আগামী অর্থ বছরের অর্থাৎ ২০১৯-২০২০ সালের জাতীয় বাজেট প্রস্তাব পেশ হল। ঘোষিত বাজেটের আকার খুব স্বাভাবিক কারণে আগের বছরের চেয়ে টাকার অংকে বড়। বাজেটের আকার, বাজেটের গুণগত দিক, খাতভিত্তিক বরাদ্দের ধরন, বাজেটের গতানুগতিকতা, আর্থিক খাতের জন্য প্রস্তাবিত সংস্কারের গতি-প্রকৃতি এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি নিয়ে ইতোমধ্যে বিজ্ঞজনরা কথা বলেছেন, বলছেন।

বাজেটোত্তর আলোচনা-সামালোচনার চিত্র সেই চেনা রূপেই হাজির হল। সরকারি দল এবং তার জোটভূক্ত অংশীজন বাজেটকে দরিদ্রবান্ধব, সমৃদ্ধির পথে আরেক ধাপ অগ্রগতি ইত্যাদি বহুবিধ বিশেষণে অভিহিত করেছেন। শুধু তাই নয়, বাজেট নিয়ে সবধরনের সমালোচনাকে দুরভিসন্ধিমূলক বা বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা বলে পত্রপাঠ বাতিল করেছেন। বিপরীতে বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ বাজেটকে গতানুগতিক, গরিব মারার বাজেট বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং আর্থিকখাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নানারকম ক্যালকুলেশনে গা বাঁচিয়ে কথা বলেছেন।

এই তিনপক্ষের বাইরে আরও একটি পক্ষ বাজেট ঘোষণার পর পরেই নাড়াচাড়া শুরু করেন। এদের তৎপরতার ফোকাস হলো স্ব-স্ব স্বার্থে যেনতেনভাবে বাজেটকে প্রভাবিত করা। সেই দিক থেকে তাদের চরিত্র কায়েমী স্বার্থবাদীই।

এই যে এতো পক্ষ বাজেটের ভালো-মন্দ নিয়ে রাতের ঘুম হারাম করছেন- তারা কারা? এরা সরকার পক্ষ, নয় তো সরকারবিরোধী এবং আবার কেউ কেউ সুবিধাবাদী পেশাজীবী। কিন্তু জনগণের পক্ষে কে? সমতলের আদিবাসী, যারা দলিত- তাদের পক্ষে কে? কেউ নেই! ডজন ডজন প্রিন্ট আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া যার একটা বড় অংশ, দুঃখজনক হলেও সত্য, চব্বিশ ঘণ্টা তারস্বরে মালিকপক্ষের স্বার্থে সাফাই গাচ্ছে অথচ দরিদ্র মানুষের স্বার্থের পক্ষে চুপটি করে থাকছে। যারা নিপীড়িত, যাদের পক্ষে আওয়াজ তোলার কেউ নেই তাদের শেষ সহায় তো মিডিয়াই। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টেছে।

তথাকথিত প্রতিযোগিতা, বাণিজ্যিকীকরণ, মুনাফার লোভ ইত্যাদি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যমকে মেহনতি মানুষের থেকে অনেকদূরে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, এখনও কিছু গণমাধ্যম এবং সংবাদকর্মী আছেন যারা শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানুষের ন্যায্য দাবির সপক্ষে কথা বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেটা ম্রিয়মান।

যারা দারিদ্রসীমার নিচে শুধু নয়, দরিদ্রদের মধ্যে দরিদ্র- তারা ঘোষিত বাজেটে কী পেল সেটা দেখার আগে মোটাদাগে বাজেটের অবয়বটা একটু দেখা যাক। এবারে বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিপরীতে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। আর বাজেট ঘাটতি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা এবং বলাবাহুল্য, যা গত বাজেটের ঘাটতির চেয়ে বেশি। আর ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ঋণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যথাক্রমে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি এবং ২৭ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করা। বাদবাকিটা বৈদেশিক ঋণ হিসেবে সংগ্রহ করার কথা বলা হয়েছে। আর বৈদেশিক ঋণ মানে উচ্চহারে সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে তার নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়বে বেসরকারি বিনিয়োগে।

