মূর্তি ভাঙার ইতিহাস আমাদের চাইতে কলকাতায় পুরানো। আমার বয়স তখন এগার  কি বারো, একাত্তরে মা-বাবার হাত ধরে কলকাতায় যাওয়া বালক আমি দেখেছি নকশাল আন্দোলনের নামে মূর্তি ভাঙার উল্লাস। দমদম এলাকায় আমার এক আত্মীয় বাড়িতে যাবার পথে ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলাম মা আর আমি। চারদিকে কালো ধোঁয়া, পাইপ গান নামের নি:শব্দ এক অস্ত্রে শব্দহীন মৃত্যু আর বোমার আওয়াজ। তার সাথে মূর্তি ভাঙ্গার প্রতিযোগিতা। কে ভাঙ্গতো, কারা ভাঙ্গাতো- সে তর্ক থাকলেও সত্য এই, ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়তেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ রামমোহনেরা। তখন কলকাতার শাসনে ছিলেন সুদর্শন সিদ্বার্থ শংকর বাবু।  ধুতি পাঞ্জাবির এই ভদ্রলোক পশ্চিম বঙ্গের শেষ কংগ্রেস শাসক। রাস্তায় রাস্তায় বিবেকানন্দের ছবিসহ পোস্টারে লেখা থাকতো- নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচতে দিন। সে দু:সময় তারা কাটিয়ে উঠলেও মূর্তি ভাঙ্গা যে থামেনি তার প্রমাণ আবারো মিললো ভোটের আগে।

বুদ্ধদেব বসুর শাসন আমলের পর সবাইকে চমকে দিয়ে সেখানকার শাসনে এলেন মমতা বন্দোপ্যাধ্যায়। অদ্ভুত এক মহিলা। পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলে ‘চমক’-ও চমকে যাবে। কথা আর কাজে মিল খুব সামান্য। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ আর সেখানকার ভোট আমাদের চাইতে অনেক বেশি নিরপেক্ষ। সব মিলিয়ে সেখানকার মানুষের মনে আচরণে এক ধরনের শান্তি আর নিরাপত্তা আছে যে কারণে, এই মহিলার উৎপাতে অনেক সময় ধরা পড়েনা। তার বড় কৃতিত্ব ওপার বাংলার বুকের ওপর চেপে বসা ট্রেড ইউনিয়ন ও বামের নামে পাথরের অপসারণ। কিন্তু সে গিমিক বেশিদিন টেকেনি। শুরু হয়ে গেল তার অসাধারণ হবার যতো অপচেষ্টা। আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীরা এর তুলনায় শিশু। ইনি কি না পারেন? গান গাইতে জানেন, ছবি আঁকতে জানেন, ছড়া লিখতে পারেন, কি পারেন না সেটাই বরং ভাবনার বিষয়। একবার কি হলো,  সরাসরি চলমান এক টিভি শোতে তাকে ইজেলে একটা ছবি আঁকতে দিয়েছিলেন ঘোষক। মমতাদি কী করলেন জানেন? তুলি ব্রাশ নিয়ে ইজেলের কাছে গিয়ে দু একটা আঁচড় কেটে রাগ করে সব ছুঁড়ে ফেলে চিৎকার করে জানালেন এসব বাজে তুলিতে হবেনা। বেচারা উপস্থাপক হাসি লুকিয়ে ম্যানেজ করার জন্য বললেন, ঠিক আছে দিদি আমরা পরে ভালো রং তুলি কিনে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব, আপনি এঁকে পাঠিয়ে দেবেন।

আরো আছে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবার্ষিকীতে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, গান্ধীকে রবীন্দ্রনাথের ফলের রস খাইয়ে অনশন ভাঙানোর গল্প। তাও সাতচল্লিশে। সমবেত সবার মুখে হাসি দেখে ধমক দিয়ে দিদি বলেছিলেন, আমি জেনে বলছি। পড়ে বলছি। পরে আনন্দবাজার লিখলো- দিদি জানেন না রবীন্দ্রনাথ কত আগে ১৯৪১ সালেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এতগুলো গল্প বলার কারণ মমতাকে ছোট করার জন্য না।

কেবল বোঝানোর জন্য তিনি কতটা অঘটনঘটনপটিয়সী। আমি কলকাতায় গিয়ে দেখেছি তার বিরাট বিরাট কাট আউটের পায়ের তলায় গড়াগড়ি খাচ্ছেন নেতাজী সুভাষ বোস, রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন দত্ত। বিশ্বাস না হয়তো কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে বেরুতেই দেখবেন স্বয়ং বিবেকানন্দের একখানা ছবি এবং তার ওপর সগর্বে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দোপ্যাধ্যায়। এগুলো কি সম্মান? না মর্যাদার পরিচায়ক? দিনের পর দিন বছরের পর বছর কলকাতা ও ওপার বাংলায় এমন ধারা চলে আসার পর আজ হঠাৎ করে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্য মায়াকান্না আর ‘ছিঃ’ এর মানে বুঝতে পারছি না তাই।

আমি বিজেপি সমর্থন করি না। করার প্রশ্নও ওঠেনা। দাঙ্গায় যাদের হাতে রক্ত তারা আমার আদর্শ বা আপন হতে পারে না। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন কাণ্ডটা কি বিজেপি করেছে না ষড়যন্ত্রের ফসল? অমিত শাহ এর শো ডাউনের শেষ পর্যায়ে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার রহস্য কোনকালেও উদঘাটিত হবে না। কারণ সে ইতিহাস বাঙালির নাই। দোষারোপ আর তর্কাতর্কি করতে করতেই ভুলে যাবো সব। পশ্চিম বাংরার বাঙালিদের কাছে আমার একটা বিনীত প্রশ্ন- আসলে কি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আছেন ওখানে? থাকলে দেখি না কেন? রাস্তার সাইনবোর্ডে-মানুষের মুখের কথায়, সিনেমা থিয়েটারে কিংবা জীবনে একেবারেই অনুপস্থিত একজন মণীষীর মূর্তি ভাঙলে কি আর না ভাঙলেই বা কি? তবে মূর্তি যে পাওয়ার ফুল সেটা কিন্তু আবারো প্রমাণিত হলো। তা যদি না হবে ঢাকা কলকাতা সর্বত্র ভাঙার পর মানুষের বিবেক জেগে উঠবে কোন দু:খে?

