Feature Img

M-M-Akash-Edited11111111111বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর নিয়ে ইদানিং যুক্তরাষ্ট্রকে খুব উদ্বিগ্ন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা সাহেব এমনভাবে কথা বলছেন যেন তিনি আমাদের দেশের কোনও ট্রেড ইউনিয়ন লিডার! আমাদের শ্রমিক-স্বার্থ নিয়ে কাজ করছেন। শ্রমিকদের খুন -গুম করে ফেলা হচ্ছে এ সব নিয়ে বলছেন। এ প্রেক্ষাপটে অনেকেই এ উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে, খুব শিগগির যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণত নানা ধরনের লিবারেজ থাকে। আমাদের গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে ড্যান মজিনা চায়ের পেয়ালায় যে ঝড় তুলছেন তার পেছনে অর্থনৈতিক কারণের চেয়ে রাজনৈতিক কারণগুলোই বেশি শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা। অবশ্যই কিছু জিওপলিটিক্যাল মোটিভ আছে তাদের। আর এমন কোনও মোটিভ থাকলেই তারা লিবারেজগুলো ব্যবহার করে। এখন আমরা যাতে তাদের আর সুযোগ করে না দিই। মজুরি বাড়ানো বা আমিনুলের মতো কোনও শ্রমিকনেতা হত্যার যথাযথ তদন্ত করে ওদের কথা বলার সুযোগগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।

পাশাপাশি এটা ঠিক যে, আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে চিরকাল যদি মজুরি কম থাকে তবে সমস্যা হতেই পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এখন বেকারত্বের হার গত অর্থনৈতিক মন্দার পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ৭ থেকে ৮ শতাংশ থাকছে সবসময়। তাই একটি জবও যাতে লস্ট না হয় সে চেষ্টা করছে ওরা। আর এ জন্যই আমাদের পণ্য উৎপাদনের আকারটাকে খুব বেশি বাড়তে দিতে চাইবে না ওরা। তাতে ওদের উৎপাদনের আকার ঠিক থাকবে। আর এ চিন্তা থেকে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের ওপর ‘কমপ্লায়েন্ট কন্ডিশন’ চাপিয়ে দিয়ে থাকতে পারে। ‘কমপ্লায়েন্ট কন্ডিশন’ মানে আমাদের শ্রমিকদের মজুরি বা সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য শর্ত দেওয়া। তবে আমার ধারণা যে যুক্তরাষ্ট্রের এ স্বার্থটা অত তীব্র কোনও স্বার্থ নয়।

কারণ গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে আমরা খুব লো-এন্ডে কাজ করি। তার মানে, আমরা যে পণ্যগুলো গার্মেন্টসে উৎপাদন করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাঠাচ্ছি, সে পণ্য এত কম মজুরি দিয়ে ওরা কোনও দিনও ওখানে উৎপাদন করতে পারবে না। সুতরাং ওদের ধরেই নিতে হবে যে এ সব পণ্যের জোগান আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকেই আসবে।

একটা বিষয় লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আমাদের কর্মশক্তি অন্যান্য দেশে যে ধরনের কাজ করছে বা আমরা যে ধরনের পণ্য বানাচ্ছি- সেগুলোর ক্রেতা এর চেয়ে সস্তা শ্রম-বিক্রেতা বা উৎপাদক পাবে না। মধ্যপ্রাচ্যে দেখুন, ড্রেনেজ পরিষ্কারের কাজটা আমাদের শ্রমিকেরা করেন। এ কাজের জন্য যে মজুরি তারা দেয় তাতে অন্য দেশের লোক পাওয়া যাবে না। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের জন্য ওদের অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ছেলেদের বেশি পাঠানো হয়। ওরাই যুদ্ধক্ষেত্রে ঝুঁকি নেয়, মারা যায়। কোনও মার্কিন তরুণের কফিন এলে তো সরকারের ভোট নষ্ট হবে।

তাই মার্কিন স্ট্র্যাটিজিও এটাই যে, যত ধরনের ইনফিরিয়র জব আছে তা তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের দিয়ে করানো। বা যত ধরনের ইনফিরিয়র পণ্য আছে তা তৃতীয় বিশ্বেই উৎপাদিত হোক। ইনফিরিয়র পণ্য বলতে আমরা বোঝাচ্ছি যে সব পণ্য উৎপাদনে পরিবেশগত ঝুঁকি বা হেলথ হ্যাজার্ড বেশি আছে। যেমন, জাহাজ-ভাঙ্গা শিল্প। গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে এ শিল্প বিকশিত হওয়ার পেছনের কারণ হল এ শিল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি বেশি। তাই আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশেই এটা বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। একসময় চীন ও ভারত কিছু ইনফিরিয়র পণ্য উৎপাদন করত। এখন আর করছে না। গত দু’বছর ধরে তারা বরং বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস পণ্য আমদানি করছে।

