দৈনিক ইনকিলাব ০১ এপ্রিল, ২০১৯

“১ এপ্রিল মুসলিম গণহত্যার মর্মান্তিক ইতিহাস এপ্রিল ফুল পালন থেকে বিরত থাকুন -বিভিন্ন ইসলামী নেতৃবৃন্দ।  তারা বলেন, ১৪৯২ সালের ‘পহেলা এপ্রিলে’ রাণী ইসাবেলা কর্তৃক মুসলমানদের চরম ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে ঘোষণা দিয়ে বলে যদি বাঁচতে চাও কর্ডোভার জামে মসজিদে সমবেত হলে প্রাণভিক্ষা দেয়া হবে।  অতঃপর এই বলে সম্মিলিত হাজার হাজার আলেম-উলামা, সাধারণ মুসলমান, নারী-শিশু, বৃদ্ধ ও নিরীহ নাগরিকগণ মসজিদে অবস্থান নিলে তাদেরকে অগ্নিসংযোগ করে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়।  একইভাবে প্রতারণার মাধ্যমে জাহাজে চড়িয়ে আগুন লাগিয়ে হত্যা করা হয়।  খৃষ্ট জগতে বা মুসলিমবিদ্বেষী খৃষ্টান রাজ-রাণীর এ আনন্দঘন পৈশাচিকতার ঐতিহাসিক স্মারক দিবসই হচ্ছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ‘এপ্রিল ফুল’।

আচ্ছা, ভালো!

কর্ডোভা ছিল স্পেনে মুসলিম খেলাফতের রাজধানী। শেষ খলিফা আবু আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ ১২ (স্প্যানিশ নাম বোয়াবদিল) ছিলেন আফ্রিকার মুর গোত্রের লোক। তিনি যুদ্ধে পরাজয়ের পরে রানি ইসাবেলা ও তার স্বামী রাজা ফার্ডিনান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি। প্রতিটি ইতিহাস বইতে এ ঘটনাটা বিখ্যাত হয়ে আছে ‘দি লাস্ট সাই অব দি মুর’ অর্থাৎ ‘মুর-এর শেষ দীর্ঘশ্বাস’ নামে। পরাজয়ের পর তিনি স্পেন ছেড়ে যাবার পথে কর্ডোভার দিকে পেছন ফিরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন, তাই এ নাম।

কেউ কেউ বলেন মুসলিম-নিধনের সময় রাজা ফার্ডিন্যাণ্ড ও তার স্ত্রী ইসাবেলা আনন্দ করে বলেছিলেন “ওহ মুসলিমস! হাউ ফুল ইউ আর” অর্থাৎ “ওহ মুসলিমস, তোমরা কি বোকা”! দাবিটা কোন ঐতিহাসিকের কোন দলিল থেকে এলো জানিনা। তবে ঘটনাটা সত্যি হলেও হতে পারে কারণ যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষ সাধারণত পরাজিতদের ওপরে নিষ্ঠুর অত্যাচার করে। রানি ইসাবেলা অত্যন্ত নিষ্ঠুর ছিলেন, তিনি লক্ষ লক্ষ মুসলিমকে হত্যা ও স্পেন থেকে বিতাড়িত করেছিলেন, – সবই আছে পশ্চিমা গবেষকদেরই লেখা ইতিহাসে।

কিন্তু কর্ডোভায় মুসলিম জনতাকে প্রাণভিক্ষার প্রতিশ্র্রুতি দিয়ে মসজিদে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মারার মতো এতবড় ঘটনা কোনো নিৰ্ভরযোগ্য ইতিহাসে পাওয়া যায়না। বিজয়ীরা সাধারণত পরাজিতদের ওপরে প্রতিশোধ নেয়া বা ক্ষমা করা যাই হোক, করে থাকে বিজয়ের উত্তেজিত দিনেই, তিনমাস পরে নয়। যেমন নবীজী (স) মক্কা বিজয়ের সময় (সাত/আট জনকে ছাড়া) সবার প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন বিজয়ের দিনেই, তিনমাস পরে নয়। তারপরেও, নিশ্চয় করে বলা না গেলেও, ঘটনাটা ঘটে থাকতে পারে। ‘এপ্রিল ফুল’ দিবস কোত্থেকে এলো তার ওপরে বিশদ কাজ করেছেন পূর্ব-পশ্চিমের মুসলিম-অমুসলিম গবেষকরা, এ ব্যাপারে অনেক থিওরি আছে। কিন্তু নিঃসন্দেহে হওয়া যায়নি।

