গত কয়েক মাস ধরে নানান পেশার মানুষের সঙ্গে মেশার বেশ সুযোগ হচ্ছে। আনন্দও পাচ্ছি। কারণ, এদের অনেকের সঙ্গে আগে বেশ সখ্যতা ছিল। কেউ বড় ভাই হিসেবে শ্রদ্ধা করত, কেউ আঙ্কেল ডাকত। এদের অনেকে সবজি বিক্রেতা, অনেকে রাস্তার পাশে বসা দৈনন্দিন কাপড়-চোপড় বিক্রেতা, কেউ ফল বিক্রেতা, কেউ গ্রোসার, কেউ ডিম বিক্রেতা, কেউ বা মুড়ি বিক্রেতা, ফুচকা বিক্রেতা এমনি নানান ধরনের মানুষ। তেমনি সুযোগ হয়েছে ঢাকার আশপাশের গ্রামের মানুষের সঙ্গে মেশার। আবার বাড়তি লাভও হয়েছে, মেঘলা দিনে গ্রামের সবুজ বিলে মেঘের শ্যামল রঙের ছায়া দেখা। মাথার ওপর মেঘলা আকাশ রেখে বুক ভরে শ্বাস নেয়া। আসলে দীর্ঘ দিনের বন্দি জীবন থেকে একটি মুক্তির জীবন খুঁজছি, তাই মনকে আগেই মুক্ত করে দিয়েছি। হয়ত রবীন্দ্রনাথের মতো অতটা নিতে পারেনি যে, ‘সবলে কারেও ধরি নে বাসনামুঠিতে’। তার পরেও নিজের মুঠি আলগা করতে শিখছি। যদিও নিজের কথা তার পরেও বলি, হয়ত রবীন্দ্রনাথকে অতটা জীবনে ধারণ করতে পারিনি, লালনকে শতভাগ ধারণ করতে পারিনি। তবে তার পরেও শিখেছি, সংসারে থেকেও কিছুটা বাউল থাকতে হয়। সংসারের বাসনাগুলো যেন শতভাগ জড়িয়ে না ধরে। এতে হয়ত অর্থ মেলে না, অর্থের অভাব হয় জীবনে- তার পরেও সুখ মেলে। সুখী হওয়া যায়। যা হোক, যে বিষয় নিয়ে লিখতে বসেছিলাম সেখানে ফেরা যাক। হঠাৎ করে দু-চারটা ভিন্ন কথা এসে গেল, যেমন করে হঠাৎ কোন কোন বনফুল ফোটে রাস্তার ধারে। এ কথাগুলো তেমনি এসে গেল।

ওই যে বলছিলাম, ঢাকার থেকে বের হয়ে গ্রামের পাশে গিয়ে বিলের ধারে দাঁড়িয়ে মেঘলা আকাশের নিচে শ্বাস নিয়েছি বুক ভরে। কিন্তু সেখানেও স্বাদ মেটেনি। অমন জায়গায় যে বিনা কাজে যাওয়া যায়, হয়ত সে কথা ভাবতে ভুলে গেছে এখনকার গ্রামের মানুষ। এখন হয়ত আর বিনা প্রয়োজনে রাস্তা বেয়ে কেউ হাঁটে না বা খোলা আকাশের নিচে কেউ দাঁড়ায় না। তাই ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, ধীরে ধীরে পাশে মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। প্রথমে তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলেছে আমার ওপর। তার পরে এক সময়ে সোজাসুজি জানতে চেয়েছে জমি খুঁজছি কিনা? তাদের বলে বোঝানোর কোন শক্তি আমার ছিল না, জমি কেনার ইচ্ছে আমার নেই বা সে ইচ্ছে নিয়ে আসেনি। এসেছি একটু খানি মুক্তির স্বাদ নিতে।

