দীর্ঘ ৪ বছরের তদন্ত প্রক্রিয়া এবং অভিযোগ পরিক্ষণের পর গত ১৫ এপ্রিল ঘোষিত হয় আমার বাবা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম শফিউল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের রায়। ইতোমধ্যে আমরা সবাই জানি চাঞ্চল্যকর এই হত্যামামলায় অভিযুক্ত ১১জন আসামীর মধ্যে ৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৮ জনকে মুক্তি দিয়েছে আদালত।

একটি অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় তদন্তে উঠে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে। এরকম একটি হত্যামামলায় আদালত সাধারণত প্রমাণ, আলামত, সাক্ষ্য ইত্যাদি পর্যালোচনার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নিরীক্ষণ করে। পাশাপাশি ঘটনার উদ্দেশ্য তুলে আনা একটি মামলার পর্যালোচনার অন্যতম বিষয়। সেদিক থেকে রায়ে কয়জনের ফাঁসি হলো আর কয়জনকে যাবজ্জীবন দেওয়া হলো তা মুখ্য নয়। বিচারের আরেকটি মানে দাঁড়ায় সত্য উদঘাটন।

ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রথম থেকেই মনে হয়েছে এই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া এই হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য প্রতিপাদনে ব্যর্থ হয়েছে।

যেখানে রায় নিয়ে আমার কোনও প্রত্যাশাই ছিল না, সেখানে আমার সন্তুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা সমীচীন হবে না। আমি জানি না এ রায়ে সুবিচার হলো, নাকি অবিচার। কিন্তু তদন্তের এই ব্যর্থতার কিছুটা প্রতিফলন এই রায়ে স্পষ্ট হয়েছে বলে আমার অভিমত।

যে ৮ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে, অভিযোগপত্রে তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু বিচারে তাদের মুক্তির অন্যতম কারণ হতে পারে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাব।

এখানে রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এন্তাজুল হক বাবুর বিবৃতির উপর কিছুটা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। উনি বলেছেন- যুক্তি-তর্কের সময় আসামীপক্ষের আইনজীবীর উপস্থাপনা শক্তিশালী হলে যে ৩ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে তাও হতো না। এই বিবৃতি দ্বারা তদন্তের ত্রুটি সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ করা যায়। পাশাপাশি তিনি সাক্ষীদের অস্বীকারকেও বড় করে দেখেছেন।

তদন্তের সুষ্ঠুতা নিয়ে এর পূর্বেও আমি বহুবার আমার অসন্তোষ প্রকাশ করেছি। যেহেতু এই মামলার রায় হয়ে গিয়েছে এবং বিচারকার্যকে ব্যাহত করার আর কোনও সম্ভাবনা নেই তাই এই মামলার তদন্ত, সাক্ষী, অভিযোগ ইত্যাদি নিয়ে যথাসম্ভব নির্মোহ এবং বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো এই লেখায়। অবশ্য তদন্ত প্রতিবেদনে তথ্যের যে পরিমাণ অসংলগ্নতা লক্ষ্য করা যায় তার সবটুকু এই স্বল্পপরিসরে তুলে আনা সম্ভব হবে কিনা আমি জানি না। তবে আমি যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবো তাতেই আমার সংশয়ের কারণগুলো স্পষ্ট হবে বলে আমি আশা করি।

২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বরে আমার বাবা, অধ্যাপক এ কে এম শফিউল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে আনুমানিক দুপুর আড়াইটা নাগাদ কতিপয় দুর্বৃত্তের হামলার শিকার হন। প্রথমে তার গতিরোধ করে ধারালো অস্ত্র দ্বারা তার মাথার ডান পাশে, কানের মাঝামাঝি, ডান কাঁধে, মাথার পেছনে এবং মাথার বাম পার্শ্বে আঘাত করা হয়। যেহেতু তার হাতে কিংবা শরীরের নীচের দিকে আঘাতের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি তাই বোঝা যায় আত্মরক্ষার কোনও সুযোগ তার ছিল না। যেহেতু আত্মরক্ষার কোনও সুযোগ ছিল না, তাই বলা যায় তার উপর অতর্কিত হামলা হয় এবং খুব তাড়াতাড়ি কাজটা হয়ে যায়। আর মানুষের শরীরের অন্যান্য অংশের আকার বড় হওয়ায় অন্য জায়গার তুলনায় মাথা এবং কাঁধের কাছাকাছি স্থানগুলোতে আঘাত করা অনেক কঠিন। সুতরাং এত কম সময়ে মাথা ও কাঁধে এরকম আঘাতে আততায়ীর দক্ষতা সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ করা যায়।

