এক.

গত ২১ এপ্রিল সকালে শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডের অনুষ্ঠানে ৩টি গির্জা ও ৩টি পাঁচ তারকা হোটেলে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৯০জনের মতো এবং আহত হয়েছিল পাঁচশ-রও অধিক নিরাপরাধ সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সারাবিশ্বে জঙ্গি আক্রমনের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, শ্রীলঙ্কার ঘটনাটি তাদের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ভয়াবহ এবং প্রাণহানির সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। বোমা হামলার দুইদিন পর ঘটনার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছিল ইসলামিক স্টেট (আইএস) নামের দুর্ধর্ষ ইসলামী জঙ্গিবাদী সংগঠনটি।

শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলার বিষয়ে ভারত সরকারের গোপন এক সূত্রের বরাত দিয়ে সেদেশের এনডিটিভি জানিয়েছিল, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা আক্রমনের দুই ঘণ্টা আগেই শুধু নয়, ৪ এপ্রিল এবং ২০ এপ্রিলও একই ধরনের সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিল শ্রীলঙ্কা গোয়েন্দা সংস্থার কাছে (প্রথম আলো, ২৩ এপ্রিল-২০১৯)।

২৪ এপ্রিল গোপন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান দাবি করে যে, বিশ্বের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা শ্রীলঙ্কান গোয়েন্দা সংস্থাকে সহিংস ইসলামী চরমপন্থি একটি নেটওয়ার্ক শ্রীলঙ্কায় সক্রিয় থাকার কথা জানিয়েছিল এবং যে কোনও সময় দেশটিতে জঙ্গি হামলার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সতর্ক করেছিল। একই প্রতিবেদনে বোমাহামলাকারী শ্রীলঙ্কান আইএসআইএস জঙ্গিদের সাথে বাংলাদেশি আইএসআইএস জঙ্গি সমর্থকদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগের আলামত শ্রীলঙ্কান গোয়েন্দাবাহিনী পেয়েছিল বলেও জানানো হয়।

শ্রীলঙ্কায় সিরিজ বোমাহামলার সাথে জড়িত সন্দেহভাজনদের মধ্যে সর্বাগ্রে ছিল মোহাম্মদ জাহরান হাশিম নামের সে দেশের এক উগ্র-মৌলবাদী নেতার নাম, যার ব্যাপারে শ্রীলঙ্কান গোয়েন্দাবাহিনী জানতো আগে থেকেই। দ্য গার্ডিয়ানের ওই প্রতিবেদনেই জানা যায় যে, ২০১৮ সালের নভেম্বরে ভারতীয় গোয়েন্দাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার সন্দেহভাজন আইএস সমর্থকদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন ডিভাইস থেকে বিশাল তথ্যভান্ডার পাওয়া গিয়েছিল, যেখানে গ্রেপ্তারকৃতদের সাথে শ্রীলঙ্কান মৌলবাদী নেতা মোহাম্মাদ জাহরান হাশিমের যোগাযোগের সুস্পষ্ট আলামত এবং প্রমান তারা পেয়েছিল। পরবর্তীতে শ্রীলঙ্কান গোয়েন্দাবাহিনীর গোপন নজরদারির জালে ধরা পড়েছিল হাশিমের সাথে বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানের আইএসআইএস জঙ্গি সমর্থকদের যোগাযোগের বিষয়টি। হামলার অব্যবহিত পূর্ব কিছু মাসে বাংলাদেশের অভ্যন্তরের আইসিস সমর্থকদের সাথে হাশিমের যোগাযোগের ব্যপারেও উল্লেখ করা হয়।

দুই.

২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কায় জঙ্গি হামলার পর ২৩ এপ্রিল কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “বাংলাদেশে এক সময় জঙ্গি তৎপরতা থাকলেও তারা এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে তাদের কোনও তৎপরতা নেই এবং নতুন করে হামলা চালানোর মতো কোন সক্ষমতাও জঙ্গিদের নেই। আমরা এ ব্যাপারে তৎপর রয়েছি”। মনিরুল ইসলামের এই বক্তব্যের আংশিক মিল খুঁজে পাওয়া যায় ঠিক এক সপ্তাহ পরই ঘটে যাওয়া ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক ঘটনায়।

