Feature Img

Diponkarবর্ষায় সিক্ত বসুন্ধরা বৈচিত্রময় পৃথিবীকে নতুন রূপে সাজায়। পত্র-পল্লবে, ফুলে-ফলে প্রফুল্লিত এক নতুন প্রকৃতিকে সে তুলে দেয় শরতের বরণডালায়। দূর আকাশে সাদা তুলোর মতো মেঘ ভাসে। মৃদু বাতাসে স্মিত হাসে কাশ ফুল। শিউলীর শরীরে জাগে শিহরণ। ঐ দূরে বেজে ওঠে ঢাক। দরজায় কড়া নাড়ে দুর্গোৎসব।

দুর্গোৎসব বাঙালি সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। এই উৎসবের উৎসে অধিষ্ঠিত হিন্দু পুরাণের অন্যতম দেবী দুর্গা।

দুর্গা নামের বুৎপত্তিগত অর্থ যিনি দুর্গ অর্থাৎ সঙ্কট হতে ত্রাণ করেন। শাস্ত্রে ‘দুর্গা’ শব্দটির একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। তাতে বলা হয়েছে ‘দুর্গা’র ‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, ‘উ-কার’ ( ু ) বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ (রৃ ) রোগনাশক, ‘গ’ অক্ষর পাপনাশক ও ‘অ-কার’ ( া ) ভয়-শত্রুনাশক। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা।

পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে দেবী দুর্গাই শিবের স্ত্রী পার্বতী। লক্ষ্মী, সরস্বতী, গনেশ ও কার্তিকের জননী তিনি। কিন্তু কেন শিবজায়া পার্বতীর নাম দুর্গা হল?

স্কন্দপুরাণ অনুসারে, রুরু দৈত্যের পুত্র ‘দুর্গ’কে বধ করেছিলেন বলেই পাবর্তীর নাম ‘দূর্গা’। তবে বাঙালির দুর্গোৎসবে দেবী কিন্তু স্কন্ধপুরাণ-এ বর্ণিত দুর্গাসুর বধকারী রূপে পূজিত নন। বাংলাদেশে তিনি পূজিত হন মহিষাসুরমর্দিনী রূপে। দেবী দুর্গার এই রূপের পরিচয় পাওয়া যায় মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এ।

মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে, তীব্র যুদ্ধে অসুরদের রাজা মহিষাসুর পরাজিত ও রাজ্যচ্যুত করলেন দেবতাদের। দেবরাজ ইন্দ্র দেবতাদের নিয়ে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলেন। ব্রহ্মা তাঁদের নিয়ে মহাদেব ও বিষ্ণু সমীপে উপস্থিত হলেন। দেবতাদের দূরাবস্থা দেখে ক্রোধান্বিত হলেন বিষ্ণু। তাঁর মুখমণ্ডল থেকে নিঃসৃত হল মহাতেজ। বিষ্ণুর মুখমণ্ডলের সেই মহাতেজের সঙ্গে এসে মিশল অন্য দেবতাদের তেজও। দেখতে দেখতে সন্মিলিত এই তেজ পর্বতপ্রমাণ অগ্নিকুণ্ডের মতো জ্যোতির্ময়ী মহাদেবীর রূপ ধারণ করল। এই জ্যোতির্ময়ী মহাদেবীই দুর্গা।

মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর একটি নির্বাচিত অংশ দেবীমাহাত্ম্যম্ অনুসারে, ত্রিশূলধারী মহাদেব স্বীয় শূল থেকে শূলান্তর এবং বিষ্ণু স্বীয় সুদর্শনচক্র থেকে চক্রান্তর উৎপাদন করে মহাদেবীকে দিলেন। বরুণদেব দিলেন শঙ্খ, অগ্নিদেব শক্তি এবং পবনদেব দিলেন একটি ধনু ও দুটি বাণপূর্ণ তূণীর। সহস্রলোচন ইন্দ্র তাঁর বজ্র থেকে বজ্রান্তর এবং ঐরাবত নামক স্বর্গগজের গলদেশস্থ ঘন্টা থেকে ঘন্টান্তর উৎপাদন করে দেবীকে দিলেন। মৃত্যুরাজ যম নিজের কালদণ্ড থেকে দণ্ডান্তর, জলদেবতা বরুন নিজের পাশ থেকে একটি পাশ এবং প্রজাপতি ব্রহ্মা রুদ্রাক্ষমালা থেকে একটি মালা ও কমন্ডলু থেকে সৃষ্ট একটি কমণ্ডলু দেবীকে দান করলেন। দুর্গাদেবীর সমস্ত লোমকূপে দিবাকর-সূর্য নিজ কিরণরাশি, নিমেষাদিকালাভিমানিনী দেবতা একটি প্রদীপ্ত খক্ষ ও একটি উজ্জ্বল ঢাল দেবীর হস্তে প্রদান করলেন। ক্ষীরোদসমুদ্র দেবীকে উজ্জ্বল মুক্তাহার, চিরনতুন বজ্রযুগল, দিব্যচূড়ামণি, দুইটি কুন্তল ও হস্তসমূহের বলয়গুলি, শুভ্র ললাটভূষণ, সকল বাহুতে অঙ্গদ, নির্মল নূপুর, অত্যুত্তম কন্ঠভূষণ এবং সমস্ত অঙ্গুলিতে শ্রেষ্ঠ অঙ্গুরী দান করলেন। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা দেবীকে অত্যুজ্জ্বল কুঠার, নানাপ্রকার অস্ত্র এবং অভেদ্য কবচ প্রদান করলেন। সমুদ্র তাঁর শিরে অম্লান পদ্মের একটি মালা, তাঁর বক্ষে তাদৃশ অপর আরেকটি মালা এবং তাঁর হস্তে একটি পরম সুন্দর পদ্ম দান করলেন। গিরিরাজ হিমালয় বাহনস্বরূপ সিংহ ও বিবিধ রত্ন এবং কুবের সদা সুরাপূর্ণ একটি পানপাত্র দিলেন। যে নাগরাজ বাসুকি এই পৃথিবী ধারণ করেন, তিনি দুর্গাদেবীকে মহামণিশোভিত একটি নাগহার প্রদান করলেন। অন্যান্য দেবগণ-কর্তৃক অলঙ্কার ও অস্ত্র দ্বারা পূজিতা হয়ে দেবী বারংবার অট্টহাস্য ও হুঙ্কার দিয়ে যাত্রা করলেন যুদ্ধে। প্রচন্ড যুদ্ধের পর মহিষাসুর বধ করে দেবতাদের হৃতরাজ্য ফিরিয়ে দিলেন তিনি। অতপরঃ অসুর বধের আনন্দে শুরু হল উৎসব। দুর্গোৎসব।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে দুর্গোৎসবের প্রবর্তক স্বয়ং কৃষ্ণ। এই পুরাণে লিখিত বিবরণ অনুসারে, সৃষ্টির আদিতে গোলকস্থ আদিবৃন্দাবনক্ষেত্রের মহারাসমণ্ডলে কৃষ্ণ সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা করেন। দ্বিতীয়বার দুর্গার আরাধনা করেন মধু-কৈটভ দৈত্যদ্বয়ের ভয়ে ভীত ব্রহ্মা। ত্রিপুরাসুরের সঙ্গে যুদ্ধকালে চিন্তিত মহাদেব তৃতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন। দুর্বাসা মুনির শাপে শ্রীভষ্ট হয়ে দেবরাজ ইন্দ্র যে দুর্গাপূজা করেন, তা ছিল চতুর্থ দুর্গোৎসব। তারপর থেকেই সর্ববিশ্বে দেবতাগণ, মুনিগণ, সিদ্ধপুরুষ এবং মানবগণ বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন কালে দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন।

দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু পৃথিবীর শাসনভার পেয়ে ক্ষীরোদসাগরের তীরে মৃন্ময়ী মূর্তি নির্মান করে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন রাজা সুরথ।

রাজা সুরথ দুর্গাপূজা করেছিলেন বসন্তকালে। সেই পুজা অনুসরন করে কোন কোন স্থানে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হলেও বাংলাদেশে দুর্গোৎসবের জনপ্রিয় সময় শরৎকাল।