মহাশয় বিদ্যাসাগর অতিশয় ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি মন মননে আধুনিকতার জন্য অপমান মাথা পেতে নিয়ে কাজ করতেন। অনেকে জানে তার বিধবা বিবাহ, সতীদাহ বন্ধের আন্দোলন সহ্য করতে না পারা বাঙালি তার চলার পথে বাড়ি থেকে হওয়ার পর বিষ্ঠা-ময়লা ছুঁড়ে অপমান করা  হতো তাকে। এসব ছিল তার গা সওয়া। তিনি এগুলো মনে নিয়েই বাঙালির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা এখন যেমন তখনো ছিলাম এক অসহিষ্ণু অবোধ্য জাতি। এমন জাতি যেখানে থাকুক, যে দেশে থাকুক, এমন আচরণ করবে এটাই স্বাভাবিক।

ওপার বাঙালার রাজনীতি এখন কেমন তার একটা বড় উদাহরণ বিজেপির শো ডাউন। এককালে বামদের লালে লাল করে দেওয়া কলকাতা এখন দিদির রঙে নীল। সে নীলের ভেতর যে গেরুয়ার প্রভাব আর আছড় ঢুকেছে এ শো ডাউন তার বড় প্রমাণ। আমি কথা বলে দেখেছি বহু যৌক্তিক কারণে মানুষ মোদির ওপর ভরসা রাখে চাইছেন। যার বড় একটি  কারণ হলো বিশ্বাসহীনতা। কারণ তারা কোনভাবেই রাহুল বা প্রাদেশিক দলগুলোর নেতাদের বিশ্বাস করতে পারছে না। ওপার বাংলায় মমতা তার বাইরের কিছু না। মানুষ বাধ্য হয়ে মানে বটে ভেতরে কী চায় তার বড় প্রমাণ ভোট বাক্স। কয়দিন পর সে বাক্স খুলে যারা জিতবে বা যারা শাসনে আসবে তারাই ঠিক করে দেবে কে বা কারা ভেঙেছিল বিদ্যাসাগরের মূর্তি।

তবে আপাতত আমি একথা বলতেই পারি এর পেছনে ভোটারদের মন আর মননে সামান্য হলেও সুড়সুড়ি জাগানোর অপচেষ্টা ছিল। মধ্যবিত্ত আর মননশীল নামে পরিচিত বিবেক বিক্রিতে অভ্যস্ত আমাদের মন জাগাতে ভাঙার বিকল্প নাই। এটা জেনেই রাজনীতি এমন করে। এমন সব খেলাধুলা করে থাকে। তবে  এটা বলতেই হবে ‘ছিঃ’, ‘ছিঃ’ বলার ভেতর হয়তো কোনও একসময় মানুষের মনে বোধ জাগতে পারে আসলেই তো। ‘ছিঃ’, ‘ছিঃ’- এর নাম রাজনীতি? তখন যদি তারা- ‘ছিঃ দিদি, ছিঃ মোদি’ বলে, আমরা কি সত্যি অবাক হবো?  আসলে শেষ কথা এই. যে যাই করুক টার্গেট বিদ্যাসাগর টার্গেট আমাদের দেশে লালন সাঁই এর মত মানবিক মানুষেরা।

আর কবে আমরা জেগে উঠবো? আর কবে জানবো এসব করার নাম নিজেদের অপমান , কবে শিখবো সবাই মিলে কাউকে সম্মান করা?

অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

Responses -- “ছিঃ মমতা দিদি, ছিঃ মোদিজি, ছিঃ রাজনীতি”

