নির্দিষ্ট সময়ে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আসনটি শূন্য হয়ে গেল। ফলে বগুড়া-৬ আসনটিতে নতুন করে ভোটের উদ্যোগ নেবে নির্বাচন কমিশন। বলা হচ্ছে লন্ডনের নির্দেশে বিএনপি-র এই শপথ।

এতে ভালো-মন্দ যাই থাক ফখরুল সাহেব সাংসদ হবার সুযোগ মিস করলেন। বেচারা মির্জা আসলেই আছেন মহাবিপদে। শপথ হবার পর যেখানে যাচ্ছেন, মুখোমুখি হচ্ছেন প্রশ্নবানের। স্বাভাবিকই বটে।

খবরে দেখলাম একহাত নিয়েছে মাহমুদুর রহমান মান্না। বোঝা যাচ্ছে আপসের কারণে আরও একধাপ পিছিয়ে পড়লো বিএনপি। নেতাকে ফেলে শপথ নিয়েছেন বিএনপির পাঁচ সাংসদ।  হারাধনের একমাত্র ছেলেটি শপথ নেননি।

তাকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দের সুযোগ কম থাকে। ভদ্রলোক পরিমিত কথা বলেন। মিতভাষী, সুদর্শন । মাঝেমধ্যে তিনিও সিনক্রিয়েট করেন। মনে আছে দেশে যখন আগুন সন্ত্রাস চলছিল তখন আগুন বোমায় চট্টগ্রামের এক কিশোরী গুরুতর আহত হয়েছিল। আঘাত পেয়ে এক চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়া সে কিশোরী কোথায় কেমন আছে, সেই চোখটি কাজ করে কিনা, রাজনীতি তার খবর রাখেনি! যারা সেই আঘাত দেখিয়ে বা তার নিন্দা করে জনগণের ভরসা চেয়েছে তারাও না। আর যারা মেরেছিল তারা তো পারলে বলে- মেয়েটি নিজেই বোমা মেরেছিল নিজের চোখে।

সেই সময় এই ভদ্রলোক কিশোরীর কথা বাদ দিয়ে তার নেত্রীর জন্য হঠাৎ দুচোখ ভরা পানি নিয়ে কাঁদতে শুরু করেছিলেন মিডিয়ায়। রুমাল দিয়ে দুই চোখ মোছার সে-ই ছবি দেখে তখন লিখেছিলাম, ‘জনাব আপনিতো এখনো দুচোখে কাঁদতে পারেছেন। একবারও কি ভেবেছেন ওই মেয়েটি আর কোনদিনও হয়তো দুচোখে কাঁদতে পারবে না?’ ভদ্রলোক রাজনীতি করেন তো, তাই মাঝে মধ্যে এমন সব উদ্ভট কাণ্ড করে বসেন। এবার তিনি শপথ না নিয়ে আবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন।

শপথ নেওয়ার আগে সংসদ ভবনে স্পিকারের কক্ষে (বাঁ থেকে) হারুনুর রশীদ, মোশাররফ হোসেন, উকিল আবদুস সাত্তার ও আমিনুল ইসলাম।

বিএনপি সংসদে যাবে কি যাবে না এটা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, আমার মনে হচ্ছিল যারা জিতেছেন তারা নিষেধ মানবেন না। তাদের ভাষায় ভোট ডাকাতির নির্বাচন, রাতে ব্যালেট বাক্স ভরে ফেলার নির্বাচনসহ এই সরকারকে তারা মনে করে জনগণের সাথে সম্পর্কহীন একনায়কের সরকার। কিন্তু আমরা বোকা হলেও আমাদের মগজ এখনো পচে যায়নি। এটুকু বেশ বুঝতে পেরেছিলাম সাংসদরা একদিন না একদিন পথে আসবেই। এর পেছনে তারা জনমনের দায় মেটানো বা গণতন্ত্রের দোহাই দেবে। বলবে তাদের নেত্রীর মুক্তির জন্য তারা এই সিদ্বান্ত নিয়েছেন। এসব আই ওয়াশ। মূলত কেউ সুযোগ-সুবিধা থেকে দূরে থাকতে নারাজ। বাংলায় যে একটা পুরনো প্রবাদ আছে- সেই তো নথ খসালি তাহলে আর মানুষ হাসালি কেন?’ এ তারই প্রতিফলন।