 

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আততায়ীর আঘাতে রক্তাক্ত অবস্থায় মটরসাইকেলসহই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারান অধ্যাপক শফিউল। ঘটনাটি ঘটে আমাদের ভাড়া বাসার উত্তরে অবস্থিত মো. মতিউর রহমানের বাসার ঠিক পাশেই।

ওই সময় আক্রান্ত অধ্যাপকের গোঙ্গানিতে মতিউর রহমানের কন্যা ফারহানা রহমান রেশমি জানালার পাশে এসে দেখেন তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে রয়েছেন। এরপর তার এবং তার মা এর চিৎকারে আশেপাশের লোকজন সেখানে উপস্থিত হয়ে অধ্যাপক শফিউলকে অটোরিক্সায় করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। মাঝপথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি তাকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে গেলে বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিট নাগাদ তাকে মৃত ঘোষণা করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ইতোমধেই রাজশাহী মহানগর পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করে দেয় এবং ঘটনার পরদিনই অর্থাৎ ১৬ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তৎকালীন প্রশাসনের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এন্তাজুল হক বাদী হয়ে মামলা করেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হিসাব শাখার সেকশন অফিসার এবং দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী রা বি ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি আব্দুস সামাদ পিন্টুর স্ত্রী নাসরীন আখতার রেশমার সাথে ‘অসৌজন্যমূলক আচরণের’ জের ধরে, ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানো জন্যই এই হত্যাকাণ্ডের যে অভিযোগ, তা প্রথম উত্থাপন করে র‍্যাব। তাদের বর্ণনা অনুযায়ী রেশমা এই হত্যাকাণ্ডের প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত তার কোনও সন্ধান পায়নি।

মজার ব্যাপার, ২৩ নভেম্বরে, যেদিন র‍্যাবের প্রধান কার্যালয়ে এই ঘটনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সেদিনই টেলিভিশনে নাসরীন আখতারের একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয় যেখানে তিনি বলেন, তিনি মৃত অধ্যাপককে চিনতেনই না। তার হত্যাকাণ্ডের দিন টেলিভিশনে প্রথম তাকে দেখেন।

যে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবে আসে তা হচ্ছে- সুযোগ থাকা সত্ত্বেও র‍্যাবের বর্ণনা অনুযায়ী এই ঘটনার নিউক্লিয়াস নাসরীন আখতারকে তৎক্ষণাৎ কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি? রেলওয়ে কলোনি ক্যাম্প, সিপিএসসি, র‍্যাব-৫ এর কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক (ডিএডি) মো. মতিউর রহমানের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ২২ নভেম্বর, ২০১৪ তারিখে টহল ডিউটি চলাকালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এবং গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এই মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী আব্দুস সামাদ পিন্টুকে ২৩ তারিখ দিবাগত রাত ২টা ৪০ মিনিটে তার নিজ বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পিন্টুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ওইদিনই রাত সাড়ে ৩টা নাগাদ অন্যান্য আসামীদের আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সুতরাং আশা করা যায় ওইদিনই র‍্যাব পিন্টুর কাছ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের যাবতীয় তথ্য পেয়ে যায়। সেটা হয়ে থাকলে নাসরীন আখতার রেশমার জড়িত থাকার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনের আগেই তাদের জানার কথা।

অন্যদিকে সংবাদকর্মীরা যদি রেশমার অবস্থান জানতে পারে তাহলে তার অবস্থান র‍্যাবেরও অজানা থাকার কথা নয়। ঘটনা যেহেতু তাকে কেন্দ্র করেই ঘটেছে তাই অন্তত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হলেও তো তাকে ওইদিনই আটক করা উচিত ছিল। তাহলে কি ইচ্ছাকৃতভাবেই রেশমাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি?

এবার আসা যাক পিন্টুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অন্যান্য আসামীদের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে। মামলার তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, ২৩ নভেম্বর রাত ৩টা ৩০ মিনিটের দিকে মতিহার থানাধীন কাপাশিয়া পালপাড়া ঢালান থেকে ৩০০ গজ দক্ষিণে পালপাড়া দিঘির উত্তর পাশে সাক্ষী মো. রাসেল উদ্দিন ও মো. সিফাত আহমেদের উপস্থিতিতে মো. সোবহান মৃধার আমবাগান হতে আরিফুল ইসলাম মানিক, সিরাজুল ইসলাম কালুকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই সময় মানিকের ডান হাতে থাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাগের ভেতর একটি চাপাতি ও একটি বড় ছোরা পাওয়া যায় এবং সবুজ শেখের ডান হাতে থাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাগের মধ্য থেকে একটি চাইনিজ কুড়াল, একটি চাপাতি ও একটি বড় ছোরা উদ্ধার করে র‍্যাব।