  1. অখিলেশ যাদব

    মমতা বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাম ও কংগ্রেসকে সঙ্গে নিলে বিজেপিকে ঠেকানো যত সহজ ছিল, এখন তা হবে না। সারা ভারতে নির্বাচনী ফলাফল যা–ই হোক না কেন, বাংলাদেশের সীমান্তঘেরা রাজ্যগুলোর ফলাফল আমাদের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তবর্তী সব রাজ্যে একসময় কংগ্রেস ও বামদের শাসন ছিল। কিন্তু এখন ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত। বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যদি ১২ থেকে ১৬ আসনে জয়ী হয়, তাহলে পরের বিধানসভা নির্বাচনে তাদের সরকার গঠন করতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। দিদির জনপ্রিয়তা এখনই ভাটির দিকে। চলতি লোকসভা নির্বাচনেও তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী পক্ষ ত্যাগ করে বিজেপিতে গিয়েছেন। শুধু তৃণমূল নয়, বাম জোটের কর্মীরাও সেখান নাম লিখিয়েছেন। নীতি-আদর্শের দুর্ভিক্ষ সবখানে।বিজেপি জানে, দেশভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে লাখ লাখ হিন্দু উদ্বাস্তু হয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল, তাদের অনেকেই প্রথমে উদ্বাস্তু শিবিরে, বিভিন্ন জবরদখল কলোনিতে আশ্রয় নিলেও সিংহভাগই বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর পশ্চিমবঙ্গের ১০টি জেলায় গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে। এদের বেশির ভাগই দরিদ্র, কৃষিজীবী বা তাঁতি, মত্স্যজীবী বা অন্যান্য পেশায় নিযুক্ত। ছিন্নমূল এই মানুষদের জীবনে গত ৭০ বছরে পরিবর্তন কিছুটা এলেও ভিটেছাড়ার তিক্ত স্মৃতি মনে থেকে যায়। বিজেপি এই জায়গাটাতেই সুড়সুড়ি দিয়ে তাদের মধ্যে শিকড় গাড়ছে বহুদিন ধরে। বিভিন্ন সময়ের ছোট-বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় তাদের সেই স্মৃতি উসকে দিয়ে তাদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলার চেষ্টাও রয়েছে। আগামী লোকসভা নির্বাচনকে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। শুক্রবার দিল্লির সভা থেকে অমিত শাহ বলেন, ১৭৬১ সালের মারাঠা ও আফগানের যুদ্ধের মতোই হতে চলেছে আগামী লোকসভা নির্বাচনের লড়াই। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ‘উইপোকা’ সম্বোধন করে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছেন, তার দল দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এলে এদের (বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী) পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হবে।‘মোদি সরকার ফের ক্ষমতায় এলেই আমরা পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি আনব। আসামের মতো প্রত্যেক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে খুঁজে বের করে বিতাড়িত করা হবে।’ আসামের মতো প্রত্যেক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে খুঁজে বের করে বিতাড়িত করা হবে।’ তবে হিন্দু ও বৌদ্ধদের সুরক্ষা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। ‘এনআরসি জনগণের প্রতি আমাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ। হিন্দু ও বৌদ্ধ শরণার্থীদের কোনো ভয় নেই। তাদের দেশছাড়ার দরকার হবে না। তারা যাতে এখানে মর্যাদার সঙ্গে থাকতে পারে আমরা তা নিশ্চিত করব।’ “বাংলার মাটিতে অনুপ্রবেশকারীরা উইপোকার মতো। ভারতীয় জনতা পার্টি সরকার তাদের এক এক করে তুলে বঙ্গোপসাগরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আসবে।” যখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সরকার রাজ্যের মুসলমানদের উন্নয়নের নামে প্রথমেই শুধু সরকারি কোষাগার থেকে ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করেন, তখন তা হিন্দু উদ্বাস্তুসহ হিন্দু সমাজের একাংশের চোখে ভালো ঠেকে না। বিজেপি এখানেই ঘৃতাহুতি দিতে হিন্দু ও মুসলমান সমাজের মধ্যে যে ফাটল রয়ে গেছে, তা আরও বাড়িয়ে মেরুকরণের চেষ্টা করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ বারবার বক্তৃতায় অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলতে গিয়ে রাজ্যের গোটা মুসলমান সমাজের দিকেই ইঙ্গিত করে দেশের আর্থিক, সামাজিক ক্ষেত্রে যাবতীয় ব্যর্থতার দায়ে তাদের দোষী সাব্যস্ত করার প্রচার চালিয়ে ওই মেরুকরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বাম জমানার অবসানের পরের সাত বছরের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিসরে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে ফেলেছে। শাসক দলের লাগাতার আক্রমণের মুখে বিরোধী বামপন্থী ও কংগ্রেস এতটাই ছত্রভঙ্গ যে তাদের নেতা ও কর্মীদের মনোবল প্রায় তলানিতে। বহু নেতা-কর্মী গত সাত-আট বছরে দল ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। তৃণমূলের আক্রমণে রাজ্যের বহু জায়গায়, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সিপিএম পার্টি অফিস তালাবদ্ধ। গ্রামাঞ্চলে এই আধিপত্যের জেরে শাসক দলের কাছে বিরোধীদের সম্পূর্ণ রূপে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়, না হলে গরিব মানুষদের রেশনের চাল, বিপিএল কার্ডের সুবাদে সরকারি অন্যান্য সুবিধা, যেমন সরকারি উদ্যোগে ১০০ দিনের কাজে রোজগার, স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষিঋণ, শস্যবিমা—সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। গ্রামাঞ্চলে শাসক দলের নিচুতলার নেতাদের লাগামছাড়া দুর্নীতি, গরিব মানুষকে তাদের শ্রমের আয় থেকে টাকার ভাগ দিতে বাধ্য করা—এসবই মানুষ দেখছে। এ অবস্থায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেও মানুষ যে তলে তলে ফুঁসছে, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে উপযুক্ত জঙ্গি রাজনৈতিক দলের আশ্রয় পেলে। বিজেপি এসে তৃণমূলের বিরোধিতায় রাস্তায় নেমে সংঘর্ষের পথে গেলে মানুষ তার দিকে সরে যেতে শুরু করে। এভাবেই উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে চা-বাগান এলাকায় আদিবাসী শ্রমিক, বীরভূমে, বর্ধমানের একাংশে, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার একাংশে, ঝাড়গ্রামে জঙ্গলমহলে আদিবাসীরা প্রথমে তূণমূল কংগ্রেস ও বিরোধী বামদের ছেড়ে বিজেপির দিকে সরেছে। যার ফলে, গত বছর পঞ্চায়েত ভোটে বিজেপি আদিবাসী এলাকায় ভালো ফল করেছে। এখন রাজ্যের অন্যত্রও বিজেপির প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। বিজেপির এই আগ্রাসী মনোভাবের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় মুসলমান সমাজের মধ্যেও মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রধানত সিপিএম থেকে যে হারে কর্মী-সমর্থকেরা বিজেপির দিকে সরছেন, তা রাজ্যের রাজনীতিকে ভয়ংকর পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