এইসব সাংসদদের চাইতে হাজার গুণ জনপ্রিয় বিএনপি নেতারা জিততে পারেননি। হেরে নাস্তানাবুদ হয়েছেন দেশব্যাপীর কাছে সুপরিচিত বিএনপি নেতারা। চট্টগ্রামে যাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে তাদের চরম দুশমনও তা বিশ্বাস করে না। দলের স্টার, তারকা, আইকন সব ফেইল- আর এরা ছয়জন হয়ে গেলেন বিজয়ী! তাতেই বহু প্রশ্নের উত্তর আছে।

এখন বিষয় এই, কেন তারা এতদিন বিরোধিতা করে, বড় বড় কথা বলে সুড়সুড় করে সংসদে গিয়ে ঢুকলেন? বলা হচ্ছে, এ সিদ্বান্ত নাকি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার। তারেক জিয়া হঠাৎ এমন গণতন্ত্রী হয়ে উঠলেন? এত উদার হয়ে গেলেন? তার মনে এত বড় পরিবর্তন এসে গেল রাতারাতি?

মানুষ বোকা না। তারেক রহমান নিজেকে যাই মনে করুক আর মুখে যাই বলুক না কেন মনে মনে  খুব ভালো জানেন তাকে ছাড় দেবেননা শেখ হাসিনা সরকার। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে তাকে ফেরত আনার কাজ শুরু করা হবে। তারেক রহমান খুব ভালো জানেন, শেখ হাসিনা যা বলেন- তাই করেন। এবং যতদিন তার প্রাণ আছে ততদিন তিনি তা করে যাবেন।

কেবল শেখ হাসিনা কেন, আমরা সবাই জানি, দেশবাসী জানে- তারেক জিয়া কী চেয়েছিল। কার নির্দেশে একুশে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা  ও বঙ্গবন্ধু কন্যার জীবননাশের চেষ্টা হয়েছিল। তাছাড়া বিগত এক দশক ধরে লন্ডনে বসে যত ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত করুক না কেন তাতে কোনও কাজ হয়নি।

বরং শেখ হাসিনা সব অপচেষ্টা রুখে এখন আপন শক্তি ও ঔজ্জ্বল্যে বিশ্বনন্দিত। তারেক জিয়া এও জানে মায়ের মুক্তি সহজ কিছু না। দেশে খালেদা জিয়ার প্রতি সমর্থন আছে বলে যত ঢোল পেটানো হোক না কেন, সে-ই ঢোল এখন ফেটে গেছে। বছরের পর বছর ধরে সত্য ইতিহাস আর মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাবর্তনে চোখ খুলে যাওয়া তারুণ্য আর নবীন প্রজন্মে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান অপরিচিত তিন মুখ।

তাছাড়া এমন কি ইতিহাস বা কাজ আছে যে যেজন্য তারুণ্য কিংবা নতুনরা তাদের জন্য পথে নামবে? আকুল হয়ে উঠবে? বর্তমান বিশ্ব সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ আর উৎপাত-বিরোধী। দুনিয়ার দেশে দেশে এখন উন্নয়ন আর ভালো থাকার সময়। মানুষ খামোখা পথে নেমে দেশ সমাজ বা পরিবেশ অস্থির করবে কোন্ দু:খে? এসব বিবেচনায় তারেক রহমান যদি পাঁচজনকে সংসদে পাঠিয়ে ভাবেন যে- সরকার তাদের সব কথা মেনে নেবে বা মানতে বাধ্য হবে তা হলে মুখ লুকিয়ে হাসার কোনও বিকল্প নাই।