অন্যদিকে মামলার ২১নং সাক্ষী মো. রাসেল উদ্দিন এবং ২২নং সাক্ষী মো. সিফাত আহমেদের জবানবন্দী থেকে জানা যায়, এই অভিযান ২২ নভেম্বর দিবাগত রাতে পরিচালিত হয়। আর র‍্যাব কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও শরিফুল ইসলাম দাবি করেছেন, ২৩ নভেম্বর অভিযানটি পরিচালিত হয়েছে। আবার র‍্যাবের এই দুই কর্মকর্তা জবানবন্দিতে বলেছেন ওই রাতে তারা আমবাগান থেকে ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন। অথচ সাক্ষী রাসেল এবং সাক্ষী সিফাত তাদের জবানবন্দিতে বলেছেন র‍্যাব ২ জনকে গ্রেপ্তার করে।

আমি মানছি তারিখ ভুল হতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে যখন এই দুইজন সাক্ষী হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর ১৭ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে দেওয়া তাদের জবানবন্দিতে কার কোন্ হাতে কী কী অস্ত্র ছিল তা ঠিকমত মনে রেখে বলতে পারলেন, কিন্তু রক্ত মাংসে গড়া তৃতীয় আসামী সিরাজুল ইসলাম কালুকে কিভাবে ভুলে গেলেন?

আদৌতে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছিল কি? নাকি জবানবন্দি লিপিবদ্ধকারী তদন্ত কর্মকর্তা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন কালুর কথা?

তাছাড়া হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক সপ্তাহ পর আসামী আরিফুল ইসলাম মানিক ও সবুজ শেখ রাত ৩ টা ৩০মিনিটে তৃতীয় এক ব্যক্তির আমবাগানে পলিথিনের ভেতর অস্ত্র নিয়ে কি র‍্যাবের অভিযানের জন্য অপেক্ষা করছিলেন?

এই মামলায় জবানবন্দি লিপিবদ্ধ নিয়ে আর একটি গল্প রয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলের কাছেই জঙ্গলের ভেতর থেকে পুলিশ ‘সাধন’ নাম খোদাইকৃত একটি চাপাতি উদ্ধার করে। পরবর্তীতে অনুসন্ধান করে জানা যায় এই চাপাতি প্রস্তুতকারী শ্রী সাধন চন্দ্র কর্মকার এসব অস্ত্র তৈরি করেন এবং তা বিক্রি করেন বগুড়া ৩নং রেলগেটে অবস্থিত ‘মা স্টোর’ নামক দোকানের ব্যবসায়ী শ্রী অমল কুমার মোহন্ত। শ্রী অমল ২৫ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে তার জবানবন্দিতে জানান, নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে লম্বা-ফর্সা চেহারার এক ব্যক্তি তার কাছ থেকে ‘সাধন’ নামাঙ্কিত এই চাপাতিটি কেনেন। চাপাতিটির দাম ছিল ৩০০ টাকা। আর এর ভিত্তিতেই অভিযোগপত্রে উঠে আসলো শ্রী অমল যে চেহারা এবং দৈহিক গড়নের বর্ণনা দিয়েছেন তার সাথে গ্রেপ্তারকৃত আসামী মো. আরিফুল ইসলাম মানিকের মিল রয়েছে। অবশ্য ওইটা যে মানিকই এরকম জোর দিয়ে কিছু বলা হয়নি।

কিন্তু আমি নিজে বগুড়ায় শ্রী অমল কুমার মোহন্ত এর দোকান নিয়ে খোঁজ করেছি। ব্যবসার অবস্থা ভাল না থাকায় তিনি এখন ফলের ব্যবসা করছেন। তবে ২০১৪ সালে তিনি লোহার এসব সরঞ্জামেরই ব্যবসা করতেন। আমি তাকে নভেম্বরের প্রথম দিকে এরকম চাপাতি আর বিক্রি হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, এরকম চাপাতি তার শত-শত বিক্রি হয়েছে। সুতরাং বিশেষ একটা চাপাতির ক্রেতার কথা তার মনে রাখাটা খুবই অস্বাভাবিক।

এরপর তাকে এই হত্যামামলায় তার জবানবন্দিতে বলা লম্বা-ফর্সা লোকের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায় ঠিকই কিন্তু তিনি পুলিশকে এরকম কোনও তথ্য দেননি। যৌক্তিকভাবে এরকম একজন ব্যবসায়ী যিনি দিনে এরকম চাপাতি কয়েকটা বিক্রি করতেন তিনি নভেম্বরের শেষের দিকে নির্দিষ্ট একটি চাপাতি দেখেই বলে দিতে পারার কথা না যে, ওই মাসের প্রথম দিকে ওই চাপাতি ক্রেতার চেহারা কেমন ছিল।

তাহলে লম্বা-ফর্সা গড়নের লোকটি কি পুলিশের কল্পিত চরিত্র?

