একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন। একজন মহিলাকে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কিছু মানুষ মারছে। মারতে মারতে হিংস্র হয়ে ওঠা দানবের সংখ্যা বাড়ছে তো বাড়ছেই। এ ভদ্রমহিলা কোন শ্রমিক বা গরীব কেউ না যা তার পোশাক কিংবা আচার-আচরণ দেখে সন্দেহ হবার কথা। তাকে ছিনিয়ে আনা হয়েছে খোদ হেডস্যারের রুম থেকে। রেনু আসলে কেমন ছিলেন, তা জানতে প্রতিবেশি আর তার স্বজনদের সঙ্গে কথা হয় বিভিন্ন পত্রিকার প্রতিবেদকদের। রেনুর সঙ্গে একই বাসায় থাকতেন ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু। তিনি বলেন, ‘খালা স্নেহপরায়ণ ছিলেন। একজন শিক্ষিত-সচেতন নারী। ছেলেধরা তো দূরের কথা, নূন্যতম  অপরাধও করতে পারেন না তিনি। ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, হয়তো ওদের আগামী নিয়ে একটু মানসিক যন্ত্রণাও ছিল তার।’

এমন একজন মহিলাকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে মারাকে আমরা বলছি গণপিটুনি। কি হয়েছে আমাদের আসলে? এখন এটা ভাবার সময় এসেছে। বলবো- না ভাবলে আমাদের আত্মীয় স্বজনদের যে কেউ এমন গণপিটুনির শিকার হতে খুব বেশি দেরি নাই। তখন  আপনি আমি আমরাও চোখের পানি ফেলবো। আর মিডিয়ায় নিউজ হবে স্বজনদের কেউ। আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখছি এর ভেতর সমাজের পচন। গলে যাওয়া সমাজের লাশ।

এখন সবকিছু বলা বা লেখার সময় না। তবু বলবো উন্নয়ন হলেই কি সমাজ বা দেশ এগোয়? সেটা যে হয় না তা বোঝার জন্য খুব বেশি লেখাপড়ার দরকার পড়ে না। সে কথা থাক। এখন আমাদের ভাবতে হবে বাংলাদেশ আসলে কী চায়? কী চায় আমাদের জনগণ? তারা কি এভাবে বাঁচতে আগ্রহী? শুধু শুনি মানুষের মনে রাগ দ্রোহ বা ঘৃণা জমছে। কিন্তু  কই তার তো একটা নমুনাও দেখিনা। মানুষতো কোন ডাকাত, চোর বা দাগী আসামির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না। এই যে রিফাত হত্যা বা বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড তাতে কি দেখলাম আমরা? নিরীহ প্রতিরোধহীন ছেলেগুলো প্রাণ দিল রাজপথে। মানুষ ভিডিও করলো। দেখলো। কেউ কেউ সেগুলো রিলে করারও ব্যবস্থা করলো। কই একজনও তো এগিয়ে আসেনি! সামাজিক মাধ্যমে কান্নাকাটি আর আহাজারি কি আসলে মানুষকে ভোঁতা ও নিস্প্রাণ করে দিচ্ছে? বরং দাগী আসামিগুলো মরেছে চোরাগোপ্তা হামলায়। যার পোশাকি নাম ক্রস ফায়ার। তাদের একজনকেও মানুষ মারেনি বা মারতে পারেনি।

এটা কী প্রমাণ করে? এটা কি চোখে  আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় না যে সমাজ মূলত আসামী বা অপরাধীদের অভয়ারণ্য? তারা নিরাপদে থাকে। নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে। তাদের মরণ ও বৈধ অস্ত্রধারীদের হাতে। আইনের হাতে। আর নিরীহ সাধারণ মানুষ মরছে রাস্তায়। তাও আবার গণপিটুনিতে।

আবারো বলি আপনি আমি চোখ বুজে কোন দৃশ্য কল্পনা করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছি। যে কারণে আমাদের সব অ্যাকশন আর প্রতিক্রিয়া বায়বীয়। বীভৎস নারকীয় ঘটনার এমন সফল চিত্রায়ন যেন শ্যুটিং। মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। ছবি তোলে। আপলোড করে। আর লাইক পায়। খুনী সে গণপিটুনির নায়ক হিসেবে নিরাপদে সে জায়গা ছেড়ে  চলে যেতে পারে। এর নাম অগ্রগতি? মানুষের মন ও মগজ নিয়ে যে সমাজ ভাবেনা বা যার কোন মাথাব্যথা নাই তার উন্নয়ন হলে কি আর না হলেই বা কি?