‘এপ্রিল ফুল’-এর উৎস প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু বোকা বানাবার প্রমাণিত ঘটনা আছে ইতিহাসে। একটি রাজবংশ ৬৬১ সাল থেকে ক্রমাগত ৮৯ বছর রাজত্ব করেছিল। তারপর তাদেরই সাথে রক্তের সম্পর্কে আত্মীয় এক বিদ্রোহী দল বেশ কয়েকটা যুদ্ধের পর ‘যাব’ স্থানের যুদ্ধে সেই রাজবংশকে উচ্ছেদ করে নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। বিজয়ী দলের আশংকা ছিল পরাজিত দলের আর কেউ আবার যুদ্ধ শুরু করে কিনা, কারণ সেই সময়ের আগে পরে বহু বছর ধরে রাজাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছাড়াও এই দলের বিরুদ্ধে ওই দলের আর ওই দলের বিরুদ্ধে অন্য দলের বহু যুদ্ধ বিগ্রহ হচ্ছিল। তাই বিজয়ী রাজা তার ক্ষমতা স্থিত হবার পর ‘সমঝোতা’র জন্য পরাজিত রাজবংশের সবাইকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে এক ডিনার পার্টিতে আমন্ত্রণ জানায়।

পরাজিত রাজবংশের ৮০ জন সদস্য উপস্থিত হলে তাদের সসম্মানে অভ্যর্থনা করে সুবিশাল ডিনার হলে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে সুবিশাল ডিনার টেবিলে প্রচুর সুস্বাদু খাদ্য সাজানো ছিল। ওদিকে পাশের ঘরে ইঙ্গিতের অপেক্ষায় ছিল অস্ত্রধারী ঘাতকের দল। পরাজিত রাজবংশের সবাই খেতে বসার সাথে সাথে ইঙ্গিত পেয়ে ঘাতকের দল ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে কিছু বুঝবার আগেই নৃশংসভাবে তাদেরকে কচুকাটা করে। সেই হুলুস্থুলের মধ্যে মাত্র একজন পালাতে পেরেছিলেন।

সেই পরাজিত রাজবংশ উমাইয়াদ খলিফারা, সেই বিজয়ী বংশ আব্বাসীয় খলিফারা। দু’দলই মক্কার কোরেশ বংশের দুই উপধারা। বোকা বানাবার এই নৃশংস বিশ্বাসঘাতকতা যে শহরে ঘটেছিল তার নাম আবু ফুর্টাস, মুসলিমের হাতে মুসলিম-গণহত্যার সেই মর্মান্তিক তারিখটা ছিল ২২ জুন, ৭৫০ সাল। যিনি পালাতে পেরেছিলেন তিনি আইবেরিয়ান উপদ্বীপ হয়ে স্পেনে চলে যান। তিনিই স্পেনের খেলাফতের বাদশাহ ‘আল দাখিল’ যাকে আমরা খলিফা আবদুর রহমান-১ বলে জানি।

তাহলে বোকা দিবস কোনটা?  প্রশ্নবিদ্ধ ১ এপ্রিল, নাকি প্রমাণিত ২২ জুন?  নাকি দুই-ই ?

কিছু আলেম-মওলানা ক্ষিপ্ত উগ্র হয়ে ওঠেন যখনই আমরা আত্মসমালোচনার জন্য খেলাফত আমলে মুসলিম-মুসলিমে হানাহানি রক্তপাতের উদাহরণ দেই যাতে আমরা সেই হিংস্রতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। তারা কি খেলাফত আমলে বিশ বাইশটা “আমিরুল মুমেনীন” নামে রাজরাজড়ার মুসলিম-মুসলিমে ক্রমাগত হানাহানি রক্তপাতের ইতিহাস এড়িয়ে  যেতে চান? কোরান কি বলেনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করো তোমাদের স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও?

