সেদিন আমি একটা ই-মেইল পেয়েছি। সেখানে ছোট একটা লাইন লেখা, “স্যার, আত্মহত্যার মিছিলে আরও একটি নাম যুক্ত হল…” এই লাইনটির নিচে আত্মহত্যার খবরটির লিংক। আমার বুকটা ধ্বক করে উঠল, কারণ আমি সাথে সাথে বুঝে গিয়েছি কে আত্মহত্যা করেছে, কেন আত্মহত্যা করেছে। যে ই-মেইলটি পাঠিয়েছে সে আমাকে আগেই সতর্ক করে বলেছিল যে আমি আরও আত্মহত্যার খবর পাব। শিক্ষার মান উন্নয়ন করার জন্য যে সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে এরা সেই কলেজের ছাত্র-ছাত্রী। এই দেশের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে আত্মহত্যার মত ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়ার পরও আমরা কেমন করে আমাদের দৈনন্দিন কাজ করে যাচ্ছি? আমাদের ভেতর কোনো অপরাধ বোধ নেই?

এই সাতটি কলেজের একটি কলেজ থেকে একজন ছাত্র কিছুদিন আগে আমাকে একটা দীর্ঘ চিঠি লিখেছিল। সে আমাকে লিখেছে যে, তাদের শিক্ষার মান উন্নয়ন করার এই পরিকল্পনা তার মত আড়াই লক্ষ শিক্ষার্থীর জীবন ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাদের সাথে যারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে তারা চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছে অথচ তারা এখন পর্যন্ত প্রথম বর্ষ শেষ করতে পারেনি। শুধু তাই না, পরীক্ষা দিতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করেছে চার ঘণ্টার পরীক্ষার জন্য তাদের তিন ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে। (বিষয়টা মনে হয় আরো জটিল, আশি নম্বরের পরীক্ষার জন্য কোনো কোনো পরীক্ষা হয়েছে তিন ঘণ্টায়। এটি সেই ছাত্রের অভিযোগ।)

ছাত্রটির অভিযোগের তালিকা আরো দীর্ঘ। তার মতে সমস্যাগুলো হচ্ছে- তীব্র সেশন জট, ফলাফল প্রকাশ হতে বিলম্ব, সিলেবাসের বাইরে থেকে প্রশ্ন, পরীক্ষার সময় কমানো, গণহারে ফেল, ফলাফলে ভুল এবং সেই ভুল সংশোধনের নামে হয়রানি, ফলাফল পুন: সংশোধনের পর একেবারে একশভাগ ফলাফল আগের মত রেখে দেওয়া ইত্যাদি। ছাত্রটির চিঠির লাইনে লাইনে হতাশা, তার চাইতে জুনিয়র ছেলে-মেয়েরা পাশ করে বিসিএস দিচ্ছে অথচ সে নিশ্চিত যে সে পরীক্ষাতে পাশই করতে পারবে না। যে পরীক্ষায় শতকরা নব্বইজন ফেল করছে সেই পরীক্ষায় সে কেমন করে পাশ করবে? পরিচিত মানুষজন যখন তার লেখাপড়ার খোঁজ নেয় সে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারে না। তার অভিযোগগুলো যে সত্যি সেটা প্রমাণের জন্য সে আমাকে কিছু কাগজপত্র পাঠিয়ে তাদের জন্য কিছু একটা করার জন্য অনুরোধ করেছে।

চিঠির শেষে সে লিখেছে এর মাঝে বেশ কয়েকজন আত্মহত্যা করেছে এবং ভবিষ্যতে আরো করবে।

তার ভবিষ্যৎবাণী সত্যি বের হয়েছে। জুলাই মাসের ১৯ তারিখ বেগম বদরুন্নেছা সরকারী মহিলা কলেজের মিতু নামের একজন হাসিখুশি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। খবরটি পড়ার পর থেকে আমি এক ধরনের তীব্র অপরাধবোধে ভুগছি। লেখাপড়া করতে এসে ছাত্রছাত্রীরা আত্মহত্যা করে এটি কেমন করে সম্ভব?