আমাদের দেশ তো এমন ছিল না। আমরা পাশের দেশ ভারতের পশ্চিম বঙ্গের সাথে নিজেদের তুলনা করে সবসময় মায়া ভালোবাসা প্রীতির কারণে গর্ববোধ করতাম। আমাদের বিশ্বাস ছিল আমরাই ভালোবাসায় এগিয়ে। কিন্তু এখন কী দেখছি? তারা স্বার্থপর হোক আর কৃপণ বা পরিমিত হোক তাদের দেশে এমন ঘটনা ঘটেনা। একটাও না। তারাও কিন্তু বাঙালি। তাদের সাথে আমাদের ধর্ম ভাষা খাবার সংস্কৃতি সব বিষয়ে মিল আছে। কখনো কখনো তা অভিন্ন একাকার। তাহলে তাদের ওখানে এমন উগ্রতা নাই কেন? এ প্রশ্ন আমাদের মনকে করতেই হবে। উত্তর পাবেন। তাদের রাজনীতি ও সমাজ আমাদের চাইতে ঢের বেশি গণতান্ত্রিক। তাদের আইন বা বিচার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করলেও আমাদের মত একপেশে না। খুন বা গণপিটুনি হলে সেখানে নিশ্চয়ই তার বিহিত হয়। আমাদের কি হয়?

আজকাল আর একটা হাস্যকর ব্যাপার ঘটে। খবরে দেখলাম স্থানীয় এমপি নিহত রেনুর মেয়ে তাসনিম তুবার পড়ালেখার দায়িত্ব নিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল। এর মানে কি? গরু মেরে জুতা দান? মা নিহত হলেন কিছু উগ্র মানুষের পিটুনিতে সে মায়ের শিশু কন্যা এখনো বুঝতেই পারছে না তার মা আর নাই। তার লেখাপড়ার দায়িত্ব মানে কী? ফাজলামোর একটা সীমা আছে। এই মেয়েটি কি ভাবে ট্রমা কাটাবে বা কি ভাবে বড় হবে তার খবর নাই ফোঁপরদালালী করে বলা হচ্ছে উনারা পড়াবেন। একবছর পর যখন এই ঘটনা সোশাল মিডিয়া ও মিডিয়া থেকে সরে যাবে বা গুরুত্ব হারাবে তখন তুবা মেয়েটি কি কাজ করে, পড়ে না বেঁচে আছে- সে খবর রাখবেন আপনারা? খামোখা রাজনীতি করার জন্য দরদী সাজার এসব অপপ্রক্রিয়া বন্ধ করুন দয়া করে।

সবার আগে সমাজকে ঠিক করতে হবে। বায়বীয় দুনিয়ায় খালি লাভ ইউ, লাইক ইউ- করতে করতে মানুষ শক্তিহীন হয়ে যাচ্ছে। তার প্রতিবাদ প্রতিরোধের শক্তিও শেষ। তাই আছে খালি পোস্ট দেওয়া। সামাজিক মাধ্যমে সাড়া ফেলে কী হয়? সরকারের টনক নড়ে? নড়ার পর? দু একটা আশ্বাসবাণী আর কদাচিৎ বিচার। বিচার হলেই যে শাস্তি হয় তার গ্যারান্টি দেবে কে? তাই সমাজের সচেতনতা আর রুখে দাঁড়ানো জরুরি। মানুষ যদি রুখে দাঁড়াতো এসব ঘটনা ঘটতো না। মুশকিল হচ্ছে আজকাল মব বা জনরোষের কাছে সবাই অসহায়। হবে না কেন? যে দেশে রাজনীতি পুলিশের মাথা ফাটিয়ে দেয়। পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে নাগরিক আর ঘরে ফেরে না।  রাস্তায় কাউকে ইচ্ছেমত পিটিয়ে মেরে ফেলা যায় সে সমাজে কে নেবে দায়? কার ঘাড়ে কটা মাথা যে জান দিতে এগিয়ে আসবে।

সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি। তাদের কাজ সামাজিক নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করা। তা না হলে উন্নয়ন ভেস্তে যেতে বাধ্য। আমরা দূরদেশে দেখি সমাজ কতটা সংহত। রাতবিরেতে মানুষ কতটা নিরাপদ। আমরা যদি সত্যি উন্নত হতাম আমাদের দেশেও তাই হতো। আমাদের সবকিছু কাগুজে। তাই নিরাপত্তাও এখন কাগজে কলমে থাকে।

