মাধরুভাগান (অন্যঅংশ নারী) উপন্যাস- এর রচয়িতা তামিল লেখক পেরুমল মুরুগন। সন্তানহীন দম্পতিদের সন্তান কামনার আশাপূরণে অপরিচিত পুরুষের সাথে সম্মতির ভিত্তিতে যৌন সংসর্গের যে আবহমানের লোকাচার স্থানীয় ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত, তার প্রেক্ষিতে এক সন্তানহীনা নারীর চিরন্তন দ্বিধা ও দোলাচলের সংবেদনশীল চিত্রায়ণ করেছিলেন লেখক পেরুমল মুরুগন মাধরুভাগান উপন্যাসে।

তামিলনাড়ুর নামাক্কাল জেলার তিরুচেঙ্গোদে শিবের অর্ধনারীশ্বর মূর্তির পূজা উপলক্ষে এই যৌন সংসর্গের আয়োজন। জেলার অনগ্রসর জাত কোঙগু ভেল্লালা-র গোত্র প্রধানদের অপছন্দ হওয়ায় ক’বছর আগে প্রকাশিত তার উপন্যাস মাধরুভাগান-এ বর্ণিত এই আখ্যানের কারণে তাকে চরম হয়রানি-হেনস্থা করা হচ্ছিল। ‘আপত্তিকর’ অংশটি উপন্যাস থেকে বাদ দেওয়া, ভবিষ্যতে বিতর্কিত কিছু না লেখার মুচলেকা সই করেও তার রেহাই মেলে নাই। তার উপন্যাস পোড়ানো হয়, নামাক্কাল শহরে হরতালও পালিত হয়। জেলা-প্রশাসনও গোলযোগকারীদের পরিবর্তে লেখককেই আপস করতে চাপ দেয়। মুরুগন তার এ যাবত প্রকাশিত যাবতীয় লেখালেখি ‘প্র্রত্যাহার’ করেন, প্রকাশকদেরও তা বিক্রি করতে মানা করেন। অসহিষ্ণু হিন্দুত্ববাদিদের ধারাবাহিক আক্রমণ ও অপমানে এক সংবেদনশীল তামিল লেখক অভিমানে নিজের ‘মৃত্যু’ ঘোষণা করলেন এভাবেই। এই ‘মৃত্যু’ লেখক হিসাবে নিজের আত্মহননের ঘোষণা।

স্থানীয় সমাজপতিদের ধারণা, পেরুমল মুরুগন তার উপন্যাসে এই গোপন লোকাচারের কথা প্রকাশ করে অনগ্রসর জাতের সমাজকে অসম্মান করেছেন। এর প্রায়শ্চিত্ত হিসাবেই তাকে বিতর্কিত অংশ বাদ দিতে হবে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই অনাসৃষ্টির সাথে বিজেপি কিংবা আরএসএসের প্রাদেশিক নেতৃত্ব কোনও ভাবে নিজেদের না জড়ালেও, স্থানীয় সংগঠনগুলি প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় থেকেছে। অধুনা এই জাত-গর্বী অসহিষ্ণুরাই ক্রমে শক্তিশালী হয়ে চোখ রাঙ্গাচ্ছে। এই ঘোষণা শোনা যাচ্ছে যে, হিন্দু ভাবাবেগে আঘাতকারী কোন লেখক তামিলনাড়ুতে ঠাঁই পাবে না।

পাশ্চাত্যে যখন ব্যঙ্গপত্রিকা ‘শার্লি এবদো’-র উপর অসহিষ্ণু ধর্মোন্মাদদের নৃশংস হত্যালীলার বিরুদ্ধে ধিক্কারে বিশ্বের কোটি-কোটি মানুষ ঐক্যবদ্ধ, তখনই পাশ্চাত্যের তুলনায় পশ্চাত বলে ভারতের তামিলনাড়ুর নামাক্কাল জেলায় অসহিষ্ণু হিন্দুত্ববাদীদের ধারাবাহিক আক্রমণ ও অপমানে এক সংবেদনশীল তামিল লেখকের ‘মৃত্যু’ ঘোষণা তেমন অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারেনি।

কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং অপছন্দের মতকে চাপা দেয়া কিংবা তার পোষণকারীদের দমন করার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা কেবল যে শাসক শ্রেণিরই একচেটিয়া, এমন নয় বরং যে-কোনও সঙ্ঘবদ্ধ গোষ্ঠী এখনো সামাজিক স্তরে এই ধরনের হিংসাত্মক দাপট দেখিয়ে চলেছে।

ডেনিশ পত্রিকা জিল্যান্ডস-পোস্টেনে মহানবী (সা:)-এর কার্টুন ২০০৫ সালে প্রথম যখন প্রকাশিত হয়, তখন বিশ্বের নানা প্রান্তে, বিশেষ করে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোয়, প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ৫০ জনের মতো মানুষের প্রাণহানি ঘটে বিভিন্ন দেশে।

শার্লি এবদোকে সেই একই পথের অনুসারী আখ্যায়িত করা অতিরঞ্জন মনে হবে না কারণ তারা বছরের পর বছর ধরে ইসলাম ধর্ম, ইসলামের মহানবী (সা.) এবং ধর্মীয় আচরণ নিয়ে অশ্লীলতাপূর্ণ কার্টুন ছেপে ফ্রান্সের সংখ্যালঘু মুসলমানের মনে আঘাত দিয়ে আসছে। নিজেদের ধর্মের নানা আচার উপাচার নিয়েও তারা বিভিন্ন সময় কার্টুন ছেপেছে শার্লি এবদো ।প্যারিসে ব্যঙ্গ পত্রিকা শার্লি এবদোর দপ্তরে দুই জঙ্গিবাদী ইসলামপন্থীর হামলায় ১০ জন কার্টুনিস্ট সাংবাদিক এবং পুলিশের দুই সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা সারাবিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল ।

পত্রিকা যাই লিখুক আর প্রচার করুক তা আপনার-আমার যত অপছন্দেরই হোক না কেন, সেটাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য ভয়ংকর সব আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এর দপ্তরে হানা দিয়ে হত্যাকাণ্ড চালানো কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হতে পারে না। এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দায় ফরাসি ভাষার ঘোষণা ‘জে সুই শার্লি’ আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে ‘আমি শার্লি ’ উচ্চারণ করে প্রটেস্ট র‌্যালি নিয়ে পথে নেমেছিল বিশ্ববিবেক প্যারিস থেকে ফ্লোরেন্স, কোলন থেকে ব্রাসেলস।

দেশে দেশে জনগণের এমন স্বতঃস্ফূর্ত সহমর্মিতা যে বার্তা পৌঁছায় তা হলো, আমরা সবাই শার্লি এবদোর পক্ষে। যদিও সাপ্তাহিক সেই পত্রিকা কার্টুন স্যাটায়ারের আড়ালে সমাজের বিভক্তি ও অসঙ্গতি তুলে আনার সাথে সাথে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে খোঁচা দেওয়ার যে চর্চা তা সমর্থন করছি এমন সরলীকরণ হলে বিপদের কথা।

কারণ মত প্রকাশের স্বাধীনতারও একটা সীমা থাকা উচিত, এমনটা মনে করেন পোপ ফ্রান্সিসও। শার্লি এবদো হত্যাকাণ্ডের দিন কয়েক পর শ্রীলঙ্কা থেকে ফিলিপিন্স সফরে যাওয়ার পথে ক্যাথলিক মিরর, রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার দেন পোপ। শার্লি এবদো নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতার মানে কারো ভাবাবেগকে আঘাত করা বা কারো ধর্মবিশ্বাস নিয়ে ব্যঙ্গ করার স্বাধীনতা নয়।’