অর্থনীতির ভাষায় ‘ফ্লাইং গিজ মডেল’ বলতে একটি মডেল আছে। শীতের সময় সাইবেরিয়া থেকে যে অতিথি পাখিরা আসে ওরা একটা নিয়ম মেনে ওড়ে। সবচেয়ে প্রথম সারিতে থাকে একটি পাখি। তার পরের সারিতে দুটি। মাঝের সারিগুলোতে পাখিদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে এটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়- সবচেয়ে ওপরের সারিতে রয়েছে ইউরোপ, তারপরের সারিগুলোতে উন্নত দেশগুলো- এভাবে মাঝের সারিগুলোতে মধ্য আয়ের কিছু দেশ এবং সবশেষে আমরা, উন্নয়নশীল দেশগুলো। এখন যদি আমাদের ঠিক ওপরের সারির একটি দেশ তার ওপরের সারিতে চলে যায়, তাহলে আমাদের সুযোগ আছে ওপরের সারিতে যাওয়ার। এভাবেই উড়ন্ত পাখিদের মতো বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির মধ্যে গতিশীলতা থাকে। গ্লোবাল ইকোনমি এ নিয়মে চলছে। আমরা যেহেতু একদম শেষ সারিতে রয়েছি- আরও অনেকদিন ‘উড়তে’ পারব আমরা।

তাই আমার মনে হয়. আমাদের গার্মেন্টস-বাজার সহজে নষ্ট হবে না, বরং আগামীতে সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা। আজ যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বন্ধ হয়, তবে আমরা ইউরোপে যাব। ভারত-চীনের মতো দেশের বাজারও তো আমাদের জন্য তৈরি হয়েছে। গ্লোবাল ইকোনমির আসলে কত পার্সেন্ট আর যুক্তরাষ্ট্র নিচ্ছে? অন্য দেশও তো আছে।

সমস্যা সেখানে নয়। অন্যদিকে। এখন আমাদের গার্মেন্টসে প্রতিবছর ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এই যে বিশাল একটা প্রবৃদ্ধি- তার একটা অংশ শ্রমিকদের সঙ্গে শেয়ার করছেন না গার্মেন্টস মালিকরা। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শ্রমিকরা কম মজুরিতে কাজ করে আসছেন। ওদিকে শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাড়ায় মালিকদের কাছে বিশাল অংকের অর্থ আসছে। এখন মালিকরা শ্রমিকদের সঙ্গে এই প্রবৃদ্ধির অর্থ শুধু শেয়ার করছেন না তা নয়- শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের প্রকৃত মজুরিকে কনস্ট্যান্ট লেভেলে রাখার চেষ্টাও করছেন না। এটা করতে হলে শ্রমিকদের আর্থিক মজুরিকে মুদ্রাস্ফীতির হার অনুযায়ী অ্যাডজাস্ট করে নিতে হয়।

এটা তো এখানে হচ্ছে না। আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করুন। আমরা আয় করছি ডলারে। ডলারের দাম এখন বেড়েছে। ৭০ টাকা থেকে ৮০ টাকার ওপরে গেছে ডলারের দাম। ডলারের যদি ২০ শতাংশ ডেপ্রিসিয়েশন হয়, তাহলে সবকিছুর দাম ২০ শতাংশ হারে বাড়বে। তাতেও কিন্তু মুনাফার হার ঠিকই থাকবে। মালিকরা এর সুযোগ নিয়ে মুনাফার পরিমাণ বাড়িয়ে নিচ্ছেন কিন্তু এই বাড়তি মুনাফাটা শ্রমিকদের সঙ্গে শেয়ার করছে না।

তাতে ক্ষতি হচ্ছে যেটা তা হল, শ্রমিকদের পেটে টান পড়ছে। তারা নানা সময়ে বিক্ষোভ করছেন। এ সুযোগে ঝুট মাস্তানরা গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে আগুন দিচ্ছে। এখন কথা হল, পুরো পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? আমি বলব, শ্রমিকরা অবশ্যই দায়ী নন, দায়ী মালিকদের লোভ। তারা শ্রমিকদের বৈধভাবে ট্রেড ইউনিয়ন করতে দিচ্ছেন না। তাই আমি মনে করি, মজিনা সাহেবের ধমক বা ইত্যাদির কারণে গার্মেন্টস শিল্পের কোনও ক্ষতি হবে না। বরং এই ট্রেড ইউনিয়ন করতে না দেওয়ার কারণেই সমস্যাগুলো গভীর হচ্ছে।

সরকারের নিয়ম হচ্ছে- মোট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দিতে হবে। মালিকরা বলছেন, তারা ৩ শতাংশ হারে নিট মুনাফা করছেন। তাদের হিসেবটা যদি মেনে নিই তাহলেও, আমি হিসেব করে দেখেছি- ১০০ ডলারের একটি পণ্য থেকে ৩ ডলার লাভ করলে, এই ৩ ডলারের ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণে দিতে হবে। সে হিসেবে ৩ ডলারে মোট ১৫ সেন্ট হিসেবে এই অংকটা হবে বছরে ৩৭০ কোটি টাকা। এই টাকাটা ৩০ লাখ শ্রমিককে দিলে প্রত্যেকের বেতন অন্তত ৫০০ টাকা করে বাড়বে।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বাড়লে লাভ কিন্তু দু’দিক থেকেই। পুরো শিল্প সুস্থিরতা ফিরে পাবে। শ্রমিক আন্দোলন কম হলে কারখানাগুলো নিয়মিত চলবে। এই সেক্টরের মর্যাদাও অনেক বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র আজ আমাদের যে ‘কমপ্লায়েন্ট কন্ডিশন’ দিচ্ছে তার মূল সুরও তো এটাই- মজুরি বাড়াও, এই শিল্পকে স্ট্যান্ডার্ড করো, ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন ওরা বলাবলির আগে আমরা নিজেরাই যদি সমস্যাগুলো ঠিক করে নিতে পারি, তাহলে এই পয়েন্টে ওরা আর আমাদের ধরতে পারবে না।

