পাকিস্তান সৃষ্টি হয় মুসলিম লীগের রাজনীতির ভেতর দিয়ে। মুসলিম লীগের রাজনীতিতে কোন অর্থনীতির যোগ ছিলো না। শুধু ধর্মের নামে এবং সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু এই দুই বিষয়ের ওপর ভর করেই মুসলিম লীগ পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিলো। যে কারণে রাষ্ট্রটি প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কাঠামো অনুযায়ী কোন রাষ্ট্র হচ্ছে কি না, আর তা না হলে এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যত কি এসব কোনো কিছুই পাকিস্তান আন্দোলনের নেতারা চিন্তা করেননি। বঙ্গবন্ধু ছাত্র জীবনে পাকিস্তান আন্দোলনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি সোহরাওয়ার্দী’র সঙ্গে একজন কর্মী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করেন। তবে মুসলিম লীগের অন্য নেতা কর্মীদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গির একটা পার্থক্য ছিলো। বঙ্গবন্ধুর কাজ লক্ষ্য করলেও যেমন বোঝা যায় তেমনি তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীও মনোযোগের সঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, তিনি নির্বাচনটিকে নিয়েছিলেন পূর্ববাংলার দরিদ্র মুসলিমের মুক্তির একটি উপায় হিসেবে। একজন প্রখর দৃষ্টি সম্পন্ন তরুণ হিসেবে তিনি তৎকালীন পূর্ব বাংলার দরিদ্র মুসলিমদের জীবনকে শুধু দেখেননি উপলব্দিও করেছিলেন তাদের কষ্ট। একজন অতিমানবিক হৃদয়ের তরুণ হিসেবে তিনি ব্যথিত ছিলেন, তাদের অর্থনৈতিক কষ্টে। তাছাড়া তখন পাকিস্তান প্রস্তাবটি ছিলো লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী। লাহোর প্রস্তাবে বলা হয়েছিলো, ” …. the areas in which the Muslims are numerically in a majority as in the North- Western and Eastern Zones of the India, should be grouped to constitute ‘Independent States’ in which constituent units shall be autonomous and sovereign.

That adequate, effective and mandatory safeguards should be specifically provided in the constitution for the minorities in these unites and these regions for the protection of their religious, cultural, economic, political, administrative and other rights and interests in constitution with them;..”

লাহোর প্রস্তাবের এই ‘স্টেটস’ এর ‘এস’ বাদ দিয়ে যে একটি কেন্দ্রশাসিত রাষ্ট্র তৈরি হবে এমনটি তখন কোনোমতেই বঙ্গবন্ধুর মত সৎ ও উদার তরুণ মুসলিম লীগ কর্মীদের মাথায় আসেনি। তাদের মাথায় আসেনি, ধর্ম ব্যবসায়ীরা এই রাষ্ট্র তৈরির আগে ইংরেজের ইন্ধনে ও কূটখেলায় ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গা সৃষ্টি করবে। যার ভেতর দিয়ে স্বায়ত্বশাসিত স্টেট তো হবেই না সঙ্গে সঙ্গে উবে যাবে মাইনরিটির সব ধরনের স্বাধীন অধিকার। তাই মুসলিম লীগের এই সৎ ও উদার কর্মী শেখ মুজিবুর রহমানও তাঁর নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো রক্তাক্ত ওই পাকিস্তানের ক্ষমতার সোপান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। এবং ততদিনে প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত এই তরুণ উপলব্দি করেন ধর্মীয় রাজনীতির প্রকৃত রূপ। যে কারণে আজীবন তিনি সংগ্রাম করে গেছেন ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে। এবং তিনি এও উপলব্দি করেন, ধর্মের নামে কোন দেশ হতে পারে না। ধর্মের নামে কেউ দেশ থেকে বিতাড়িত হতে পারেন না। তাই তাঁকে নিয়ে তৈরি পাকিস্তানের গোয়েন্দা রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, তিনি ১৯৪৭ সালেই ফরিদপুরে জনসভা করে সংখ্যালঘুদের দেশত্যাগ না করার জন্যে বলছেন।

অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বঙ্গবন্ধুর উপলব্ধিতে আমরা তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে পাচ্ছিঃ এক, পূর্ববাংলার মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র মুসলিমরা যে আর্থিক মুক্তির জন্যে পাকিস্তান চেয়েছিলেন সে পাকিস্তান হয়নি। দুই, লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী না হয়ে সম্পূর্ণরূপে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নিয়ম বর্হিভূত একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে। তিন, এই রাষ্ট্র সৃষ্টি করতে গিয়ে ধর্মের নামে যে নরহত্যা হয়েছে তা শুধু অমানবিক নয় চিরস্থায়ী এক ক্ষত।

