তা তখন সরকার সংশ্লিষ্ট কারো মাথায় আসেনি। আজ ভারত থেকে টিকা আসা বন্ধ হয়ে যাবার পর রাশিয়া, চীন এসব বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। 

 তবে চীন থেকে টিকা আনার আগে একটা বিষয় পরিষ্কার বিবেচনায় নেওয়া উচিৎ। সেটা হল সমস্ত স্টাডিতে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠিত সমস্ত টিকার মধ্যে চীনের করোনা টিকা সিনোফার্মের কার্যকারিতা সবচেয়ে কম। সুতরাং এ বিষয়টি আমদানীর পূর্বেই গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করা উচিৎ যে, এ টিকা করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে কিনা।      

করোনা-প্রতিরোধ সংক্রান্ত যেকোন নির্দেশনা দেওয়ার আগে বিশ্বের নানা দেশের গবেষকদের সর্বসাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণার সাথে পরিচিত থাকা জরুরী। আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশের গবেষকরা বলছেন উন্মুক্ত স্থানের চেয়ে বদ্ধ জায়গায় করোনা সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি- এমনকি ডবল মাস্ক পরে ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখলেও। দেখা গেছে, বিভিন্ন দেশের উন্মুক্ত স্থানে গণজমায়েত থেকে সে হারে করোনা সংক্রমণ ঘটেনি। এমতাবস্থায় ঈদের জামাত, যা মসজিদের ভিতরে আদায় করতে বলা হয়েছে, সেটা উন্মুক্ত স্থানে হলেই অধিক নিরাপদ কিনা, ভেবে দেখা উচিৎ।     

বাংলাদেশের সামনে এ মুহূর্তে দুটো চ্যালেঞ্জ। একটি হল ভারতের দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ হতে বাংলাদেশকে রক্ষা করা। এর জন্য সীমান্তে কঠোর স্ক্রিনিং করার পাশাপাশি বিস্তৃত পর্যায়ে ভ্যারিয়েন্ট সার্ভেইল্যান্স এবং জিনোম সিকুয়েন্সিং এর পরিধি বাড়ানো জরুরী। আর তারপরেও যদি সংক্রমণ ঘটে যায়, ভারতের মত যাতে অক্সিজেন এবং চিকিৎসার সঙ্কটে যাতে পড়তে না হয়, তার জন্য জোর প্রস্তুতি নেওয়া। আর দ্বিতীয়টি হল সংক্রমণ ক্রমান্বয়ে শূন্যতে নামিয়ে আনা। 

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ দুটো বিষয় আমাদের সামনে স্পষ্ট করেছে। এর একটি হল শক্তিশালী স্বাস্থ্য অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা। আর দ্বিতীয়টি হল করোনার মত মহামারী ঠেকানোর জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারা।

সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারলে দুর্বল অবকাঠামো নিয়েও যে মহামারীর ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, তা অনেক দেশই ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে। নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাহলে উপরে উল্লিখিত দুটো চ্যালেঞ্জও বাংলাদেশ সফলভাবে মোকাবেলা করতে পারবে।

সাঈদ ইফতেখার আহমেদশিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিস, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

Responses -- “করোনাভাইরাস অতিমারী: কোন পথে বাংলাদেশ?”

  1. হাসান মাহমুদ

    অসাধারণ নিবন্ধ, লেখককে ধন্যবাদ।

    Reply
  2. মোঃ ওবায়দুল হাসান

    কোভিড বাস্তবতায় বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্লেষণ নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধটি পড়লাম। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এটা বুঝতে সময় লাগার ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। এঁরা এত এত বিদেশ সফর করেও এইটুকু শিক্ষা অন্তত অর্জন করতে পারেননি যে ‘অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকে না।’

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—