বিশ্বে শুধু যে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তা না। বঙ্গবন্ধুর আগে-পরে অনেক রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান আততায়ীর হাতে অকালে প্রাণ দিয়েছন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যারা প্রাণ দিয়েছেন তারা সৎ নিষ্ঠাবান ও জনপ্রিয় ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের দুজন খুব জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। একজন ছিলেন রিপাবলিকান দলের ষোড়শ রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকন। আর দ্বিতীয় জন হলেন ডেমোক্র্যাট দলের রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি। প্রথম জনের হত্যাকারীকে সনাক্ত করা গেছে এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে জন এফ কেনেডির হত্যাকারীকে সনাক্ত করা যায়নি। সনাক্ত করা যায়নি বললে ভুল হবে বা সত্যের অপলাপ হবে। সত্যটা হলো তার হত্যাকারীকে সনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়নি বরং মূল পরিকল্পনাকারীদের এবং হত্যাকারীকে কৌশলে দূরে রাখা হয়েছে।

এ ব্যাপারে আজ বিস্তারিত লিখব না কেননা এটি নিয়ে আজকের লেখা নয়। কেনেডি হত্যার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্র পুরোপুরি জড়িত ছিল। যেমন বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রযন্ত্র সক্রিয় ছিল। আর জড়িত ছিল আন্তর্জাতিক শক্তি। আমেরিকা, পাকিস্তান ও চীনকে সন্দেহ করা হয়।

তবে প্রথম দুইটা দেশের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবেই পাওয়া গেছে। অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার আমরা আংশিক একটা বিচার করতে পেরেছি। মূল পরিকল্পনাকারী ও বেসামরিক যারা জড়িত ছিল তারা এই বিচার ব্যবস্থা থেকে পার পেয়েছে। এখানেও রাষ্ট্রের একটা অংশ সক্রিয় ছিল এবং তারা সফল হয়েছে। একজন সাবেক সেনাপ্রধান এবং পরবর্তীতে রাজনীতিবিদ তাকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের এক সদস্য বঙ্গবন্ধু- হত্যা নিয়ে দোষারোপ করেছেন করেছেন। পরবর্তীতে উভয়ে উভয়ের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেছন। এখান থেকেই পরিষ্কার যে সামরিক বাহিনীর কর্তারা এর সাথে জড়িত ছিল এবং রাজনীতিবিদরাও। কিন্তু চক্রান্তকারী রাজনীতিবিদদের ও সামরিক বাহিনীর কর্তাদের বিচারের আওতায় আনা যায়নি এটা সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা।

এরপরও সরকারকে সাধুবাদ দিতে হয় এজন্য যে তারা আংশিক বিচার অন্তত করতে পেরেছে। অনেক দেশ রাজনৈতিক হত্যার ক্ষেত্রে আংশিক বিচারও করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের কথা আগেই বলেছি, এই দলে আছে সুইডেন। ১৯৮৬ সালে সুইডেনের একজন জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ওলোফ পালমেকে আততায়ী গুলি করে হত্যা করেছিল। তিনি কোনও রকম নিরাপত্তাকর্মী ছাড়াই সস্ত্রীক সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। একজন প্রধানমন্ত্রী কতটা সৎ, সাহসী ও জনগণকে বন্ধু ভাবলে এমন অরক্ষিত অবস্থায় সিনেমা দেখতে যেতে পারেন! একই জাতীয় কাজ বঙ্গবন্ধুও করেছেন। ধানমণ্ডির অরক্ষিত বাসভবনে রাষ্ট্রপতি পরিবারবর্গসহ অবস্থান করেছেন, সকল পরামর্শ উপেক্ষা করে। যতদূর জানি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছাও ধানমণ্ডির বাসভবন ছেড়ে বঙ্গভবনে যেতে রাজি হননি। তার যুক্তি ছিল- বঙ্গভবনের জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে তাদের সন্তানেরা বিলাসী হয়ে উঠতে পারে। আমি বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় যদি বঙ্গবন্ধু বঙ্গভবনে থাকতেন তাহলে হয়তো তার হত্যাকাণ্ড রোধ করা যেত। আর আমরা অকালে অভিভাবকহীন হতাম না, এগিয়ে যেত দেশ অনেক অনেক গুণ।

সুইডেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত পালমে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড থেকে শিক্ষা নেননি। তিনি অরক্ষিত থেকেছেন এবং অকালে জীবন দিয়েছেন। ৩৩ বছর পার হয়ে গেল তার হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে পারেনি সুইডেন। ১৪/১৫ বছর আগে পত্রিকায় পড়েছিলাম সুইডেনের তৎকালীন পুলিশ প্রধান বলেছেন তারা আশাবাদী খুনিকে খুঁজে বের করবেন। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে তেমন কিছুই দৃশ্যমান না। বঙ্গবন্ধুর পরেও বেশ কয়েকজন সরকার প্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ বেশ কিছু রাজনীতিবিদ হত্যার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন- আনোয়ার সাদাত, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধীসহ অনেকেই।

বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাকি যারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তারা কেউই সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটা রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশটার গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল নীতি আদর্শকে গুড়িয়ে দেওয়া। অন্যান্য রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মতো দ্বিপক্ষীয় কোনও শত্রুতা বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য এ হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ও পরাজিত শক্তি তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সমন্বয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। তার পরিবারবর্গ ও আত্মীয়-স্বজনকেও খুনিরা বাদ রাখেনি। পরবর্তীতে তারা বঙ্গবন্ধুর চার সহযোগীকেও হত্যা করেছে জেলের মধ্যে। বাংলাদেশের প্রগতিশীল চরিত্রকে রুখে দেবার জন্য এটা ছিল সুপরিকল্পিত। এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি লাভবান হয়েছে এদেশের খুনি চক্র ও পরাজিত শক্তি আর আন্তর্জাতিক কিছু শক্তি। যেমন- চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও আরব বিশ্বের দেশসমূহ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে তাদের একতরফা বাজার বানিয়েছে, যা এখনো বিদ্যমান। আর মধ্যপ্রাচ্য তাদের সংস্কৃতি রপ্তানি করেছে, আর নিম্নমানের জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে। যা পাকিস্তান আমলে তারা পারেনি। অতএব সন্দেহাতীতভাবে বলা যেতে পারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড দ্বিপক্ষীয় কোনও বিষয় ছিল না।

সুইডেনের মত একটা দেশ ওলোফ পালমের হত্যাকারীকে খুঁজে না পাওয়া ও তার বিচার না করতে পারা সে দেশের জন্য লজ্জার। নাকি ব্যাপারটা এরকম সরকার এই খুনের বিচারে অনাগ্রহী ছিল, কোন অদৃশ্য কারণে। যেমন অনেকেই মনে করেন প্রিন্সেস ডায়ানাও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ড বা দুর্ঘটনার তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করেছে ব্রিটেনের রাজ পরিবার। ডায়ানার বন্ধু দোদি আল ফায়েদের বাবা সে অভিযোগ করেছেন অনেকবার। তাছাড়াও অনেক পত্রিকা বিভিন্ন সময়ে রাজ পরিবারের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করেছে। এটা সত্যি প্রিন্সেস ডায়ানার গণতান্ত্রিক আচরণ রাজপরিবারের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “ব্রিটেনের নয়, জনগণের হৃদয়ের রানী হয়ে থাকতে চাই।” এ কথায় তো রাজতন্ত্রের ভিতকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ওলোফ পালমে কি এমন কোন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যে সুইডিশ রাজতন্ত্র তার উপর বিরক্ত হয়েছিল, যার কারণে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া হল? যার ফলে এই বিচারকে স্থবির করে দেওয়া হয়েছে? তা না হলে সুইডেনের মত আধুনিক একটা দ্বীপ দেশ থেকে হত্যাকারী তাদের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। আর ৩৩ বছরেও সে দেশের পুলিশ খুনিকে ধরতে পারল না! রাষ্ট্রযন্ত্র যদি কোন খুনের সাথে জড়িত থাকে সে হত্যার বিচার হয় না।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছনে সুস্পষ্টভাবেই বলা যায় রাষ্ট্রযন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত ছিল। যার কারণে রাষ্ট্র সংবিধানে মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী এবং অবৈধ এক আইন পাস করেছিল। যে আইন ক্ষতিপূরণ অধ্যাদেশ হিসাবে পরিচিত ছিল। যদিও সংবিধানের মৌলিক আইনের পরিপন্থী এই আইনের কোনও ভিত্তি ছিল না। কিন্তু তারপরও ২১ বছর ধরে এই আইনের কারণে বিচার করা যায়নি। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রই সেখানে নির্বাক ছিল। আর সেই সময়ে বাংলাদেশের যেসব ব্যক্তি নিজেদের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী বলে দাবি করেন, তারাও কোনও ব্যাখ্যা দেননি। কারণ তারাও কোন না কোনভাবে তৎকালীন শাসকদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন বা পেয়েছেন।

