- মতামত - https://opinion.bdnews24.com/bangla -

মমতার বিজেপি বিরোধিতার স্বরূপ

সংসদীয় রাজনীতিতে আরএসএস এর রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে প্রতিষ্ঠিত করতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এনডিএ  নামক নীতিহীন সুবিধাবাদী জোটের ভেতর দিয়ে বিজেপি অটল বিহারী বাজপেয়ী নেতৃত্বে সাড়ে ছয় বছর শাসন ক্ষমতায় ছিল। সেই শাসন ক্ষমতায় তাদের টিকে থাকতে যারা সেই সময় সব থেকে বেশি সাহায্য করেছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেস হলো তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান।
১৯৯৮ সালে লোকসভার মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় থেকেই বিজেপির সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথাগত সখ্যতা তৈরি হয়। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে যে লোকসভা নির্বাচন হয়, সেখানেও বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ নামক নীতিবিহীন, সুবিধাবাদী জোট ক্ষমতাসীন হয়। সেই জোট সরকারের রেলমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯৯ সালে ১৩ অক্টোবর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  শপথ নিয়েছিলেন। তার সঙ্গে তৃণমূলের অপর সংসদ অজিত পাঁজা কয়লা দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এই সময় কালেই আরএসএস বিজেপির পূর্ণাঙ্গ মদতে কংগ্রেসের জায়গায় পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের স্থান করে নেয় তৃণমূল কংগ্রেস ।পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি, তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরেই তাদের বিশ্বস্ত সঙ্গীকে খুঁজে পায় ।
২০০০ সালের ৩০ মে পশ্চিমবঙ্গে ৭৯ টি পৌরসভা নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি একসাথে লড়াই করে। তৃণমূল-বিজেপির সম্মিলিত প্রার্থী হিসেবেই ২০০০সালের ১২ জুলাই সুব্রত মুখার্জি কলকাতার মেয়র হন। বিজেপির মীনা দেবী পুরোহিত হন ডেপুটি মেয়র। মজার কথা হলো, এই সুব্রত মুখার্জি তখন বিধানসভায় ছিলেন কংগ্রেসের সদস্য, অথচ মেয়র হিসেবে তিনি ছিলেন তৃণমূল-বিজেপির প্রার্থী।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বিধানসভার যে নির্বাচন হয় ,সেই নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের স্বার্থে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে সাময়িকভাবে ত্যাগ করে কংগ্রেসের সঙ্গে আবার নির্বাচনী সমঝোতা করেন। সেই নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার ফিরে যান এনডিএ শিবিরে। ২০০১ সালের ২৪ অগাস্ট বিবিসি-তে হার্ডটক ইন্ডিয়া নামক একটি অনুষ্ঠানে করন থাপার-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বিজেপি হলো আমাদের স্বাভাবিক মিত্র।’
গুজরাট গণহত্যার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন এনডিএ-এ এর অন্যতম শরিক। গুজরাট গণহত্যার অব্যবহিত পরে ২০০২ সালের ১২ এপ্রিল গোয়াতে অনুষ্ঠিত বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রকাশ্যে বলেন, “মুসলিমরা যেখানে থাকেন, সেখানে তারা অন্যদের সঙ্গে বসবাস করতে পারেন না।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু সেদিন বাজপেয়ীর এই চরম নিন্দনীয় কথাবার্তার একটি ও প্রতিবাদ করেননি।