ব্যয়ের প্রাক্কলন যেভাবে করা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে-বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অর্থাৎ ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় হবে সরকারি কর্মচারিদের বেতন-ভাতা বাবদ। এর সাথে পেনশন ৮ দশমিক ৭ শতাংশ যোগ করলে দাঁড়ায় ২৭ শতাংশ। ঋণের সুদ বাবদ যাবে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ টাকা। তার মানে অনুৎপাদশীল খাতেই একটা বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।

মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে কাজেই যদি প্রশ্ন রাখা যায়-সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত-বঞ্চিত দলিত ও সমতলের আদিবাসী মানুষের জন্য কী বরাদ্দ রাখলেন? সেই মানুষগুলোর অনুকূলে কোনও খাত দেখিয়ে দেওয়া তার জন্য দুরূহ হবে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে পিছিয়ে পড়া ওইসকল মানুষের জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই! তবে হ্যাঁ, একজন দরিদ্র মানুষ আর দশজনের মতো যোগাযোগ অবকাঠামো, বাজার-ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, কৃষিতে দেওয়া ভর্তুকি ইত্যাদি থেকে কোনো না কোনোভাবে সেবা নিতে পারবে এবং নিয়েও থাকে। কিন্তু তারা যতোটা পিছিয়ে পড়েছে, যতো হার্ডেল তাদের এগিয়ে আসার পথে সেইসকল বাধা-বিপত্তি সরিয়ে তাদের অনুকূলে পরিবেশ তৈরি করতে গড়পরতা বরাদ্দ কী যথেষ্ট? অথচ মূল্য সংযোজন কর থেকে ২ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা সেখানে স্বল্প আয়ের মানুষের কন্ট্রিবিউশন কিন্তু কম নয়। এছাড়া কৃষি উৎপাদন, কায়িক শ্রম ও উদ্ধাবনী নানা উদ্যোগও তো জাতীয় উন্নয়নে তাদের অবদান। মূল্য সংযোজন করের আওতা ও পরিমাণ যেভাবে বাড়ানো হয়েছে তাতে স্বল্প আয়ের মানুষের এই অবদান কিন্তু মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই জোগাড় করতে হবে।

সর্বসাধারণের পরিশ্রমের টাকা দিয়ে সরকার প্রায় ১৪টি খাতে (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, জনপ্রশাসন, জনশৃঙ্খলা, প্রতিরক্ষা, ভর্তুকি, প্রণোদনা, সুদ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ইত্যাদি) খরচ মেটাচ্ছে তার বিপরীতে ঐ দরিদ্র মানুষগুলোর প্রাপ্তির হিস্যা কতো? এর কোনও সদুত্তর পাওয়া যাবে না। বরং ভাঙ্গা রেকর্ডেও মতো শুনতে হবে-এই বাজেট দরিদ্রবান্ধব, শতাধিক স্কিমে সামাজিক নিরাপত্তা জাল তৈরি করে এতো লাখ মানুষকে সেবা দেওয়া হচ্ছে, দরিদ্র মানুষ বিনামূল্যে বই পাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের জন্য যে পরিসেবা সেটা তো আহামরি কিছু নয়। উপরন্তু যে অবস্থার মধ্য দিয়ে তারা সেবা পায় সেটাকে কী পাওয়া বলা যায়? ন্যায্য পাওনা পেতেও তাদের পাড়ি দিতে হয় অনেক বঞ্চনার পথ। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই- তারা সেবা থেকে সুবিধা পাচ্ছে কিন্তু সেসব তো দান-খয়রাত। দলিত এবং সমতল অঞ্চলের আদিবাসী যারা সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বৈষম্যের দুষ্টচক্রে নিপতিত তাদের সার্বিক উন্নয়নে দরিদ্রবান্ধব সরকারের কী অঙ্গীকার থাকলো বাজেটে? দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই এর নির্মোহ আলোচনা হওয়া দরকার।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্পর্কে যেটুকু জানা গেছে তাতে বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, দুগ্ধদানকারী দুস্থ মায়ের জন্য ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা দুস্থ নারীর ভাতা ইত্যাদির আওতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ভাতার পরিমাণ  বাড়ানো  হয়নি। কিন্তু ওইসকল কর্মসূচিতে দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা করে কিছু বলা নাই। শুধু বেদে ও অগ্রসর জনগোষ্ঠীর সংখ্যা পূর্বের চেয়ে আরও ২০ হাজার বাড়িয়ে ৮৪ হাজার করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভাতার পরিমাণ বাড়বে কি না, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী কিসের ভিত্তিতে চিহ্নিত হবে, সেখানে দলিত এবং সমতলের আদিবাসীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে কি না তার কোনও দিক-নির্দেশনা বাজেট বক্তব্যে পাওয়া যায়নি।

