ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তার কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হলেও দেশ- কালের সীমা অতিক্রম করে তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী একাত্তরের ঘাতক দালাল ও পাক হানাদার বাহিনীর সাহায্যকারী শক্তির বিরুদ্ধে তার জীবন-সংগ্রাম, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তার আপসহীন লড়াই তাকে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাক-হানাদার বাহিনীর সহযোগী ঘাতক দালাল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গত শতাব্দীর নয়ের দশকে বাংলাদেশে উত্তাল গণ সংগ্রাম হয়েছিল, তার ফলে সেই দেশ আজ আবার একটা গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ পরিকাঠামোর ভেতরে নিজেকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনকে বাংলাদেশের মানুষ তাদের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধের ‘দ্বিতীয় পর্যায়’ বলে অভিহিত করে থাকেন।

মুক্তিযুদ্ধের সেই ‘দ্বিতীয় পর্যায়’টি  নির্যাস আজ  কেবল  বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ নেই। জাহানারা ইমাম তার ঐতিহাসিক আন্দোলনের ভেতর দিয়ে নিজেকে গোটা বিশ্বের মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধাপরাধ এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের এক জীবন্ত প্রতীকে পরিণত করেছেন।

জাহানারা ইমামের জন্ম অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে ১৯২৯ সালের ৩ মে। তার পিতা সৈয়দ আবদুল বারী ছিলেন পেশায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম ছিলেন সে যুগের এক বিশিষ্ট বিদুষী মহিলা। রাঢ় বাংলার অভিজাত  মুসলিম পরিবারের নিজস্ব আয়মাদারির ভেতরেই জাহানারার শৈশব -কৈশোর কাটলেও তার পরিবারে কিন্তু মেয়েদের আধুনিক শিক্ষার ব্যাপারে কোনো রক্ষণশীলতা ছিল না। তাই কোনও রকম পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ১৯৪২ সালে জাহানারা ম্যাট্রিক পাস করেন।

১৯৪৪ সালে তিনি রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ পাস করে ‘৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ। সেখান থেকেই  ‘৪৭ সালে তিনি বিএ পাস করেন। ‘৪৮ সালে তিনি ময়মনসিংহ শহরের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা পদে যোগ দেন। ‘৪৯ সাল পর্যন্ত সেই স্কুলে শিক্ষকতা করেছিলেন। এরপর চলে আসেন ঢাকায়। যোগ দেন সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে।

১৯৬০ সাল পর্যন্ত এই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা দায়িত্ব তিনি অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে পালন করেছিলেন। এই সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং শিক্ষা বিজ্ঞানের উচ্চতর গবেষণার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানকার একটি সার্টিফিকেট কোর্স অত্যন্ত যোগ্যতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকায় ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ উপাধি প্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকাতেই বুলবুল একাডেমী নামে এক কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন।

পূর্ব পাকিস্তানের শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে এ ধরনের স্কুলের প্রচলন তখন প্রায় ছিলই না। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জাহানারা ইমাম কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক ভাষা বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার স্বামী শরিফ ইমাম ছিলেন পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। মহান মুক্তিযুদ্ধে জাহানারা ইমামের পুত্র শফি ইমাম রুমী শাহাদাত বরণ করেন ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কালের সেই দুঃখ ভেজা দিনগুলোর কথা টুকরো টুকরো ছেঁড়া ছেঁড়া কাগজের লিপিবদ্ধ করে রাখতেন জাহানারা। একটা গোটা খাতাতে সে দুঃখজ্বালা লিপিবদ্ধ করার সাহস হতো না, পাছে পাক-হানাদার বাহিনী এসে তার পুত্র, মুক্তিযোদ্ধা রুমির তল্লাশির নামে সে খাতাখানিকেও নষ্ট করে দেয়, এই ছিল ভয়।