শরৎকালে দুর্গোৎসব করেন রামচন্দ্র। কৃত্তিবাসী রামায়ণ অনুসারে, রামচন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত লঙ্কাধিপতি রাবণ আকুল সুরে দেবীর স্তব করলেন।

রাবণের কাতর স্তবে দেবীর হৃদয়ে করুণার উদ্রেক হল। রাবণকে অভয় দিলেন তিনি।

সম্পূর্ণ অনাকাঙ্খিত এই খবরে আশঙ্কিত হলেন রাম। দেবতারাও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলেন। দেবরাজ ইন্দ্র ব্রহ্মার কাছে গেলেন। এই সংকটাপন্ন মুহুর্তে একটা কিছু করার অনুরোধ জানালেন ব্রহ্মাকে।

ব্রহ্মা রামের কাছে এলেন, বললেন, ‘দুর্গাপূজা করো। দুর্গাপূজাই এই সংকট থেকে পরিত্রানের একমাত্র উপায়।’
‘কিন্তু এখন যে শরৎকাল!’ রাম সংশয়পূর্ণ কন্ঠে বললেন, ‘দুর্গাপূজার প্রশস্ত সময় তো বসন্তকাল! শাস্ত্রমতে শরৎকাল অকাল। তাছাড়া বিধান রয়েছে অকালবোধনে নিদ্রা ভাঙাতে হবে কৃষ্ণানবমীতে। রাজা সুরথ প্রতিপদে পূজারম্ভ করেছিলেন। সেকাল তো আর নেই! সুতরাং কিভাবে করবো এখন দুর্গাপূজা?’

ব্রহ্মা বললেন, ‘আমি ব্রহ্মা, বিধান দিচ্ছি শুক্লাষষ্ঠীতে বোধন করো।’
ব্রহ্মার কথা শুনে আশ্বস্ত হলেন রামচন্দ্র। দেবী দুর্গার মাটির প্রতিমা গড়ে পূজা শুরু করলেন তিনি। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেল গাছের তলায় হল দেবীর বোধন। অধিবাসের সময় স্বহস্তে নবপত্রিকা বাঁধলেন রামচন্দ্র। সপ্তমীর দিন সকালে স্নান করে বেদবিধিমতে পূজা করলেন। অষ্টমীর দিনও তাই করলেন তিনি। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে করলেন সন্ধিপূজা।
রামচন্দ্রের নবমী পূজার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন কৃত্তিবাস ওঝা। সেই বর্ণনা অনুসারে, বহুরকম বনফুল ও বনফলে পূজার আয়োজন করা হল। তন্ত্রমন্ত্রমতে পূজা হল। কিন্তু দেবী দর্শন দিলেন না।

তখন বিভীষণ বললেন, ‘নীলপদ্ম সহযোগে পূজা করুন প্রভূ। দেবী নিশ্চয় দর্শন দেবেন।’
কিন্তু নীলপদ্ম যে দুর্লভ! পৃথিবীতে একমাত্র দেবীদহ নামক হ্রদেই নীলপদ্ম মেলে। সেই হ্রদ তো লঙ্কা থেকে বহুদূরে! এই দূরত্ব অতিক্রম করতে দশ বছর প্রয়োজন! কার সাধ্য এতটা পথ অতিক্রম করে নীলপদ্ম নিয়ে আসে! সমস্যার কথা শুনে এগিয়ে এলেন পবনপুত্র হনুমান। তাঁর ক্ষমতা সীমাহীন। নিমেষেই তিনি উপস্থিত হলেন দেবীদহে। এনে দিলেন একশো আটটি নীলপদ্ম।

নীলপদ্ম সহযোগে পূজা শুরু হল। কিন্তু দেবী দুর্গা মায়াবলে একটি পদ্ম লুকিয়ে রাখলেন। রামচন্দ্রকে ভক্তির পরীক্ষায় ফেললেন তিনি।

অঞ্জলি দেবার সময় রামচন্দ্র লক্ষ্য করলেন একশো সাতটি নীলপদ্ম রয়েছে সেখানে! অথচ আরেকটি নীলপদ্ম না পেলে যে অসম্পূর্ণ থাকবে পূজা!