যে ছাত্রটি আমার কাছে দীর্ঘ একটি চিঠি পাঠিয়েছিল সে আমার কাছে সাহায্য চেয়েছিল। সাহায্য করার মত আমি কেউ নই, কিন্তু ডুবন্ত মানুষ খড়কুটোকেও আকড়ে ধরে। আমি সেই খড়কুটো তাই আমার পক্ষে যেটা করা সম্ভব সেটা করেছি, দেশের সব সংবাদপত্রের কাছে অনুরোধ করেছি সাত কলেজের অধিভুক্তির বিষয়টি অনুসন্ধান করে প্রয়োজন হলে কোনো ধরনের রিপোর্ট প্রকাশ করতে। সংবাদপত্রগুলো নিজেদের উদ্যোগেই কিংবা কেউ কেউ আমার অনুরোধে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এখন আমি জানি আমার কাছে লেখা সেই ছাত্রের অভিযোগগুলো মিথ্যা নয়। সত্যি সত্যি তাদের জীবন নিয়ে এক ধরনের নির্মম পরিহাস করা হচ্ছে।

দুই.

আমাদের পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যত ছাত্রছাত্রী পড়ে তার থেকে অনেক বেশি ছাত্রছাত্রী পড়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত অসংখ্য কলেজে। যদি তাদের শিক্ষার মান যথেষ্ট উন্নত না হয়ে থাকে এবং সেটা উন্নত করার জন্য তাদেরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার প্রয়োজন হয়ে থাকে তাহলে অন্যান্য কলেজগুলো কী দোষ করল? তাদের শিক্ষার মান কী উন্নায়ন করার কোনো প্রয়োজন নেই? (পত্র-পত্রিকায় যে রিপোর্ট বের হয়েছে সেখানে অবশ্য শিক্ষার মান উন্নয়নের কথা লেখা নেই সেখানে বলা হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের বিরোধ এর আসল কারণ। আমি অবশ্য অনেক চিন্তা করেও দুইজন ভাইস চ্যান্সেলরের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কীভাবে এতো বড় একটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে কিছুতেই ভেবে পাইনি। তাই আমি ধরে নিচ্ছি শিক্ষার মান উন্নয়নই এর মূল কারণ এবং হয়তো পর্যায়ক্রমে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে স্থানীয় কলেজের দায়িত্ব দেওয়ার মত কোনো একটা পরিকল্পনা আছে। সেটি ভলো হবে না খারাপ হবে আমি মোটেই সেই বিতর্কে যাচ্ছি না।)

তবে আমরা মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অধিভুক্ত করার এই পরিকল্পনাটি কাজ করেনি। কেন করেনি সেটা খুব কঠিন নয়। খোঁজ নিয়ে জেনেছি কলেজগুলোকে অধিভুক্ত করার ফলে তাদের বেশ কিছু বাড়তি কাজ করতে হয়, পরীক্ষা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে হয়। এটি বিশাল দায়িত্ব। প্রশ্নপত্র মডারেশান করতে হয়, প্রশ্নপত্র মডারেশনের পর তার রূপ পুরোপুরি পাল্টে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। শতকরা দশ ভাগ ছাত্রছাত্রীর খাতা দেখতে হয়। আড়াই লক্ষ ছাত্রছাত্রীর দশ ভাগ প্রায় পঁচিশ হাজার ছাত্রছাত্রী, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সমান! সোজা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দুই দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্র-ছাত্রীর খাতা দেখতে হয়। ভাইবাতে বহির্সদস্য হিসেবে যেতে হয়। সব ছাত্রদের জন্য এক মিনিট করে দেওয়া হলেও কতো সময় দিতে হবে কেউ হিসেব করেছে? এছাড়াও পরীক্ষার ফল প্রকাশের বিশাল দায়িত্ব রয়েছে, নিশ্চয়ই সাত কলেজের শিক্ষকেরা সেখানে সাহায্য করেন, কিন্তু দায়িত্বটুকু তো থেকেই যায়। কাজেই প্রশ্নপত্র কঠিন হয়ে যাচ্ছে, খাতা দেখতে দেরি হয়ে যাচ্ছে, ফল প্রকাশিত হচ্ছে না, ভুলভ্রান্তি হচ্ছে, সেগুলো ঠিক করা যাচ্ছে না। এবং অধিভুক্ত সাত কলেজের সব শিক্ষার্থীর জীবন হারাম হয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ছাত্রছাত্রীরাও এই অধিভুক্তি বাতিল করার জন্য আন্দোলন শুরু করেছে। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ। প্রশাসনিক ভবনে তালা। আমি দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলাম কখন ছাত্রলীগের ছেলেরা মাঠে নামে, এখন তারাও নেমে পড়েছে। নিজেদের সাথ নিজেদের সংঘাত শুরু হয়েছে; কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সাথে সংঘাত এখন শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার। সোজা কথাও পরিস্থিতি যতটুকু জটিল হওয়া সম্ভব ততটুকু হয়ে গিয়েছে এখন ভবিষ্যতে সেটি কোনদিকে মোড় নেবে কেউ অনুমান করতে পারছে না।