দেশ স্বাধীন হবার অনেক পরে, বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বরণেরও পরে যুদ্ধাপরাধী ঘাতক দালালেরা আবার দেশের মাটিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দেখে বুকের ভিতর জমিয়ে রাখা কান্নাকে ক্রোধে রূপান্তরিত করে, সেই সব হারানো, ছেঁড়া, টুকরো টুকরো কাগজ গুলিকে একত্র করে জাহানারা ইমাম রচনা করেন ‘একাত্তরের দিনগুলি’। এ বইটিকে শুধু বাংলাদেশের মানুষ নন, গোটা বিশ্বের মানবাধিকারের পক্ষের মানুষজন বলে থাকেন- ‘বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের টেস্টামেন্ট।‘

অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে একাত্তরের ঘাতক দালাল, কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে বাংলাদেশে ফিরে আসবার অনুমতি দেওয়ার পরই জাহানারার অন্তরাত্মা থেকে যুদ্ধাপরাধী ঘাতক দালালদের বিরুদ্ধে ক্রোধের এই  স্ফুলিঙ্গ উৎসারিত হতে শুরু করেছিল।

খালেদা জিয়া প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পায় এবং একাত্তরের ঘাতক হিসেবে সব থেকে বেশি নিন্দিত জামায়াতে ইসলামী এই গোলাম আযমকে ‘৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর তাদের দলের আমির হিসেবে ঘোষণা করার  করে।

গোটা বাংলাদেশের মানুষের এই ঘটনার প্রেক্ষিতে  ক্ষোভের ফল্গুধারাকে প্রবাহমান নদীর স্রোতে পরিণত করেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। একাত্তরের ঘাতক-দালালদের সমস্ত কুকীর্তির তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ তিনি তৈরি করলেন ‘গণ তদন্ত কমিশন’। এই কাজে তার পাশে সব রকমের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল।

সুফিয়া কামাল  নিজে এই গণ তদন্ত কমিশনের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে থেকে শামসুর রাহমান, কলিম শরাফী, কবীর চৌধুরী, আহমেদ শরীফ, দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, অনুপম সেন, বদরুদ্দীন উমর, শওকত ওসমান প্রমুখ মুক্তবুদ্ধির মানুষদের সঙ্গে নিয়ে এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার মানবিক সহযোগিতাকে সম্বল করে তথ্য অনুসন্ধানের কাজটি সমাপ্ত করলেন।

‘৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ জন সদস্যকে নিয়ে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি তৈরি হয়েছিল, সেই কমিটি অল্প সময়ের ভেতরে গোটা বাংলাদেশ জুড়ে ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি (‘৯২) পরিণত হয় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ হিসেবে।শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হন এই সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক। সাংগঠনিকভাবে এই কাজে তার সব থেকে বড় সহায়ক শক্তি ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংস্কৃতিকর্মী সৈয়দ হাসান ইমাম।

জাহানারা ইমামের ছিল অপূর্ব সাংগঠনিক দক্ষতা। তার অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের জেরে  তিনি পরস্পর বিপরীত মেরুতে অবস্থানকারী কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা কিংবা সারস্বত জগতে চরম ব্যক্তিত্বের সংঘাতে লিপ্ত কবীর চৌধুরী এবং আহমেদ শরীফকে ঘাতক-দালালদের শাস্তির দাবিতে এক মঞ্চে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

গণ তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ‘৯২ সালের ২৬ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের কুখ্যাত ঘাতক দালাল গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে ন্যুরেনবুর্গের বিচারের অনুসরণে গণ আদালত অনুষ্ঠিত হয়। এই গণ আদালতের সদস্য হিসেবে ছিলেন বঙ্গজননী সুফিয়া কামাল, কবি শামসুর রাহমান, শিল্পী কলিম শরাফি, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, অধ্যাপক আহমদ শরীফ, অ্যাডভোকেট গাজীউল হক, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, আবু ওসমান চৌধুরী, বিচারপতি অনুপম সেন প্রমুখ ।

