- মতামত - https://opinion.bdnews24.com/bangla -

প্রাক-প্রাথমিক: বাংলাদেশে শিশুর স্বর্গ কি অসম্ভব?

সম্প্রতি প্রাক-প্রাথমিক দুই বছর করার এবং প্রাথমিকের প্রথম তিনটি শ্রেণি থেকে পরীক্ষা তুলে নেওয়ার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণায় শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন হাওয়ার প্রবেশ মনে হচ্ছে। একটু নতুনত্ব বটে, তবে তা যথেষ্ট কি?

এ নিয়ে কিশোর সাহিত্যিক জাফর ইকবাল অবশ্য বলছেন, হুট করে নয়, প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পেছনে শিক্ষাবিদদের চিন্তা ও গবেষণা রয়েছে। তবে তার লেখাটি পড়ে অনুভব করলাম-শিক্ষাবিদরা ‘শিশুদের কী কী পাঠ্য হবে’ এরই মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছেন-খেলার প্রসঙ্গ আলগোছে অনেক পরে সামান্য বাক্যে উল্লেখ করেছেন তিনি।

স্কুলের বাচ্চাদের এত পরীক্ষা নিয়ে হাহুতাশ করা মধ্যবিত্ত পরীক্ষা তুলে নেওয়ায় শেষমেশ কতটা আহ্লাদিত হবে আমার সন্দেহ আছে। কারণ ৯৯ ভাগ বাঙালিই স্কুল-কোচিং-বাড়ির কাজের বাইরে শিক্ষা ব্যবস্থায় আর কিছু থাকতে পারে তা মনে করেন না। যেদেশে স্কুল পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য বই পড়াকে বিরূপ চোখে দেখা হয়, সেদেশে বই ছেড়ে অন্য কিছু করার কথা বললে তেড়েফুড়ে আসাই স্বাভাবিক। আর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আরেক কাঠি সরেস-তারা  অসীম কিছু বানাবার তাড়নায় সন্তানকে পেষণ করে চলেছেন। কারণ- এ লড়াই বাঁচার লড়াই, মরে গেলেও এ লড়াইয়ে জিততেই হবে। দরকার পড়লে সন্তানের গলায় পাড়া দিয়ে পড়াবে।

প্রায়ই শিশুগৃহকর্মীরা খবর হয়- তাদের উপর নিষ্ঠুর নির্মম নিপীড়ণের ঘটনায়। কিন্তু বাপ-মা শিক্ষার নামে শিশুদের নির্যাতন করছেন কিনা তা নিয়ে কখনো জোরালো প্রশ্ন জাগে কি? কতটা ভয়াবহ মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে শিশুরা বড় হচ্ছে মেপে দেখা হয় না কখনো। সবটাই আড়াল হয়ে যায় আপন সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নামক এক মহৎ উদ্যোগের তলে। দেশে দেশে এই যে এত এত খুন খারাবি হচ্ছে- যারা করছেন তাদের কাছে তাদের কাজকেও মহৎ উদ্দেশ্যে বলেই মনে হয়।

জন্মের পর থেকেই শুরু হয় খবরদারি, শিশুকে শেখাতেই হবে, নয় তো জীবনযুদ্ধে হেরে যাবে। আমাদের এই শিক্ষিত করে তোলার ধারণার অন্ধত্বে পেয়ে বসেছে। তাই অতটুকুন শিশুদেরও আদতে কোনও স্বাধীনতা নাই। তারা মা-বাপের দাস মাত্র। অবাক হচ্ছেন? গ্রিসের প্রাচীন দার্শনিকদের পাণ্ডিত্য আজও আমাদের বিস্মিত করে, কিন্তু দাসদের দাসত্ব তাদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল দেখে আমাদেরই অবাক লাগে। অভিভাবকের কাছে শিশুর দাসত্বের ব্যাপারটাও তেমনই-শিশুদের নিরঙ্কুষ আনুগত্যই স্বাভাবিক ব্যাপার। বাপ-মাকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত পুলিশ কন্যা ঐশীর কথা মনে আছে? সে সময় ঐশীর বিরুদ্ধে গণমাধ্যম ও সমাজ তীব্র ঘৃণায় ফেটে পড়েছিল এ কারণে নয় যে সে জোড়া খুন করেছে, খুন খারাবি তো প্রতিদিনের ঘটনা- কেউ না কেউ কাউকে না কাউকে হত্যা করছে। বাপ-মাকে হত্যা করাই প্রধানত তার বিরুদ্ধে উন্মত্তের মতো ওই খেপে ওঠার কারণ। কেননা আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- বাপ-মায়ের প্রতি শিশুর আনুগত্যে এতটুকুন শৈথিল্য অগ্রণযোগ্য। আবার দেখুন, কন্যার প্রেমের খবর জানলে এই সেদিনও অভিভাবকের মাথায় রক্ত চড়ে যেত, আজও যায় কি? অনার কিলিং হয়তো বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য হবে না, কিন্তু আপত্তির ভিত্তি একই- অভিভাবকের প্রতি আনুগত্যর অভাব। আমরা ভাবতেই পারি না বাপ-মায়ের ‘কল্যাণ বোধের’ বাইরে শিশুদের কোনও ভাবনা-ইচ্ছা-আগ্রহ থাকতে পারে। সন্তান-অভিভাবকের দাস-মালিক সম্পর্ক আমাদের চেতনায় এমনই মজ্জাগত।

