দারুণ এক অসহিষ্ণু সময় পার করছি আমরা। সমাজে বৈষম্য, খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন, নিপীড়নের ঘটনা আগেও ছিল। এটি নতুন কিছু নয়। আগে দেশের কোথায় কী ঘটল তা জানার জন্য অন্তত একদিন অপেক্ষা করতে হতো, এখন হয় না। অতীতে পরের দিনের খবরের কাগজ হাতে পাওয়ার আগে দেশের কোথায় কী হচ্ছে, এমনকি একই শহরের বড় কোন ঘটনাও অজানা থেকে যেত। সাধারণের কাছে সেই অপেক্ষা ছিল  অন্তত একটি দিনের। এরপর সেটা নিয়েই সারাদিনের আলোচনা— ঘরে, অফিসে, চায়ের দোকানে, মাঠে, আড্ডায়। কিছুদিন চলত সেই ঘটনার ফলো আপ। তারপর হয়ত আবার নতুন ঘটনা। এখন সময়টা অনেক বেশিই গতিশীল। কোথায় কী ঘটছে তা জানার জন্য পত্রিকা তো দূরের কথা, টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজেরও অপেক্ষা করতে হয় না। যা কিছু ঘটছে সব সরাসরি সম্প্রচার সোশ্যাল মিডিয়ায়। আর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন যে যার মত । অর্থাৎ একটি অপরাধ দৃশ্য আপনি লাইভে তো দেখছেনই সেই সাথে জানাচ্ছেন প্রতিক্রিয়া, হয়ত অপরাধ তখনো চলমান।

একজন রেণুকে— একজন মাকে মেরে ফেলা হল পিটিয়ে। রিফাতকে মেরে ফেলা হল কুপিয়ে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শত শত মানুষ। ঘটনার সাক্ষ্য প্রমাণ আছে বহু লোকের হাতে হাতে, পকেটে পকেটে, মোবাইলে মোবাইলে।

এত প্রমাণ থাকার পরও বিচার নিয়ে শংকিত কেউ কেউ। অনেকেই বলছেন বিচারহীনতার কথা। অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন সুবিচার বা দ্রুত বিচার অথবা কোন কোন ক্ষেত্রে বিচারই নিশ্চিত করতে পারছে না তখন এটাই নিয়তি। মানে ‘মব জাস্টিস’ অনিবার্য। কী ভয়াবহ একটা বিষয়!

মনে আছে প্রথম যখন র‍্যাব গঠন হল এর পরে পরে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি একটি নতুন শব্দ হিসেবে দেখা দিতে থাকল দৈনিকের পাতায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো নড়েচড়ে বসল। জোর প্রতিবাদ, নিন্দা চলতে থাকল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেমিনারে, কর্মশালায়, দেশে বিদেশে মানবাধিকার সভায়, কখনোসখনো রাজপথে প্রতিবাদে। কিন্তু সেখানে কি সমাজের একেবারে সাধারণের উপস্থিতি ছিল? বরং সাধারণ একসময় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে একটি একটি অপরাধীর সংখ্যা কমে যাওয়ায়। আর এভাবেই ধীরে ধীরে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ রোজকার আবহাওয়ার সংবাদের মতই একটি সাধারণ সংবাদ হয়ে গেল পত্রিকার পাতায়। এই সাধারণের গ্রহণযোগ্যতার মাঝেও নিশ্চয়ই কেউ কেউ দারুণভাবে ব্যথিত হয়েছিল। অনেক পরিবার গুমরে গুমরে কেঁদেছে প্রিয় সন্তানের, প্রিয় পিতার বা প্রিয়জনের বিনা বিচারে মৃত্যুতে। বলা বাহুল্য, সাধারণ জনগণের এতে কিন্তু বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ কখনো ছিল না। বরং এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীর মৃত্যুতে মিষ্টি বিতরণের মত ঘটনাও প্রচুর ঘটেছে। অথচ কখনো একটি সুষ্ঠু তদন্ত রিপোর্টের দেখা মেলে নাই যে কেন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাল্টা গুলি পায়ে না লেগে বুকে, পেটে বা মাথায়ই লাগে। তবে কি জনগণের কাড়ি কাড়ি টাকায় তাদের সুষ্ঠু প্রশিক্ষণ হয় নি? সমস্যাটা সেখানে নয়।

