Feature Img

Babymoudud-f111প্রবীণ শব্দ উচ্চারণ মাত্র আমাদের চোখের সামনে যে-ছবিটা ভেসে ওঠে তাহলো একজন শুভ্রকেশধারী মানুষ যিনি বয়সের ভারে এবং বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় কাতর। কেউ কেউ অত্যন্ত অসহায়ভাবে জীবন যাপন করে থাকেন। আমরা তাদের সম্মান মর্যাদা কতখানি দিয়ে থাকি জানি না, তবে অযত্ন-অবহেলা ও উপেক্ষা করতে পারলে যেন বাঁচি। মনে করে থাকি বৃদ্ধ আর ক’দিন বাঁচবে? তার জন্য সময় নষ্ট করার দরকার কী? এটা কখনও আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা মূল্যবোধ হওয়া উচিত নয়।

আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এ বছরের শ্লোগান হচ্ছে ‘দীর্ঘ জীবন : ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ’ প্রবীণদের অধিকার রক্ষা ও পুণর্বাসনের দাবিতে বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হবে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। ৬০ বছর পার হলেই প্রবীণের ঘরে নাম লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক হয়ে উঠেছেন তারা। জাতিসঙ্ঘের হিসাব অনুযায়ী জন্মের পর বাংলাদেশের গড় আয়ু হচ্ছে ৭০.০৬ বছর। এর মধ্যে পুরুষদের আয়ু ৭০.০৬ বছর, নারীর ৭১ .৯৮ বছর। আর ৬০ বছর বয়সের উর্ধে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ বসবাস করছে। এদের কেউ কেই একশ বছরের মতো বয়সেও দীর্ঘ জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে নারী প্রবীণরা দীর্ঘজীবী হলেও তাদের অধিকাংশই মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হন। এ দু:সহ জীবন যাপন শুধুমাত্র আসহায়ত্ব ও দূর্ভাগ্যজনক ছাড়া আর কিছু নয়।

২০০২ সালে মাদ্রিদে অনুষ্টিত ১৫৯টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রবীন বিষয়ক দ্বিতীয় বিশ্ব সম্মেলনে একটি আন্তর্জাতিক কর্ম পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক ঘোষণা গৃহীত হয়। এতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে ‘সকল বয়সীদের জন্য উপযুক্ত একটি সমাজ নির্মাণের জন্য উন্নয়নের অধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা ও সকল ধরনের মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়ন খুবই প্রয়োজন।’

এই সম্মেলনে যে এগারোটি বিষয়ের ওপর গূরুত্ব আরোপ করা হয় সেগুলো হচ্ছে (১) সকল প্রবীণ নাগরিকের মৌলিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন, (২) নিরাপদ বার্ধক্য অর্জন এবং প্রবীণ বয়সে দারিদ্র দূরীকরণ এবং প্রবীণদের জন্য জাতিসঙ্ঘ নীতিমালা বাস্তবায়ন, (৩) নিজেদের সমাজে স্বেচ্ছামূলক কাজ ও আয় বর্ধকমূলক কাজের মাধ্যমে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনযাপনে পরিপূর্ণ ও কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রবীনদের ক্ষমতায়ন, (৪) জীবনব্যাপি এবং শেষ জীবনেও স্বচ্ছল, আত্মপরিতৃপ্তি ও ব্যক্তিগত উন্নয়নে সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে (৫) প্রবীণরা কোনও একক সমজাতীয় বর্গ নয়– বিষয়টি স্বীকার করে তাদের জীবনব্যাপি শিক্ষা ও কমিউনিটি অংশগ্রহণের সুযোগ, (৬) প্রবীণরা যেন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার এবং ব্যক্তির নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত এবং তার বিরুদ্ধে সকল বৈষম্য ও সন্ত্রাস দূর করতে হবে, (৭) জেন্ডারকেন্দ্রীক বৈষম্য দূর করে প্রবীণদের মধ্যে জেন্ডার সাম্য প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার; (৮) সামাজিক উন্নয়নের জন্য পারস্পরিক সংহতি, আন্ত:প্রজন্ম নির্ভরশীলতা ও পরিবারে স্বীকৃতি প্রদান, (৯) প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনমূলক স্বাস্থ্যসেবা, সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ থাকা (১০) প্রবীনদের মধ্যে প্রাইভেট সেক্টর, সিভিল সোসাইটি ও সরকারের সব মহলের মধ্যে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সহযোগিতা, (১১) উন্নয়নশীল দেশসমূহে অন্যান্যের মধ্যে বার্ধক্যের ব্যক্তিকর, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রতিক্রিয়াগুলো কেন্দ্র করে যন্ত্রপাতি আবিষ্কারসহ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে উৎসাহ প্রদান, (১২) আদিবাসী প্রবীণদের বিশেষ পরিস্থিতি ও অন্যান্য পারির্পাশ্বিকতা বিবেচনায় রেখে তাদের বক্তব্য কার্যকরভাবে প্রকাশের সুযোগ দেয়া।