১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আংশিক বিচার করেছে, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক শক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। এই বিচার শুরু করতে পারাটাই কঠিন ছিল। রায় দেওয়ার সময় বিচারক দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন একটা কমিশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীদের খুঁজে বের করতে। আর বেসামরিক চক্রান্তকারীরা দুর্বল তদন্তের কারণে যে পার পেয়েছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। একটা পূর্ণাঙ্গ বিচার না পাওয়ার অতৃপ্তি আমাদের আছে। কিন্তু এরপরেও সরকারকে ধন্যবাদ একটা বিচার করতে পারার জন্য। এরপরের প্রশ্ন হলো দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির শাস্তি কার্যকর করা যায়নি, আসামিরা পলাতক থাকার কারণে।

এই পলাতক আসামিদের নিয়ে একটা রাজনীতি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। সব দেশের সাথে আমাদের বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকায় আমরা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফিরিয়ে আনতে পারছি না। আর যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ সেসব দেশ তাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য আসামিদের হস্তান্তর করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড বৈধ হলেও তারা খুনিকে হস্তান্তর করেনি। বরং এক খুনিকে তারা রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে সেখানে বসবাস এর বৈধতা দিয়েছে। খুনিদের মধ্যে আরও কয়েকজন অন্যান্য দেশে পালিয়ে আছে। কেউ কেউ বলেন তারা নাকি অবস্থান পরিবর্তন করেই চলেছে। একসময় খুনিদের স্বর্গরাজ্য ছিল লিবিয়া, তাদের সে স্বর্গরাজ্যে রাজার পতন হয়েছে। অনেকে মনে করেন কোন কোন খুনি হয়তো পাকিস্তানে আছে। সেটা অস্বাভাবিক কিছু না। একজন যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানে পালিয়ে গেছে। এছাড়াও অনেক জঙ্গি নেতা পাকিস্তানি পালিয়ে আছে। সেক্ষেত্রে পাকিস্তানে তারা আশ্রয় পাবে সেটাই স্বাভাবিক, যে সরকারই সেখানে ক্ষমতায় থাকুক না কেন। যদি পাকিস্তানে কোনও খুনি থেকে থাকে তাকে আমরা ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারবো সেটা আমার মনে হয় না। ভারতের মতো একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রই পাকিস্তান থেকে দাউদ ইব্রাহিমকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারছে না। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পারবে সেটা আমি মনে করি না।

সবচেয়ে বড় কথা আমাদের সরকারের কাছে সঠিক কোনও তথ্য নেই খুনিরা কে কোথায়! আগে আমরা শুনেছি দুই খুনি ভারতে পালিয়ে আছে কিন্তু পরে তার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। বর্তমান সময়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের যে সম্পর্ক তাতে ভারত দ্রুতই খুনিদের হস্তান্তর করতো। সাত খুনের হত্যার পরিকল্পনাকারীকে সহ বেশ কয়েকজন দুষ্কৃতিকারীকে তারা হস্তান্তর করেছে। আর জাতির জনকের খুনিকে ভারত অন্তত কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেবে না। কারণ এটা বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটা স্পর্শকাতর বিষয়। আমাদের সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী অতীতে আশ্বাস দিয়েছেন এবং এখনও আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন খুনিদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। কিন্তু এটা আমার কাছে খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না বিগত দিনের বাস্তবতার আলোকে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তিত হয়ে এখন রিপাবলিকানরা ক্ষমতায়, তারা খুনিকে হস্তান্তর না করে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে। এর আগে ডেমোক্রেটরা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন একজন খুনিকে হস্তান্তর করেছিল এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরও হয়েছে। এক্ষেত্রে বলতে বাধ্য হচ্ছি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা ব্যর্থ হয়েছেন কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে খুনিকে ফিরিয়ে আনতে। যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু কিছু সন্ত্রাসীকে তাদের হাতে তুলে দিতে বাংলাদেশকে বাধ্য করেছে, তাদের প্রভাব খাটিয়ে। বাংলাদেশ যেসব সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের এফবিআই এর হাতে তুলে দিয়েছে সে ব্যাপারে কারণ দর্শাতে বলেছিল উচ্চ আদালত।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীকে ফিরিয়ে না নিয়ে আসতে পারা আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা। আর কানাডার ক্ষেত্রে সরকারের কিছু করার নেই। কিন্তু সরকার তাদের কাছে একটা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে যে, তোমাদের দেশে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ সেটা মেনে নিলাম। কিন্তু একটা খুনের আসামিকে তোমরা জামাই আদরে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে দিতে পারনা। তাকে মৃত্যুদণ্ডের পর তোমাদের দেশে যে সর্বোচ্চ শাস্তি আছে সেটা দিয়ে জেলে রাখ। আমি জানি না সরকার এ জাতীয় কোনও প্রস্তাব তাদের কাছে রেখেছে কিনা। তবে আমি আমার জার্মান উকিল থমাস ডিটসকে একসময় এই ব্যাপার নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “তোমাদের সরকার এই মামলার সমস্ত কাগজপত্র পাঠিয়ে তাদেরকে এই অনুরোধ রাখতে পারে। এমনকি যদি জার্মানিতেও কোন খুনি থেকে থাকে তাহলে জার্মান সরকারকেও তারা সে অনুরোধ জানাতে পারে। একজন খুনির স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারার কোন অধিকার নেই।”

কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন অভিযোগ করেছিলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুষ্কৃতিকারীরা লন্ডনে জড়ো হয়েছে।” কথাটা ঠিক, এ সমস্যা তাদের আইনের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। তারা নিজেরাই খুনি সন্ত্রাসী ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য লন্ডনকে খুনিদের অভয়ারণ্য তৈরি করে রেখেছে। আমাদের দেশের বেশ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীসহ দুষ্কৃতিকারীরা সে দেশে আশ্রয় পেয়েছে। অতি মানবতাবাদী কিছু দেশের আইন সন্ত্রাসীদেরকে সন্ত্রাসে উৎসাহিত করছে। সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতিকারীরা এই আইনের সুযোগ নিয়ে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করছে।

আংশিক বিচারের জন্য সাধুবাদ দেওয়া স্বত্ত্বেও খুশি হব সরকারের মন্ত্রীরা যদি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে রাজনৈতিক বক্তব্য বা মিথ্যা আশ্বাস আমাদের না দেন। তারা বলে দিলেই পারেন সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল, সেটা করেছে। কিন্তু বিভিন্ন দেশের আইনের কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব না।

আর কিছু সংগঠন আছে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে জন্য নিমিত্তে মাঝে মাঝে কানাডিয়ান দূতাবাসে স্মারকলিপি দিতে যান দুই-চার জন লোক নিয়ে। এসব স্মারকলিপি কানাডার সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না। খুনি দণ্ড মাথায় নিয়ে ঘৃণ্য হয়ে এদেশে সেদেশ ঘুরছে এটাও এক রকম শাস্তি।

আর একজন খুনির কথা বলা হয়েছে সে জিম্বাবুয়েতে মারা গেছে। ঢালাওভাবে এটা বিশ্বাস না করে এগুলো খতিয়ে দেখা উচিত যে, সে পরিচয় গোপন করে পালিয়ে আছে কিনা অন্য কোথাও। এমনও হতে পারে সে কসমেটিক সার্জারি করে চেহারা বদল করে ফেলেছে। সরকারের উচিত তার কঙ্কালের ডিএনএ রিপোর্ট চাওয়া জিম্বাবুয়ে সরকারের কাছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিভিন্ন সামরিক শাসকেরা তার মৃত্যুদিন পালন করাই আমাদের জন্য কঠিন করে তুলেছিল, জাতীয় শোক দিবস তো দূরে থাক। তারপর ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সাথে সাথে আমরা জাতীয় শোক দিবস হিসেবে এখন দিনটাকে পালন করি। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে আবার বাধার সৃষ্টি হয়।

বিএনপি ক্ষমতায় আসলে দিনটাকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করতে দেয় না। তখন আমাদের সাংবাদিকদের লেখার ধরন এবং চেহারা পাল্টে যায়। এখন দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার কারণে একটা জিনিস লক্ষ করছি অগাস্ট মাস আসলেই বলা হয় শোকের মাস। আগে কিন্তু এই জাতীয় কথাবার্তা সাংবাদিকরা লিখতেন না। এটা আমার কাছে অতিরিক্তই মনে হয়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ৪৪ বছর পরে পুরো অগাস্ট মাসকে শোকের মাস হিসাবে দেখার কি যৌক্তিকতা আছে আমি জানিনা। আমার কাছে মনে হয় বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু দিনটাকে সম্মানের সাথে, ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে, সার্বজনীনভাবে পালন করতে পারাটাই জরুরি। এই জাতীয় শোক দিবসে দলমত নির্বিশেষে একত্রে যাতে পালন করতে পারি সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। একটা মাসকে শোকের মাস হিসাবে পালনের চেয়ে জরুরি বঙ্গবন্ধুর উপর গবেষণা করে যে সকল কাহিনী এখনও যা অজানা আছে তা উন্মোচিত করা, বঙ্গবন্ধু যে লক্ষে কাজ করেছেন সেই তা অর্জনে তার নীতি আদর্শের বাস্তবায়ন করা। তাহলেই তার আত্মা শান্তি পাবে আর বাংলাদেশ তার লক্ষ অর্জন করবে দ্রুত।

Responses -- “বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীকে ফেরত না পাওয়া কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয় কি?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—