রাজা রামমোহন রায় বেঁচে থাকলে আজও তাঁর সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যেতেন নাকি হাল ছেড়ে দিতেন বলা মুশকিল। প্রায় দুই শ বছর আগের কূপমণ্ডুক ব্রাহ্মণদের তিনি নিরস্ত্র করতে পারলেও, একালের নব্য ব্রাহ্মণদের তিনি বাগে আনতে পারতেন কিনা সন্দেহ। এই দেশে যেকোন হত্যা, রাহাজানি, দাঙ্গাবাজি, দুর্নীতি, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নারী নির্যাতন বা অন্য কোনও অপরাধের ঘটনাকে জায়েজ করতে সবার আগে নারীর চরিত্রকে চিতায় চড়ানো হয়।

এই যে দেশজুড়ে এতো ধর্ষণ, এতো যৌন হয়রানি, এতো নারী নির্যাতন, তবু এসবের বিরুদ্ধে বিপুল জনমত গড়ে ওঠে না শুধু এই কারণে। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিশ্বাস করে এই সবকিছুর জন্য মূলত মেয়েরাই দায়ী এবং তাদের ধর্ষণ করা, হয়রানি করা, অ্যাসিডে পুড়িয়ে দেয়া বা মারধোর করা ঠিকই আছে। তাই প্রতিটা ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি বা নারী নির্যাতনের পর প্রথমেই আঙুল ওঠে নিপীড়িত মেয়েটির দিকে। সবাই চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে বসে যায় মেয়েটির চরিত্র ঠিক ছিল কিনা, মেয়েটির পোশাক ঠিক ছিল কিনা, মেয়েটির চালচলন ঠিক ছিলো কিনা, মেয়েটি সতীসাধ্বী কিনা,  মেয়েটির কোন প্রেমিক ছিলো কিনা। সেইসব বিচারে যদি মেয়েটি কোয়ালিফাই করতে পারে, তবেই সবার ফুসরত মেলে অপরাধীর দিকে তাকানোর। স্বামীর জীবন-মৃত্যুর সাথে জুড়ে দেয়া সতীত্ব রক্ষার যে চিতা রামমোহন নিভাতে চেয়েছিলেন দুইশ বছর আগে, সেই চিতা একালের ব্রাহ্মণদের বুকে আজও জ্বলছে গনগনে শিখা হয়ে। চাক্ষুষ আগুন তারা হয়তো জ্বালায় না, কিন্তু নারীর চরিত্র বিচারের সামাজিক আগুনে পুড়িয়ে শেষ করে দিতে চায়। এর ব্যতিক্রম ঘটেনি বরগুনার হত্যাকাণ্ডের বেলাতেও।

বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত নামের মানুষটিকে কুপিয়ে হত্যার পর গতানুগতিকভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্রাহ্মণরা তাই মহা উৎসাহে রিফাতের স্ত্রীর চরিত্র বিশ্লেষণে বসেছে। সন্ত্রাসী খুনিদের নয়, রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রকান্তরে খুনিদের পক্ষের দাঁড়িয়েছে। যেহেতু মিন্নি নামের মেয়েটির বিয়ের আগে একটি প্রেমের সম্পর্ক ছিল, সেহেতু তাকে বিয়ে করা ছেলেটিকে মেরে ফেলা ঠিক আছে। খুনিকে নয়, মেয়েটির বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো ঠিক আছে। এবং ধর্ষকামী মগজ নিয়ে মিন্নির চরিত্র বিশ্লেষণ করা ঠিক আছে। ভাবখান এমন যে, একবার কোন সম্পর্কে জড়ালে বাঁচো আর মরো তার গলাতেই লটকে থাকতে হবে সারাজীবন। তাই যে মেয়েটি এই ভয়াবহ সন্ত্রাসের সামনে দাঁড়িয়ে একা লড়ে গেছে, তার পাশে না দাঁড়িয়ে খুনির অপরাধকে জায়েজ করতে বসেছে নব্য ব্রাহ্মণকুল।

জানেন কি, মিন্নির প্রাক্তন প্রেমিকও ঠিক আপনাদের মতোই ভাবে। আপনাদের এসব বিকৃত বিশ্লেষণ আর চিন্তাধারাই খুনের মূল উৎস। রিফাতকে কোপানো ছেলেগুলার সাথে আপনাদের আদতে কোনোই পার্থক্য নেই। ঠিক এই কারণেই, হ্যা আপনাদের এই অন্ধকার মগজ আর তার চিন্তাধারার কারণেই, এই সমাজে নয়নরা বুক ফুলিয়ে রিফাতদের হত্যা করার সাহস পায়। যেমন বুক ফুলিয়ে সদ্য বিধবাকে জ্বলন্ত চিতায় হত্যা করতো তৎকাালীন কূপমণ্ডুক ব্রাহ্মণরা। সদ্য বিধবা মেয়েটি শোক করার ফুসরত পেত না চিতায় পুড়ে মরার আতঙ্কে। এখনও পায় না আপনাদের কুৎসিত মানসিকতার চিতার ভয়ে। আপনারা মেয়েটির  চরিত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে আপনার মর্ষকামিতা প্রশমন করেন। হত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা করেন।

