প্রকৃতিবন্দনায় সময়টা কাটিয়ে দিতে পারলে বেশ হতো। চৈত্রের শেষসপ্তাহে যখন বৈশাখের আগমনী গানে-সুরে অবগাহনের প্রস্তুতির কথা ছিল তখন এক লহমায় মনটা ভারী হয়ে গেল। বজ্রপাত কিংবা আগাম কালবোশেখির তাণ্ডব কিংবা দেশের কোথাও শিলাবৃষ্টির কারণে প্রাণ ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতিজনিত প্রভাবে নয় এ মানুষ থেকে উদ্ভূত মানবসৃষ্ট দুর্বিপাকে। ফেনীর নুসরাত নামের মেয়েটি মারা গেছে। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে মৃত্যুর কাছেই পরাজিত হতে হয়েছে। মরে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছিল সে; প্রাণান্ত চেষ্টায় প্রাণ বাঁচাতে চেয়েছিল। চিকিৎসকেরাও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে; নুসরাত মারা গেছেন, চিকিৎসকরা হেরে গেছেন, অগণন মানুষের প্রার্থনা আর প্রত্যাশা অপূরণ থেকে গেছে। তার মৃত্যু বিষাদের কালবোশেখি হয়ে হানা দিয়েছে আমাদের মাঝে, চোখে জল এনেছে, প্রতিবাদে প্রতিবিধান চাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রতিবাদ কতখানি কাজে লাগছে-লাগবে এনিয়ে আছে প্রশ্ন!

নুসরাত; কৈশোরত্তীর্ণ এক মাদ্রাসাপড়ুয়া ছাত্রী। উচ্ছল কৈশোরে পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাঁধ পড়েছিল তার আগেই, সেই বাঁধ লৌকিকতার অন্তরালে থাকা ভাববাদী ধারণার যা চাপিয়ে দেওয়া পারিবারিক বলয় থেকে। সেই বাঁধের যুক্তি পারলৌকিক মুক্তির অভীপ্সা যেখানে সামান্যতম দায় ছিল না তার। পরিবার তাকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছে। ওখানে কথিত আর প্রচারিত ধর্মীয় আবহে নিরাপত্তার কথা ছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত ধর্ম আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আশ্রয়ে থাকা নিরাপত্তার প্রসঙ্গ যে অসাড়- সে প্রমাণ হলো, এবং আরও একবার। আফসোস, এজন্যে তাকে মূল্য দিতে হয়েছে জীবন দিয়েই। আফসোস, এই সমাজ এটাতারপরেও বিশ্বাসে নেবে না; এ সমাজ তবু মানবে না ধর্মীয় শিক্ষাগ্রহণ আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কারও নিরাপত্তা দিতে পারেনা। নিরাপত্তা মানবিক মানুষের দ্বারাই সম্ভব; আর মানবিক মানুষ হতে ধর্মীয় শিক্ষা অত্যাবশ্যক নয়।

নুসরাত লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যে নারী। নারীর লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটছে হামেশাই। প্রতিকারহীন এই লাঞ্ছনার শিকার হয়ে কেউ মরে যায়, কেউ আত্মহনন করে আর কেউ মরতে মরতে বেঁচে যায়। তীব্র সংগ্রাম শেষে এই বেঁচে যাওয়ার পরে আরেক দুর্বিষহ জীবনের মুখোমুখি হতে হয় তাকে-তাদেরকে। শারীরিক লাঞ্ছনা শেষের পরের অধ্যায়ে মানসিক পীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠতে হয় তাদের। সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মানুষের মুখ ও চোখের সে ভাষাগুলো কখনও মূর্তমান হয় আবার কখনও বিমূর্ত নিপীড়নে বারংবার আহত করে। এ কষ্টকঠিন সময়, ক্ষতবিক্ষত করে মানসিকভাবে।