    Reply
  2. সুকান্ত সরকার

    ফিরে এল কি সত্তর দশকের সেই মূর্তি ভাঙার রাজনীতির দিন ? উঠছে সেই প্রশ্ন৷ যখন উত্তাল নকশালবাড়ি আন্দোলনের জেরে একের পর এক মনীষীদের মূর্তি আক্রান্ত হয়েছিল কলকাতায়৷ রামমোহন-বিদ্যাসাগরের ভাস্কর্য ভেঙে জান্তব উল্লাসে মেতে উঠত অতি বামপন্থী নকশালপন্থীরা৷ অনেকটা সেই ধাঁচেই আবারও মূর্তির উপর আক্রমণ নেমে এসেছে৷ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়েছে, ত্রিপুরায় লেনিনের মূর্তি ভাঙার দৃশ্য, পাল্টা কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিতে কালো রঙ করা ও তামিলনাড়ুতে পেরিয়ারের মূর্তি ভাঙা একইভাবে উত্তরপ্রদেশে আম্বেদকরের মূর্তির উপর হামলার কথা৷ ভারতে চলছে প্রতিবাদের নামে মূর্তি ভাঙা আর বিশ্ব দেখছে সেই অসভ্যতা৷ত্রিপুরার নির্বাচনে বিজেপির বিজয়ের পর সারা ভারতে মূর্তি ভাঙার ধুম লেগেছে। বিজেপি বাম বিরোধী মৌলবাদী শক্তি। তারা ত্রিপুরায় জিতে যাওয়ার পর ঘরে ঘরে গিয়ে সিপিএম নেতাকর্মীদের মেরেছে। সিপিএম-এর অফিস দখল করেছে আর বেলুনিয়ায় খুব জৌলুসের সঙ্গে বসানো লেলিনের মূর্তি উপড়ে ফেলেছে। পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য মূর্তি ভাঙার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। ১৯৬৯/৭০ সালে চারু বাবুর নকশালবাড়ী বিপ্লবের কর্মীরা মোড়ে মোড়ে বসানো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,রাজা রামমোহন রায়ের মতো পূজনীয় ব্যক্তিদের স্থাপিত মূর্তিগুলোর মাথা ভেঙে কনিষ্কের মূর্তির মতো করে রেখে যেত। তারা নাকি মনে করতো এরাই বিপ্লবকে বিঘ্নিত করেছে। এদের কারণেই বিপ্লব বিলম্বিত হচ্ছে। অথচ এরাই আদিম সমাজটাকে টেনে তুলে বিপ্লবীদের সম্মুখে উপস্থিত করেছেন।এসব কারণে চারু বাবুদের বিপ্লব দীর্ঘজীবী হয়নি। ইতিহাসের প্রবহমান ধারাকে মেনে চলতে হয়। ত্রুটি উৎপাটন করার অধিকার আছে,ইতিহাস মুছে ফেলার অধিকার কারও নেই। ত্রিপুরায় মূর্তি ভাঙার প্রতিক্রিয়ায় বিজেপির পূর্বসূরী সংগঠন ভারতীয় জনতা সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির একটি আব মূর্তির মুখে কালি লাগানো ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ৭ মার্চ সকালে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় শ্যামা প্রসাদের মূর্তিটির ওপর হামলা হয়। ত্রিপুরায় বিধানসভা নির্বাচনের জয়ের পর উন্মত্ত বিজেপি সমর্থকেরা বেলুনিয়ায় রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নায়ক ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের মূর্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর থেকে ভারতজুড়ে একের পর এক মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে, এটা তারই অংশ। শ্যামা প্রসাদের মূর্তিটির মুখমণ্ডলজুড়ে কালির পাশাপাশি চোখ ও কানের বেশিরভাগ অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাতুড়ি ব্যবহার করে মূর্তির এ অবস্থা করা হয় বলে ধারণা পুলিশের। বিজেপি গিয়েছিলো শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির মূর্তি দুধ, গঙ্গাজল ঢেলে দিয়ে শুদ্ধ করতে। তারা সারা পশ্চিম বাংলায় এ কর্মসূচি দিয়েছে। কিন্তু কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশ মূর্তিতে হাত দিতেও দেয়নি। মিরাটে অম্বেদকরের মূর্তি ভাঙাকে কেন্দ্র করে বহুজন সমাজ পার্টির কর্মীরা হাইওয়ে অবরোধ করেছে। মহারাষ্ট্রেও নাকি অম্বেদকরের মূর্তি ভেঙেছে। অম্বেদকরও দলিত নেতা। ভালো ছাত্র ছিলেন, সম্ভবত কাথিয়ারের মহারাজের অনুগ্রহ পেয়ে ব্যারিস্টারি পড়েছিলেন। তিনি স্বাধীন ভারতের নেহরু মন্ত্রিসভার আইনমন্ত্রী ছিলেন এবং শাসনতন্ত্র রচনা পরিষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন। অম্বেদকর শেষ বয়সে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন না হিন্দু ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণা হয়ে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন,তা আমি জানি না। দলিতদের নিয়ে গান্ধীর মাতামাতিকে তিনি বিদ্রুপ করতেন। এমনকি গান্ধীর কর্মকাণ্ডকে ভণ্ডামি বলতেও দ্বিধা করতেন না। গান্ধী আমরণ দলিতদের নিয়ে ছিলেন। তিনি দিল্লির দাঙ্গর মহল্লায় রাতযাপনও করেছেন। অথচ আম্বেদকর নিজ গোষ্ঠীর সঙ্গে না থেকে তাদের পরিত্যাগ করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কোনটা সঠিক ভণ্ডামি তা নির্ণয় করা মুশকিল। সম্প্রতি বাংলাদেশে আইনের দেবীর ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ছড়ায় প্রতিবাদ৷ তবে সেখানে সুষ্ঠুভাবেই কাজটি করে সরকার৷ তবে মূর্তির উপর আক্রমণ নেহাতই ক্ষোভ বিক্ষোভের বহি:প্রকাশ৷ ইরাকে বহুবছর পর সাদ্দাম হোসেন জমানার শেষ হতেই তাঁর মূর্তি টান মেরে ফেলে দিয়েছিল জনগণ৷ মিশরে হোসনি মোবারক জমানার অবসানের পর সেখানেও তার ছবির উপর পদাঘাত করা হয়৷ গত পার্লামেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন বিকৃতমূলক মূর্তি বানিয়ে হয়েছিল বিপক্ষ প্রচার৷ সবই প্রতীকী৷ লক্ষণীয় এরা কেউই মণীষী বা চিন্তাবিদ নন৷ এইসব সংশ্লিষ্ট দেশগুলির কোনও মণীষী বা চিন্তাবিদের মূর্তি আক্রান্ত হয়নি৷ যেমনটা হচ্ছে ভারতে৷ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মূর্তির ভাঙার প্রচুর উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে গত শতকের ছ’য়-সাতের দশকে। নকশালপন্থী নেতা চারু মজুমদার সেই সময়ে বিদ্যাসাগর, রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথদের বুর্জোয়া সংস্কৃর্তির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাই এঁদের মূর্তি ভেঙে বিল্পবী সংস্কৃতি তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় এই সব মনীষীর মূর্তি ভেঙে ছিলেন নকশালপন্থীরা। মুক্তি ভাঙার রাজনীতি নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল রাজ্যে।

    Reply
  3. অজয় দাশগুপ্ত

    মূর্তি ভাঙার ইতিহাস আমাদের চাইতে কলকাতায় পুরানো। আমার বয়স তখন এগার কি বারো, একাত্তরে মা-বাবার হাত ধরে কলকাতায় যাওয়া বালক আমি দেখেছি নকশাল আন্দোলনের নামে মূর্তি ভাঙার উল্লাস। দমদম এলাকায় আমার এক আত্মীয় বাড়িতে যাবার পথে ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলাম মা আর আমি। চারদিকে কালো ধোঁয়া, পাইপ গান নামের নি:শব্দ এক অস্ত্রে শব্দহীন মৃত্যু আর বোমার আওয়াজ। তার সাথে মূর্তি ভাঙ্গার প্রতিযোগিতা। কে ভাঙ্গতো, কারা ভাঙ্গাতো- সে তর্ক থাকলেও সত্য এই, ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়তেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ রামমোহনেরা। তখন কলকাতার শাসনে ছিলেন সুদর্শন সিদ্বার্থ শংকর বাবু। ধুতি পাঞ্জাবির এই ভদ্রলোক পশ্চিম বঙ্গের শেষ কংগ্রেস শাসক। রাস্তায় রাস্তায় বিবেকানন্দের ছবিসহ পোস্টারে লেখা থাকতো- নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচতে দিন। সে দু:সময় তারা কাটিয়ে উঠলেও মূর্তি ভাঙ্গা যে থামেনি তার প্রমাণ আবারো মিললো ভোটের আগে।