২৯ এপ্রিল রাত সাড়ে তিনটার দিকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খবর পেয়ে র‍্যাব রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলার মেট্রো হাউজিংয়ে একটি বাড়িতে অভিযান চালায় । অভিযানের এক পর্যায়ে জঙ্গিদ্বয় নিজেরাই বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মহত্যা করে। বোমাবিস্ফোরণে দুই জঙ্গি মারা গেলেও বাকি জঙ্গিদের কোনও হদিস মেলেনি। তবে নিহত দুজন ছাড়া আরও জঙ্গির সম্পৃক্ততা যে ছিল তা বোঝা যায় রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় দুটি মামলায় নিহত দুই ব্যক্তি ছাড়াও ‘অজ্ঞাত আরও তিন থেকে চারজনকে’ আসামি করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। একই দিন, অর্থাৎ ২৯ এপ্রিল রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর গুলিস্তানে পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা হলে ঘটনাস্থলে তিনজন পুলিশ আহত হয়। এ হামলার কয়েক ঘণ্টা পরে আইএসআইএস পুলিশের উপর বোমা হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয়।

উপরের ঘটনা দু’টি সাধারণের দৃষ্টির সম্মুখে হলেও অন্তরালে সেদিন ঘটছিল ভিন্ন এক অধ্যায়, যা নিঃসন্দেহে গবেষক এবং পর্যবেক্ষকদের হতবাক করেছিল। জঙ্গিবাদ নিয়ে যারা গবেষণা বা কাজ করেন, তারা কমবেশি সবাই অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যম ‘টেলিগ্রাম’ এর কথা শুনেছেন বা জানেন। বিশ্বের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনগুলো ‘টেলিগ্রাম অ্যাপ্লিকেশন’ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে অনলাইনে যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদান করে থাকে।

আইএসআইএস বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়েছিল এবং সিরিয়া থেকে টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে সে হামলার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছিল। অর্থাৎ আইএস-এর টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং গ্রুপ পরিচালিত হতো ভিন্ন কোনও দেশ থেকে এবং তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সিরিয়া থেকে। বাংলাদেশে আইএস-এর সমর্থক বা সদস্য থাকলেও দেশের ভিতর থেকে কখনো সরাসরি ‘টেলিগ্রাম গ্রুপ বা চ্যানেল’ পরিচালিত হয়নি বা হতে শোনা যায়নি। কিন্তু ২৯ এপ্রিল মোহাম্মদপুর ঘটনার পর বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টার দিকে টেলিগ্রাম চ্যানলে আইএস-এর পক্ষ থেকে একটি ‘জরুরী বিজ্ঞপ্তি’ দেয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে লেখা ছিল (হুবহু তুলে দেয়া হলো),

আল মুরসালাত মিডিয়া (পাবলিক) #important_notice, আমাদের সকল ভাইদের জানানো হচ্ছে যে, নিরাপত্তা জনিত কারণে আত তামকিন মিডিয়ার অফিসিয়াল গ্রুপ ডিলিট করা হবে ইনশাআল্লাহ, পাশাপাশি আমরা সবাইকে বলবো যেন বাংগালী কোন পাবলিক গ্রুপে কেউ না থাকে, প্রয়োজনে চ্যানেলে থাকুন আপনার যদি বাংলায় দাওলাতুল ইসলামের মিডিয়া কার্যক্রম এর সাথে সবসময় যুক্ত থাকতে চান, তাহলে নিচের দেওয়া ### চ্যানেলে জয়েন করুন ইনশাআল্লাহ বিদ্রঃ আমাদের কথা সবসময় গুরুত্বের সাথে নিবেন, এবং নিজেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে যত্মবান হোন

মোহাম্মদপুরের ঘটনা এবং তার ঠিক ৫ বা ছয় ঘণ্টা পরেই  উপরের এই বিজ্ঞপ্তি নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকেই আইএস-এর টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং/অথবা বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপ পরিচালিত হতো, যা এর আগে কখনো হয়নি বা হতে দেখা যায়নি অথবা সেদিনের পুলিশই অভিযানে জঙ্গিদের এমন কিছু স্পর্শকাতর বিষয় উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল যে, যার প্রেক্ষিতে জঙ্গিবাহিনীর এই সতর্ক বার্তা পাঠানো ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প ছিল না। ঠিক একই কারণে, বাংলাদেশের সীমারেখার ভিতরে সন্দেহাতীত ভাবেই আইএস এর উপস্থিতি তথা তাদের সক্রিয় কার্যক্রম বিদ্যমান আছে বা ছিল’ বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। তবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণের কারণেই ২৯ এপ্রিল মোহাম্মদপুর জঙ্গি আস্তানা ধ্বংস করতে সমর্থ হয়েছিল এবং সমূহ ভয়ংকর কোন বিপদ থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পেয়েছিল, যার একচ্ছত্র কৃতিত্বের অধিকারী নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সরকার, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট, র‍্যাব ও পুলিশ ছাড়াও অন্যান্য গোয়েন্দাবাহিনীর অসাধারণ কর্মতৎপরতা।