নিপীড়নের শিকার যত নারী তারা সমাজ থেকে নানা অভিধা পায়, অপবাদ জুটে। একজন-দুইজনের দ্বারা শারীরিক নিপীড়নের পর বেঁচে গেলে নিপীড়নের পরের ধাপে সেই নিপীড়ন চালিয়ে যায় সমাজের আরও কিছু লোক। সাহস আর বেঁচে থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা যেখান থেকে পাওয়ার কথা সে জায়গা থেকেই বাধা আসে। ফলে নিপীড়নের শিকার নারীর পৃথিবী ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়, দমবন্ধ পরিবেশে তাকে বেড়ে ওঠতে হয়। অনেককে বাধ্য হতে হয় স্থানিক অবস্থান পরিবর্তনে। এখানে আর্থিক ব্যাপার সংশ্লিষ্ট বলে কেউ পারে কেউ পারেনা। ফলে দুঃসহ জীবনের ব্যাপ্তি বাড়ে। এ দুঃখজনকভাবে প্রতিকারহীন। অথচ এর উলটো হওয়ার কথা ছিল। সমাজের পক্ষ থেকে যেখানে সহযোগিতার হাত বাড়ানোই সঙ্গত ছিল সেখানে উলটোটা করে বসে সমাজ। এটা আমাদের সংস্কৃতিগত অধঃপতন; রোখা উচিত ছিল, কিন্তু সেটা হচ্ছে না।

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা কর্তৃক যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিল নুসরাত জাহান রাফি। উদ্ধার হওয়া এক চিঠির মাধ্যমে জানা যায়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ধর্ষণে উদ্যত হয়েছিলেন মাদ্রাসার ওই শিক্ষক। বাধা দিয়েছিল সে। তবু ওই মাদ্রাসা শিক্ষক হয়রানি করেছে। এরপর ওই শিক্ষার্থী আইনি প্রতিবিধান চেয়েছে, মামলা করেছে কথিত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। আর এতেই ক্ষেপে যায় সিরাজ-উদ-দৌলা। গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। আগুনে নুসরাতের দেহের আশি শতাংশ পুড়ে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্যে ঢাকায় আনা হয়। বার্ন ইউনিটে লাইফসাপোর্টেও ছিল সে। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। আরও উন্নত চিকিৎসার জন্যে সিঙ্গাপুরে পাঠানোরও নির্দেশ ছিল প্রধানমন্ত্রীর, কিন্তু অবস্থা এতখানি খারাপ ছিল যে তাকে বিদেশ পাঠানো যায়নি। এবং বুধবার রাতে মারাও যায় নুসরাত।

কিশোরীর এই মৃত্যু জীবনকে দেখার আগেই, জীবনকে পুরোপুরি উপভোগের আগেই। যদিও পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা জীবদ্দশায় তাকে পৃথিবীর কিছুই দেখতে দেয়নি। পারলৌকিক সুখের আশায় ধর্মীয় শিক্ষার নামে তার পরিবার প্রথমেই তাকে মাদ্রাসার গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে দিয়েছিল। নারীকে মানুষ হিসেবে নয় ‘ভোগ্যবস্তু’ বলে বিশ্বাসী ও প্রচারকারীদের কাছে নারীজন্ম পাওয়া নুসরাত জীবনের বেশিরভাগ সময়েই পার করে দিয়েছিল এবং সেই তাদের দ্বারাই পেয়েছিল যন্ত্রণার মৃত্যুস্বাদ।

নারী ভোগ্য, নারী অপবিত্র, নারী নিষিদ্ধ, নারী দেখলে লালা ঝরে, নারীদের লেখাপড়া করা জায়েজ না- এমনই প্রচার করে মাদ্রাসার অধিকাংশজন। তবু এই দেশের কিছু মেয়েশিশু, কিছু কিশোরী ওইসব মাদ্রাসায় যেতে বাধ্য হয়। এটা পারিবারিক সিদ্ধান্তে হয়ে থাকে, কারণ ওইসব প্রতিষ্ঠানে কিংবা যেকোনও প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বয়স তাদের তখন হয়না। নুসরাতের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। তাকেও মাদ্রাসায় পড়তে হয়েছে। তার বাবাও একজন মাওলানা বা  মাদ্রাসাশিক্ষক বলে ওখানে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না তার, কারণ এ যে পারিবারিক সিদ্ধান্ত।

