দুনিয়ায় সর্বাপেক্ষা ভারী পিতামাতার কাঁধে সন্তানের লাশ। নুসরাত জাহান রাফি’র পিতা কন্যার লাশ শুধু বহনই করেননি, তার জানাজাও পড়িয়েছেন। আমিও এক কন্যার পিতা, খবরটায় প্রথমে শিউরে উঠেছিলাম। পরে দেখি দগ্ধমৃত মেয়েটা শুধু আমারই নয় সারা জাতির কন্যাপ্রতিমা হয়ে উঠেছে। অন্যায়ের বলিষ্ঠ প্রতিবাদ করে নোবেল পুরস্কার পায় মাথায় বুলেট খাওয়া মালালা ইউসুফজাই আর ‘ইসলামিক স্টেট’-এর জিহাদীদের দ্বারা না জানি কত শতবার গণধর্ষিতা নাদিয়া মুরাদ। আর অন্যায়ের বলিষ্ঠ প্রতিবাদ করে আমাদের দুর্দান্ত প্রতিবাদী এই মেয়েটি আগুনে পুড়ে মরে। ছোট্ট এক কিশোরী ক্রমাগত চিৎকার করে যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছে, দোর্দণ্ডপ্রতাপ অধ্যক্ষের মুখে মামলা ছুঁড়ে মেরেছে, বাংলাদেশে এটা চিন্তা করা যায়!

প্রচণ্ড ঝাঁকি খেয়েছে বাংলাদেশ। অনেক দিক দিয়ে জাতি এগিয়ে যাবার পরেও বিচারহীনতার ভয়ংকর দানব দেশকে গ্রাস করেছে। যাহোক, অভিযোগ তো করাই যায়, করা হচ্ছেও। কিন্তু তার চেয়ে অনেক জরুরী অনতিবিলম্বে এই হিংস্রতা বন্ধ করার পদ্ধতি বের করে প্রয়োগ করা। দুটো পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই নেয়া হয়েছে:-

(ক) সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের স্বার্থে ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুদের জবানবন্দি নেওয়ার দায়িত্ব নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

(খ) থানায় রাফি’র বুকভাঙা ভিডিও দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছে জাতি। ওই ভিডিও ধারণের জন্য ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ব্যারিষ্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। এজন্য এবং দেশের মঙ্গলের জন্য তাঁর ক্রমাগত অন্যান্য প্রচেষ্টার জন্য অজস্র অভিনন্দন।

রাফি হত্যায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেক অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতেই হবে। নাহলে সরকার, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার ওপর দেশবাসীর ইতোমধ্যেই ক্ষতবিক্ষত আস্থা চিরকালের মতো উঠে যাবে। এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য জাতি হাঁসফাঁস করছে। কবি নির্মলেন্দু গুণ অনশনের কথা বলেছেন, আইনজীবীরা ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা ক্রিমিন্যালদের পক্ষে লড়বেন না। ফেসবুকে সাইক্লোন চলছে, অভিযুক্ত ওসি’র বিচারের দাবীতে ইন্টারনেটে সিগনেচার ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। সবাই মিলে অন্যান্য প্রস্তাব ও আলোচনা করলে পথ একটা বেরিয়ে আসবেই। আমার কিছু প্রস্তাব:-

১. শিক্ষার্থী অভিভাবক সবার জন্য প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে কপি করে শিক্ষাবোর্ড ও মাদ্রাসা বোর্ডের প্রতি অনলাইন অভিযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে অপরাধপ্রবণ শিক্ষকেরা হুঁশিয়ার হতে বাধ্য হবে। এটা থাকলে রাফি’কে থানায় গিয়ে ওসি মোয়াজ্জেমের হাতে নির্যাতিতা অপমানিতা হতে হত না।

২. ওই মাদ্রাসার সামনের রাস্তার নাম রাখা হোক “নুসরাত জাহান রাফি সড়ক”। নাম-ফলকটা সবার চোখের সামনে ধরা থাকবে, আমাদের বিস্মৃতিপ্রবণ জাতিকে চিরকাল রাফি’র প্রতিবাদী আত্মদান এবং ওই ক্রিমিন্যালদের কথা মনে করিয়ে দেবে।

৩. ধর্ষণের মহামারীতে আক্রান্ত বাংলাদেশ, ভয়াবহভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে জাতির নারীরা। ধর্ষণের জন্য আলাদা ট্রাইবুনাল গঠনের দাবীতে ঢাকায় মিছিল হয়েছে। সেটা করতে হবে এবং শুধুমাত্র ধর্ষণের তদন্তের জন্য নারী-প্রধান সিভিল কমিটি গঠন করতে হবে। যেহেতু মাদ্রাসা একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান তাই কমিটিতে মানবাধিকার কর্মী, আইনবিদ, শিক্ষক ইত্যাদির সাথে একজন আলেম-ইমাম থাকতে হবে।