আবারো বলি একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন। আপনার স্ত্রী, আপনার কন্যা, আপনার বোন বা ভাইকে কেউ ছেলেধরা সন্দেহ করে পিটাচ্ছে। তার জান বের হয়ে যাবার আগে সে একবার প্রিয়জনদের মুখ দেখার চেষ্টা করছে। তার চোখে ভাসছে বাড়িতে রেখে আসা সন্তানের মুখ। সে রক্তে ভেসে যেতে যেতে মনে করছে এই দেশে তার জন্ম হয়েছিল। এই মাটিতে সে বড় হয়েছে। কত আনন্দ বেদনায় কত মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে। আজ এমন মরণের কালে কেউ এগিয়ে আসছে না। সে কি এইদেশ কে আর্শীবাদ করতে করতে মারা যাবে না অভিশাপ দিতে দিতে? আজকাল এসব ঘটনায় নির্বাক স্বার্থপর মানুষদের দেখে মাটিও হতবাক। আকাশ গোপনে কাঁদে। বাতাস উদাস হয়ে চলে যায়।  এইদেশ মুক্ত করার জন্য যারা জান দিয়েছিলেন, যারা ইজ্জত দিয়েছিলেন- আজো যারা কল্যাণ আর ভালোর যাত্রী তারা নীরবে চোখ মুছে আর মনে মনে বলে- এমন দেশতো আমরা চাইনি।

এ কেমন বাংলাদেশ দেখছি আমরা?

অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

১৫ Responses -- “এ কেমন বাংলাদেশ দেখছি আমরা?”

  1. hamid

    আপনার লেখাটা ভালো লাগলো, শুধু প্রতিবেশী দেশের সাথে তুলনার অংশটা ছাড়া। এখানে যেমন “ছেলেধরা” অজুহাত দিয়ে, ওখানে তেমন “গরুচোর” বা “গো-মাংস ভক্ষক” ওজুহাত দিয়ে অনেক ঘটনা ঘটেছে যেখানে একদল মানুষের ভেতরের পশুটা বের হয়ে এসেছে। এই নৃশংসতা রোধে এখানকার প্রশাসন গত কয়েকদিনে যতটা পদক্ষেপ নিয়েছে, ওখানকার প্রশাসন গত এক বছরেও এরকম কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে আমার জানা নেই। যাই হোক, বাংলাদেশ আপনার মাতৃভূমি (আমার ধারণা) , প্রতিবেশী দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন, অসুবিধা নেই, তবে মাতৃভূমিকে ছোট করে নয়।

    Reply
  2. আশিকুর রহমান

    ভদ্রমহিলা কোন শ্রমিক বা গরীব কেউ না যা তার পোশাক কিংবা আচার-আচরণ দেখে সন্দেহ হবার কথা। – এই লাইনটা পড়ে এর নিচে আর পড়বার রুচি হলো না।

    Reply
  3. Cornell Macbeth

    … “এ কেমন বাংলাদেশ দেখছি আমরা? … ”
    “দাশগুপ্ত বাবু” আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। এটা সেই বাংলাদেশ যেখানে “ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা” প্রতিনিয়ত মৌলবাদীদের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন; এবং এর ফলে ইতিমধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নিখোঁজ (গুম) হয়েছেন।

    *সূত্রঃ The White House Press Corps.