যা হোক, সাংবাদিক মন। মানুষ পেলেও অন্য রকম একটা খুশি কাজ করে। মানুষের জীবনকাহন জানতে ইচ্ছে করে, জানতে ইচ্ছে করে ওই সব এলাকার নানান কথা। আশ্চর্য হইনি, বরং খুশি হলাম জেনে ওই সব মানুষ জানে, তার এলাকার আগামী বিশ বছরে উন্নয়নের কী কী পরিকল্পনা সরকার করেছে। কোথা থেকে কোন্ পথে কতদূর রাস্তা যাবে, কোথায় ব্রিজ হবে সব তাদের জানা। তারা জেনেছে তাদের প্রয়োজনে। কারণ, তাদের জমির দাম বাড়বে। আর সেই সব হিসাব-নিকাশ নিয়ে হচ্ছে জমি বেচা-কেনা। আবার তাদের ভেতর আশঙ্কা আছে, তারা তাদের জমি সবটুকু রক্ষা করতে পারবে কি-না? কারণ বড় বড় হাউজিংগুলো এলে দখল করে নেয় তাদের জমি-জায়গা। কেউ কেউ আবার নানান প্রতারণা ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। যেমন, তাদের মুখেই শোনা এ সব জায়গায় যত হাউজিং দেখা যায় এর আশিভাগ মূলত প্রতারণা। অর্থাৎ তারা কোন না কোন জমির মালিককে বছরে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে ভাড়ায় সাইন বোর্ড বসায়। শুধু একটা সাইন বোর্ড বসানোর জন্য ওই মালিক বছরে দশ হাজার টাকা পায়। এভাবে হয়ত দশটা সাইন বোর্ড তারা দশ জায়গায় বসায়। তারপরে সেটা দেখিয়ে ঢাকার মানুষের কাছে বা প্রবাসীদের কাছে প্লট বিক্রি করে। পরে এক সময় তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার অনেক সঠিক হাউজিংও আছে। তবে তারা প্লট বিক্রি করে প্রথমে কিস্তিতে। আর শুরুতে যাদের কাছ থেকে টাকা নেয় তাদের ভেতর যারা দুর্বল পার্টি তাদের আর জমি রেজিস্ট্রি করে দেয় না। নানান কথা বলে কিস্তিতে হয়ত কিছু টাকা ফেরত দেয়। কারণ, ততদিনে জমির দাম কয়েক শ’গুণ বেড়ে গেছে। তাই সেগুলো তারা এখন আবার নতুন কাস্টমারের কাছে বিক্রি করে। এমনি নানান ঘটনা, যার অনেক গল্প ও উপন্যাসেরও উপাদান।

আবার এই শহরের কাঁচা বাজারের সবজি বিক্রেতা; তার যেমন এক ধরনের সমস্যা তেমনি বাজারের বাইরে রাস্তায় সকালে যে সবজি নিয়ে বসছে তার আরেক সমস্যা। বাজারের ভেতরের যে সবজি বিক্রেতা সে বলছে তার আগের মতো আর ক্রেতা আসে না। কারণ, এখন ক্রেতা তার হাতের কাছেই সবজি পাচ্ছে। রাস্তায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ বাজারে তার দোকানের ভাড়া বেড়ে গেছে। রাস্তার যে সবজি বিক্রেতা সেও সমস্যা মুক্ত নয়। কারণ, সে যে ফুটপাতে বা রাস্তায় বসতে পারছে এ জন্য সরকারী দলের স্থানীয় কর্মীদের চাঁদা দিতে হয় নিয়মিত। এমনিতে বাজারের থেকে তাকে কম দামে বিক্রি করতে হয়। তা ছাড়া স্থায়ী দোকান না হওয়ায়, সকাল দশটার আগে তাকে বিক্রি শেষ করতে গিয়ে শেষের দিকে বেশ সস্তায় বিক্রি করতে হয়। তার ওপরে সরকারী দলের স্থানীয় কর্মীদের চাঁদা সব মিলে তার লাভ থাকে খুবই কম। অন্যদিকে অন্য জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে প্রতিদিন। কষ্ট হচ্ছে তার জীবন চালাতে।

