[হিন্দুস্তানের বদমেজাজি বাদশাহ শাহরিয়ার তার তথাকথিত চরিত্রহীনা বেগমের পরকীয়ায় যারপরনাই নারাজ হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন যে প্রতি রাতে তিনি এক যুবতীকে নিকাহ-এ-মুতা করবেন এবং ভোর হলেই এক রাতের সেই বেগমকে কতল করবেন। কয়েক বৎসরে শত শত যুবতী বেঘোরে ইন্তেকাল ফরমালে ক্ষুরধার বুদ্ধিমতী উজিরকন্যা শেহেরজাদি করুণাপরবশ হয়ে ছোটবোন দিনারজাদির সঙ্গে সল্লা করে বাদশা শাহরিয়ারকে নিজেই নিকাহের প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব গৃহীত হয়। জীবনের শেষ রাত্রিতে শেহেরজাদির আবদার রাখতে বাসরঘরে ডেকে আনা হয় দিনারজাদিকে। রাত গভীর হলে পূর্বপরিকল্পনামাফিক শেহেরজাদিকে এক সওয়াল জিজ্ঞাসা করলেন- দিনারজাদি: ‘দিদি, সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং-এ বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান কেন হয় না!’ কালবিলম্ব না করে শেহেরজাদি এই সওয়ালের জওয়াব বাৎলাতে আরম্ভ করলেন।]

শোনো বোন দিনারজাদি! বাংলাদেশে বর্ষাকাল সমাগত। সুতরাং একটি আষাঢ়ে গল্প দিয়ে শুরু করি। যে ইংরেজ কর্মকর্তার নামে ঢাকার র‌্যাংকিং স্ট্রিট, তিনি একবার অফিসিয়াল ট্যুরে যাচ্ছিলেন নারায়ণগঞ্জে। ফুলবাড়িয়া স্টেশনে ট্রেনের পাদানিতে দাঁড়িয়ে সাহেব প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষমান স্ত্রীকে বিদায়চুম্বন দিতে গেলে ট্রেনের অতি দ্রুতগতির কারণে সেই চুম্বন মেমসাহেবের টসটসে গালের বদলে গিয়ে লেগেছিল নারায়ণগঞ্জ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে র‌্যাংকিং সাহেবের জন্যে অপেক্ষমান বুড়ো চাপরাশি ইসমাঈলের থোবড়া গালে।

র‌্যাংকিং সাহেব তার মুখ-ফসকানো সেই চুম্বনসহ ‘নাই’ হয়ে গেছেন আজ কত বছর! কিন্তু বাঙালিরাও সেই থেকে বা তারও অনেক আগে থেকে জীবনের কোনো ক্ষেত্রে কোনো প্রকার র‌্যাংকিং-এর ধারে কাছে ‘নাই’। কৃষি, শিল্প (উভয়ার্থে), সাহিত্য, প্রকাশনা, চিকিৎসাব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, ক্রীড়া, সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনী, দুদক, বিচারবিভাগ, সংসদ… কোন ক্ষেত্রটিতে তারা বিশ্বমানের? তাদের কৃষি সেকেলে। শিল্পজাত দ্রব্য তারা প্রধানত আমদানিই করে। (হুমায়ুন আহমেদ গত হবার পর?) সাহিত্যও তারা অনেকটাই হিন্দুস্তান থেকে আমদানি করে। ওদের শিল্পকর্ম বিশ্বমানের বলা যাবে না। ভাষ্কর্য, বিশেষ করে ঢাকা শহরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মৃণালহকীয় ভাষ্কর্যগুলোর সিংহভাগ অতি কদর্য। চিকিৎসার জন্যে ক্ষমতা থাকলে বাঙালিরা সিঙ্গাপুর যায়, আর অক্ষম হলে যায় ভারতে। খেলাধুলায়ও কি ওদের সেরা বলা যায় (যদিও ক্রিকেট তারা ইদানিং ভালোই খেলছে বটে!)?

ঘনঘন, কারণে-অকারণে আমলাদের বিদেশ পাঠায় বাংলাদেশ সরকার প্রশিক্ষণের জন্যে। কিন্তু আমলাতন্ত্রের দুরবস্থা যে কে সেই। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় রয়েছে দীর্ঘসূত্রিতা আর টাকার খেলা। বেশির ভাগ বাঙালি বুদ্ধিজীবী যে মানের প্রবন্ধ লেখে পত্রপত্রিকায়, যে মানের আলোচনা করে দৃশ্য-শ্রাব্য মিডিয়ায়, সেগুলো পড়ে-শুনে-দেখে মনে হয়, লিখবে বা বলবে কী, এরাতো এখনও চিন্তাই করতে শেখেনি। বাংলাদেশের পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা। হয় ঘুস, নয় ঘুষিতেই বেশির ভাগ কাজ হয় বাংলাদেশে। যে পদ্মাসেতু বানাচ্ছে ভেবে বাঙালিরা আহ্লাদে অষ্টখণ্ড হচ্ছে, সেটি নির্মাণ করতে করতে (পরের মাথা কামিয়ে শিক্ষানবিশ ক্ষৌরকার যেভাবে কাজ শিখে) কাজ শিখছে চীনারা। বাংলাদেশ শুধু টাকার জোগান দিচ্ছে। বোন, বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে ট্রাফিক সিস্টেমের লাল-সবুজ আলো নিজের মতো জ্বলে, গাড়ি ইচ্ছেমতো চলে এবং কেউ কখনও কিছু বলে না।

