(বিস্মৃতিপ্রবণ জাতিকে শেকড়ের ইঙ্গিত)

স্বর্ণমৃগ

অসম্ভব!

থাকবো না, কিছুতেই না। আর পড়ে থাকবো না এই শীতজর্জর রুক্ষ মাটির দেশে। বছরে সাতমাস শীতকাল, একটা পাতা থাকে না গাছে। শিকারের জন্য বেরুলেই তীব্র হিংস্র ঠাণ্ডা হাড় অবধি বসিয়ে দেয় তার ধারালো দাঁত। পরিশ্রমেও বন্ধ্যা মাটি দিতে চায় না অন্ন। কেন পড়ে থাকব এ পোড়া দেশে ? চলে যাবো, চলে যাবো অন্য কোনোখানে। যেখানেই, যত দূরেই হোক, সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা দেশ একটা আছেই কোথাও। সেখানে ফল খেয়ে আঁটিটা ছুড়ে ফেললে পরদিন দেখা যাবে ছোট্ট দু’টো নধর সবুজ পাতা। এরকম হিংস্র ঠাণ্ডা থাকবে না, নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু জড়িয়ে রাখবে মাতৃগর্ভের নিরাপত্তায়। অন্নপূর্ণা মাটি চাইবার আগেই ভরে দেবে প্রসারিত হাতের ভাণ্ড। চলো, চলো যাই। গাঁঠরি বাঁধো মুসাফির।

উঠে দাঁড়ালো আর্যরা। আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে, বাংলা থেকে কত হাজার মাইল দূরে রাশিয়ার সেই ভলগা নদীর তীরে। শস্য-শ্যামল স্বর্ণমৃগ হ্যামিলনের বাঁশির মতো ডেকেছে তাদের, রওনা হয়ে গেল তারা। সাথে সাথে এশিয়া ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অগণিত ভবিষ্যৎ মানবজাতির ধর্মীয় ও সামাজিক রূপরেখার ভিত্তি রচিত হয়ে গেল চিরকালের জন্য। কী গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল সেটা!

পথ জানা নেই। দিক জানা নেই। মঞ্জিলের চেহারা স্বরূপ কিছুই জানা নেই। শুধু আছে দু’চোখ ভরা স্বপ্ন। স্বর্গাদপি গরীয়সী মায়ের মতো মাটি চাই। একদল চললো উত্তরে। একদল দক্ষিণে। পথ দুর্গম। শত শত মানবগোষ্ঠী পড়ে পথে। দেখা হলেই লড়াই। কিন্তু আর্যদের সাথে পারবে কে ? শুধু উন্নততর ধাতব অস্ত্রশস্ত্রই নয়, উন্নততর সামাজিক ব্যবস্থা, পশুপালন ও কৃষির অভিজ্ঞতাই নয়, অতিন্দ্রীয় আরো একটা শক্তি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে আর্যরা। তা হলো দর্শন। স্রষ্টা দর্শন। ব্রহ্ম, বিষ্ণু, মহেশ্বরের ধর্মীয় দর্শনে যা পরিণত হয়েছে পরবর্তীকালে। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানবগোষ্ঠী তখনো গাছ পাথর, চন্দ্র সূর্যের আরাধনা করছে। অনেকের শুধু পাথরের অস্ত্র সম্বল, ভাষা, পরিধেয় বলে কিছু নেই। সাত-সমুদ্দুর-তেরো-নদী পার হয়ে রূপকথার রাজপুত্রের মতো এগিয়ে চলেছে আর্যরা ভুবন ভোলানো মাটির টানে।

