বেশ কয়েক বছর ধরে, সপরিবারে নিউমার্কেটে আছি বিশ্বাস বিল্ডার্সের বহুতল ভবনে। গত শুক্রবার রাত এগারোটার দিকে এক বন্ধু-সহকর্মী ফোন করে বললেন, আপনাদের ভবনে আগুন লেগেছে। দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যান। ভবনে কোনও প্রকার বিপদ-সংকেত কিংবা ফায়ার অ্যালার্ম বাজানোর ব্যবস্থা নেই। আমাদের টিভি থাকলেও কখনও দেখা হয় না। টেলিভিশনে খবর দেখে উদ্বিগ্ন বন্ধুটি ফোন না করলে জানতেই পারতাম না যে মহাবিপদে আছি।

পড়ি কী মরি করে বের হলাম। বাইরে তখন ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। পাশের তিন প্রতিবেশির একজন দরজাই খোলেননি। অন্য দুই পরিবারের কর্তা বন্ধ লিফটের সামনেই ছিলেন। একজন নামতে পারবেন না, কারণ বাড়িতে শয্যাশায়ী রোগী। এত বড় ভবনে সিঁড়ি দিয়ে অশক্ত রোগী নামার কিংবা নামানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্যজন নামবেনই না। তিনি বরং যারা নামছেন, তাদেরই বিদ্রুপ করছেন। ‘ঈশ্বর ভরসা। আগুন শীঘ্রই নিভে যাবে!’ এই দুই পরিবারের পরিজন-সন্তান সবাই  অ্যাপার্টমেন্টের ভিতরেই থেকে গেল। শ্বাসকষ্ট হলেও গৃহস্বামীর অনুমতির অভাবে নামতে পারলো না কেউ।

অপরিসর সিঁড়িতে কোনও আলোর ব্যবস্থা নেই। আমরা নেমে যাওয়ার পর সিঁড়ি নাকি অসহনীয় গ্যাসে ভরে গিয়েছিল। যারা না নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা হয়তো জানেন না যে কার্বন মনোঅক্সাইডের মতো গ্যাসে শরীর কিছুক্ষণের মধ্যে এতটাই নিস্তেজ হয়ে যায় যে নামারও উপায় থাকে না। বিশ্বাস ভবনের প্রথম পাঁচতলায় শত শত কক্ষ কাগজে-পত্রের দোকান, কার্যত গুদাম। এসব গুদামে কোন্ ধরনের পদার্থ মজুত রাখা হয়েছে, সেগুলোতে আগুন লাগলে কী ধরনের গ্যাস সৃষ্টি হতে পারে, তা কেউই জানে না, না প্রশাসন, না জনগণ।

লোকজন সুশৃঙ্খলভাবে গেটের বাইরে বের হয়ে আসছে। ভবনের নিরাপত্তা কর্মীরা সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। নিউমার্কেট লোকারণ্য। আশেপাশের কাঁচা বাজারের ভবনগুলোর বারান্দায় শত শত উৎসুক দর্শক। ভেঙে ফেলতে হবে – এই ভয়ে রঙটং দিয়ে ‘মেক-আপ’ করা পুরনো এই ভবনগুলোর বারান্দা অতিরিক্ত লোকের ভারে ভেঙে পড়ে নিচে অপেক্ষমান মানুষ আহত-নিহত হওয়া অসম্ভব নয়।

বাইরে বেরিয়ে আমার প্রাকযৌবনের শ্রদ্ধেয় কলেজ শিক্ষক, এলাকার দোকানদার, ধোপা, নাপিত, ফার্মাসিস্ট, পুরনো পরিচিত লোকজনের সঙ্গে ঘণ্টা দুয়েক সময় কাটালাম নিষ্প্রদীপ পরিবেশে। সবাই সহানুভূতিশীল। বন্ধুবান্ধব, ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, আত্মীয়-স্বজন ফোন করে খবর নিচ্ছেন অবিরাম ঢাকা, চট্টগ্রাম, বেইজিং, ভিয়েনা, মন্ট্রিয়ল থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক সহকর্মী সঙ্গ দিতে ছুটে এলেন। সবাই উদ্বিগ্ন, ফোনে একই কথা: ‘ভালো আছি, নিরাপদে আছি!’ বলতে বলতে অস্থির লাগলেও সবার ভালোবাসার উত্তাপ অনুভব করে ভালোও লাগছিল।