পোপের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আলবার্তো গ্যাসপারি। পোপের নানা সফর আয়োজন করেন তিনিই। তাকে দেখিয়ে পোপ ফ্রান্সিস বলেন, ‘এই যে আমার বন্ধু গ্যাসপারি। যদি উনি আমার মায়ের নামে কোনো খারাপ কথা বলেন, তা হলে একটা ঘুষি অবশ্যই ওনার প্রাপ্য। সেটা স্বাভাবিক নয় কী!’ তার কথায়, ‘কাউকে খুঁচিয়ে তোলা উচিত নয়। অন্যদের বিশ্বাসকে অপমান করার অধিকার কারো নেই। কারো ভাবাবেগ নিয়ে মশকরা করা যায় না।’

যদিও প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ঈশ্বরের নামে খুনোখুনির পক্ষপাতী তিনি নন। পোপের কথায়, ‘ঈশ্বরের নাম করে কাউকে আঘাত করা, যুদ্ধ করা বা খুনোখুনি কখনোই সমর্থন করা যায় না। এটা প্রত্যেক ধার্মিকই জানে।’

সাধারণ ধার্মিক মুসলিমরাও যে জঙ্গিদের বিরোধী তা স্মরণ রাখতে বলেন পোপ। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের উস্কানির ফলে মর্মাহত হয়ে ধার্মিক ব্যক্তি জঙ্গিবাদের সমথর্কে পরিণত হতে পারে।’ প্রসঙ্গত, পোপ ফ্রান্সিসকে নিয়েও বেশ কিছু ব্যঙ্গচিত্র ছাপা হয়েছে শার্লিতে। কিন্তু তা নিয়ে তিনি কখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেখুন, কেউ আমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করলে ক্ষমা করার অধিকার আমার আমার আছে। কিন্তু যিশুখ্রিস্টকে নিয়ে ব্যঙ্গ করলে কোটি কোটি খ্রিস্টান একইভাবে মর্মাহত হবে।’

লেখক চান কোনো বাধা ছাড়াই তার নিজস্ব উপলব্ধির কথা তিনি বলবেন, তবে তাকে সচেতন থাকতে হবে যে, মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের শর্তও জড়িত। স্বাধীনতা তত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, যত দূর পর্যন্ত প্রসারিত হলে তা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে না। চিন্তার ও মতের ভিন্নতা তিনি সহ্য না করে প্রতিপক্ষের অবস্থানকে তিনি উপহাস ও কটূক্তিমূলক আক্রমণে জর্জরিত করবেন-এমনটি অনভিপ্রেত। কারণ এমন অবিবেচনা প্রসূত স্বাধীনতা চর্চার পরিণাম হবে চিন্তা ও মত প্রকাশের জন্য অরাজকতা সৃষ্টির অন্যরূপ।

কোনো ব্যক্তি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার উসকানি বা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো সাংবাদিকতার নীতিবিরুদ্ধ বলেই বিবেচনা করা হয়।যে ধরনের সংবাদ বা পরিবেশনা নিরীহ মানুষের জীবনহানির কারণ ঘটাতে পারে, তা প্রকাশ করা দায়িত্বশীলতার পরিচয় বহন করে না।বিবেক ও অরাজকতার চর্চা পাশাপাশি চলতে পারে না। স্বাধীনতা মানেই দায়িত্ব সচেতনতা- এটা সব সংবাদপত্রেরই মৌল নীতি।

ইউরোপীয় অধিকাংশ দেশেই সম্প্রতি একটি আইন পাস করা হয়েছে- যার ভাব হচ্ছে, খ্রিস্টধর্ম বা সার্বজনীন কোনো প্রতীককে বিতর্ক-সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত করে কোনো লেখক, রচয়িতা কোন কিছু প্রকাশ করতে পারবে না,যদি করেন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর শাস্তি বরণ করতে হবে।