আবার জীবন বদলে গেছে কোন কোন সবজি বিক্রেতার। বাজারের ভেতর একটি গ্রোসারি শপের গায়ে কয়েক পদের সবজি নিয়ে এখন থেকে দশ বছর আগে ব্যবসা শুরু করেন এক সবজি বিক্রেতা। এখন ওই গ্রোসারি শপের মালিক সে। মালামালে পরিপূর্ণ তার দোকান। এমনকি মাল রাখার জন্য পাশে আরেকটি দোকানকে গুদাম হিসেবে ভাড়া নিয়েছে। তার দুই ছেলে আর একটি লোক রেখে সেই দোকান চালাচ্ছে। মেয়ে নার্সিং পড়ছে। আরও দুই ছেলে নসিমন, করিমন- এগুলো চালায় টঙ্গীর রাস্তায়। তার জীবনে এখন দিন বদলের গল্প, স্বপ্ন পূরণের গল্প।

ফল বিক্রেতারাও বাদ যাচ্ছে না সরকারী দলের কর্মীদের চাঁদার হাত থেকে, বাদ যাচ্ছে না ফুচকা বিক্রেতারাও। তবে বিস্ময়কর তাদের পুরনো সখ্যতার মূল্য। দীর্ঘদিন পরে তাদের কাছে ফিরে গিয়েও মিলছে তাদের সততার সাক্ষ্য। যেমন তারা থাই পেঁপে বিক্রি করছে ঠিকই- তবে বলছে এটা রাঙ্গামাটির আর এটা কাপাসিয়ার। সত্যকে লুকাচ্ছে না। যেমন- ফুচকাওয়ালার বয়স হয়ে গেছে। বয়স হয়েছে আমারও। তার পরেও চিনতে পেরে তিনি খুশি। তার খুশি দেখে বলি, আলু খাওয়া নিষেধ। আলু ছাড়া কি ফুচকা হবে? তিনি হেসে বলেন, আপনার কি খাওয়া উচিত হবে? তার কথা কামরাঙ্গীরচরে যেখানে এগুলো তৈরি হচ্ছে সেগুলো খুবই নোংরা পরিবেশ। বাচ্চারা লোহা খেলেও হজম করে ফেলতে পারে। তার মতে তাই ওদের খাওয়ায় কোন দোষ নেই। আমাদের খাওয়া উচিত হবে না। মনে মনে ভাবি, হায়রে সময়! সময় কেবল বয়ে যায়। জীবন থেকে শুধু ফুচকার আলু চলে যায়নি, রাস্তার অস্বাস্থ্যকর খাবার হজম করার ক্ষমতাও চলে গেছে। অথচ এক সময়ে মজা করে বন্ধুবান্ধব মিলে রাস্তার পাশের ইটের খাবারের দোকানের (মজা করে বলতাম ইটালিয়ান রেস্টুরেন্ট) কালো মাংসের ভুনা খেয়েছি। হজম হয়ে গেছে। কোন অসুবিধা হয়নি। ফুচকাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করি, তাকে কোন চাঁদা দিতে হয় কি-না? তিনি হেসে বলেন, এটা তো এ দেশের নিয়ম। রাস্তায় বসে বিক্রি করতে হলে, যখন যারা সরকারী দলে থাকে তাদের লোকজনকে পয়সা দিতে হয়। যে পান বিড়ি বিক্রি করে তাকেও পয়সা দিতে হয়।

এ দেশের নিয়ম বলতে মনে পড়ে গেল ২০০৫ সালের দিকে গুলবাগের এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কথা। তখন গুলবাগ, মালিবাগ বস্তির পাশের রাস্তায়, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও প্রভৃতি জায়গায় বিকেল থেকে ওপেন ফেনসিডিল বিক্রি হতো। যারা বিক্রি করত তাদের সমীহ করে চলতে হতো। ওই সময়ে ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোক একদিন বলেছিলেন, দেখ, সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েক পুলিশ অফিসার, কয়েকজন ওয়ার্ড কমিশনার আর জনাদুয়েক বড় নেতাকে ক্রসফায়ারে দিলে রাজধানীতে আর মাদক থাকত না। রাজধানীতে এখনও বহাল তবিয়তে মাদক আছে। ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোক বেঁচে আছেন কি-না জানি না। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, মাদক বন্ধের পথ কি এটাই! যেমন- নয়ন বন্ডকে ক্রস ফায়ারে দেয়ার পরে ফেসবুকে লেখা হচ্ছে- এটাই সঠিক পথ।

