ছাত্ররাজনীতি দেশে দেশে শাসক ও সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর কাছে অপছন্দের হয়েছে যুগে যুগে, বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। তারুণ্যের উচ্ছ্বল-উচ্ছৃঙ্খল আচরণ দেখিয়ে ছাত্ররাজনীতিকে ভৎর্সনা করা এবং জনমত তৈরি করার চেষ্টাও হয়েছে। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পেছনে শিক্ষায় বিঘ্ন ঘটা অথবা সহিংসতার চাইতে অন্য বড় কারণ কাজ করে। অনেক সময় যুগ অতিক্রম না করে সমাজে ছাত্ররাজনীতির অবদান হিসেব করা জটিলই হয়ে ওঠে।

তিন যুগ ধরে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের চেষ্টার পর উল্টো সুর বাজতে শুরু করেছে বাংলাদেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সতর্ক পদক্ষেপে ছাত্ররাজনীতি দমন চিন্তা দূর হতে চলেছে। তাহলে কি ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে গেছে?

মনে হতেই পারে- কোনও ছাত্রের অনশন কিংবা আদালতের নির্দেশেই বুঝি ডাকসু নির্বাচন করতে বাধ্য হলো। তাহলে কি ১৯৯০ সালের পর এত দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করতে হতো? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন ভাষণে রাষ্ট্রপতিও ডাকসু নির্বাচনের গুরুত্বের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ছাত্রসংসদ ফের চালু করতে কর্তৃপক্ষকে নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে দেখা যায়, কোথায় যেন দ্বিধা- ‘যেন আদালতের নির্দেশে বাধ্য হলুম’। ডাকসু নির্বাচনের পর অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচন হবে। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক- কেন ছাত্ররাজনীতি বন্ধের এত তৎপরতা চলল, আর কেনইবা তা ফেরত আনা হচ্ছে?

ছাত্র রাজনীতি বন্ধের কয়েক যুগের এই তৎপরতায় কর্তৃপক্ষের প্রণোদনার অভাব কি ছিল? সেমিনার, মতবিনিময়, টকশো, খবরাখবর সবকিছুতেই ছাত্ররাজনীতি কত খারাপ তা বোঝাতে কোটি কোটি বাক্য ব্যয় হয়েছে গেছে এরই মধ্যে।

ছাত্রসংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলের রেজিমেন্ট হিসেবে কাজ করায় সকল দুর্নাম মাথায় নিয়েও টিকে থাকে দলের স্বার্থে। সব দেশে সব কালে ছাত্র রাজনীতি এক রকম ভূমিকা রাখেনি। দেশ, কাল, অঞ্চল ভেদে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকায় তারতম্য দেখা যায়। কোনও দেশেই ছাত্রস্বার্থ ইস্যুতে ছাত্ররাজনীতি আবদ্ধ থাকে না সব সময়, সমাজ ও রাজনীতির প্রভাবে সমাজ বদলেও নামে ছাত্র সমাজ-ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসের বাইরেও। গবেষকদের অভিমত হচ্ছে, ছাত্ররাজনীতি নির্মূল হয় না। শিল্পে অনুন্নত দেশের জন্যই নয়, শিল্পোন্নত পশ্চিমা দেশেও প্রযোজ্য।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, ছাত্র সমাজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মনোভাব জটিল-সবকিছু আগাম ঠাওর করাও যায় না, কখন কোন ইস্যুতে মেতে ওঠে ওরা। পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্বের ছাত্র রাজনীতি বিষয়ক গবেষক ফিলিপ অ্যালটবাখের মনে করেন, শিক্ষার্থীদের সংগঠন ও আন্দোলনের চালিকা শক্তি হিসেবে কোনও না কোনও মতাদর্শ কাজ করে থাকে। শিল্পে অনুন্নত দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে উন্নত-অনুন্নত সব দেশে নতুন সমাজ বিনির্মাণ ছাড়াও ছাত্র-স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপারও তাদের সক্রিয়তায় ইন্ধন জোগায়। জ্ঞান সৃজন এলাকা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের বাকী অংশ থেকে একটু বেশি স্বাধীনতা দেওয়াই প্রথা। ছাত্ররাজনীতি জ্ঞানের সৃজনীশক্তির এক রকম বহিঃপ্রকাশই। গত শতাব্দী জুড়ে দেশে দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে ছাত্র সমাজ- এই সচেতনা গঠনে পশ্চিমের আধুনিক ধারার জ্ঞান চর্চাই কি অনুঘটক নয়? বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।