মত প্রকাশে পাশ্চাত্য যে স্বাধীনতা ভোগ ও প্রয়োগ করছে তাতে মুসলিমদের কোন আপত্তি নাই। আপত্তি তখনই যখন তথাকথিত বাকস্বাধীনতার নামে ইসলাম বিদ্বেষের অবাধ চর্চা করা হয়। এই প্রবণতা দেখে নোয়াম চমস্কি বলেছিলেন- ব্যঙ্গচিত্র ও বিদ্রুপাত্মক রচনায় পাশ্চাত্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষী ও বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব বরাবর প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশ করে আনন্দ পায়। কিন্তু ইসরাইল ও ইহুদী নিয়ে এই ধরনের ব্যঙ্গাত্মক রচনার বিনিময়ে পশ্চিমা কার্টুনিস্টরা পাশ্চাত্য জনগণের বা নেতৃত্বের আক্রমণ থেকে রেহাই পান না। ইসরাইলি ও ইহুদিদের সঙ্গত সমালোচনা করার অপরাধে লেখক ও প্রকাশকেরা পাশ্চাত্যে কতখানি বিপাকে পড়তে পারেন তার এক নজিরের সাথে খোদ শার্লি এবদোর নামও জড়িয়ে আছে।

ওই পত্রিকায় কথিত ইহুদি ধর্মকে অবমাননার জন্য ক্ষমা না চাওয়ায় মরিস সান নামের এক প্রবীণ কার্টুনিস্টকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। ইহুদি ধর্মের প্রতি নূন্যতম ব্যঙ্গ বা সমালোচনা যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাসকে আঘাত করে নবীদের নিয়ে বিদ্রুপাত্মক কাজ গ্রহণীয় হওয়ার প্রশ্নই উঠে না।

আপাত এক মেরু বিশ্বে পশ্চিমের শত্রুুর জায়গা নিয়েছে অথবা শত্রুুর জায়গায় বসানো হয়েছে ইসলামকে। একদা ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসলামকে হনন করতে আয়োজনের শেষ নাই। কখনো সামরিক কখনো মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্র দিয়ে। যদিও হনন নয় বরং সকলের সহবস্থানই নিশ্চিত করবে শান্তি ।

এম এম খালেকুজ্জামানআইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

Responses -- “মুক্তমত বাধাগ্রস্ত প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সর্বত্র”

  1. আহমেদ শাহিন

    সুমন,

    ভাই, উপরের মন্তব্যটি করেছিলাম খালেদ সাহেবের জবাবে। উনি সংগত কারণ ছাড়াই বিশাল একটা মন্তব্য করে বসেছেন।

    আপনাকে বলছি, না, হজরত এটা করতে পারেন না। কোনো ধর্ম মিথ্যা তা প্রমাণের জন্য তাদের কিছু ভাঙচুর করা আধুনিক মানবিক চিন্তা অনুসারে কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা ইচ্ছামত সমালোচনা, ব্যঙ্গ, কার্টুনের মাধ্যমে হতে পারে, কোনো সমস্যা নাই। এখন আপনি যা বললেন সে ধরণের উদ্যোগ কি মনে হয় না আপনার ধর্মের বিরুদ্ধে নেয়া সম্ভব? একটু ভেবে বলেন তো? কেউ আপনার ধর্মের পবিত্র কিছু ধ্বংস করে যদি দাবি আপনার ধর্ম অসার তবে কেমন হয়?

    Reply
  2. আল মামুন

    বাংলাদেশে হিন্দুনিন্দার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ বা নিষেধাজ্ঞা নেই৷

    Reply
  3. আহমেদ শাহিন

    লেখক পুরোপুরি পস্পরবিরোধী মত দিয়েছেন। কখনো তিনি মত প্রকাশের নৈতিকতা পোপের কাছ থেকে ধার করেছেন, কখনোবা নোয়াম চমস্কি।

