একেবারে ছোটবেলায় আমাদের কাছে ধর্ম জিনিসটা ছিল আবছায়া। এটুকু শুধু জানতাম যে, আমরা হিন্দু, আরেক দল আছেন, যারা মুসলমান। মুসলমানরা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে। আর হিন্দুরা পূজা করে। হিন্দুদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা। আর মুসলমানদের ঈদ। হিন্দুরা গরুর মাংস খায় না। মুসলমানরা কচ্ছপ বা কাছিম খায় না। হিন্দুরা মরে গেলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আর মুসলমানদের কবর দেওয়া হয়। এই ছিল মোটা দাগের পার্থক্য।

আমাদের অভিভাবকরা বোঝাতেন, আমরা যেমন পূজার সময় ঠাকুর-দেবতা বা ভগবানের উপাসনা করি, মুসলমানরাও আল্লাহকে স্মরণ করেন। আল্লাহ বা ভগবান আসলে এক। ভিন্ন নামে ডাকা হয়। সেই বয়সে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগত, একই রকম মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আমরা কেন হিন্দু, আমরা কেন ভগবান ডাকি, আর আমাদের প্রতিবেশীরা কেন মুসলমান, তারা কেন আল্লাহ ডাকে? এই পার্থক্য কেন হলো, কে, কীভাবে এই বিভাজন সৃষ্টি করল-সে সব প্রশ্নের জবাব সেই বয়সে পেতাম না।

তাতে অবশ্য আমাদের বেঁচে থাকা, মেলামেশা, খাওয়া-পড়া, উৎসব-বিনোদনে কোনো সমস্যা হতো না। লেখা-পড়া, খেলাধুলা, আড্ডা, এবাড়ি-ওবাড়ি যাওয়া, খাওয়া-কোনো কিছুতেই কোনো বাধা-নিষেধ ছিল না। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, বন্ধুবান্ধবদের বাসায় গেলে কখনই আমাদের সামনে গুরুর মাংস আনা হতো না। অভিভাবকরা এ ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ও সচেতন থাকতেন। আমাদের আলাদা ঘরে বসিয়ে খাবার পরিবেশন করা হতো। তখন এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতো। এবং সেটা ছিল অন্তর থেকে উৎসারিত। তখন অবশ্য এখনকার মতো ধর্মপালনের এত সমারোহ ছিল না। বাড়ির মুরুব্বিরা রোজা রাখতেন বটে। কিন্তু তাদের চেহারা-আচরণ দেখে টের পাওয়া যেত না। ছোটরা শখ করে এক-আধটা রোজা রাখত। তাতেও বিরাট কোনো সমারোহ ছিল না। রোজা রেখে ‘মুই কি হনুরে’ ভাব নিয়ে কেউ চলত না। হোটেল-রেস্তোরাঁ অন্য সব সময়ের মতোই খোলা থাকত। যার মন চাইতো হোটেলে গিয়ে খেত। এমনকি বহু রোজদারকেও দেখতাম হোটেলে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিত। আমরা খেতাম। কিন্তু তারা খেত না! এই নিয়ে কোনও টিকা-টিপ্পনী, ক্ষোভ-রাগ কারোর মধ্যে কখনও দেখিনি। সন্ধ্যায় ইফতার হতো সাধারণ নাস্তার মতো। শুধু বাড়তি হিসেবে এক গ্লাস শরবত আর একটু আদা থাকত। রমজান মাসে আমরাও বন্ধু-বান্ধবদের বাসায় ইফতারি করতাম। ঘুঘনি, মুড়ি, ডালের বড়া। ঘরে বানানো সেই সব জিনিসের স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে!

শৈশবে আমাদের কাছে ঈদ মানে ছিল সেমাই খাওয়া। আমরা সকাল বেলায় বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দেখতাম সবাই পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় পরে ঈদের নামাজে চলেছে। বড়দের হাত ধরে ছোটরাও যেত। তখন আশেপাশের কয়েক মাইল জুড়ে ছিল একটি মাত্র ঈদগাহ মাঠ। বিশাল বটগাছের ছায়ায় সেই নির্জন ঈদগাহ মাঠ শত শত মানুষের পদচারণায় ভরে উঠত। আর আমরা বাড়িতে অপেক্ষা করতাম কখন ঈদের নামাজ শেষ হয়। নামাজ শেষ হওয়ার পর সবাই সারি বেঁধে ফিরে আসত। পরিচিতজন সামনে পেলেই কোলাকুলি করা হতো। এই কোলাকুলিতে আমরা ছোটরাও খুব মজা পেতাম। সমবয়সীদের সঙ্গে আমরা বার বার কোলাকুলি করতাম। কখনও কখনও আমাদের কোলাকুলি শেষই হতে চাইত না!