এই তিন উপলব্ধি থেকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে প্রাথমিকভাবে যে সিদ্ধান্তগুলো নিতে দেখা যায় তাহলো রাজনীতি হতে হবে সবার জন্যে, কোনো একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্যে নয়। আর রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হতে হবে মানুষের মুক্তি। যে মুক্তির প্রথম শর্ত অর্থনৈতিক মুক্তি। মানুষের এই অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়াও আরো অনেক মুক্তির প্রয়োজন। তবে এটাই সত্য সব মুক্তির পূর্বশর্ত অর্থনৈতিক মুক্তি। মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক মুক্তি এলে ধীরে ধীরে মানুষ অন্য সকল মুক্তির দিকে এগোয়।

পাকিস্তানের শুরুতে অর্থাৎ ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যে রাজনৈতিক দলটি গঠন করা হয়, তার উদ্দেশ্য যদিও ছিলো সকল মানুষের জন্যে একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গড়ে তোলা, কিন্তু তখনও পাকিস্তানে সে পরিবেশ শতভাগ সৃষ্টি হয়নি। তাই আওয়ামী (জনগণের) লীগ না গড়ে প্রথমে তাঁদেরকে গড়তে হয়েছিলো জনগণের মুসলিম লীগ। অর্থাৎ আওয়ামী মুসলিম লীগ। কিন্তু এই আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়ার আগে থেকেই পাকিস্তান গোয়েন্দা রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, বঙ্গবন্ধু যেখানে মিটিং করছেন সেখানেই তিনি পূর্ব বাংলার মানুষের খাদ্য অভাবের কথা বলছেন। অর্থাৎ পাকিস্তানে নতুন রাজনীতি শুরু করার আগে থেকে তিনি যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন, সেখানে তিনি পূর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত ১৯৪৭-৪৮ এর পাকিস্তান গোয়েন্দা রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, বঙ্গবন্ধু চাচ্ছিলেন মুসলিম লীগ দরিদ্র মুসলিমের দল হোক। তাঁর ওই সময়ের বক্তব্য থেকে (যে সকল বক্তব্য গোয়েন্দারা তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন) এটা স্পষ্ট হয় যে, বঙ্গবন্ধুর এই কাজের অন্যতম বড় বাধা ছিলেন, মওলানা আকরাম খাঁ। তিনি মুসলিম লীগকে তার পকেট লীগে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। আর এর থেকে মুক্তি পাবার জন্যেই, দরিদ্র মুসলিমসহ পূর্ব বাংলার সকল দরিদ্র মানুষের মুক্তির লক্ষ্যেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো।

আওয়ামী মুসলিম লীগ যখন প্রতিষ্ঠা করা হয় পাকিস্তানী প্রশাসন সে সময়ে বঙ্গবন্ধুকে জেলে রেখেছিলো। তিনি মুক্তি পান ২৭ জুলাই। তার মাত্র কিছু দিনের মধ্যে পূর্ব বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়। এই দুর্ভিক্ষের সময় বঙ্গবন্ধুই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন করেন। অর্থাৎ পাকিস্তানের রাজনীতিতে, বা পাকিস্তান সৃষ্টিতে যেখানে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলো ধর্ম। বঙ্গবন্ধু সেই দেশে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। অভাব থেকে মুক্তি। সত্যি বলতে কি, পাকিস্তানের রাজনীতিতে অর্থনীতিকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু বঙ্গবন্ধুই করেন। কেউ কেউ বলতে পারেন, কমিউনিস্টরা তার আগের থেকে অর্থনীতি নিয়ে রাজনীতি করছিলেন। তারাই এটা শুরু করেন। তবে বাস্তবতা বলে কমিউনিস্টরা তখন এতটাই বিপর্যস্ত ছিলো যে তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে মূল ধারায় এসে এ ধরনের কোন রাজনীতি করার সুযোগ ছিলো না। তাছাড়া কমিউনিস্টরা তখন নিজেদের আদর্শের দ্বন্দ্ব নিয়ে এতই ব্যতিব্যস্ত ছিলো যে দেশের রাজনীতি নিয়ে তাদের ভাবার সময় ছিলো না।

বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় দিক হলো, শুধু বিরোধী দলে থেকে তিনি জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যার জন্যে আন্দোলন করেননি। যুক্তফ্রন্টের অন্যতম নেতা আবু হোসেন সরকারের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হচ্ছে তখনও তিনি যেমন জনগণের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্যে লড়েছেন। এমনকি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সরকার। সরকারের নেতৃত্বে তাঁর নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সে সময়েও তিনি জনগণের আর্থিক দুর্দশার কথা বলতে ভোলেননি।

১৯৫৬ সালে যে সময় আবু হোসেন সরকার মূখ্যমন্ত্রী সে সময়ে অর্থাৎ ১৯৫৬ সালের ২ থেকে ১২ জুলাই ইত্তেফাকের রিপোর্টের ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ওই সময়ে ব্যস্ততা ও গৃহীত পদক্ষেপের কিছু অংশ প্রত্যক্ষ করলেই স্পষ্ট হয় যে বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের খাদ্য বা অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে সেদিন কতটা সোচ্চার ছিলেন। কীভাবে তিনি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানকে নিয়ে এসেছিলেন। ২ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর পদক্ষেপ গুলো ছিলো নিম্মরূপঃ

২ জুলাই, ১৯৫৬, আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী শেখ মুজিব আহুত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়াকিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, খাদ্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ও মন্ত্রীসভা শোচনীয় ব্যর্থতা ও চরম কেলেংকারীর পরিচয় দিয়েছে।

৩ জুলাই, ১৯৫৬, ‘৮ জুলাই খাদ্য দাবী দিবস’( আওয়ামী লীগ ওর্য়াকিং কমিটি কর্তৃক সিদ্ধান্ত অনুমোদন) খাদ্য দাবী দিবসকে সামনে রেখে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান যে বিবৃতি দেন তা ছিলো, আগামী ৮ জুলাই ‘খাদ্য দাবী দিবস’ পালনের জন্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওর্য়াকিং কমিটির গত ৩০ জুনের সভায় তা অনুমোদন করা হয়েছে। উক্ত দিবসের কর্মসূচী হচ্ছে জনসভা অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রা। এই দিবস উপলক্ষ্যে বিভিন্ন জনসভার প্রস্তাবাবলী অনুগ্রহপূর্বক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলীয় নেতা এবং ঢাকাস্থ পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের সদর দফতরে প্রেরণ করা যেতে পারে।

৪ জুলাই, ১৯৫৬, আওয়ামী লীগের উদ্যোগে খাদ্যের দাবীতে মুন্সীগঞ্জে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে মুন্সীগঞ্জ মহাকুমা আওয়ামী লীগ দুর্ভিক্ষ ও বন্যা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে। এর পর মুন্সীগঞ্জে প্রকাশ্য জনসভা হয়। এই জনসভায় বক্তব্য রাখেন শেখ মুজিবুর রহমান, বাবু রাধা মাধব দাস, কোরবান আলী প্রমুখ।

৭ জুলাই, ১৯৫৬, খাদ্য দাবী দিবস পালনে বাধা হিসেবে শহরে ১৪৪ ধারা জারির নিন্দা করে শেখ মুজিবুর রহমান বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী শেখ মুজিব বলেন, “আগামীকাল হইতে শহরে শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করিয়া ১৪৪ ধারা জারির নিন্দা করার ভাষা খুঁজিয়া পাইতেছি না। সরকার মন্ত্রী সভা’র ( আবু হোসনে সরকার, কে এস পি নেতা) ইহাই নবতম অগণতান্ত্রিক কীর্তি। সরকার জানিতেন যে, ওয়ার্কিং কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাব অনুয়ায়ী আওয়ামী লীগ ৮ জুলাই খাদ্যের দাবীতে শহরে এক সভা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে। এই ১৪৪ ধারা জারির যে কারণ দেখানো হইয়াছে তাহা অতীব ন্যাক্কারজনক। কারণ, আওয়ামী লীগ পরিচালিত কোন সভা কিংবা শোভাযাত্রার ফলে কখনও শান্তি ভঙ্গ হয় নাই। আদেশটি তাই স্পষ্টভাবে জনসাধারণের গণতান্ত্রিক অধিকারের খেলাপ। ‘সরকার মন্ত্রীসভা’ খাদ্য সংক্রান্ত ব্যাপারে সকল অপকর্ম, কেলেঙ্কারী ও দুর্নীতি ঢাকিবার জন্যে প্রত্যহ মৃত্যুপথযাত্রী হাজার হাজার নিরন্ন জনসাধারনকে সাহায্যদানে ব্যর্থ হইয়া এই কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন।” ( ইত্তেফাক, ৭ জুলাই, ১৯৫৬)

