প্রতিবছরের মতো এবারও সারাদুনিয়ায় ১৮ মে দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হবে। বোধ করি আন্তর্জাতিক এই উদযাপনে পৃথিবীর ১৫১টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও সামিল হবে। এই দিবস উদযাপনের উদ্দেশ্য হচ্ছে জাদুঘরের গুরুত্ব ও ভূমিকার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তোলা। শুরুতেই আমার প্রশ্ন আমরা কি সেই সচেতনতার কাজটি করছি?

তবে জাদুঘরের ইতিহাসে আমাদের দেশের মতো দীর্ঘ সময়ের ইউরোপের উপনিবেশ হিসেবে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে ঔপনিবেশিক কালো থাবামুক্ত দেশগুলোর বাস্তবতার ভিন্নতা রয়েছে। এখানে বলে নেওয়া ভাল ইউরোপের কতিপয় দেশ বিশেষ করে ফরাসি এবং ব্রিটেনের জাদুঘরগুলোতে বাংলাদেশের আর গ্রিসের মতো অন্যান্য দেশের প্রাচীনকালের অনেক অনেক নিদর্শন রয়েছে। প্রশ্ন হলো এসব তারা কিভাবে সংগ্রহ করেছে?

তাদের সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা এশিয়া, আফ্রিকার দেশগুলো থেকে প্রত্নসম্পদ তারা অবাধে লুট করেছে বা চুরি করেছে।

পরের প্রশ্ন হলো তাদের সাম্রাজ্যবাদী অবস্থার পতনের পরে বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী চোরগুলোকে খেদিয়ে দেবার পরে তাদের জাদুঘরে কিভাবে তারা অন্যান্য দেশের অনন্য নিদর্শন বাড়িয়ে চলেছে?

এজন্যে তারা দুটি উপায় অবলম্বন করে। কালোবাজারের মাধ্যমে এক চোরের কাছ থেকে আরেক চোর সংগ্রহ করে থাকে। যে কারণে ইরাক বা সিরিয়ায় লুট হওয়া জাদুঘরের সম্পদ ইউরোপে কেনাবেচা হয়। আর অন্য আরও একটি উপায় হলো অন্যান্য দেশের অনন্য নিদর্শনের আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি আদান প্রদানের উছিলায় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো নিজেদের দেশে প্রদর্শনীর আয়োজন করে অনন্য নিদর্শনগুলোর নমুনা তৈরি করে আসল নিদর্শনগুলো রেখে দিয়ে নকল নমুনাগুলো ফেরত পাঠানো।

আর এই দুইনম্বরি চর্চার ক্ষেত্রে ফরাসি দেশের সুনাম (?) দুর্নাম দুটোই রয়েছে। যে যেভাবে দেখেন।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ এরকম একটি খপ্পরে পড়েছিল। এরকম খপ্পরের পক্ষে দূতিয়ালি আর প্রকাশ্যে গোপনে দূতিয়ালিগিরির সঙ্গে আদতে ভক্ষক প্রকাশ্যে সংস্কৃতির রক্ষক আমলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামী দুই একজন অধ্যাপক, ডাকসাইটে ঋণখেলাপি, নাটক জগতের তারকা, বিপণন ব্যবসায় সফলতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিবর্গ, গণমাধ্যমের কতিপয় মুঘল, যাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আশকারায় বাংলাদেশের জাদুঘরের প্রচীনকালের অনন্য দুইশ’র কাছাকাছি নিদর্শন পাচারের আয়োজন করা হয়েছিল।

এখানে বলে রাখা দরকার ১৯৭০ সালে সাংস্কৃতিক সম্পত্তির অবৈধ লেনদেন ঠেকাতে ইউনেস্কোর এক সম্মেলনে একটি দলিল গৃহীত হয়। সেই দলিলে বলা আছে, কোন দেশ অবৈধ, কালোবাজার থেকে এবং আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কোন চোর বা অন্য কারও কাছ থেকে কোনও নিদর্শন ক্রয় বা সংগ্রহ করতে পারবে না। অবাক করার বিষয় হলো ইউনেস্কোর সদর দপ্তর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অবস্থিত হলেও দেশটি সেই দলিলকে সম্মান করেনি।

এবার বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ পাচারচক্রের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের প্রসঙ্গে একটু বলি। দীর্ঘ আয়োজন করে বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরের ভেতরের এবং বাইরের অনেক প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় বাংলাদেশের অনন্য সব নিদর্শন প্যারিসের গিমে জাদুঘরে পাচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আর অনন্য এতসব নিদর্শনের তালিকা তৈরি করেছিলেন ফরাসি এক কিউরেটর।

এই পাচারের পক্ষে যারা সরব ছিলেন তাদের যুক্তি ছিল- তাতে না কি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। আর দেশের সম্পদ বিদেশে পাচারের নামে আমাদের ভাবমূর্তি ‘উজ্জ্বলকরণ’ কর্মসূচির যারা কারিগর ছিলেন তাদের মধ্যে জাতীয় জাদুঘরের একাধিক সাবেক মহাপরিচালক, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। আর বাইরে থেকে রসদ জোগানোর মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছেন এক ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠিত একটা ফাউন্ডেশন আর নাট্যত্রয় প্রতিষ্ঠিত একটি মার্কেটিং কোম্পানি। জাদুঘরের ভেতরের কয়েকজন সৎ কর্মকর্তা এই দুই নম্বরি প্রক্রিয়া ফাঁস করে দিলে দেশের গুটিকয়েক বুদ্ধিজীবী আর হাতেগোনা কয়েকজন অল্প বয়সী সাংবাদিক এই প্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করার ব্যাপারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন।