এরপর অপেক্ষা করতাম কখন প্রতিবেশীর বাসা থেকে গরম-গরম সেমাই আসে। বিভিন্ন বাড়ি থেকে সেমাই আসত। তখন সাধারণত দুই ধরনের সেমাই আমরা দেখতাম। একটা দুধ দিয়ে রান্না করা। আরেকটা একটু শক্ত কিছিমের। যেটাকে জর্দা সেমাই বলা হতো। অনেক সময় চালের রুটি আর মুরগির মাসের ঝোলও আসত। সেসব খেয়ে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খেলায় মত্ত হওয়াটাই ছিল আমাদের শৈশবের ঈদ।

এরপর প্রাইমারি ছাড়িয়ে হাইস্কুলে ভর্তি হই। বাড়তে থাকে বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা। বিনোদনের উপাদানগুলোও বাড়তে থাকে। তখন আমরা যারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ছিলাম, আমাদের কাছেও ঈদের দিনটি ছিল খুবই আকর্ষণীয়। ভালো জামাকাপড় পরে অপেক্ষা করতাম কখন ঈদের নামাজ শেষ হয়। নামাজ শেষ হওয়া মাত্র আমরাও উৎসবে সামিল হয়ে যেতাম। সবাই খুশি মনে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করতাম। যারা লম্বা তারা একটু ঝুঁকে পড়ে কোলাকুলি করত। আবার অনেক সময় আমরা সাইজে খাটোরা উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে কোলাকুলি করতাম। সেটাও ছিল একটা মজা! তারপর শুরু হতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেমাই খাওয়ার পালা। দুপুরে পোলাও-মাংসের জন্যও আমরা অপেক্ষা করতাম। তখন বিনোদন বলতে ছিল সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা। আমরা বন্ধুবান্ধবরা দল বেঁধে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতাম। ঈদের দিন অভিভাবকরাও উদার হয়ে যেতেন। সিনেমা দেখার অনুমতির জন্য সেদিন ভাবতে হতো না। তখন বাংলা সিনেমা যে কী ভালো লাগত বলে বোঝানো যাবে না! অ্যাকশন বা ফ্যান্টাসি ধরনের সিনেমা বেশি ভালো লাগত। আলাদীন, আলিবাবা, সিন্দাবাদ, লাইলি-মজনু, মান-সম্মান, বানজারান জাতীয় সিনেমাও আমাদের মনকে আলোড়িত করত (বানজারান সিনেমাটি লুকিয়ে লুকিয়ে হলে গিয়ে অন্তত পাঁচবার দেখেছি)! ওয়াসিম, সোহেল রানা, জসিম ছিল স্বপ্নের নায়ক! ববিতা ছিল প্রিয় নায়িকা!

আমরা যখন এইট-নাইনের ছাত্র, তখন এলাকায় প্রথম টেলিভিশন আসে। তখন অবশ্য টেলিভিশন এত সুলভ ছিল না। হাতেগোনা কয়েকটি বাড়িতে ছিল এই পরমাশ্চর্য যন্ত্রটি। সেসব বাড়িতে রীতিমতো হাট বসে যেত। কেউই নিজ ঘরে শান্তিতে টেলিভিশন দেখতে পারত না। অনেক সময় ভদ্রতা বশে নিজের চেয়ারটিও ছেড়ে দিতে হতো প্রতিবেশী কোনো মুরুব্বি ব্যক্তির সম্মানে! ঘরে-বাইরে কোথাও আশ্রয় না পেয়ে অনেককে বেজার মনে চলে যেতে হতো। সে এক সময় ছিল বটে!

এই সময়ে আমাদের কাছে ঈদের বড় আকর্ষণ ছিল টেলিভিশন দেখা। আমরা দল বেঁধে বড়লোক কোনো বন্ধুর বাড়িতে যেতাম টেলিভিশন দেখার জন্য। সেখানে গাদাগাদি করে বসে টেলিভিশন দেখতে হতো। আর ছিল লোডশেডিং আতংক। ঈদের বিশেষ নাটক কিংবা আনন্দমেলা চলাকালে বিদ্যুৎ থাকবে কি-না এটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার বিষয়। তখন মমতাজ উদ্দিন আহমেদের লেখা ঈদের নাটক ছিল খুবই জনপ্রিয়। এ ছাড়া, আনন্দমেলা, সিনেমার গান, ঈদ উপলক্ষ্যে বিশেষ কোনো সিনেমা-এগুলোও ছিল আমাদের কাছে খুবই প্রিয়। সাদাকালো টেলিভিশনে দেখা এসব রঙিন বিনোদন আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখত। ঈদ চলে গেলে কয়দিন খুবই শূন্য শূন্য লাগতো।