আমরা ভবন থেকে বের হবার আগেই একাধিক অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপণ শকট এসে হাজির হয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। ভাগ্য ভালো, আগুন রাতে লেগেছিল। দিনের বেলা আগুন লাগলে নিউমার্কেটের মহা-অপরিকল্পিত পার্কিং ব্যবস্থা এবং নৈমিত্তিক জ্যামের কারণে দমকলের গাড়ি ভবনের নিকটে আসা কঠিন হতো। কিন্তু প্রায় দুই ঘণ্টা বাইরে থেকে বহুজনকে জিজ্ঞেস করেও আগুন ঠিক কোথায় লেগেছে, কী ধরনের দাহ্য পদার্থ ইত্যাদি কিছুই আমরা জানতে পারিনি। চকবাজার বিপর্যয়ের পর পুরনো ঢাকার কেমিকেল ব্যবসায়ীরা যে বিশ্বাস-ভবনের গুদামগুলোতে তাদের মালপত্র এনে রাখেনি তারই বা নিশ্চয়তা কী! বর্তমান পরিস্থিতিতে পাঁচশ গুদামের উপর শুয়ে থাকা মানে কার্যত কমপক্ষে দুই শ বোমার উপর শুয়ে থাকা।

বিদেশে কোনও ভবনের প্রত্যেক কক্ষে পানির ফোয়ারা থাকে। ধোঁয়া কিংবা উত্তাপ একটা বিশেষ পর্যায়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ফোয়ারা থেকে পানি বের হতে শুরু করবে চক্রাকারে। তাতেই সিংহভাগ অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এতে কাজ না হলে অগ্নিনির্বাপক দল তাদের পানির পাইপ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে দরজা, জানালা কিংবা দেয়াল ভেঙে ভবনে ঢুকে পড়ে। বাংলাদেশেও এসব নিয়ম নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু কোথাও কি নির্মাণকোড মেনে ভবন তৈরি করা হয়? বাংলাদেশের শহরগুলোতে দুই ভবনের মাঝে গাড়ি চলাচলের উপযোগী কোনো রাস্তা না রাখাই দস্তুর। দুই ভবনের মাঝে অল্পস্বল্প জায়গা রাখছেন কেউ কেউ, কিন্তু তিন তলার দিকে দুই ঝুলবারান্দা এতটাই কাছে নিয়ে আসছেন যে দুই মুখোমুখি প্রতিবেশি চাইলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পরস্পরের করমর্দন করতে পারেন। দুই ভবনের মধ্যে স্থানাভাব যে বিপদের আকর সেই বিশ্বাসই নেই আমাদের।

যিনি ভবন নির্মাণ করছেন তিনি নিয়ম মানছেন না। নিয়ম না মানার জন্যে আইনের মুখোমুখি করার করার কথা যে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারীর তিনি ঘুসের লোভে কিংবা ঘুসির ভয়ে নিশ্চুপ। বিচার করে শাস্তি দেবার কথা যে বিচারকের তিনি হয় দীর্ঘসূত্রিতা করছেন, নতুবা নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে বসে আছেন। ব্যবসায়, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, জনগণসহ রাষ্ট্রের চতুরঙ্গ দেখভাল করার কথা যে রাজনীতিকের তিনি ক্ষমতার লোভে কাউকে চটাতে চান না। সুতরাং আমরা কেউই আমাদের বিপদের দায় এড়াতে পারি না, আমি-আপনি, কেউ না।