আমি যখন পিএইচডি করি তখন আমার সুপারভাইজার কয়েকজন গবেষকের সাথে কথা বলছিলেন। গবেষণায় একটি বিশেষ ব্যাপার নিয়ে তারা একটা ভিন্নধর্মী কাজ করতে চায়। আমার সুপারভাইজার ছিলেন খুবই চাছাছোলা মানুষ, তিনি অন্য গবেষকদের বলতেন, “তোমরা এই ঘোড়াটাকে নিয়ে টানাটানি করতে চাও করো, আমি আপত্তি করবো না। কিন্তু ঘোড়া যদি মরে যায় তাহলে অতি দ্রুত এই ঘোড়াকে কবর দেওয়ার সাহসটুকু যেন থাকে।” তার কথাটি আমার খুব পছন্দ হয়েছিল এবং আমার নিজের জীবনে এটা মনে রেখেছি।

যে কোনো ব্যাপারে নূতন কিছু চেষ্টা করার মাঝে কোনো দোষ নেই, কিন্তু সেই নূতন কিছু যদি কাজ না করে তাহলে সেটাকে অতি দ্রুত কবর দেয়ার সাহস থাকতে হয়। আমি মনে করি এই সাত কলেজের অধিভুক্তির বিষয়টি কাজ করেনি, তাই এখন যত দ্রুত সম্ভব এই ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে এটার নিষ্পত্তি করে ফেলা উচিৎ। তবে আমাদের দেশে সেই কালচারটি এখনো গড়ে উঠেনি। মৃত ঘোড়াকে কবর দেওয়া দুরে থাকুক, ঘোড়াটি যে মারা গেছে আমরা সেটাও স্বীকার করতে রাজি হই না। বাড়তি পাবলিক পরীক্ষা হিসেবে পিএসসি এবং জেএসসি এই দেশের ছেলেমেয়েদের জন্য একটু অহেতুক বিড়ম্বনা সেটি সবাই মেনে নেওয়ার পরও এই পরীক্ষা দুটি বাতিল করা হচ্ছে না।

কাজেই সাতটি কলেজের বিষয়টা যেভাবে ঝুলে আছে সেভাবেই যদি দিনের পর দিন ঝুলে থাকে আমি একটুও অবাক হব না। আমাদের নি:শ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করে থাকতে হবে আবার না কোনো একদিন জানতে পারি যে আবার আরো কোনো ছাত্র বা ছাত্রী হতাশায় আত্মহত্যা করে ফেলেছে। একজন মানুষের জীবন কতো বড় একটি ব্যাপার! সেটি শুধু যে সেই মানুষটির জীবন তা নয়, তার সাথে আরো কতো আপনজনের স্নেহ মমতা ভালোবাসা জড়িয়ে থাকে, সেটি যখন এভাবে আমাদের অবহেলার কারণে হারিয়ে যায়, আমরা সেটা কেমন করে মেনে নিই?

বেশ কয়েক বছর আগে শাবিপ্রবির আমাদের বিভাগটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়ার কারিগরি সাহায্য করেছিল। তখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত কলেজগুলো নিয়ে আমার একটা ধারণা হয়েছিল। সেবার আমি প্রথমবার এই কলেজগুলোর গুরুত্বটা অনুভব করেছিলাম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা বিশ লক্ষ। কাজেই আমাদের যদি দেশের শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হয় তাহলে সবার আগে কোথায় দৃষ্টি দিতে হবে? অবশ্যই এই বিশাল ছাত্র সংখ্যার দিকে। আমরা যদি তাদের লেখাপড়ার মান একটু খানিও বাড়াতে পারি তাহলে তার প্রভাব হয় অনেক বড় এটা হচ্ছে সহজ গাণিতিক হিসাব।