দুনিয়া এমনিতেই হানাহানি হিংস্রতায় ভরে গেছে। অতীতের সত্য মিথ্যা, যত হিংস্রতা সেসব অতীতেই থাকুক, এখন কোন ধর্মের কোন ধর্মগুরু যেন সে আগুন আবার টেনে এনে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দগ্ধ না করেন। তারা যেন আমাদেরকে পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতা হানাহানি নয় বরং সহযোগিতায় অতীতের হিংস্রতা অতিক্রম করে যাবার পথ দেখান। তাহলেই আমরা সব ধর্মের সাধারণ মানুষেরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে এই সুন্দর গ্রহটা ভাগাভাগি করে বাঁচতে পারব।

দেশে কিছু ইসলামী বক্তার হিংস্র হুংকার ইসলামের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, তারা ব্যর্থ করেছেন কোরানের হুকুম – “ধর্মে বাড়াবাড়ি করোনা”- সুরা মায়িদা ৭৭ ও নিসা ১৭১।

ক্রমাগত এতো হিংস্রতা প্রচার করার পরেও দেশে সবচেয়ে বেশি বাক-স্বাধীনতা তারাই ভোগ করেন, তাদের লাগাম টেনে ধরার কেউ নেই। অনতিবিলম্বে এটা বন্ধ হওয়া দরকার এবং দায়িত্বটা প্রধানত: শান্তিকামী আলেমদেরই।

পহেলা এপ্রিল এক খবরে দেখলাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছয়টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে আছে বক্তাদের আয়ের ওপর আয়কর বসানো এবং ওয়াজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য প্রদানকারীদের আইনের আওতায় আনা। কিন্তু দায়িত্বটা শুধু সরকারের নয়, দায়িত্বটা শান্তিকামী আলেমদেরও কারণ তারা দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপরে প্রভাব রাখেন। আইনের এই নিয়ন্ত্রণ খুব দরকারী এবং মুসলিম বিশ্বে এটা নুতন কিছু নয়।

১. ওয়াজে খোৎবায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের বিরুদ্ধে আইন করেছে আরব আমিরাত – সূত্র – আমেরিকা ও ক্যানাডার প্রাচীনতম বাংলা পত্রিকা দেশে-বিদেশে, ২১শে জুলাই ২০১৬।

২. সৌদি আরব আইন করেছে ওয়াজে খোৎবায় রাজনীতি মেশানো যাবেনা, বলেছেন ইসলামী বিষয়ক মন্ত্রী সালেহ আল শেখ – এশিয়া নিউজ ১লা এপ্রিল, ২০১৪।

৩. “ইমামদের ওপরে কুয়েত ও সৌদি আরব নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করছে … কুয়েত সরকার ওয়াজগুলোকে পর্যবেক্ষণ (মনিটর) করছে, এক ইমামকে টিভিতে নিষিদ্ধ করেছে ও এক বিদেশি ইমামকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে” – রয়টার্স, ২৫ নভেম্বর ২০১৩।

সবাইকে সালাম।

হাসান মাহমুদমুসলিম রিফর্ম মুভমেন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী, শারিয়া আইনের ওপর গবেষক, লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বক্তা।

Responses -- “বিশ্ব বোকা দিবস: পহেলা এপ্রিল নাকি ২২ জুন?”

  1. Nahidul Islam

    কোনো মুসলিম অন্য কাউকে ধোকা দিবে এটা হতে পারে না, আল্লাহর রসূল বলেন যে ধোকা দেয় সে মুসলমানই না। তো আমাদের এত ইতিহাস এর দরকার নাই তো এপ্রিল ফুল না পালনের। প্রব্লেম হচ্ছে মুসলমানরা আজ এসব ফালতু জিনিস নিয়ে কচ কচে খুব ব্যস্ত। অথচ এদিক থেকে ইসলামের টুয়া উদাম করে বসে আছে, অন্যরা সুযোগ নিচ্ছে।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      আপনি রক্ষণশীল/উগ্র ইসলামী ভাবধারা থেকে বেরিয়ে আসুন, তাহলে আর বিদ্বেষ দেখতে পাবেন না।