পাশাপাশি শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিতে হবে। দুনিয়াজুড়ে শ্রমিকদের এ অধিকার স্বীকৃত। আমাদের গার্মেন্টস মালিকদের মধ্যে এ নিয়ে অহেতুক ভীতি আছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে গুণ্ডামি হয় কিন্তু আমাদের দেশেই খুব ভালো ইউনিয়নেরও উদাহরণ আছে। যেমন, ট্যানারি শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন খুব শক্তিশালী। ওখানে তো কোনও সমস্যা হচ্ছে না। বরং নিয়মতান্ত্রিকবাবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আদায় হচ্ছে। গার্মেন্টসে এটা না থাকায় সমস্যা যেটা হচ্ছে তা হল, শ্রমিকরা বিক্ষোভ করছেন কিন্তু তাদের দাবির কথা মালিকপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যথাযথ অথরিটি নেই। মালিকপক্ষও বুঝতে পারছেন না শ্রমিকদের দাবি কী বা কার সঙ্গে কথা বলতে হবে। ট্রেড ইউনিয়ন শক্তিশালী হলে গার্মেন্টস শিল্পে একটা সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসবে।

আমাদের দেশেই একটি গার্মেন্টসে মালিক-শ্রমিক সুস্থ সম্পর্কের একটি চমৎকার উদাহরণ আছে। ওপেক্স নামের একটি গার্মেন্টসে একসময় সুপাভাইজারের কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। মালিক পরে শ্রমিকদের আস্থায় নিয়ে তাদের হাতেই কারখানা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে দিলেন। মালিক শুধু মাস-শেষে এসে বেতন দেন আর মুনাফাটা নিয়ে যান। তার মানে, শ্রমিকদের আস্থায় নিলে কতদূর হতে পারে তার একটা বড় উদাহরণ এটি।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের সম্ভাবনা আসলে কতটুকু? মাঝে মাঝে যে অনেক নেতিবাচক কথা শোনা যায়, তার সত্যতা কী? আমাদের দেশে শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নই বা কতটা সম্ভব?

আমার মনে পড়ে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি পারভেজ আলম চৌধুরীর সঙ্গে একটি গবেষণা নিয়ে আমার প্রচুর মতবিনিময় হয়েছে। তিনি আমাদের শিল্পের উন্নয়নের ব্যাপারে কিছু সাজেশন দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশ একাটি শিল্প-বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। আর সামান্য কিছু কাজ করলেই একে এগিয়ে দেওয়া যাবে। বিশেষ করে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরে রয়েছে অমিত সম্ভাবনা। উন্নত দেশগুলোতে টেক্সটাইল শিল্পকে কেন্দ্র করেই শিল্প-বিপ্লব হয়েছে। শিল্পের বিকাশ সাধারণত এভাবে হয়- প্রথমে সুতা, তারপর গেঞ্জি, পোশাক এবং সবশেষে টেক্সটাইল। আমাদের দেশেও এটাই হচ্ছে।

দরকার দুটো কাজ। প্রথমত, এই শিল্পের শ্রমিকদের ব্যাপক ট্রেনিং দিতে হবে। এখন যেভাবে চলছে সেভাবে চলবে না। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতিও লাগবে। আর এ সব আধুনিক যন্ত্র চালাতে শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে ট্রেনিংটা খুব জরুরি। ৪৬০ উপজেলার প্রতিটিতে যদি ট্রেনিং সেন্টার করে দেওয়া যায়, তবে সেখান থেকেই আধুনিক মেশিন চালানোর উপযোগী দক্ষ শ্রমশক্তি বেরিয়ে আসবে। আর দরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো। ব্যস, এ দুটো হলেই আমাদের দেশে একটি শিল্প-বিপ্লব ঘটিয়ে দেওয়া সম্ভব।

পারভেজ আলম চৌধুরীর এই সম্ভাবনাময় ভবিষতের চিন্তা কোনও অলীক কল্পনা নয়। আসলেই এটা সম্ভব। আমার গবেষণায় সেটা উল্লেখ করেছি আমি।

কেন এ দেশে শিল্প-বিপ্লব সম্ভব নয়? আমাদের একটা বিশাল শ্রমশক্তি রয়েছে। পূর্ব এশিয়ার দেশ দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম কিন্তু শ্রম-ঘন শিল্পপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে উন্নতি করেছে। আমরা আমাদের শ্রমশক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে শ্রম-ঘন শিল্পের বিকাশ ঘটাতে পারি। শ্রম-ঘন শিল্পের বিকাশ হলে কিন্তু পশ্চিমের মতো বেকারত্ব-কেন্দ্রিক পুঁজিবাদের বিকাশ হবে না। ওখানে বিশাল পুঁিজ, শ্রমিক কম। আর আমরা করব কম পুঁজিতে বিশাল শ্রমশক্তি নিয়ে শ্রম-ঘন শিল্পের বিকাশ।

