কাশ্মীর এখন জ্বলন্ত টপিক। হঠাৎ করে মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা এই অঞলে কি হচ্ছে আসলে? ভারতীয় সংবিধানের যে অনুচ্ছেদের ফলে জম্মু ও কাশ্মীর বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা পেয়ে আসছিল, তা বাতিল করে কেন্দ্রের শাসনের আওতায় আনতে পার্লামেন্টে বিল তুলেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার।নিরাপত্তার কড়াকড়ি আর ধরপাকড়ে বিরোধপূর্ণ ওই উপত্যকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেই বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সোমবার পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশে সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ করার কথা জানান।

পাশাপাশি ‘জম্মু ও কাশ্মীর সংরক্ষণ বিল’ নামে আরও একটি প্রস্তাব তিনি পার্লামেন্টে তোলেন, যা পাস হলে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে লাদাখকে আলাদা করে ফেলা হবে। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ হবে আলাদা দুটো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, আপাতত দুই জায়গায় দুজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর কেন্দ্র সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন। জম্মু ও কাশ্মীরে আইনসভা থাকবে, তবে লাদাখে তা থাকবে না।

কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ এবং তাবৎ বাক-বিতন্ডা চলে আসছে আমাদের ছেলেবেলা থেকে। আমরা যখন পূর্ব পাকিস্তানে ছিলাম তখন সে বালক বেলায় কাশ্মীর যুদ্ধের কারণে খোঁড়া বাংকারে মাটির গর্তে লুকিয়ে থেকেছি অনেকবার। সেই পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হলো কত পানি গড়ালো ইতিহাস কতভাবে বদলালো কিন্তু কাশ্মীর সমস্যার সমধান মিললো না। ভারতের নির্বাচনের ঠিক আগে আমরা একটি যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব দেখেছিলাম। যদিও নিন্দুকেরা বলে তা নাকি পাতানো খেলা। আর তার কারণ ছিল পিছিয়ে পড়া ইমেজ ফিরিয়ে এনে মোদীর ভোটযুদ্ধে জয়লাভ করা। মোদী শেষতক জিতেছেন। জেতার পর তিনি যে এই স্বায়ত্বশাসিত রাজ্যটির ওপর প্রতিশোধ নেবেন তা ভাবা গেলেও কিভাবে তা হবে বোঝা যায়নি। এখন তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। 

যারা ইতিহাস জানেন বা খবর রাখেন তাদের অজানা না কিভাবে কাশ্মীর ভারতে ঢুকেছিল। তখনো বলপ্রয়োগের ব্যাপার ছিলো। রাজা চাইতেন ভারতে যেতে প্রজারা ভিন্ন কিছু। সে সময় শান্তি আর সৌহাদ্যের জায়গা এতটা নষ্ট হয়নি। নেহেরু যেমন বুদ্ধি খাটিয়ে ছাড় দিয়ে তাঁর পূর্ব পুরুষদের কাশ্মীরকে ভারতে রেখেছিলেন তেমনি সীমান্ত গান্ধীর কথা ভুললেও চলবে না। খান আবদুল গাফফার খানের পুত্র ফারুকও ছিলেন সেখানকার মূখ্যমন্ত্রী। ঘটনা কিন্তু বদলায়নি। একদিকে যেমন জম্মু পর্যন্ত ভারতের অবিচ্ছেদ্যতা আরেকদিকে শ্রী নগর মানেই সংঘর্ষ আর হত্যা। মুসলমান প্রধান এই এলাকায় যে নারকীয় ঘটনাগুলো ঘটে তার পেছনে ভারতের হাত অস্বীকার করা যাবে না। আবার আজাদ কাশ্মীর নামে যেটুকু পাকিস্তানের দখলে তার প্রভাব এড়ানোও কঠিন। ফলে ভারত পাকিস্তান আর কাশ্মীর এই তিন মিলে এক অরাজক কাণ্ড । আর আজ তা এমন এক জায়গায় চলে এসেছে যেখানে নিরাপত্তা আর সহাবস্থান বলে কিছুই থাকলো না। 