৭ জুলাই, ১৯৫৬, প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারী শেখ মুজিবুর রহমান আজ ( শনিবার) ৫৬ সিম্পসন রোডে অবস্থিত আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির এক জরুরী সভা আহবান করেন। তিনি জানান, সভায় খাদ্য দাবী দিবসকে সামনে রেখে সরকার কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারির ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। এদিন সন্ধ্যায় আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভা ১৪৪ ধারা জারির তীব্র নিন্দা করে। ঢাকায় ঐদিন খাদ্য দাবী দিবস পালন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

১০ জুলাই, ১৯৫৬, শেখ মুজিব এদিন পূর্ব পাকিস্তানের খাদ্য সমস্যা নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে অভিহিত করার জন্যে করাচী পৌঁছান।

১২ জুলাই, ১৯৫৬, করাচীতে শেখ মুজিবুর রহমান এমপি পূর্ব পাকিস্তানের খাদ্য পরিস্থিতির গুরুতর অবস্থা নিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন।

ইত্তেফাকের ১৯৫৬ সালের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এগার দিনের একটি ছবি ও সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের যে বিবৃতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছিলো সেটা তুলে ধরার ভেতর দিয়ে বেশ কিছু বিষয় আমরা লক্ষ্য করতে পারি। প্রথমত, ওই সময়ের খাদ্য অভাব মেটানোর দাবিতে এই এগার দিন নিরলসভাবে বঙ্গবন্ধু একটার পর একটা রাজনৈতিক কর্মসূচী নিচ্ছেন। এবং তিনি মুন্সীগঞ্জেও যেমন জনসভা করতে যাচ্ছেন তেমনি ছুটে যাচ্ছেন তাঁর নেতা সোহরাওয়ার্দীর কাছে করাচীতে। অর্থাৎ একজন রাজনীতিক দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্যে কতটা তৎপর হতে পারেন এটা তার একটি সর্বোচ্চ উদাহরণ। আর এই এগার দিনই শুধু নয়। শেষ অবধি এই খাদ্যের দাবিতে বঙ্গবন্ধু রাজপথে মিছিল করতে গিয়ে রক্তাক্তও হয়েছিলেন। ওই মিছিলের প্রত্যক্ষদর্শী তৎকালীন রিপোর্টার, পরবর্তীতে ভয়েস অফ আমেরিকার সাংবাদিক জিয়াউর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার ১৯৯২ সালে নিয়েছিলাম। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জিয়াউর রহমান বলেন, সেদিন বঙ্গবন্ধু চকবাজার থেকে খাদ্যের দাবীতে মিছিল নিয়ে অগ্রসর হন। সদরঘাট এলে সরকারী পুলিশ ওই মিছিলে গুলি চালায়। গুলিতে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এবং জিয়াউর রহমান নিজে একটি সিনেমা হলে আশ্রয় নেন। সিনেমা হলের কার্নিসে এসে তিনি দেখতে পান গুলিতে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে রাজপথে রক্তাক্ত অবস্থায় একজন একটি রক্তাক্ত আহত দেহ কাঁধে নিয়ে নির্ভীকভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কার্নিসের দিকে আরো এগিয়ে চিনতে পারেন তিনি শেখ মুজিবুর রহমান।

এর থেকে নিশ্চয়ই বলা যায়, ১৯৪৭ এ ধর্মের নামে ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গার ভেতর দিয়ে যে রাজনীতির নামে একটি দেশের সৃষ্টি হয়েছিলো সেই দেশের রাজনীতি ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় একক চেষ্টায় অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যে রাজপথে রক্তাক্ত হবার অবস্থানে নিয়ে আসেন। রাজনীতির এই পরিবর্তনের একক কারিগর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ কাজে তিনি এতটাই আপোসহীন ছিলেন যে, কেন্দ্রে যখন আওয়ামী লীগ সরকার, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তখনও তিনি মানুষের অর্থনৈতিক কষ্ট বা খাদ্যের কষ্টের কথা বলতে পিছপা হননি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পার্লামেন্টে বলছেন, খাদ্যের অভাব পূরণ করেছেন তিনি। সরকারী দলের সদস্য হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদ করে বলছেন, মাননীয় স্পীকার, প্রধানমন্ত্রীর কথা সঠিক নয়। আমি একদিন আগেও পূর্ব বাংলার প্রত্যন্ত এলাকায় ছিলাম। সেখানে চলছে খাদ্যাভাব।