ভারতবর্ষে সহিংসতা দিয়ে ছাত্রদের রাজনীতি শুরু হয়। ১৯০৫ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের ইডেন হিন্দু হোস্টেলে লর্ড কার্জনের ভাস্কর্যে আগুন ও পরীক্ষা বর্জন দিয়ে এর যাত্রা শুরু। গত একশ’ বছরে ছাত্ররাজনীতির সংশ্লিষ্ট অগুণিত সহিংস ঘটনাসহ হত্যাকাণ্ডও প্রত্যক্ষ করেছে এ দেশ। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররাজনীতি কোথাও সব সময় শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক পথে হাঁটেইনি, সহিংসতার ইতিহাস আছে। ইংরেজি-ফ্রেঞ্চ-জার্মান ভাষায় কথা বলা ‘সভ্য’ সাদা চামড়ার ছাত্র রাজনীতিকরাও সহিংস হয়েছে- শুধু কর্তৃপক্ষের সাথে সংঘর্ষ নয়, প্রতিপক্ষকে ঘায়েলে গুম-খুন পর্যন্ত করেছে।

ব্রিটিশ আমলে স্বদেশী, অসহযোগসহ সব প্রধান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল এদেশের ছাত্র রাজনীতিকরা। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছাত্র সমাজ। শিল্পে অনুন্নত সব দেশের ইতিহাসে ছাত্রদের ভূমিকা এমনই। ফলে স্বাধীনতার সাথে সাথে দেশে দেশে ছাত্রদের রাজনৈতিক অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়। তবে কী পুঁজিবাদী, কী সমাজতান্ত্রিক, কী ইসলামি সব দেশেই ক্ষমতা আহরণের পর ছাত্ররাজনীতি শাসকদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, নানা রকম প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়েও যায়।

১৯৪৯- এ চীনের ‘লাল’ বিপ্লবের সাথে ১৯১৯ সালে সেদেশের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যোগসূত্র খুঁজে পান অনেকে। কিন্তু বিপ্লবোত্তর চীন ছাত্রদের সরকার বিরোধী কোনও অবস্থান সহ্য করেনি। সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সরকার বিরোধী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার ভয়ানক চেষ্টা চলে। ৮৯ সালে সেই তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ট্যাংক নামিয়ে পিষে দেয় গণতান্ত্রিক ছাত্রবিক্ষোভ।

ধনতান্ত্রিক দেশ মালয়েশিয়ায় গণআন্দোলনে সক্রিয় ছাত্র সমাজকে দমনে ১৯৭৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাল্টে ছাত্র সংগঠনগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। বামপন্থায় আকৃষ্ট ছাত্র সমাজ একটু ‘বেড়ে গিয়েছিল’ আরকি- ভূমিহীন কৃষক থেকে শুরু করে শহুরে গরিব মানুষের ইস্যু নিয়েও আন্দোলন করত। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইনেও ছাত্ররাজনীতির সুযোগ খুব সীমিত করে দেওয়ার ইতিহাস আছে। মিয়ানমারে ১৯২০ সালে ছাত্ররা জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জড়ালেও ষাট দশকে সেনা শাসন কায়েমের পর স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

বহু দেশেই দেখা যাবে ছাত্ররাজনীতিকে দমনে নানা কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। যে সব দেশে অন্যান্য সামাজিক শক্তি রাজনীতিতে বেশি প্রভাবশালী সেসব দেশেই ছাত্ররাজনীতি উন্মুক্ত। কারণ ছাত্ররাজনীতি সেসব দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠতে পারে না।

ইরানে ১৯৫৩ সালে জাতীয়তাবাদী, বামপন্থি ও ইসলামি সংগঠনগুলোর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত তিন ছাত্রকে সেদেশে এখনও মর্যাদার সাথে স্মরণ করা হয়। নিহত তিনজনের একজন জাতীয়তাবাদী, বাকী দুজন কমিউনিস্ট। সেদেশের এক সমাজবিজ্ঞানীর ইসলামি অনুপ্রেরণায় ছাত্রসমাজ ইসলামি বিপ্লবে শক্তি জোগায়। সেই দেশে এখন ছাত্রদের সংস্কার আন্দোলন দমন করা হয় শক্ত হাতে। সংস্কাবাদী ছাত্রদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধ মতাবলম্বী চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া চালু আছে। সিঙ্গাপুর ও চীনেও নাকি উচ্চশিক্ষা নিতে ছাড়পত্র প্রয়োজন হয় দাবী এক গবেষকের।