কোনো কিছুই যেখানে কোন প্রকার র‌্যাংকিং-এ পড়ে না, সেখানে গত কয়েক বছর ধরে সামাজিক ও প্রথাগত গণমাধ্যমে ক্রমাগত হাহুতাশ করা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং নিয়ে। বিশ্ব-র‌্যাংকিং দূরে থাক, এশীয় র‌্যাংকিং-এও নাকি বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নামগন্ধ নেই। চরিত্র কিংবা অর্জনের দিক থেকে প্রাইভেট হোক বা পাবলিক, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই আসলে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়ে ওঠেনি। এগুলো বড়সড় কলেজ মাত্র এবং সে কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং-এ এগুলোর কোনোটিই অন্তর্ভুক্ত কথা নয়। কিন্তু আমজনতাকে সে কথা বোঝাবে কে, বিশেষত এই আওয়াম এবং আমের মৌসুমে?

বাংলায় ‘গরীব’ মানে ফকির, কিন্তু আরবিতে ‘গরিব’ শব্দের অর্থ অদ্ভুত বা অপরিচিত কোনো ব্যক্তি। দশ রকমের দু নম্বরী করে পকেটে কিছু কাঁচা পয়সা আসাতে বাঙালিকে আর ‘ফকির’ বলা যাবে না, কিন্তু গরিব সে অবশ্যই, মননে ও আচরণে। এমন অদ্ভুত হয়ে উঠেছে সে যে তাকে আর চেনা যায় না। তার ‘ঘোরারোগ’ হয়েছে, কারণে-অকারণে ঘুরতে যাচ্ছে সে এদিক-ওদিক, কাটমুণ্ডু, কোলকাতা, ব্যংকক। র‌্যাংকিং হচ্ছে গরীব বাঙালির ঘোড়ারোগ। গরীব মাত্রেই নিরীহ নয়। গরীব এবার আঙ্গুল তুলেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে, প্রধানত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে, যেটি দেশের প্রাচীনতম এবং সম্ভবত প্রধানতম বিশ্ববিদ্যালয়: ‘মনু, তোমরা যে এত হম্বিতম্বি করো, দশ টাকায় ছপ-চমুচা খাও, র‌্যাংকিং-এ তোমরা নাই কেন, হেইয়ে এড্ডু বুঝায়া বলবা?’

যেহেতু সরকার তথা জনগণের টাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয় চলে, সেহেতু কিছুটা জবাবদিহিতাতো থাকেই। ভাত দেবার ভাতার যদি উচিৎ সার্ভিস না পেয়ে কিল দেবার গোঁসাই হয়ে উঠে, তবে আপত্তিই বা করবেন কোন মুখে? এই মাথামোটা গোঁসাইদের বুঝিয়ে বলতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়টা বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র অংশ বই নয়। স্বাস্থ্য হলে সারা শরীরে হয়, হাতটা শুধু স্বাস্থ্যবান, মাথাটা স্বাস্থ্যহীন- এমনটা হয় না। বাংলাদেশের কোনো সেক্টরেই যেহেতু মানসম্পন্ন কিছু হচ্ছে না, সেখানে হঠাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মান উপচে পড়ার কথা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং-এর বাইরে থাকার এই হচ্ছে প্রথম কারণ।

২০১৯ সালের সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি তালিকা রয়েছে আন্তর্জালে। তার অন্তত একটিতে দেখলাম, ১০০টির মধ্যে ৮০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ইওরোপ ও উত্তর আমেরিকায়। বাকি ২০টি বিশ্ববিদ্যালয় চীন, জাপান, কোরিয়া আর সিঙ্গাপুরে অবস্থিত। এশিয়ার সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তালিকায় এক আইআইটি ছাড়া ভারতের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। পাকিস্তান, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড এসব দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই সেই তালিকায়। তুমি বলতে পারো, পাকিস্তান বা থাইল্যান্ডের সঙ্গে কেন আমি বাংলাদেশের তুলনা করবো? করবো এ কারণে যে তুলনীয় দুই বস্তুর মধ্যেই তুলনা চলে। ইংল্যান্ড কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করলে কিছুই বোঝা যাবে না। ফিলিপাইন কিংবা ব্রাজিলের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থানটা বোঝা গেলেও যেতে পারে। এর মানে হচ্ছে, র‌্যাংকিং-এ সেরা একশতে থাকার যে শর্তগুলো রয়েছে সেগুলো পূরণ করা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল বা গরীব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অসম্ভব না হলেও কঠিনতো বটেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং-এ স্থান না পাবার এটা দ্বিতীয় কারণ।