ঘটনাস্থলের নিষ্ক্রিয় জনগণ নয়, এই আপনারা বাঁচতে দেন না রিফাতদের। এই আপনারাই আইনের লোক, আপনারাইতো নেতা, নেতার হাতা, আপনারাই সরকার গঠন করেন, আপনারাই বিরোধীপক্ষ, আপনারাই সমাজ, আপনারাইতো জনগণ। এই দেশে প্রকাশ্যে খুন হবে নাতো কী হবে? এই আপনারাই এইসব জন্য দায়ী। এই আপনারা প্রত্যেকেই একেকজন খুনি।

২১ Responses -- “একালের সতীদাহ”

  1. shahid

    লেখাটি সত্যিই একটি অসাধারণ লেখা। হত্যাকাণ্ড ও অপরাধী না দেখে আমরা কেনই বা মেয়েটির চরিত্র নিয়ে ঘাটাঘাটি করবো।

    Reply
    • Not Applicable

      now you should think about the mystery. The main accused
      is on cross fire. he will have no more chance to tell truth. it’s just common sense.

      Reply
      • Not Applicable

        I do not support Cross Fire. And do not like hear so called truth as well. Burning truth is that Noyon Bond 007 directly killed Rifat Sharif. If there was truth why the Gang Star did not go to Police or Court with his complain. Many innocent people have been suffering for this type of Gang Star all over the country.

    • Not applicable

      They did not go to police? What do you think? How many police cases they have in the record book of police already? You are telling me you do not know that after this event. Or you only read who was attempting to injure other person. It’s an endless matter until law is the law and law is independent. Bangladesh Army is in good condition. Why not police? If they can’t do their job, we don’t need them. We pay their salaries for those one after another ?

      Reply
  2. Not Applicable

    it’s my second time here today. after going over this writing, i wrote my comment. then i went to see the video footage in the internet. i am a little confused to the whole thing now. so i wanted to include my opinion again. i saw in the video that she was trying to push back and trying to save her husband from the attackers who had The large curved blades (Ram-dao). she was not afraid of them at all in the video. It is a little contrary to me that she went there to save her husband and nothing happen to her. was she aware of the situation before? anyone asked her about it? or it was the same thing always as usual. Meaning we saw the video that he was attacking so he is the main person. catch him first then bring him to the justice. perhaps the mother of the thief does complain the loudest. it is just common a sense.

    Reply
  3. Not Applicable

    i always hoped that one day we will find a big anaconda after searching of some worms for fish. unfortunately we were very unlucky in that. those kids were already infected in some symptoms. weren’t they doing crimes before? are their any other criminals presently? why don’t we finish all criminal case now before another event might occur? they are not so many. perhaps one or two in every village. what are we waiting for? i am not sure it is an article however i found so many comments in that. sometimes cheap things can get easy market. it was one of them.

    Reply
  4. হুমায়ুন কবির

    একটা মেয়ে কৈশোরের শেষ দিকে পৌছতেই শুরু উত্যক্ত করা (প্রেম নিবেদন)। বখাটে, অখাটের সাথে কোন কোন সময় বুড়ো-থুড়োও যোগ দেয়। কোন কিছু ঘটলে বা বদনাম ছড়িয়ে পড়লে সব দোষ মেয়েটার। এবারেও আয়শার স্বামী হত্যাকারী না খুজে, তার দোষ খোজার প্রবনতা কিছুটা হলেও লক্ষ্য করা গেছে। তবে আয়শাকে ভাগ্যবতীই বলতে হবে। যদি হত্যাকান্ডটি প্রকাশ্যে না ঘটতো এবং ভিডিও ছড়িয়ে না পড়তো তাহলে খবর বের হতো পরকীয়ার কারণে খুন। হয়তোবা এরই মধ্যে মেয়েটিকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে একটি স্বীকারোক্তিও মিলে যেত। সে খবর কুয়াকাটা, কক্সাবাজার হয়ে পৃথিবীর সব সৈকতে ছড়িয়ে পড়তো। স্বামী শোক আর মিথ্যা অপবাদের বোঝা নিয়ে ফাঁসি কাষ্ঠের দিকে এগুতো আর আমার মত বেয়াক্কেল বলতো উপযুক্ত শাস্তি!!