১৯১৮ সালে আর্জেন্টিনায় ধর্মভাবাপন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে গণধর্মী করে তোলার সংস্কার আন্দোলনের সফলতা নিখিল লাতিন আমেরিকার শিক্ষা ব্যবস্থায় বদল ঘটায়। তাদের ভাবনায় ছিল, গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক সমাজের পূর্বশর্ত। তখন থেকেই লাতিন ছাত্র সমাজ রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নিলেও কিউবার বিপ্লবীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসনকে পুঁজিবাদী রোগ হিসেবেই দেখে বলে জোসেফ তলচিন নামের এক বিশ্লেষকের অভিমত।

কোল্ড-ওয়ারের আমল থেকে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে গবেষণা করে আসা ফিলিপ অ্যালটবাখ পশ্চিমা নিরিখে মনে করেন-ছাত্ররাজনীতি মূলত বামপন্থি প্রবণ, প্রতিষ্ঠান বিরোধী এবং মতাদর্শ কেন্দ্রিক। জাপান, ভারতসহ পশ্চিমা দেশের ছাত্র আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করা এই পণ্ডিতের দাবী- ছাত্র সমাজের ক্ষুদ্র একটি অংশ শুধু আন্দোলনে জড়ালেও গণমাধ্যম তা অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করে থাকে। যদিও ষাট দশকে পশ্চিমা দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোথাও কোথাও ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার রেকর্ড রয়েছে। ছাত্ররাজনীতির এমন নাটকীয় অভ্যুত্থান সেসময় বেশিরভাগ ‘তৃতীয় বিশ্বে’র দেশে ঘটেনি অ্যালটবাখের হিসেবে। যুদ্ধের দামামার মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিরোধী জ্বরে ভুগেছে পশ্চিমা তরুণ সমাজই। ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির গবেষক সলমন লিপের অভিমত, ষাট দশকের ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার এই ছাত্র আন্দোলন আদতে বিংশ শতকের লাতিন আমেরিকার ওই ছাত্র আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিচালনায়, শিক্ষা নীতিমালা প্রণয়নে ছাত্রদের অংশগ্রহণ এবং সামরিক নীতি, সংখ্যালঘুর অধিকার, ‘তৃতীয় বিশ্ব’, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক- এসবে ষাট দশকের পশ্চিমের শিল্পোন্নত দেশের ছাত্ররাজনীতির সাথে তারও পঞ্চাশ বছর আগের লাতিন আমেরিকার ছাত্র আন্দোলনের সাদৃশ্য রয়েছে।

ছাত্ররাজনীতি বিষয়ক সার্বজনীন কোনও তত্ত্ব নির্মিত হয় নাই উপলব্ধি করা অ্যালটবাখ বলেছেন, বেশিরভাগ গবেষণা ও তত্ত্ব পশ্চিমা দেশের ছাত্র সমাজের ভিত্তিতে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ‘তৃতীয় বিশ্বে’র ছাত্ররাজনীতির তাপ নিয়ন্ত্রণ করে, তবে শিল্পে অনুন্নত দেশের ছাত্র আন্দোলন নিয়ে পশ্চিমা গবেষণাগুলো পক্ষপাতদুষ্ট। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে অন্যান্য দেশের ছাত্ররাজনীতির স্বাতন্ত্র্য রয়েছে, এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠনসহ পরিবেশ ভেদেও ছাত্রদের রাজনৈতিক সচেতনায় পার্থক্য ঘটে থাকে। স্বাধীন প্রপঞ্চের উপর ভিত্তি করে শিল্পে অনুন্নত দেশের ছাত্ররাজনীতি বিশ্লেষণের পক্ষপাতি এই সমাজবিজ্ঞানী বলছেন, এসব দেশে খুব কম ছাত্র আন্দোলন ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ইস্যুতে আবদ্ধ থেকেছে, দেশের বৃহত্তর রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে ছাত্ররাজনীতি। গবেষকরা মনে করেন, ছাত্ররাজনীতিতে সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগগুলোর শিক্ষার্থীরাই প্রধানত জড়িত হয়। লাতিন আমেরিকায় ছাত্র আন্দোলনের অগ্রণী শক্তি আইন পড়ুয়ারা আর আর্জেন্টিনার বিংশ শতাব্দীর আন্দোলনের সূচনা চিকিৎসাশাস্ত্রে ছাত্রদের দিয়ে। আদতে বিজ্ঞান ও প্রফেশনাল বিষয়ের শিক্ষার্থীরা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো থেকে সাধারণত দূরেই থাকে। পশ্চিমা দেশের সঙ্গে এসব দেশের ছাত্রনেতাদের বড় পার্থক্য অ্যাকাডেমিক রেজাল্টে, যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় ইংরেজি বিভাগের অনার্সে প্রথম হলে তার জন্য ছাত্রসংসদে আসন নির্ধারিত ছিল।