যে কোনো বিচারে অক্সফোর্ড কিংবা এমআইটি সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। এর প্রথম কারণ, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মধ্যে একাধিক নোবেল পুরস্কারধারী রয়েছেন। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে কোনো নোবেল পুরস্কারধারী নেই শুধু নয়, কেউ ভুল করে এই এলাকায় ঢুকে পড়লেও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অমর্ত্য সেনের মতো নাজেহাল হয়ে তিনি বেরিয়ে যেতে বাধ্য হবেন। নোবেল পুরস্কারধারী পেতে গেলে বিদ্যাচর্চার যে দীর্ঘকালীন পরিবেশ-মানসিকতা লাগে, সে পরিবেশ পূর্ববঙ্গে নেই, ছিল না কোন কালে। ভাটি বা ব-দ্বীপ অঞ্চলে চাষবাস হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানচর্চা হয় কি? সেই পরিবেশ সৃষ্টির সামর্থ্য আমাদের নেই, কখনও ছিল না। যারা এক সময় বাংলাদেশে বিদ্যাচর্চা হতো বলে দাবি করেন, তারা মূলত ‘শোনার বাংলা’ রোগে ভুগছেন। এই রোগ সংক্রামক, সুতরাং সাধু সাবধান! বাংলাদেশে বিদ্যমান সার্বিক আর্থ-সামাজিক-মানসিক পরিবেশের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বসেরা হয়ে উঠতে পারে না। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং থেকে ছিঁটকে পড়ার তৃতীয় কারণ।

র‌্যাংকিং-এ সেরা একশতে থাকার অন্যতম শর্ত মাথাপিছু প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। প্যারিসের সর্বোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তালিকায় স্থান পেয়েছে। আমি শেহেরজাদি ও তুমি দিনারজাদি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, ছাত্রাবাসে আমার একান্ত নিজস্ব আলাদা কক্ষ ছিল। আমি একা থাকতাম সেই কক্ষে। চেয়ার ছিল, টেবিল ছিল, বইয়ের তাক ছিল, বেসিন ছিল। পরিচ্ছন্ন গণবাথরুম, স্নানাগার ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে আমার কক্ষের সমান ক্ষেত্রফলের একটি কক্ষে জনা দশেক শিক্ষার্থী গরুছাগলের মতো পরস্পরের গায়ে লেগে শোয়। এ ধরনের কক্ষকে বলা হয় ‘গণরুম’। গণরুমের মেঝেতে পাতা থাকে ক্যাম্পাসের এখান-ওখান থেকে না বলে খুলে আনা (‘চুরি করা’ বলছি না চক্ষুলজ্জাবশত) প্লাস্টিকের ব্যানার। ঘাম আর অনুরূপ একটি গন্ধে নরক গুলজার। বইপত্রের বালাই নেই, নোট বা গাইডবই সম্বল। সেগুলো আবার স্তুপ করে রাখা আছে বারান্দায়, পায়াভাঙা একটি প্লাস্টিকের শেলফে।

গণটয়লেট যদিও জঘন্য রকম নোংরা, তা নিয়ে কারও অভিযোগ নেই, না হাউজ টিউটর বা প্রভোস্টের, না শিক্ষার্থীদের। হতে পারে, এর চেয়ে পরিস্কার টয়লেট হয়তো তারা জীবনে দেখেইনি। অনেকের কাছে গণরুমের মতো নরককু-ও সোনার হরিণ। এখানে থাকতে গেলে দলের বড়ভাইয়ের নির্দেশে রাতবিরাতেও মিছিলে যেতে হয়। কারণে-অকারণে চর-থাপ্পর-লাথি খেয়ে হজম করতে হয়। শাস্তিস্বরূপ গণরূম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে শীতের রাতে বারান্দায় শুতে বাধ্য হয়ে নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়ার মতো ঘটনা একাধিক ঘটেছে।