এই সম্মেলনে যে তিনটি নির্দেশনা কার্যকর করতে বলা হয়েছে সেগুলো হলো : (ক) প্রবীণ জনগোষ্ঠী ও উন্নয়ন, (খ) প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি; (গ) প্রবীণদের জন্য সক্ষমতা ও সহায়তামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা। সম্মেলনে ২৩৯টি সুপারিশ সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

আমাদের দেশে সরকারীভাবে বর্তমানে ২৪ লক্ষ ৭৫ হাজার দুঃসহ নারী ও পুরুষকে বয়স্কভাতা হিসেবে মাসে তিনশত টাকা দেয়া হয়। ছয়টি সেভ হোম বা শান্তিনিবাস আছে, তবে অব্যবস্থাপনায় ভরা। বেসরকারীভাবে দেশে কিছু বৃদ্ধাশ্রম আছে, যেখানে সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবারের অবহেলা, সন্তানদের উপক্ষোয় অশ্রপাত ও হৃদরোগে মৃত্যু প্রবীণদের একমাত্র নিয়তি।

প্রবীণদের প্রতি তরুণ প্রজন্মের অসম্মান কখনও বাঙালির মূল্যবোধ হতে পারে না। এছাড়া দারিদ্র ও নিঃসঙ্গতা প্রবীণদের কাছে অভিশাপ ছাড়া কিছু নয়। আমাদের দেশে প্রবীণ নীতিমালা আছে। প্রবীণদের সিনিয়র নাগরিক’ ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি। পৃথিবীর উন্নত দেশে ও আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতেও এই সম্মানের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। একারণেই সেখানে যানবাহনে যাতায়াতে, স্বাস্থ্যসেবা নিতে, ব্যাংকের লেনদেন কার্যক্রমে প্রবীণদের বিশেষভাবে সহযোগিতা দেবার ব্যবস্থা আছে। ‘সিনিয়র নাগরিক’ ঘোষণা করলে এসব সুযোগ তো পাওয়া যাবেই এবং সমাজের অবহেলা, তরুণদের কাছে অসম্মান ও ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপের সম্মুখীন হতে হবে না। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে তাদের সম্মান করা, শ্রদ্ধা করা, মর্যাদা দেয়া ও সহায়তা করা আমাদের কর্তব্য হ্ওয়া উচিৎ।

প্রবীণরা অভিজ্ঞতার সম্পদ, আমাদের কাছে উজ্জীবনী শক্তি হিসেবে চলমান ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক।

বেবী মওদুদ: লেখক ও সাংবাদিক।

Responses -- “প্রবীণ : সিনিয়র নাগরিকের স্বীকৃতি চাই”

  1. ফারহানা মান্নান

    প্রবীণদের প্রতি তরুণ প্রজন্মের অসম্মান কখনও বাঙালির মূল্যবোধ হতে পারে না। আপনার লেখা পড়ে ভাল লাগলো আপা।

    Reply
  2. Mustab-shira Ruhani

    বেবি আপা, অনেক ধন্যবাদ। খুব ভালো লেগেছে লেখাটা।

    আমাদের প্রজন্মকে সচেতন করার জন্য এ ধরনের লেখা আরও প্রত্যাশা করছি।

    Reply
  3. জাকির হোসাইন

    খুব সুন্দর একটা পরিচ্ছন্ন লেখা…. যা বর্তমান প্রজন্মের জন্য জানা ও বোঝা খুব দরকার ও উপকারী বটে। আমাদের সমাজে বয়স্কদের প্রতি নাগরিকের সন্মানবোধ যেন একটা সামাজিক কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এটা প্রত্যাশা, বেবি আপা……এমন সামাজিক সচেতনামূলক লেখা আরো চাই। অনেক ধন্যবাদ … শুভেচ্ছা।.

    Reply

Leave a Reply to জাকির হোসাইন Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—