এই তো কিছুদিন আগে আমাদের ছেড়ে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল। জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র তিনি মৃত্যুর পূর্ব পযর্ন্ত হাতে পাননি। এ রকম অনেক মুক্তিযোদ্ধাই আছেন, যাঁরা সনদপত্র পাননি কিংবা নেননি! তাঁদের কথা ভাবতে গিয়ে এই প্রসঙ্গে আরও কিছু বিবেচনাবোধ অনুরণিত হচ্ছে আমাদের মাঝে!

আমাদের চোখের সামনে দেখছি, আমাদের অনেকের চেয়ে অনেক কম ভূমিকা রেখেও মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র নিয়ে ভাতা তুলছেন, সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন। অথচ এঁদের অনেকে অর্থনৈতিকভাবে বেশ স্বচ্ছল ও সমাজে অনেক দিক থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত! কতজন যে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র নিয়ে সংবর্ধনা নিচ্ছেন, তাও আমাদের চোখের সামনে দেখেছি বা দেখছি! আরও দেখলাম প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ করার পরও অনেকের সনদপত্র নেই। আমরা ভাবছি ‘মুক্তিযোদ্ধা’ কারা?

কিছুদিন আগে পাঁচ সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করেছে সরকার। প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্মকর্তারা মুক্তিযোদ্ধা না হওয়া সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। তাদের নাম উল্লেখ করতে চাই না। অভিযোগ রয়েছে, শুধুমাত্র চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর লক্ষ্যে তারা মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহারে উদ্যোগী হয়েছিলেন! সনদ বাতিলের ফলে তাঁরা আরও এক বছর বাড়তি চাকরি করার সুবিধা পাননি। চাকরির শেষ সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার হিড়িক পড়েছিল বলে পত্রপত্রিকায় খবরও এসেছিল!

জানা যায়, এ পর্যন্ত মোট মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়া হয়েছে প্রায় এক লাখ ৫২ হাজার। গত পাঁচ বছরে অর্থাৎ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সময়ে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার মোট ১১ হাজার ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। এর আগের সরকারের আমলে আরও ৪০ হাজার সনদ দেওয়া হয়। তবে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এখনো সনদ নেননি।

মহাজোট সরকার ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর নির্ধারণ করে। এর আগে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁদের অবসরের বয়সসীমা ৫৭ থেকে বাড়িয়ে ৫৯ বছর করা হয়। অবসরের বয়স বাড়ানোর পর ২১ হাজার মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁদের সনদ প্রত্যয়নের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। প্রকাশিত খবর থেকে আরও জানা যায়, এর মধ্যে প্রায় সাত হাজার সনদে গলদ পাওয়া যায়, মন্ত্রণালয় সেগুলো প্রত্যয়ন করেনি। এ ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে এক হাজার ৬৬৮ জনের সনদে গলদ ধরা পড়ে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৫২ জনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ সঠিক নয় বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে ভুয়া সনদধারী কারও বিরুদ্ধে এখনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ক’দিন আগে খবর বেরিয়েছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাময়িক সনদ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। ৪৭ হাজার ‘মুক্তিযোদ্ধা’র এই সনদ রয়েছে, তাঁদের ভাতাও স্থগিত রাখা হয়েছে। ২০০৮-০৯ সালে ১ লাখ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেলেও ২০১৭-১৮ সালে ভাতা দেওয়া হয় ১লাখ ৮৬ হাজার জনকে। ২০০৯ সালে সম্মনী ভাতা ছিল ৯০০ টাকা। এখন সেই ভাতা বাড়িয়ে হয়েছে ১০ হাজার টাকা, দুটি উৎসব ভাতাও দেওয়া হয়। বহু রকমের তালিকাকে ভিত্তি করে মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়া হয়। আমরা জানি, যাঁরা প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রায় অর্ধেকেই আর এসময়ে বেঁচে নেই!