    Reply
  5. সুবোধ সরকার

    আমি এর আগে আর কোনো লেখার সাথে এতখানি একমত হয়নি।

    Reply
  6. Plaban Dey

    উদাহরণ দেয়া যেতেই পারে, তবে সেটাকে সাম্প্রতিক না করাই ভাল। ২০০ বছর আগের ব্রাহ্মণ সম্পর্কে আপনি কি জানেন? কেন তাদেরকে নেগেটিভ রুপে উপস্থাপন করছেন? ব্রাহ্মণরা কি রাস্তায় মানুষ কুপিয়ে হত্যা করত? দয়া করে এইরুপ উপহাসজনক সম্পাদনা থেকে বিরত থাকবেন বলে আশা করি। আর হ্যা- আমি ব্রাহ্মণ নই।

    Reply
  7. আব্দুল করিম

    ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, সাম্প্রদায়িকতা, ফেসবুকে আসক্তি হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করা, ক্ষমতার প্রদর্শনী দেখানো, অন্যের দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ সবই আজকাল ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেউ যখন সত্ চিন্তা, সততা নিয়ে আবির্ভূত হয় তখন আমরা তাকে নিয়ে উপহাস, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করি। কারো ব্যর্থতায় তার পাশে না দাঁড়িয়ে বরং তার সমালোচনা করি, হিংসা, বিদ্বেষ, মিথ্যাচার, ধোঁকাবাজি আজ যেন চারদিক থেকে আমাদের মনুষ্যত্বের দণ্ডকে ভেঙে ফেলছে। নকল প্রবণতা, প্রশ্নফাঁস, খাদ্যে ভেজাল, নকল ওষুধ সবই হচ্ছে। আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতার লক্ষণ তো অত্যধিক। দিন দিন আমাদের মানসিক বিকৃতি ঘটছে, হতাশা গ্লানিতে আমরা জর্জরিত হচ্ছি। পরকীয়া, লোভ-লালসা, বিচারহীনতা, ভাই ভাইকে খুন, একক কর্তৃত্ব, জিদ,অহংকার যেন নৈতিকতার পর্দাকে ছিদ্র করছে। ফেসবুক, ইউ-টিউব, গুগলে পর্ণোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি ইত্যাদি দেখে আজ তরুণ সমাজ ইভটিজিং কিংবা ধর্ষণের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তাদের আচরণে নেতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। মেয়েঘটিত ঝামেলা নিয়ে একাধিক প্রেমিকপ্রার্থীর মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্বও আজকাল সর্বত্র দৃশ্যমান। তরুণের প্রাণ যেন স্মার্টফোন যা সঙ্গে থাকলেই হলো তাদের আর কিছুর দরকার হয় না। ফোন নিয়ে সারা দিনরাত ব্যয় করছে ফেসবুক, ইউ-টিউব, ভিডিও গেমস ইত্যাদির সঙ্গে। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতায় লিখেছেন ‘-যদি কেউ কথা না কয়, ওরে ও অভাগা, যদি সবাই থাকে মুখ ফিরায়ে, সবাই করে ভয়, তবে পরাণ খুলে ও তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা একলা বল রে’। সবাই যদি বাংলার জমিন থেকে হারিয়ে যান, ভয়ে সন্ত্রস্ত হন, নির্বাক হয়ে যান, আতঙ্কে প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেন, একলা চলেন, একলা মনের কথা বলেন তাহলে জাতি হিসেবে আমাদের কী একদিন অস্তিত্ব সংকটে পড়তে হবে না? প্রেক্ষাপট এমনই হয়েছে যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কেউ কথা বলবেন খুন হবেন, অপহরণ হবেন। রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে কিছু বলবেন, হামলা-মামলার শিকার হবেন। দুঃসহ এই পরিস্থিতিতে কে এই অসীম সাহসীর ভূমিকা পালন করবে? কোথায় আজ আইনের শাসন? সবই আছে। তবে খাতা কলমে। ফাঁকা আওয়াজ, বুলি সর্বস্ব মাত্র। কারণ আজ এত বছর পরেও আমরা হামাগুড়ি দিয়ে সাবালকত্ব হতে পারিনি। আজকের স্বাধীন দেশে আইনের শাসন এক প্রকার নেই বললেই চলে। অনেকে অনেক কথা বলেন। নানা প্রতিশ্রুতি দেন। অথচ জনগণকে নিয়ে সাপ খেলাও করেন। কারণ এ দেশে ‘যে যায় লংকায় সে হয় রাবন’। প্রতিবাদ করলে একজন নাগরিকের জীবনে নেমে আসে হামলা-মামলা।এই রুগ্ন বিচারহীন সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিবাদীর ভূমিকা সাহস করে কেউ কী নিতে চাইবে? কারণ একটি সমাজ যখন রুগ্ন হয়ে যায় তখন আইনের শাসন বলে কিছুই থাকে না। কেউ কোনো দায়িত্ব কাঁধে নিতে চায় না। ঝুঁকি নিতে চায় না। জবাবদিহি বলে কিছু থাকে না। যদিও বিবেকের কাছে একরাশ প্রশ্ন থেকে যায়। তবুও সবার অভিন্ন প্রশ্ন ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’।