আমার মামাকে ফোন করে অগ্নিকাণ্ডের খবর দিতে তার মন্তব্য: মানুষতো কলেরা-বসন্ত এসব মহামারী নির্মূল করেছে। ঈশ্বর তার পরিবার পরিকল্পনা করবেন কী করে! মানুষই অপরিকল্পিত নগর বানিয়ে ঈশ্বরের কাজ সহজ করে দিচ্ছে। জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্ত, চিত্ত ভাবনাহীন। মৃত্যুর পর স্বর্গে থাকা-খাওয়া-বিনোদনের সুবন্দোবস্ত আছে। নিউমার্কেটের বিশ্বাস ভবনটি ইতিমধ্যে একাধিকবার জ্বলেছে, হয়তো আবারও জ্বলবে। বিশ্বাস যত জ্বলন্ত হবে, স্বর্গবাস ততই সুনিশ্চিত।

শিশির ভট্টাচার্য্যঅধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Responses -- “বিশ্বাসে আগুন!”

  1. সেলিম রহমান

    ভয়ঙ্কর আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া অনেক অসহায় মানুষের বর্ণনার এবং নিজের তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন লেখক। সাথে ভবন নির্মাণে আগুন থেকে বাঁচার কিছু অতি প্রয়োজনীয় বিষয় যা ভবনে থাকা না থাকার বিষয়ে সামান্য কিছু উল্লেখ করেছেন। সমাজের কিছু অসংগতিও উল্লেখ করেছেন।

    আধ্যাপক সাহেব ফোয়ারা লিখেছেন, কিন্তু উনি “স্প্রিংলার সিস্টেম” এর বাংলা অনুবাদ করেছেন কিনা তা বুঝা যাইনি তার লেখায়। তাতেই লতিফ সাহেব চটেছেন, নিজেই তার মানে করে নিয়েছেন আর লিখেছেন “আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের মূল সমস্যাটা বু্দ্ধিবৃত্তিকক্ষেত্রে দার্শনিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের ঘাটতি।“ লেখকের ভাষা জ্ঞানের প্রতি কটাক্ষ করেছেন। করতেই পারেন “আমার বিবেচনায়”।

    লতিফ সাহেব তার বুদ্ধিবৃত্তিক, দার্শনিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটিয়ে এবং সর্বোপরি বিবেচনায় বুঝতে পেরেছেন এটা বাংলাদেশের মূল সমস্যা। পুরো বাংলাদেশের মূল সমস্যা! ইন্টারেস্টিং!!! সত্যিই তো, এত স্বল্পতে এতটা বিশাল দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা কজনেরই বা থাকে।

    ছোট কথা কি, জীবন প্রলয়ি আগুনের ভয়াবহতা থেকে প্রানে বাঁচলেও, ব্যক্তি বিবেচনার আঁচ স্পর্শ করেই।

    Reply
    • লতিফ

      ইন্টারেস্টিং তো বটেই, তা মানুন কি না মানুন। বাংলাদেশে ডাক্তারি আর ওকালতি নামের মাত্র দুটো পেশার আইনগত স্বীকৃতি আছে, বাকিগুলো হাওয়া-মে-উড়তা যায়ে দোপাট্টার মতো, এমনকি ইঞ্জিনিয়ার নামের যে পেশা সেটাও আইনদ্বারা স্বীকৃত কোনো পেশা না। এটাকে বুদ্ধিবৃত্তিকক্ষেত্রে দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ঘাটতি বলব না তো কাকে বলব? এবার অধ্যাপক সাহেবের যে জগত, অর্থাৎ ভাষা, সেটা নিয়ে বলি। আজতক, বাংলাভাষার কোনো ব্যাকরণ বের হলো না এবং বানানে যে বিশৃঙ্খলা, যা নিয়ে তিনি নিজেই পেরেশান, এর কারণ তো সেই ঘাটতি যা ঘি দিয়ে ভাত মেখে খেলে পুরণ হবে না। বাঙালি কেন বাড়ি বানানোর বেলায় এক ইঞ্চি জায়গা ছাড় দেয় না, এর মনস্তাত্ত্বিক কারণ আজতক তো কোনো পণ্ডিতের মাথা থেকে বের হলো না? তাহলে দোষটা বুদ্ধিবৃত্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত হবে না কেন? সমস্যার গোড়া তো ওই আপসহীনতা এবং তাতে কাজ না হলে মারমুখী হয়ে ওঠা, প্রয়োজনে রাষ্ট্রের শক্তিকে ব্যবহার করে হলেও। তো মনস্তাত্ত্বিক এই ভয়াবহ সংকট পাবলিকে কীভাবে অতিক্রম করবে? আলোর পথযাত্রীদের কাজ কী ঘাস খাওয়া আর রাজউকের প্লটের পেছনে দৌড়ানো?