প্যারিসে মাত্র ৫ ফ্রাঁতে পাঁচ পদ সুস্বাদু খাবার দিয়ে পেট ভরে খেতাম, আমি শেহেরজাদি যখন শিক্ষার্থী ছিলাম। চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় যেটি র‌্যাংকিং-এর ধারে কাছে নেই, সেখানেও সামান্য অর্থে শিক্ষার্থীরা উন্নত খাবার পায়। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কী খায় সাধারণ ছাত্রেরা? ছাত্রাবাসে যে সুখাদ্য পরিবেশন করা হয় না তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হোস্টেলের ডালের গল্প কে না জানে! ছাত্রনেতারা ফাউ খাবার কারণে খাবারের মান ভালো হয় না, নাকি এর অন্য কোনো কারণ আছে জানি না। আমার মনে হয়, সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং থেকে বাদ পড়ার চতুর্থ কারণ।

সম্প্রতি নাকি একটি হল থেকে ক্যান্টিন-চালকেরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, কারণ নবনির্বাচিত ছাত্রনেতারা নাকি তাদের কাছে অসহ্য রকম চাঁদা দাবি করেছে। নেতা হওয়াতে প্রচুর সময়, অর্থ ও পেশিশক্তি বিনিয়োগ করতে হয় এবং বিনিয়োগ থেকে যদি লাভ না আসে, তবে ব্যবসায়ী মানবে কেন! এই মাৎস্যন্যায় পরিবেশ, অখাদ্য খাবার, মাথাপিছু এই মানের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সেরা একশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান পাবার কথা স্বপ্নেও কি ভাবতে পারে কেউ?

বাংলাদেশের সরকার, জনগণ, প্রতিষ্ঠান… সবকিছু এক স্বখাত-সলিল, অসুস্থ সিস্টেমের শিকার। এক অদ্ভ’ত গোলোক-ধাঁধা বা ভুলভুলাইয়ায় আটকে আছে বাঙালিরা সবাই। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলছি বটে, কিন্তু আমি নিশ্চিত, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, দেশরক্ষা বিভাগ, ব্যবসা, সংস্কৃতি… বাংলাদেশের সব সেক্টরে এক অবস্থা, ফারাক উনিশ আর বিশ। অবস্থা কিংবা দূরবস্থা, যাই বলো না কেন তুমি দিনারজাদি। যতদিন লাল আলোতে গাড়ি চলবে, ততদিন অবস্থা পাল্টাবে না, পাল্টানোর কথা নয়। র‌্যাংকিংও ততদিন সোনার হরিণ হয়েই ছুটে বেড়াবে বাঙালির নাগালের বাইরে।

ততদিন জীবন কিন্তু থেমে থাকবে না। জীবনের রেলগাড়ি তীব্রবেগে ছোটার কারণে র‌্যাংকিং সাহেবের চুমু মুখ ফসকে ঈসমাইলের থোবড়া গালেই পড়তে থাকবে সুদূর নারায়ণগঞ্জে গিয়ে, আর বেচারা মেমসাহেব তার সোনার যৈবন আর টসটসে গাল নিয়ে সোনার বাংলার ফুল (Fool)-বাড়িয়া স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে। ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ কথাটার প্রতি তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, বোন দিনারজাদি। শব্দটির মানে হচ্ছে: ‘এমন একজন ব্যক্তি, যে কিং বা রাজা হয়েও নিজের কর্তব্য বুঝতে পারে না, বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাঙালি চরিত্রের সব বৈশিষ্ট্য এই সংজ্ঞায় ফুটে উঠেছে। যে বিমূঢ়, সে কিং হলেই বা কি, কিংকং হলেই বা কি!

[বাদশা এবং দিনারজাদি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন। ইতিমধ্যে পূবের আকাশে সুবেহ-সাদিকের চিহ্ন ফুটে উঠলো এবং ভোরের আযান শোনা গেল। শেহেরজাদি অনতিবিলম্বে মুখে কুলুপ আঁটলেন এবং দুই বোন ফজরের নামাজ পড়ে নকশি-লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। ৩০টি কারণের মধ্যে বাকি ২৬টি জানার আগ্রহ ছিল বলে শেহেরজাদির মৃত্যুদণ্ড পরের সকাল পর্যন্ত স্থগিত করে বাদশা শাহরিয়ারও ফজরের নামাজ পড়তে বেরিয়ে গেলেন।]

শিশির ভট্টাচার্য্যঅধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

১৫ Responses -- “আলিফ-লাইলা-১: র‌্যাংকিং সাহেবের মুখ ফসকানো বিদায়-চুম্বন”

  1. BONGO RAJ

    লেখার শৈলীটাকে (arrangement/style) বাহবা দিতেই হবে। সমস্যাটা রয়ে গেল তার সামগ্রী নিয়ে, জগাখিচুডী দিয়েতো শিল্প হয় না।
    বাংলাদেশের সব কিছুকেই সমস্যা সমস্যা বলে রোদন করলে বাহবা দেবার লোকের অভাব হয় না বলেই এই ধরনের লেখাগুলো বাজার পায়।
    আরে ভাই এই বাংলা আজকের “আওয়াম আর আমের মৌসমের” চাইতে ভাল ছিল কোনকালে? যদি ভাল নাই থেকে থাকে, তা হলে তো বলা যায় কিছুটা হলেও তো আগাচ্ছে!! যদি আগানোটা সঠিক হয় তাহলে আরও একটু দেখতে দোষ তো নেই!!!