    Reply
  4. মেশকাত হোসেন

    খুনের সময় ও খুনের পরে ক্যামেরা ছিল অসংখ্য। একটি স্বতঃস্ফূর্ত খুনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ এসব ক্যামেরায় রেকর্ড হয়েছে। কেউ কেউ আবার গণপিটুনিতে নির্জীব মানুষটির ছবিও তুলছিলেন ক্যামেরায়। আহা, তাতেও কী কাড়াকাড়ি! আচ্ছা, ওই ছবিগুলো যাঁরা তুলছিলেন, তাঁরা কি বাড়ি ফিরে পরিবারের সদস্যদের তা দেখিয়েছেন? দেখিয়ে কী বলেছেন? —‘এই দেখো, আজ আমি খুন করেছি!’ তাসলিমাকে পেটানো হয়েছে প্রবল ক্ষোভে। সেই ক্রোধের আগুনকে লেলিহান বানিয়েছে ‘ছেলেধরা’ নামের একটি শব্দ। আর তাতেই আমরা সবাই হত্যার মতো একটি গর্হিত ও নিষ্ঠুর কাজের লাইসেন্স পেয়ে গেলাম। বেরিয়ে পড়ল আমাদের জান্তব রূপ। বিজ্ঞানের ভাষায় মানুষও জন্তু। তফাত শুধু বিবেক-বুদ্ধিতে। তবে এই জনপদে বিবেক বেশির ভাগ সময় নাটক-সিনেমায় থাকে। আর আমরা সযত্নে লালন করি ভেতরের শ্বাপদ সত্তা। উপযুক্ত বারুদে তা জেগে ওঠে বটে, তবে গর্জন করে সুবিধা বুঝে। নিজেদের চেয়ে অসহায় কাউকে পেলেই আমরা তা উগরে দিই। অন্যের রক্তে হাত রাঙানো তখন মামুলি ব্যাপার। আমরা নিচেই নামছি। তা নিয়ে আর না ভেবে বরং মেপে ফেলুন কতটুকু নিচে নামলেন। ওটাই ট্রফি।

    Reply
  5. আনিস

    রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিক্কার ছিল।’ বাঙালি দুর্বল, বাঙালি হৃদয়হীন, বাঙালি কর্মহীন, বাঙালি দাম্ভিক, বাঙালি তার্কিক! এটা রবীন্দ্রনাথের আমলে ছিল, এটা এই আমলেও আছে। এই জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের ধিক্কার ছিল, এই সমাজের প্রতি ধিক্কার তুলে নেবার কোনো কারণ নেই! রবীন্দ্রনাথই বলেছিলেন, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি। বাঙালিকে জননী বাংলাদেশ তখনো মানুষ করেনি, এখনো মানুষ করেনি। আমরা এখন পিটুনি দিয়ে মানুষ মারছি। মা গেছেন স্কুলে, শিশুসন্তানকে ভর্তি করাবেন বলে, লোহার রড দিয়ে মেরে মেরে তাঁকে থেঁতলে পিষে ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত করে আমরা ততক্ষণ পিটিয়েছি, যতক্ষণ না তাঁর শেষনিশ্বাস বেরিয়ে যায়। বাড়িতে তাঁর সন্তান অপেক্ষায় থাকে, মা ফিরে আসবেন। মা ফেরেন না। বাবা স্কুলে গেছে ছেলেকে দেখতে, তাঁকে আমরা পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করছি।

    Reply
  6. নাজমুল

    বিভাজিত সমাজের চরম পরিণতি হচ্ছে এই গণপিটুনি। এখানে সবাই সবাইকে সন্দেহ করে। বিশ্বাস এই সমাজে অনুপস্থিত। এখন আর আমাদের সামষ্টিক বলে কিছু নেই। হয় তুমি আমার পক্ষে, নয়তো বিপরীতে। যুক্তরাষ্ট্রের নয়া রক্ষণশীলেরা এই ধারণার বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর হাত ধরে এখন স্থানীয় পর্যায়েও প্রতিফলিত হচ্ছে। খুব সহজেই অন্যকে বিপরীত পক্ষে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে ‘মব জাস্টিস’। পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি করা হচ্ছে। রাজনীতিতে পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি করে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতাই মব জাস্টিসের বিস্তার ঘটায়। রাষ্ট্রের সর্বত্র যখন শত্রু পক্ষ চিহ্নিত হয়, তখন সাধারণ নাগরিকেরা বসে থাকবে কেন। সমাজ অপরাধী চিহ্নিত করা শুরু করে। রাষ্ট্রের প্রতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি নাগরিকের অনাস্থা যখন চরমে ওঠে, তখনই মব জাস্টিসের চর্চা হয়। কারণ নাগরিক তার রাষ্ট্রকেও বিশ্বাস করে না। শঙ্কায় থাকে রাষ্ট্রের কাছে সুবিচার পাওয়া যাবে না।