আমাদের ভেতর অদ্ভুত একটা দায় চাপানোর সংস্কৃতি আছে। রাষ্ট্রকে দায়ী করা সহজ। গুজবের ঘটনা কী এই প্রথমবার ঘটেছে? নিশ্চয়ই নয়। চোর/পকেটমার পিটিয়ে মেরে ফেলা মোটামুটি একটি সাধারণ ঘটনা এই সমাজে। দারুণ বীরত্ব দেখানো যায় ছিঁচকে চোর পিটিয়ে মেরে ফেলে। নিশ্চয়ই চোরটিকে আটকের পর আর বলপ্রয়োগের প্রয়োজন থাকে না। এর পরের দায়িত্ব হওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের আইন-বিচার ব্যবস্থার শরণাপন্ন হওয়া। কিন্তু এই সমাজের সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যন্ত বিচার ব্যবস্থাকে ঘৃণা করেন। সমস্যা গোটা সমাজের অপরাধপ্রবণ মানসিকতায়; মানবিকতার আড়ালে নিষ্ঠুরতার পরস্পরবিরোধী সহাবস্থানে; মনের কোণে ক্ষমতাহীনতার আক্ষেপে। অর্থাৎ সুযোগ পেলেই সেই নিষ্ঠুর ক্ষমতালিপ্সু স্বত্তার আত্মপ্রকাশে বিন্দুমাত্র বিলম্ব হয় না। এই সুযোগসন্ধানী জনতা আছে সবখানে। সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে।

এই সুযোগসন্ধানী, বিচার বিবেচনাহীন লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের হাতেই খুন হয়েছে বিশ্বজিৎ, খুন হয়েছে রিফাত শরীফ, খুন হয়েছে তাসলিমা রেণু, খুন হয়েছে খবরের শিরোনামে না আসতে পারা আরও বহুজন। সংবিধান বলে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কাজেই নিরাকার এই রাষ্ট্রকে দায় দিলেই বাড়ি ফিরে চোর পেটানোর বড়াই করা যায়। কিন্তু অধিকারের ধারণার একটি অন্যতম  গুরুত্বপূর্ণ নীতি হারিয়ে যায়— প্রতিটি অধিকারের সাথে যে একটি করে দায়িত্ব আছে সেটা আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

এই দায়িত্ববোধের শিক্ষা কে দেবে? কীভাবে শিখবে এমন একটা অসহিষ্ণু সমাজে বাস করে? এই শিক্ষাগুলো হওয়ার কথা ছিল পরিবারে, প্রাথমিক বা বড়জোর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। অথচ পরিবার ব্যস্ত সার্টিফিকেট আর ফলাফল নির্ভর শিক্ষা নিশ্চিতে আর বিদ্যালয় ব্যস্ত আছে আজ সৃজনশীল, কাল পিএসসি-জেএসসি কোচিংয়ে। মূল্যবোধের শিক্ষা নেই কোথাও। সহনশীলতার জায়গা জুড়ে রয়েছে আদিম ক্ষমতালিপ্সু মন। সহমর্মীতা-সহযোগিতার জায়গা কেড়ে নিয়েছে জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা।

ফলাফল একবিংশ শতকে এসেও আমরা মনে মনে লালন করে চলেছি মধ্যযুগীয় নির্মমতা। ভুলে গেলে চলবে না একটি রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারন করে তার সাধারণ জনগণ।

সারওয়াত শামীনঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। পড়াশোনা করেছেন হলি ক্রস স্কুল ও কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর গবেষণার বিষয় সংবিধান, আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তন আইন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার এবং টেকসই  উন্নয়ন।

Responses -- “তাহলে রাষ্ট্রের কোন চরিত্র নির্ধারণ করছি আমরা?”

  1. আসাদুজ্জামান

    “জনগণ, রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে” এ তথ্য কোথা থেকে পেয়েছেন?
    এরিস্টটলকে যদি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে মানেন তবে এটা মানতে হবে যে রাষ্ট্র‌ই নির্ধারণ করে তার জনগণের চরিত্র কেমন হবে।
    জনগণ অপরাধ করলেও, রাষ্ট্র সেই অপরাধ তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করে..

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—