১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫৬ এর ভেতর বঙ্গবন্ধু একাই ধর্ম ভিত্তিক পাকিস্তানের রাজনীতির গতি প্রকৃতি বদলে দিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তির ধারা প্রবাহিত করেছিলেন রাজনীতিতে। আর তারই ধারাবাহিকতায় তিনি ছয় দফা, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকলপনা, দ্বিতীয় বিপ্লবে উন্নীত করেছিলেন রাজনীতিকে, জাতি ও দেশকে। আওয়ামী লীগের ৭০ বছরে দেশ আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি উদাহরণ হিসেবে মাথা উঁচু করেছে বিশ্বে। তার সূচনাটি এভাবেই আওয়ামী লীগের শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমান নামক একজন দীর্ঘদেহী, আজানুলম্বিত বাহু’র বীর স্বাপ্নিকের হাতেই শুরু হয়েছিলো।

স্বদেশ রায়সাংবাদিক

Responses -- “বঙ্গবন্ধু ও পাকিস্তানের রাজনীতিকে অর্থনীতির ধারায় ফেরানো”

  1. সেলিম

    দাদা লেখাটির জন্য ধন্যবাদ।
    স্বাধীনতার মুলমন্ত্র বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা এবং সবগুলো পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে শুধুমাত্র ৪টি পত্রিকা রাখার কারণ নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ লেখা লিখে আমাদের কিছু জানার ব্যবস্থা করবেন বলে আশা করছি।

    Reply
  2. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    সম্প্রতি রাজনীতি করার একমাত্র যোগ্যতা যেকোনও উপায়ে বিত্তশালী হওয়া। বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বিভাজনটা হয়েছে, তা প্রকাশ্য এবং দৃশ্যমান। চাকরি, পদোন্নতি, ঠিকাদারি, ব্যবসা ইত্যাদি কোনও কিছুই এখন দলবাজি ছাড়া ন্যায্য প্রাপ্তি হিসেবে অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের একটি অংশ তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দলবাজি করতে বাধ্য হচ্ছে। সমাজের আরেকটি বিভাজনও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এক দল দ্রুত ওপরের দিকে ধাবমান। এর ফলে আরেক দল দ্রুত নিচে নামছে, বলতে গেলে প্রান্তে চলে যাচ্ছে। অসাম্য এমনভাবে বাড়ছে, যার দাপটে মধ্যবিত্ত বলে কোনও শ্রেণিই আর থাকবে না বলে আশংকা আছে। সরাসরি দুই ভাগের সমাজ হতে চলেছে বাংলাদেশ–ধনী আর দরিদ্র বা উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্ত। বাজারি অর্থনীতির আদর্শে উচ্চবিত্ত সমাজও গরিবি হটানোর কথা বলে। কিন্তু তা আসলে হয় না। মাথাপিছু আয় যত বাড়ছে, বৈষম্য তত উৎকট হচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় একটা ছোট আকারের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে, তেমনি সরকারের লোকজনের বেতন, ভাতা, নানা ধরনের উপহার বেড়েছে, তারা স্ফীত হয়েছে। বেতনের বাইরে স্পিড মানির বদৌলতে তাদের উপরি আয়ের স্পিডও দ্রুতগতিতে ধাবমান। সরকারের বাইরে বিশাল বাণিজ্য জগৎ থাকলেও কর্মসংস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। আবার হলেও পারিশ্রমিকের স্বল্পতায় দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করছে বিশাল এক জনগোষ্ঠী। শহরে, গ্রামে এই দলেই বিচরণ মধ্যবিত্তের। আসলে অন্তহীন দুর্নীতি, সরকারি উপহারে একটি ক্ষুদ্র, কিন্তু শক্তিশালী সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি হওয়ায় তারা প্রভুত্ব করছে আর সবার ওপর। এভাবে বৈষম্য বেড়ে চলেছে লাগামহীন। এই যে ক্ষুদ্র, কিন্তু অতি শক্তিশালী শ্রেণির কথা বলছি, এরা একজোট হয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীর খাটুনির ফল বিনাশ্রমে উপভোগ করছে। বৈষম্য নিরসনকেই উন্নয়নের দর্শন হিসেবে গ্রহণ করে এগোতে না পারায় বাজারিকরণের নীতিকে আঁকড়ে ধরার ফলে এ দেশে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য বেড়ে বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে গেছে। শুধু উন্নয়ন দিয়ে আর সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সম্ভব হচ্ছে না। বহুমুখী কিছু ভাবতে হবে। আমাদের ভেতর ভয়ংকর এক প্রতিযোগিতার প্রবৃত্তি সৃষ্টি হয়েছে। বৈষম্যবৃদ্ধিকারী হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে সংস্কৃতি সচেতন মধ্যবিত্তের হার নিশ্চিত।