তবে শুধুমাত্র শ্রম-ঘন শিল্পপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমেও উন্নতি সম্ভব নয়। এ জন্য মজুরি-খরচ কম রাখতে হয়। আর মজুরি-খরচ কম রাখতে গেলে দেশের প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম কম রাখতে হয়। এ জন্য আবার দরকার কৃষি-বিপ্লব। তাতে খাদ্যের দাম সাধারণের নাগালের মধ্যে রাখা যায়। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে আগে কৃষিতে একটা বিপ্লব হয়েছে। পাশাপাশি ভূমি-সংস্কার করে কৃষিতে একটা ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটিয়েছে তারা।

বাংলাদেশেও কিন্ত এখন কৃষিতে এই রকম একটা উল্লম্ফন হচ্ছে। কৃষিতে যে বিরাট বিকাশ ঘটেছে তা এখন না মেনে উপায় নেই। এই বিকাশের প্রথম শর্ত, প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে হবে। আমাদের এখানে চাল প্রধান খাদ্যপণ্য। সরকার নানাভাবে এর দাম স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নিয়েছেন। ফলে এর দাম আর বাড়ছে না। কিন্তু এই সাফল্যগুলো পরিপূর্ণ করে শিল্পে বিপ্লব ঘটাতে চাইলে ভূমি-সংস্কার দরকার। এই সংস্কারের মাধ্যমে আমরা বিরাট অনুৎপাদনশীল বা অনুপস্থিত মালিক শ্রেণীকে কৃষি থেকে সরিয়ে সমবায়ের মাধ্যমে মধ্য বা ক্ষুদ্র কৃষকদের হাতে জমিগুলো তুলে দিতে পারি। এটা করলে কৃষি উৎপাদন গুণগত ও পরিমাণগত দু’দিক থেকেই বাড়বে। কারণ আমরা তো শুধু বাইরের বাজার দিয়েই এ দেশে শিল্প-বিপ্লব ঘটাতে পারব না। দরকার দেশের বাজারেরও বিকাশ। এ জন্য কৃষকের জীবনমানের উন্নতি ঘটাতে হবে। তার মানে, কৃষি-বিপ্লব এবং শিল্প-বিপ্লব, দুটোর মেলবন্ধনের মাধ্যমে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।

আমাদের দ্বিতীয় শর্ত হল, শিক্ষা। সাধারণ শিক্ষা নয়, কাজ বা চাকরির জন্য নির্দিষ্ট ট্রেনিং বা শিক্ষা। ব্যস, এগুলোই হল ‘কি টু দ্য মিরাকল।’

আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশটা গত কয়েক বছরে আমাদের দেশকে দু’ভাবে এগিয়ে দিয়েছে। প্রথমত, বস্তুগত উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে এটা সাংস্কৃতিক জগতেও একটা বিপ্লব ঘটিয়েছে। কে আগে ভেবেছিল যে গ্রামের সহজ-সরল মেয়েটি হয়তো বড়জোর কারও বাসায় কাজ নিতে পারত- সে একটা শিল্পের শ্রমিক হয়ে যাবে এভাবে? গ্রাম থেকে দলে দলে মেয়েরা শহরে আসছে। একা থাকতে শিখছে। কাজ করছে। এটা আমাদের সমাজের সাংস্কৃতিক বলয়ে বড় একটা নাড়া দিয়েছে।

সুতরাং আমি আশাবাদী। সামান্য কিছু কাজ করে দেশে একটা শিল্প বিপ্লব ঘটানোর অবস্থা আমাদের আছে। শুধু সুযোগটা নিয়ে নিতে হবে।

এম এম আকাশ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এম এম আকাশঅধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

২০ Responses -- “বাংলাদেশে শিল্পবিপ্লব কেন হবে না?”

  1. Amzad Ali sarkar

    পোশাক শিল্পে আনেক শিশু-কিশোর কাজ করছে যা অমানবিক। এদের শিক্ষিত ও মানুষ হওার অধিকার আছে এটা নিশ্চিত করতে হবে।

    Reply
  2. Manik Mohammad Razzak

    আকাশ ভাই, আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার লেখায় কালো মেঘের ফাঁকেও এক-চিলতে আলোর দেখা পেলাম। তারপরও আশাবাদী হতে পারছি না, মনে সংশয়-দ্বিধা-ভয়। শিল্প-বিপ্লব বলতে যা বোঝায় তা কি এ দেশে বা এ পৃথিবীতে এখন আর নতুন করে সম্ভব? এখন তো আমরা বাস করছি বিশ্বায়নের যুগে। সামান্য টেবিল ফ্যান তৈরির যোগ্যতাও তো এখনও আমরা অর্জন করতে পারিনি্। নেই গ্যাস, নেই পর্যাপ্ত ভূমি, নেই পানি, নেই বিদুৎ, নেই মধ্য-পর্যায়ের যোগ্য ব্যবস্থাপক, নেই সৎ উদ্যোক্তা শ্রেণি, নেই দক্ষ শ্রমিক, নেই অবকাঠামোগত সুবিধা, নেই সামাজিক স্থিতিশীলতা। এত নেই নিয়ে কীভাবে এ দেশে শিল্প-বিপ্লব সম্ভব???