স্বদেশ রায়সাংবাদিক

Responses -- “সাধারণ মানুষের খবর”

  1. Not applicable

    Who to blame? Bangladesh police, attackers, attackee, politicians, social media , the wife of attackee , politicians? Do we have any reasons not to blame any of them?

    Reply
  2. সাইফুল ইসলাম

    দাদা
    উন্নয়নে ভেসে যাচ্ছে দেশ! কোথাও কোনো কষ্ট অন্যায় অবিচার নেই, আপনার লেখা আর বিটিভির নিউজ দেখলে মন ভালো হয়ে যায়, দুজনেই বাতাবী লেবুর বাম্পার ফলন দেখায়! হা হা হা!

    Reply
  3. রেজা নওফল হায়দার

    চীনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রয়োগ করলেই হয়।

    Reply
  4. সৈয়দ আলি

    ‘………ফেসবুকে লেখা হচ্ছে- এটাই সঠিক পথ।’ফেসবুকে লেখা হলেই কি সেটি গ্রহনযোগ্য? রাষ্ট্রীয় রক্তপিপাসা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটায়। বাংলাদেশে ভয়াবহতম হত্যাকান্ডটি এভাবেই ঘটেছে।

    Reply
  5. নাজমুল

    অভিভাবকদের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব বাড়ছে। এটা নিম্ন, মধ্য, উচ্চ, সব বিত্তের মধ্যেই। অভিভাবকের বাড়তি আয়ের টাকা সন্তানের মুঠোতে উঠে যাচ্ছে সহজেই। সেই টাকা তারা মাদকসহ অন্যান্য বিনোদনে ব্যয় করছে। অপরাধপ্রবণতার মধ্যে আমরা কিশোরদের হত্যাকারী হিসেবেও দেখতে পাচ্ছি। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অভিভাবকদের সত্যিকারের অভিভাবক না হয়ে ওঠা পর্যন্ত এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা থেকে কিশোর-উঠতি তরুণদের দূরে রাখা অসম্ভব। কিশোররা সব মহল্লাতেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। মাদক এর জন্য প্রধানত দায়ী। মাদকের টাকা জোগাড় করতে নিজ বাড়িতেও চুরি-ডাকাতি-খুন করছে তারা। বন্ধুর হাতে বন্ধু। ভাইয়ের হাতে ভাই খুন হচ্ছে। ধর্ষণ তো আছেই। শুনলাম, সারাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানেও তাদের দমানো যায়নি। তাদের কাছে মাদক আসছে আগের মতোই সরল পথে। মাদকসেবী, ব্যবসায়ীদের এলাকার মানুষ চেনে। তারা চোখের সামনেই শিশু থেকে কিশোর, তরুণ হয়েছে, কিন্তু এখন তারাই ভয়ঙ্কর। অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে তারা। কোনও কোনও পরিবারে অভিভাবকরাও মাদকাসক্ত। পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে তারা বেপরোয়া। ০০৭ দলের সদস্যরা সকলেই কিশোর। কিংবা মাত্র তারুণ্যের চৌকাঠে পা রেখেছে। শহরের সদস্যদের অনেকেই নামিদামি স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। সমাজের উঁচুতলায় তাদের বাস। পারিবারিক বিত্ত-বৈভবের ঘাটতি নেই। ঘাটতি আছে শুধু পারিবারিক অনুশাসনের। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন পরিবার থেকে আসা কিশোররাও। শিক্ষার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কম। মাদক বেচাকেনা ও অস্ত্রের জোগান দিতে গিয়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ হয়। যোগাযোগের এই সূত্র ধরেই রাজনীতির প্রশ্রয়ের হাত তাদের মাথার ওপর নেমে আসে। একদম বিনে পয়সায় এই প্রশ্রয় আসে না। রাজনীতি তাদের ব্যবহার করে নানা প্রয়োজনে। আর ওপর তলার যারা আছে ০০৭-এ, তারা তো প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানই। সুতরাং বেপরোয়া হতে বাধা কোথায়? বিত্তশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ না হলেও, বিত্তহীন ও নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ঘর থেকে আসা ০০৭-এর সদস্যরা মাদকসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধে তাদের পৃষ্ঠপোষকের অভাব হয় না। সাধারণভাবে কিশোর অপরাধ গোষ্ঠীর সকলেই ক্ষমতাসীন দলের সদস্যের দাবিদার হয়ে যায়। দলের সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও, দাবিদার হয়েই এলাকায় প্রভাববিস্তার করতে থাকে। সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের আশপাশে ঘুরঘুর করে। মোটরসাইকেল বহর বা মিছিলে সমাবেশে হাজিরা দিয়ে স্থানীয় মানুষদের কাছে নিজেদের ক্ষমতার প্রদর্শন করতে থাকে। স্থানীয় রাজনীতির কর্তারাও তাদের প্রয়োজনে এই ০০৭-এর সদস্যদের পাশে নিয়ে দাঁড় করায়, ব্যবহার করে। পুলিশ প্রশাসনের কাছে বিস্তর প্রমাণ ও অভিযোগ থাকার পরেও, রাজনৈতিক নেতার পাশে যাকে দেখা গেছে, তাকে হাতকড়া পরানোর সাহস পায় না। বরং পুলিশ প্রশাসন নিজেদের স্বার্থে তাদের কখনও তোষণ এবং ব্যবহার করতে শুরু করে। এই বাস্তবতায় ০০৭ পাড়া, মহল্লা, গ্রামে হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। এবং তাদের জন্ম ও বিস্তার সকলের সামনেই। সমাজ ও রাজনীতির লালন-পালনেই এরা ০০৭ বন্ড হয়ে উঠছে।