অবাক লাগে যখন মাদ্রাসাশিক্ষা গ্রহণকারী এবং মাদ্রাসাশিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত একটা শ্রেণির লোকজন ঘোষণা দিয়ে নারী বিষয়ে অবমাননাকর কথা ও প্রচার করে সেই তাদের কাছে আমাদের সমাজের একটা অংশের লোকজন তাদের মেয়েশিশু-কিশোরীকে পাঠায়। জোরগলায় তারা নারীদের নিয়ে যখন আপত্তিকর কথা বলে তখন তাদেরকে বর্জন করাই উচিত ছিল আমাদের। এমন না মাদ্রাসায় ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সকলেই নিরাপদে থাকে; ওখানে কেউ নিরাপদ না এটা সাম্প্রতিক বর্তমান আর নিকট অতীত থেকেই তো প্রমাণ। মাদ্রাসা শিক্ষক কথিত ধর্মীয় নেতাদের কাছে কেবল নারী শিক্ষার্থীরাই যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে এমন না, এদের দ্বারা ছেলেরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এটা এখন আর গোপনীয় কিছু নয়, এটা প্রকাশ্য এবং প্রমাণিত; বিভিন্ন গণমাধ্যমে এইধরনের যৌন নির্যাতন ও হয়রানির সংবাদই তো এর প্রমাণ।

নুসরাতের ঘটনা তাই নজিরবিহীন নয়, এটা কথিত ধর্মীয় শিক্ষকদের দ্বারা যৌন হয়রানির ধারাবাহিকতা। ধারাবাহিকভাবে এসব চলে আসলেও আমরা সচেতন হচ্ছি কই? আমরা সচেতন হচ্ছি না, সমাজের অধিকাংশ লোকই এখনও এটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। অনেকের কাছে এই ঘটনাগুলো স্বাভাবিক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এটা আশঙ্কাজনক নিঃসন্দেহে।

মানুষ কেবলই চুপ তা নয়, এই নিপীড়কদের পক্ষে মাঠেও আছে কেউ কেউ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কিছু ছবিতে দেখা যায় যৌন নিপীড়ক মাদ্রাসা শিক্ষক সিরাজ-উদ-দৌলা পক্ষে ফেনীতে মানববন্ধন হয়েছে যেখানে অন্য অনেকের সঙ্গে উপস্থিত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শিক্ষার্থীও। কয়েকটি গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে আগে থেকেই সিরাজ-উদ-দৌলা নানা কারণে বিতর্কিত। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে ওঠেছে যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর কারণে সে প্রতিবারই পার পেয়ে গেছে। এই দুর্বৃত্তের পেছনে আছে সকল রাজনৈতিক দলের নেতারাও। রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে বৈরি সম্পর্ক থাকলেও যৌন নিপীড়ক মাদ্রাসা শিক্ষক সিরাজের পক্ষ নিতে ওখানে তাদের মধ্যে আছে ঐক্যমত্য। ফলে দিন দিন তার পশুপ্রবৃত্তি আরও বেড়েছে এবং এই বলে বলীয়ান হয়ে নুসরাতকে যৌন হয়রানির পর তাকে পুড়িয়ে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে সে।

অভিযুক্ত শিক্ষক সিরাজের পক্ষে ফেনীর ওই মানববন্ধন কবেকার সেটা আলোচ্য নয়। পূর্ব থেকেই অপরাধী সিরাজের পক্ষে এতলোকের অংশগ্রহণ ও তাকে আশকারা দেওয়ার মানুষের সংখ্যা দেখে উদ্বিগ্ন হতে হয়। আরও উদ্বেগ বাড়ে যখন এই শিক্ষকসহ আরও অনেক মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলো প্রকাশের পরও কোন মাদ্রাসা এবং কোনও ধর্মীয় নেতা এনিয়ে কিছু বলছেন না। ফলে ধরে নেওয়াই যায়, ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের মাদ্রাসা শিক্ষকদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে তারা স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবেই দেখছে।