    Reply
    • আবু সালেহ

      মহাশয় আপনাকে ধন্যবাদ এখানে কন জামাত গন্ধ পান নাই

      Reply
  2. সৈয়দ আলি

    খিক খিক খিক। ইহা দেখিতেছি যে সৈয়দের ব্যাটার ভট্টাচার্য্যীয় ভুত। ছা-ছপের দোকানদার নিয়োগকর্ত্রীকে কেহ যদি বোঝাইতে পারে যে নিবন্ধটি রচনা করিয়া শ্রীমান ভট্টাচার্য্য ‘দ্যাশের’ উন্নয়ন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নাতীত নেতার সোনার বাংলা কে ‘শোনার বাংলা’ বলিয়া বিদ্রুপ করিয়াছে, তাহা হইলে ভট্টাচার্য্য মহাশয়ের পরিনতি আঁচ করিতে পারিলেও অমঙ্গল-বার্তা দিতে চাহি না।

    Reply
  3. করবী মালাকার

    র‌্যাংকিং সাহেবের গল্পটা আষাঢ়ে গল্প না কইয়া ঢাকার ভানুর গল্প কইলে ভাল হইত। কৌতুকে ভানুর র‌্যাংকিং ভালই ছিল। এইডা তারই কৌতুক ছিল ।
    অনেক কারনের মইধ্যে র‌্যাংকিং-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগো দশাডা বাকী ২৬ টার মইধ্যে জানতে পারমু বইলা আমি গরীব মানুষ আরও কয়েক রাইত জাইগা থাকতে রাজী আছি।

    Reply
    • Shamsul Alam

      খুব সত্যি কথাই কইছেন বইন। জনাব শিশির ভট্টাচার্য কেন যে আমাদের অতি প্রিয় ভানুকে এই বিখ্যাত চুম্বন কাহিনীর জন্য উল্লেখ করিলেন না, তাহার মাজেজা আমার বোধগম্য হইল না। যদি এখনো কোন অতীব বুড়া ঘোড়া জীবিত থাকে, তাহলে এই কথা শোনামাত্র সে তো এক বিরাট অট্টহাস্য দিবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অনতিদূরে অবস্থিত সদরঘাট হতে সেই ঘোটক নাসিকা নিঃসৃত অট্টহাস্য জনাব ভট্টাচার্য হয়ত শুনিলেও শুনিতে পারেন। জয় ধাকার ভানু।

      Reply
  4. আল মামুন

    আর শিক্ষকরা যদি কিছু চিন্তা করতে চান, তাহলে হারেরে করে তেড়ে আসে প্রশাসন৷

    Reply
  5. MD Rahman KABIR

    ক্রিকেট খেলাতে ভাল করছে কারণ খেলাটা সরাসরি টিভিতে দেখায়; সুতরাং, ভাল না করলে খুব বেশিদিন স্বজনপ্রীতি করার সুযোগ নাই; যদি খেলাটা সরাসরি না দেখাত তাইলে এও জাইত।
    আমাদের সকল সেক্টরে মাশরাফি, মুস্তাফিজ আছে; নেই শুধু সঠিক ব্যবহার আর সুযোগ।

    Reply
  6. Qudrate Khoda

    অতি যুক্তিযুক্ত, বুদ্ধিদীপ্ত, উপভোগ্য, ও উৎকৃষ্ট মানের রচনা।

    Reply
  7. শাহাদাত হোসেন

    রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণকারী, বিশেষ দলের পদলেহনকারী শিক্ষকদের কথা কেন বাদ পড়লো?

    Reply
  8. Not Applicable

    is that going to be a series story? twenty six more?wow!!! I can only say one thing out of all issues here. don’t feel like writing ten pages for that either. we have clown chairman in Anti-Corruption Commission of Bangladesh. When I watch some of the talk television show of that chairman, one picture comes to my mind. and she is our honorable prime minister of Bangladesh. My question is: our prime minister takes responsibilities in many big projects. 1 Leader of the House 2 Minister for Cabinet Affairs 3 Minister of Defence 4 Minister of Energy 5 Chairperson of the Planning Commission. can she just add one more only? if she can, that would be our Anti-Corruption Commission in Bangladesh.

    Reply
  9. Md. Mahbubul Haque

    … কোন ক্ষেত্রটিতে তারা বিশ্বমানের?