      Reply
  2. সৈয়দ আলি

    ‘নিয়ম না মানার জন্যে আইনের মুখোমুখি করার করার কথা যে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারীর তিনি ঘুসের লোভে কিংবা ঘুসির ভয়ে নিশ্চুপ।’

    Reply
  3. লতিফ

    আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের মূল সমস্যাটা বু্দ্ধিবৃত্তিকক্ষেত্রে দার্শনিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের ঘাটতি। আগুন নিয়ে লিখতে গিয়ে বাংলার অধ্যাপক সাহেব এমন বিষয়ের অবতারণা করেছেন যে বিষয়ে তাঁর জ্ঞান এতটাই সীমিত যে, তার প্রকাশটাই দূর্ভাগ্যজনক। বেশি না, দুটো উদাহরণ দেই। তিনি বলছেন, বিদেশে কোনও ভবনের প্রত্যেক কক্ষে পানির ফোয়ারা থাকে। অধ্যাপক সাহেব দীর্ঘদিন কানাডার মন্ট্রিয়ল শহরে ছিলেন। কোথায় ফোয়ারা দেখেছেন? তিনি যদি স্প্রিংলার সিস্টেমের বাংলা ফোয়ারা করেন তো বাংলাভাষার দূর্গতি ঠেকায় কে। তাঁর তো জানা থাকার কথা বাংলাদেশের মানুষ ফোয়ারা বলতে কী বুঝে থাকে। যাকগে বিদেশেও বেশিরভাগ ভবনে স্প্রিংলার সিস্টেম থাকে না, কারণ এটা ব্যয়বহুল এবং এরজন্য সিটির পানির লাইনে অনেক চাপ থাকতে হয়, তা না হলে ডিজেল পাম্প বসাতে হয়। এসব কারিগরী জ্ঞান বাংলাদেশে নাই। বাংলাদেশে বহুতল ভবনের বেলায় যা দেখেছি, তা হলো ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম, অর্থাৎ, আগুন বা ধোঁয়ার কারণে অ্যালার্ম বেজে উঠলে মানুষ ‘নিরাপদ’ সিঁড়ি বেয়ে ভবনের বাইরে যেতে পারে। বলা বাহুল্য, নিরাপদ সড়কের মতো নিরাপদ সিঁড়ির ধারণাও বাংলাদেশে নাই, ফলে আমার নজরে আসা বেশিরভাগ নিরাপদ সিঁড়ি এনএফপিএ-এর স্ট্যাণ্ডার্ড অনুসরণ করে বানানো না। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে কোনো ফায়ার কোড নাই এবং বিল্ডিং কোডে যেভাবে বলা হয়েছে, তা অনুসরণ করে আগুনে পলায়ন ও প্রতিরোধ করার কোন ডিজাইন কেউ-ই করতে পারবে না। আর ধোঁয়া সম্পর্কে তো বড় বড় প্রকৌশলী বা স্থপতিদেরই কোনো ধারণা নাই। যাকগে, কোড ভঙ্গ করে বিল্ডিং বানালে বিদেশে পুলিশ সেটা দেখতে আসে না। সেজন্য সিটি কর্পরেশনের ইন্সপেকশন বিভাগে যোগ্য লোক আছে, এবং সেরকম গলদ পেলে তারা ‘অকুপ্যান্সি সনদ’ দেয় না। আর সেই সনদ না পেলে ইন্সুরেন্স কোম্পানী ওই ভবনের বীমা করে না। এখন আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ দিতে কেউ এগিয়ে আসবে না। অবশ্য, বাংলাদেশে সরকার নামে এক শ্বশুর আছে, চিন্তা কি!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—