      Reply
  2. রোমান

    বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সংখ্যার অনুপাতে ২০৫০ সালে ইউরোপের চেহারাটা কেমন দাঁড়াবে? মার্কিন গবেষণা সংস্থা ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’ অভিবাসনের হার বিবেচনায় এর যে নানা চিত্র দাঁড় করিয়েছে, তাতে দেখানো হচ্ছে, মুসলিমরা জনসংখ্যার বিরাট বৃদ্ধি ঘটবে বিভিন্ন দেশে।যেমন ধরা যাক সুইডেনের কথা। ২০১৬ সালে সুইডেনের মুসলিমদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু অভিবাসনের উচ্চ হার যদি অব্যাহত থাকে ২০৫০ সাল নাগাদ সুইডেনে মুসলিমরা হবে মোট জনসংখ্যার তিরিশ শতাংশ। অর্থাৎ জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ।পিউ রিসার্চ সেন্টার অভিবাসনের বিভিন্ন হার বিবেচনায় নিয়ে ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যা সম্পর্কে তিন ধরণের পূর্বাভাস দিয়েছে। এতে বলা হচ্ছে যদি অভিবাসন যদি এখনই শূণ্যে নামিয়ে আনা হয়, তারপরও ইউরোপের মুসলিম জনসংখ্যা বর্তমানের ৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে।
    আর যদি অভিবাসনের উচ্চ হার অব্যাহত থাকে, তাহলে মুসলিম জনসংখ্যা হবে ১৪ শতাংশের বেশি। ২০১৬ সালের তথ্য বিবেচনায় নিলে ইউরোপের এই তিরিশটি দেশের মুসলিম জনসংখ্যা এই মূহুর্তে ২ কোটি ৫৭ লক্ষ। মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৯ শতাংশ।এর মধ্যে সংখ্যার হিসেবে এবং জনসংখ্যার অনুপাতে সবচেয়ে বেশি মুসলিম আছে ফ্রান্সে। দেশটিতে বাস করে প্রায় অর্ধ কোটি মুসলিম ( ৪৯ লক্ষ ৫০ হাজার)। ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে মুসলিমরা হচ্ছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। উরোপের এই তিরিশটি দেশের মধ্যে মুসলিমরা দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যায় আছে জার্মানিতে। সেখানে মোট জনসংখ্যার ৬ দশমিক ১ শতাংশ মুসলিম। মোট মুসলিমের সংখ্যা ৫৭ লক্ষ ২০ হাজার।বৃটেনে মোট জনসংখ্যার অনুপাতে মুসলমানদের সংখ্যা জার্মানির তুলনায় বেশি (৬ দশমিক ৩ শতাংশ)। ব্রিটেনে মুসলমানদের সংখ্যা ৪১ লক্ষ ৩০ হাজার। এছাড়া ইউরোপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় এবং হারে মুসলিম আছে নেদারল্যান্ডস, ইটালি, স্পেন এবং সুইডেনে। ইউরোপে যদি অভিবাসন এখনই একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয়, তারপরও ২০৫০ সাল নাগাদ ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যা দাঁড়াবে সাড়ে তিন কোটিতে। যা মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। যদি মধ্যম হারে অভিবাসন চলতে থাকে, তাহলে ইউরোপে মুসলিমদের সংখ্যা ২০৫০ সাল নাগাদ সাড়ে পাঁচ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এর মধ্যে ব্রিটেনেই মুসলিমদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে, এক কোটি ৩০ লাখ। আর উচ্চ হারে যদি অভিবাসন ঘটে, তাহলে ২০৫০ সালে ইউরোপে মুসলিমদের সংখ্যা হবে সাড়ে সাত কোটি। জার্মানি হবে ইউরোপে সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। জার্মানির মোট জনসংখ্যার প্রায় বিশ শতাংশ হবে মুসলিম। তাদের মোট সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় এক কোটি ৭৫ লাখে।

    Reply
  3. রোমান

    এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যমতে প্রাচীন রোমান উৎসব হিলারিয়া (যা উদযাপিত হত ২৫শে মার্চ) থেকেই এপ্রিল ফুল’স ডের উৎপত্তি।

    জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে বছর শুরু হত ২৫ মার্চ। আর টানা ৮ দিনের উৎসবের শেষ দিন অর্থাৎ এপ্রিলের ১ তারিখ নববর্ষ উদযাপন হত। এরপর ষোল শতকে যখন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু হয়, তখন নববর্ষ সরে যায় ১ জানুয়ারি। কোন কোন সূত্রমতে, ক্যালেন্ডার বদলাবার খবর অনেকেই না জানায় তারা ১ এপ্রিলেই নববর্ষ উদযাপন করতে যেয়ে বোকা বনে যায়। তখন থেকেই এই এপ্রিলের ১ তারিখে নিজেরা নিজেদের বোকা বানিয়ে মজা নেয়। এপ্রিল ফুল’স ডে’র উৎপত্তি নিয়ে আরও কিছু মতবাদ থাকলেও কোন সমর্থিত সূত্রেই মুসলমানদের বোকা বানিয়ে গণহত্যার কোন বর্ণনা নেই।