    – ভাঁড়ামিতে;
    – তেলবাজিতে;
    – ব্যক্তি পুজায়;
    – পরচর্চায়;
    – বাংলা ভাষায় ব্যক্তিক বিশেষণ তৈরীতে;
    – জনসাধারণের নামে নিজের স্বার্থ সিদ্ধিতে;
    – নিজে বুদ্ধিমান, অপরকে বুদ্ধু ভাবতে;
    – অপরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে;
    – অপরের কৃতিত্বকে নিজের বলে চালাতে;
    – ঘুষোঘুষিতে (ঘুষ দিতে ও নিতে);
    – নিজেকে যেনতেন কিছুর বিনিময়ে বিক্রি/অসম্মানিত করতে;
    – হুজুগে মাততে;
    – আনন্দের আতিশর্যে কাউকে মাথায় তুলে পরক্ষণেই অন্যের কুপরামর্শে আছাড় মারতে ;
    – আর আমাদের বিবেক-বিক্রিত দলীয় রাজনীতি ও তার লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র(অপ)রাজনীতি?
    বাঙালিচরিত! আরও বলব?

    আর দাদা, আপনার ঘাড়ে মাথার সংখ্যা ও তার সুস্থতা নিয়ে নিদারুন ভাবনায় পেরেশান আছি, এত খুল্লামখুল্লাভাবে উন্নয়নের এ জামানায় কেউ লেখে!?!
    আপনাকে চালিয়ে যেতে বলব কিনা ঠিক বুঝতে পারছি না।