এনডিএ জোটের দুটি শরিক দল সেই সময়ে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। মমতা কিন্তু সেই দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করা তো দূরের কথা, প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বিষয়টি বিজেপি এর আভ্যন্তরীণ।২০০২ সালের ১ মে গুজরাট গণহত্যা নিয়ে লোকসভায় বিরোধীরা যে প্রস্তাব আনেন, সেই প্রস্তাবে কার্যত বাজপেয়ী সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আজকের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন তিনি বিরোধীদের সেই প্রস্তাবের সঙ্গে সহমত তো দূরের কথা, বাজপেয়ী  বা গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে একটি শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি লোকসভাতে।
গুজরাট গণহত্যায়  মুসলমানের রক্তে হাত লাল করে ২০০২ সালের ২২ ডিসেম্বর মোদি আবার সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন, তারপরই এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফুলের তোড়া পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এই বন্ধুত্ব পেয়ে তার প্রতিদান হিসেবে আরএসএস তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি পরিচালিত মন্ত্রিসভায় ২০০৩ সালের ৮ ই অক্টোবর আবার অন্তর্ভুক্ত করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এই সময় দীর্ঘদিন কোনও দপ্তর না পেয়েও মমতা বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভা ছিলেন।
উদ্বাস্তু সমস্যা ঘিরে মেরুকরণের লক্ষ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা লোক দেখানো বিজেপি বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন । কিন্তু মজার কথা হলো ২০০৩ সালে বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার, যে সরকারে একযোগে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি ছিল, সেই সরকারই  নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে আসে। সেই আইনের মাধ্যমে উদ্বাস্তুদের বিরুদ্ধে জঘন্যতম আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে আজ। বিজেপি যখন আসাম এনআরসি এর কথা বলছে বা পশ্চিমবঙ্গে তারা ক্ষমতায় এলে এনআরসি প্রয়োগের কথা বলছে , তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সব কথাবার্তা বিরোধিতা করে একটা আবেগ তৈরি করার চেষ্টা করছেন। মজার কথা হলো, ২০০৩ সালে যখন সংসদে এই আইনটি বিজেপি সরকার নিয়ে আসে, তখন কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তার দল তৃণমূল কংগ্রেস এই আইনের সমর্থক ছিল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ সিপিআই (এম) থেকে শুরু করে যাবতীয় বামপন্থি দল বা কংগ্রেসের সঙ্গেও বিজেপির মূল চালিকাশক্তি আরএসএস এর যোগসাজশের অভিযোগ তুলছেন। অথচ এই আরএসএস এর  রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে থাকাকালীনই ২০০৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে আরএসএস তাদের মুখপাত্র পাঞ্চজন্য সম্পাদক তরুণ বিজয়ের সম্পাদিত ‘কমিউনিস্ট টেররিজম’ নামক গ্রন্থের অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানান। মমতা সঙ্ঘের সেই অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেন- ‘কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াইতে আমি আপনাদের পাশে আছি । যদি আপনারা আমায় এক পারসেন্ট সাহায্য করেন, আমরা কমিউনিস্টদের তাড়াতে পারবো ।’
আরএসএস এর এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংঘের বর্তমান সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত মদন দাস দেবী এইচ ভি শেষাদ্রী  এর মতো শীর্ষস্থানীয় নেতারা। সংঘের এইসব নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে মমতা সেদিন বলেছিলেন, “আপনারাই হলেন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনারা দেশকে ভালোবাসেন। বিজেপির রাজ্যসভার  সাংসদ বালবির পুঞ্জ ওই সভাতেই বলেছিলেন, “আমাদের প্রিয় মমতা দিদি হলেন সাক্ষাৎ দুর্গা।” ( দি টেলিগ্রাফ,১৬ ই সেপ্টেম্বর,২০০৩)।