বলা হচ্ছে, মির্জা ফখরুল নাকি তারেক রহমানের আদেশেই সংসদে যাননি। এর মানে কি এই তারা মনে করছে মহাসচিব বাইরে থাকা মানে জোটের শরীকদের খুশি রাখা যাবে? না এটাকে জনগণের কাছে প্রতিবাদ বলে চালিয়ে বাকিদের দিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করা হবে? কোনটাই যে সহজ কাজ না সেটা সময় বলে দেবে। তবে আপাতত আমরা যে দেখলাম তা এক নির্মম কৌতুক। সেলুকাসের বিচিত্র দেশে সব সম্ভব।

এত কথা, এত গর্জন, এত হম্বিতম্বি, এত ভোট চোর-ভোট ডাকাত বলে- দেশ মাথায় তোলার পর এমন নির্মম আত্মসমর্পণ কৌতুকই বটে। ভাবছি সেসব সুশীলদের নিয়ে যারা টিভিতে বা বিভিন্ন মিডিয়ায় লিখে বলে চিৎকার করে নিজেদের মতামত দিলেন- এখন তারা কি বলবেন?

কিভাবে এই জাতীয় ঘটনাকে জায়েজ করবেন তারা? ড: কামাল হোসেন আর তাকে বিশ্বাস করা কাদের সিদ্দিকী মাহমুদুর রহমান মান্না, আ স ম রবের কী হবে এখন? তাদের যে চেহারা দেখেছিলাম তাতে তো মনে হয়েছিল তারা এবার কিছু করে ছাড়বেন।

মিডিয়ার বলে বলীয়ান হয়ে আস্ফালনের পাশাপাশি তারা জাতিকে চমকেও দিয়েছিলেন কিছুটা। মনে হয়েছিল কিছটা টাফ-টাইম আসছে সরকারের জন্য। এখন কী তা মনে হচ্ছে আদৌ? আহারে কাদের সিদ্দিকী বঙ্গবীর এখন আপনি কোথায় লুকাবেন? কোথায় যাবে আ স ম রবের উত্তেজিত কথা বার্তা? মান্নার মতো শিরে সংক্রান্তি চলছেই। এবার তাদের বলার মুখও থাকলো না আর।

অন্যদিকে সবার আগে শপথ নেয়া গণফোরামের দুই সদস্যের ব্যাপারে ড: কামাল হোসেনের তেজও আস্তে আস্তে নিভে গেছে। কেন জানি মনে হয়, তিনি এই খেলাধুলার নেপথ্য নায়ক। সুলতান মনসুরকে যেমন করে ধমক দিয়েছিলেন তারচেয়ে বেশি ধমকালেন মোকাব্বিরকে। সে ধমকও কয় দিন পর আপসে পরিণত হয়ে গেল! এখন তিনি কি বলবেন? তিনি কি বলবেন যে এই জোটের আর দরকার নাই? বেইমানদের সাথে না থাকার অজুহাতে ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দিলেই কিন্তু ষোলকলা পূর্ণ হবে। হয়তো সেটাই দেখবো একদিন। তখন কি আর সন্দেহ থাকবে- কেন কী কারণে মাঠে নেমেছিলেন ড: কামাল ।

শপথ গ্রহণের এই নাটকে দেশের জনগণের কী উপকার, কী লোকসান জানিনা। তবে একথা নি:সন্দেহে বলা যায়, বাঙালি শপথ করে শপথ ভাঙার জন্য। শপথের নামে আজকের নাটকও একদিন উল্টো পথে হাঁটতে পারে। ততদিন সবুর করবেন কিনা জানিনা কিন্তু এখন থেকেই মির্জা ফখরুল গলা খুলে গাইতে পারেন, ‘শপথের মালা খুলে, আমারে গেছো যে ভুলে…।‘

এটা নিশ্চিত সাংসদরা কথা বলবেন বটে সাথে টোপও গিলতে থাকবেন। ঢুকতে না ঢুকতেই তারা সংসদীয় কমিটির মেম্বার হয়ে গেছেন। কত টোপ! কত কাজ! কত পাওয়া আর কত চাওয়া! এসব চাওয়া-পাওয়ার ঠেলায় কারাগার ইসু কোথায় তলিয়ে যায় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

হায় শপথ।

অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

Responses -- “বিএনপি: শপথের মালা খুলে, আমারে গেছো যে ভুলে…”