    এ ছাড়া মাথায় উপর চেপে বসে আছে ১৬ কোটি মানুষ। এখন পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আমাদের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। অথচ দক্ষতা বিকাশের ক্ষেত্রগুলো প্রবল অদক্ষতার ঘূর্ণাবর্তে পড়েছে। থানা পর্যায়ের কলেজগুলো থেকে এখন উচ্চতর ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে। তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত বেকারে দেশ সয়লাব অথচ ভালো ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, পাল্পার মিস্ত্রি নেই। কারখানা-পর্যায়ের উৎপাদশীলতার গুণগত মানও প্রশ্নহীন নয়। সবকিছু মিলিয়ে এক অজ্ঞ সমাজের দিকে এগিয়ে চলছে আমাদের সমাজ-অর্থনীতি্। শিল্পক্ষেত্র বলতে শুধু টিকে আছে দর্জিবাড়ি। ওখানে যারা কাজ করছেন, বিদেশি মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করছেন, ওরা এখন আর আন্ডা কেনারও সামর্থ রাখেন না। একসময় ও সেক্টরের পান্ডারা খুব গর্ব করে বলতেন, ওদের শ্রমিকরা নাকি প্রতিদিন একটা করে আন্ডা খেয়ে দেশে মুরগি বিপ্লব ঘটিযেছেন!!!

    যে হারে এ সেক্টরের শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছেন আর যে হারে মুদ্রাস্ফীতি ঘটছে তাতে করে শ্রমিকদের দারিদ্র্য বিমোচন হতে কত শতাব্দী অপেক্ষা করতে হবে তা বলা মুশকিল। এ ছাড়াও উৎপাদন ব্যবস্থা পরিপূর্ণতা অর্জনের আগেই উপরিকাঠামো তথা টারশিয়ারি সেক্টর যে হারে বেড়ে চলছে (এখন জিএনপি’র ৪৯% এ সেকটর থেকে আসছে) তাতে করে অদূর-ভবিষ্যতে দেখ যাবে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে গেছে এ সেক্টর।

    সুসংহত নেতৃত্ব, সব ক্ষেত্রে সমানাধিকার, মানবাধিকার, সামাজিক স্থিতিশীলতা, সম্পদের সুষম বন্টন এবং যৌক্তিক ও কঠোর আইনি কাঠামো ছাড়া কোনও বিপ্লব-ই কি কেউ প্রত্যাশা করতে পারেন?

    Reply
  3. ধ্রুব বর্ণন

    “এই সাফল্যগুলো পরিপূর্ণ করে শিল্পে বিপ্লব ঘটাতে চাইলে ভূমি-সংস্কার দরকার। এই সংস্কারের মাধ্যমে আমরা বিরাট অনুৎপাদনশীল বা অনুপস্থিত মালিক শ্রেণীকে কৃষি থেকে সরিয়ে সমবায়ের মাধ্যমে মধ্য বা ক্ষুদ্র কৃষকদের হাতে জমিগুলো তুলে দিতে পারি।”

    শেষের দিকে এই অনুসিদ্ধান্তগুলো খুব তাড়াহুড়ার হলে। আপনি জোর করে কীভাবে একজনের জমি আরেকজনকে দিবেন? এটা কী ধরনের অর্থনৈতিক চিন্তা? কৃষিতে যে জমির মালিক জড়িত, সে কীভাবে আবার অনুৎপাদনশীল হয়? তাহলে সে অর্থে তো ওপেক্স গার্মেন্টসের মালিকও নিজে এক অর্থে অনুৎপাদনশীল। সেখানে আপনার সম্পদ-বণ্টনের যুক্তি কেন খাটবে না? এখানে প্রেক্ষাপটটার আরেও ব্যাখ্যা দরকার ছিলে।

    কৃষক আর শ্রমিক তো মেশিন না যে জমি আর ট্রেনিং দিলেই উৎপাদন বাড়াতে থাকবে। উৎপাদনের সঙ্গে মালিক ও শ্রমিক উভয়ের ইনসেনটিভ, মোটিভেশন আর সেটার উপযোগী কন্ডিশন গুরুত্বপূর্ণ। আপনি ইনসেনটিভকে পাত্তা না দিয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থা ভেঙে একটা কাঠামোতে আনতে চাইলে সিস্টেমটা প্ল্যানমাফিক কাজ করবে সেটা স্বপ্নকল্পনা। মোটিভেটিং ফ্যাক্টরগুলোকে আমলে না এনে এ ধরনের টপ ডাউন উন্নয়ন পরিকল্পনা করাটা এই লেখার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

    Reply
  4. reza

    আকাশদা, আপনি একজন ভালো অর্থনীতিবিদ। ড্যান মজিনারা দেশ নিয়ে ভাবেন কিন্ত আপনারা দেশ নিয়ে কতটুকু ভাবেন? আমাদের দেশের গার্মেন্টস্ শিল্পের অস্থিরতা, শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা, এ শিল্পে ভারতের আগ্রাসনে কী পরিমাণ তারা দখল করে নিয়েছে, সুতা শিল্পে ভারতের রাজত্ব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এ দেশের সম্ভাবনা বিনষ্ট করে দিচ্ছে। সাপ্তাহিক ২০০০ এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, গার্মেন্টস্ শিল্পের ৮০% এখন ভারতের দখলে। ভারত বিভিন্ন দিক দিয়ে আমাদের গ্রাস করে রেখেছে। যেমন: ফারাক্কার পানির ন্যায্য হিস্যা, টিপাইমুখ বাঁধ, তিস্তা সমস্যা, ট্রানজিটের নামে করিডোর নিয়ে সঠিক মাসুল না দেওয়া, সীমান্তে তাদের বাঙালি হত্যা, তালপট্টি দ্বীপ দখল, গোয়েন্দা সংস্থা “র” এর অপতৎপরতা, তাদের দ্বারা আমাদের দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।