    Reply
  8. Fazlul Haq

    ক্রিমিনাল পৌরুষত্ব ও নারী বিদ্বেষ মানসিকতা এসব হত্যার জন্য দায়ী। মাদ্রাসা মসজিদ, ওয়াজ মাহফিল নারী-ঘৃণা মানসিকতা সৃষ্টির একটা প্রধান উতস।

    Reply
  9. সুজা মালিথা

    প্রেম করার আবার সময় আছে নাকি? প্রেম সে তো বিয়ের আগেও হতে পারে আবার বিয়ের অনেক পরেও হতে পারে।
    প্রেম প্রাকৃতিক এবং চিরন্তন। প্রেম করবো কিন্তু মানবোনা তা কীকরে হয়। ( এক শ্রেণির মানুষ যেমন সানি লিওন / মিয়া খলিফা অভিনীত ছবি দেখবে সারাদিন আবার তাদের গালি দিবে বা জাহান্নামি বলবে।)
    প্রেম ইজ ইকোয়াল টু অবশ্যই বিয়ে নয়। প্রেম মনের ব্যাপার। বিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রেমের সঙ্গে বিয়েকে গুলিয়ে ফেলে প্রেমিকাকে নিজস্ব সম্পত্তি ভাবলে হবে এই একুশ শতকে এসে।
    বাস্তবতা কল্পনার থেকে অনেক বেশি বিস্ময়কর। পুলিশ তদন্তে কী কী তথ্য সামনে আসে তাই এখন আমাদের দেখার অপেক্ষায় থাকা উচিত। অবশ্য একশ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনার পেছনে যেমনভাবে মেয়েদের দোষ খুঁজতে থাকে সেখানে মিন্নীর দোষ খোঁজাখুঁজি তাদের কাছে কী আর খুব দোষের।

    Reply
  10. সৈয়দ আলি

    মূল সমস্যাকে লুকাতে শাখা সমস্যা নিয়ে হাঁকাহাঁকি। দেশে ফ্যাসীবাদের মদদে আইনহীনতার মাৎস্যন্যায় চলছে। এই সত্যটি প্রকাশ না করে সুদুর রামমোহনকে উল্লেখ করে পান্ডিত্য ফলানো হচ্ছে।

    Reply
    • Zahidul Karim

      Mr Sayed Ali,
      Thank you for your awesome answer, but i have to say did you really got the massage that this article suggesting?????? Do you really know the word Faschibad, Lawlessness, Matshanoy????? The last sentence articulated that, You are the murdered, i’m the murdered, we are the murdered….. its for the types of people you are. Shame on me that couldn’t control to response some one like you.