এবার আসা যাক প্রত্যক্ষদর্শীর প্রসঙ্গে। তদন্ত প্রতিবেদন আনুযায়ী, ফারহানা রহমান রেশমী দুজনকে পালাতে দেখেন যাদের একজনের পরনে ছিল নেভি ব্লু ও সাদা রঙের স্ট্রাইপড হাফ হাতা গেঞ্জি এবং জিন্সের প্যান্ট এবং অন্য জনের পরনে ছিল ছাই রঙের গেঞ্জি ও জিন্সের প্যান্ট।

মামলার ১৫ নং সাক্ষী মো. মাহবুবুল আলম তনু এবং ১৬ নং সাক্ষী মো. মোস্তাক আহমেদদের জবানবন্দি অনুযায়ী ‘১৪ সালের ২৪ নভেম্বরে তাদের উপস্থিতিতে আসামী মো. আল মামুনের নিজ বাড়িতে তল্লাশির সময় আসামীর শয়নকক্ষে খাটের নিচে লুকানো পলিথিনের ভেতর থেকে পুরনো নেভি ব্লু ও সাদা স্ট্রাইপড গেঞ্জি এবং পুরনো জিন্সের প্যান্ট পাওয়া যায়।

মামলার ২৩ নং সাক্ষী মো. খলিলুর রহমান এবং ২৪ নং সাক্ষী মো. মনিরুল ইসলামদের জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই একই দিনে তাদের উপস্থিতিতে আসামী ইব্রাহিম খলিল বাবুর বাড়িতে তল্লাশির সময় তার শয়ন কক্ষে খাটের নিচ থেকে পলিথিনে লুকানো অবস্থায় ছাই রঙের হাফ হাতা গেঞ্জি ও একটি জিন্সের প্যান্ট পাওয়া যায়। এই ৪টি আলামত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রত্যক্ষদর্শী ফারহানার বর্ণনার সাথে মিলে যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আসামী আল মামুন এবং আসামী ইব্রাহিম খলিল বাবু দু’জনই কেন খুনের পর এই পোশাকগুলো নিজের খাটেরই নিচে এক সপ্তাহ ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন? মজার ব্যাপার এইসব আলামত দেখানোর পরেও কিন্তু তারা বেকসুর খালাস পেয়ে গিয়েছেন। অর্থাৎ এদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেননি তদন্তকারী কর্মকর্তা। তাছাড়া ফারহানাও কারও চেহারা সনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

নাকি পোশাকের পুরো ব্যাপারটাই সাজানো ছিল?

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিহত অধ্যাপক শফিউল ইসলামের বাড়িতে যাওয়ার পথ। মহাসড়ক থেকে এই কাঁচা পথ ধরে ২০০ গজ এগোলেই তার বাড়ি।

আমার মনে এই প্রশ্নটা আসার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। ২০১৬ সালে আমি নিজে একবার মো. মতিউরের বাড়িতে যাই এই ব্যাপারে জানার জন্য। সেসময় রেশমীর সাক্ষাৎ না পেলেও মতিউরের সাথে এই ব্যাপারে আমার কথা হয়। মতিউর জানান তার মেয়ে ফারহানা দু’জনকে দেখেন যার মধ্যে লুঙ্গি পরা একজন মধ্য বয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন। প্রথমে আমি এই তথ্যকে মিথ্যা হিসাবে ধরে নিলেও এর উপস্থিতি মামলার ডকেটে দেখতে পাই। অর্থাৎ তথ্যটি মিথ্যা নয়। কিন্তু পার্থক্য এটাই, ডকেটে বলা আছে আমাদের তৎকালীন প্রতিবেশী ও আমার বাবার সহকর্মী মো. নাজমুল হকের স্ত্রী সুমনা আক্তার ঘটনাস্থলের ৪/৫ গজ পশ্চিমে জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় লুঙ্গি পরা আনুমানিক ৩০ বৎসরের শ্রমজীবী শ্রেণির একজনকে দেখেন।