গবেষকরা দেখেছেন, দৈহিক ও মানসিক বিকাশে এবং জগতে বেঁচে থাকার শিক্ষা প্রচলিত শিক্ষাদানের পদ্ধতির বদলে শিশুরা অন্যভাবেই বরং ভালভাবে অর্জন করতে পারে। এ নিয়ে নৃবিজ্ঞানী-সমাজবিজ্ঞানী-মনোবিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ অনেক গবেষণাই আছে। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? বড় বিপদে না পড়লে চিন্তাশীল-বুদ্ধিমান এই মানুষেরও তো প্রচলিত নিয়মের অনুকরণ প্রিয়। চাইলেই এসব ধারণা প্রয়োগ খুব সহজ নয়। প্রতিষ্ঠিত ছকের বাইরে পা ফেলা ঝুঁকিপূর্ণ।

যদিও প্রতি নিয়ত প্রতিটি ঘরে চোখে পড়ে-শিশুরা এই বোঝা মানতে চায় না, তাদের মানতে বাধ্য করতে হয়। যে কারণে অর্পিত শিক্ষাদানের গুরু দায়িত্ব পালনে অনেক শিক্ষকই শাস্তিদানের ক্ষমতা চান। বাড়িতে সন্তানকে অভিভাবকরা কি শাস্তি দেন না? দেন তো।

মূল প্রশ্ন হচ্ছে- জগতে লড়াই করে বেঁচে থাকার কৌশল শেখায় শিশুরা কি অনাগ্রহী? ইতিহাস তা অবশ্য বলছে না। কিন্তু তাদের শেখার ধরন ভিন্ন, স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থায় যার কোন গুরুত্ব নাই। কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার আগে শিকারি জীবন যাপন করত মানুষ। তখন কোনও স্কুল কলেজ ছিল না। সে সময় শিকারি মানব সন্তান কীভাবে বেঁচে থাকার শিক্ষাটি অর্জন করত তার ধারণা দিয়েছেন নৃবিজ্ঞানীরা। সভ্যতার ছোঁয়ার বাইরে বর্তমানকাল পর্যন্ত টিকে থাকা বিশ্বের কয়েকটি নৃগোষ্ঠীর উপর চালানো গবেষণায় সে সব ধরা পড়েছে।

ভেবে নেওয়া ঠিক নয়, সে সময় শিকারি জীবনে বেঁচে থাকার জন্য সামান্য কিছু জানলেই চলত। এত এত তরু-লতা-বৃক্ষ-প্রাণীর নানান বিষয় খুব ভালভাবে না জানলে বেঁচে থাকাই কঠিন ছিল তখন। শিকারি সমাজের শিশুরা বড়দের কাজের অনুকরণে নানান খেলা বানিয়ে তাতে মেতে থাকত। এই খেলাগুলোই তাদের শিক্ষার পাঠ ছিল। তারা মিছিমিছি ঘর বানাত, পুরো আবাসটাই বানিয়ে ফেলত। বাস্তব জীবনে বড়রা যা করত তারই অনুকরণে চলত তাদের খেলা। তারা শুধু ঘর সামাল দেওয়াই নয়, শিকার শিকার খেলাও খেলত। এর ভেতর দিয়ে তারা শিখতে থাকত বাস্তব জীবনের বাঁচার কৌশল। তাদের এসব খেলার সাথে মানুষের নিকট প্রজাতির প্রাণীদের আচরণেও মিল পেয়েছেন গবেষকরা। তারা দেখেছেন, ওইসব প্রাণীর বাচ্চাও বড়দের আচরণের অনুকরণে খেলে। এসব খেলায় বড় বা শক্তিশালী যে সে কখনোই তার শক্তি খাটায় না। শিশুরা যেমন ‘ঢিশুম’ বলে ঘুষি মারে, আমরা বড়রা ‘আহা’ বলে আহত হয়ে পড়ে যাবার ভান করি, তেমন আরকি।