      Reply
  11. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    জঙ্গি নামক খুনিদের হামলার সময়ও মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল বিভিন্ন জায়গায়। ভয় না–পাওয়া কিছু মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ, যাঁদের মধ্যে তৃতীয় লিঙ্গের লোকও আছেন, তাঁদের হাতেও ধরা পড়েছিল কয়েকজন। বনানীর সুউচ্চ ভবনের সেই আগুনে মানবতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন অগ্নিসেনা সোহেল। ভয় তাঁকে অবশ দর্শক করেনি। রানা প্লাজার নরকের গর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ বাঁচাতে ভয় পায়নি অজস্র তরুণ। কিন্তু যখন প্রকাশ্যে বিশ্বজিৎ হত্যা হয়, যখন বদরুল চাপাতি তোলে খাদিজার গায়, যখন হাতুড়ি পিটিয়ে কোমর ভাঙা হয়, আর যখন বরগুনার রিফাত শরীফকে কোপানো হয়, তখন মানুষ জড় পদার্থের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। প্রকাশ্যে সশস্ত্র সন্ত্রাস দেখামাত্রই মানুষ বুঝে যায় তাদের পরিচয়। কারা এখন বাংলাদেশে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে ঘুরতে পারে? কোপাতে পারে যাকে-তাকে? কারা তারা, কারা তারা? চাপাতি–হাতুড়ি–বন্দুক কয়েকজনকে হয়তো খুন করে, কিন্তু হত্যা করে অধিকাংশের মানবতাকে, সাহসিকতাকে। মানুষ সবচেয়ে ভয় পায় তাদেরই, যাদের নাম নেওয়াও বিপজ্জনক। তখন মানুষ দর্শক হতেও ভয় পায়, পুলিশে ফোন দিতেও ভয় পায়। ধরুন, কিছু মানুষ ঘুরে দাঁড়াল। জাপটে ধরতে গেল অস্ত্রধারীকে। হয়তো সে নিজেও আহত হলো। কিন্তু সেখানেই তো ঘটনাটা শেষ হবে না। দুষ্টের বিচার আর শিষ্টের সুরক্ষা হবে না। অস্ত্রধারীরা ফোন দেবে তার দলবল-ভাইবেরাদরকে। তারা আসবে। প্রতিবাদকারীদেরও পেটাবে বা খুন করবে। থানা থেকে অপরাধীকে ছিনিয়ে নেবে। বিচারের দড়ি লম্বা করতে করতে কয়েক বছর পার করে ফেলবে। এর মধ্যে বাধাদানকারীরা তো বটেই, তাদের আপনজনেরাও ঝুঁকিতে পড়বে। সোনাগাজীর আগুনে–শহীদ নুসরাতের বাড়িতে পুলিশ পাহারা দিতে হয়েছিল কেন? অপরাধীদের পুলিশে দিয়েও ভয়ে থাকতে হয়, এই বুঝি খুনিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে প্রতিশোধ নিতে এল? এমনকি বিচারে শাস্তি হওয়ার পরও নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না, মহান ক্ষমার ছায়া যদি ওদের বিদেশ পাঠিয়ে দেয়! মানুষ সব জানে ও দেখে। মানুষকে দুষে লাভ নাই। রিফাত শরীফের হত্যাকাণ্ড বোঝায়, কোন চেতনা অবশ করা ভয়ের পরিবেশে আমরা বাস করছি। যে ক্ষমতার চাপাতি রিফাত-খাদিজা-তনু-সাগর-রুনীকে কোপায়, যে ক্ষমতার হাতুড়ি মাজা ভাঙ্গে ছাত্রের, সেই চাপাতি–হাতুড়ি–বন্দুকই ক্ষমতার আসল চরিত্র—বাকিসব লোকভোলানো বিজ্ঞাপন। মানুষ দর্শক হয়ে যায়। কারণ মানুষ জানে চাপাতি একা নয়, সঙ্গে সহমতভাইরা আছে। এক চাপাতি বাধা পেলে হাজারো চাপাতি দৌড়ে আসবে, এক মানুষ খুন হলে লাখো মানুষ ভয় পাবে। মানুষ নৃশংস হয়ে যায়, কারণ তারা ক্ষমতার চরিত্রকে কপি করে ক্ষমতায়িত হতে চায়, কোনো বাধা তো নেই। বাধা তো আছে কেবল বাঁচতে চাওয়ায়। দুর্বৃত্ত ক্ষমতা মানুষকেও নষ্ট করে কাউকে ভীরু দর্শক আর কাউকে নির্দয় জানোয়ার বানিয়ে তোলে। আমরা তো আরও বহু অন্যায়ের দর্শক। দেখতে দেখতে আমরা চীনদেশীয় সম্রাটের মাটির প্রজার মতো ভঙ্গুর ও জবরজং হয়ে গেছি। একটা আদিবাসী প্রবাদ আছে, যখন মাটি নষ্ট হয়, তখন মানুষও অসুস্থ হয়ে যায়। সমাজ হলো মানবজমিন, সেই জমিনটাকে দুঃশাসন, দুর্নীতি, লোভ, ভয় আর লাভের টোপে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। যখন জনগণ শাসক বদলাতে পারে না, তখন শাসকেরাই জনগণের চরিত্র নষ্ট করে দেয়, বদলে দেয়। তাদের করে তোলে ভীরু, লোভী ও পলায়নপর। সাধারণ মানুষের দশা এখন খাঁচায় পোরা মুরগির মতো। একটি মুরগিকে তুলে নিয়ে জবাই করার সময় বাকি মুরগিগুলো কিন্তু নীরবই থাকে। তারা একসঙ্গে চিৎকার করে না, ছোটাছুটি করে না, খাঁচায় কামড় বসায় না। তাতে হয়তো কিছুই হতো না, কিন্তু কসাইয়েরা জানত যে মুরগিরা পোকামাকড়ের চেয়ে বেশি সরব ও প্রতিবাদী। যদি মানুষ এমন করে চিৎকার করত, ঠেকাতে যেত বা দূর থেকে ঢিলটাও মারত, তাহলে একজন মানুষের প্রাণ বাঁচতো আর খুনিরাও বুঝত, নাগরিক একা নয়, বিচ্ছিন্ন নয়, দুর্বল নয়। তারা ভয় পেত। বুঝে যেত যে কারও বউকে চুরি করা, কারও বোনকে উত্ত্যক্ত করা, কারও মেয়েকে ধর্ষণ করা কারও ভাইকে বা কারও বাবাকে হত্যা করা যাবে না। কিন্তু তা হয় না আর আজকাল। খুনের দৃশ্যের দর্শকেরা জানে, যে যেখানে দাঁড়িয়ে সে একাই দাঁড়িয়ে। সে বিচ্ছিন্ন নাগরিক। আইনের সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন, সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন। সে নৈরাষ্ট্রের নৈনাগরিক। কিন্তু একজন মাস্তান, সন্ত্রাসী, ক্যাডার, নেতা যখন একটা আঙুলও তোলে, মানুষ বুঝে যায় সেই আঙুলের পেছনে পাওয়ারফুল বডি আছে।

