ভারতের বিজেপি সরকার বা প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদি বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা পানি চুক্তি করায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও তিস্তা পানি চুক্তি করার পক্ষে। মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এ চুক্তি করার জন্যই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি না আসায় সে সময়ে মনমোহন সিং-কে সিনেটে একটি চমৎকার ভাষণ ও বাঘ রক্ষার চুক্তি করে চলে যেতে হয়।

মোদি সরকার আসার পরে ল্যান্ড মার্ক ল্যান্ড বাউন্ডারি চুক্তি হয়েছে। বিরোধী দল কংগ্রেসের স্বল্প আসন থাকা সত্ত্বেও পার্লামেন্টে তারা অকুণ্ঠ সমর্থন জানায় ওই চুক্তিকে। কিন্তু শেখ হাসিনা অনেক দেরিতে ফিরতি সফরে গেলেও দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওই তিস্তা চুক্তি করাতে সমর্থ হননি। মমতা ব্যানার্জি রাজি হননি।

মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে যখন ক্ষমতায় আসেন তখন কেন্দ্রে কংগ্রেসের মনমোহন সিং সরকার। তখন ভারতের অনেক পলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট এমনটি ধারণা করেছিলেন, মমতা ব্যানার্জি লোকাল গভর্মেন্ট নির্বাচন হয়ে গেলে তিস্তা চুক্তিতে রাজি হবেন। কারণ গজলডোবা এলাকায় যেখানে তিস্তার পানি ধরে রাখা হয় ওই এলাকায় কংগ্রেসের আধিপত্য। মমতা ব্যানার্জি লোকাল গভর্মেন্ট নির্বাচনে সেখানে জিতলে তিনি রাজি হয়ে যাবেন তিস্তা পানি চুক্তিতে। লোকাল গভর্মেন্ট নির্বাচনে মমতা জেতেন বটে, কিন্তু তিনি মনমোহন সিং-কে বেইজ্জতই করেন। মনমোহন সিং অনেকটা ঢাকায় নেমেই জানতে পারেন মমতা ব্যানার্জিকে বাংলাদেশ সফরে তার সফরসঙ্গী হচ্ছেন না। আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানতে পারেন প্রায় রাত একটার দিকে। সে আরেক অধ্যায়। সে অধ্যায় এ কলামে নন। যাহোক, মনমোহন সিং নিরবে চলে যাবার পরে অনেক পানি তিস্তা দিয়ে গড়িয়ে যায়। এর পরে মোদি ক্ষমতায় আসেন। বিশাল ম্যান্ডেটের এই সরকার তিস্তা পানি চুক্তি করতে শতভাগ আন্তরিক থাকা সত্ত্বেও আবারও মোদির অবস্থা মনমোহনের মতো করে ছাড়েন মমতা ব্যানার্জি। যেহেতু ভারতীয় সংবিধানে রাজ্য সরকারের তার পানিসহ অনেক সম্পদের ওপর অধিকার রয়েছে তাই ওই সংবিধান বলে কেন্দ্রকে বুড়ো আঙুল দেখান মমতা ব্যানার্জি। পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধু শুধু নয় উপকারী রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের নায্য পাওনা তিস্তার পানি থেকে গত দশ বছর বঞ্চিত করে রেখেছেন মমতা ব্যানার্জি।

এখনও ভারতের পলিটিকিক্যাল অ্যানালিস্টরা মমতাকে ঘিরে তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে নানান হিসাব-নিকাশ করেন। তারা নানান আশা খোঁজেন মমতার কাজের মধ্যে যার ভেতর দিয়ে তারা তিস্তা পানি চুক্তির একটা আশা দেখেন। কিন্তু তারা এই হিসেবটি করেন না যে, আর যাই হোক মমতা বাংলাদেশের সঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণসহ অবস্থান চাইলেও তার নিজস্ব কিছু এজেন্ডা আছে। যার ভেতর আছে, বাংলাদেশের জঙ্গিরা তার দেশে আশ্রয় নিলে অনেকটা ওভারলুক করা। অনেকে বলেন, মমতা পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোটের জন্যে একাজ করেন। কারণ, বাংলাদেশের জঙ্গিরা ওখানে মুসলিম প্রধান এলাকাতে গিয়ে কোনও না কোনও মুসলিম জঙ্গির আশ্রয় নেয়। মমতা তার প্রশাসনকে সেখানে ইচ্ছাকৃত উদাসীন রাখেন একটি মাত্র কারণে সেটা তার রিজার্ভ ভোট। যে কারণে সাঈদীর সপক্ষে কোলকাতায় মিছিল হলে মমতা তখন গণতন্ত্রী হয়ে যান। তার প্রশাসন সেটা বাধা দেয় না। যে কারণে ইসলামাবাদ ও কোলকাতায় সাঈদী ও মতিউর রহমান নিজামীর জন্যে মিছিল হয়। মমতার এমনি সার্বিক আচরণ মিলে এটা এখন প্রমাণিত সত্য, তিনি আর যাই হোক তিস্তার পানি চুক্তি করার পক্ষে কখনই মত দেবেন না। মমতা যে সময়ে তিস্তা নিয়ে এই খেলা খেলছেন তখন বাংলাদেশের সামনে আরেকটি চুক্তি দরজায় কড়া নাড়ছে তাহলো গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন। ২০২১ সালে গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন।