আমাদের ছোট বেলার ঈদ আনন্দের আরেকটি উপকরণ ছিল ঈদের সালামি কিংবা ঈদি সংগ্রহ করা। বড়দের সঙ্গে ছোটদের এই ভালোবাসার লেনদেন সম্পর্ককে করে তুলতো আরও মধুর। ঈদের দিন কেউ পা ছুঁয়ে সালাম করলে স্নেহ নিয়ে পাঞ্জাবির পকেট কিংবা শাড়ির আঁচল থেকে থেকে এক টাকা, দুই টাকা কিংবা পাঁচ টাকার একটা নোট বের করে দিতেন। নতুন পোশাক পরে বড়দের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে তারপরই ঈদের সালামি নেয়ার প্রথা চলে আসছে বহুবছর ধরে।

আমাদের ছোটবেলার সেই অকৃত্রিম ঈদের আনন্দ এখন আর দেখা যায় না। তখন আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলোও ছিল ছোট ছোট, প্রাপ্তিগুলোও তেমনই। তাই নিয়ে আমরা কত সুখে-আনন্দে দিন কাটিয়েছি। আমাদের অভাব ছিল কিন্তু অভাববোধ ছিল না। ছিল না দেখানোর-ফাটানোর-ফুটানোর মানসিকতা। ঈদে সবাই নতুন জামা পরতো না, সেই সামর্থ্য সবার ছিল না। যে পরতো, তার মধ্যে এই নিয়ে কোনো গর্ব ছিল না। বরং এক ধরনের কুণ্ঠিত ভাব থাকতো। যেন নতুন জামা পরে সে কোনো অপরাধ করে ফেলেছে। যার পকেটে একটি টাকা থাকতো, সেও কখনও গর্ব করতো না। যার কোনো টাকা থাকত না, সেও কোনো ধরনের হীনমন্যতায় ভুগতো না। আমাদের পাঁচবন্ধুর যদি একটাকা থাকতো তাহলে আমরা সবাই সমান খুশি হতাম। সবাই মনে করতাম ওটা আমাদের টাকা। পাঁচজনে মিলে ওটা ব্যয় করবো। মানবিক অনুভূতি, সততা আর আন্তরিকতা দিয়ে গড়া ছিল আমাদের শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো। সম্পর্কগুলোও!

যন্ত্রপ্রযুক্তি নির্ভর সমাজে এখন মানুষের প্রাচুর্য বেড়েছে। বেড়েছে বিনোদনের উপকরণ। বেড়েছে আকাঙ্ক্ষা, সাধ। একইসঙ্গে সামর্থ্যও। এখন আর কারও মনে ঈদের সেমাই, সিনেমা হলের সিনেমা, ঈদ-সালামি কিংবা টিভি অনুষ্ঠান নতুন কোনো আনন্দ-আলোড়ন তৈরি করে বলে মনে হয় না। কেউ কিছুতেই এখন আর সন্তুষ্ট হয় না, তৃপ্ত হয় না! কোনো কিছুই কাউকে আর আকর্ষিত করে না! এ এক আশ্চর্য মানসিকতা! আশ্চর্য বোধ!

এখনও ঈদ আসে। আমরা কেবলই বসে বসে স্মৃতির জাবর কাটি। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো অনন্ত দীর্ঘশ্বাস হয়ে দেখা দেয়! মনের মধ্যে কেবল অনুরণন তোলে শাহ আবদুল করিমের গান: আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম…

চিররঞ্জন সরকারকলামিস্ট।

One Response -- “ছোটবেলার ঈদ”

  1. Hasan Mahmud

    হোয়াট ?? এ তো আমারই শৈশব কৈশোরেরই জীবন কাহিনী, কেবল লিখতে শুরু করেছিলাম, আপনি “কেমনে ব্যাটা পেরেছে সেটা জানতে”? শুধু আপনি হিন্দু সেই জায়গায় আমি মুসলিম বসিয়ে দিলেই চিত্রটা দিব্যি মিলে যায়। ইশকুলে আমরা হিন্দু মুসলিম পাঁচটা “বাঁদর” যত দুর্গাপূজা, ঈদে মিলাদুন্নবী, কালীপূজা, ঈদুল ফিতর, রথযাত্রা, কোরবানী ঈদ সব অনুষ্ঠানে “বড়বাড়ী’র বাঁশঝাড়ের বাঁশ চুরি করে কেটে প্যাণ্ডেল বানাতাম যেখানে অনুষ্ঠান হতো! বটম লাইন, দুনিয়ার আর কোনো জাতির রাজনীতিকেরা দেশের ও জাতির এতবড়ো সুদূরপ্রসারী সর্বনাশ করেনি যা আমাদের রাজনীতিকেরা করেছে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—