অনেক সমাজবিজ্ঞানীর ধারণা, সমাজ ও রাজনীতি সম্পৃক্ত পঠনপাঠনের প্রভাবে শিক্ষার্থীরা রাজনীতিমুখী হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শুধু ক্লাসরুমে আবদ্ধ নয়, ক্যাম্পাসজুড়েই নানা কাজে-অকাজের মাঝে জড়িয়ে আছে এই জ্ঞানার্জন। অ্যালবাখ মনে করেন, সমাজ সংস্কার বা বদলের ‘পূর্ণাঙ্গ’ দাওয়াই যুক্ত মতবাদেই ছাত্রসমাজ বেশি আকর্ষণ বোধ করে। তার এই মতের ভিত্তিতে আলোকপাত করা যেতে পারে ছাত্ররা কেন সাম্যবাদ আর ‘একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান’ ও পরকালের হাতছানি সম্বলিত ধর্মীয় ধারণায় আকৃষ্ট হয়।

ষাট-সত্তর দশকে পশ্চিম ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা যখন সমাজতান্ত্রিক ধারণায় তাড়িত ছিল, তখন সমাজতান্ত্রিক পূর্ব ইউরোপের ছাত্র সমাজ কমিউনিস্ট শাসন বিরোধী হয়ে উঠতে দেখা যায়। বিক্ষোভের অংশ হিসেবে বেলগ্রেড ইউনিভার্সিটির নামই বদলে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটায় ছাত্ররা।

উন্নত দেশের চাইতে অনুন্নত দেশে ছাত্ররাজনীতি সমাজে বেশি প্রভাবশালী হওয়ার কিছু কারণ দেখেছেন অ্যালটবাখ। তিনি মনে করেন, দুর্বল গণমাধ্যম, অকার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা, শক্তিহীন  ট্রেড ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষের অভাব এই ছাত্ররাজনীতির গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। সংখ্যাল্প শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্বলিত এসব দেশে দৃঢ় রাজনৈতিক মতাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির ছাত্র সমাজকে সহজে সংগঠিত করা যায়। তাই মূক-মূঢ় মানুষের পক্ষে রাজনীতিতে ভূমিকায় নামে। সমাজে নতুন চিন্তা-সচেতনার বাহন তারাই। ‘তৃতীয় বিশ্বে’ রাজধানীতে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ তাই এত প্রভাবশালী। আর বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রসমাজের ওপর যেকোন ধরনের দমন ছাত্র আন্দোলনকে বরং প্রবল করে তোলে। এসব ব্যাপার দিয়ে ছাত্ররাজনীতির প্রভাব দেশে কতটা থাকবে অথবা থাকবে না তার হিসেব যেমন করা যায়, আবার সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি ও গোষ্ঠী ছাত্ররাজনীতি নিয়ে শঙ্কিতও বন্ধের পায়তারার কারণও অনুমান করাও যেতে পারে। একটি কথা এখানে বলে রাখা ভালো, রাজধানীর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনও দুর্গম অঞ্চল নয়, এখানে দীর্ঘ মেয়াদে আগ্নেয়াস্ত্র সমাগম ঘটানো রাষ্ট্রীয় কোন না কোনও এজেন্সির আনুকূল্য ছাড়া কি সম্ভব? অভি-নিরুদের আমলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রবাজির ইতিহাস পর্যালোচনা করা যেতেই পারে।