রামচন্দ্র পদ্মলোচনা। পদ্মের মতো অপরূপ চোখ তাঁর। পদ্মের অভাব পূরণ করতে নিরুপায় রামচন্দ্র স্বহস্তে নিজের একটি চোখ উৎপাটন করে দেবীর পাদপদ্মে নিবেদনে উদ্যত হলেন। দেবী দুর্গা রামচন্দ্রের ভক্তিতে সন্তুষ্ট হলেন। তিনি রামকে চোখ উৎপাটনে বাঁধা দিয়ে যুদ্ধ জয়ের আশীর্বাদ করলেন।
দেবী দুর্গার আশীর্বাদে শ্রীরামচন্দ্র সমাপ্ত করলেন দশমী পূজা।

রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার এই ইতিহাস বাল্মীকি রামায়ণ-এ নেই। আছে খ্রীষ্টিয় নবম-দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাঙালি স্মার্তদের লেখা দেবীভাগবত পুরাণ ও কালিকাপুরাণ-এ। কৃত্তিবাসের আগেও যে বাংলায় দুর্গাপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল, তার প্রমাণ একাদশ শতাব্দীতে লেখা ভবদেব ভট্টের মাটির মূর্তিতে দুর্গাপূজার বিধান, চতুর্দশ শতাব্দীতে লেখা বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তি-তরঙ্গিনী, শূলপাণির দুর্গোৎসব-বিবেক ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে লেখা স্মার্ত রঘুনন্দনের দুর্গাপূজা-তত্ত্ব। কৃত্তিবাসের যুগে অর্থাৎ পঞ্চদশ শতাব্দীতে দুর্গাপূজা ছিল বাঙালির এক প্রধান উৎসব।

কৃত্তিবাসী রামায়ণ-এর দুর্গাপূজার বিবরণের চাইতে পৌরাণিক দুর্গাপূজার বিবরণ কিছুটা আলাদা। কালিকাপুরাণ অনুসারে, রাবণবধে রামচন্দ্রকে সাহায্য করার জন্য রাত্রিকালে দেবীর বোধন করেছিলেন ব্রহ্মা।

কিন্তু ‘রাত্রিকালে দেবীর বোধন’ অর্থ কি? শরৎকালকে রামচন্দ্র কেন দুর্গাপূজার পক্ষে ‘অকাল’ বলেছিলেন? ‘অকালবোধন’ বিষয়টাই বা কি?

পুরাণ মতে, সূর্যের উত্তরায়ন হচ্ছে দেবতাদের দিন। উত্তরায়ন অর্থ বিষুবরেখা থেকে সূর্যের ক্রমশ উত্তরে গমন। সূর্যের এই গমনে সময় লাগে ছয়মাস। এই ছয় মাস দেবতাদের একদিনের সমান। দিনের বেলায় জাগ্রত থাকেন দেবতারা। তাই দিনেই দেবতাদের পূজা করা শাস্ত্রের বিধান।

অন্যদিকে সূর্যের দক্ষিণায়ন দেবতাদের রাত। দক্ষিণায়ন অর্থ বিষুবরেখা থেকে সূর্যের ক্রমশ দক্ষিণে গমন। সূর্যের এই গমনকালের ব্যপ্তিও ছয় মাস। দক্ষিণায়নের ছয় মাস দেবতাদের একরাতের সমান। স্বাভাবিকভাবেই এই সময় দেবতারা ঘুমান। সেকারণেই রাতে পূজার বিধান নেই শাস্ত্রে।

শরৎকাল দক্ষিণায়ণের সময়। দেবতাদের রাত্রিকাল। তাই শরৎকাল পূজার্চনার উপযুক্ত কাল নয়- ‘অকাল’। অকালে দেবতার পূজা করতে হলে তাঁকে জাগরিত করতে হয়। জাগরনের এই প্রক্রিয়াটিই হল ‘বোধন’।

বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এ রামের জন্য ব্রহ্মার দুর্গাপূজার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই পুরাণ অনুসারে, রামচন্দ্রের মঙ্গলের জন্য স্বয়ং ব্রহ্মা স্তব করে দেবীকে জাগরিত করে বললেন, ‘রাবণবধে রামচন্দ্রকে অনুগ্রহ করার জন্য তোমাকে অকালে জাগরিত করেছি। যতদিন না রাবণ বধ হয়, ততদিন তোমার পূজা করব। যেমন করে আজ তোমার বোধন করে পূজা করলাম, তেমন করেই মর্ত্যবাসী যুগ যুগ ধরে তোমার পূজা করবে। যতকাল সৃষ্টি থাকবে, তুমিও পূজা পাবে ঠিক এইভাবেই।’
একথা শুনে খুশি হলেন দেবী, বললেন, ‘সপ্তমী তিথিতে আমি প্রবেশ করব রামের ধনুর্বাণে। অষ্টমীতে মহাযুদ্ধ হবে রাম-রাবণের। অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে বিচ্ছিন্ন হবে রাবণের দশমুণ্ড। সেই দশমুণ্ড জোড়া লাগবে আবার। কিন্তু নবমীতেই নিহত হবেন রাবণ। দশমীতে রামচন্দ্র করবেন বিজয়োৎসব।’
দেবীর কথামতোই হল সবকিছু। যথাযথভাবেই পালিত হল বিজয়োৎসব।

বিভিন্ন পুরাণে উল্লেখিত উদাহরন ছাড়াও গবেষণালদ্ধ নানা সূত্রমতে, দুর্গাপূজার প্রচলন প্রাচীন বৈদিক যুগে। ঋগে¦দ-এর দশম মণ্ডলের দশম অনুবাকে ‘দেবীসূক্ত’-এর উল্লেখ আছে। আট মন্ত্রবিশিষ্ট ঋগেদীয় দেবীসূক্তের মন্ত্রদ্রষ্টা মহর্ষি অম্ভৃণের কন্যা ব্রহ্মবাদিনী বাক্। এই দেবীসূক্তই দেবীবন্দনার মঙ্গলসূত্র।

বৈদিক হিন্দুধর্ম ছিল যজ্ঞ অনুসৃত। বৈদিক যজ্ঞ ও দুর্গাপূজার মধ্যে প্রভেদ পরিলক্ষিত হলেও উভয়ের উদ্দেশ্য একই। বৈদিক যজ্ঞের উদ্দেশ্য রোগমুক্তি ও অপশক্তির বিরুদ্ধে বিজয় কামনা, রূপ-যশ-সৌভাগ্য-ধন-পুত্র প্রার্থনা । দুর্গার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্রও বলে, ‘আয়ুরারোগ্যং বিজয়ং দেহি দেবি নমস্তুতে। রূপং দেহি যশো দেহি ভাগ্যং ভগবতি দেহি মে। পুত্রান দেহি ধনং দেহি সর্ব্বকামাংশ্চ দেহি মে ॥’ ( হে ভগবতী, আপনাকে প্রণাম করি, আপনি আমাকে রোগমুক্ত করুন, বিজয়ী করুন, যশ ও সৌভাগ্য প্রদান করুন, পুত্র ও ধন প্রদান করুন এবং আমার সকল কামনা পূর্ণ করুন।)

বৈদিক যজ্ঞের মতো দুর্গাপূজার মন্ত্রেও ‘যজ্ঞ’ শব্দটির পরিব্যাপ্তি লক্ষ্যনীয়। দুর্গাপূজায় দেবীকে যজ্ঞভাগ গ্রহণে আহ্বান জানানো হয় (‘দেবি যজ্ঞভাগান্ গৃহাণ’)। বৈদিক যুগে প্রত্যেক ঋতুর প্রারম্ভেই অনুষ্ঠিত হত যজ্ঞ। যজ্ঞ হত শরৎঋতুর আরম্ভেও। মূলত বৈদিক শারদ যজ্ঞই তন্ত্র সমাচ্ছন্ন হয়ে পর্যবসিত হয়েছে আধুনিক দুর্গোৎসবে।