    Reply
  12. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    এই ধরনের ঘটনা এই প্রথম ঘটেছে তা নয়; প্রায়ই আমরা সামাজিক মাধ্যমে এই ধরনের ভিডিও দেখে অভ্যস্ত যে অনেকের উপস্থিতিতেই একজন বা কয়েকজন কাউকে নির্যাতন করছে, অন্যরা তা প্রত্যক্ষ করছেন নির্বিবাদে। আমরা দেখতে পাই, কোনো একজন নারী লাঞ্ছিত হচ্ছেন, কিন্তু অন্যদের এই নিয়ে বিকার নেই। এই ঘটনা তো নতুন নয় যে কেউ কাউকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করছে দেখে উপস্থিত লোকজন হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন বলে কিছু করতে পারেননি। কেননা, এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। তারপরও এই প্রশ্ন যথার্থ যে কেন কেউ এগিয়ে আসেননি, কেন কেউ এগিয়ে আসেন না। এই প্রশ্ন প্রধানত মানবিক, কিন্তু কেবল মানবিক বিবেচনায় এই প্রশ্ন তুলে বেদনা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। এ ধরনের আচরণের জন্য নাম–গোত্রহীন পথচারীদের দোষারোপ করে আমরা সবাই হয়তো সাময়িকভাবে ‘কিছু একটা করার’ সান্ত্বনা পেতে পারব, কিন্তু তাতে এই অবস্থা বোঝা বা তার প্রতিকারের পথ পাওয়া যাবে না। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই এই আক্রমণের সঙ্গে ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে বিশ্বজিৎ দাস হত্যার ঘটনার তুলনা করছেন। সেই হত্যার সুবিচার হয়নি—এই ধারণা কেবল তাঁর পরিবারের নয়, সাধারণ মানুষেরও। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের প্রতিপক্ষ এই বিবেচনায় বিশ্বজিৎই একমাত্র নিহত হয়েছেন, তা নয়; বিরোধী দলের কর্মীদের ওপরে হামলা, নির্যাতন, গুম, হত্যা—প্রকাশ্যে, পুলিশি হেফাজতে এবং অপ্রকাশ্যেও ঘটেছে, ঘটছে। সেই বিষয়ে ‘সতর্ক প্রতিক্রিয়া’, আসলে যা প্রতিক্রিয়াহীনতা বা পরোক্ষ সমর্থন, তা–ই কি এই অবস্থার পটভূমি তৈরি করেনি?