এক হাজার বছর লেগে গেল আফগানিস্তান পৌঁছুতে। তারপর রণে ভঙ্গ দিয়ে একদল স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধল ইরানে গিয়ে, তারাই আজ ইরানিদের পূর্বপুরুষ। অন্যদল চললো দক্ষিণে। বিষ-পিঁপড়ের মতো জেদী তারা। একবার কামড় দিয়ে ধরলে যতই টানো কামড় ছাড়বে না সে। বেশি টানলে মাথা থেকে শরীর বরং ছিঁড়ে চলে আসবে, ছেঁড়া মাথাটা কামড় দিয়ে পড়ে থাকবে তবু। ক্লান্তিহীন পথ চলার বিরাম নেই। আরো কয়েকশ বছর পর পাঞ্জাব। সেখান থেকে গঙ্গার ধার ধরে এগোতে এগোতে একেবারে বিহারের ভাগলপুরে এসে থামলো আর্যরা। চোখ তুলে দেখল সামনে বিস্তীর্ণ বদ্বীপ। সুজলা, সুফলা শস্য শ্যামলা।

মনে ঝড়, চোখে অশ্রু। এই সেই দেশ, সেই মাটি। যার হাতছানিতে দেড় দু’হাজার বছর আগে ঘর ছেড়ে পথে নেমেছিল পূর্বপুরুষেরা। কত জন্ম-জন্মান্তর পার হয়ে গেছে তার পর। কত বংশ, প্রজন্ম পথে পথে ঝরে গেছে শুধু এই অন্নপূর্ণা মাটির খোঁজে। অজস্র রক্তক্ষয়, অসংখ্য যুদ্ধ যার জন্য, সেই মাটি ওই সামনে। এবার মহাযাত্রার সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ লড়াইয়ের জন্য সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল চিরকালের অপরাজিত আর্যরা।

ঝাঁপিয়ে পড়ল, এবং সাথে সাথে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত ছিটকে ফিরে এসে আছাড় খেয়ে পড়ল বিহারের মাটিতেই। বিস্ফারিত চোখে চেয়ে আছে আর্যরা। যা ঘটে গেছে তা কল্পনাতীত। হাজার হাজার বছরে সংখ্যাতীত বিজয়ের পর এই প্রথম তাদের ললাটে পড়েছে পরাজয়ের কলঙ্কতিলক। সামনে পুণ্ড্রনগরে ধাতব অস্ত্রহাতে মাথা উঁচু করে রক্তচোখে তাকিয়ে আছে সবল, সুঠাম, বলদৃপ্ত বাঙালি। জীবনের প্রথম পরাজয়ের কশাঘাতে পাগল হয়ে উঠল আর্যরা। সমস্ত শক্তি, অভিজ্ঞতা আর জেদ একত্রিত করে ঝাঁপিয়ে পড়ল আবার, আবার এবং আবার। তারপর হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল বিহারের মাটিতেই। সামনে তখনো ধাতব অস্ত্রহাতে মাথা উঁচু করে রক্তচোখে তাকিয়ে আছে সবল, সুঠাম, বলদৃপ্ত বাঙালি।

তাকানো যাক দলিলের দিকে। কোন্ দলিল ? কার লেখা দলিল ? আর কারো নয়, সেই আর্যদেরই লেখা। অন্য কখনো নয়, সেই আড়াই-তিন হাজার বছর আগেই। অন্য কোথাও নয়, সেই বিহারে বসেই লেখা।

– পুণ্ড্রদেশের অধিবাসীরা ক্ষত্রিয়। [মানব ধর্মশাস্ত্র। ক্ষত্রিয় মানে যোদ্ধা]

– পুণ্ড্রদেশের প্রধান শহর পুণ্ড্রনগর। পুণ্ড্রজাতিরা দস্যু এবং শত্রু। [ঐত্তরিয় ব্রাহ্মণ গ্রন্থ]

– প্রাচ্যদেশের লোকদের তারা (আর্যরা) ‘অচ্ছুৎ’, ‘খুনেডাকাত’ এসব তো বলেছেই, এমনকি ‘অসুর’ বলতেও ছাড়েনি। [ডাঃ নীহার রঞ্জন রায়]

অতি প্রাচীন, অতি অস্পষ্ট একটা ছবি।

কি মনে হয় ? একটু স্পষ্ট হয়ে আসছে না ছবিটা ?