    Reply
  3. এনামুল কবীর

    অর্থনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নোবেল পাওয়া উচিত ছিল। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার তত্ত্বে তিনি এই সম্মান পাওয়ার দাবি রাখেন। মন্তব্য করলেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত।
    আজ রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে বঙ্গবন্ধু পরিষদ আয়োজিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
    ড. আবুল বারকাত বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি তো শুধু বলতে পারতেন ‘মুক্তি’ কিংবা ‘স্বাধীনতা’ কিন্তু তিনি দুটোই বলেছিলেন। কারণ দুটো আলাদা জিনিস। এর মধ্য দিয়ে তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তিসহ সব ধরনের মুক্তি নিয়ে এসেছিলেন।
    তিনি বলেন,অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথা বলে কেউ যদি নোবেল পুরস্কার পেতেন, সেটা পাওয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধুর। কারণ অমর্ত্য সেন যে তত্ত্বের ভিত্তিতে অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন এসব তত্ত্ব শেখ মুজিবুর রহমান অনেক আগেই দিয়েছিলেন। তারপরও অমর্ত্য সেন নোবেল পেয়েছেন। এতেও আমরা খুশি। কারণ তিনিও বাংলাদেশেরই মানুষ ছিলেন।‘এ বাংলায় তুমি জন্মেছিলে বলেই আজ আমরা স্বাধীন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, এবারের সরকারের অন্যতম এজেন্ডা হচ্ছে দুর্নীতি নির্মূল করা। কারণ দুর্নীতি নির্মূল না হলে একটি দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন স্থিতিশীল হয় না। বিষয়টি বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালেই বুঝেছিলেন।
    তিনি (বঙ্গবন্ধু) তখন বলেছিলেন,পাকিস্তান সব নিয়ে গেছে। কিন্তু আমার দুর্নীতিবাজদের নিয়ে যায়নি- এটা আমাদের দুর্ভাগ্য।
    এ অর্থনীতিবিদ বলেন,আমরা এখন শতভাগ সাক্ষরতার কথা বলছি। ভাবখানা এমন যে শতভাগ সাক্ষরতা হলেই আমাদের সব হয়ে যাবে। অথচ ১৯৭৪ সালেই বঙ্গবন্ধু ১০০ ভাগ জনগণকে শিক্ষিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

    Reply
    • Md. Mahbubul Haque

      কে কি পারতেন, কিন্তু করেননি বা করতে পারেননি অথবা সুন্দর সুন্দর বচন ওগড়ানো দিয়ে যদি সাফল্যের মাণদন্ড নির্ধারণ করা করা হয় তাহলে কিছু বলার নেই। দেশে যে পুস্তকগুলো আজকাল ধর্মগ্রন্থের চাইতেও বেশী আলোচিত ও জনসাধারণকে পড়ে চরিত্র গঠনের পরামর্শ দেয়া হয় (সরকারী চাকুরী প্রাপ্তিতে অবশ্য পাঠ্য) জেনে রাখুন সেগুলো তারাই মানে না, যারা এগুলো পড়ার পরামর্শ দেন।
      বচনগ্রন্থ বা জ্ঞানী জ্ঞানীগ্রন্থ আরও আসছে…মোসাহেবি জাতীয় আলোচনাসভা (তৈলমর্দনসভা), লেখনীর জোয়ার বয়ে যাবে।

      Reply
  4. সৈয়দ আলি

    বেছে বেছে মৌলানা ভাসানীর অবদান বাদ দিয়ে খাসা কলাম লিখেছেন সম্পাদক মহাশয়।

    Reply
    • মাসুদ আনোয়ার

      মৌলানা ভাসানীর অবদানটা বরং আপনিই লিখুন, সৈয়দ আলি ভাই।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—