সুমনা আক্তার আমার বাবার তত্ত্বাবধায়নেই গবেষণা করেছেন। এই খুনের ঘটনাটি ঘটার সময় তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএসে অবস্থান করছিলেন বলে আমি নিশ্চিত করেছি। আর ফেসবুকে জঙ্গি সংগঠনের পোস্টে নাজমুল হকের নাম থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং আমার অনুরোধেই একদিন পরে ওই বাসা ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে ওঠেন। পাশাপাশি আমি এটিও নিশ্চিত করেছি সুমনা আক্তারের সাথে মতিউর বা তার বাড়ির কারও কখনো সাক্ষাৎ হয়নি যে সে সুমনার কাছে এই তথ্য পাবেন। ফলে ফারহানাও লুঙ্গি পরা ওই ব্যক্তিকে দেখেছেন বলে আমার ধারণা।

সেটা যেই দেখে থাকুক, এরকম একটা তথ্য থাকার পরেও কেন এই বিষয়টির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়নি? হতেও তো পারে এই ব্যক্তিই এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।

২৩ নভেম্বর, ২০১৪ তে ঢাকায় র‍্যাব হেডকোয়ার্টারে এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলনের পর  প্রত্যেক আসামীকে একান্তে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল আমাকে। জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষে চোখ বাঁধা অবস্থায় একজন একজন করে আসামীকে আমার সামনে আনা হয়। সেসময় ওই কক্ষে পলাশ নামে র‍্যাবের এক কর্মকর্তাও আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঘরে একটি ভিডিও ক্যামেরাও ছিল।

ওই জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুস সামাদ পিন্টু আমাকে জানায়, মমতাজউদ্দিন কলাভবনে বাবার চেম্বারের সামনে রঙ করার সময় তিনি আমার বাবাকে ‘চেম্বারের ভেতর খাটে’ একজন ছাত্রীর সাথে অসামাজিক কাজে লিপ্ত অবস্থায় দেখেন। ওইসময় উনি প্রতিবাদ করলে আমার বাবা তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে তিনি এই বিষয়ে তার রাজনৈতিক গুরু আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বলকে জানালে তারা দলবদ্ধ হয়ে আমার বাবার সাথে দেখা করতে গেলে সেদিনও আমার বাবা তাদেরকে তাড়িয়ে দেন। এরপর তারা আমার বাবাকে শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তবে পিন্টুর ভাষ্যমতে তাদের হত্যার পরিকল্পনা ছিল না। সবুজ শেখ কুপিয়ে দিয়েছিল আমার বাবাকে।

বলাই বাহুল্য, উপরের তথ্যটিও মিথ্যা। আমি পিন্টুর কাছে আমার বাবার চেম্বারের অবস্থান জানতে চাই। উনি বলেন মমতাজউদ্দিনের দোতলায়। আমার বাবার চেম্বার ছিল মমতাজউদ্দিন কলাভবনের নিচতলায়, যেখানে তিনি ২০১০ এর পর থেকে বসেননি। সেখানে বসতো তার সহকর্মী মো. নাজমুল হক, ড. আবু রাসেল রিপন এবং শফিকুল ইসলাম জোয়ার্দার। এমনকি তার কাছে এই চেম্বারের চাবিও ছিল না। বাবা বসতেন মমতাজউদ্দিনের চতুর্থ তলায় প্রজেক্ট অফিসে। বাইরে থেকে এই প্রজেক্ট অফিসের ভেতরে দেখতে পাওয়া কোনভাবেই সম্ভব না কারণ অভ্যর্থনা কক্ষের পর একটি সাধারণ অফিস ঘর পেরিয়ে কাঁচের পার্টিশন দেওয়া সংরক্ষিত চেম্বারে বাবা বসতেন। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি এই প্রজেক্ট অফিসের বাইরের করিডোরেও পিন্টু রঙের কাজ করেননি।

আসামী আরিফুল ইসলাম মানিককে জিজ্ঞাসাবাদকালে তিনি জানান, তিনি আমার বাবাকে চিনতেনও না। আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বলের নির্দেশেই তিনি কাজটি করেন। তবে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা তাদের ছিল না।

এবার ফেসবুকে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করা জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ ২’ কে নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা প্রয়োজন বলে আমার মনে হয়। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ এই সংগঠনটি নিয়ে গভীর তদন্ত চালালেও পরবর্তীতে এরকম কোনও সংগঠনের অস্তিত্ব নেই বলে নিশ্চিত করে র‌্যাব এবং পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। তাছাড়া এই পেজের সাথে জড়িতদের এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততা নেই বলে তারা জানান। কিন্তু মামলার ডকেটে বলা আছে, এ সংগঠনের কর্মীরা এর পূর্বেও ঢাকায় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে বলে জানা যায়।