দুনিয়া বদলে গেছে। কোন দেশের সমস্যায় এমনকি বাইরের দেশ তাদের কব্জা করলেও কেউ কিছু বলে না। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের  আমলে যে ভারসাম্য তা আর নাই। মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক দেশ তামা হয়ে গেছে। তাদের জনগোষ্ঠী আজ শরণার্থী। ইরাক সিরিয়া লিবিয়া কোথাও মানুষ শান্তিতে নাই। কিন্তু কারো কোন বলার কিছু নাই। না ইউরোপ না আমেরিকা না অন্যকোন দেশ। জাতিসংঘ নামে যে প্রতিষ্ঠান আজ তার নিজেরই কোন ঠিক নাই। তার কথা কেউ শোনে না।  আফগানিস্তানের কথা ভাবুন। সেদেশে আজ কত বছর ধরে লড়াই চলছে? কাবুল কি আসলে কোন বাসযোগ্য বা থাকার মত শহর? তাতে কি? কারো টনক নড়ে না। কেউ এনিয়ে এখন আর মাথাও ঘামায় না। যেন এটাই নিয়তি। এটাই স্বাভাবিক।

কাশ্মীর দীর্ঘকালের এক সমস্যা। নরেন্দ্র মোদী ক্যারিশম্যাটিক লিডার। তিনি আঁট ঘাট না বেঁধে নামেননি। তাঁর ভালো জানা আছে পাকিস্তান মুখে তড়পালেও কিছু করতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অনেকেই তাদের বন্ধু। শুধু বন্ধু  না জব্বর মিত্রতার সম্পর্ক এখন। ইরান আছে নিজের ঝামেলায়। তাহলে কে দাঁড়াবে কার হয়ে? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথা বলা মানে এখন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। কথিত মানবতাবাদী আর কিছু সংগঠন ব্যতীত মূলত কেউই মুখ খুলবে না। আর এই ফাঁকে ভারতীয়রা তাদের কাজ সারবে।

যেমনটা আমরা শ্রীলংকায় দেখেছি। শেষদিকে লংকানরা তাই করেছিল। চারদিক থেকে ঘিরে ধরে তামিলদের মেরে সাইজ করেছিল। সে অসম যুদ্ধে প্রায় নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেছে তামিল যুবশক্তি। বলা হয় নারী ও শিশু ছাড়া কেউই বাঁচেনি সেখানে। এমন নৃশংসতা আমরা কম্বোডিয়ায়ও দেখেছি। লাওসেও আছে এমন বর্বরতার ইতিহাস। কাশ্মীর কি সে পথে  যাচ্ছে? 

সেখানকার মানে ভারতের নেতাদের কে কি বলছেন তার ভেতর থেকেও ঘটনা আঁচ করা সম্ভব। যেমন– কংগ্রেসের গুলাম নবী আজাদের মতো কাশ্মীরি নেতার আক্ষেপ, ‘‘মহারাজ, প্রধানমন্ত্রী হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পরে এবার উপ রাজ্যপাল শাসন করবেন কাশ্মীর! এর থেকে লজ্জার কী হতে পারে।’’ প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরমের মতে, কাশ্মীরকে ভারতের উপনিবেশে পরিণত করেছে বিজেপি সরকার। আগামী দিনে কাশ্মীর ভারত থেকে বেরিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন অনেক বিরোধী।