গণআদালত সংগঠনে শহীদ জননীকে সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহের বিশেষভাবে সাহায্য করেছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের পত্নী পান্না কায়সার ও কন্যা শমী কায়সার। এই গণআদালত সার্বিকভাবে বাংলাদেশের সমাজ জীবনে একাত্তরের ঘাতক-দালালদের সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে একটি আশাবাহী বার্তা বয়ে আনে। খালেদা জিয়ার সরকার, যেই সরকারের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াত ইসলাম। একাত্তরের কুখ্যাত ঘাতক ও দালাল মতিউর রহমান নিজামী পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের কৃষিমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনিসহ যুদ্ধাপরধাধীরা প্রত্যেকেই ভয়ঙ্কর রকমভাবে রুষ্ট হন শহীদ জননী জাহানারা ইমামসহ গোটা গণআদালত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধির মানুষজনদের উপরে।

গণআদালতের সঙ্গে যুক্ত ২৪জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অজামিনযোগ্য মামলা দায়ের করে খালেদা জিয়া সরকার। প্রবল গণরোষের প্রেক্ষিতে কার্যত বাংলাদেশের হাইকোর্ট বাধ্য হয়েছিল বাংলাদেশের বিশিষ্ট এই ২৪ জন নাগরিকের জামিন মঞ্জুর করতে। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই প্রবল বিরোধিতার মধ্যেই ক্যান্সার আক্রান্ত জাহানারা ইমাম লাখো মানুষের পদযাত্রা নিয়ে ‘৯২ সালের ১২ এপ্রিল গণ আদালতের রায় কার্যকর করার দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি জাতীয় সংসদের স্পিকার,  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে সেই সময়ের  বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনার হাতে অর্পণ করেন।

তৎকালীন জাতীয় সংসদের ১০০ জন সাংসদ প্রকাশ্যে গণ আদালতের রায়কে সমর্থন করেন। শহীদ জননীর নেতৃত্বাধীন গণ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। গণ-স্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান, ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচির ভেতর দিয়ে আন্দোলন এক বেগবান ধারায় পর্যবসিত হয়। খালেদা জিয়ার সরকার বাধ্য হয়ে সংসদে চার দফা চুক্তির কথা বলেন। আন্দোলন চলতেই থাকে।

‘৯৩ সালের ২৮ মার্চ নির্মূল কমিটির সমাবেশে খালেদা জিয়ার সরকার বর্বরোচিত আক্রমণ চালায়। পুলিশের লাঠিতে গুরুতরভাবে আহত হন ক্যান্সার আক্রান্ত শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। তার আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে, তাকে পিজি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে হয়েছিল। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গোটা বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্তর্জাতিক মাত্রা লাভ করে ।

আন্তর্জাতিক স্তরে মানবাধিকার আন্দোলনের জীবন্ত কিংবদন্তী হিসেবে অভিহিত করা হয় শহীদ জননীকে। জাহানারা ইমামের এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফলে খুনি মেজর চক্র পাকিস্তান এবং আমেরিকার সহায়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করার পর গোটা বাংলাদেশকে যে আবার পাকিস্তানের ছায়া উপনিবেশে পরিণত করার ঘৃণ্য চক্রান্ত করেছিল, তা থমকে যায়। তার এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সে দেশে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সেই সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই গণ আদালতের রায়কে সম্মান জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখেই শেখ হাসিনা একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারের জন্য বিশেষ  ট্রাইব্যুনাল তৈরি করেছিলেন। চুলচেরা বিচারে তাদের দোষী সাব্যস্ত করে সেই ট্রাইবুনাল কাদের মোল্লাসহ একাধিক যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির আদেশ দেয়।  শেখ হাসিনা সরকার সেই আদেশ কার্যকর করে।