তাছাড়া বগুড়া জেলার বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করে এর সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে মো. শরিফুল ইসলাম, মো. রায়হানুল ইসলাম স্বাধীনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই পেজের মূল হোতা আব্দুর রহিম সরকারকে গ্রেপ্তার করতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।

চার্জশিটে যাদের ছেড়ে দেওয়া হয় তাদেরও নাম উল্লেখ থাকে। কিন্তু এই আসামীদের নামের উল্লেখ নেই কেন?

ডকেটে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এই হত্যাকাণ্ড সংঘটনের পর পালানোর সময় আততায়ীদের একজনের মোবাইল ফোন পড়ে যায় তখন দলের অন্যরা তাকে বলে ফোনটি খুঁজে বের করতে নয়তো সবাই ধরা পড়ে যাবে। পুলিশ নিশ্চিত করেছিল ওই ব্যক্তিটি আসামী আরিফুল ইসলাম। এই আরিফুল ইসলাম এই হত্যামামলার চার্জশিটভুক্ত আসামী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে সেও বেকসুর খালাস পেয়ে গেছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে এতটা নিশ্চিত থাকা সত্বেও তা কেন হলো? তাহলে কি মোটিভ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অভাব রয়েছে?

এবার একটু সাক্ষী প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন উথাপনের প্রয়োজন। তদন্ত প্রতিবেদনের বর্ণনায় দেখা যায়, নাসরীন আখতার রেশমার সাথে আমার বাবা ‘অসৌজন্যমূলক আচরণ’ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পুলিশের কাছে নাসরীনের জবানবন্দিতে দেখা যায়, মমতাজউদ্দিন কলাভবনেই এই ঘটনাটি ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন এবং হিসাবের দায়িত্ব ছিল সেকশন অফিসার নাসরীন আখতার রেশমার উপর। আমার বাবার বেতন সংক্রান্ত কোনও কাজও তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। সুতরাং তার মমতাজউদ্দিনে আসার কোনও কারণ আমি দেখি না। আর সেটি যদি হয়েও থাকে তাহলে কলাভবন থেকে কেন কোনও সাক্ষী নেই? আর যদি প্রশাসন ভবনের মত জনবহুল জায়গায় এই ব্যাপারটি ঘটে তাহলে তো সাক্ষীর অভাব থাকার কথা নয়। অভিযোগপত্রে কেন সেখানকারও কোন সাক্ষী নেই?

নাসরীন তার স্বামী পিন্টুকে এই ব্যাপার জানালে পিন্টুর আমার বাবা অধ্যাপক এ কে এম শফিউল ইসলামের সাথে মমতাজউদ্দিন কলাভবনেই বাকবিতণ্ডা হয়। মমতাজউদ্দিন কলাভবনে কেন সেই ঘটনারও কোন সাক্ষী নেই? পরবর্তীতে আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল ও তার দলের সাথে আমার বাবার মমতাজউদ্দিন কলাভবনের সামনে যে বাকবিতণ্ডা হয় সেটিরও কেন কোনও সাক্ষী নেই? এই ঘটনার সাক্ষ্য দিতে পারে এমন কাউকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জনবহুল জায়গা থেকে পাওয়া গেল না?

এরকম একটি ঘটনা ঘটার পর একজন অধ্যাপকের সম্মানহানি করা সবচেয়ে সহজ ছিল। তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা যেত। প্রয়োজনে তার চাকরিও চলে যেতে পারত। সেটা না করে রাজনীতি করা এই আসামীরা কেন হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নিল?

এই প্রশ্নটা আমি বহুবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ডিবি এবং র‍্যাবের কর্মকর্তাদের করেছি। তাদের প্রত্যেকেরই উত্তর ছিল এই হত্যাকাণ্ডটি তো অনিচ্ছাকৃত এবং অপরিকল্পিত। ধারালো অস্ত্র দ্বারা মাথার পেছনে এভাবে পাঁচ-পাঁচটা কোপ দেওয়ার পরও কি বলা যায় এটি অপরিকল্পিত ছিল?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটি, তা হলো, চার্জশিটে এত-এত সাক্ষী রাখা হলো অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে নাসরীন আখতারের সাথে দ্বন্দ্বের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার উত্থাপন করলো যে, বাহিনী সেই র‍্যাব এর তদন্তকারী কর্মকর্তার বা এই মামলার আসামী সনাক্তকরণে যাদের ভূমিকা ছিল তাদের মধ্যে কাউকে কেন মামলার সাক্ষী করা হলো না?