জবাবে অমিত বলেন, ‘‘যত নষ্টের গোড়া ৩৭০ অনুচ্ছেদ।’’ তাঁর যুক্তি, এর ফলে গোটা দেশের সঙ্গে মিশতে পারেননি কাশ্মীরিরা। ব্যবসায়ীরা, শিল্পপতিরা উপত্যকায় জমি কিনতে পারেননি। ফলে লগ্নিও হয়নি। মানুষ গরিবই রয়ে গিয়েছেন। ওই অনুচ্ছেদ উঠে গেলে কাশ্মীর ভারত থেকে বেরিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, আরও ভাল করে দেশের সঙ্গে তার আত্তীকরণ ঘটবে। অমিতের দাবি, অনুচ্ছেদ ৩৭০-কে হাতিয়ার করেই উপত্যকায় সন্ত্রাসে উস্কানি দিয়েছে পাকিস্তান। গত তিন দশকে ৪১ হাজার মানুষের মৃত্যুর পিছনে অনুচ্ছেদ ৩৭০ রয়েছে বলেই মত অমিতের। তাঁর দাবি, কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ নন, সে রাজ্যের তিনটি পরিবার যারা এ যাবৎ রাজত্ব করে এসেছে, তারাই সবচেয়ে আতঙ্কিত।

বোঝা যাচ্ছে এক মরণ কামড় দিতে চলেছে বিজেপি। সন্ত্রাস আর হানাহানি একদা ভূস্বর্গ নামে পরিচিত কাশ্মীরকে বহুকাল থেকে নরক বানিয়ে রেখেছে। এখন শুরু হলো আধিপত্য পর্ব। যারা এর ভেতর ভারত আবার ভাঙার ইন্ধন দেখছেন তারা যেমন শংকিত আবার যারা নির্যাতন ও ভয়াবহ সংখ্যালঘু নিপীড়নের কথা বলছেন আমরাও তাদের মত ভীত। উপমহাদেশে গান্ধী ও শান্তি এ-দুই শব্দ সমার্থক ছিলো। এখনো তা শেষ হয়ে যায়নি। তবে এভাবে চললে অচিরেই ভারতকে অশান্তির মাশুল গুণতে হবে। সাথে থাকবে আগাম বিপদের ভয়াবহতা। কিভাবে তা ফিরে আসে তা এখন দেখার বিষয়।

উপমহাদেশের অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস ধর্মীয় অনুভূতি আর মানবিকতার বিবেচনায় এর প্রভাব আমাদের দেশেও পড়বে। তাই আমাদের সাবধানতা অবলম্বন জরুরী। আমরা যেন এর কারণে আমাদের শান্তি বা পরিবেশ বিষিয়ে না তুলি। পাশাপাশি আমরা এটাও চাইবো কাশ্মীরের নারী শিশুসহ নিরাপরাধ মানুষ যেন কোন নির্যাতন বা হয়রাণীর শিকার না হয়। তারা মানুষ। তারা তাদের ভূখণ্ডে স্বাধীন ও মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার রাখে। তা যদি না হয় বা দিতে না পারে তাহলে গণতান্ত্রিক দেশ বলে গর্ব করার অধিকার কি ভারতের থাকবে আদৌ?

অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

Responses -- “কাশ্মীর ভূস্বর্গে দাবানল”

  1. সেলিম

    ভালো লেখা। মনযোগ দিয়ে পড়লাম। লেখককে ধন্যবাদ।
    এটা ঠিক, ভারত যখন সিকিমকে দখল করলো তখনো বিশ্ব কিছু বলেনি। চুপ করে এনজয় করেছে। এবার তো আর বলার কথাই না।

    Reply
  2. সুকান্ত সমদ্দার (অনীয়)

    কাশ্মির ভারতের একটি রাজ্য এখানে ভারত যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে। এটা তাদের আভ্যন্তরিন ব্যাপার। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে কোন সরকারই চাইবে না যে তাদের আভ্যন্তরিন কোন রাষ্ট্রে অন্য রাষ্ট্র থেকে জঙ্গি প্রবেশ করুক আর ধীরে ধীরে অঞ্চলটিকে জঙ্গি অঞ্চল গড়ে তুলুক। আর যে সময়ে এসে ভারত সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাহা সত্যিই ভারতকে ভাল কিছু দিবে। ভারত আরো ঐক্যবদ্ধ হবে। জঙ্গির বিদায় ঘটবে। জঙ্গি নির্মূলে ধ্বংস হবে। হাজার হাজার তীর্থ ভ্রমণ যাত্রীদের প্রতি হামলা করতে সাহস পাবে না। শত শত নিরহ সৈনিকদের প্রতি বোমা হামলা করতে পারবে না। টহলরত পুলিশ, সেনাদের প্রতি পাথর ছুড়তে পারবে না। আশা করি আরো বিভিন্ন দিক থেকে তারা সুরক্ষিত থাকবে। সুরক্ষিত থাকবে সাধারন জনগন।