আমরা জানি, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বহুমাত্রিক। মুক্তিযুদ্ধ তো সাধারণ মানুষই করেছে। মুক্তিযুদ্ধ মানেই গোলাগুলি শুধু নয়। মুক্তিযুদ্ধে কতজনের কত রকমের ভূমিকা–কতজনের কত ধরনের আত্মত্যাগ! কতভাবে অংশগ্রহণ! গুটি কয়েক লোক ছিল, যারা চিহ্নিত রাজাকার-আলবদর ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী! আর অন্যরা বহুভাবে বহুস্তরে অংশ নিয়েছেন! সেসব বিস্তৃত ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠলগ্ন হয়ে আছে। যিনি আহত হয়েছেন, যিনি স্বজন হারিয়েছেন, যাঁর ঘর-বাড়ি লুঠ হয়েছে, সর্বস্ব হারিয়ে হয়েছেন সর্বহারা, যে খাদ্য দিয়েছেন–আশ্রয় দিয়েছেন নিরাশ্রয়দের, যিনি অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন–তাঁদের কি কোনো অবদান নেই মুক্তিযুদ্ধে? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মানেই হলো বেশিরভাগ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মানে প্রথম থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ গণমানুষের অংশগ্রহণের দৃঢ় অবস্থানের ইতিহাস, তা শুধু ক’জনের নয়। একদিক থেকে তাঁরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা। জনগণের সেই সম্মিলিত ও বিস্তৃত ভূমিকাকে খণ্ডিত করে শুধু কিছু ‘সনদপত্র’র আওতায় মধ্যে সীমাবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাকে বিবেচনা করা মুক্তিযুদ্ধের বহু বিস্তৃত পটভূমি ও তাৎপর্য় অনেকাংশে সঙ্কুচিত ও ম্লান করা হয় বলে আমাদের মনে হয়। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল অনন্য ও গণমানুষের গণযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধকে সংকীর্ণ ও একরৈখিকভাবে মূল্যায়ন করা কোনোক্রমেই ঠিক নয়।

যখন থেকে সনদপত্র নির্ভর মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় টেনে নিয়ে সুবিধা বিলানোর উদ্যোগ নেওয়া হলো–তখন থেকে মুক্তিযুদ্ধকে সংকীর্ণ গলির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হলো! আর এই কারণে পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করেছে–তারাই প্রধানত ‘মুক্তিযোদ্ধার সাইনবোর্ড’ ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করার চেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে সুবিধাবাদী ‘মুক্তিযোদ্ধা’ নামধারী কিছু লোক ব্যবহৃত হয়েছে ক্ষমতার পাটাতনে বসা লোকদের স্বার্থে। এই প্রবণতা এখনো থেমে থাকেনি। মুক্তিযোদ্ধার অর্ন্তনিহিত মানে হলো দেশমাতৃকার জন্য আত্মত্যাগ, জনগণের মুক্তির জন্য লড়াই করে জীবন দান করার মানসিকতা ও গৌরবময় ভূমিকা পালন করার ইচ্ছে ইত্যাদি, এটাই তো তাঁর ভাবমূর্তি। এই ভাবমূর্তির বাইরে ‘মুক্তিযোদ্ধা’র নামে কিছু আমলা ও সুবিধাভোগীরা আরও সুবিধা নিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তিকে কাদামাখা করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সংকীর্ণ পোষাকী অবস্থানে ঠেলে দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সীমাবদ্ধ করা সমীচীন নয়, তা মানাও যায় না! এর ফলে আত্মত্যাগের মহিমাকে দূরে ঠেলে দিয়ে সুবিধামুখী প্রতিকৃতির পরিচয় মেলে ধরে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকাকে নতুন প্রজন্ম ও ইতিহাসের কাছে ছোট করা সমীচীন নয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার গৌরবের ভাবমূর্তিকে কাদামাখা করে ছোট পরিসরে নিয়ে যাওয়ার অধিকারও কারও নেই, ইতিহাসের সত্য সেটাই বলে!