২০২১ সাল যেমন বাংলাদেশের জন্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তেমনি মমতা ব্যানার্জির জন্যও। কারণ, ২০২১ এ মমতার রাজ্য সরকারের বিধান সভা নির্বাচন। ওই নির্বাচনের জয় পরাজয়ের ওপর নির্ভর করছে মমতা ২০২১ সালে রাজ্যে সরকার গঠন করতে পারবেন কি পারবেন না?

আসলে কি ২০২১ এ মমতা সরকার গঠন করতে পারবেন? মমতা ২০২১ এ রাজ্য সভা নির্বাচনে যাবেন কিন্তু তার আগেই ২০১৯ এ ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে দিয়েছে ২০২১ এ  পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতাকে কাদের সঙ্গে লড়তে হবে। ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ১৮ টি আসন, কংগ্রেস ২টি আর মমতা বিশটি। আর সব জায়গাতেই মমতাকে লড়তে হয়েছে বিজেপির সঙ্গে। এমনকি লোকসভার সঙ্গে বিধান সভার চারটি উপ নির্বাচনেও জিতেছে বিজেপি। তাই আগামী বিধান সভা নির্বাচনে মমতার প্রতিপক্ষ নরেদ্র মোদির বিজেপি।

২০২১ এর নির্বাচনে কী ফল হতে পারে সেটা খুঁজতে গেলে পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনের একটু অতীতে যেতে হবে। ২০০৯ এ পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভা নির্বাচনে মমতা ও তার এসওএস জোট মিলে ২০টি আসন পায়। আর তার বিপরীতে ১৬টি আসন ছিলো বামফ্রন্টের। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার মনে করেছিলো লোকসভা নির্বাচনের এই ফল ২০১১ এর বিধানসভা নির্বাচনের ওপর কোনও প্রভাব ফেলবে না। সে সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অনেক বাম নেতা ও তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললেও তারা বলেছেন, বিধান সভায় এর কোন প্রভাব পড়বে না। বাস্তবে লোকসভা নির্বাচনের প্রভাবই পড়েছিল বিধানসভায়। বামফন্ট্রের সিট ২৩৩ থেকে নেমে ৬২তে এসে দাঁড়ায়। ২০০৯ এ মমতার জোটের আসন ছিল ২০ আর তার ধাক্কাতেই ২০১১ এর বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার ২৯৪ আসনের ভেতর বামফ্রন্ট পায় মাত্র ৬২টি। ঠিক ২০০৯ এর চিত্রটি আবার ফিরে এসেছে ২০১৯ এ। এবার পশ্চিমবঙ্গের লোকসভায় বিজেপির সিট ১৮টি। আর তার পরে প্রতিদিনই তৃণমূল থেকে দলে দলে লোক ও নেতারা যোগ দিচ্ছেন বিজেপিতে। তাই ২০০৯ এর লোকসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচন ২০১১ এর বিধানসভা নির্বাচনের একটি ঈংগিত দিচ্ছে।