মমতা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের অব্যবহিত পরে ২০১৩ সালের ৪ অগাস্ট সংঘ পরিবারের পক্ষ থেকে মমতার সংঘ সম্পর্কে প্রশস্তির কথা জানানো হয়েছিল। এই বাজপেয়ী সরকারের সহযোগী হিসেবেই বিজেপির সাহায্য নিয়ে ২০০৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠিত পঞ্চায়েত ভোটে ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার অব্যবহিত পরেই ২০১১ সালের ১৪ মে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির মমতার স্তুতিবাচক একটি উত্তর সম্পাদকীয় । সেই লেখাটির শিরোনাম ছিল- প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে দিন
আনন্দবাজার পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদকের অনুরোধে মমতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে নরেন্দ্র মোদি সেদিন লিখেছিলেন, “আদরণীয় মমতাবেন, প্রথমেই আপনাকে আমার অভিনন্দন। আপনার কাছে আমার গগনচুম্বী প্রত্যাশা। কিন্তু প্রথমেই বলি ,আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কথাটা বললাম ,আপনি একজন দৃঢ়চেতা মুখ্যমন্ত্রী। আপনার বুদ্ধিমত্তার উপর আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা । কিন্তু প্রশাসনিক কঠোরতা খুব আবশ্যক। এই কঠোরতা শুরুতেই আপনার কাছ থেকে প্রত্যাশা করি।”
আরএসএস এর বাংলা মুখপাত্র’ স্বস্তিকা-র ২০১২ সালে ২৩ মে সংখ্যায় ‘দুঃশাসনের অবসান’  শীর্ষক এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “অবশেষে দুঃশাসনের অবসান। ৩৪ বছর ধরিয়া বাংলার বুকের উপর ফ্যাসিবাদের জগদ্দল পাথর চাপিয়া বসিয়াছিল। রাজ্যের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ সেই পাথর ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিতে সক্ষম হইয়াছে। আলিমুদ্দিনওয়ালাদের যে ধরাশায়ী করা সম্ভব, ইহা লইয়া অনেকের সন্দেহ ছিল। যদিও কমিউনিস্টরা বিজেপিকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী নয়,পয়লা নম্বর শত্রু বলে মনে করে। ইহা স্বীকার করিতেই হইবে,পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী সরকারের অত্যাচারের প্রতিবাদে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারই নেতৃত্বে তৃণমূল জোটের এই বিরাট জয়।”
বিগত ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের আগেও বিজেপি-তৃণমূলের বোঝাপড়ার একটা স্পষ্ট আভাস ছিল। তৃণমূল সাংসদ অম্বিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের মে মাসে হাওড়াতে যে উপনির্বাচন হয়, সেখানে বিজেপি নিজেদের প্রার্থীর নামে দেওয়াল লেখা পর্যন্ত শুরু করে দিয়েছিল। একদম শেষবেলাতে ওই ভোটে তৃণমূলকে সুবিধা করে দিতে বিজেপি তাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।
গত লোকসভা নির্বাচনের অব্যবহিত আগে ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজ্যের বাজেট পেশের দিন  মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় যে বক্তব্য দেন, সেখানে তিনি প্রচ্ছন্নভাবে বিজেপির প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই  মাসের  ৫ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডের এক জনসভায় বিজেপির তৎকালীন সভাপতি রাজনাথ সিং রাজ্যের ঋণের সুদ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি যে সহমর্মিতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। বিধানসভার ভিতর রাজনাথের সেই সুরেই সুর মিলিয়ে ছিলেন মমতা। সেদিন বিধানসভায় মমতা বলেছিলেন, “ইউপিএ সরকার বিদায় নিক। নতুন সরকার আসবে, তখন কথা বলে ঋণ কাঠামোর পুনর্গঠন করা হবে। যাতে কোনও টাকা না নিয়ে যাওয়া হয় দেখব।”