গোলাম কিবরিয়া পিনুকবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক

Responses -- “মুক্তিযোদ্ধার ভাবমূর্তি, সনদ, সুবিধা ও খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি”

  1. মোরসালিন মিজান

    গোলাম কিবরিয়া পিনু, আপনার জন্য সত্যি করুণা হচ্ছে। আপনি মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরের সূর্য সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ছোট করার সেই পুরনো প্র্যাকটিস এখনও অব্যাহত রেখেছেন। চাতুর্যপূর্ণ লেখায় আপনার ক্ষুদ্রতা ঢাকা পড়েনি মোটেও। কত সহজেই না আপনি মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায়িত করলেন! একাত্তরে অধিকাংশ বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। নানাভাবে দেশের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছেন। সেহেতু, আপনি বলতে চাইলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে আলাদা করে দেখার কোন কারণ নেই। আপনার জন্য, ফের বলি, করুণা হচ্ছে। আপনি সম্মুখ সমর কী তা জানেন না। এবং এই আপনাদের মতো অগভীর চর্চায় অভ্যস্তরা কবি পরিচয়ে সামনে আসেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম, ত্যাগ আজ ২০১৯ সালের আয়নায় দেখছেন আপনি। আমাদের কী দুর্ভাগ্য! যারা মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ ভাবতে পারেন না, তাঁদের গৌরব বুকে ধারণ করতে পারেন না সেই অতি সামান্যরা জাতির বিবেক বনে গেছেন।

    Reply
  2. সৈয়দ আলি

    “প্রশাসনের এই শীর্ষ কর্মকর্তারা মুক্তিযোদ্ধা না হওয়া সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। তাদের নাম উল্লেখ করতে চাই না।” সরকার তাদের সনদ বাতিল করেছে কিন্তু প্রতারণার মামলা করেছে কি? তাদের প্রতারণাপূর্বক নেয়া বেতন ভাতা ফেরৎ নিয়েছে কি? আপনার নাম না নেয়া সিনিয়র সচিবদের অন্ততঃ একজন লাভজনক সরকারী পদে আছে। সে কথাটি বলবেন না? ও, আওয়ামী লীগের সমালোচনা করতে গেলে বাধে?