বাংলাদেশে দুর্গোৎসব সাধারণত আশ্বিন শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিন অর্থাৎ ‘ষষ্ঠী’ থেকে দশম দিন অর্থাৎ ‘দশমী’ অবধি পাঁচ দিন অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে দুর্গাষষ্ঠী, মহসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত।
পূজার এই পাঁচদিনসহ সমগ্র পক্ষটিকে ‘দেবীপক্ষ’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। দেবীপক্ষের সূচনা হয় পূর্ববর্তী অমাবস্যার দিন। এই দিনটি ‘মহালয়া’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে দেবীপক্ষের সমাপ্তি হয় পঞ্চদশ দিন অর্থাৎ পূর্ণিমায়। এই দিনটি কোজাগরী পূর্ণিমা নামে পরিচিত। দিনটি বাৎসরিক লক্ষ্মীপূজার দিন হিসাবে গণ্য হয়। দুর্গাপূজা মূলত পাঁচদিনের অনুষ্ঠান হলেও মহালয়া থেকেই প্রকৃত উৎসবের সূচনা হয় এবং কোজাগরী লক্ষ্মীপূজায় হয় সমাপ্তি।

বাংলায় দুর্গোৎসবের বহুল প্রচলিত রূপ অর্থাৎ মহিষাসুরমর্দিনীর পূজার উল্লেখ পাওয়া যায় মার্কণ্ডেয় পুরাণ (মূল পুরাণটি চতুর্থ শতাব্দীর রচনা, তবে দুর্গাপূজার বিবরণ-সম্বলিত সপ্তশতী চণ্ডী অংশটি পরবর্তীকালের সংযোজন), ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ (রচনাকাল আনুমানিক অষ্টম শতাব্দী), বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণ (সঠিক রচনাকাল অজ্ঞাত), কালিকাপুরাণ (রচনাকাল ৯ম-১০ম শতাব্দী) ও বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এ (রচনাকাল ১২শ শতাব্দী)। শুধু পুস্তকসূত্রই নয়, বাংলার বিভিন্ন স্থান থেকে আবিস্কৃত হয়েছে ৯ম-১২শ শতাব্দীর মধ্যকার সময়ে নির্মিত একাধিক মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তিও। তবে সেই সব মূর্তিতে মহিষাসুরমর্দিনী কিন্তু পরিবারসমন্বিতা নন।

মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার পরিবারসমন্বিতা মূর্তির প্রচলন হয় ষোড়শ শতাব্দির প্রথম পাদে। পরিবারসমন্বিতা এই মূর্তিকাঠামোর মধ্যস্থলে দেবী দুর্গা সিংহবাহিনী ও মহিষাসুরমর্দিনী। তাঁর উপরিভাগে ধ্যানমগ্ন মহাদেব। মহিষাসুরমর্দিনীর ঠিক ডানপাশে উপরে দেবী লক্ষ্মী ও নীচে গণেশ; বামপাশে উপরে দেবী সরস্বতী ও নীচে কার্তিক।

পরিবারসমন্বিতা এই রূপে দুর্গাপূজা প্রথম অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার তাহিরপুরে। পণ্ডিত প্রবর রমেশ আচার্যের বিধানে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে মহাড়ম্বরে দুর্গাপূজা শুরু করেন তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ। কংসনারায়ণের পূজার পরপরই আড়ম্বরপূর্ণ দুর্গাপূজার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন অবিভক্ত বাংলার জমিদাররা। নতুন আঙ্গিকের এই পূজার শাস্ত্রীয় ও সামাজিক আয়োজন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় দুর্গাপূজা পরিনত হয় জমিদারদের উৎসবে।

জমিদারী প্রথা বিলোপের পর দুর্গোৎসবে জমিদারদের অংশগ্রহণের হার কমে আসে স্বাভাবিকভাবেই। নব্য ধণিকশ্রেণীর উদ্ভবের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্গোৎসব আয়োজকগোষ্ঠীতে যুক্ত হয় অনেক নতুন মুখ। তবে প্রতিটি দুর্গোৎসবই তখন আয়োজিত হত সম্পূর্ণ একক উদ্যোগে।

আনুমানিক ১৭৯০ খ্রীষ্টাব্দে একটি ঘটনা ঘটে অবিভক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। গুপ্তিপাড়ার একটি ধনী পরিবারের আকস্মিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে অনিশ্চয়তার সন্মূখীন হয় বাড়িটির বাৎসরিক পূজার আয়োজন। গুপ্তিপাড়ার বারো জন বন্ধুস্থানীয় যুবক তখন এগিয়ে আসে সামনে। এই বারো জন ‘ইয়ার’ বা বন্ধু সংঘবদ্ধ ভাবে গ্রহণ করে পূজাটির দায়িত্ব্। গুপ্তিপাড়ার এই পূজাটি মানুষের কাছে পরিচিত হয় ‘বারোইয়ারি’ বা বারোয়ারি পূজা নামে।