    Reply
  6. হইলদা হিমু

    রিফাতের হত্যাকাণ্ড জাতিকে নাড়া দিয়েছে। এখানে জাতি বলতে আমি যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, সেই জাতিকে বোঝাচ্ছি। এই সক্রিয় ব্যক্তিরা সমগ্র জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করেন কি না, বলতে পারব না। ঘটনাস্থলে ৫-৭ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর প্রত্যেকে হামলাকারীদের চেনে। উনারা এও জানে যে ওরা সরকার দলীয় নেতা কর্মী ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে মিলেমিশে অপকর্মগুলো সম্পাদন করে। এখানে রাষ্ট্র অবশ্যই নীতিনৈতিকতা ধ্বংস করছে যারফলে আমরা ভীত জাতিতে পরিণত হয়েছি। এতকিছুর পরেও প্রত্যক্ষদর্শীরা হয়তো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রিফাতকে বাঁচাতে এগিয়ে যেত কিন্তু, পরবর্তীতে আইনের মারপ্যাঁচে অপরাধী বেরিয়ে এসে সেই পরোপকারীর পরিবারের ক্ষতি করবেই। বিচার ও তদন্ত বিষয়ক অবহেলা আর ভুল বিচার সম্পর্কে আমরা ৩ দশক ধরেই অবগত। সূতরাং, অন্যায় প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বা একটা মানুষের প্রাণ রক্ষা করার ক্ষেত্রে দেশের আদালত পর্যন্ত মনের ভেতর থেকেই ভয় জাগিয়ে তুলছে। রাষ্ট্রীয় এমন একটাও প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে দূর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হয় না, যেখানে টাকা দিয়ে অপরাধ বিনিময় করা যায় না। ডিজিটাল বাংলাদেশ করে সমাজ যতটা গর্তে পরেছে, এখান থেকে টেনে তোলা সহজ নয়। এখন পাড়ায় পাড়ায় বন্ডের রাজত্ব; 7 star, 9 star; ডিস্কো বয়েজ, এরকম বিভিন্ন নামের বন্ড বা গ্যাং। এদেরকে ছোট থেকে তৈরি করা হয় দক্ষ বড় মাস্তান হবার জন্য। এরা সবাই ফেসবুক ব্যবহার করে গ্রুপ তৈরি করে, যোগাযোগ করে করে আরও শক্তি অর্জন করে, সংগঠিত হয়। বয়স কম বলে এদের দিয়ে যেকোন অপকর্ম করানো যায়। কেনো বাঁচাতে আসেনি কেউ, এই সহজ প্রশ্নটির অনেক উত্তর তবে সবগুলি উল্লেখ সম্ভব নয়, আমি শুধু কয়েকটি সংযুক্ত করছি-
    ১) বরগুনার মানুষ খুনিকেও চেনে, যাকে খুন করা হচ্ছে তাকেও চেনে। তারা পরস্পর বন্ধু ছিল।
    ২) খুনির সাথে মেয়টি বিয়ে মিথ্যে নয়, সে যখন জেলে তখন ওই ছেলেটি মেয়েটিকে আবার বিয়ে করে অথচ খুনির সাথে যখন বিয়েটা হয় তখন এই ছেলেটিও সেখানে উপস্থিত ছিল।
    ৩) মাদকের সাথে এদের প্রত্যেকের সম্পর্ক আছে এটা বরগুনার মানুষরা জানে। তাদের কোপাকুপির মাঝখানে কে নিজের জীবন দিতে যাবে!
    ৪) বরগুনা শহরের সকল মানুষ জানে এরা সকলেই ক্ষমতার রাজনীতির স্থানীয় নেতাদের একান্ত আর্শীবাদে মাদক সাম্রাজ্যে বিস্তার ঘটিয়ে আসছে, তাই সাধারণ মানুষের মন কেমন করার বিষয় ছিলনা।বরগুনা কলেজে মাদক সরবারহে এদের প্রত্যেকেরই ভূমিকা ছিল বলেই এখানকার সাধারণ মানুষ মনে করে। সুতরাং, তাদের জন্য সাধারণ মানুষের দরদ তৈরি হওয়ার বাস্তব কারণ নাই।
    এ সবই ক্ষমতার রাজনীতির উপহার তাই সাধারণ মানুষের কিছু করার নাই।