    বুদ্ধদেব বসুর শাসন আমলের পর সবাইকে চমকে দিয়ে সেখানকার শাসনে এলেন মমতা বন্দোপ্যাধ্যায়। অদ্ভুত এক মহিলা। পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলে ‘চমক’-ও চমকে যাবে। কথা আর কাজে মিল খুব সামান্য। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ আর সেখানকার ভোট আমাদের চাইতে অনেক বেশি নিরপেক্ষ। সব মিলিয়ে সেখানকার মানুষের মনে আচরণে এক ধরনের শান্তি আর নিরাপত্তা আছে যে কারণে, এই মহিলার উৎপাতে অনেক সময় ধরা পড়েনা। তার বড় কৃতিত্ব ওপার বাংলার বুকের ওপর চেপে বসা ট্রেড ইউনিয়ন ও বামের নামে পাথরের অপসারণ। কিন্তু সে গিমিক বেশিদিন টেকেনি। শুরু হয়ে গেল তার অসাধারণ হবার যতো অপচেষ্টা। আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীরা এর তুলনায় শিশু। ইনি কি না পারেন? গান গাইতে জানেন, ছবি আঁকতে জানেন, ছড়া লিখতে পারেন, কি পারেন না সেটাই বরং ভাবনার বিষয়। একবার কি হলো, সরাসরি চলমান এক টিভি শোতে তাকে ইজেলে একটা ছবি আঁকতে দিয়েছিলেন ঘোষক। মমতাদি কী করলেন জানেন? তুলি ব্রাশ নিয়ে ইজেলের কাছে গিয়ে দু একটা আঁচড় কেটে রাগ করে সব ছুঁড়ে ফেলে চিৎকার করে জানালেন এসব বাজে তুলিতে হবেনা। বেচারা উপস্থাপক হাসি লুকিয়ে ম্যানেজ করার জন্য বললেন, ঠিক আছে দিদি আমরা পরে ভালো রং তুলি কিনে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব, আপনি এঁকে পাঠিয়ে দেবেন।

    আরো আছে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবার্ষিকীতে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, গান্ধীকে রবীন্দ্রনাথের ফলের রস খাইয়ে অনশন ভাঙানোর গল্প। তাও সাতচল্লিশে। সমবেত সবার মুখে হাসি দেখে ধমক দিয়ে দিদি বলেছিলেন, আমি জেনে বলছি। পড়ে বলছি। পরে আনন্দবাজার লিখলো- দিদি জানেন না রবীন্দ্রনাথ কত আগে ১৯৪১ সালেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এতগুলো গল্প বলার কারণ মমতাকে ছোট করার জন্য না।

    কেবল বোঝানোর জন্য তিনি কতটা অঘটনঘটনপটিয়সী। আমি কলকাতায় গিয়ে দেখেছি তার বিরাট বিরাট কাট আউটের পায়ের তলায় গড়াগড়ি খাচ্ছেন নেতাজী সুভাষ বোস, রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন দত্ত। বিশ্বাস না হয়তো কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে বেরুতেই দেখবেন স্বয়ং বিবেকানন্দের একখানা ছবি এবং তার ওপর সগর্বে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দোপ্যাধ্যায়। এগুলো কি সম্মান? না মর্যাদার পরিচায়ক? দিনের পর দিন বছরের পর বছর কলকাতা ও ওপার বাংলায় এমন ধারা চলে আসার পর আজ হঠাৎ করে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্য মায়াকান্না আর ‘ছিঃ’ এর মানে বুঝতে পারছি না তাই।

    আমি বিজেপি সমর্থন করি না। করার প্রশ্নও ওঠেনা। দাঙ্গায় যাদের হাতে রক্ত তারা আমার আদর্শ বা আপন হতে পারে না। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন কাণ্ডটা কি বিজেপি করেছে না ষড়যন্ত্রের ফসল? অমিত শাহ এর শো ডাউনের শেষ পর্যায়ে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার রহস্য কোনকালেও উদঘাটিত হবে না। কারণ সে ইতিহাস বাঙালির নাই। দোষারোপ আর তর্কাতর্কি করতে করতেই ভুলে যাবো সব। পশ্চিম বাংরার বাঙালিদের কাছে আমার একটা বিনীত প্রশ্ন- আসলে কি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আছেন ওখানে? থাকলে দেখি না কেন? রাস্তার সাইনবোর্ডে-মানুষের মুখের কথায়, সিনেমা থিয়েটারে কিংবা জীবনে একেবারেই অনুপস্থিত একজন মণীষীর মূর্তি ভাঙলে কি আর না ভাঙলেই বা কি? তবে মূর্তি যে পাওয়ার ফুল সেটা কিন্তু আবারো প্রমাণিত হলো। তা যদি না হবে ঢাকা কলকাতা সর্বত্র ভাঙার পর মানুষের বিবেক জেগে উঠবে কোন দু:খে?

    মহাশয় বিদ্যাসাগর অতিশয় ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি মন মননে আধুনিকতার জন্য অপমান মাথা পেতে নিয়ে কাজ করতেন। অনেকে জানে তার বিধবা বিবাহ, সতীদাহ বন্ধের আন্দোলন সহ্য করতে না পারা বাঙালি তার চলার পথে বাড়ি থেকে হওয়ার পর বিষ্ঠা-ময়লা ছুঁড়ে অপমান করা হতো তাকে। এসব ছিল তার গা সওয়া। তিনি এগুলো মনে নিয়েই বাঙালির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা এখন যেমন তখনো ছিলাম এক অসহিষ্ণু অবোধ্য জাতি। এমন জাতি যেখানে থাকুক, যে দেশে থাকুক, এমন আচরণ করবে এটাই স্বাভাবিক।

    ওপার বাঙালার রাজনীতি এখন কেমন তার একটা বড় উদাহরণ বিজেপির শো ডাউন। এককালে বামদের লালে লাল করে দেওয়া কলকাতা এখন দিদির রঙে নীল। সে নীলের ভেতর যে গেরুয়ার প্রভাব আর আছড় ঢুকেছে এ শো ডাউন তার বড় প্রমাণ। আমি কথা বলে দেখেছি বহু যৌক্তিক কারণে মানুষ মোদির ওপর ভরসা রাখে চাইছেন। যার বড় একটি কারণ হলো বিশ্বাসহীনতা। কারণ তারা কোনভাবেই রাহুল বা প্রাদেশিক দলগুলোর নেতাদের বিশ্বাস করতে পারছে না। ওপার বাংলায় মমতা তার বাইরের কিছু না। মানুষ বাধ্য হয়ে মানে বটে ভেতরে কী চায় তার বড় প্রমাণ ভোট বাক্স। কয়দিন পর সে বাক্স খুলে যারা জিতবে বা যারা শাসনে আসবে তারাই ঠিক করে দেবে কে বা কারা ভেঙেছিল বিদ্যাসাগরের মূর্তি।