    Reply
  3. মনির হোসেন

    আমাদের বোঝা দরকার যে কাশ্মীরে যা ঘটেছে, ঘটছে ও ঘটবে, তা কেবল কাশ্মীরের জনসাধারণ বা সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্যই নয়, এর মধ্য দিয়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী কর্তৃত্ববাদের নখদন্ত শাণানো হচ্ছে। উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মোন্মাদনা, বিদেশভীতি, কর্তৃত্ববাদ ও আধিপত্যবাদী মনোভঙ্গি মিলেমিশে যখন একটি রাজনৈতিক আদর্শ তৈরি করে এবং সেই আদর্শের প্রচারকেরা যখন ক্ষমতায় আসীন হয়, তখন একটি দেশে কী পরিস্থিতির সূচনা হতে পারে, তার উদাহরণ হচ্ছে বিজেপি এবং তার নেতা নরেন্দ্র মোদির শাসিত ভারত। ‘ব্রুট মেজরিটি’ বা বর্বর সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে এমন একটি সরকার কীভাবে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বদলে দিয়ে ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করার দিকে এগোয়, সেই উদাহরণও মিলতে শুরু করেছে।অমুসলিম বা কাশ্মীরি নয় বলে অন্যরা রেহাই পাবে, এমন আশা করার কারণ নেই। গত কয়েক বছরে ঘৃণা-বিদ্বেষের যে চাষাবাদ করা হয়েছে, তার পরিণতি গো-রক্ষকদের তাণ্ডবে, জয় শ্রীরামকে হিংসাধ্বনিতে পরিণত করার মধ্যে দেখতে পেয়েছি। রাষ্ট্র সেখানে সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে। আর এখন রাষ্ট্রের সব শক্তি দিয়েভিন্ন মত, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন ভাষার বিরুদ্ধেই যেন যুদ্ধের ঘোষণা করেছে। সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের আশু লক্ষ্য হচ্ছে কাশ্মীর, অবশ্যই সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই ধারার ওপর ভিত্তি করেই আরও পাঁচটি ধারা সংবিধানে যুক্ত হয়েছে, যার আওতায় নাগাল্যান্ডে নাগারা, অরুণাচল রাজ্যে নাগাদের একাংশ, মিজো এবং অন্য উপজাতিরা, মেঘালয়ে গারো, খাসি ও মিকির উপজাতির সদস্যরা সাংবিধানিক সুবিধা পেয়ে আসছে। ৩৭০ ধারা বাতিলের পর সেগুলো নিয়ে কেবল প্রশ্ন উঠবে তা নয়, বিজেপি ও তার নেতারা এই উদাহরণ দিয়েই সেগুলো বাতিল করে দেবেন না, তার গ্যারান্টি কোথায়? যে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের কথা তাঁরা বলেন, সেখানে এই ভিন্নতা, এই বৈশিষ্ট্য অগ্রহণযোগ্য। আর সেই বিবেচনায়ই সাবেক অর্থমন্ত্রী চিদাম্বরমের হুঁশিয়ারির কথাগুলো শুনতে হবে। একসময়কার সংবিধানবিষয়ক আইন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘আজ পার্লামেন্টে যে অসাংবিধানিক ও অবৈধ প্রস্তাব পাস হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে যে ভয়াবহ উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়েছে, তার ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে ভারতের জনগণকে, প্রতিটি রাজ্যের জনগণকে জেগে উঠতে হবে। আজ আমি সব দল, সব রাজ্য, সব নাগরিককে এ বিষয়ে সতর্ক করতে চাই যে রাজ্যগুলোর সমাহার (ইউনিয়ন অব স্টেটস) হিসেবে ভারতের যে ধারণা, তা আজ ভয়াবহ বিপদের মুখে।’ ভারতের এই ঘটনাবলির প্রতিক্রিয়া কেবল ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রের মধ্যে সীমিত থাকবে, এমন ভাববার পক্ষে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। এটা কেবল এই কারণে নয় যে কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তান-ভারতের ৭০ বছরের দ্বন্দ্ব-সংঘাত আছে। এই কারণেও যে এখন কোনো ঘটনাই সীমান্তে কাঁটাতার দিয়ে আটকানো যায় না। আপাতত যদি ভারতের সৈন্যরা কাশ্মীরে তাঁদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষমও হন, তবে তার অর্থ এই নয় যে কাশ্মীরে অনন্তকালের জন্য কবরের শান্তি নেমে আসবে।