মমতা সেদিন বলেছিলেন, “কেন্দ্রের নতুন সরকার সুদ মকুব করার পর তিন বছর সময় পাব। তারপর অল উইল বি গোল্ড। স্বর্ণযুগের বাংলা ফিরিয়ে আনব।”
আসলে মমতার যে তথাকথিত ফেডারেল ফ্রন্টের ‘সোনার পাথরবাটি’র তত্ত্ব, সেই তত্ত্বের অবতারণা কার্যত সেদিনই তিনি করে রেখেছিলেন । সেবার লোকসভা ভোট শেষ হওয়ার অব্যবহিত পরেই ২০১৪ সালের ১২ জুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন; ৩৫ বছরের বাম অপশাসন থেকে রাজ্যকে বের করে আনতে কি পরিশ্রমই না করেছেন মমতাজী।
 এরপর থেকে মোদি এবং মমতার মধ্যে একান্ত আলাপচারিতা কার্যত একটি রুটিনমাফিক ব্যাপারে পরিণত হয় ।২০১৫ সালের ১০ মার্চ দিল্লিতে তাদের প্রথম একান্ত বৈঠক হয়। সেই বছরই ৯ মে প্রধানমন্ত্রীর কলকাতা সফরকালে নজরুল মঞ্চের গ্রিনরুমে ৪০ মিনিটের উপর একান্ত আলাপচারিতা চালান মোদি মমতা। সেদিন রাতে রাজভবনেও তাদের মধ্যে একান্ত আলাপচারিতা হয়। সারদা তদন্ত নিয়ে তখন দারুণ চাপের মধ্যে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই অবস্থায় সে বছরই ২৮ ডিসেম্বর দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন মমতা। এরপর যা অতীতে পশ্চিমবঙ্গে কোনওদিন হয়নি, তাই করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৫  সালের ২৩ জুন আরএসএস এর পূর্বের রাজনৈতিক সংগঠন, ভারতের জনসঙ্ঘের বর্তমান রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির তাত্ত্বিক ভিত্তির অন্যতম নির্মাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ৬৩তম মৃত্যু দিবস মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের উদ্যোগে সরকারিভাবে প্রথম এ রাজ্যে পালিত হয় ।
এরপরই বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ ২৭ জুলাই (২০১৫) প্রকাশ্যে দলীয় কর্মীদের সভায় বলেন,  ২০১৬ এর  বিধানসভা নয়, ২০১৯  এর লোকসভা নির্বাচনই বিজেপির লক্ষ্য। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক-মুহূর্তে আরএসএস কিভাবে তৃণমূল কংগ্রেস কে সাহায্য করেছে-  তা আজ আর কারো অজানা নয়। সেই নির্বাচনে কার্যত আরএসএস এর সাহায্যে তৃণমূল কংগ্রেসের পুনরায় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ফিরে আসবার পর, সংঘের মুখপাত্র ‘স্বস্তিকা’ র প্রচ্ছদ নিবন্ধের শিরোনাম ছিল- কমিউনিজমের শোক যাত্রায় শাপমুক্তি বাংলার । ওই নিবন্ধে লেখা হয়েছিল, “তৃণমূলের এই জয় সম্ভব হয়েছে স্রেফ জাতীয়তাবাদী ভোটের ফলে। জাতীয়তাবাদী ভোটাররা অনেক ক্ষেত্রে দেখেছেন, যেসব জায়গায় বিজেপি দুর্বল, জেতার সম্ভাবনা ক্ষীণ, সেখানে ঢেলে তারা তৃণমূলের পক্ষে গিয়েছেন। ঠিক যেমনটি হয়েছিল গত বিধানসভা নির্বাচনে।”
২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে যে কমবেশি ১০০টি কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসকে প্রকাশ্যে সাহায্য করেছে বিজেপির মস্তিষ্ক আরএসএস, তা কলকাতায় এসে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ্যে বলে গিয়েছিলেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেত্রী উমা ভারতী। গত বিধানসভা নির্বাচনের অব্যবহিত আগে ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর কলকাতা সায়েন্স সিটি প্রেক্ষাগৃহে আরএসএস এর একটি সাংগঠনিক সভা হয়। সেই সভায় সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত প্রকাশ্যে বলেন, “তারা পশ্চিমবঙ্গে এমন কিছু করতে পারেন না যাতে কমিউনিস্টদের সুবিধা হয় বা কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় ফিরে আসার কোনও রকম সুযোগ পায়।”