৪. প্রমাণিত ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, এ আইন বানিয়ে কঠোরভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে।

৫. কোন শিক্ষক কোনো ছাত্র বা ছাত্রীকে শিক্ষায়তনের ভেতরে কোনো কক্ষে একা দেখা করতে বলতে পারবেন না, এ আইন বানিয়ে কঠোরভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে। স্মর্তব্য, অধ্যক্ষ সিরাজের অফিসে ছাত্রীদেরকে একা দেখা করতে হত।

৬. ভ্রাম্যমান আদালতের আদলে নারী-প্রধান “ভ্রাম্যমান শিক্ষায়তন পরিদর্শন কমিটি” গঠন করতে হবে। মাদ্রাসা স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠান তাই এতে মানবাধিকার কর্মী, আইনবিদ, শিক্ষক ইত্যাদির সাথে একজন আলেম-ইমাম থাকতে হবে। এই কমিটি দেশের যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগে জানান না দিয়ে ঝটিকা পরিদর্শন করতে পারবে ও সদস্যেরা একত্রে যে কারো সাথে একান্তে কথা বলার ক্ষমতা রাখবেন।

৭. যেসব মাদ্রাসার বিরুদ্ধে ছাত্র-পেটানোর ও বলাৎকারের অভিযোগ আছে সেগুলোর তদন্ত ও সিসি ক্যামেরা বসানো বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৮. গণসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। মাদ্রাসায় এ ধরণের সমস্যার ওপরে শাহাদৎ রাসেল নির্মিত বাংলা শর্ট ফিল্ম “কালার অফ চাইল্ডহুড” আমেরিকার আটলান্টায় ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে “শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক শর্ট ফিল্ম” পুরস্কার পেয়েছে। এটা, এবং এরকম আরো ছোট ছোট মুভি বানিয়ে টিভিসহ যেভাবে সম্ভব ব্যাপক প্রচার করতে হবে। ভারতের চিত্রনায়ক আমির খানের মতো বাচ্চাদের নিয়ে কয়েক মিনিটের ফিল্ম বানিয়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। এতে তিনি ছবি এঁকে বাচ্চাদের বুঝিয়েছেন তাদের ওপর যৌন নির্যাতন কি এবং সেক্ষেত্রে কি করতে হবে।

৯. বিশাল দায়িত্ব আছে আলেম সমাজের। অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন কিছু ইমাম, তাঁদের ধন্যবাদ। কিন্তু আমরা তাঁদের কাছ থেকে আরো বেশী আশা করি। বহুদিন থেকেই মাদ্রাসায় শিক্ষক দ্বারা ধর্ষণ ও ছাত্র-প্রহারের খবর আসছে। আমরা দেখতে চাই তাঁরা বক্তৃতায় এর নিন্দা করা ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে বা এই বিষয়ের ওপর কমিটি বানিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাবেন, সবার সাথে কথা বলবেন। এতে ভিকটিমের শক্তি-সাহস বাড়বে, অপরাধীর মনোবল হ্রাস পাবে, প্রশাসনের ওপরে সঠিক তদন্তের চাপ সৃষ্টি হবে ও পরের সম্ভাব্য অপরাধীর প্রতিবন্ধক হবে।

সিরাজুদ্দৌলার শক্তিগুলো হল:-(১) সমাজে উচ্চ অবস্থান, (২) টাকার শক্তি (অজস্র টাকা সে আত্মসাৎ করেছে, গ্রেপ্তারের পরেই তার স্ত্রী একসাথে আঠারো লক্ষ টাকা তুলেছে ব্যাংক থেকে), (৩) থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন, (৪) ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম (৫) সরকারী কর্মকর্তা (নীচে তিন শিক্ষকের কাহিনী দেখুন), (৬) মাদ্রাসা শিক্ষক আফছার আহমেদ, (৭) ক্যাডার শামীম, জাবেদ, জোবায়ের, আহমেদ, পপি ইত্যাদি। (৮) পক্ষান্তরে, রাফি’র পরিবারের সামাজিক ও সিরাজুদ্দৌলার তুলনায় আর্থিক দুর্বলতা সুস্পষ্ট।

দেশের সর্বত্র অপরাধী-চক্রের এটাই মোটামুটি কমন টেমপ্লেট। বহু জায়গায় বহু অপরাধের ক্ষেত্রে ওপরের ১ থেকে ৮ পর্যন্ত শুধু নামগুলো বদলে দিলেই চিত্রগুলো মোটামুটি মিলে যাবে। বহু মাথা বিশিষ্ট এই প্রকাণ্ড হাইড্রা দানবের সাথে কিভাবে পেরে উঠবে সাধারণ মানুষ? জামিন পেয়ে ধর্ষক ধর্ষিতাকে আবার ধর্ষণ করে খুন করে ফেলে গেছে, এমন বীভৎস ঘটানোও তো আমরা দেখেছি।