    Reply
  4. আবদুল আওয়াল

    অ্যালান ক্যাম্পবেল জনসন ছিলেন বড়লাটের সেরেস্তার উচ্চপদস্থ কর্মচারী। তিনি প্রত্যক্ষভাবে ভারত বিভাগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অ্যালান ক্যাম্পবেল তার লিখিত গ্রন্থ ‘মিশন উইথ মাউন্টব্যাটেন’-এ হরি সিং এবং হায়দ্রাবাদের নিজাম সম্পর্কে লিখেছেন, ‘যেমন কাশ্মিরের মহারাজ তেমনি হায়দ্রাবাদের নিজাম, বৃহৎ কোনও সংকটপূর্ণ অবস্থাকে প্রতিরোধ করার পন্থা জানেন না। জানেন শুধু দায়িত্ব এড়িয়ে কালক্ষেপণ করা। তাদের রাজনৈতিক বুদ্ধির ভান্ডারে এই দীর্ঘসূত্রতার কৌশলশাস্ত্র ছাড়া আর কোনও অস্ত্র ছিল না।’কাশ্মির সম্পর্কে মাউন্টব্যাটেন এবং উপপ্রধানমন্ত্রী সর্দার প্যাটেলের কোনও অস্পষ্টতা ছিল না। তারা মনে করতেন এটা যেহেতু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল সুতরাং তারা পাকিস্তানে যোগদান করবে। সর্দার প্যাটেল জুনাগর, হায়দ্রাবাদ নিয়ে যতই দুরভিসন্ধি করুক না কেন কিন্তু কাশ্মির নিয়ে তিনি ফন্দি-ফিকির করেননি। বরং তিনি লিয়াকত আলী খানকে বলেছিলেন নিজাম পাকিস্তানে যোগ দিতে চাচ্ছেন আর হরি সিং চাচ্ছেন ভারতে যোগদান করতে। সুতরাং এতে আমাদের হাতে উভয় রাজ্য একচেঞ্জ করার সুযোগ থাকবে এবং আমরা তাই করব। কিন্তু নেহরু কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ। তার অভিলাষ ছিল কাশ্মির ভারতের সঙ্গে থাকুক। এরই মাঝে হরি সিং ভারতের কাছে সৈন্য ও সমরাস্ত্র সাহায্য চাইলেন। নেহরু সৈন্য পাঠাতে উতলা হয়ে উঠলেন, কিন্তু গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন বললেন হরি সিং আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের সঙ্গে যোগদান না করলে ভারতের সৈন্য পাঠানোর বিষয়টি তিনি অনুমোদন দিতে পারবেন না। হরি সিং ভারতে যোগদানের কথা ঘোষণা দেওয়ার পর গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন সৈন্য পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছিলেন এই শর্তে, কাশ্মিরে শান্তি ফিরে এলে গণভোটের আয়োজন করতে হবে এবং রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। জাতিসংঘ বিরোধ মেটানোর জন্য গণভোটের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। এখন কাশ্মির তিন দেশের দখলে। লাদাখের কিছু অংশ চীনের দখলে। আবার কাশ্মিরের কিছু অংশ আজাদ কাশ্মির নামে একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তানের সঙ্গে আছে। বলা যায় পাকিস্তানের দখলে। অবশিষ্ট জম্মু ও কাশ্মির ভারতের শাসনতন্ত্রের ৩৭০ ধারা মোতাবেক এতদিন স্বায়ত্তশাসিত বিশেষ মর্যাদা ভোগ করা একটা রাজ্য ছিল। গত ৫ আগস্ট ২০১৯ ভারতের রাষ্ট্রপতি বিশেষ অর্ডিন্যান্স জারি করে ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করে জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করেছে। এখন থেকে কাশ্মির হবে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং দু’জন লেফটেন্যান্ট গভর্নর শাসিত এলাকা। জম্মু ও কাশ্মিরে বিধানসভাও থাকবে।
    ভারতের অনেক নেতা সেদিন গভর্নর জেনারেলের গণভোটের প্রস্তাব গ্রহণ করতে চাননি। তখন ক্যাম্বেল তার বইতে লিখেছেন মাউন্টব্যাটেন নাকি নেহরুকে বলেছিলেন, ‘ভণ্ডামি করে রাষ্ট্র গঠন করা যায় না।’ কাশ্মির নিয়ে নেহরুর ভণ্ডামির ইতি টেনে নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয়বার পর্দা তুললেন। শেষ পর্যন্ত মাউন্টব্যাটেনের কথাই সত্য প্রমাণিত হবে—‘ভণ্ডামি করে রাষ্ট্র গঠন করা যায় না’। গত ৭০ বছর ফিলিস্তিনে শান্তি স্থিতি কিছুই নেই। যেখানে শান্তি-স্থিতি কিছুই নেই, সেখানে তো রাষ্ট্র গঠন বৃথা। আর কাশ্মিরেও তো শান্তি স্থিতি কিছুই নেই। এখানে কি উল্টাপাল্টা করে শান্তি স্থিতি কিছু আনা যাবে!