২০২১ যদি ২০১১ এর ঈংগিতকে কার্যকর করবে তেমনি একটি পরিবেশ এখন পশ্চিমবঙ্গে। তাদের সাধারণ মানুষের বক্তব্য, সাংবাদিকদের বক্তব্য এবং মিডিয়ার নানান রিপোর্ট ও লেখার ভেতর দিয়ে সেটাই বের হয়ে আসছে। আর তাই এখন বলা যায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় কোনও অঘটন না ঘটলে ২০২১ এ বিজেপিই হবে ২০১১ এর তৃণমূল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সেদিকেই হাঁটছে। এমনকি যারা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষে তারাও এখন আর মমতার ভেতর অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কিছু দেখছে না বরং কিছু স্ট্যান্টবাজি দেখছে। তাই ২০২১ এ পশ্চিমবঙ্গে পট পরিবর্তন এখন অনেকে সময়ের বিষয় বলে মনে করছেন। আর যদি এই পট পরিবর্তন হয় তার ফলে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন, ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা কীভাবে হবে সেটা তাদের বিষয়। বাংলাদেশের জন্যে দুটো সুখবর তখন এক সঙ্গেই আসবে বলে আশা করা যায়। কারণ, নরেদ্র মোদি জনগণের সামনে কমিটমেন্ট করেছেন, তিনি তিস্তা পানি চুক্তি করবেন। তাই মমতা রঙ্গমঞ্চ থেকে সরে গিয়ে সেখানে বিজেপি এলে নরেন্দ্র মোদির জন্য আর কোন বাধা থাকে না। পাশাপাশি ২০২১ এ গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন। সেখানেও মোদির জন্যে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কোনও বাধা হবে না। বাংলাদেশ সহজেই গঙ্গার পানি পাবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ না হয়েও একজন সাধারণ সাংবাদিক হিসেবে আমি মনে করি দুই দেশকে গঙ্গার ওপর এই ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভাবতে হবে। বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার দরকার নেই। তবে চুক্তিটা এমন হতে পারে ফারাক্কার সব গেইট খোলা থাকবে বারো মাস। এটা কোনও বাড়তি বন্ধুত্বের জন্যে নয়। বাস্তবতা মেনে নেবার জন্যে। কারণ ফারক্কা বাঁধ কোলকাতা বন্দরকে কোনও বাড়তি পানি দেয়নি। হলদিয়া বন্দরকে সুখ সাগরে ভাসায়নি। শুধু তাই নয় অতিরিক্ত লবনের কারণে আমাদের সুন্দরবনের মতো তাদের সুন্দরবনও আজ বিপন্ন। আর বাংলাদেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত তা উত্তরবঙ্গের মরা পদ্মা ও মাটির নিচের পানি কমে যাওয়া বলে দেয়।  তাই আর গেইট বন্ধ নয়, বরং খুলে দেয়া হোক সব গেইট। ভেবে দেখতে পারেন বিশেষজ্ঞ ও দুই দেশের রাজনীতিকরা।

স্বদেশ রায়সাংবাদিক

Responses -- “২০২১ সালেই কি তিস্তা পানি চুক্তি ও গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়ন হবে?”

  1. সামিরুল ইসলাম

    এই মূলা আর কতো দিন ঝুলাবেন ? বিগত ১০ বছরের উপর আপনার দল ক্ষমতায় তিস্তায় পানি পাওয়া যাবে এ মূলা গত ১০ বছর ধরে সাধারন জনগনের সামনে ঝুলায়া রাখছেন । দয়া করে মূলা আর ঝুলাবেন না, এবার আমাদের মাপ করেন !

    Reply
  2. Md.brahim

    মমতার স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের কারণে বামের জনগণ রামের দিকে গেছে। মমতার নেতা ভাগিয়ে দল বড় করার নীতি বিজেপি নিয়েছে। সুতরাং আগামীতে মমতার হার বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ। সে প্রত্যাশা করতেই পারি।