নুসরাত যখন মারা গেল তখন চৈত্র সমাপ্যে বৈশাখ সমাগত। আবহমান বাঙালির প্রাণের উৎসব বৈশাখ উদযাপনে আমরা ব্যস্ত। অসুরের মুখে কালি দিয়ে সুন্দর আগামীর কথা বলবো বৈশাখের আবহে। রঙে রঙিন এই বৈশাখে প্রতিবারই আমরা সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর হই। ভিড়ে, গণপরিবহনে এবং সকল জায়গায় ঘটে যাওয়া নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে বলি। এবারও বলব। এবার বলব নুসরাতের লাশ কাঁধে নিয়ে, দগ্ধ নুসরাতের লাশ কাঁধে নিয়ে, মৃত্যুকে হারিয়ে দিতে চাওয়া নুসরাতের লাশ কাঁধে নিয়ে।

এফআর টাওয়ারের আগুন, ফেনীর নুসরাতসহ আরও অনেকেই এবারের চৈত্র বিষাদে ভাসিয়েছে। আসছে বৈশাখে এই বিষাদকে আমরা জয় করতে চাই। এই জয় আসবে নুসরাতসহ সকল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ‘ফুলস্টপ’ এঁকে-সাঁটিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই!

কবির য়াহমদপ্রধান সম্পাদক, সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম

Responses -- “বিষাদের চৈত্র এবং নুসরাত”