    যেকোনো হামলার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানেন না হামলাকারী কারা, কারা হন্তারক; কিন্তু তাঁদের মনে এই আশঙ্কা থাকে যে এদের পেছনে আছে ক্ষমতাশালীরা। ক্ষমতার জোর না থাকলে, রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন, অন্ততপক্ষে ইংরেজিতে যাকে বলে ‘টার্নিং আ ব্লাইন্ড আই’–এর নিশ্চয়তা না থাকলে আজকের বাংলাদেশে কারও পক্ষেই যে নিজের ক্ষমতা দেখানোর সুযোগ নেই, এটুকু নাগরিকেরা বোঝেন। সেই বোধবুদ্ধি দিয়েই তাঁরা দর্শক হন, বড়জোর ভিডিও করেন। প্রতিরোধ করার তাগিদও সম্ভবত তাঁরা বোধ করেন, কিন্তু সাহস করেন না। যে সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি সর্বব্যাপ্ত হয়ে উঠেছে, সেখানে এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। ভয়ের সংস্কৃতি, আতঙ্ক ও সন্ত্রাস যার উপাদান, তার ক্রমাগত বিস্তারের দিকে তাকিয়ে ২০১৪ সালে লিখেছিলাম যে ভয়ের সংস্কৃতি মানুষকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত করে, তাঁর প্রতিরোধের শক্তিকে চূর্ণ করে দেয় অত্যাচার, অনাচার, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা যে নিষ্ক্রিয়, তার আরেকটি কারণ হচ্ছে সমাজের অভ্যন্তরের পরিবর্তন। তিনটি প্রবণতা এখন বাংলাদেশের সমাজের বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে—অসহিষ্ণুতা, প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা এবং হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার মানসিকতা। বাংলাদেশের সমাজে উপস্থিত অসহিষ্ণুতার প্রকৃতি ও পরিসর বুঝতে হলে সামাজিক মাধ্যমের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। সামান্য ভিন্নমতকে কেন্দ্র করে যে ধরনের মন্তব্য প্রকাশিত হয়, তাতেই বোঝা যায় যে এখন কেবল একমত হওয়াই হচ্ছে ব্যক্তির কাজ; দল ও মতের অন্ধত্ব এখন সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। এই অসহিষ্ণুতা এক দিনে তৈরি হয়নি। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে যখন ভিন্নমতকে দমন করা হয়, রাষ্ট্র এবং ক্ষমতাসীনেরা যখন ভিন্নমতকে দেশদ্রোহের মতো করেই বিবেচনা করে, যখন যেকোনো ধরনের ভিন্নমত ‘ষড়যন্ত্র’ বলে চিহ্নিত, তখন নাগরিকদের মধ্যে সহিষ্ণুতার বিকাশ হবে—এমন আশা করা বাতুলতা। উপরন্তু, এই অসহিষ্ণুতা এখন ঘৃণায় রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশে যে কোনো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি, মানুষ যে কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপরে আর ভরসা রাখে না, তার একটা প্রমাণ হচ্ছে যেকোনো ঘটনার পরে ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি করেন। ক্ষমতাসীনদের নিকটজনেরাও এখন আর প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের ওপরে ভরসা না রেখে সাধারণ মানুষের সামনে এসে দাঁড়ান; তার সাম্প্রতিক প্রমাণ হচ্ছে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজের ভাগনে অপহৃত হওয়ার পরে তিনি ফেসবুকে সাধারণ মানুষের সাহায্য চান। রিফাত শরীফকে যখন আক্রমণ করা হয়েছে, হত্যা করার রামদার আক্রমণে রক্তাক্ত করা হয়েছে, তখনো মানুষের মধ্যে এই আস্থা থাকেনি যে এদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া যায়। রিফাতের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আগামী কয়েক দিন আমরা সবাই আলোচনা করব, আক্রমণকারীদের কেউ কেউ হয়তো গ্রেপ্তারও হবে, কিন্তু আয়েশা আক্তার তাঁর স্বামীর, দুলাল শরীফ তাঁর সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার পাবেনই—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপরে আপনি কি ভরসা করতে পারেন?