বারোয়ারি পূজার সূত্র ধরে একক উদ্যোগে সম্পাদিত পূজা রূপান্তরিত হল একধিক জনের পূজাতে। ধনীর আঙ্গিনা থেকে পূজা নেমে এল অনেকটাই সাধারনের সন্নিকটে। গুপ্তিপাড়ার আদর্শ অনুসরণ করে সম্মিলিত উদ্যোগের বারোয়ারি পুজো ছড়িয়ে পড়ল বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলায় দুর্গাপূজার সংখ্যা বাড়ল ব্যাপকহারে। পূজার সংখ্যা বাড়লেও সে সব পূজার সঙ্গে সর্বজনের সংযুক্ততা সৃষ্টি হয়নি তখনও। ঊনবিংশ শতাব্দী বাংলার সামজিক আন্দোলনের স্বর্ণযুগ। একদিকে ব্রিটিশ বিরোধিতা, অন্য দিকে শিক্ষার প্রসার- এই দুইয়ের কারণে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে সামাজিক প্রভেদ অনেকটাই কমে এল।

বিংশ শতকের প্রথম পাদে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় গড়ে ওঠা ‘স্বদেশি আন্দোলন’ বাংলার শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলকে একত্রিত হবার সুযোগ এনে দিল। আন্দোলনের নেতৃত্ব ধণিক শ্রেণীর হাতে থাকলেও আন্দোলনের স্বার্থেই তাঁরা শ্রেণীগত ও জাতিগত বিভেদ নিয়ে আপস করতে বাধ্য হলেন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের এই নৈকট্য সাধারন মানুষকে সাহস জোগাল দুর্গাপূজার মতো সুবৃহৎ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে বিত্তশালীদের একচেটিয়া অধিকারে ভাগ বসাতে, ব্যক্তি বা বারোয়ারির সীমা ছাড়িয়ে পূজাকে সর্বজনের উৎসবে পরিণত করতে।

বাংলায় দুর্গাপূজাকে সর্বজনের উৎসবে পরিনত করার অগ্রপথিক বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথ বসু। উত্তর কলকাতায় তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ‘সিমলা ব্যায়াম সমিতি’ ছিল সে যুগের বিপ্লবীদের আস্তানা। এই সমিতির উদ্যোগে ১৯২৬ সালে আয়োজিত হল ‘সর্বজনীন দুর্গোৎসব’। এই উৎসবে সর্বজনের অধিকার নিশ্চিত করা হল। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষকেই উৎসবের শর্তহীন অংশীদার করা হল। সিমলা ব্যায়াম সমিতির ওই পূজাদ্যোগের সাথে পর্যায়ক্রমে যুক্ত হলেন বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরা ।

ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠল। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি সশস্ত্র বিপ্লবের পথে স্বাধীনতা অর্জনের প্রচেষ্টাও চলল সমান তালে। ইংরেজের নজর এড়াতে দুর্গোৎসবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করল বিপ্লবীরা। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ছদ্মাবরণে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে সংঘবদ্ধ করার কাজের অন্যতম উপায় হয়ে উঠল দুর্গোৎসব।

কালের পরিক্রমায় ব্রিটিশ শাসনের অবসান হল। বিভাজিত হল বাংলা। পাকিস্তানি অপশাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শেষে বিভাজিত বাংলার পূর্বাঞ্চল রূপান্তরিত হল বাংলাদেশ নামের একটি নতুন রাষ্ট্রে। স্বাধীন বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের অসাম্প্রদায়িক প্রবণতা দুর্গোৎসবকে পরিনত করল প্রকৃতঅর্থেই সর্বজনীন উৎসবে।

দীপংকর চন্দ: সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিককর্মী।

দীপংকর চন্দসংবাদিক ও সাংস্কৃতিককর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—