    Reply
  4. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    ১৫০২ খ্রিস্টাব্দে স্পেনে বসবাসকারী মুসলমানদের অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে যান। স্পেনীয় রাজন্যবর্গের হাতে নির্যাতিত এমনকি খুন হয়ে যাওয়ার ঘটনা এড়াতে তাদেরকে সব সময় তাদের বিশ্বাস ও কাজকর্মের গোপনীয়তা রক্ষা করে চলতে হত। স্পেনীয় শাসকদের হয়রানির হাত হতে বাঁচতে তারা অনেকেই বাহ্যিকভাবে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতো। এই ধর্মান্তরিত ‍মুসলমানদের স্পেনীয়রা ‘মরিস্কো’ বলে সম্বোধন করতো। স্পেনীয় প্রশাসন তাদেরকে সব সময় কড়া নজরদারির মধ্যে রাখতো।
    স্পেন খ্রিস্টীয় প্রশাসন মরিস্কো মুসলিমদের ওপর বিভিন্ন নিপীড়নমূলক আইন জারি করেছিল যাতে তারা গোপনেও ইসলামী বিশ্বাসের লালন করতে না পারে। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে ও শুক্রবার সকালে তাদের ঘরের দরজা খোলা রাখতে হত যাতে সৈনিকরা দেখতে পারে, তারা গোসল করছে কি না। এ ছাড়া কোনো মুসলমানকে ওজু করতে বা কুরআন তেলওয়াত করা অবস্থায় দেখতে পেলে তাকে সাথে সাথে হত্যা করা হত। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও স্পেনের মরিস্কো মুসলমানরা গোপনে তাদের ধর্ম পালন করতে থাকে। মরিস্কো মুসলমানরা তাদের বিশ্বাস গোপনের সর্বাত্মক চেষ্টা করা সত্ত্বেও খ্রিস্টান রাজন্যবর্গ সব সময় তাদের সন্দেহের চোখে দেখতো। স্পেনীয় মুসলমানদের আত্মগোপনের একশত বছরের পর, ১৬০৯ ঈসায়ীতে স্পেনীয় রাজা ফিলিপ সকল মরিস্কোকে স্পেন হতে বিতাড়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাদেরকে মাত্র তিন দিনের সময় দেওয়া হয় স্পেন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার। স্পেন হতে বহিষ্কারের যাত্রা পথে মরিস্কোরা স্পেনীয় খ্রিস্টানদের দ্বারা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হয়। তাদের সম্পদ লুট করে নেওয়া হয় এবং তাদের শিশুদের ‘যিশুর সন্তান’ বলে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি, খেলার ছলে খ্রিস্টান সৈনিক ও উচ্ছৃংখল জনতা অনেক মরিস্কোকে হত্যাও করে। জাহাজের নাবিকরাও তাদের হয়রানি করতে ছাড়েনি। তাদের জন্মভূমি থেকে বহিষ্কারের জন্য জাহাজ ভাড়াও তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়। জাহাজেও তাদের ওপর আরেক দফা লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। স্পেনীয় মরিস্কো মুসলমানদের ওপর এই আচরণ স্পষ্টতই আধুনিকালের সন্ত্রাস ও গণহত্যার নামান্তর।অনেক মরিস্কোই স্পেনে স্থায়ী হতে চেয়েছিল। শত শত বছর যাবত এটি ছিল তাদের আবাসস্থল এবং তাদের জন্মও ছিল এই ভূমিতে। অন্য কোনো দেশে থাকার কথা তারা ভাবতেও পারছিল না। অনেকেই পরবর্তীতে নির্বাসন হতে গোপনে স্পেনে ফেরত এসেছিল কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। ১৬১৪ ঈসায়ীর মধ্যে স্পেনের সর্বশেষ মরিস্কোকে বিতাড়িত করা হয় এবং এর মধ্য দিয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে ইসলামের নিশানা মুছে দেওয়া হয়। একশত বছরের ব্যবধানে স্পেনের মুসলিম জনসংখ্যা পাঁচ লাখ হতে একদম শূন্যে নেমে যাওয়ার ঘটনাকে একমাত্র গণহত্যার সাথেই তুলনা করা যায়। পর্তুগীজ পাদ্রী দেমিয়ান ফনসেকা এই বিতাড়নের ঘটনাকে agreeable Holocaust বা ‘ঐক্যমতের গণহত্যা’ বলে বর্ণনা করেছেন। এর ফলে, এত বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তির হ্রাসের কারণে স্পেনের অর্থনীতি তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং স্পেনের রাজস্বের হ্রাস ঘটে।