    অন্যদিকে আমাদের দেশের বর্তমান শাসকশ্রেণীর মতো এভাবে ধারাবাহিকতা থাকলে এ দেশ কঙ্গো, সিয়েরা লিওন হতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। আর শিল্প-বিপ্লব? এ কথা ভাবার আগে দেশের বিডিআর ট্রাজেডি, শেয়ারমার্কেট, যোগাযোগ ব্যবস্থায় অরাজকতা, ডাকবিভাগের দুর্নীতি, অর্থমন্ত্রীর বাচালতা, দীপু আপার ফটোসেসনের তেলেসমাতি, সাহারা বানুর দক্ষতা, সুরঞ্জিত দাদার কালোবেড়াল, হলমার্ক গ্রুপ – এ রকম হাজারও ঘটনা যা মন্তব্যের কলামে প্রকাশ সম্ভব নয় যা দেশে বিদ্যমান তা প্রতিরোধ করা নিয়ে ভাবতে হবে। আগে আসুন, আমরা দেশের অভ্যন্তরীন দুর্নীতি প্রতিরোধ করি, তারপর শিল্প-বিপ্লব করি।

    Reply
  5. Hira

    অসম্ভব তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। খুব ভালো লাগল লেখাটি পড়ে। আমরা পুঁজিবাদীদের ছায়া থেকে যত দূরে খাকতে পারব ততই মঙ্গল।

    Reply
  6. আলী হায়দার

    অসাধারণ লেখা। লেখকের কাছে প্রশ্ন রাখছি- আচ্ছা, সমবায়ের মাধ্যমে গার্মেন্টস শিল্প স্থাপন করলে কেমন হয়? যেখানে শ্রমিকরাই হবেন গার্মেন্টসের মালিক? মুনাফার একটা অংশ তারা পাবেন আর বাকি অংশ সঞ্চিত হবে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী বিকাশের জন্য।

    এই শিল্পে যেহেতু শ্রমিকের মালিকানা আছে সে জন্য তিনি পরম নিষ্ঠার সঙ্গে শ্রম দিবেন। পণ্যের গুণগত মানও খুব ভালো হবে। কারণ নিজের কারখানায় কেউ ফাঁকি দিবেন না। আর শ্রমিক-অসন্তোষ তো তাদের নিজেদের তাগিদেই সমাধান করবেন যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয়।

    Reply
  7. mehedi

    গার্মেন্টসের সেই গ্রাম্য মেয়েটি এখন ঢাকায় ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে ৮/১০ টি পুরোনো মেশিন নিয়ে একটি মিনি গার্মেন্টস খুলেছে। কয়েকজন মিলে আবার একটি সেলাইয়ের দোকান দিয়েছে। এ সব জায়গা থেকে অত্যন্ত উন্নতমানের পোশাক দেশের খুচরা বাজারগুলোর চাহিদা মিটাচ্ছে। আবার বড় কারখানার সাব কন্ট্রাক্টের কাজও তারা করছে। তারা এখন আর শুধু লেবার নয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাও।

    তবে গার্মেন্টসের প্রধান সমস্যা হিসেবে কম মজুরিকে চিহ্নিত করাটা অবশ্যই সঠিক। স্বল্প মজুরিই এ দেশে গার্মেন্টস কারখানার অস্থিরতার মূল কারণ। এটা স্বাভাবিক চিন্তার বিষয় যে, যেখান থেকে লাভজনক বা সন্তোষজনক জীবিকা আসে সেটিকে টিকিয়ে রাখাই আমাদের সবার স্বভাবসুলভ আচরণ। কিন্তু উদয়াস্ত পরিশ্রম করার পরও যদি উপার্জন দ্বারা ন‌্যুনতম চাহিদা না মেটে – তখনই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, সৃষ্টি হয় সংঘাত। গার্মেন্টস মালিকরা এটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন ততই তাদের জন্য ভালো হবে। না হলে একটিমাত্র সংঘাত তাদের জন্য এমন ক্ষতির কারণ হবে, যা লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে নেয়ার মতো অবস্থায় তাদের ফেলবে।

    ট্রেড ইউনিয়ন করার ব্যাপারে মালিকপক্ষ যদি স্ব-উদ্যোগে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসেন সেটা তাদের জন্য উপকার বৈ ক্ষতির কারণ হবে না। এ ক্ষেত্রে মানসিকতা কিছুটা পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন মানে যে মাস্তানবাজি নয়, সেটা মালিক ও শ্রমিক সংগঠন উভয়কেই বুঝতে হবে।