তাছাড়া চার্জশিটে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের উপর অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও এর পটভূমির উপর একদমই গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কিভাবে খুন করা হলো, কে কখন, কোথায় অবস্থান করছিলো, আসামীকে কিভাবে আটক করা হলো, সেসময় কে কে সাক্ষী ছিল ইত্যাদি অনেকরকমের খুঁটিনাটি তথ্য থাকলেও অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডের মূল বিষয় ‘অসৌজন্যমূলক আচরণ’ এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ তুলে আনা হয়নি। ‘অসৌজন্যমূলক আচরণ’ অনেকরকমের হতে পারে। একজন আর একজনকে কোন বিষয়ে অপমান করলেও তা অসৌজন্যমূলক আচরণ, আবার তাকে মারধর করলেও তা অসৌজন্যমূলক আচরণের মধেই পড়ে। আবার সম্পর্কভেদে অসৌজন্যমূলক আচরণ এক-একরকম হয়।

এটাই কি অভিযোগের ভিত্তিহীনতা তুলে ধরে না?

ধরে নিলাম অধ্যাপক এ কে এম শফিউল ইসলাম নাসরীন আখতারকে যৌনপ্রস্তাব দিয়েছিলেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির কোনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নেই। শিক্ষকরা ক্ষমতাশালী হওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে অনেকসময় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকলেও লোকমুখে তার চর্চা হয়ে থাকে। অধ্যাপক এ কে এম শফিউল ইসলামের বিরুদ্ধে জনশ্রুতিতেও হয়রানিমূলক কোনও বিষয় কখনো আসেনি। তারপরেও যদি প্রস্তাব দিয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে তাদের পরিচয় এবং সাক্ষাতের বিস্তারিত তথ্য অভিযোগপত্রে উঠে আসেনি কেন?

অভিযোগপত্র শুধু বলছে এই ‘অসৌজন্যমূলক আচরণের’ জের ধরেই একটা ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো। হাজার হাজার তথ্যে ভরা এই চার্জশিটে খুনের মতো একটা ঘটনা ঘটলো ঠিক যে কারণে সেটারই কোন গভীর বিশ্লেষণ নেই! অভিযোগপত্রে এই ঘটনার কোন সাক্ষীও দেখাতে পারেনি।

আসামী অন্য কোনও স্বার্থে বা কাউকে বাঁচাতে খুনের দায় নিজের উপর নিচ্ছে কিনা সেটাও তো নির্ণয় করা দরকার ছিল।

ফলে চার্জশিটের এমন অস্পষ্ট বর্ণনা কোন শক্তিশালী মোটিভ দেখাতে পারে না যার জন্য একজন মানুষ আর একজন মানুষকে খুন করতে পারে। এছাড়াও এতে আরও অনেক অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়।

আবার পুলিশ প্রথম দিকে কেন র‍্যাবের এই ভাষ্যকে উড়িয়ে দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেছিলো? তাদের কাছে এমন কোন্ তথ্যের ভিত্তিতে তারা এতটা নিশ্চয়তার সাথে এই দাবী করেছিল? সেই দাবীও হঠাৎ কেন উড়ে গেল?

উপরে যেসব তথ্য এবং প্রশ্ন তুলে ধরেছি, আমি আশা করি, তাতেই পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে তদন্ত নিয়ে সংশয় কেন প্রকাশ করি।

এরকম ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের পরে আসলে বলা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় কে খুনি আর কে নয়। খুনের কারণ স্পষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও হয়তো যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারাই আমার বাবার খুনি।

কিন্তু এই আসামীরা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত না হয়ে থাকলে আসল খুনি কে?

শুধু আমার বাবার স্বেচ্ছাচারী এবং ছন্নছাড়া জীবনকে পুঁজি করে কোন মহলের নির্দেশে এবং কেন এই হত্যামামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হলো?

সেই মহল কি এতটাই ক্ষমতাশালী?

নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে এই মামলা?

নাকি শুধু মাত্র রাজনৈতিক অন্তর্কলহতে আমার বাবার হত্যাকাণ্ডের এই মামলাকে ব্যবহার করা হয়েছে?

সেক্ষেত্রে আসল খুনি এখনো আমাদের আশেপাশে বিচরণ করছে। তাহলে রাষ্ট্র কি চায় না একজন বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক?