কিছুটা সতর্কতার সাথে আমি মন্তব্য করতে চাই এভাবে যে, যে ভুল এবং অপেশাদারিত্বের কারণে মাশুল দিতে হয়েছিল শ্রীলঙ্কার গোয়েন্দাবাহিনী, সরকার তথা সেদেশের নিরীহ জনগণকে, ঠিক একই ধরনের ভুল না করার মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকার, গোয়েন্দা-ও নিরাপত্তা বাহিনী সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের নজির স্থাপন করে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দেশকে নিঃসন্দেহে বিশ্বের এক সুউচ্চ আসনে নিজেদের প্রতিষ্ঠা দিতে সমর্থ হয়েছে এবং সেই সাথে বাংলাদেশের জনগণ রক্ষা পেয়েছে সমূহ বড় ধরনের কোনও দুর্ঘটনার কবল থেকে!

তিন.

ভিন্ন একটি প্রসঙ্গ। গত ২৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাতে আইএসআইএস তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে বাংলা ভাষায় একটি পোস্টার প্রকাশ করেছিল। সেখানে লেখা ছিল, ‘শীঘ্রই আসছি, ইনশাআল্লাহ…’!

ভারতের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া’ এই পোস্টারের সংবাদ প্রকাশ করে এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে ঈঙ্গিত দেয়, আইএস যে কোনও সময় বাংলাদেশ বা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হামলার পরিকল্পনা করছে। অথচ একাধিক গবেষক এবং পর্যবেক্ষকই এই পোস্টারটিকে হামলার ব্যাপারে কোনও আগাম বিজ্ঞপ্তি বলে মনে করেননি। তাদের মতে, আইএসআইএস নতুন কোনও কিছু প্রকাশের পূর্বে তাদের সমর্থক ও সদস্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নতুন কোনও কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে বলে থাকে। কার্যত হয়েছেও তাই। এই পোস্টার প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা পরে আইসিসের বাংলাভাষী এই গ্রুপটি নিজেদের অনুবাদকৃত একটি প্রচারণামূলক গান প্রকাশ করে, যার পূর্বে উল্লেখিত পোস্টারটি প্রকাশিত হয়। এটি এক ধরনের বিজ্ঞাপন।

এই ডামাডোলের মধ্যেই আইএস আঠারো মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করে, যেখানে তাদের শীর্ষনেতা আবু বকর আল-বাগদাদী প্রথমবারের মতো ভিডিও বার্তায় দেখা যায়। এই ভিডিওতে তাকে  শ্রীলঙ্কাসহ সাম্প্রতিক কালের বিভিন্ন ঘটনাবলী নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অন্তত পাঁচ বার এই বাগদাদীকে হত্যা করা হয়েছে বা তিনি মারা গেছেন বলে ঘোষণা দিয়েছিল। দীর্ঘ পাঁচ বছর অন্তরালে থাকার কারণে বিশ্ব বিশ্বাস করেছিল বাগদাদীর মৃত্যুর কথাকে। কিন্তু হঠাৎ করে ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে তার আবির্ভাব বিশ্বকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিলেও আইএসআইএস-এর সদস্য ও সমর্থকদের মধ্যে যে নতুন উদ্যম ও উৎসাহের সৃষ্টি করেছে, তা বলাই বাহুল্য!

ইতিপূর্বে আইএসআইএস-এর নেতা হিসেবে আবু ইব্রাহিম আল হানিফ নামের একজন বাংলাদেশির নাম শোনা যেত, যার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কেউ কোনও হদিস জানে না। হলি আর্টিজান হামলার পর কোনও এক সময় বাংলাদেশে সক্রিয় আইএসআইএস-এর মধ্যে এক ধরনের বিভেদের কথা শোনা গিয়েছিল এবং নেতৃত্বের কারণে অথবা অন্য যেকোনও কারণেই হোক, বাংলাদেশে আইএস দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসে জঙ্গি সংগঠনটির একই টেলিগ্রাম  চ্যানেলে খুব ছোট একটা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তারা জানিয়েছিল যে, ‘দ্বিধাবিভক্ত আইএসআইএস-এর মধ্যে মিমাংসা হয়ে গেছে এবং এখন থেকে যেকোনও অপারেশন দুই গ্রুপ একীভূতভাবেই পরিচালিত হবে’।

চার.