  1. Md. Mahbubul Haque

    সেই তো মল খসালি, তবে কেন লোক হাসালি?
    শেষ পর্যন্ত আপনিও স্বীকার করলেন যে দিনের ভোট আগের রাতে দেয়া হয়েছিল। ইলেকশন দ্য অম্লীগস্টাইল। আপনাদের মগজ তো পঁচে গেছেই, বিবেক থেকেও দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। চারপাশের এত অন্যায়, অবিচার – ক্ষমতার সৌরভে টের পাচ্ছেন না, যেমন পায়নি বিম্পি তার শাসনামলে।
    বিরোধীদলের মাজায় জোর নেই বুঝে নিজেরাই এখন নিজেদের ভ্রষ্টতার বয়ান দিচ্ছেন বড় গলায়? মন্ত্রীত্ব হারিয়ে আরো কিছু বিবেকহীন এখন আপনার সুরে কথা বলছে? সময় বিচার করবেই। একটি দলের বর্তমান দূর্দশায় হাসছেন? মনে পড়ে না ৭১-৭৫ দোর্দন্ডপ্রতাপে একক শাসনামলের পরেও মর্মান্তিক পতনের পর নৃশংস কান্ডটির বিরোধিতা করতে বা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আপনার মত সুবিধাভোগী কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায় নি? সবাই গিরগিটির মত গায়ের রং পাল্টে নিরাপদ দূরত্বে পালিয়েছিলেন। কেউ কেউ ট্যান্কের ওপর দাঁড়িয়েও নৃত্য করেছিল। সুযোগ বুঝে আপনারা দলের পক্ষে বা বিপক্ষে গলায় রক্ত তুলে ফেলেন শুধুমাত্র নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে।
    দলের প্রয়োজনে নয়, দেশের প্রয়োজনে সত্য বলুন, মিথ্যার বেসাতকারী হবেন না। দেশটির গায়ে আর কালিমা লাগাবেন না যদি জন্মটা এদেশের মাটিতে হয়ে থাকে।

    কয়েকটি বিরোধীদলীয় গর্দভকে এবার দেখা যাবে খোয়াড়ে। তারা নাকি বিরোধী দলের মহান দায়িত্ব পালন করবেন? এই বেকুবের অর্ধেকগুলো কি জানে না, নাকি না জানার ভান করে যে তারা জনগণের ভোটে ইলেক্টেড নয় ষড়যন্ত্রের দ্বারা রাতের ভোটে সিলেক্টেড? জাতির সাথে প্রতারণায় তারাও অংশীদার হচ্ছেন ব্যক্তিক চাহিদায়। মধ্যরাতের অশ্বারোহীরা এবার দেশের কান্ডারী। দেশ ও জনগণের উন্নয়নের জন্য নির্বাচনে চুরি করা লাগে না, বিরোধীদলের মাজাও ভাঙতে হয় না, সুশাসনই যথেষ্ট।

    আরেক কুপুত্র-অকাল কুষ্মান্ড তার কৃতকর্মের বিচারের ভয়ে দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে নিরাপদ দূরত্বে বসে আছে আর মধ্যবয়সেও আনাড়ির মত ভুলভাল চাল দিচ্ছে। এবং তার অপকর্মের সাজা ভোগ করছে তার বৃদ্ধ মা জননী।
    ধিক বিবেকহীন গর্ভস্রাব রাজনৈতিক ও তাদের উপাসনাকারীদের।

    Reply
  2. Jewel Debnath

    Tareq Zia had no choice since the elected were adamant to join the parliament. I think they are now making an excuse by saying Tareq Zia gave the order. Apparently Not!

    Reply
  3. কাজল হাসান

    সত্যিই বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা তাদের দলের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার মতোই বেইজহীন, ভঙ্গুর।। এই বেইজলেসের কারণে তাদের চিন্তাশক্তিও কিছুটা জাতিসত্বাহীন, কর্কশ।।

    Reply
  4. সৈয়দ আলি

    আহা, বিএনপির দুর্দশায় লেখকের কলজে ফেটে যাচ্ছে!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—