আমাদের ছেলেবেলার কথা কি কিছু মনে পড়ে? আমরাও তো খেলতাম। বা শিশুদেরও তো খেলতে দেখি। মিছিমিছি হাড়ি-পাতিলে রান্নাবাড়িই শুধু করে না, কল্পনার সবটুকু ব্যবহার করে শিশুরা কত সামান্য কিছুকে কত অসামান্য কিছু ভেবে মেতে থাকে। বড়দের কাছে যা পরিত্যক্ত, ফেলে দিতে চায়, শিশুদের কাছে তার গুরুত্ব অসীম হতে পারে। বড়রা জানতেই পারে না শিশুটির কাছে কী বিশাল ভূমিকা ওই সামান্য  জিনিসটার।

আমরা এও দেখি খেলায় শিশুদের কোনও ক্লান্তি নেই-যত ক্লান্তি বড়দের তৈরি করা নিয়ম মেনে শেখার সময়। পড়তে বসলেই চোখে রাজ্যের ঘুম- আর যেই না খেলার অনুমতি মেলে অথবা ডিভাইস হাতে পায়, অমনি তার মতো সজাগ দুনিয়াতে আর একটিও নাই। শিশুদের এই ইচ্ছাশক্তির সাথে আমরা সবাই পরিচিত কিন্তু কখনোই শিশুর শিক্ষায় এর ভূমিকা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না।

শিশুদের এই খেলার সাথে বড়রা আজকাল যেগুলোকে খেলা বলে তার কিছু পার্থক্য আছে। শিশুরা জেতার লক্ষ্য নিয়ে খেলে না। খেলার নিয়ম তারা নিজেরাই বানায়। কিছু খেলা তারা একা একা খেলে, আবার কিছু আছে-সামাজিক খেলা। সামাজিক খেলা মানে একের অধিক শিশু যখন এক সাথে কোন খেলা খেলে সেটা। এই সব খেলার নিয়ম যেমন তারা নিজেরাই তৈরি করে, তেমনিই নিয়মগুলো মনে রাখার চেষ্টাও করে।

অনুমেয় যে বিশ্বব্যাপী চেয়ার টেবিল বই খাতা ভিত্তিক পড়াশোনার পদ্ধতি চাইলেই বাতিল করা যাবে না। তাই আমরা বেছে নিতে পারি অন্তত প্রাক প্রাথমিককে। এই বয়সটায় ধর্ম-বিজ্ঞান-দর্শন শিক্ষার বালাই নেই। আর ইতিহাসে যত লেখাপড়া-শিক্ষাদীক্ষা রয়েছে তা মূলত এই বয়স পর্বটি পার করার পরের ব্যাপার।

আমার মনে পড়ে, আমার শিশু শ্রেণি নামক প্রাক-প্রাথমিক ক্লাসটিও পরবর্তী সব ক্লাসের মতোই চেয়ার-টেবিলে বসে শিক্ষকের শিক্ষাদান ছিল। ইন্টার্নেট ঘেঁটে একটা ছবি পেলাম যেখানে শিশুরা কার্পেটের উপর গোল হয়ে বসে পড়াশোনা করছে। মানে দেশে প্রাক প্রাথমিকে একটু পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু তাদের ক্লাস রুটিনটি আছে দেখলাম। আর পড়াশোনা যে শিক্ষক কেন্দ্রিক রয়ে গেছে সেটাও চোখ এড়ালো না।

অন্য কথায় যাবার আগে একটি তথ্য দিই। কলোম্বিয়ায় গ্রামের স্কুলের শিশুরা পড়ালেখায় ভাল করার কারণ খতিয়ে দেখতে গিয়ে ধরা পড়ে- গ্রামের স্কুলে শিশুরা শিক্ষকের পাঠদান ভিত্তিক পদ্ধতিতে ক্লাস করে না। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টি শিখে থাকে। শিক্ষক তাদের সহায়ক হিসেবে কাজ করেন মাত্র-শিক্ষক ক্লাসরুমের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন। Escuela Nueva  নামক এই ব্যবস্থা যে ফলদায়ক তা নিশ্চিত করছে ইউনেস্কো। এখন ব্রাজিল, ভারত, ফিলিপাইনসহ ১৭টি দেশে এটার প্রায়োগিক পরীক্ষা চলছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে বক্তৃতায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর শেখার কৌশল হিসেবে বক্তৃতার চাইতে আলোচনাকে প্রাধান্য দেবার পেছনে একই কারণ নিহিত।