    তবে আপাতত আমি একথা বলতেই পারি এর পেছনে ভোটারদের মন আর মননে সামান্য হলেও সুড়সুড়ি জাগানোর অপচেষ্টা ছিল। মধ্যবিত্ত আর মননশীল নামে পরিচিত বিবেক বিক্রিতে অভ্যস্ত আমাদের মন জাগাতে ভাঙার বিকল্প নাই। এটা জেনেই রাজনীতি এমন করে। এমন সব খেলাধুলা করে থাকে। তবে এটা বলতেই হবে ‘ছিঃ’, ‘ছিঃ’ বলার ভেতর হয়তো কোনও একসময় মানুষের মনে বোধ জাগতে পারে আসলেই তো। ‘ছিঃ’, ‘ছিঃ’- এর নাম রাজনীতি? তখন যদি তারা- ‘ছিঃ দিদি, ছিঃ মোদি’ বলে, আমরা কি সত্যি অবাক হবো? আসলে শেষ কথা এই. যে যাই করুক টার্গেট বিদ্যাসাগর টার্গেট আমাদের দেশে লালন সাঁই এর মত মানবিক মানুষেরা।

    আর কবে আমরা জেগে উঠবো? আর কবে জানবো এসব করার নাম নিজেদের অপমান , কবে শিখবো সবাই মিলে কাউকে সম্মান করা?

    Reply
  4. কল্যান ডি কষ্টা

    দাদা
    ওপার বাংলায় রাজনীতিতে কতো উত্তাপ, কতো রঙিন, পক্ষ বিপক্ষ । ভোট কতো সুন্দর নিরেপেক্ষ । সবাই যেন তার ভোটটা ঠিক মতো দিতে পারে এ জন্য কতো কঠোর ব্যবস্থা । আর এপার বাংলায় ….. যেন কবর !

    Reply
  5. আসামের নাগরিকত্ব তালিকা ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

    আসামের নাগরিকত্ব তালিকা নিয়ে যে বিতর্কের জন্ম হয়েছে, তা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটা এ মুহূর্তে বলা মুশকিল। তবে সেখানে বাঙালি মুসলমানরা যে এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে আছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যদিও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলছেন, এখনই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, তার পরও কথা থেকে যায়। আগামী লোকসভা এবং পশ্চিম বাংলার বিধানসভার নির্বাচন সামনে রেখে বিজেপি এই ইস্যু তুলে রাজনৈতিক ফায়দা আদায় করে নিতে চায়। এতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সময় পার করছে। তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ইস্যুতে বাংলাদেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এবং তাতে লাভবান হবে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ভারতের সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত কী বলেছিলেন। এর পরপরই এনআরসির খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়।
    ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন কিছুদিন আগে। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেছিলেন, দেশটির (অর্থাৎ ভারতের) উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢোকানো হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তান। চীনের মদদে একটি ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে ‘অস্থির’ করে তুলতেই এ কাজ করা হচ্ছে। একজন সেনাপ্রধানের এ ধরনের বক্তব্যের গুরুত্ব অনেক বেশি। তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন এমন এক সময়ে যখন আসামে এক ধরনের ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযান শুরু হয়েছিল। এই বাঙালিরা মূলত মুসলমান। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চায়! বিজেপি মনে করে, ওই সব বাঙালি বাংলাদেশ থেকে গেছে এবং সেখানে বসবাস করছে, যার পেছনে আদৌ কোনো সত্যতা নেই। এর আগে বিজেপি সরকার পশ্চিম বাংলা থেকেও ‘বাঙালিদের’ উত্খাতের পরিকল্পনা করেছিল। এটা সম্ভব হয়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারণে। ভারতীয় গণমাধ্যম বিপিন রাওয়াতের ওই বক্তব্যের সমালোচনা করেছে। দ্য হিন্দু, আনন্দবাজার, টাইমস অব ইন্ডিয়া কিংবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতো পত্রিকায় বিপিন রাওয়াতের ওই মন্তব্যের সমালোচনা করা হয়েছিল। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, বিপিন রাওয়াতের ওই মন্তব্য ছিল ‘রাজনৈতিক’। চলতি ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যাবেন। নিজের ‘রাজনৈতিক পথ’ পরিষ্কার করতেই তিনি ওই মন্তব্য করেছেন। বিপিন রাওয়াতের উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক না কেন, এটি সত্য, দুই বছর আগেই আসাম সরকার নাগরিকত্ব শনাক্তকরণের একটি কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকা এসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অতি সম্প্রতি। আসাম সরকার তখন এক কোটি ৯০ লাখ নাগরিকের একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছিল। এর মধ্য দিয়ে তারা তাদের নাগরিকদের শনাক্ত করবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। এতে কয়েক লাখ বাঙালি মুসলমান সেখান থেকে বিতাড়িত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের যদি বাংলাদেশ গ্রহণ না করে, তাহলে তাদের বন্দিশালায় রাখা হবে বলে একটি পরিকল্পনাও তারা গ্রহণ করেছে। এ ধরনের বন্দিশালা নির্মিত হয়েছে বলেও গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জেনারেল বিপিন রাওয়াত যখন এ ধরনের একটি কথা বলেন তখন এ ধরনের বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবেই। সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্পর্ক একটি উচ্চতায় উপনীত হয়েছে। বিশেষ করে মোদির জমানায় একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে উভয় সরকার। এখন তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ‘বাংলাদেশি খেদাও’ অভিযান যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তা দুই দেশের জন্যই কোনো ভালো সংবাদ বয়ে আনবে না। যে ৪০ লাখ বাঙালির কথা বলা হচ্ছে, তারা বংশপরম্পরায় সেখানে বসবাস করছে। তাদের প্রায় সবার ভোটার আইডি কার্ড আছে। তারা ভোট দেয়। রেশন কার্ডও আছে। তাদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা অযৌক্তিক। নিশ্চয়ই আমরা আশা করব, সেখানে শুভ বুদ্ধির মানুষ আছেন; যাঁরা এর প্রতিবাদ করবেন। ভারতের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি থেকে আমরা শিখতে চাই। কিন্তু সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন যে সংস্কৃতি, তা আমাদের কিছু শেখাতে পারবে না। এতে দুই দেশের মধ্যে অনাস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে, আর তাতে লাভবান হবে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো।