    Reply
  13. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    আগে ছেলেমেয়েরা এদিক-সেদিক চলাফেরা করলে টিসির ব্যবস্থা ছিল। তখন টিসি একটা ভয়ঙ্কর বিষয় ছিল। ভয়ভীতিটা আগে প্রচণ্ড রকমভাবে কাজ করত। এখন সেই অনুশাসনগুলো একেবারে আলাদা হয়ে গেছে। ফলে আমরা অনেকটা অসহায়ের অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছি। বাবা-মা পরিবারে যে অনুশাসনগুলো ছেলেমেয়েদের দিত, সেটি এখন কোনোভাবেই দিতে পারে না। ফলে নতুন নতুন উপসর্গ দেখতে পাচ্ছি- বাবা ছেলেকে মেরে ফেলছে, ছেলে বাবাকে মেরে ফেলছে, এক রিলেশনশিপ ভেঙে নতুন রিলেশনশিপ গড়ে তোলা, মেরে ফেলা ইত্যাদি। এই নতুুন উপসর্গের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে পশু প্রবৃত্তি আবার নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নতুন জীবনে প্রবেশ করার কারণে আমাদের টাকার গরম, লোভ, দ্রুত যে কোনো জিনিস পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এসব কিছু বাড়ছে। কিন্তু সেভাবে আমাদের পুলিশ ব্যবস্থা, আমাদের কোর্ট, প্রিজন ইত্যাদি ঢেলে সাজাতে পারিনি। ফলে রাষ্ট্রীয়ভাবে যদি আমরা অনুশাসনের কথা বলি, তাহলে দেখতে পাব কোনো না কোনোভাবে পুলিশের দুর্নীতি, অনিয়ম চোখে পড়ছে। আমরা নুসরাতের ঘটনার কথাও বলতে পারি। তারা বারবার অপরাধীদেরই সহায়তা করেছে। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা কোনোভাবে সাপোর্ট পাচ্ছে না। একইভাবে প্রিজন ও সংশোধনাগারের কথাও বলতে পারি। তাদের এসব বিষয় থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য কি আমরা অবস্থা তৈরি করতে পেরেছি? আমাদের সমাজে যে এসেন্স দেওয়ার কথা- মানবিক হওয়া, মূল্যবোধগুলো প্রগ্রেসিভ করা এসবও দিতে পারিনি। আমরা একটা ভঙ্গুর অবস্থায় আছি।
    বরগুনায় যে ঘটনাটি ঘটল, সেটি বারবার ঘটতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা সমাজের এসব বিষয় অ্যাড্রেস করতে না পারব। পুলিশ এখানে কিছুই করতে পারে না। এখন আগের মতো কেউ কোথাও যদি আঘাতপ্রাপ্ত হয় তাহলে সবাই মিলে যে রক্ষা করবে সেটি হচ্ছে না। তবে গ্রামের মধ্যে এই বিষয়টি আছে। শহরে মানুষ নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি চিন্তা করে। এরপর হচ্ছে যে সোসাইটিতে এ ধরনের কোনো কাজ করবেন, সে সোসাইটি যদি আপনাকে পুরস্কৃত না করে আরও ভোগান্তির মধ্যে ফেলে দেয় তাহলে কে যাবে রক্ষা করতে? বাঁচাতে গিয়ে যদি তাকেই নিপীড়নের শিকার হতে হয়, বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, কোর্টে বারবার যেতে হয় তাহলে তো সে নিজেই আরেকভাবে ভিকটিম হয়ে যাবে। তাই এই বিষয়টিও কাজ করে এগিয়ে না আসার ক্ষেত্রে। আগে জনসভায় হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হতো। কিন্তু সমাজ পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে প্রতিবাদী মানসিকতা কমে গেছে। এক ধরনের আত্মবাদী হয়ে যাচ্ছে মানুষ। উন্নত বিশ্ব কিন্তু বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে এসব মানবিক কাজে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের দেশে এসব দেখা যাচ্ছে না। এখন মানবিকতা জিনিসটাই উঠে গেছে। এই ট্রানজিশনাল সোসাইটিতে এটা থাকবে না- এটাই স্বাভাবিক। তাই আমাদের সোসাইটি শেষ হয়ে গেছে যারা বলেন, তারা কিন্তু আবেগে কথাটি বলেন। একাডেমিক জায়গা থেকে যদি বলি তাহলে এটাই কিন্তু স্বাভাবিক। কারণ এসব বিষয় মানুষ প্রাইমারি লেভেলে স্যোশালাইজড হওয়ার মাধ্যমে পেয়ে থাকে। আর আমাদের সে রকম কোনো বিকল্প সামাজিক ইনস্টিটিউশনই গড়ে ওঠেনি। কাজেই সবার আগে আমাদের এই জায়গায় গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আমরা যে অবস্থার মধ্যে আছি, সেখানে এ রকম আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। উন্নত বিশ্বের ট্র্যাডিশনাল সোসাইটি যেগুলো আছে, সেসবের বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মানুষের এই পশু প্রবৃত্তি খুব একটা দমন করা যায়নি। আফ্রিকান যেসব ট্র্যাডিশনাল সোসাইটি রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে- হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া, মানুষকে কিল-ঘুষি, চড়-থাপ্পড় দেওয়া, গালিগালাজ করা। এসব কিন্তু আবার ইউরোপ ও আমেরিকায় দেখা যায় না। এসবকে তারা কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হলো সামাজিকীকরণ, পরিবার, স্কুলিংসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ছাড়া রাষ্ট্রের বিধান অনুযায়ী অন্যায় করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে যখন আমরা লোডশেডিং দেখেছি, ব্ল্যাক আউট হয়েছে- তখন মানুষ লুটপাটসহ সবই করেছে। তার মানে হচ্ছে, মানুষের মধ্যে এই প্রবৃত্তিটা থাকে। এই প্রবৃত্তিটা দমন করার জন্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুশাসন প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের ট্র্যাডিশনাল সোসাইটিতে এই জিনিসগুলোর দারুণ অভাব বলে আমরা যত্রতত্র এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখি।

    Reply
    • সৈয়দ আলি

      নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, খুব ভালো বিশ্লেষন করেছেন। সাথে আমি যোগ করতে চাই, সমাজের নেতৃত্ব যেভাবে এমন সব মানুষের হাতে চলে গেছে যারা শৈশবে ভাল কথা বলা বা উদার হওয়ার শিক্ষাই পায়নি। এরা সমাজের অন্যায় ও অসঙ্গতি দুর করবে কি করে? এদের লুট করা টাকাই এদেরকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে গ্রহনযোগ্যতা দিয়েছে।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—