কলোম্বিয়ায় প্রাক-প্রাথমিকে শিশুরা এক বছর বয়স থেকেই যায়। কিছুটা লিখতে পড়তে শিখলে প্রাথমিক স্কুলে যায়। এলাকার মায়েরাও এসব কেন্দ্রে বাচ্চাদের দেখাশোনা করে থাকে-নিজেরটিসহ প্রতিবেশীদের সন্তানদেরও।

বাংলাদেশেও প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তির বয়স সীমা না রাখাই ভাল- সেটা এক হোক, দুই হোক বা তিন বছর। আর এতে কোন শ্রেণি ভেদ রাখারও দরকার পড়ে না। ছোট-বড় সবাই মিলেমিশে খেলাধুলা করবে আর তার মধ্য দিয়ে শিখবে। বরং বড়দের কাছ থেকে ছোটরা খেলতে খেলতে অনেক কিছু শিখে যাবে। কোনও নির্দিষ্ট ক্লাস বা রুটিন থাকবে না। আসা বা চলে যাওয়ার সময় নির্ধারণেরও দরকার নাই, সকাল থেকে সন্ধ্যা অবদি খোলা থাক। আসা যাওয়া ঠিক করুক অভিভাবকের সুবিধা মতো। নাওয়া খাওয়ার ব্যবস্থা যদি স্কুল করতে না পারে তার ব্যবস্থা কী হবে তা শিক্ষক ও  অভিভাবকরা নিজেরাই সমাধান বার করুক।

যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক স্কুল নামে এক ধরণের স্কুল ষাট দশক থেকে চালু হয়েছে। সেখানেও এমনই ব্যবস্থা-শিক্ষার্থীরা নিজের ইচ্ছা মতো শেখে। ওখানে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা স্নাতক হয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে ব্যবস্থাটি কেজো-বাচ্চাগুলো উচ্ছন্নে যায়নি।

শিকারি সমাজ থেকে পাওয়া শিশুদের শেখার কৌশল থেকে শুরু করে এসব পদ্ধতির ধারনাগুলো মিলিয়ে প্রাক প্রাথমিক স্কুলগুলো গড়ে তোলা যেতে পারে। শিকারি সমাজে শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের কৌশল নিয়ে আলোচনা হলেও তাতে শিশুর প্রতি ঝুঁকি বড় করে বিবেচনায় ধরা হয়নি। এখনকার অভিভাবকরা শিশুর নিরাপত্তা ও ঝুঁকি নিয়ে অতিমাত্রায় সচেতন। জাপানে যদিও শিশুদের ঝুঁকি নিতে শেখানো হয়, কিন্তু বাঙালি বাবা-মায়ের তাতে কিছু যায় আসবে না। ফলে শিশুর এই স্বাধীনতায় যেন ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে থাকে তার দাবী উঠবেই।

সামান্য একটা লাঠিই হতে পারে শিশুর দারুণ খেলার জিনিস-আসলে হয়ও তাই। তারপরও দারুণ দারুণ খেলনার প্রতি শিশুর আকর্ষণ কম নয়। তিন/চার বছর বয়সে আমি অন্য এক শিশুকে এমন এক খেলনা নিয়ে খেলতে দেখেছি যে দৃশ্য আজও মনে আছে। অমন খেলনা যে আমার ছিল না, সেটাই মনে দাগ কেটে গেছে। প্রাক-প্রাথমিক হয়ে উঠুক খেলনার ঘর, শত শত হাজার হাজার খেলনা থাকুক।

দেশে কর্মজীবী নারীর সন্তানদের কথা ভেবেই এখনও ‘দিবাযত্ন কেন্দ্র’ গড়ার কথা ভাবা হয়। স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য বেসরকারি উদ্যোগে কিছু কিছু গড়ে উঠেছে। আবার মিরপুরে বস্তির সন্তানদের জন্য এমন এক দিবাযত্ন কেন্দ্র দেখলাম, কিন্তু এই কেন্দ্র বলতে ঘর-যেখানে অনেকগুলো বাচ্চা। প্রাক-প্রাথমিকগুলো যেন শুধু এমন বদ্ধ ঘর না হয়, বিশাল না হোক কিছু খোলা স্থানও যেন থাকে।