‘৯৪ সালের ২৬ জুন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যু হলেও আজও বাংলাদেশসহ গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে মৌলবাদ ,সাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম অত্যন্ত জীবন্ত একটি নাম। একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত করার পাশাপাশি জাহানারা ইমামের লেখা অন্য জীবন, জীবন মৃত্যু, নিঃসঙ্গ পাইন, বুকের ভিতর আগুন, নাটকের অবসান, দুই মেরু, প্রবাসের দিনলিপি, ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস ইত্যাদি গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের এক চিরকালীন সম্পদ।

Responses -- “শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই”

  1. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ মধ্যপন্থার রাজনীতির ধারক বাহক হলেও ১৯৭১-৭৫ সালে বিশ্ব ও দেশীয় বাস্তবতায় বামমুখিনতার দিকে তাকে তাকাতে হয়েছিল, বামপন্থার বিপ্লবী উত্থানের ঘুরপাকে বাংলাদেশ তখন অনেকটাই অস্থির ছিল। এ ধরনের অবস্থায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছিল। এর মাধ্যমে ডানপন্থার রাজনীতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠার সুযোগ লাভ করে। ১৯৯০ পর্যন্ত এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে যে রাজনীতি দেশে বিকশিত হয়েছিল তাতে উদার বা মধ্যপন্থার রাজনীতি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার স্তরে পৌঁছাতে পারেনি।বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ মধ্যপন্থার রাজনীতির ধারক বাহক হলেও ১৯৭১-৭৫ সালে বিশ্ব ও দেশীয় বাস্তবতায় বামমুখিনতার দিকে তাকে তাকাতে হয়েছিল, বামপন্থার বিপ্লবী উত্থানের ঘুরপাকে বাংলাদেশ তখন অনেকটাই অস্থির ছিল। এ ধরনের অবস্থায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছিল। এর মাধ্যমে ডানপন্থার রাজনীতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠার সুযোগ লাভ করে। ১৯৯০ পর্যন্ত এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বে যে রাজনীতি দেশে বিকশিত হয়েছিল তাতে উদার বা মধ্যপন্থার রাজনীতি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরস্পরবিরোধী আদর্শ ও অবস্থানের রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটেছে তাতে বিরোধ-সংঘাতের আদর্শিক বীজ খুব গভীরে লুকায়িত রয়েছে। যতোক্ষণ পর্যন্ত দু’টো জোটের প্রধান দু’টো দলই মতাদর্শগতভাবে কাছাকাছি-স্পষ্ট করেই বলছি গণতন্ত্রের উদারবাদী আদর্শের খুব কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে পরিণত না হচ্ছে (একটি হলে চলবে না) ততক্ষণ পর্যন্ত পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির একটির অবস্থান মধ্যপন্থার কাছাকাছি হলেও অন্যটি দক্ষিণ মেরুতেই সরে থাকা বা যাওয়ার কারণে দূরত্ব, দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বিদ্যমান থেকেই যাবে। এই বাস্তবতা খুব সহজে নিরসন হবে-তা বলা মুশকিল। তবে তাদের মধ্যে সহঅবস্থানের পন্থা বা কৌশল বা অবস্থা নীতিগুলো কী হবে তা বোধ হয় নির্ধারণ খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এতদিনেও এই দুই দল বা জোটের মধ্যে সহঅবস্থানের কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক নিয়ম-নীতি তৈরি হয়নি। ফলে একদল ক্ষমতায় গেলে অন্য দলের অবস্থান অবস্থা একেবারেই ভিন্ন থাকে। এ ক্ষেত্রে আমরা সবকিছুকে আবার এক করে দেখার চেষ্টাও করছি। ক্ষমতায় দুই দল বা জোটের অবস্থান ও কার্যক্রম কিন্তু চরিত্রগতভাবে একরকম ছিল না। তফাত্গুলো বোঝার মধ্যে দেখা যায় যথেষ্ট বৈরি আচরণ বিদ্যমান ছিল বা আছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক আচরণ বলতে যা বোঝায় তার অনুপস্থিতি কোনো কোনো দিক থেকে প্রবল, কোনো দিক থেকে কম ছিল মাত্র। ফলে এক ধরনের বৈরি সম্পর্ক নিয়েই দুই দলের বা জোটের রাজনীতি ক্রিয়াশীল রয়েছে। যুক্তির শাসন মানার ক্ষেত্রে এক পক্ষের অনীহাই অন্য পক্ষকে অসংযত করে ফেলতে পারে। তেমনটিই ঘটছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে যে সব দীর্ঘদিনের ক্ষত রয়েছে সেগুলোকে সংবেদনশীলতা দিয়ে দেখার সংস্কৃতির কথা গুরুত্ব দিয়ে উপলব্ধি করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও গলাবাজির রাজনীতিকে পরিহার করে মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার চর্চাকে দল বা জোটে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। এসবই মধ্যপন্থার রাজনীতির উপজীব্য বিষয়। দেশের আর্ত-সামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের পশ্চাত্পদতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্যে অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ এবং জনসাধারণকে আধুনিক ধ্যান-ধারণায় বেড়ে উঠার রাষ্ট্র গঠনে উভয়পক্ষকেই মেরুর নীতি নয়, যুক্তি ও চর্চার নীতি অনুসরণ করতে হবে। তবেই আধুনিক বিশ্ব বাস্তবতায় রাজনীতি সংস্কৃতি সংঘাতের পরিবর্তে সহঅবস্থানে পরিচালিত হওয়ার পরিবেশ লাভ করবে।