সরকারের পরিচালন এবং উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে দরিদ্র মানুষের কনট্রিবিউশন দু’হাত বাড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে অথচ দেবার বেলায় যৎসামান্য ভাতা? বাজেটের স্পিরিট যদি বিবেচনায় নেয়া যায় তাহলে দেখা যাবে দরিদ্র মানুষের জন্য চুঁইয়ে পড়া সুবিধার নীতিই বহাল থাকছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা এবং ভাতার পরিমাণ সামান্য বাড়িয়েই দরিদ্র মানুষের প্রতি সরকার দায় সারতে চাচ্ছে। এর বাইরে কৃষিতে ছিঁটেফোটা কিছু ভর্তুকি। ধনিক গোষ্ঠী এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতির ধ্বজাধারী রাজনৈতিক শক্তি সামাজিক নিরাপত্তার নামে দয়া-দাক্ষিণ্যের এই কর্মসূচি দিয়ে দারিদ্র বিমোচনের যে প্রপ্রাগান্ডা চালায় সেটা একটি ফাঁপা আওয়াজ। সামান্য সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে দরিদ্র মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এধরনের কর্মসূচি শাসকগোষ্ঠীর জন্য খুব হ্যান্ডি। কিন্তু এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে দরিদ্র মানুষের পরনির্ভরশীলতাই বাড়বে।

এছাড়া হাজার জনের সামনে দরিদ্র মানুষকে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা কী মানবতাকে পরিহাস করা নয়? মানবাধিকারের মূলসুর এবং বাংলাদেশের সংবিধানে ব্যক্তির যে মর্যাদা ঘোষিত হয়েছে সেই স্পিরিটের সাথে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ দ্বান্দ্বিক। দারিদ্র বিমোচনের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য কৌশল নয়।

ঘোষিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওইটুকু বরাদ্দ (বেদে ও অনগ্রসরদের জন্য বরাদ্দ) বাদ দিলে আর কোথাও তাদের জন্য এক্সক্লুসিভ বরাদ্দ নেই। কিন্তু কেন নেই? এখানে সরকারেরই কী সব দায়িত্ব? সরকার পরিচালনাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দায় এখানে পুরোটা না। এর দায় আরও অনেকের। দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের অধিকার ও উন্নয়নে কর্মরত নেতৃবৃন্দ/বেসরকারি সংগঠন/নেটওয়ার্ক/অধিকারমঞ্চ পিছিয়ে পড়া এসকল মানুষের প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং একটি মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের দাবিতে সমন্বিত দাবি জাতীয়ভাবে উত্থাপন করতে পারেনি। নিজেদের মধ্যে ঐক্য এবং জোড়ালো দাবি নিয়ে নীতি-নির্ধারণী পক্ষসমূহের সামনে হাজির হতে পারেনি। ভুক্তভোগী এসকল মানুষের প্রকৃত চাহিদা, জীবিকায়ন চ্যালেঞ্জ এবং মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য করণীয় বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি এবং তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে গণমাধ্যমের জোড়ালো অবস্থান না থাকাও তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।

দেশের উন্নয়ন শুধু প্রবৃদ্ধির সূচক দিয়ে পরিমাপ করা নয় বরং উন্নয়নের সুফলকে বৈষম্যহীন করতে দরকার নতুন উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি। দরকার-দলিত ও আদিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থিক বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় নীতি-কাঠামো তৈরি করা। শুধু বাজেটে বরাদ্দ দিলেই হবে না, সাথে সাথে উদ্যোগ নিতে হবে বাস্তবায়নকারী ও রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলারও।

One Response -- “বাজেট ২০১৯-২০২০: প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নে বরাদ্দ এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকট”

  1. Md. Mahbubul Haque

    “তোমারটা দাও – খাই,
    আমারটা চাইও না, তোমার আল্লাহর দোহাই”।।

    – এলিট শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী অর্থমন্ত্রীরা এই স্লোকটি মুখস্ত করেই বাজেট প্রণয়নে বসেন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—