অপরাধী অপরাধ করে। কিন্তু পুলিশ যখন অপরাধ করে এবং শিক্ষক, বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক যখন ধর্ষক হয়ে ওঠে তখন পায়ের নীচে আর মাটি থাকে না। বেরিয়ে আসছে সিরাজুদ্দৌলার অপরাধনামা। বহু বছর ধরে ছাত্রী-নির্যাতন, ছাত্র-বলাৎকার, টাকা আত্মসাৎ ইত্যাদি ক্রাইমের অপ্রতিহত ক্রিমিন্যাল সে। দুবছর আগে সাহস করে তার বিরুদ্ধে সরকারী কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে আরেক ছাত্রী-নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন ওই মাদ্রাসার তিন শিক্ষক। শেষতক এক ভুতুড়ে কাল্পনিক ঘটনার “কারণ দর্শাও” হুমকি-নোটিশের মুখে নাকে খৎ খেয়ে বুকভাঙা বেদনায় চুপ করে গেছেন তাঁরা, এখন টেলিভিশনে মুখ খুলছেন।

তিনটে ব্যাপার লক্ষ্যনীয়। এক, প্রধানমন্ত্রীকে দেশের “জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ” সবই করতে হবে কেন? তাছাড়া, কোনো এক ব্যক্তির ওপরে এতটা চাপ যে কোনো দেশের জন্য বিপজ্জনক। দুই, ক’দিনের মধ্যেই পুলিশ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পলাতক অপরাধীদের ধরেছে। অর্থাৎ সে দক্ষতা তাদের আছে। কিন্তু আগের বহু হতভাগীদের ক্ষেত্রে খুনী-ধর্ষক ধরা পড়েনি কারণ ওগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যত তর্জনী ছিল না, এক্ষেত্রে আছে। তিন, একের পর এক অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারদেরকে “ক্লোজড” বা “প্রত্যাহার” করাটা কোনো সমাধানই নয়, সমাধান হল তদন্তে অপরাধী প্রমাণিত হলে শাস্তি দেয়া। পুলিশ কর্তৃপক্ষ সেটা করলে অপরাধপ্রবণ পুলিশ অফিসারেরা সাবধান হবে এবং পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

এই মেয়েকে আমাদের দরকার ছিল। ৭৫-৮০ % অঙ্গার দেহ নিয়ে যে মেয়ে চিৎকার করতে পারে- “আমি সারা বাংলাদেশের কাছে বলবো, সারা পৃথিবীর কাছে বলবো এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য” – সেই মেয়েকে আমাদের বড়ো বেশী দরকার ছিল।

এমন মেয়ে আবার কবে আসবে কে জানে !

মাটির ভুবন পরে, মাটির ভুবন ভরে,
লাশ হয়ে আছে পড়ে, অমূল্য রতন,
নিসর্গের লক্ষ তারা, সিক্ত চোখে বাক্য হারা,
দেখে দেখে হয় সারা, নিসর্গের ধন।
রংধনু রং যত, লক্ষ ফুলের মত,
ওই মুখে শত শত, খেলা করে তার,
কোথা রাখি কোথা রাখি ! অমিয় সুখের পাখী,
বুকের পাঁজরে ঢাকি, কন্যা আমার !

হাসান মাহমুদমুসলিম রিফর্ম মুভমেন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী, শারিয়া আইনের ওপর গবেষক, লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বক্তা।

One Response -- “নুসরাত, কন্যা আমার! কতিপয় প্রস্তাব”