    Reply
  3. তুফান

    ‘ডিপ স্টেট’ শব্দদ্বয় এখন মার্কিন রাজনীতিতে সদা উচ্চারিত। বাংলায় এর অনেক প্রতিশব্দের মাঝে ‘ছায়া রাষ্ট্র’ বা ‘গুপ্তরাষ্ট্র’ বলা যেতে পারে। তবে এই ধারণা যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সাথে জড়িত থাকলেও এর অবস্থিতি ও কর্মকাণ্ড রাষ্ট্র-রাজ্য-সরকার-ক্ষমতার ধারণার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই টুইটারে লিখলেন, তিনি ‘ডিপ স্টেটে’ আক্রান্ত। এ দিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট আলোচনার দ্বার উদ্বোধন করলেন। ডিপ স্টেট কী? সাধারণভাবে বোঝানো হয়, এটা হলো দৃশ্যমান সরকারের বাইরের বা পেছনের সরকার। আর এই সরকারই আসল। এই অদৃশ্য সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধি সরকারের প্রদত্ত হুকুম, পরামর্শ বা বক্তব্য শোনে। কিন্তু বাস্তবায়ন করে নিজেদের হিসাব অনুসারে। এখন এটা সর্বজনীন এবং বিশ্বব্যাপী অনুসৃত পদ্ধতি। এর চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন মার্কিন কংগ্রেসের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাইকেল লোফগ্রেন তার ‘দি ডিপ স্টেট : দি ফল অব দি কনস্টিটিউশন অ্যান্ড দি রাইজ অব শ্যাডো গভর্নমেন্ট’ বইতে।
    তিনি লিখেছেন, এই ছায়ারাষ্ট্রের কর্মীরাই নির্বাচনে সাহায্য করে; নির্বাচিতদের তথ্য দিয়ে তাদের নীতি ও কর্মপন্থা এমনভাবে নির্মাণ করিয়ে নেয় যেন অবশেষে তারাই এর ভোক্তা হতে পারে। অর্থাৎ এরা শাসন-শোষণ-নির্বাচন করে থাকেন নিজেদের জন্য, তবে অপরের নামে। এরা কিন্তু পেছনের দরজা দিয়ে আসেননি। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরকার তৈরি করে আইন প্রণয়ন করে এই গোষ্ঠীর সৃষ্টি করেছেন। এরা প্রতিষ্ঠান বা এসটাবলিশমেন্ট বলে পরিচিত, যার ওপর ভর করে থাকতে হয় সবাইকে। এই এসট্যাবলিশমেন্ট সরকারি-বেসরকারি এবং অন্য সব সংস্থার সর্বস্তরে অবস্থিত। এসব প্রতিষ্ঠানের নীতি, কর্মপন্থা বা কর্মকাণ্ড প্রস্তুত এবং বাস্তবায়ন তারাই করে থাকেন; যদিও এগুলো প্রচারিত হয়ে থাকে জনপ্রতিনিধি বা জনগণের সেবকদের নামে। এ জন্যই দেখা যায়, কোনো এক সময়ের পরে এসব কর্মকাণ্ডের দায়ভাগ নিতে হয় জনপ্রতিনিধিদের। ফলাফল বিরূপ হলে দায়ভার পুরোটাই প্রতিনিধিদের ওপর চাপানো হয়। তবে এর ব্যতিক্রম হয় তখনই যখন জনপ্রতিনিধির অভিজ্ঞতা কর্মচারীর সাথে সাযুজ্যপূর্ণ থাকে। অর্থাৎ তিনি কর্মচারী ছিলেন এবং এখন জনপ্রতিনিধি। এরাই দুই অবস্থার অভিজ্ঞতা একত্রে ব্যবহারের ফলে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। এরাই হলেন ‘ছায়ারাষ্ট্র’ যার কোনো প্রতিলিপি নেই। লোফগ্রেন লিখেছেন, এখন সর্বত্র তারাই রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।
    এই ছায়ারাষ্ট্র নির্ধারণ করে কোন রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী ক্ষমতায় যাবে। এই নির্ধারণের মূল মাপকাঠি হলো কতটুকু সুবিধা বা সুযোগ এই ক্ষমতা প্রয়াসী দল ক্ষমতায় গিয়ে তাদের দিতে পারবে। অতীতে এই প্রশ্নটি ছিল সরাসরি শক্তির সাথে জড়িত। শক্তিমানেরা ক্ষমতা সরাসরি দখল করে অস্ত্রের সাহায্যে তা রক্ষা করত। প্রতিপক্ষ তাদের চেয়ে শক্তিশালী হলে তারা ক্ষমতাচ্যুত হতো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। এখন এটা হয় বুদ্ধিচর্চার মাধ্যমে যার নাম নির্বাচন। তবে এই ছায়া রাষ্ট্র নিজেদের প্রয়োজনীয় তথ্যÑ সূত্র সুবিধাগুলো আহরণ বা নির্মাণ করে রাষ্ট্রের অর্থ, উপযোগিতা ও সেবা ব্যবহার করে। কখনো কখনো এই সেবা ব্যবহারের আকার বিস্ময়কর। সেজন্য এসব ব্যবহারের প্রয়োজনও