আমরা লক্ষ্য করছি না যে গৃহস্থ নারীর সন্তানের জন্যও ‘দিবাযত্ন কেন্দ্র’ দরকার। যদি পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনাই দেখি, তাহলে বুঝব এর প্রয়োজনীয়তা। দেশে বছরে ১৫ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। ঘরের পাশেই ডোবাতে এসব দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। আর দেশে মোট শিশু মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই ঘটে এইভাবে জলে ডুবে। মায়েরা সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকায় সন্তানদের লক্ষ্য রাখা সম্ভব হয় না, তাই এমন ঘটনা ঘটে। ফলে যে কোনও বয়সীর জন্য প্রাক-প্রাথমিক উন্মুক্ত থাকলে এসব মায়েদেরও সন্তানরা ঝুঁকি মুক্ত হবে। এতে শিশু মৃত্যুর হার রাতারাতি কমিয়ে ফেলা সম্ভব বলেই মনে হয়।

শুধু তাই কেন, আজকাল শিশুরা মোবাইল বা এমন ডিভাইস নিয়ে মেতে থাকছে বলে সবাইকে খেদ করতে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সন্তানকে এক জায়গায় বসিয়ে ব্যস্ত রাখতে এসব ডিভাইস হাতে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন মায়েরাই সে কথা কিন্তু আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য প্রাক প্রাথমিক গড়ে তুললে এই সমস্যারও সমাধান হতে পারে।

পণ্ডিতজনেরা জাদুঘর বানাবার, পাঠাগার বানাবার গুরুত্ব বোঝেন কিন্তু কখনো পাড়ায় পাড়ায় খেলার ঘর বানানোর কথা বলেন না। উন্মুক্ত স্থান বুজে আসা শহরে শিশুদের খেলার জন্য মাঠের কথা বলেন বটে, তবে তা শুধুই শিশুর অবসর সময় কাটাবার জন্য। খেলাধুলায় শরীর গঠন হয় এতটুকুই সাধারণে সমর্থন পায়। কিন্তু খেলাই যে শিশুর শিক্ষায় জরুরি সে ধারণা গড়ে ওঠেনি। তাই অন্তত এসব ধারণার ভিত্তিতে প্রাক-প্রাথমিক স্কুল গড়ে এর সুফল জনগণের সামনে তুলে ধরা আবশ্যক।

১ Comment (Open | Close)

১ Comment To "প্রাক-প্রাথমিক: বাংলাদেশে শিশুর স্বর্গ কি অসম্ভব?"

#১ Comment By সরকার জাবেদ ইকবাল On এপ্রিল ২৬, ২০১৯ @ ৪:৩৭ অপরাহ্ণ

সুলেখক মুজতবা হাকিমকে আন্তরিক ধন্যবাদ বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য। প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ বা early childhood development-এর প্রথম কথাই হলো – শিশুরা খেলার মাধ্যমে শেখে। কথাটি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা বেশ কঠিন। কেননা, বড়দের কাছে খেলা মানে অযথা সময় নষ্ট। আর, শিশুদের কাছে খেলাই হলো কাজ। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে শিশুরা খেলার মাধ্যমে বিভিন্ন ধারণা যেমন আকার, আকৃতি, রং, হালকা-ভারি, লম্বা-খাটো, সরু-মোটা, মসৃণ-খসখসে, ইত্যাদি ধারণা অর্জন করে থাকে। তাছাড়া, শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য রক্ষা করার নানা কৌশলসহ বিভিন্ন রকম সুক্ষ্মপেশী (Fine motor) এবং স্থুলপেশীর (Gross motor) দক্ষতা শিখে থাকে। এই শেখাগুলোই পরবর্তী সময়ে শিশুর একাডেমিক লার্নিং-এর ভীত মজবুত করে আর লাইফ স্কিলস লার্নিংকে এগিয়ে রাখে। বিষয়টি অনুধাবন করার; বুঝিয়ে বলার নয়।

একটি স্মৃতিচারণ করছি, – প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার মহতি লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে নাসিরনগরের কুণ্ডা গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় (‘ঘরে খেলে শিখি’/Home Based Early Learning Opportunity/HBELO) চালু করলাম। ছোট শিশুরা লেখাপড়া করার সুযোগ পাবে – এই ভেবে মায়েরা হৃষ্টচিত্তে তাদের সন্তানদেরকে কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু, যখন দেখতে পেলেন শিশুরা নানা রকম খেলনা নিয়ে শুধুই খেলছে তখন তারা রেগেমেগে তাদের সন্তানদেরকে টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন, আর, গজগজ করেছিলেন, ‘তোমরা আমরার পোলাপান নষ্ট করতে আইছো?’ সেই প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি তৃপ্ত।