    Reply
  5. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    মধ্যযুগের প্রায় পুরোটা জুড়েই মুসলিমরা স্পেনের মূল শাসক ছিল; তাদের রাজ্যের নাম ছিল আল আন্দালুস। ৯ম ও ১০ম দশকে শিক্ষা, গণিত, ভূগোল, স্থাপত্য, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও কাব্যচর্চায় কর্দোবা ছিল গোটা ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় শহর। ১৫শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এসে উত্তর স্পেনের খ্রিস্টান রাজ্যগুলি একত্র হয়ে মুসলিম আরব আফ্রিকান কাছ থেকে হৃত ইবেরীয় উপদ্বীপ ফেরত নেবার জন্য যুদ্ধ করে এবং ১৪৯২ সালে স্পেন থেকে শেষ মুসলিম আফ্রিকান গোত্রীয় শাসনকর্তাকে বিতাড়িত করা হয়। খ্রিস্টানরা স্পেন থেকে সেখানে বসবাসরত মুসলমানদের নারকীয় ভাবে হত্যা ও বিতাড়িত করে এবং মুসলিম সভ্যতার স্থাপত্য নিদর্শনাবলী গুলো দখল করে নেয়।মুসলিমদের এই ভূখণ্ডটি ধীরে ধীরে খ্রিস্টান রাজ্যে পরিণত হয়। শেষ হয়ে যায় ৮০০ বছরের আল আন্দালুস (স্পেন) ইসলামী রাষ্ট্রের।খ্রিস্টান পুনর্দখল প্রক্রিয়ার এই সমাপনীমূলক বছরটিতেই অর্থাৎ ১৪৯২ সালে অভিযাত্রী নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নেতৃত্বে স্পেনের রাজার জাহাজের বহর আমেরিকা মহাদেশে পদার্পণ করে। এরপরে প্রায় ৩০০ বছর ধরে স্পেনীয় অভিযাত্রী এবং যোদ্ধারা বিশ্বের আনাচে কানাচে ভ্রমণ করে এবং স্পেনীয় রাজার জন্য বিশাল আয়তনের ভূখণ্ড দখল করে। আমেরিকা মহাদেশ থেকে লুটকৃত ধনসম্পদের জন্য স্পেন ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষমতাধর শক্তিতে পরিণত হয়। স্পেনীয় সৈনিক এবং ধর্মযাজকেরা বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশবিশেষ ও মেক্সিকো থেকে শুরু করে এবং দক্ষিণে চিলি পর্যন্ত স্পেনের উপনিবেশ স্থাপন করে এবং সেখানে স্পেনীয় ভাষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়। ইউরোপে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে সেসময় পর্যায়ক্রমে কাস্তিলীয়, আরাগোনীয়, হাবসবুর্গীয় এবং বুর্বোঁ বংশের বিভিন্ন রাজা দেশটির শাসনের দায়িত্ব পালন করেন। বহু প্রজন্ম ধরে স্পেন ছিল গোটা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ; এর সাম্রাজ্য বিশ্বের সমস্ত জায়গায় ছড়িয়ে ছিল। ১৭শ শতকেই স্পেনের অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দেয়। ১৮শ ও ১৯শ শতকে ইউরোপ মহাদেশ এবং সারা বিশ্বজুড়ে স্পেনের ক্ষমতা অবিরত হ্রাস পেতে থাকে এবং বিশ্বের ঘটনাবলিতে এর ভূমিকা তেমন ছিল না বললেই চলে। বিংশ শতাব্দীতে এসে ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত মতাদর্শের সংঘাতের উপর ভিত্তি করে সংঘটিত স্পেনের গৃহযুদ্ধ দেশটিকে আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কেন্দ্রে ফেরত নিয়ে আসে। কিন্তু যুদ্ধশেষে স্বৈরশাসক ফ্রানসিস্কো ফ্রাংকোর চার দশকব্যাপী শাসনের সময়ে স্পেন আরও বেশি একাকী হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালে ফ্রাংকোর মৃত্যুর পর হুয়ান কার্লোস নামক বুর্বন বংশের রাজা আবার সিংহাসনে ফেরত আসেন এবং দেশটিতে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। সেসময় স্বৈরাচার থেকে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় দেশটির ঝঞ্ঝাটহীন রূপান্তর উল্লেখ করার মত। তখন থেকে দেশটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অনেকগুলি সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে, যাদের কেউ সমাজতন্ত্রবাদী, কেউ বা রক্ষণশীল।

    Reply

Leave a Reply to azadi Hasnat Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—