পুণ্ড্রদেশ হলো রাজশাহী, দিনাজপুর বগুড়া নিয়ে উত্তরবঙ্গ। দু’টো ধ্বংসাবশেষ আছে সেখানে, পাহাড়পুর ও মহাস্থানগড় (পুণ্ড্রনগর)। প্রাচীন সভ্যতার সবকিছু আছে সেখানে আছে। আছে ধাতব অস্ত্রশস্ত্র, মুদ্রা, পশুপালন, কৃষিকাজ এবং প্রাচীন সভ্যতার সর্বজনস্বীকৃত মাপকাঠি পয়ঃপ্রণালী। সময়? আজ থেকে তিন সাড়ে-তিন হাজার বছর আগে যে সময়টায় বিশ্ববিজয়ী বন্যা রাশিয়ার ভলগা থেকে ভারতের বিহার পর্যন্ত ছুটে এসে পাথরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছিল।

তারপর ?

– বিদেহ (উত্তর বিহার) হলো পূর্বদিকে আর্য বসতির শেষ সীমা। [শতপথ ব্রাহ্মণ গ্রন্থ-আর্যদের]

– আর্যরা বিজয়ী রূপে বাংলার কোনও অঞ্চলে বসতি স্থাপন করিতে পারে নাই।

[ঐতিহাসিক ড. নীহার রঞ্জন রায়ের সূত্রে “পিতৃভূমি ও স্বরূপ অন্বেষণ”- ফারুক হাসান]

আরো একটু স্পষ্ট হয়ে এল না ছবিটা ?

কি মনে হয় ?

(চলবে)

হাসান মাহমুদমুসলিম রিফর্ম মুভমেন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী, শারিয়া আইনের ওপর গবেষক, লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বক্তা।

Responses -- “বাংলা ও বাঙালি (এক)”

  1. Akhtar Hossain

    অনেক আগেই পড়েছিলাম হাসান মাহমুদের লেখা বাঙলা ও বাঙালি সিরিজ। তখন থেকেই ভাবতাম লেখক সেই লেখাগুলো আবার লিখেছেন না কেন। আশাকরি অনেকেই সংগ্রহে রাখার মত কিছু মুল্যবান তথ্য পাবেন।

    Reply
  2. সরকার জাবেদ ইকবাল

    তাহলে আজ সেই ‘সবল, সুঠাম, বলদৃপ্ত বাঙালি’ কেন মেনি বিলাই হয়ে গেল? মিয়ানমারকে ‘সোজা করা’ কি এতই কঠিন? তিস্তার পানি কি আনা যায় না?

    Reply
  3. দানিয়েল

    আর্যদের প্রতিহত করে পুণ্ড্র জাতি। বাঙালি জাতি বা বাংলা ভাষার তখন উদ্ভবই ঘটেনি।

    Reply
  4. shanta maria

    লেখাটা ভালো লাগছে। আশাকরি আমাদের প্রাচীন ইতিহাস সুখপাঠ্য হবে। জাতিকে শেকড়ের কথা জানানোর উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামি পর্বগুলো পড়ার অপেক্ষায় আছি।

    Reply
  5. সোহান

    অসংখ্য ধন্যবাদ। যেন এটারই অপেক্ষা করছিলাম। বাংলার ইতিহাস যেন নেই। ইসলামি ইতিহাস বা ইউরোপীয় ইতিহাস পড়ানো হয় সেভাবে আমাদের ইতিহাস হয় না।। অপেক্ষায় থাকলাম পরবর্তী লেখার জন্য।।

    Reply
  6. দানিয়েল

    ১। ভারতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত এই জাতির নাম আর্য ছিল না। ইরান হয়ে ভারতে প্রবেশ করে বলে এদের নাম Iran>Aryan বা আর্য হয়।
    ২। পাহাড়পুর পাল সভ্যতার নিদর্শন, পুণ্ড্রবর্ধনের নয় ।

    Reply
    • হাসান মাহমুদ

      আপনি সঠিক, ধন্যবাদ। আমি শুধু ইঙ্গিত দিয়েছি, এখানে এর বেশী দেয়া যায় না। ইতিহাসে এমন খুব কমই আছে যা বিতর্কিত নয়। আর্যরা বহিরাগত নয়, তারা উত্তর ভারতের আদিবাসী, এমন তত্বও আছে।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—