  1. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    এই দেশ ও দেশের রুটিনমাফিক মানুষেরা এখন দীর্ঘ যন্ত্রণাময় লড়াই শেষে জীবনকে বিদায় জানানো সোনাগাজীর নির্যাতিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে নিয়ে হা-হুতাশ করছেন। এটা চলবে হয়তো আরও কিছুদিন। যথাযথ প্রতিস্থাপনের আগ পর্যন্ত, পরের নুসরাতের দেখা মেলার আগ পর্যন্ত। নতুন আরেকটি ঘটনা সবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেবে। রিমোটের মালিকানা বুঝে নেওয়া মানুষেরা নির্দ্বিধায় চ্যানেল বদলে নেবে। সামনে তো অপেক্ষায় রয়েছেই মনোহর বিশ্বকাপ। ছোটার এই সময়ে ঘটনার অভাব কে আর বোধ করেছে কবে? অন্য দেশে জনগণ বাস্তবতা বদলায়, সিস্টেমের সংস্কার করে। আর আমরা দেশবাসী যখন সিস্টেম নড়াতে পারছি না, তখন ওই সিস্টেমই জনগণকে বদলে দিচ্ছে। প্রতিটি অন্যায়ের ঘটনা থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে তিনটি সর্বনাশা তির: একজন শিকার হয়ে পড়ে যাচ্ছে আর উঠে দাঁড়াচ্ছে নতুন এক অপরাধী, সৃষ্টি হচ্ছে নির্বিচার অপরাধের বিচারহীনতার অভ্যাস। কোনো কোনো প্রাণী নিজের ক্ষত-ঘা লেহন করে। আমরা বোধ হয় আমাদের অন্যায় ও মিথ্যাকে লেহন করার জায়গায় চলে এসেছি। আমাদের সিস্টেমের গায়ে ঘা। এই সিস্টেম ক্ষত করছে, রক্ত ঝরাচ্ছে আমাদের শরীরে। বাঁচার উপায় কী? প্রথম কথা হলো সুশাসন। সেটা করবে সরকার। কোনো নাগরিকই যাতে অরক্ষিত না থাকে, তার বন্দোবস্ত পাকা করতে বাধ্য করতে হবে। দ্বিতীয় বিষয় হলো বিচার। বিচার করবেন আদালত, তদন্ত করবে প্রশাসন। প্রশাসন যাতে নিরপেক্ষ তদন্ত করে, তাদের দিয়ে যাতে তা করিয়ে নেওয়া যায়, তার জন্য ব্যাপক-বিস্তর নাগরিক ও সাংবাদিক নজরদারি জরুরি। আইনকেও পাহারা দিতে হয়, তা তো আমরা হাড়ে হাড়ে বুঝছি। আইন যাতে সঠিক বিচারটা করে, সেই পরিবেশ তৈরিতে আপস করা যাবে না। কিন্তু সরকার একা পারবে না। অন্যায়-হিংসা-লোভ যতক্ষণ বাইরে থাকে, সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেটা শরীর-মনের অংশ হয়ে গেলে তাকে আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কিন্তু সেটাই যখন সমাজ-রাষ্ট্রের ভেতরের শক্তি হয়ে যায়, তখন সিস্টেম আর নিজেকে সারাতে পারে না। ফেনীর নিপীড়ক শিক্ষকটি জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ঠাঁই পেয়েছে সরকারি দলে। এটাই বোঝায়, অপরাধী যে দলেরই হোক, ক্ষমতাই তার আশ্রয়। তাই এত কিছুর পরও নুসরাতের পরিবারকে আপস করতে হুমকি দেওয়া হয়, এত কিছুর পরও পাষণ্ড লোকটার ক্ষমতার খুঁটি অটুট থাকে। শুধু ব্যক্তি অপরাধীর বিচারে তাই শান্তি আসবে না। দায়ী ক্ষমতাতন্ত্রের বিহিত করতেই হবে। এমন বাস্তবতাতেই কিশোর-কিশোরীদের আন্দোলনের দাবি হয়ে ওঠে ‘রাষ্ট্র মেরামত’-এর। মেরামত সমাজেও করতে হবে। প্রতিটি পরিবার যদি তার ভেতরে কোনো অমানুষকে জায়গা না দেয়, সমাজের যতটুকু জোর আছে, নৈতিক পোড়ানি আছে, তা জড়ো করে যদি তারা অপরাধীদের বর্জন করে, তাহলে সুনীতি ও ভালো মানুষেরা একটু জায়গা পাবে, ভরসা পাবে। যৌন নির্যাতন ও নারীর বিরুদ্ধে হিংসার বেলায় যৌনায়িত পাবলিক কালচারের দায়টাও দেখতে হবে। আমলে নিতে হবে নির্বিচার ভোগের সংস্কৃতিকেও। আনন্দ-বিনোদনের নামে দিনরাত মোবাইল থেকে টেলিভিশন, ইউটিউব থেকে বিজ্ঞাপন দিয়ে যে রগরগে পুরুষালি ভোগ–বাসনা মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাও চলবে আর নারীর নিরাপত্তাও থাকবে, তা হয় না। জোর করে ক্ষমতা, সম্পদ ও নারী এবং দুর্বল মানুষদের ভোগ/অত্যাচার করা যায়, এই তরিকা সামাজিক ডিএনএ বদলে দিয়েছে। সেখানে বদলের জাগরণ ছাড়া আমরা বাঁচতে পারব না।

    Reply
  2. রিযাজ

    ফেনীর নুসরাতসহ আরও অনেকেই এবারের চৈত্র বিষাদে ভাসিয়েছে। আসছে বৈশাখে এই বিষাদকে আমরা জয় করতে চাই। এই জয় আসবে নুসরাতসহ সকল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় ‘ফুলস্টপ’ এঁকে-সাঁটিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই!
    আসুন আমরা সবাই বৈশাখের উৎসবে মাঝেই এ হত্যার প্রতিবাদ করি। প্রশাসন, সমাজ, আদালত সবার এর দায়িত্ব নিতে হবে। পহেলা বৈশাখের দিন সকাল নয়টায যে যেখানে থাকব দুই মিনিট দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করব।
    প্রথম মিনিট তিন মাসের মধ্যে বিচারকার্য শেষ করার জন্য। পরের মিনিট ঐ পশুদের প্রতি ঘৃণা ও সমাজে তাদের মুখোশ উনমচন করার জন্য।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—