    Reply
  6. ‘বঙ্গাল খেদা’ থেকে ‘মুসলমান খেদা’: আসামে বাঙালি মুসলমান

    আসামে ব্রিটিশ শাসন শেষ হবার কিছুদিন পর ১৯৫০ সালে গোয়ালপাড়ায় আরম্ভ হয় ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলন। অথচ গোয়ালপাড়া একসময় ছিল বাংলাদেশেরই অংশ। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর এখানে একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সমাজে বৈষম্য বাড়লেও স্বাধীন বাংলাদেশে দূর্বলও ভাষা পেয়েছে। এ অবস্থায় দলে দলে বাংলাভাষী মুসলমানরা আসামে গেছে, এর কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত নেই। আসামের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশেরও সীমান্ত আছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাভাষী মুসলমান এক রাষ্ট্র বলে সহজেই আসামে ঢুকতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আসাম থেকে বাংলাভাষী মুসলমানদের তাড়াবার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেননা, এদের একটি অংশ হতে পারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া। ভারতের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন কিছুদিন আগে। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেছিলেন, দেশটির (অর্থাৎ ভারতের) উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢোকানো হচ্ছে! এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তান। চীনের মদদে একটি ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে ‘অস্থির’ করে তুলতেই এ কাজ করা হচ্ছে। একজন সেনাপ্রধানের এ ধরনের বক্তব্যের গুরুত্ব অনেক বেশি। তিনি এই মন্তব্যটি করেছিলেন এমন একসময়, যখন আসামে এক ধরনের ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযান শুরু হয়েছিল। এই বাঙালিরা মূলত মুসলমান। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চায়! বিজেপি মনে করে ওইসব বাঙালি বাংলাদেশ থেকে গেছেন এবং সেখানে বসবাস করছেন, যার পেছনে আদৌ কোনো সত্যতা নেই। এর আগে বিজেপি সরকার পশ্চিম বাংলা থেকেও ‘বাঙালিদের’ উৎখাতের পরিকল্পনা করেছিল। এটা সম্ভব হয়নি মমতা ব্যানার্জির কারণে। বিপিন রাওয়াতের এই বক্তব্য ভারতীয় গণমাধ্যম সমালোচনা করেছে। দি হিন্দু, আনন্দবাজার, টাইমস অব ইন্ডিয়া, কিংবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতো পত্রিকায় বিপিন রাওয়াতের ওই মন্তব্যের সমালোচনা করা হয়েছিল। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, বিপিন রাওয়াতের ওই মন্তব্যটি ছিল রাজনৈতিক। তাদের যদি বাংলাদেশ গ্রহণ না করে, তাহলে তাদের বন্দিশালায় রাখা হবে বলে একটি পরিকল্পনাও তারা গ্রহণ করেছে। এ ধরনের বন্দিশালা নির্মিত হয়েছে বলেও গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জেনারেল বিপিন রাওয়াত যখন এ ধরনের একটি কথা বলেন, তখন এ ধরনের বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবেই। সাম্প্রতিক সময়ে এ সম্পর্ক একটি উচ্চতায় উপনীত হয়েছে। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদির জমানায় একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার (বিবিআইএন) ব্যাপারে দুই দেশ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার মূল কথা হচ্ছে, বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের সাতবোন রাজ্যেগুলোর উন্নয়ন। এই সাতবোন রাজ্যগুলোর মধ্যে আসামও রয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে এই রাজ্যগুলো সড়কপথে সংযুক্ত হয়েছে। এখন যদি তথাকথিত ‘বাংলাদেশি খেদাও’ অভিযান শুরু হয়, তাহলে তো বিবিআইএনের উদ্যোগ ভেস্তে যাবে! মমতার অনেক বক্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত নই (তিস্তার পানি বণ্টন অন্যতম)। কিন্তু তিনি জানেন, বিজেপি কী চায়? বিজেপির অনেক দিনের টার্গেট পশ্চিম বাংলা দখল করা। সাতবোন রাজ্যের প্রায় সব ক’টিতে এখন বিজেপি রাজ্য ক্ষমতায়। ভারতের সর্বত্র ‘গেরুয়া ঝান্ডা’ উঠানোর এক মহাপরিকল্পনা রয়েছে বিজেপির। এখানে বড় অন্তরায় পশ্চিম বাংলার মমতা ব্যানার্জি। বিজেপি পশ্চিম বাংলার রাজ্য ক্ষমতা দখল করতে চায়। এরই মধ্যে তারা পশ্চিম বাংলা থেকেও ‘বাংলাদেশিদের’ (?) বহিষ্কারের দাবি করছে। অথচ মমতা বলছেন, প্রয়োজনে তিনি আসামের ওই ৪০ লাখ ভারতীয় নাগরিককে পশ্চিম বাংলায় আশ্রয় দেবেন। মমতার পেছনে রয়েছে পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা। তারা মমতাকে বারবার সমর্থন দিয়ে আসছেন।
    এরই মধ্যে এই ইস্যুটি খোদ ভারতে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে! পশ্চিম বাংলার বিধানসভার কয়েকজন সদস্য আসামে যেতে চেয়েছিলেন। সঙ্গে একজন রাজ্য সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন। কিন্তু তাদের আসামে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আসাম সরকার যে কতবেশি সাম্প্রদায়িক, এই ঘটনা তার বড় প্রমাণ। একজন ‘মন্ত্রী’ কয়েকজন বিধানসভার সদস্য, তারাই যদি নিজ দেশের অন্য একটি রাজ্যে ঢুকতে না পারেন, তা তো ভারতের সংহতির জন্য কোনো ভালো খবর নয়। এটা ভারতে বিতর্ক আরও বাড়াবে। মমতা নিজেই বলেছেন, ভারতে ‘সুপার ইমার্জেন্সি’ চলছে। এখন জনপ্রতিনিধিরা ভারতের অন্য অঞ্চলে যেতে পারবেন না, এটা কোনো ভালো সংবাদ নয়। জাতীয় কংগ্রেস ও সিপিএমও এর সমালোচনা করেছে।