তদের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব বিশারদ সাবেক সচিব আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া, মার্শাল আর্ট মাস্টার ম্যাক ইউরি, ব্যরিস্টার তানিয়া আমীর, শিল্পী নিসার হোসেন, স্থপতি শামসুল ওয়ারেস, স্থপতি আবদুল হাননান, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্য, শিল্পী মনিরুজ্জামান, সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী অন্যতম।

সময়টা ছিল ২০০৭-২০০৮ সাল। শুরুর দিকে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অজ্ঞাত কারণে প্রত্নসম্পদ পাচার নিয়ে প্রতিবেদন করা থেকে বিরত থাকে। সংবাদপত্রের মধ্যে কেবল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, নিউ এইজ, যুগান্তর, সমকাল, হলিডে আর যায়যায় দিন ধারাবাহিক কয়েকটি প্রতিবেদন ছাপার ফলে কিছু মানুষের টনক নড়ে। তারপর একাধিকবার জাদুঘরের ফটকের সামনে নিয়মিত প্রতিবাদ জানায়। ফয়েজ আহমেদ প্রতিষ্ঠিত ধানমণ্ডিতে অবস্থিত শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতেও দুই একবার সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

অন্যদের মধ্যে জাতীয় জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান প্রত্নসম্পদ পাচার ঠেকানোর ব্যাপারে লোখালেখি করেন আন্দোলনের পক্ষে। শেষতক বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ জাতীয় জাদুঘরের প্রত্নসম্পদ পাচারের এই উদ্যোগ ঠেকানোর ব্যবস্থা করে। তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা এই অবস্থায় বিব্রত বোধ করে পদত্যাগ করেন। সংস্কৃতি সচিবকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আর প্যারিসে বাংলাদেশের রাষ্টদূত ঘটনার ঘনঘটায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে পরলোক গমণ করেন।

এইসব ঘটনা ঘটেছে আজ থেকে বছর দশেক আগে। এই দশ বছর পরে আমার প্রশ্ন আমাদের জাদুঘর ব্যবস্থাপনার কোন উন্নতি হয়েছে কি?

জাদুঘরের প্রবিধানমালা ঘেঁটে আর বিগত বছরগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে যতটুকু বোঝা যায় আমাদের জাদুঘর ব্যবস্থাপনার কোন রকম উন্নয়ন ঘটেনি। বরং কিছুকিছু ক্ষেত্রে বিপজ্জনকভাবে অবনতি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে প্রথমেই আমি প্রবিধানমালা নিয়ে দুই একটি কথা বলতে চাই। প্রবিধানমালার একটি ট্রাস্টি বোর্ডের কথা বলা থাকলেও জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী ট্রাস্টি বোর্ডকে পাশ কাটিয়ে বেশ কিছু প্রকল্প নিয়েছেন। তার মধ্যে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম মালিকানাধীন দৃক গ্যালারির সঙ্গে একাধিক প্রকল্প অন্যতম। এ নিয়ে আলোচনা বা বিশেজ্ঞদের কোনও মতামত নেয়া হয়নি। সাবেক মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী জাদুঘরের পুতুল গ্যালারি সরিয়ে ফেলেছেন।

হাল আমলে জাদুঘরের আসল কাজের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক কার্যক্রম যেমন- কারো সংবর্ধনা, কারো জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপনের নামে জাদুঘরের তহবিলের যথেচ্ছাচার ব্যবহারের ফলে জাদুঘর ব্যবস্থাপনার কোন উন্নয়ন ঘটেনি।

আর অসমর্থিত সূত্রে কথা চালাচালি হচ্ছে, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিদর্শন- বিশেষ করে চিত্রকর্ম ক্রয়ের কারণে টাকা পয়সার নয়ছয় করার একটা ঝুঁকি রয়েছে। এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং আধুনিক করা দরকার। সম্প্রতি দৃক গ্যালারির সঙ্গে মসলিন শিল্প সংক্রান্ত জাতীয় জাদুঘরের একটি প্রকল্প নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। আমরা ডিজিটাল উন্নয়নের কথা বলছি। অথচ জাতীয় জাদুঘরে ডিজিটাল উন্নয়নের ছিঁটেফোটাও লাগেনি। এর রহস্য কী? এই রহস্যও উন্মোচিত হওয়া দরকার।

ইউরোপ এবং পাকিস্তানসহ বিদেশের জাদুঘরে কুক্ষিগত হয়ে থাকা বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ ফিরিয়ে আনার জন্যেও তোড়জোড় শুরু করা জরুরি।

লেখাটি শেষ করার আগে একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। শেখ হাসিনার সরকার টানা তৃতীয়বারের মতো যাত্রা শুরু করেছে। কে এম খালিদ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি যদি গত দশ বছরে বাংলাদেশের জাদুঘরগুলোসহ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সকল সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের বিষয়ে পর্যালোচনার জন্যে একটি সংসদীয় কমিটি করার উদ্যোগ নেন তাহলে জাদুঘরসহ জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। একই সঙ্গে আমাদের একটি নতুন জাতীয় সংস্কৃতি নীতিও দরকার। যে নীতিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা আর গণতান্ত্রিক চেতনার বহির্প্রকাশ থাকবে। শেখ হাসিনার এক দশক শাসনামলের পরেও আমাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কেন ২০০৬ সালে প্রণীত জাতীয়তাবাদী জামাতি সংস্কৃতি নীতি আঁকড়ে ধরে থাকবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—