    Reply
  7. মর্তুজা

    আমার অপ্রকৃতস্থ লাগছে। শুধু ছেলেধরা সন্দেহে মানুষ পিটিয়ে মারছে মানুষ, এই জন্য নয়। আমি পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছি, অসহায় বোধ করছি সামাজিক মাধ্যমে আমার নিজের বন্ধুদের অনেকের বক্তব্য দেখে। আমার যে বন্ধুটি গান করেন, যে বন্ধুটি কবিতা লেখেন, যে বন্ধু টেলিভিশন সাংবাদিকতা করেন, যে বন্ধু মানবাধিকার আন্দোলন করেন, তাঁরা পর্যন্ত লিখছেন, এই রকমের পোস্ট:
    ১. ধর্ষণকারীকে এই রকমভাবে গণপিটুনি দাও।
    ২. অমুকের মুখে দলা দলা থুতু দিই। তার প্রতি শুধুই ঘৃণা।
    ৩. অমুককে রিমান্ডে নিয়ে চিকন বেত দিয়ে পেটাতে থাকো।
    ৪. অমুক অপরাধীকে ক্রসফায়ারে দাও।
    ওপরে আমি যে ধরনের ফেসবুক স্ট্যাটাসের উদাহরণ দিলাম, তাতে আমরা বিচারের আগেই অপরাধী কে, তা শনাক্ত করে ফেলছি, অপরাধের মাত্রা কী তা–ও নির্ধারণ করে ফেলছি এবং অপরাধীর শাস্তি কী হওয়া উচিত, তা–ও বলে দিচ্ছি। আর সেসব শাস্তি নিষ্ঠুর শারীরিক শাস্তি। এই উন্মত্ততার কালে কে বলবে যে, কোনো অপরাধীকেই শারীরিক নিষ্ঠুর শাস্তি দেওয়া যায় না। রিমান্ডে নিয়ে সাত খুনের আসামিকেও প্রহার করা যায় না। বিনা বিচারে কাউকে হত্যা করা যায় না, শাস্তি দেওয়া যায় না, বিচারের রায় না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপরাধীও বলা যায় না। আমরা যখন দেশপ্রেমের দৃষ্টিকোণ থেকে কাউকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করে তার মুখে দলা দলা থুতু দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে দেয়ালে লিখে প্রচার করি, সেই মানসিকতাই ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে ছড়ায় জিঘাংসা হয়ে, রিরংসা হয়ে; সমাজে গণপিটুনি হয়; গণধর্ষণ হয়। এ আমার পাপ, এ তোমার পাপ।

    Reply
  8. শুভ্র

    গণপিটুনির প্রয়োজনীয়তা আর ক্রসফায়ারের অনিবার্যতা এক নয়।

    আমার মনে হয় পুলিশের উপর থেকে আস্থা ওঠার ফলেই এইভাবে গণপিটুনি দিয়ে আইন নিজের হাতে নেয়, যা অনুচিত। পুলিশ টাকা খেয়ে অপরাধীদের ছেড়ে দেয় বলে গণপিটুনি নামক অস্ত্র মানুষ ব্যবহার করছে। অনেকের আবার ধারনা গণপিটুনিতে যা কিছু করা যায়, মারা গেলেও ক্ষতি নাই, যা ভুল।

    পত্রিকা ও সংবাদে হত্যাগুলোকে গণপিটুনি দিয়ে অবহিত করে এমনভাবে ফলাও করে যেন এটা কোন অপরাধই নয়। এরা গণপিটুনিকে প্রকারান্তরে উৎসাহ দেয় বিভিন্নভাবে। সাম্প্রতিক সময়ে যে হত্যাগুলো হয়েছে সেগুলো গণপিটুনি নয়, সংগবদ্ধ হত্যাকাণ্ড। প্রত্যেককে আইনের আয়তায় এনে কঠিন বিচার করে পুরো জাতির জন্য একটা উদাহরণ তৈরী করার আহ্বান জানাচ্ছি।

    Reply
  9. সজল কান্তি

    দাদা
    কেমন বাংলাদেশ আপনি আশা করেন ? প্রত্যেকটা সরকারী স্বায়ত্বশাষিত এমনি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। বিচারহীনতা, ব্যাংক লুট, সর্বক্ষেত্রে দূর্নীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস, নির্বিচারে প্রশাসন দলীয়করণ, অক্ষম অকার্যকর রাষ্ট্র। এ অবস্থায় সোনার বাংলা আশা করেন কিভাবে? দেশটা এখন আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে আছে। কোন অংগ ঠিক মতো কাজ করছে না!

    Reply
    • সৈয়দ আলি

      সজল কান্তি, আপনার সাথে সম্পুর্ন একমত। মূল কথাগুলো না বলে ধানাপানাই নাটুকে কথা বলে সমস্যা আড়াল করা হচ্ছে। দেশে আইনশুন্যতা বা মুখ চিনে আইনের প্রয়োগই অপরাধীদের নির্ভয় করে তুলছে।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—