তারা তৈরি করে। এসব উদ্দেশ্যে তারা নানা অভাবিত ঘটনা পেছন থেকে ঘটিয়ে থাকে। আবার তারা জনগণকে বোঝাল, বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সবার তথ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এ জন্য ১৭০ কোটি ডলার খরচ করে ইউটাহতে ১৭টি ফুটবল মাঠের সমান একটি দালান নির্মাণ করেছে ২০০৭ সালে। এই দালানে যে কম্পিউটার আছে তাতে এক ইওটাবাইট তথ্য আছে। অর্থাৎ ৫০০ কোটি লাখ পাতায় যে তথ্য থাকে, তার সমান। অন্য কথায়, এখানে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের তথ্য পাওয়া যাবে। এই ছায়ারাষ্ট্র ওয়াশিংটনে ৩৩টি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছে। এক কোটি ৭০ লাখ বর্গফুটে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৮,৫৪,০০০ বেসরকারি গোয়েন্দা কাজ করে যাচ্ছে। তারা দেশের এবং বিশ্বের প্রয়োজনীয় সব প্রতিষ্ঠান ও মানুষের তথ্য অনুসরণ করে। এই ছায়া সরকার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে অত্যন্ত প্রাধান্য দেয়। মনোবিজ্ঞানী ড. আয়ারভিং এল জানিস বলেছেন, এই কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে গিরগিটির রঙ পাল্টানোর মতো প্রার্থিত জনগোষ্ঠীকে এক কাতারে আনা যায়। এর নাম দিয়েছেন ‘গ্রুপ থিংক’। তখন এদের যা বলা হয়, তাই মেনে নেয়। তাই দেখা যায়, এই কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে সরকার এবং বিভিন্ন গোষ্ঠী নানা দিন পালন করে, অনেক স্মৃতিসভা করে, অযথাই মিছিল, আনন্দের আয়োজন করে। ড. আয়ারভিং বলেছেন, এসব ভড়ং এক দিকে জনগণের চিন্তা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, অপর দিকে এক বিরাটসংখ্যক অনুসারী সৃষ্টি করা এবং খুশি করা সম্ভব। তবে এই ডিপ স্টেট পুরো সরকার নয়। লোফগ্রেন দেখিয়েছেন, এরা মূলত জাতীয় প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সংস্থা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিচার বিভাগ এবং অর্থ বিভাগের একাংশের সমন্বয়ে গঠিত। এরা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের মাঝে গোপন ও স্বতঃস্ফূর্ত যোগাযোগ রক্ষা করে। বৈদেশিক মন্ত্রণালয়কে হাতের পাঁচ আঙুলের মতো ব্যবহার করা হয়। যদি কোনো রাজনীতিবিদ ভুলে যান তার লাইনটি, এ সংস্থাগুলো তড়িৎগতিতে তা স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলে না। তবে তারা কখনো নিজেদের ভুল স্বীকার করেন না। যেমন, লিবিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানের যুদ্ধগুলো। এই ছায়ারাষ্ট্রের আধুনিক স্থপতি ডেভিড রকফেলার ১৮৭৩ সালে ৮৭ জন ধনী, ক্ষমতাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে ট্রাইলেটারাল কমিশন তৈরি করেছিলেন। নতুন বিশ্ব গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এরা কাজ শুরু করেন। এরা ইউরোপ-আমেরিকার বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং এই কমিশনের সদস্যদের কেউ-না-কেউ আমেরিকা-ইউরোপে ক্ষমতায় গেছেন। যেমন জিবনিউ ব্রেজিনস্কি, যিনি প্রেসিডেন্ট ওবামার শিক্ষক ছিলেন। ব্রেজিনস্কি ট্রাইলেটারাল কমিশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা। এই কমিশনের সদস্য লুকাস পাপাডোমস এবং মারিও মন্টি যথাক্রমে গ্রিস ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এই কমিশনের সদস্যরা বিশ্বব্যাংকে প্রেসিডেন্টদের বেশির ভাগ। বুশ, কিনটন, ডিক চেনি, আল গোরও এই কমিশনের সদস্য হিসেবে বিশ্বঅর্থনীতি এবং রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন; এখনো করছেন। মজার