‘শীঘ্রই আসছি, ইনশাআল্লাহ…!’, পোস্টারটি যে জঙ্গিদের গান প্রকাশের আগাম বিজ্ঞপ্তি ছিল, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেও ইতিমধ্যে টাইমস অব ইন্ডিয়া ছাড়াও বাংলাদেশের তাবৎ সব মিডিয়ার বদৌলতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কাঁপছিল অজানা এক জুজুর ভয়ে। মিডিয়াগুলোর খবর ছিল এমন এক ধরনের প্রতারণামূলক, যা পরোক্ষভাবে আইএসআইএস-কে এনে দিয়েছিল সস্তা প্রচারণার সুযোগ এবং জনমনে ভীতির সঞ্চার ও চাপা উত্তেজনা। বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ার কাণ্ডজ্ঞানহীন, দায়িত্বহীনতার সুযোগ নিতে আইএসআইএস এক সেকেন্ডও দেরি করেনি। ঠিক পরক্ষণেই তারা বাংলা, হিন্দি এবং ইংরেজি, তিন ভাষায় ঘোষণা দিলো অনাকাঙ্খিত মিডিয়া নির্মিত সেই জঙ্গি আক্রমনের কথা এবং বিভিন্ন জঙ্গিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আইএসআইএস-এর এই হুমকী অত্যন্ত সিরিয়াস বলে মত দিয়েছেন। এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে বাংলাভাষী গ্রুপের টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে হিন্দিতে হুমকি বার্তা পাঠানোর বিষয়টি। এই বার্তায় নেতা হিসেবে নাম দেখা যায় ‘আবু মোহাম্মদ আল বাঙালী’ নামের একজন বাংলাদেশির এবং সেই সাথে বিভক্ত আইএস-এর একত্রীকরণের কারণে  নেতৃত্বেও পরিবর্তন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আইএসআইএস-এর নিজস্ব কিছু ভাষারীতি আছে, যা দিয়ে হুমকির স্তর নির্ণয় করা সম্ভব। টেলিগ্রামে তাদের সমর্থকদের পরিচালিত একটি চ্যানেলে এ ধরনের একটি হুমকি বার্তার (যেটি একই সময়েই প্রকাশিত হয়েছিল তাদের অফিশিয়াল চ্যানেলের বিজ্ঞপ্তির পাশাপাশি), বিজ্ঞপ্তিতে শেষ লাইনে ইংরেজিতে লেখা ছিল, “… Wait for the big surprise from the IS mujahideen O pathetic cow worshiper FILTH!” শেষের এই লাইনটি মূলত হামলার লক্ষ্যকে নির্দেশিত করে। ইতিপূর্বে ফ্রান্সে আক্রমনের সময় ব্যবহার হয়েছিল ‘ও ক্রুসেডার’ এবং শিয়াদের আক্রমনের আগে ব্যবহার হয়েছিল ‘ও রাফিজী’। এবার হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে ব্যবহার হয়েছে একই টার্ম- O pathetic cow worshiper FILTH! সুতরাং ভাষারীতি এবং এবছরের শুরু থেকে খোদ আইএসআইএস-এর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ এবং তাদের শীর্ষনেতা আবু বকর আল-বাগদাদীর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে এই বিজ্ঞপ্তির গুরুত্বকে বাড়িয়ে দেয় বৈ-কি!

যেহেতু ভারতের আইএস সমর্থকদের সাথে শ্রীলঙ্কার আইএস নেতা হাশিমের যোগাযোগের বিষয়টি প্রমাণিত এবং বাংলাদেশের এই জঙ্গি সংগঠনের সমর্থকদের সাথে শ্রীলঙ্কান আইএসআইএস-এর যোগাযোগের আলামতও পাওয়া গিয়েছে, সেহেতু উপরের ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে  নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে যে- বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখার ভিতরে আইএসআইএস-এর একটা ‘লোকাল চক্রকেন্দ্র বা Hub’-এর উপস্থিতি বিদ্যমান’।

এছাড়াও বিভিন্ন আলামতে এটাও পরিষ্কার যে, সবল অথবা দুর্বল যা-ই হোক না কেন, আইএসআইএস-এর বাংলাদেশে উপস্থিতি এবং কার্যকলাপ শুধু বাংলাদেশই নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে কোনও দেশের জন্যই তা মারাত্মক হুমকিস্বরূপ বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। অন্তত শ্রীলঙ্কার ঘটনা সে সাক্ষ্যই দেয়!

বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে জঙ্গিমুক্ত রাখতে বাংলাদেশ সরকার, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট, র‍্যাব ও পুলিশ এবং অন্যান্য গোয়েন্দাবাহিনীর কর্মতৎপরতা অব্যাহত রাখা ছাড়াও ভারত তথা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিষয়ে অধিকতর অংশীদারিত্ব, সহযোগিতামূলক- এবং যৌথ-কার্যক্রম পরিচালনার কোনও বিকল্প নেই।

 

সাব্বির খানবিশ্লেষক, লেখক ও সাংবাদিক

One Response -- “আইএস: দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—