    Reply
  7. অমিতাভ

    অনেকেই মনে করছেন বার্মায় রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ গণহত্যা ও বিতাড়ন উদ্যোগের সফলতা দেখে আসামে বিজেপি অনুরূপ উদ্যোগ শুরু করেছে। কিন্তু সত্য হল, আসামে এই উদ্যোগটি অনেক পুরনো। আসামে বাংলাভাষীদের গণহত্যা ও বিবিধ নিপীড়নের অনেক ইতিহাস রয়েছে। বহুরূপে নিয়মিতই এসব ঘটছে।১৯৮৩ সালের নেলি গণহত্যায় ১৩ হাজার মুসলিমকে হত্যা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্ত দেশে এসব ঘটলেও বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা এগুলো সম্পর্কে শুনতে-বুঝতে চায়নি অতীতে। চূড়ান্ত গণহত্যা শুরুর আগে রোহিঙ্গাদের অতীত নিপীড়িত অধ্যায় সম্পর্কে আমরা যেমন জানতে চাইতাম না– আসামের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। সর্ব-সাম্প্রতিক নাগরিক তালিকার আগে থেকেই আসামের বাংলাভাষীরা কীরূপ ধর-পাকড়-নিপীড়নের মধ্যে আছে তার একটা বড় উদাহরণ সেখানকার ‘ডিটেনশন সেন্টার’গুলো। বর্তমানে আসামের অন্তত ছয়টি স্থানে (গোয়ালপাড়া, কোকড়াঝাড়, শিলচর, দিব্রুগড়, জোড়হাট, তেজপুর) কারাগারের মতো করে তৈরি এইরূপ ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে বাংলাভাষীদের বন্দি করে রাখা হয়েছে সন্দেহজনক মানুষ তথা ‘ডি-ভোটার’ (ডাউটফুল ভোটার) এবং ‘বিদেশী’ তকমা দিয়ে। গোয়ালপাড়াতে ২০ বিঘা জমির উপর নির্মিত হচ্ছে সমগ্র ভারতের সবচেয়ে বড় ডিটেনশন সেন্টার (এবং অবশ্যই এটা আসামের একটা মুসলিম প্রধান জেলা!) ডিটেনশন সেন্টারগুলোর বন্দিদের মধ্যে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও আছেন এবং এরা আসামের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষদের অংশ। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মানুষ আছে এসব সেন্টারে। তবে প্রতিনিয়তই এসব ডিটেনশন সেন্টারের বন্দি সংখ্যা বাড়ছে এবং বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তা আরও বেগবান হয়েছে। যাদের কাছেই নাগরিকত্বের ‘সন্তোষজনক’ কাগজপত্র পাওয়া যায় না– এমন বাংলাভাষীদেরই এইরূপ ডিটেনশন সেন্টারে পুরে দেয়া হচ্ছে। আসামের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এরকম প্রায় এক লাখ ‘অবৈধ মানুষ’-এর তালিকা নিয়ে নিয়মিতই অনুসন্ধান ও গ্রেফতার কার্যক্রম চালায়। ২০০৪ থেকে সেখানে এই কার্যক্রম চলছে–যদিও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মানবাধিকার আন্দোলনে আসামের বাংলাভাষীদের এই বঞ্চনাদগ্ধ অধ্যায় কোন বড় এজেন্ডা হয়ে ওঠেনি। বরং প্রতিনিয়ত ভারতীয় প্রধান প্রধান প্রচারমাধ্যমে এই ‘অবৈধ বাংলাভাষী’দের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো ছাড়াও এইমর্মেও মন্তব্য জুড়ে দেয়া হয়– এরা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষ। আসামের বর্তমান ‘বাংলাদেশী বন্দিশিবিরগুলো’ কী ৭০ বছর আগের নাজি শিবিরগুলোর সঙ্গে তুলনীয়? জানি সিরিয়াস ভিন্নমত থাকবে অনেকের। তবে স্পষ্টত খানিকটা নাজি মাইন্ডসেটের ছাপ আছে এতে।

    Reply
  8. মুসলমানরা কেন ভবিষ্যত নিয়ে আতঙ্কিত? BBC News বাংলা

    হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এর শাসনামলে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটি মারাত্মক অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে। বিবিসি’র রজনী বৈদ্যনাথানের রিপোর্ট। ভারতের নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণের মাত্র কদিন আগে এ ঘটনাটি ঘটে। সেদিন আসামের উত্তর-পূর্ব এলাকার মুসলমান ব্যবসায়ী শওকত আলী কাজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎ বেশ কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল মানুষ তার ওপর হামলা চালায়। আক্রমণকারীরা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। তারপর ময়লা কাদার ওপর হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে।”আপনি কি বাংলাদেশী?” তার ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে হামলাকারীদের একজন। “আপনি এখানে গরুর মাংস বিক্রি করেন কেন?” মি. আলীর দিকে আঙুল উঁচিয়ে এ প্রশ্ন করে আরেকজন।
    শওকত আলীর এ লাঞ্ছনার ঘটনা দেখতে ওইখানে উৎসাহী অনেক লোকই ভিড় করেছিল। তবে আলীর সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসে নি। তারা মোবাইলে পুরো ঘটনাটির দৃশ্য ধারণ করছিল।
    ঘটনার এক মাস পর। এখনো মি. আলী ঠিকমত হাঁটতে পারেন না।আমি মি. আলীর সঙ্গে দেখা করতে তার বাড়িতে গেলাম। বাজার থেকে সামান্য দূরে শ্যামল সবুজ শস্যক্ষেত পার হয়ে তার বাড়ি। সেটিও সবুজে ঘেরা। আটচল্লিশ বছর বয়সী লোকটি বিছানায় পা ভাঁজ করে বসেছিল। সেইদিনের ঘটনার কথা বলতে গিয়ে তার চোখ ছলছল করে উঠল। “তারা আমাকে লাঠি দিয়ে মেরেছে, আমার মুখে লাথি মেরেছে,” মাথা ও পাঁজরের ক্ষতচিহ্নগুলো দেখিয়ে বলছিলেন মি. আলী। তার পরিবার কয়েক দশক ধরে তাদের ছোট খাবারের দোকানটিতে ঝোলওয়ালা গরুর মাংস বিক্রি করে আসছেন, তবে আগে কখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। আরেকটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে অনেকেই এ প্রশ্ন তুলেছেন যে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়, যাদের সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ২০ লাখ, তাদের অধিকার এখানে ঠিক কতটা সমুন্নত রয়েছে? ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫ এর মে থেকে ২০১৮ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ভারতের ১২ টি প্রদেশে ৪৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ জনই মুসলমান। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এখন যারা এ দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তারা এসব ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এ বিষয়ে তারা নীরবতার সংস্কৃতি পালন করছে।

    হিন্দুরা যেহেতু গরুকে পবিত্র মনে করে এজন্য ভারতের অনেক প্রদেশে গরুর মাংস বিক্রি করায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে আসামে গরুর মাংস বিক্রি করা আইনত বৈধ।

    শওকত আলী শুধু শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হননি, তার সামাজিক মর্যাদাও হারিয়েছেন। দুর্বৃত্তরা এই ধর্মপ্রাণ মুসলমান লোকটিকে শূকরের মাংস খেতে বাধ্য করেছে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—