    Reply
  10. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    ইদানিংকালে আর বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোর আর কোনো খবর পড়তে ইচ্ছা হয়না , আমি খবরের জন্য মূলত অনলাইন সংস্করণের উপর নির্ভরশীল ।ওয়েবপেজগুলো তে গেলেই দেখা যায় শুধু খারাপ খবর , অসংখ্য মৃত্যুর খবর , প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে , কিছুক্ষন আগেও দেখলাম ট্রাকের ধাক্কায় দুজন মারা গেছে ।গতসপ্তাহে প্রতিদিন কমপক্ষে দশজন করে মানুষ মারা যাচ্ছে , ট্রেনে কাটা পরে মানুষ মরছে , রিক্সায় করে যাবার সময় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে মৃত্যু , গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যুতো নৈমিত্তিক হয়ে গেছে , কয়েকদিন আগে শুনলাম মিডল ইস্ট এর দেশ ওমান থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৭০ প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকের লাশ দেশে আসে । ভাবা যায় কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার !!! এসব পড়তে আর ভালো লাগে না , চারদিকে শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু !!! অনেকদিন আগে ব্লগার ও কলামিস্ট ফারুক ওয়াসিফ এর একটা লেখায় পড়েছিলাম এদেশে জীবন জিয়ে না , সত্যি কি তাই ? এসএসসি পরীক্ষা আসলেই একটা শিক্ষার্থীর জন্য অনেক উদ্বেগের, দশবছরের শিক্ষা জীবন শেষ করার মধ্যে আনন্দের চেয়ে উদ্বেগের পরিমানই হয়তো বেশি থাকে ।আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম ২০০৩ সালে , ব্লগে যদি ২০০৩ সালের এসএসসি উত্তীর্ণ কোনো ব্লগার থেকে থাকেন তাহলে নিশ্চয় মনে থাকবে ওই সময়কার পরীক্ষার কথা ।২০০১ সালে গ্রেডিং সিস্টেম চালু হবার পর এ+ ছিল ৮ ০ তে আর এ গ্রেড ছিল ৬০ এ , ২০০৩ সালে সরকার সেই পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার চিন্তা করলো , তারা ৯০ তে এ + আর এ গ্রেড ৬০ থেকে ৭০ এ নিয়ে আসার চিন্তা করলো ( ২০০ ২ সালে ৬০ পেলে এ গ্রেড ধরা হতো )। কিন্তু পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা আমলে নিয়ে এ + ৮০ তে ঠিক রাখলো কিন্তু এ গ্রেড নিয়ে এলো ৭০ এ এবং চতুর্থ বিষয়ের নম্বর যোগ করা বাদ দিয়ে দিলো (২ ০ ০ ৩ সালে ৭০ পেলে এ গ্রেড আর ৮ ০ এ + , এবং চতুর্থ বিষয়ের নম্বর যোগ করা বন্ধ ছিল ) । আর এই খবর শিক্ষার্থীদের জানানো হল পরীক্ষার একমাস আগে, বাংলাদেশে গ্রেডিং সিস্টেমের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরীক্ষা হল সেই বছর । এখন যেমন মাসব্যাপী পরীক্ষা হয় , ২০ ০ ৩ সালে সেই সিস্টেমে মাত্র দশ কি ২ সপ্তাহের মধ্যে সব পরীক্ষা শেষ হয়েছিল , এখনো মনে আছে পরীক্ষা শুরু হয়েছিল মার্চের ২৭ তারিখ যা এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধেই শেষ হয় । আমাদের আগের বছর অর্থাৎ ২০ ০ ২ সালে ম্যাথমেটিক্স এ গ্রেস দিয়েছিলো , ফলে আমাদের বছর সব বিষয়ে প্রশ্ন হলো কঠিন , রেজাল্ট এ দেখা গেলো পাশের হার মাত্র ২ ৭ % , এ + পেয়েছিলো ১১ ০ ০ জন আর এ গ্রেড পেয়েছিল ১ ০ , ০০ ০ জন , পাশের হার অত্যন্ত কম । সেই পরিস্থিতি দেখে সরকার ২০ ০ ৪ সাল থেকে আবার গ্রেডিং সিস্টেম এ পরিবর্তন এনে চতুর্থ বিষয়ের নম্বর যোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল । বাংলাদেশে মৌলিক বিজ্ঞান অর্থাৎ বেসিক সাইন্স এর চর্চা একদম কমে গেছে , বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয় বলতে আমি ফিজিক্স , কেমিস্ট্রি , ম্যাথমেটিক্স , জুলোজি কিংবা বোটানির মত বিষয়কে বোঝাচ্ছি , একসময় ফিজিক্স কিংবা কেমিস্ট্রিকে টপ লেভেলের সাবজেক্ট ধরা হতো ।জাপানে শিক্ষার্থীদের বিষয় নির্বাচনে প্রথমদিকে থাকে কেমিস্ট্রি আর এর পরে ফিজিক্স কিংবা ম্যাথমেটিক্স বর্তমানকালে ছাত্ররা তাদের বিষয় নির্বাচনের প্রথমদিকে এই বিষয়গুলোকে রাখতে চায় না ।এখন সবাই ঝুঁকছে EEE (Electrical and Electronic Engineering) কিংবা ফার্মেসির মতো বিষয়গুলোতে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বাদই দিলাম , আনাচে কানাচে সমস্ত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এই দুটি ডিপার্টমেন্ট আছে । নেই কোনো ভালো শিক্ষক , নেই কোনো ল্যাবরেটরি কেবল চাকরির কথা চিন্তা করে বিষয়দুটোকে একদম বাজারি সাবজেক্ট বানিয়ে ফেলেছে । অবশ্যই এই দুই বিষয়ের গুরুত্ব অনস্বীকার্য্য , কিন্তু বিষয়দুটো সম্পূর্ণ প্রায়োগিক এবং ল্যাবভিত্তিক । ভালো ল্যাব কিংবা ভালো মানের শিক্ষক না থাকলে ভালো গ্রাজুয়েট বের হয়ে আসবে না ।এর সাথে সাথে বেসিক সাইন্স এর বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে , বেসিক সাইন্স এর ডেভেলপমেন্ট ছাড়া অ্যাপ্লায়েড ফিল্ডের ডেভেলপমেন্ট হয়না ।সেসময় আমাদের স্কুল থেকে আমরা চারজন সর্বোচ্চ জিপি এ পেয়েছিলাম ।