    Reply
  5. নাজমুল

    কাশ্মীর সংকট সমাধানে যুগে যুগে বহু মনীষী ও রাষ্ট্রনায়ক নিজের চিন্তা ও পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও কাশ্মীর সংকট সমাধানে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনীগ্রন্থ ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কাশ্মীর নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘অত্যাচার আর গুলি করতে কেহ কাহারো চেয়ে কম পারদর্শী নয়। গুলি করে বা গ্রেফতার করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। ভারতের উচিত ছিল গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার মেনে নিয়ে দুদেশের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি করে নেয়া। এই সংকটের সমাধানে বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ ছিল, ‘পাকিস্তান ও ভারত সামরিক খাতে অর্থ ব্যয় না করে দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য অর্থ ব্যয় করতে পারত। দুদেশের জনগণও উপকৃত হত। ভারত যখন গণতন্ত্রের পূজারি বলে নিজকে মনে করে তখন কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিতে কেন আপত্তি করছে? এতে একদিন দুটি দেশই এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে বাধ্য হবে।’জম্মু-কাশ্মীরের জনমতকে উপেক্ষা করায় ভারতের সমালোচনা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আরও বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ভারত, গণতন্ত্রের পথে যেতে রাজি হয় না কেন? কারণ তারা জানে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিলে ভারতের পক্ষে কাশ্মীরের লোক ভোট দেবে না। তাই জুলুম করেই দখল রাখতে হবে।’দুদেশের সরকার কাশ্মীরের একটি শান্তিপূর্ণ ফয়সালা না করে দুই দেশের জনগণের ক্ষতিই করছেন। দুদেশের মধ্যে শান্তি কায়েম হলে, সামরিক বিভাগে বেশি টাকা খরচ না করে দেশের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা যেত। তাতে দুই দেশের জনগণই উপকৃত হতো। আমার মনে হয়, ভারতের একগুঁয়েমিই দায়ী শান্তি না হওয়ার জন্য।’

    -কারাগারের রোজনামাচা
    -তারিখঃ ১৩ জুলাই ১৯৬৬
    -পৃষ্ঠাঃ ১৫৯

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—