  1. মালবী সাংরি

    ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যুর পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে হারিয়ে যাওয়া সেই হত্যা মামলাগুলো ৷ উচ্চ আদালত থেকে বলা হয়েছে, মিতু, তনু , ত্বকী বা সাগর-রুনি’র মতো নুসরাতের মামলাটা যেন হারিয়ে না যায় ৷ নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মামলাটির বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে এক আর্জির পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার বলেন, ‘‘আমরা যতটুকু জানি যে এ মামলা পিবিআইতে ট্রান্সফার করা হয়েছে তদন্তের জন্য৷ প্রধানমন্ত্রী নিজে এটা তদারক করছেন৷ তারপরও আমরা সমভাবে ব্যথিত৷ আমরা কোনোভাবেই চাই না সাগর-রুনির মতো, মিতুর মতো, তনুর মতো, ত্বকীর মতো এ মামলাটা হারিয়ে যাক ৷” শাহদীন মালিক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রতিবছর চার হাজার হত্যাকাণ্ড হয়৷ ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে ৩৮ হাজার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে৷ কয়টা ঘটনার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ? বহু মামলাই এভাবে হারিয়ে গেছে৷ যেগুলো নিয়ে মিডিয়ায় একটু বেশি লেখালেখি হয়, সেটা আলোচিত মামলা৷ পুলিশ পারে ঘরের মধ্যে স্ত্রীকে হত্যা করল স্বামী, ভাই ভাইকে হত্যা করল, এই সব মামলার রহস্য উৎঘাটন করতে৷ যেখানে একটু কষ্ট করে অপরাধী বের করতে হয়, সেখানে আর পারে না৷ বলা হয়, জঙ্গি তৎপরতা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সফল৷ কিন্তু দেশে কত জঙ্গি ছিল? সর্বোচ্চ ৫০ জন? তাদের তো মেরেই ফেলেছে৷ আবার উলটো দিক দিয়ে দেখলে দেখবেন, পুলিশ কী করবে? একজন এসআইয়ের কাঁধে ২৫টি মামলা ৷ সে কোন মামলার তদন্ত করবে? পুলিশের তো প্রটোকল দিতেই সময় চলে যাচ্ছে৷ কয়জন পুলিশ সঠিকভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন? ”জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৮ সালে প্রথম যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা ও আইন করার দাবি উঠেছিল ৷ ওই সময় ছাত্র-শিক্ষকরা মিলে একটি নীতিমালার একটি খসড়া জমা দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে৷ এরপর বিভিন্ন সময়ে নারী নির্যাতনের ঘটনায় নানা জায়গা থেকে একই দাবি আসতে থাকে ৷ দীর্ঘ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট কর্মস্থল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য দিকনির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির তখনকার নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী৷ এরপর ২০০৯ সালের ১৪ মে বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ মাহমুদ হোসেন (বর্তমানে প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ কর্মেক্ষেত্রে ও শিক্ষাক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি দিকনির্দেশনামূলক রায় দেন ৷ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সদস্য অধ্যাপক সাদেকা হালিমও আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিথিলতার সমালোচনা করেন৷ ‘‘আদালতের আদেশ আছে, কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই তো এটা মানছে না ৷ শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলে তো উদ্যোগ নিতে পারে ৷ কিন্তু তারাও কিছু করছে না সোনাগাজীর নিহত নুসরাতের মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এখন শ্রীঘরে। তিনি ক্ষমতাসীন দলের নেতা। শুধু ওই মাদ্রাসার কেন, প্রজাতন্ত্রের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে সরকারি দলের বাইরের কারও সদস্য হওয়া অকল্পনীয়। বেসরকারি মাধ্যমিকে ম্যানেজিং কমিটি এবং উচ্চমাধ্যমিকে গভর্নিং বডি আছে। কওমি মাদ্রাসার নিয়মকানুন কী, তা স্পষ্ট নয়। অনেক কামিল-ফাজিল মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড করে দেয়, কোনো কোনো মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করে দেয়। অনেক মাদ্রাসায় কর্তৃপক্ষের দলাদলি ও মামলা-মোকদ্দমায় সরকার হস্তক্ষেপ করে এবং গঠন করে দেয় অ্যাডহক কমিটি। ২৫-৩০ বছর যাবৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মাননীয় সাংসদদের ভূমিকা একচ্ছত্র। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি গঠনের নিয়ম সরকার করে দিয়েছে। অভিভাবকদের প্রতিনিধি ৪ জন, শিক্ষকদের প্রতিনিধি ৩ জন, তার ১ জন হবেন নারী, সংরক্ষিত নারী প্রতিনিধি ১ জন, প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বা যিনি জমি দান করেছেন, তাঁর প্রতিনিধি ১ জন, এলাকার বিদ্যানুরাগী বা সমাজকর্মী ১ জন এবং প্রধান শিক্ষক পদাধিকারবলে সদস্য। এলাকার বিশিষ্ট বিদ্যানুরাগী যদি হার্ভার্ডের পিএইচডিও হন এবং উপজেলা বিরোধী দলের সংস্কৃতি সম্পাদকের চাচাতো শালীর স্বামী হন, তাঁর পক্ষে কোনো ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হওয়া অসম্ভব। তা ছাড়া, কবির ভাষায় বলতে গেলে, সবার উপরে এমপি সত্য তাহার উপরে নাই। তবে কিছুকাল আগে সরকার নিয়ম করে দিয়েছে, কোনো এমপি সর্বোচ্চ চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারবেন। যে দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিষদগুলো অকার্যকর, সেখানে ; যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি কী ভূমিকা রাখতে পারবে, তা সহজেই বোঝা যায়। শিক্ষা বা নারীর নিরাপত্তা কোনো দলীয় বিষয় নয়। সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে না পারলে অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হবে না।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—