আমাদের দেশের বড় বড় বশ্ববিদ্যালয়ের সবচাইতে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের আমরা ধরে রাখতে পারিনি। ব্যর্থতা আমাদের আমরা তাদের জন্য গবেষণার ক্ষেত্র গড়ে তুলতে পারিনি, কাজের পরিবেশ তৈরি করতে পারিনি, তাদেরকে তাদের উপযুক্ত অর্থ বিত্ত, সম্পদ কিংবা নিরাপত্তা দিতে পারিনি, তাদের সন্তানদের সত্যিকার লেখাপড়ার ব্যবস্থাও করে দিতে পারিনি। আমার ধারণা যদি কোনো ধরনের জরিপ নেয়া হয় তাহলে আমরা দেখব আমাদের এই দেশের মূল চালিকা শক্তির একটি বড় অংশ এই বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসেনি, এসেছে দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কলেজগুলো থেকে।

আমরা তাহলে আমাদের কৃতজ্ঞটি কাদেরকে জানাব? আমরা কী সেটি করছি? তাহলে কেন তাদের আত্মহত্যা করে তাদের জীবনের অবসান করতে হচ্ছে?

মুহম্মদ জাফর ইকবাললেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Responses -- “আত্মহত্যার মিছিল”

  1. বেলাল বেগ

    সব মিলে আমাদের শিক্ষা ব্যব্সথার যে চিত্রটি আমার চোখে ধরা দিল তা সম্ভবত: নাসিরুদ্দীন হোজ্জার. এক্জন মৌলবী গছের ছাযায় বসে ছাত্রদের পঅড়ানো অবস্থায এক ছাত্রকে বেত দিয়ে পেটানর সময় মুখ চালাচ্ছিলেন, কত গাধা পিটিয়ে মানুষ করলাম আর—– ঠিক ঐ সময় পাশ দিয়ে যাওয়া হোজ্জার কানে কথাটা ঢুকল. সে বাড়ী গিয়ে তার গাধাটি নিয়ে এসেছিল হুজুরের কাছে ভর্তির জন্য. যে রাষ্ট্রের সংগে তার জনগনের ই সম্পর্ক নেই, সেখানে শিক্ষাটা কাদের জন্য থাকবে!

    Reply
  2. সুনীল আকাশ

    স্যার
    শিক্ষার এ দূর্দশায় সরকারের কি কিছু করার নেই? বিগত ১১ বছর ধরে একই সরকার ক্ষমতায় তাহলে শিক্ষার মান দিন দিন কেন কমছে, শিক্ষা কেন বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে, শিক্ষায় দুর্নীতি কেন দিন দিন বাড়ছে? এর দায় কি সরকার অস্বীকার করতে পারে?

    Reply
  3. আলমগীর হোসেন।

    স্যার, শাবিপ্রবি’র অলিক গ্রুপের নাসাতে ২৩ জুলাই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু ভিসা না পাওয়ার কারণে তা আর হয়নি। কিভাবে এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তা ঘটতে পারে?