আমরা দেখেছি তার পরেও ২০১৭ সালে মনিপুরের বিধানসভা নির্বাচনে সে রাজ্যে বিজেপিকে সরকার গড়তে তৃণমূল কংগ্রেসের একমাত্র বিধায়ক খোলাখুলি সমর্থন জানিয়েছিলেন। সেই বিধায়ক সংবাদমাধ্যমের কাছে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে, দলের নির্দেশেই তিনি এই সমর্থন জানিয়েছেন। আজ পর্যন্ত সেই বিধায়ককে কিন্তু দল থেকে কোনও রকম বহিষ্কার তৃণমূল কংগ্রেস করেনি।
১ Comment (Open | Close)

১ Comment To "মমতার বিজেপি বিরোধিতার স্বরূপ"

#১ Comment By মাসানুর রহমান On এপ্রিল ২৬, ২০১৯ @ ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

ভারতের উত্তর প্রদেশের বিজেপি নেতা রঞ্জিত বাহাদুর শ্রীবাস্তব লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার উত্তর প্রদেশের বারাবাঁকিতে বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মনোবল ভেঙে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেজন্য আপনারা যদি মুসলিমদের ধ্বংস করতে চান তাহলে নরেন্দ্র মোদীকে ভোট দিন। দেশভাগের পর থেকে ভারতে মুসলিমদের জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। এবার ভোটদানের মাধ্যমে তারা এই দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাচ্ছে। এখনই না আটকানো গেলে তারা একদিন তাতে সফল হবে।’ ‘গোলওয়ালকর, হেডগেওয়ারের বইগুলো পড়লে বোঝা যাবে তাতে স্পষ্ট লেখা আছে যে মুসলিম, কমিউনিস্ট, খ্রিস্টান তারা জাতির অংশ নয় এবং তাদের ধ্বংসের কথা অনেক আগেই বলা হয়েছে। এটা হয়তো তারা এখন নতুন ভাষায় বলছে। চীন থেকে ব্লেড নিয়ে এসে দাড়ি কাটা হবে, ধর্মান্তরিত করা হবে, এগুলো হচ্ছে নতুন ভাষা। যদি ধর্মান্তরিত করাই হয় তাহলে তাদেরকে হিন্দু ধর্মের কোথায় ঠাই দেওয়া হবে? ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ, শূদ্র না অতি শূদ্র কোন স্তরে তাদেরকে স্থান দেওয়া হবে?’
বিদ্বেষ অনেক আগে থেকেই ছিল। মেনকা গান্ধীও সম্প্রতি বলেছেন। আসলে ভারতের গণতন্ত্র জিউস-ইসরাইলি মডেলের এথনিক ডেমোক্রেসির দিকে ঝুঁকছে। যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে গণতন্ত্র থাকবে কিন্তু সেই গণতন্ত্রে একটা বিশেষ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক কোনও প্রক্রিয়ায় রাখা হবে না।
এখানে নির্বাচন হবে, ভোট হবে, ক্ষমতা হস্তান্তরও হবে কিন্তু ওদেরকে বাদ দিয়ে সব হবে। যার ফলে এটা এক ধরণের নেহাতই ইসরাইলের জিউস মডেল অব ডেমোক্রেসি। এখানে এই মডেলে মুসলিম সম্প্রদায়কে, হয়তো বা খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে খুব পদ্ধতিগতভাবে জাতি গঠনের প্রক্রিয়া থেকে বাইরে বের করে দেয়া হবে। মুসলিমদের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। বেনাগরিক করার কথা বলা হয়েছে। যার ফলে এটা দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্প। বিজেপি নেতা-মন্ত্রীরা এই যেসব কথা বলছেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু আমরা অবাক এজন্যই হচ্ছি যে, এসব বিতর্কিত ও আপত্তিকর মন্তব্যের প্রতিবাদের জন্য তথাকথিত সেক্যুলার মূলধারার কোনও রাজনৈতিক দল অন্য ভাষায় কথা বলছে না। তারাও কিন্তু কমবেশি একই ভাষায় একই ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে। বিজেপি এসব কথা বলবে এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু তথাকথিত সেক্যুলার বিভিন্ন দলের প্রতিক্রিয়া আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বিক্ষিপ্ত দু`একটা প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও সম্মিলিত কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। এসব ইস্যুতে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া পেলে এই দেশটার এভাবে এত অল্প সময়ের মধ্যে এতটা অধঃপতন হতো না’ । ————— যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল মাতিন