কথা, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করে এবং তারাই ছায়ারাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। লোফগ্র্রেনের একটি তথ্য অত্যন্ত মূল্যবান। ডিপ স্টেট দু’টি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। তা হলো অপরিহার্য জাতীয় নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক সংস্থার আধিপত্য। জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে ডিপ স্টেট জনগণের সাধারণ অধিকারটুকুও ছিনিয়ে নেয় এবং তাদের একটি ভীতির রাজ্যে নীত করে। নিরাপত্তার নাম বলে তারা রাষ্ট্রকে নানা সঙ্ঘাতে জড়িয়ে ফেলে আর্থিক সুবিধা লুটে নেয়। যেমনÑ এই স্টেট ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে, দু’টি বিশ্বযুদ্ধের নায়ক তৈরি করেছে। ফলে ঋণের বোঝা চেপে যায়। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ১৭০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এই ডিপ স্টেট সম্পর্কে এক প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘প্রকাশ্য সরকারের পেছনে সিংহাসনে আসীন থাকে এক অদৃশ্য সরকার যার জনগণের প্রতি কোনো দায়িত্ব নেই ও আনুগত্যও নেই।’ অ্যাটর্নি ও লেখক জন ডাবলু হোয়াইটহেড তার ‘ব্যাটলফিল্ড আমেরিকা : দি ওয়্যার অন আমেরিকান পিপল’ বইতে দেখিয়েছেন এই ডিপ স্টেটের সদস্যরাÑ মিলিটারি, পুলিশ, সংগঠিত অপরাধী সংস্থা, সরকারি কর্মচারীরা ক্ষমতাবান হচ্ছেন এবং ধনসম্পদের মালিক হচ্ছেন। সংবিধানে বিধৃত জনগণের ‘উই দি পিপল’ বলে অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ডিপ স্টেট আসলে পুলিশি রাষ্ট্র বলতে যা বোঝা যায়, সত্যিকারভাবে তাই সৃষ্টি করেছে। অধিকারহীন জনগণ অসহায় এবং প্রায় অনুপস্থিত। তিনি বলেছেন, ‘এ অবস্থা বিরাজ করছে বিশ্বের সব দেশে এবং এটা অপরিবর্তনীয়।’
    এটা অপরিবর্তনীয় এ জন্য যে, বিশ্বে এখন ‘নির্বাচিত’ সরকারের পরিবর্তনের সময় একটি স্বল্পকালীন সরকার থাকে। তারা এই স্টেট। এরাই নির্বাচন পরিচালনা করে এবং দৃশ্যত ক্ষমতা বদল করে। আসলে আড়াল থেকে এরাই সব কলকাঠি নাড়ছে। হোয়াইটহেড বলেছেন, ‘অবস্থা অপরিবর্তনীয় হওয়ার আর একটি কারণ এই স্টেটের শাসনে ধনী আরো ধনী হয়, গরিব হয় আরো গরিব, মিলিটারি আরো যুদ্ধবাজ হতে পারে। অশান্তি জিইয়ে রেখে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে।’
    ডিপ স্টেট নিজেদের আরাম-আয়েশ-নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। হোয়াইটহেড তথ্য দিয়েছেন, ‘যদি আণবিক যুদ্ধ হয় তার ফলাফল থেকে প্রেসিডেন্সিকে বাঁচানোর জন্য ব্লুমন্টের কাছে মাউন্ট ওয়েদারে মাটির নিচে এক বিশাল শহর তৈরি রাখা হয়েছে। বিপদের সময় ডিপ স্টেটের অধিবাসীরাই সেখানে থাকবে, জনগণ নয়। লেখক জর্জ ফ্রিডম্যান এই স্টেটের ইতিহাস বর্ণনা করে বলেছেন, এর জন্ম সরকার এবং ক্ষমতা ব্যবস্থার উদ্ভবের সাথে সাথে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা তাদের বশংবদদের দিয়ে যে প্রশাসনব্যবস্থা নির্মাণ করে, তারাই ছায়ারাষ্ট্র।