    Reply
  4. Lutfa Kabir

    স্যার, আপনি তো নিজেও শিক্ষা পলিসি ২০১০’র অন্যতম সদস্য ছিলেন। আপনি কেন একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করলেন না? কেন, আন্ডার কোয়ালিটি শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে আসার পথ খোলা রাখলেন যা ব্রিটিশ আর পাকিস্থানিরা করেছিল? তারা ভেদাভেদ বজায় রাখতে এই রকম শিক্ষা পলিসি করেছিল কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা তো সবকিছুই থেকে মুক্তি চেয়েছিল তাহলে তাদের করা শিক্ষা পলিসি আজও চলছে কি করে?
    যে দেশ ও রাজনৈতিক দল পাকিস্থানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে অন্যায় ও বৈষম্যের কথা বলে সেই দেশ ও দলই পাকিস্থান আমল থেকে চলে আসা শিক্ষা নীতি বারবার চালিয়ে দিচ্ছে। ২/১ টি শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের পরও কোন এক অজ্ঞাত কারণে সাইন্স, আর্টস আর কমার্স নামের বৈষম্য মূলক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে মুক্তি পায়নি বাঙালি জাতি।
    ৭১ পূর্বে এদেশে গুটিকয়েক বিজ্ঞানের বিষয় ছিল; জব সেক্টরও তেমন ছিল না সুতরাং সেসব যুগে দায়িত্ব পরায়ণ; সময়জ্ঞান যুক্ত নৈতিকতামণ্ডিত, হার্ড-ওয়ার্কার ভালো ছাত্ররাই আর্টস/মানবিক/সামাজিক বিজ্ঞান পড়তো। যদিও সেই সময় গুলোতে সামাজিক কারণেই বলি আর কম জনসংখ্যার কারণেই বলি না কেন, মানুষের নৈতিকতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধ ছিল অনেক। কিন্তু, আজকের প্রেক্ষাপট এক নয়। সময় বদলে; অধিক অধিক বিজ্ঞানের বিষয়, সুনিশ্চিত চাকুরী ও বেতন (যদিও ৩য় বিশ্বের দেশে এটা একটা বোগাস) আর ভালো ছাত্ররা পড়লো বিজ্ঞান। কিন্তু, দিন শেষে দেখা গেলো, আসলে তৃতীয় বিশ্বের এসব দেশের আসলে বিজ্ঞানকে ধারণ করার মতো সেই অর্থে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও সক্ষমতা থাকে না। সুতরাং, এদেশের অনেক মেধাবী অ্যাটলান্টিক পাড়ি দিল। একমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় সব দিকে সব বিষয়ে ভাল ছাত্রের সুষমও বণ্টন হতো এবং তাতেও যেসংখ্যক ছেলে মেয়ে বিজ্ঞান পড়তো তা আমাদের মতো গরীব দেশের বিজ্ঞান গবেষণা ও প্রয়োগের জন্য যথেষ্ট। আপনারা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করে, এক শ্রেণীকে দেশ থেকে বেড় করে দেবার হাইওয়ে বানিয়ে দিয়েছেন; আর যাদের ডিপ্লোমা কিংবা কর্মমুখি শিক্ষা নিয়েই খুশি থাকার কথা তাদের কর্তা বানাচ্ছেন। আহা, কি আনন্দের কথা।
    প্রশ্ন হোল, মানবিক/সামাজিক বিজ্ঞনের তো বিদেশে যাবার এতো সুযোগ নেই। তাহলে এরা কোথায় গেলো? আজকের শিক্ষা পলিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউনিট ভিত্তিক বৈষম্যমূলক ভর্তি পরীক্ষা এমন যে ঢাবির কোথায় যদি বলি সেখানে বিজ্ঞানে পড়তে হলে একজনকে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, ম্যাথ সব পড়তে হবে আর অন্য ইউনিটগুলোতে তেমন পরিশ্রম না করেও একই ডিগ্রী পাওয়া যায় এবং দেশের চাকুরী গুলোর এর থেকে বেশি যোগ্যতা আর দরকার নেই। কি চমৎকার। আজকে যারা বুয়েট, কার্জন হলে সাইন্স পরে এদের এসএসসি ও এইচএসসি সহ বাকি ইতিহাস পর্জবেক্ষন করলে দেখা যাবে আজকের সর্বোচ্ বিদ্যাপীঠে যারা বাংলা, ইংলিশ, সামাজিক বিজ্ঞান পড়ছে তাদের ৮০% ক্ষেত্রে সাইন্স পড়ুয়া দের পারফর্মেন্স ওইসব বিষয়ে ভালো ছিল। তাহলে ফলাফল কিঃ ফলাফল হোল সমাজের উঁচু থেকে কিছুসুবিধাভোগী মানুষ জানে অর্থনীতি, ল, সামাজিক বিজ্ঞান পড়তে বিজ্ঞানের মতো কষ্ট করতে হয়না কিন্তু অ্যাডমিন হওয়া যায় আর অন্যদিকে জেলায় জেলায় সাইন্স পড়ুয়াদের দাপটে যারা সমাজে অনেকটাই চাপে থাকতো তারা কিছুটা নিরুপায় হয়েই সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিকের বিষয়গুলো পড়ে। শিক্ষা ব্যবস্থার গোগাইল দিয়ে ক্যাম্পাস গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের দুধ- অল্প কিছু কিসমিস-বালির একটা কক্টেল করা হয়েছে আর সেই কক্টেল দিয়ে সবচেয়ে উপকৃত হয়েছে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস বাচিয়ে রাখা রাজনীতিবিদেরা।
    বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞানের ছেলেমেয়েদের জন্য ইউনিট ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষার নামে বিষয় বণ্টনে কিছু Arificial barrier করে রাখা আছে; আর এক শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের সামাজিক ফিল্ট্রেশন প্রসেস কে বাইপাস করিয়ে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসা হয়েছে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে। সেই সাথে শিক্ষা-অফিস ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুঁকে যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল (মেধা ও নৈতিকতা) মানুষজন। আর এই পলিসির সুবিধাভোগীর আবার খারাপ দিকও আছে; অনেকেই এই সুবিধায় ক্যাম্পাসে পা দিয়ে কোপ করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে যা কেউ বলছে না।
    একজন বিজ্ঞানের ছাত্র সারাজীবনই ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, গণিত, বাংলা, ইংলিশ সব শুধু পড়বেন আর পড়বেনই; কষ্ট করবেন; জীবনের মূল্যবান সময় ইনভেস্ট করবেন; বাবা-মা আপনার পিছনে টাকাপয়সা খরচ করবেন; দিনশেষে শুধু এটা দেখার জন্য যে দেশে পর্যাপ্ত চাকুরির সুযোগ নাই; ইনফ্রাস্ট্রাকচার/অবকাঠামো নাই (তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সেই সক্ষমতাও নির্ণয় করা জরুরী); সম্মান ও সম্মানীও (বেতনকাঠামো) তুলনামূলক কম বা সামাজিকভাবে সন্তুষ্ট হবার মতো না; উপরন্তু, আপনার মধু অন্যজন খাচ্ছে; আপনি যা অর্জন করেছেন তার কানাকড়ি না করেও আপনার উপরে চলে যাচ্ছে শুধুমাত্র বৈষম্যমূলক পলিসি/নীতির কারণে।
    যারা বিজ্ঞান সত্যিই ভালোবাসেন তারা অবশ্যই একটি ভাষাও শিখবেন ঠিক যেমনটি আপনি গনিতে ভালো মার্ক্স পান; ফিজিক্সে স্কুল/কলেজ সেরা ঠিক তেমনি একটা উন্নতদেশের ভাষাও শিখবেন যাতে সেটা তুখোরভাবে লিখতে, পড়তে এবং বলতে পারেন।
    স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় যে মেধাকে লালন করে তা যতটা না ট্যালেন্ট তার থেকেও বেশি হচ্ছে অনেকগুলো মানবীয় ভালো গুণাবলীর সমষ্টি। বিষয়টি শুধু এমন নয় যে, একজন বিজ্ঞানের ছাত্র শুধু ফিজিক্স/কেমিস্ট্রি/গণিতের ভাষা বোঝে বরং এইসব জানার জন্য তিনি দিনে দিনে যে সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা, কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা, অন্যদের থেকে আলাদা (StandOut), মা-বাবা-শিক্ষকদের বিধিনিষেধ মানা প্রভুতি। এসব গুণাবলীর সবগুলই হয়তো সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে না কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা অন্যান্যগ্রুপের ছাত্রছাত্রীদের থেকে তুলনামুলকভাবে বেশি থাকার কথা এবং তা কারোরই অজানা থাকার কথা নয়।
    দেশে বিজ্ঞানের তেমন কোন প্রয়োগ ও সুযোগ নেই; অথচ তুখোড় ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞান পড়িয়ে একগ্রুপকে অ্যাটলান্টিক পাড়ি দিতে সব বন্দোবস্ত করে দেবার ব্যবস্থা করেছি ার এক গ্রুপ কিছুটা নিরুপায় হয়েই পারলে বিসিএস অথবা স্বল্প বেতনের প্রাইভেট সেক্টরে চাকুরী করাতে বাধ্য করছি কেননা পাবলিক প্রাইভেট বেতন স্কেলও ঠিক নাই।
    ^^^ পরিশেষে যে প্রশ্নটির জন্ম দেয় তা হলঃ তাহলে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মিশন-ভিশন কি? যদি তারা ভালো বিজ্ঞানী চায় তবে তার সুযোগ- সুবিধা নেই কেন? আর যদি তারা ভালো প্রশাসন ও নেতৃত্ব চায় তাহলে এতো এতো ভালো মানবীয় গুণাবলীর ছেলেমেয়েদের সেইভাবে গড়ে তুলে কাজে লাগানো গেলো না কেন? নাকি সারাজীবনই আমরা, ইউরোপ-আমেরিকার জন্য বিজ্ঞানী বানাবো? আর যদি সেটাও বানাই তাহলে প্রশ্ন হলঃ দেশ থেকে এক্সপোর্ট করা বিজ্ঞানী নাকি দেশের জন্য দক্ষ প্রশাসন ও নেতৃত্ব? কোনটি বেশি জরুরী?

    Reply
  5. সৈয়দ আলি

    যথারীতি জাফর ইকবাল সমস্যার মূলকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে দুই ভিসির ‘ দ্বন্দ’ এই সমস্যার মূলে কিন্তু একথা বলার সততা বা সাহস দেখাতে পারেননি যে শিক্ষাবিদের পরিবর্তে দলদাসদের নিয়োগ দেয়াই সমস্যার আসল কারন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—