এই প্রশ্নগুলোর জবাব মেলেনি বলেই নারাজি দেইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছিলাম এই ব্যাপারে, তাও পাইনি। হয়তো একদিন মিলবে সকল প্রশ্নের জবাব। সেদিনের অপেক্ষায় বেঁচে থাকবো।

সৌমিন শাহ্‌রিদআলোকচিত্রী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।

Responses -- “অধ্যাপক শফিউল হত্যার তদন্ত: আমার সংশয় ও কিছু প্রশ্ন”

  1. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান

    খুব ছোট্ট বয়সে মা হারানোর পর বাবাকে (আমার শ্রদ্ধেয় স্যারকে) হারিয়ে তোমার ভালো থাকার কথা নয়। অবর্ণনীয় কষ্ট নিয়েই জীবনের বাকীটা পথ এভাবে বাবা হারানো সন্তানদের বয়ে বেড়াতে হয়। পৃথিবীর আদালতে ন্যায়বিচার সবটুকু না পেলেও, আল্লাহর আদালতে সবটুকু পাবে-সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। জেভিন, তোমাকে পড়ানোর ছলে সঙ্গ দিতে গিয়ে একদিন বলেছিলাম-“নামায পড়ে তোমার আম্মুর জন্য দোয়া কর”! কিন্তু কখনো ভাবিনি, এত দ্রুত তোমাকে বলতে হবে-“নামায পড়ে তোমার বাবা’র জন্য দোয়া কর”। ভালো থেকো বাবা জেভিন! তোমার জন্য অনেক ভালোবাসা ও দোয়া। (বাবু আংকেল, সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র, রাবি, বর্তমানে চীনে পিএইচডি গবেষণারত; anisrahaman01@gmail.com)

    Reply
  2. ইউসুফ আলী

    সক্রেটিসের উদ্দেশ্যে বিচারকরা বললেন : ‘যদি আপনি কথা বলা সম্পূণরূপে বন্ধ করেন তবে আমরা আপনাকে ক্ষমা করে দিতে পারি। আপনি যা সত্য বলে ভাবেন, সেসব আপনাকে যাদের মাঝে বসবাস করতে হবে তারা সত্য বলে মনে করেন না। আপনার সত্য তাদের অসন্তুষ্ট করে তুলছে। আপনি যদি এ ব্যাপারে কথা দেন, তবে আমরা আপনাকে বিশ্বাস করি। আমরা জানি আপনি কথা দিয়ে কথা রাখেন। যদি আপনি পুনরায় কথা না বলার ওয়াদা করেন এবং নীরব থাকার ব্যাপারে সম্মতি দেন, তবে আপনি আপনার জীবন রক্ষা করতে পারেন।’ সক্রেটিস বললেন ‘সত্য বলার জন্যই আমার জীবনধারণ। অস্তিত্ব আমায় জীবন দিয়েছে সত্যের অভিজ্ঞতা লাভের জন্য। অন্ধকারে সত্য হাতড়ে বেড়ানো মানুষদে, মাঝে সত্যের বাণীকে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে জীবনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতাবোধের বহিঃপ্রকাশ। যদি আমাকে কথা বলতে না দেয়া হয়, তবে আমি বেঁচে থাকার কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছি না। আমার জীবন এবং সত্যের বাণী সমার্থক। আপনারা আমায় ভ্রষ্ট করার চেষ্টা করবেন না। যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে আমি বলেই যাবো’ বিচারকেরা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাদের একজন বলে উঠলেন, ‘আপনি একজন কঠিন ও জেদি ব্যক্তি ব্যতীত কিছুই নন।’ সক্রেটিস বললেন, ‘আমি কঠিন নই। কঠিন হচ্ছে সত্য। কঠিন হচ্ছে নৈতিকতা। সত্য আপস করতে জানে না। আমি ক্ষুদ্র একটি জীবনের জন্য আপস করতে পারি না। চিরতরে অবদমিত হবার চেয়ে আমার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়। ইতোমধ্যেই বার্ধক্যের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। যে কোনোভাবেই মৃত্যু আমার কাছে আসবে। বরং এভাবে মৃত্যুকে গ্রহণ করাই অধিকতর সুন্দর, কারণ এতে করে মৃত্যুও অর্থবহ হয়ে উঠবে। আপনাদের শর্ত মতে আমি মৃত্যুকে গ্রহণ করছি যাতে এটি স্পষ্ট হয় যে, তুচ্ছ মৃত্যু আমাকে সত্য বলা হতে বিরত রাখতে পারেনি।’

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—