    Reply
  8. hasan sardar

    লেখকের মতো আমিও আশাবাদী। তবে একটা বিষয়ে আপনার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। লেখকের মতে, ‘ভূমি-সংস্কার দরকার। এই সংস্কারের মাধ্যমে আমরা বিরাট অনুৎপাদনশীল বা অনুপস্থিত মালিক শ্রেণীকে কৃষি থেকে সরিয়ে সমবায়ের মাধ্যমে মধ্য বা ক্ষুদ্র কৃষকদের হাতে জমিগুলো তুলে দিতে পারি। এটা করলে কৃষি উৎপাদন গুণগত ও পরিমাণগত দু’দিক থেকেই বাড়বে।’

    আমার মতে, প্রথমে কৃষকদের জীবনমানের উন্নতি সাথন করা দরকার। এ জন্য দরকার উৎপাদিত কৃষিপণ্যের নায্যমূল্য নিশ্চিত করা। জমি থেকে কৃষক যদি আয় করতে না পারে তাহলে কৃষকরা কৃষি থেকে মৃখ ফিরিয়ে নেবেন। অনেক কৃষক ইতিমধ্যে কৃষিকাজ থেকে মৃখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করছেন। একজন কৃষক হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে জমিতে ফসল ফলান আর জমির পোকা-খাওয়া ফসল নিজে খান – এর চেয়ে দুঃখের কিছু হতে পারে না!!!

    Reply
  9. দীপেন ভট্টাচার্য

    আকাশ ভাই, ইন্টারেস্টিং লেখা। বুঝলাম আপনি বলতে চাইছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের শ্রমিক-স্বার্থ নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র স্বীয় স্বার্থ ছাড়া কথা বলে না এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বিশাল বাজার থাকা সত্ত্বেও এর পেছনে জিও-পলিটিকাল কারণ রয়েছে সেহেতু শ্রমিক অধিকার নিয়ে মজিনার কথা না বলাই ভালো – যদিও দিনের শেষে আমরা সবাই শ্রমিক অধিকার নিয়ে একমত।

    তবে আমি আপনার এই মন্তব্যটার ওপর একটু বলতে চাই –
    “খোদ যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের জন্য ওদের অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ছেলেদের বেশি পাঠানো হয়। ওরাই যুদ্ধক্ষেত্রে ঝুঁকি নেয়, মারা যায়। কোনও মার্কিন তরুণের কফিন এলে তো সরকারের ভোট নষ্ট হবে।”

    অভিবাসী কথাটা এ ক্ষেত্রে খাটে না। মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য হয় নাগরিক হতে হবে, নয় গ্রীন কার্ড থাকতে হবে। কাজেই কার্যত যারা যুদ্ধ করতে যায় তারা হয় নাগরিক, নয় নাগরিকত্বের পথে। এখন দেখা যাক এই সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ কেমন। তুলনাটা করতে হবে জনসাধারণে তরুণ গোষ্ঠীর সঙ্গে। ২০০২ সালের হিসেবে মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১৮ থেকে ২৪ বছরের শ্বেতকায় সংখ্যা হচ্ছে ৬৫%, কালো ১৪%, লাতিনো বা হিস্পানিক ১৬%, অন্যান্য ৫%, কিন্তু সেনাবাহিনীতে শ্বেতকায় সংখ্যা হচ্ছে ৬৯%, কালো ১৬%, লাতিনো ১১% ও অন্যান্য ৬%।

    সেনাবাহিনীর মূল অংশ শ্বেতকায় ও কালোরা কখনই “অভিবাসী” নয়, এমনকি লাতিনোরাও নয়। এই সেনাবাহিনীতে দক্ষিণ এশিয় নাগরিকদের অংশগ্রহণ প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।

    ইরাক যুদ্ধে ২০০৬ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যায় শ্বেতকায় ২০১৫, কালো ২৫১, ও অন্যান্য ১৩১, এর মধ্যে সাদা কালো মিলিয়ে লাতিনো হচ্ছে ২৭১। এরা সবাই মার্কিন তরুণ। দেখাই যাচ্ছে সাদা তরুণেরা এর মূল ভারটা বইছে। যেটা বলা যেতে পারে যে অর্থনৈতিকভাবে দীন এমন অনেক পরিবার থেকে অনেকে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয় – সেটা সাদা, কালো সবার জন্য প্রযোজ্য। সেখানে ভোটের ব্যাপারটা আসতে পারে।

    অনেক শ্বেতকায় পরিবার বংশ থেকে বংশান্তরে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে এবং ঐতিহাসিকভাবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ রিপাবলিকান থেকেছে। বরং ইদানীংকালে এই অবস্থার একটু পরিবর্তন হচ্ছে। অর্থাৎ অনেক সাদা সেনা পরিবার ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকছে।

    আপনার সঙ্গে দেখা হল না, এই বোর্ডেই লিখলাম। ভালো থাকবেন।

    Reply
  10. শাহ আবদালী

    সরকার সব সুবিধা দিচ্ছে ভারতকে। আপনি কীভাবে কী আশা করেন? দয়া করে এমন কিছু লিখেন যেখানে বাস্তব সমস্যার কথা আছে এবং বাস্তব সমাধানের কথাও আছে।