    এই প্রশাসন ব্যবস্থা গঠন করার প্রস্তাব দেন জার্মান অর্থনীতিবিদ-আইনজ্ঞ কার্ল সুজ। তিনি বলেন, সরকার পরিচালনার জন্য অরাজনৈতিক কর্মীবাহিনীর প্রশাসন থাকা উচিত। এরা রাজনৈতিক নির্দেশে চলবে। তবে তাদের মেধাবী হতে হবে। পরে পরীক্ষার মাধ্যমে সিভিল সার্ভিসের আবির্ভাব ঘটে এবং ধাপে ধাপে তাদের অবস্থানকে সংহত-সুদৃঢ় করে। ফলে ইচ্ছে করলেই এদের সরানো সহজ নয়। দৃশ্যত সিভিল সার্ভিস রাজনৈতিক ইচ্ছার অনুগত হলেও তারা নিজেদের এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে থাকে। এ জন্য এখন প্রায়ই দেখা যায়, প্রাক্তন সিভিল সার্ভিসের সদস্যরা রাজনীতিতে যোগ দিচ্ছেন এবং ক্ষমতাসীন দলসহ সব রাজনৈতিক দল তাদের সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। এর প্রধান কারণ, এদের মাধ্যমে ডিপ স্টেটকে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। ডিপ স্টেটের প্রধান অঙ্গ হলো গোয়েন্দা বাহিনী। এর বিস্তৃত ও বিশাল বর্ণনা পাওয়া যায় ট্রেভর আরনসনের বই ‘দি টেরর ফ্যাক্টর’। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডের চমৎকার বর্ণনা রয়েছে এ বইটিতে। বিশেষ করে এফবিআই এবং সিআইএ’র কর্মপন্থার একাংশের বর্ণনা। সংস্থাদ্বয়ের আছে বিশাল বাজেট ও লোকবল এবং এদের কর্মপরিধি বিশ্বজুড়ে। বিশ্বের সব দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বা সাথে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। বইটিতে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং টেররিস্ট’ আলোচনায় ট্রেভর দেখিয়েছেন, কাউন্টার টেরোরিজমের নামে অবিশ্বাস্য কর্মকাণ্ড করা হয়ে থাকে। আরনসন অনুসন্ধানে পান ‘এফবিআই সন্ত্রাস দমন বা প্রতিরোধের পরিবর্তে প্রান্তিক, হতাশাগ্রস্ত, বেপরোয়া, মানসিক অসুস্থ বা অপরিপক্বদের মাঝ থেকে মানুষ সংগ্রহ করে সন্ত্রাসী বানায়। অন্য কথায় এফবিআই যে শত্রু দমনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা বরং সেই শত্রু নির্মাণে পটু।’ দেখা গেছে, তাদের চিহ্নিত সাজাপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীরা তাদেরই একসময়ের কর্মী। এবং এই কর্মকাণ্ড নিরবচ্ছিন্নভাবে সারা বিশ্বে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে চলছে। ডিপ স্টেটের একটি প্রিয় কর্মকাণ্ড হচ্ছে যুদ্ধ। তারা নানা বিষয়ের উদ্ভাবন করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মাঝে যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত, সামাজিক অশান্তি উসকে দেয় এবং এর ফলের জন্য অপেক্ষা করে। ফল হলো, তাদের অর্থ ও ক্ষমতা লাভ। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর জে রুমেল তার ‘ডেথ বাই গভর্নমেন্ট’ বইতে আধুনিক কালের বিভিন্ন সঙ্ঘাত-যুদ্ধে ১৯০০ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে ১৬ কোটি লোক নিহত হয়েছে বলে এক অনুসন্ধানী তথ্য প্রকাশ করেন। এদের মাঝে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হয় চীনে, এরপর রাশিয়ায় এবং জার্মানিতে। চীনে মৃতেরে সংখ্যা উল্লেখ করেছেন সাত কোটি ৭০ লাখ, রাশিয়ায় ছয় কোটি ১৯ লাখ, জার্মানিতে দুই কোটি ৯ লাখ। তবে তিনি উল্লেখ করেছেনÑ ধর্মীয় বিবাদ, জাতিগত বৈষম্য, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, শিক্ষাগত অসুবিধার কারণে এ মৃত্যুগুলো ঘটেনি। একটি সমাজে বিভিন্ন মতবাদ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদলের যে জায়গা থাকা উচিত – সেই জায়গায় এখন বি-রাজনীতিকীকরণের একটা প্রক্রিয়া বা চেষ্টা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো রাষ্ট্রের শক্তিপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে। এ জন্য একটা ‘ডিপ স্টেট’ বা ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটা রাষ্ট্র’ তৈরি হচ্ছে।

    Reply
  4. সৈয়দ আলি

    আর কতো প্রতিশ্রুতি পুরনের প্রচার চালাবেন?

    Reply
  5. সজল কান্তি

    দাদা
    শুধু দিবাস্বপ্ন দেখে লাভ নেই, তিস্তার পানি ২০২১ তো দুরের কথা ২১২১ সালেও পাবেন না ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—