    Reply
  3. সাঈদ, মুক্তিযোদ্ধা

    মুক্তিযুদ্ধকালে ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়স সাড়ে ১২ বছর নির্ধারণ করে জারি করা পরিপত্র কেন আইনগত কর্তৃত্ব-বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। এ নিয়ে গত ৪৬ বছরে মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স, সংজ্ঞা ও মানদণ্ড ১০ বার পাল্টানো হলো। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, বর্তমানে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের মত অনেক ভুয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা সরকারের দেয়া বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। অনেকে ট্রেনিং পেয়েছেন; কিন্তু কোন সম্মুখ যুদ্ধে অংশ গ্রহন করার সুযোগ পাননি এবং তারা কোন ধরনের আহতও হননি। একই সাথে ট্রেনিং দিয়েছেন, একই সাথে যুদ্ধের ময়দানে থেকেছেন, একই সাথে বাড়ী ফিরেছেন, একই সাথে অস্ত্রও জমা দিয়েছেন; অথচ তাঁদের মধ্যে কতিপয় মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতার অনেক পরে এক শ্রেনীর অসাধু দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সহায়তায় ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ভুয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সেজে সরকারের দেয়া বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। তারা যা খাচ্ছেন তা নৈতিকতার দিক থেকে সঠিক নয়। এখানেও মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের অসাধু এবং স্বার্থান্বেশী মহলের হাত রয়েছে। ভুয়ারা কোথায়, কখন যুদ্ধ করেছে এবং কোথায় কি ভাবে আহত হয়েছে তা সহযোদ্ধাদের সাথে আলাপ করলেই পাওয়া যাবে। দেশের অধিকাংশ উপজেলায়ই ভুয়ারা বহাল তবিয়তে আছে। অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোন কিছু পাবার আশায় যুদ্ধ করেননি। তাঁদের একটাই উদ্দেশ্য ছিল কি ভাবে দেশ শত্রু মুক্ত হবে এবং কবে দেশ স্বাধীন হবে। যাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত মহৎ সে সব মুক্তিযোদ্ধাদেরকে যারা ভুয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সাজার সুযোগ করে দিয়ে সকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় করাচ্ছে সে সব লোভী কর্মকর্তাদেরকে আইনের আওতায় আনা উচিত, তাদের মুখোস উন্মোচন করা উচিৎ এবং তাদের থেকে তসরুফকৃত অর্থ আদায় করা উচিৎ। ভুয়ারা দেশ ও জাতির শত্রু। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা এবং ভুয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে তালিকা থেকে বাদ দেয়া গেলে প্রতি মাসে সরকারের কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। সাশ্রয়কৃত সে সব অর্থ সরকার ইচ্ছা করলে উন্নয়নমূলক অন্য কোন খাতে ব্যয় করতে পারবেন। মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রনয়ণ করার সময় ভারতীয় তালিকা মানদন্ড হিসেবে ধরা হলে পূর্বের তালিকা তৈয়ারে সমস্যা কম হতো। তা হলে সব তালিকা-ই ভুয়া মুক্ত হতো। সে সুযোগ এখনো আছে।মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মানের স্মারক হিসেবে কোটা রাখা হোক। তবে ৩০ শতাংশ কোটা কমিয়ে আনা উচিত। কারণ ইতোমধ্যে এটা অনেকবার প্রমাণিত হয়েছে, ৩০ শতাংশ কোটা পূরণ করার মত মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এখন দেশে অবশিষ্ট নেই। কোটা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা যেতে পারে। ৩০ শতাংশ রেখে দিলেও আমার কোনো আপত্তি ছিল না, যদি সকলে আসল মুক্তিযোদ্ধা হতেন। কোটা সুবিধা নেয়ার জন্য অনেকে যে অবৈধ পন্থায় সনদ সংগ্রহ করেছেন, সেটি এখন ওপেন সিক্রেট। আপত্তি আমি করছি, কারণ কোটা সুবিধা নিতে গিয়ে দুর্নীতি হয়েছে। তরুণ সাংবাদিক সাইদ রহমান পরিবর্তন.কম এ মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে ’মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়ে, সম্মান কমে’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। সাইদ রহমানের লেখা থেকে নিম্নে উল্লেখিত পরিসংখ্যান ধার করলাম। তিনি লিখেছেন, ’মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্ট সূত্র মতে, ১৯৮৪ সালে এরশাদ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন করেন। সেই তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮ জন। ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভারত সরকার থেকে প্রাপ্ত তালিকা সংগ্রহ করেন, এতে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৮৩৩ জন। ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে যে তালিকাটি হয় সেই তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ৮৬ হাজার। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়ন করা হয়, যা মুক্তিবার্তা (সবুজ) হিসেবে পরিচিত। পরে আরও যাচাই-বাছাই করে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫২ জনের আরেকটি তালিকা করা হয়, যা মুক্তিবার্তা (লাল) হিসেবে পরিচিত। ২০১৭ সালের শুরুতে বর্তমান তালিকার সাথে নতুন করে আরও মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে আবেদন আহ্বান করা হয়। এতে করে উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে ১ লাখ আবেদন জমা পড়েছে। অনলাইনসহ এই আবেদন দেড় লাখ। ধারণা করা হচ্ছে, এর ৮০ ভাগই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’! সাইদ রহমান আরও লিখেছেন- ’এ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও মানদণ্ড বদলেছে ১০ বার। মুক্তিযুদ্ধতো একটিই, যেটি ১৯৭১ সালে সংগঠিত হয়েছিল। তাহলে এতবার এর সংজ্ঞা পাল্টাতে হলো কেন? কে না জানে, এই সংজ্ঞা এবং মানদণ্ড নির্ধারণেও কাজ করেছে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি/মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতিকরণ’। ২০১৪ সালে জামুকার (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল) বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধার উপাধি বা সনদ পাওয়ার জন্য আট যোগ্যতার কথা বলা হয়। সেগুলো হলো, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ট্রেনিং ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করা। মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে ভূমিকা রাখা। কাদেরিয়া বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, আনসার বাহিনীর মতো বিভিন্ন মুক্তিবাহিনীর সদস্য থাকা। প্রথমে ভারতের ত্রাণশিবিরে অবস্থান করলেও পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া। পুলিশ, আনসার ও সেনাবাহিনীর সদস্য হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অথবা মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত গণপরিষদের সদস্য হওয়া। মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দিতে শিল্পী, সাহিত্যিক, খেলোয়াড়, চিকিৎসক, লেখক, সাংবাদিক হিসেবে বা বিদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অবদান রাখা প্রভৃতি।
    একই বছর জামুকার আরেক বৈঠকে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যেকোনো আবেদনকারীর বয়স ১৯৭১ সালে ন্যূনতম ১৫ বছর হওয়া বাধ্যতামূলক। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে জামুকার আরেক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, একাত্তরের ২৬ মার্চ যাঁদের বয়স ন্যূনতম ১৩ বছর ছিল, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারবেন’। সাংবাদিক আজিজুল পারভেজ কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ’জাল সনদের হাজার হাজার ’মুক্তিযোদ্ধা’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে লিখেছেন, ’মুক্তিযুদ্ধ না করেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি, সনদ পাওয়া, গেজেটভুক্ত হওয়া এবং এ বিষয়ক কাগজপত্র সংগ্রহ করে ফেলা কোনো কষ্টসাধ্য ব্যাপার না। লোক ধরে টাকা ব্যয় করলেই তা মিলছে। এই সুযোগে কেবল মুক্তিযুদ্ধ না করা ব্যক্তিরাই যে মুক্তিযোদ্ধা বনে যাচ্ছেন তা-ই নয়, রাজাকার যুদ্ধাপরাধীরাও মুক্তিযোদ্ধা বনে যাচ্ছেন। এভাবে মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে চলছে চরম বিশৃঙ্খলা-নৈরাজ্য। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জাল সনদে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। জাল সনদের জন্য সারা দেশেই গড়ে উঠেছে একটি জালিয়াতচক্র। জাল সনদ নিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়লেও জালিয়াতচক্রকে শনাক্তের কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না’। মুক্তিযোদ্ধা সনদ শুধু সাধারণ দুর্বৃত্তরাই জাল করেন নি। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সচিবরা পর্যন্ত সনদ জাল করে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। ২০১৪ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে শ্যামল সরকার ’ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা: বাতিল হচ্ছে পাঁচ সচিবের সনদ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, ’সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত ৫ সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ জাল অভিযোগে বাতিল হতে পারে। আর এটি হলে এসব সচিব চাকরি হারাবেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে চাকরিকালে যে বাড়তি সুবিধা নিয়েছেন তা-ও তাদের সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে। একইসঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন তারা। এদিকে গতকাল উপ-সচিবসহ ৩৫ জনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, সচিবদের মধ্যে পাঁচ জনের সনদ যে জাল সে সম্পর্কে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হাইকমাণ্ডের সিদ্ধান্ত পেলেই ওই পাঁচ সচিবের সনদ বাতিল করা হবে। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, জাল মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের শত শত অভিযোগ রয়েছে’। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের অনেকে কোটা বাতিলের তৎপরতার বিরুদ্ধে অনেক সোচ্চার। কিন্তু জাল সনদের বিষয়ে তেমন কোনো কথাই বলেন না। এ বিষয়টি দুঃখজনক। অন্যদিকে অনেকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অপমানসূচক মন্তব্য করেন । কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার সুযোগ কারা দিয়েছে? যারা মুক্তিযোদ্ধার সনদ জালের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকেও তেমন কোনো অ্যাকশন নিতে দেখা যায় না। ১৯৭১ সালের এর পরে জন্ম নিয়ও যদি মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায় (এমন পাওয়া গেছে) তবে আর ১২/১৩ কিংবা ১০ বছর হিসেব করে কি লাভ? নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে লজ্জা হয়।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—