    পোপের প্রাচীনপন্থী নৈতিকতা কোন উন্নত নৈতিকতা নয়। কোন কিছুর প্রতি মানুষের গভীর আবেগ বা গভীর বিশ্বাস থাকলে বরং একে অধিক সমালোচনার প্রয়োজন হয়। যেকোন বিশ্বাস বা মতকে যেকোন উপায়ে সমালোচনার অধিকার সবারই থাকা উচিত, এজন্য হামলা করাকে, হুমকি দেয়াকে সমর্থন করা যায় না।

    //ইউরোপীয় অধিকাংশ দেশেই সম্প্রতি একটি আইন পাস করা হয়েছে- যার ভাব হচ্ছে, খ্রিস্টধর্ম বা সার্বজনীন কোনো প্রতীককে বিতর্ক-সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত করে কোনো লেখক, রচয়িতা কোন কিছু প্রকাশ করতে পারবে না,যদি করেন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর শাস্তি বরণ করতে হবে।//

    – অসত্য তথ্য। ইউরোপের দুয়েকটা দেশে অতীত থেকে চলে আসা এ ধরণের কিছু আইন নামেমাত্র রয়ে গেছে, এগুলো ধীরে ধীরে বাতিল করা হচ্ছে।

    Reply
  4. খালিদ

    ইতিহাস একথা স্পষ্ট সাক্ষী দেয় যে, মদিনা প্রজাতন্ত্রের জনগণ নির্বিঘ্ন ও নির্ভয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও চার পুণ্যবান খলিফার সামনে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারতেন। মহানবীর (সা.) অভ্যাস ছিল যে, বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সাহাবায়ে কেরামের মতামত নিতেন এবং মত প্রকাশে উৎসাহিত করতেন। ওহুদের যুদ্ধের সময় মহানবী (সা.) এবং বিশিষ্ট সাহাবাদের মত ছিল মদিনা শহরের অভ্যন্তরে অবস্থান করে শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া; কিন্তু হজরত হামজাহ (রা.) এবং অপেক্ষাকৃত যুবক সাহাবারা শহরের বাইরে কোনো উন্মুক্ত প্রান্তরে গিয়ে যুদ্ধ করার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের এই মতামত গ্রহণ করে ওহুদের প্রান্তরে কোরাইশদের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। একদা মহানবী (সা.) যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করছিলেন। একজন বলে ওঠেন, ‘গনিমতের বণ্টন আল্লাহর ইচ্ছার পরিপন্থী হয়েছে।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধু জবাব দিলেন, ‘আমি যদি ইনসাফ না করি তাহলে ইনসাফ করবে কে?’ কিন্তু ভিন্ন মত পোষণকারীদের মুখ বন্ধ করে দেননি। হজরত জুবায়ের (রা.) এবং আনসারীর মধ্যে সৃষ্ট বিরোধের এক মামলা বিশ্বনবীর (সা.) আদালতে প্রেরিত হয়। সাক্ষী-প্রমাণ ও তথ্যাদি যাচাই করে বিশ্বনবী (সা.) হজরত জুবাইরের অনুকূলে রায় প্রদান করেন। কিন্তু আনসারী ক্রোধান্বিত হয়ে মন্তব্য করেন, ‘আপনি ফুফাতো ভাইয়ের পক্ষে রায় দিলেন।’ এটা ছিল বিশ্বনবীর (সা.) সততা ও ন্যায় ইনসাফের প্রতি খোলা চ্যালেঞ্জ; কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে ক্ষমা করে দেন। ভিন্নমতের জন্য কোনো শাস্তি দেননি। এক যুদ্ধ অভিযানের সময় মহানবী (সা.) মুসলমানদের হুকুম দিলেন যে, অমুক অমুক জায়গায় তোমরা শিবির স্থাপন করো। এক সাহাবি জানতে চাইলেন এই হুকুম আল্লাহ প্রদত্ত ওহি, না আপনার ব্যক্তিগত অভিমত? রাসূল বলেন, এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। সাহাবি উত্তর দিলেন অমুক জায়গা শিবির স্থাপনের উপযোগী নয় বরং এর পরিবর্তে অমুক অমুক স্থান শিবির স্থাপনের উপযোগী এবং সহায়ক। আল্লাহর রাসূল নিঃসঙ্কোচে সাহাবির এই অভিমত মেনে নেন।
    ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) মতামতের স্বাধীনতা অনুমোদন করে জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাকে অনুসরণ করো যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করব। যদি আমি গোমরাহির পথে পরিচালিত হই তবে তোমরা আমাকে সঠিক পথের দিশা দেবে।’ হজরত ওমর (রা.) ক্ষমতায় থাকাকালীন বক্তৃতারত অবস্থায় মদিনার জনগণকে বলেন, ‘আমি যদি ভুল পথে পরিচালিত হই তখন তোমরা কী করবে?’ তাৎক্ষণিকভাবে একজন উত্তর দিলেন, ‘এই তরবারি দিয়ে সোজা পথে নিয়ে আসব।’ পরমতসহিষ্ণুতার এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে দুনিয়াবাসী অভিভূত হয়েছে। হজরত ওমরের (রা.) খিলাফতকালে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রাদেশিক গভর্নরের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মতামত ও অভিযোগ পেশ করতে পারতেন। যে কোনো নাগরিকের ভিন্নমত প্রকাশে বাধা দেয়া হতো না। হজরত আমর ইবনে আস (রা.), হজরত মুগিরা ইবনে শোবা (রা.), হজরত আবু মুসা আশয়ারি (রা.) ও হজরত সা’দ ইবনে ওয়াক্কাসের (রা.) মতো খ্যাতনামা প্রাদেশিক গভর্নরদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো হজরত ওমর (রা.) প্রকাশ্যে জনসমক্ষে শুনানি করতেন।
    ওয়াসাক রুমী নামের এক খ্রিস্টান ক্রীতদাস বহু বছর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমরের (রা.) কাছে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি হজরত ওমর ইবনে খাত্তাবের (রা.) ক্রীতদাস ছিলাম। তিনি আমাকে বলতেন, মুসলমান হয়ে যাও, যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করো তাহলে আমি তোমাকে মুসলমানদের আমানতদারীর কোনো দায়িত্ব অর্পণ করব।’ কিন্তু আমি ইসলাম কবুল করিনি। এতে হজরত ওমর (রা.) বলেন, ‘লা ইকরাহা ফিদ্দিন।’ (ধর্মের ব্যাপারে জোর-জবরদস্তি নেই)। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি আমাকে মুক্ত করে দেন এবং বলেন, ‘তোমার যেখানে ইচ্ছে সেখানে চলে যেতে পারো।’ (আবু উবাইদ : কিতাবুল আমওয়াল, পৃ. : ১৫৪)। এ ঘটনা প্রমাণ করে, ইসলামের অপরাপর জনগোষ্ঠীকে দাওয়াত দেয়ার নিয়ম আছে; কিন্তু জোর করে ধর্মান্তরিত করার বিধান নেই_ হজরত ওমরের এই সহনশীল ঘটনাই তার দৃষ্টান্ত।

    Reply
    • আহমেদ শাহিন

      হজরত যখন মক্কা বিজয় করেছিলেন তখন কাবার ভেতরের সবগুলো মূর্তি ধ্বংস করে ফেলেন, এই মূর্তি ভাঙ্গাকে আজও অনুসরণ করে অসংখ্য মুসলমান।

      হজরত পারতেন মূর্তিপূজারীদের জন্য আলাদা একটা উপসনাস্থল তৈরি করে দিতে।

      Reply
      • সুমন

        আমাদের নবী (সঃ) এটা করেছিলেন এটাই প্রমাণ করতে যে মুর্তিদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই।
        আর বর্তমানে মুসলিম হয়েও যারা অন্যের ধর্ম পালনে বাধা দেয় তারা সত্যিকার মুসলিম কিনা সেটা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই ভাল বলতে পারবেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্য ও সঠিক বুঝার ও আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—