    Reply
  11. আব্দুল করিম

    বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অগ্রগতির উদাহরণ এবং দুই দেশ তাদের জন্মকালীন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈষম্য একটা বড় ইস্যু ছিল এবং ওয়েস্টমিনিস্টার মডেলের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা ছিল এখানে, পাকিস্তানের অধীনে যে আকাঙ্ক্ষাটা ছিল স্বপ্নের মতো। সামরিক শাসন, ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব পাকিস্তান রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য ছিল যথেষ্ট। সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং এর মধ্যে ভারতও রয়েছে, যে ভারতকে অনেকেই উত্তর-ঔপনিবেশিক সরকারের মডেল এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার জননী হিসেবে বিবেচনা করতো। কেন্দ্রীয় একটি আকাঙ্ক্ষা এবং বহুজাতির বাস্তবতার মধ্যে যে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ছিল, সেটা এখনও বজায় রয়েছে। রাজনৈতিক শক্তিগুলো যেখানে ভারতের অর্থ কি – সেটা নিয়ে সঙ্ঘাতে লিপ্ত, সেখানে এই সঙ্ঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আসলে দরিদ্ররা, যাদের দুর্ভোগের পাল্লাটা অন্যান্য শ্রেণীর চেয়ে বেশি। হিন্দুত্ববাদী আদর্শ ভারতে সবসময়ই ছিল এবং বিজেপির কারণে এটা ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। কারণ এখানকার বিবদমান শক্তিগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় নিজেদের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস দলটিকে এক সময় উত্তর-ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক শক্তি মনে করা হতো, যাদের মধ্যে পশ্চিমা বামপন্থী উদারনীতি বর্তমান রয়েছে। কিন্তু তারা শাসন ব্যবস্থায় ওয়েস্টমিনিস্টারের আদলে উত্তর-ঔপনিবেশিক সিস্টেম থেকে আধুনিকতাবাদকে কেন্দ্রীয় অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। এবং যেহেতু এই সিস্টেমে একটা বিচ্ছিন্ন অভিজাতবর্গ তৈরি হয়েছে এবং বাকিরা আলাদা হয়ে গেছে, তাই এই সিস্টেমটা কাজ করেনি। ভারতে দারিদ্র-বৈভবের যে পার্থক্য সেটার সাথে বাংলাদেশের চিত্রের পার্থক্যটা অনেক। কার্যত, বাংলাদেশ দরিদ্রদের অনেক ভালো সেবা দিতে পেরেছে।
    এক বিবেচনায় পাকিস্তান নিরাপদ কারণ তারা কখনও সাম্য বা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি বরং সবসময় সেনাবাহিনী এবং তাদের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে থেকেছে, ঠিক জন্মের সময় দেশটি যেমন ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশই জনগণের অংশগ্রহণ, সমতা এবং বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোকে সরিয়ে রাখার ক্ষেত্রে খুব একটা সুবিধার জায়গাতে নেই। এ কারণে জনগণের দাবি-দাওয়া বেড়ে গেছে এবং যে সব জায়গায় এই পার্থক্যটা বেশি, সেখানে চাপটা পড়ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর। দক্ষিণ এশিয়ার অভিজাত শ্রেণী সবার জন্য উপযুক্ত সমতার একটা অর্থনীতি উপহার দিতে পারবে কি-না, সেই প্রশ্নটা এখনও কম-বেশি রয়েই গেছে।
    এ অঞ্চলের বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চীনের যে হিসেবী ক্ষুধা, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর যে অসহায়ত্ব, সেটা কোন কল্পিত ভয় নয়, বরং বাস্তবতা এখানে অবশ্যম্ভাবী। চীন যেহেতু একই সাথে দক্ষ ও সংগঠিত, দক্ষিণ এশিয়ার হোচট খাওয়াটা তাই জারিই থাকবে।

    Reply
  12. নাজমুল

    একটা ঘটনা ঘটলে দেখবেন মানুষ এর ভিতর থেকে ছোট ছোট করে বিভিন্ন রকমের ইস্যু বের করে নিয়ে আসে। তারপরে সেই ছোট ছোট ইস্যুগুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা চলতে থাকে। সেগুলো নিয়ে তুমুল আলোচনা করতে করতে সেই ছোট ইস্যুগুলোকেই বর্ধিত করে ফেলা হয়। মাঝখান থেকে মানুষ মূল ঘটনা থেকেই সরে আসে। এই ব্যাপারটা একরকম পলিটিক্যাল প্রোপাগান্ডা৷ আপনি এই কৌশল প্রয়োগ করে যেকোনো পুকুর চুরি ঘটনাকে ধামাচাপা দিয়ে ফেলতে পারেন। আপনাকে কেবল পাবলিক সাইকোলজি বুঝে এই ছোট ছোট ইস্যুগুলোকে ট্রিগার্ড করতে হবে। বুঝতে হবে পাবলিক সেন্টিমেন্ট আর লোকে কি খায়?
    আপনি যদি চিন্তা করে দেখেন গত কয় বছরে বাংলাদেশের বেশকিছু বড় বড় আন্দোলন ফেইল করে গেছে কি করে তাহলে ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনে বোঝানো হলো, যে লোকটা নেতৃত্ব দিচ্ছে সে একজন শিবিরকর্মী। কাজেই তার পিছনে আন্দলোন করবার কোনো মানে হয় না। অথচ আমরা সবাই মিলেই চেয়েছি এই কোটা বৈষম্য না থাকুক। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের আমরা হেয় করিনি, কেবল বলেছি সেই কোটাটা একটু কম হোক। কোটা সংস্কার চেয়েছি, বাতিল নয়৷ কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সেই শিবিরকর্মী লোক এখন ডাকসুর ভাইস প্রেসিডেন্ট। প্রধানমন্ত্রীর বাস ভবনে গিয়ে তিনি হাসিমুখে বলেন, “আপনার মাঝে আমি আমার মা কে খুঁজে পাই”। তাকে এখন ছাত্রলীগের লোকজন বুকে টেনে এনে কোলাকুলি করে। এখন কোথায় সেই শিবিরকর্মী গেলো কে জানে?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—