    Reply
  11. নিঝুম মজুমদার

    একটা ঝরঝরে চমৎকার আশাবাদী লেখা পড়লাম।

    লেখার বিপরীতে কিছু হতাশা ও নেতিবাচক দিকের কথাও মাথায় আসছে। নেগেটিভ কথাগুলো হাইপোথেটিকাল। ইউরোপ ও আমেরিকার প্রোডাক্টগুলো এখন আসলে গ্লোবাল প্রোডাক্ট। একটি পণ্যকে যদি বিভিন্ন অংশে ভাগ করে ফেলি – দেখা যাবে এর চারটি ভাগ চার মহাদেশের পণ্যে ঠাসা। ওয়াল্ট ডিজনির পণ্য একটা উদাহরণ হতে পারে। এর পেছনে গ্লোবালাইজেশনের ধারণাটুকু আসলে হয়ে যাবার পর আরোপিত, মূল কারণটা যে অর্থনৈতিক সাশ্রয় তা লেখক বলেই দিয়েছেন। এখানে লেখক বলেছেন যে – আমেরিকা বর্জন করলেও অন্যান্য দেশ আছে, ইউরোপের বাজার আছে কিন্তু আমেরিকা যে সব কারণে কাউকে ত্যাগ করে, বুঝতে হবে সে সব কারণ বাকি সম্ভাবনাময় দেশের ক্ষেত্রেও তারা তাদের প্রভাব খাটিয়ে চালান করে দেয়।

    তাই আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাঘাত ঘটাবে এমনটা কেউই চাইবে না। কিউবা একটা উদাহরণ হতে পারে এ ক্ষেত্রে। তবে যে উন্নয়নশীল দেশগুলো মূলত কম মজুরিতে এ সব পণ্য উৎপাদন করছে, তাদের নিজেদের ভেতরেই প্রচন্ড ব্যাবসায়িক যুদ্ধ চলে। এক দেশের প্রতি আমেরিকা রেস্ট্রিকশন আরোপ করলে অন্য দেশ তা লুফে নিবে, ভবিষ্যতে নিজেদেরও এমন হতে পারে, এ সব চিন্তা না করে। এর মূল কারণ এই অঞ্চলে ব্যাবসায়ীদের ঐক্যটাও খুব কম।

    সুতরাং আমেরিকা পণ্য নেয়া বন্ধ করলে, সেই একই রিজন অন্যান্য দেশও দেখাতে শুরু করবে বলেই আমার ধারণা। ওয়াল্ট ডিজনির অধিকাংশ পণ্য বাংলাদেশের শাহ মাখদুম গার্মেন্টস থেকে যেত। হঠাৎ করে তারা চাইল্ড-লেবার ইস্যু দেখিয়ে পণ্য নেয়া বন্ধ করে দিল। অথচ এরা কি এই চাইল্ড-লেবারের কথা আগে জানত না? আগে কি এই পণ্য বানাত সব পূর্ণবয়স্করা?

    আসলে এখানেও বিভিন্ন রাজনীতি জড়িত। ব্যাক্তি রেষারেষি, স্বার্থ জড়িত….

    তবে এটা ঠিক, শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি দেয়াটা মালিকদের পক্ষ থেকে খুব স্ট্রং একটা স্টেপ হতে পারে। শ্রমিক যেন “এলিয়েনেশন” ধারনাতে পড়ে না যায়। উৎপাদনের সাথে, মুনাফার সাথে তার সর্বসম্পৃকতা থাকলেই আসলে যে কোনো কিছু অতি সহজে মোকাবেলা করা যায়। ওপেক্স এই ক্ষেত্রে একটা ভালো উদাহরণ।

    চমৎকার আশাবাদী একটা লেখার জন্য আকাশ স্যারকে আবারো ধন্যবাদ।

    Reply
  12. Azad Humayoun

    আপনার লেখাটিতে আগামী সুন্দর বাংলাদেশের একটি স্বপ্নময় চিত্র ফুটে উঠেছে। ভালো লাগল। আমরা আসলে পারব। শুধু প্রয়োজন একটৃ সহনশীলতা। পারভেজ আলম চৌধুরীর মতো ব্যবসায়ীদের আরেকটু এগিয়ে আসা যাতে শ্রমিকদের সঙ্গে মুনাফার একটা অংশ শেয়ার করা যায়। ট্রেড ইউনিয়নের বিষয়টা আসলে মালিকদের মনে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। সে ক্ষেত্রে সুস্থ ট্রেড ইউনিয়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য নিরলস কাজ করা। শ্রমিক এবং মালিক উভয়ের দিক থেকেই। সরকার যদি সাশ্রয়ী মুল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে – তাহলে আর কিছু দরকার নেই। বাংলাদেশের মানুষ খুবই সৃজনশীল। তাদের পক্ষে খুবই সম্ভব শিল্প-বিপ্লব ঘটানো। এ রকম একটি স্বপ্ন-জাগানিয়া লেখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

    Reply
  13. আরাফাত

    প্রথমে আপনার টাইটেলটা দেখে নেগেটিভ ভেবেছিলাম। এখন দেখলাম আশাবাদে পূর্ণ লেখাটা। অনেক ভালো লাগল।

    Reply
  14. jamal

    আকাশদা, সুন্দর লিখেছেন। কিন্তু মালিকরা যে মৌজ মেরে আসছেন এতদিন ধরে – তা কি তারা এত সহজে ছেড়ে দিবেন? তাদের বোধোদয় হোক, এ কামনাই করি।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—