    Reply
  7. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    দেখুন কোন সমাজ নিয়ে যখন কথা বলবেন তার আগে চিন্তা করে দেখতে হয় যে, কে এই সমাজটাকে নেতৃত্ব দিচ্ছে? যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে, এই সমাজ কি তাদের নেতৃত্ব দেয়ায় সুযোগ দিয়েছে না কি এরা ছল-চাতুরী করে সে সমাজে চেপে বসেছে? খুন–ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধগুলোও এখন আর আমাদের নাড়া দিতে পারছে না। আমরা নাড়া খাই তখন, যখন মানুষকে খুন করা হয়েছে অতিশয় বীভৎস পন্থায়। একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে—এটা এখন একেবারেই আটপৌরে, চাঞ্চল্যহীন খবর। চাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে তখন, যখন মেয়েটিকে দলবদ্ধভাবে উপর্যুপরি ধর্ষণ করার পর বীভৎসভাবে হত্যা করা হবে। ছিনতাইয়ের সব খবর আজ আর সংবাদমাধ্যমে জায়গাই পায় না; জায়গা পাবে যখন ছিনতাইকারীরা শুধু কিছু ছিনিয়ে নিয়েই সটকে পড়বে না, তাদের নিরীহ শিকারটির পেটে ছুরি মেরে ফেলে রেখে যাবে এবং সেই বেচারা রাস্তার ধারে পড়ে থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যাবে। যা বলতে চাচ্ছি, তা সংক্ষেপে এই: বাংলাদেশে অপরাধপ্রবণতায় অহেতু অতিরিক্ত হিংস্রতা যুক্ত হয়েছে; কোনো কোনো অপরাধের ঘটনায় অপরাধীদের আচরণে মানসিক বিকৃতির লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অতিশয় হিংস্রতাপূর্ণ ও বীভৎস অপরাধের ঘন ঘন পুনরাবৃত্তির ফলে সামাজিক সংবেদ ক্রমেই কমে যাচ্ছে, সমাজ নির্বিকার হয়ে পড়ছে, ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। ব্যক্তির চেতনা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে শুধুই নিজের ও স্বজনের নিরাপত্তার তাগিদকে ঘিরে। এসব কোনোভাবেই সুস্থ–স্বাভাবিক সমাজের লক্ষণ নয়। আড়াই বছর বয়সী শিশু থেকে ৫৮ বছর বয়সী বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। আড়াই বছরের শিশু কীভাবে ধর্ষণ করা সম্ভব? আমার প্রশ্নের উত্তরে ওসি সাহেব বললেন, ‘শোনেন, যত রকমের উদ্ভট, অস্বাভাবিক ক্রাইম দেখবেন, সবগুলোর পেছনে আছে মাদক। একটি ছেলে যখন মাদক নেয়, তখন তার আর কোনো হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। আড়াই বছরের একটি বাচ্চাকে যে রেপ করা সম্ভব নয়, এই সাধারণ বোধটাই সে হারিয়ে ফেলে। অন্য সব ক্রাইমের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার।’ গুরুত্ব দিতে হবে ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, তার ওপর সামাজিক–সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক পরিবেশ–পরিস্থিতির প্রভাবের ওপর। যারা মানুষ খুন করার মধ্য দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়, তাদের মধ্যে একধরনের ‘হিরোইজম’ কাজ করে। যারা নিজের শক্তি, সাহস, ক্ষমতা, আধিপত্য দেখিয়ে অন্যদের মনে ভয় ছড়াতে চায়, তারা যদি কাউকে খুন করে, তাহলে তা এমনভাবে করে যেন সবাইকে তাক লাগিয়ে দেওয়া যায়, স্তম্ভিত করা যায়। রিফাতের হত্যাকারীদের মধ্যে সম্ভবত এসব প্রবণতা কাজ করেছে। তারা রিফাতকে জনসমক্ষে পৈশাচিকভাবে খুন করার সাহস দেখাতে পেরেছে আরও একটা কারণে। সেটা হলো স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব। তারা তাদের প্রশ্রয় বা পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে এবং সে কারণে তাদের মনে এই অভয় কাজ করেছে যে রিফাতকে খুন করে তাদের আইন ও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে না। এর আগে অনেক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পরেও তারা যেভাবে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, রিফাতকে খুন করার পরেও সেভাবেই বেরিয়ে আসতে পারবে। ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় লালিত–পালিত অপরাধীদের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত (অলিখিতভাবে) ইমপিউনিটি (শাস্তির ভয় ব্যতিরেকে অপরাধ সংঘটনের সুযোগ) থেকে যে বিচারহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে মাদকদ্রব্যের অবাধ ব্যবহার যুক্ত হলে হরর সিনেমার মতো বীভৎস–বিভীষিকাময় অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা বেড়ে যাওয়া মোটেই অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। মাঝেমধ্যে ব্যাপক জনপ্রতিক্রিয়ার মুখে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদাধিকারীর নির্দেশও আজ আর নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশে সব অস্বাভাবিকতাই যেন স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। এ বড় বিপদের কথা। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর যাবতীয় উন্নয়ন নিষ্ফল হবে, যদি সমাজ থেকে স্বাভাবিক শান্তি ও স্বস্তি বিদায় নেয়, নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়ে। যাঁরা সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তাঁরা যদি এটা উপলব্ধি করতে না পারেন, তাহলে জন্মভূমি বাংলাদেশ হয়তো একদিন আমাদের সন্তানসন্ততির কাছে বসবাসের যোগ্য থাকবে না।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—