    Reply
  2. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক সভায় মোজাফফর আহমদ বলেছিলেন, ‘আজ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের যে প্রস্তাব আনা হয়েছে, সেটি আমাদের নেতা মাওলানা ভাসানীর একক কিংবা কোনো একটি দলের দাবি নয়। এটি হলো পূর্ব পাকিস্তানের ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের দাবি। এটি আবেগের কিংবা ভোট লাভের স্লোগান নয়। এটি হলো প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত অভ্যন্তরীণ সব ব্যাপারে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত এ অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা।’আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছে এবং রণাঙ্গেন উপিস্থত না থাকলেও এর নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই যুদ্ধে অন্যান্য দলের কোনো ভূমিকা ছিল না। দল কেন; সেনা, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, ছাত্র-তরুণ, নারী, বাঙালি-অবাঙালিসহ সর্বস্তরের মানুষেরই ভূমিকা ছিল। আর যুদ্ধটাও একাত্তরের ২৬ মার্চ শুরু হয়নি। শুরুরও আগের শুরু ছিল। বামপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। এটাই ইতিহাসের সত্য।
    স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতিতে বামপন্থীদের বিচ্যুতি বা দুর্বলতা যত প্রকটই হোক না কেন, স্বাধীনতা-পূর্ব রাজনীতি তথা মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের ভূমিকা খাটো করে দেখার উপায় নেই। ষাটের দশকের মাঝামাঝি বামপন্থীরা মস্কো ও বেইজিং—দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মণি সিংহ, মোজাফফর আহমদ, খোকা রায়, মোহাম্মদ ফরহাদ, মতিয়া চৌধুরী, পঙ্কজ ভট্টাচার্য প্রমুখ ছিলেন মস্কো শিবিরে। আর বেইজিং শিবিরে ছিলেন মাওলানা ভাসানী, কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো প্রমুখ। এ বিভাজন সত্ত্বেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তবে বেইজিংপন্থীদের যে অংশটি ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তারা স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। ভারতে মস্কোপন্থী বামপন্থীরা সিপিআইেয়র সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছিল। তখন ইন্দিরা গান্ধী ও কংগ্রেসের ওপর দারুণ প্রভাব ছিল সিপিআইয়ের। অন্যদিকে বেইজিংপন্থী অংশ সিপিআইএমের সমর্থন পেলেও কংগ্রেসের নীতিনির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। একাত্তরে ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে আলাদা গেরিলা বাহিনী গঠিত হয়েছিল। ছয় হাজার কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তারা দেশের ভেতরে পাঠিয়েছে। বেইজিংপন্থীদের নিয়ে গঠিত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি দেশের ভেতরে ঘাঁটি স্থাপন করে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। অনেকে ভারতে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। কিন্তু বামপন্থীরা শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের উগ্রবাদী অংশের বিরোধিতার মুখে পড়েন। এ কারণে অনেক নেতা–কর্মী যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিলে ভারত রণকৌশল হিসেবে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি সই করে। এর আগেই অবশ্য বিচক্ষণ তাজউদ্দীন মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয় রূপ দিতে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন এবং বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধিদলেও বামপন্থীদের যুক্ত করেন। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে যে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন ছিল, সেটি অনেকটাই অনুপস্থিত ছিল। এর জন্য আওয়ামী লীগের একদেশদর্শী নীতি বেশি দায়ী, না বামপন্থীদের হঠকারিতা—তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। সেই সময়ে প্রধান বিরোধী দল ন্যাপ কিংবা সিপিবির কাছ থেকেও মানুষ ভিন্ন ভূমিকা আশা করেছিল। আগ বাড়িয়ে সব বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতার নীতি না নিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নিতে পারলে হয়তো তারাই সত্যিকার বিরোধী দল হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু সেটি তারা করতে পারেনি বলেই শূন্যস্থানটি পূরণ করে আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আসা জাসদ। রুশ-ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়ে দলটি রাজনীতি শুরু করলেও তাদের আসল খুঁটি কোথায় ছিল তা এখনো রহস্যাবৃত। বাহাত্তরে তারা যাকে ‘চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক’ বলে অভিহিত করেছিল, ২০০৮ সালে তাদের সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধে দলের একাংশ।

    Reply
  3. গোলাম মোহাম্মদ

    কাগমারী সম্মেলনে ভাসানী পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে ১৮ই মার্চ আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর ২৫শে জুলাই তার নেতৃত্বে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ (ন্যাপ) গঠিত হয়। ন্যাপ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাসানী প্রকাশ্যে বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং এর পর থেকে সবসময় বাম ধারার রাজনীতির সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ‘কাগমারী সম্মেলনের পর ভাসানীর পক্ষে আর আওয়ামী লীগে থাকা সম্ভব হয়নি, যদিও দলের কেন্দ্রীয় নেতারা চাননি তিনি দল ছেড়ে চলে যান। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, যদিও তাকে পদত্যাগ না করতে তার স্নেহভাজন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বিশেষভাবে পীড়াপীড়ি করেন।’ ঐতিহাসিক এই কাগমারী সম্মেলনেই মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীকে তার ঐতিহাসিক ‘আসসালামো-আলায়কুম’ জানিয়েছিলেন। যা ছিল আমাদের স্বাধীনতার ইঙ্গিতবাহী সালাম। সেই সম্মেলনে ভাসানী পাকিস্তানি শাসকদের হুঁশিয়ার করে বলেন, যদি পূর্ব পাকিস্তানে শোষন অব্যাহত থাকে তবে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে “আসসালামু আলাইকুম ” জানাতে বাধ্য হবেন। ষাট দশকের রাজনীতির বিভ্রান্তি ও ক্রমাগত বিভক্তি এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক সম্পর্কগুলি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারনে একটি সামরিক স্বৈরাচারী সরকার অনেকটাই নিরাপদ থেকেছে। প্রগতিশীল শক্তির বিপর্যস্ততা ও অনৈক্য রাজনীতিতে বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রবল উত্থান ঘটায়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নতুন জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার ও স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি সামনে নিয়ে আসে। পঞ্চাশ দশক জুড়ে বাঙালীদের উঠতি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত তারুণ্যের প্রবল জাগরন ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার বিষয়টি ষাট দশকে এসে বেপথু হয়ে পড়ে এবং কথিত শ্রেনী সংগ্রামের কানাগলিতে ঢুকে খেই হারিয়ে ফেলে। এজন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী, গণসংগঠনের অভ্যন্তরে কর্মরত কমিউনিষ্ট মতাদর্শের অনুসারী নেতৃত্বের তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি ও সমাজ বিশ্লেষণে সনাতনী ধারনা। ফলে সামরিক স্বৈরাচার ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রবল সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায় এবং পরিনামে উঠতি বুর্জোয়াদের সংগঠন আওয়ামী লীগ সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য সম্ভাব্য হুমকিতে পরিনত হয়। চীনা পার্টির বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে জনচাহিদা অনুযায়ী যথার্থ রাজনৈতিক লাইন গ্রহনে ব্যর্থ পিকিংপন্থীদের প্রায় সকল দল-উপদল গণআন্দোলন ও গণসংগ্রাম পরিত্যাগ করে। চীন বিপ্লবের অনুকরনে গ্রাম থেকে শহর ঘেরাওয়ের কর্মসূচি গ্রহন করে, গোপন ও সশস্ত্র কার্যকলাপকে একমাত্র মোক্ষ হিসেবে গ্রহন করা হয়। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানের আগেই এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। অন্যদিকে মস্কোপন্থীরা রাজনৈতিক কর্মকান্ডে ক্রমশ: আওয়ামী লীগের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম আগে নাকি শ্রেনী সংগ্রামের বিষয়টি বেশি প্রধান্য পাবে, বামপন্থীরা এই মৌলিক প্রশ্নের বিষয়ে সবচেয়ে বড় ভুলটি করে বসেছিলেন। যার প্রভাব ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পড়েছিল এবং সে সময়েও পিকিংপন্থীরা চরম বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছিলেন। এ সময়কালে উঠতি বুর্জোয়া, মুৎসুদ্দী ও গণমানুষের জাতীয়তাবাদী আকাঙ্খা সঠিকভাবে প্রকারান্তরে ধারন করেছিল আওয়ামী লীগ এবং ধারাটিকে অনেক দুর অবদি এগিয়ে নিয়েছিল। যদিও বাম রাজনৈতিক ধারাসমূহের নেতৃত্বে এক দীর্ঘ শ্রেনী সংগ্রামের ইতিহাস সে সময়ে রচিত হয়েছিল, কিন্তু বিচ্ছিন্ন কিছু শ্লোগান ছাড়া বাঙালীর প্রশ্নে তারা সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারেনি। আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদকে উপেক্ষা করেই ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বর মাসে শেখ মুজিব দলের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা হিসেবে আওয়ামী লীগের কর্মকান্ড পরিচালনা শুরু করেন। অন্যদিকে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ আগে থেকেই রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি ১৯৬৩ সাল জুড়ে শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করে, যা অবাঙালী বৃহৎ পূঁজিপতিদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার শোষনের চিত্রটি জনগনের সামনে সবচেয়ে জনপ্রিয় ইস্যু হিসেবে নিয়ে আসেন। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন কলোনী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানকে উল্লেখ করে বলেন, এই প্রদেশ এখন শিল্পপতিদের বাজারে পরিনত। তিনি মনে করিয়ে দেন, এখানকার সম্পদ লুটপাট করে পাকিস্তানী পূঁজিপতিদের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠছে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিল একেবারেই অরক্ষিত ও নিরাপত্তাহীন। চীন এই যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ায় পিকিংপন্থীরা ব্যাপক বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য সরকারকে দায়ি করে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি জোরালো করে তোলে। ১৯৬৬ সালে ঘোষিত ছয় দফা কর্মসূচি পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন করার দাবি না হলেও সরকার এটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিকল্পনা আঙ্খ্যায়িত করে আওয়ামী লীগের প্রায় সকল নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে এবং দমন-পীড়ন বৃদ্ধি করে। পিকিংপন্থীরা এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানায়নি, ছয় দফা সম্পর্কেও আগ্রহ দেখায়নি।

    Reply

Leave a Reply to গোলাম মোহাম্মদ Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—