সম্প্রতি ডাকসু নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ বিরোধী সব পক্ষ ছাত্র সমাজকে বারবার মনে করিয়ে দিতে চেষ্টা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-সংসদে সরকার বিরোধী শক্তিই বিজয়ী হয়ে আসছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বিশ্বব্যাপীই ‘প্রতিষ্ঠান’ বিরোধিতা ছাত্র আন্দোলনের প্রধান মেজাজ। এ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের আপত্তি চোখে পড়ে না। তবে এই কথার মধ্যে আরও কথা আছে।

উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতে আমরা কী বুঝি? এর চৌহদ্দি, ভবন, সড়ক, গাছপালা, চাকুরেরা? এর সবই বহাল রেখে উচ্চশিক্ষা ব্যাপারটি উধাও করে দিলে সেটাকে কি বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায়? নিশ্চয় না। উচ্চশিক্ষা প্রপঞ্চটির অনুপস্থিতিতে সেটিকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ধরে নিতে দ্বিধা থাকলে স্বীকার করতেই হয় এই শিক্ষা ব্যাপারটাই এর প্রতিষ্ঠানিক ভিত্তি। মানতেই হচ্ছে-বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষা পাচ্ছে তার অনুগামী হয়েই ছাত্র সমাজ তার কাঙ্ক্ষিত রাজনীতি-আন্দোলনের কল্পনাটি গড়ে তোলে। তার সাক্ষ্য দিচ্ছে- ডিসিপ্লিন ভেদে ছাত্রদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সক্রিয়তায় তারতম্য তাবৎ বিশ্বেই। এ অর্থে ছাত্ররাজনীতির মেজাজ প্রতিষ্ঠান বিরোধী নয়, বরং উল্টোটাই সত্য বলা যায়- বিরোধী কর্তৃত্বের বিরোধী। প্রতিটি শিক্ষার্থীর পারিবারিক, ধর্মীয়, জাতিগত, সাংস্কৃতিক, শ্রেণিগত ইত্যাদি নিজস্ব যা কিছুই সঙ্গে নিয়ে আসুক না কেন, তার সাথে মিথস্ক্রিয়া ঘটছে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার বিষয়াবলির। মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আসার জন্যই শুধু নয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের মনোজগতে ক্ষমতাসম্পন্ন মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার স্বপ্নও তাদের এসব সক্রিয়তায় কাজ করে।

আর্জেন্টিনায় ধর্মবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সরকারের হস্তক্ষেপ যেমন ছাত্র সমাজের সমর্থন পেয়েছে, আবার বাংলাদেশে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সেনা বাহিনীর গুলিতে শহীদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরের দায়িত্বেরত ড. জোহা ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে থাকায় মর্যাদার সাথে আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। ফলে ছাত্র সমাজের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার অর্থটি সরলভাবে না নিয়েই বলতে হয়, ছাত্র বিক্ষোভের বিরোধিতা করলে কী এশিয়া, কী ইউরোপ বা আমেরিকা- ছাত্র রাজনীতির মেজাজ সবখানেই ‘প্রতিষ্ঠান’ বিরোধী, তা দেশের সরকার হোক অথবা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। লক্ষ্যণীয়, বিশ্বব্যাপী তারুণ্যের এই স্বাধীনচেতা মেজাজ দেখতে ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বিকাশের জন্য অপেক্ষা করতেও হয়েছে। ১৮০০-তে উত্তর আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাতী প্রার্থনাকালে পায়ে সামান্য আওয়াজ করায় কয়েকজন ছাত্রের বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ আন্দোলনে নামে।

বিগত শতাব্দীতে শিল্পোনুন্নত দেশে জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছাত্ররা সোচ্চার হয়, যেখানে স্বাধীকার ও মাতৃভাষা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের আগেই ইন্দোনেশিয়ায় রাষ্ট্র ‘ভাহাষা ইন্দোনেশিয়া’র দাবিতে আন্দোলন করেছে ছাত্র সমাজ। আফ্রিকার দেশে দেশে স্বাধীনতার পর মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিও স্বাধীকার আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল।

স্বাধীনতা আন্দোলনে বড় অবদানের কারণে ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশে। এদেশে ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থেকে গড়ে ওঠা সব রাজনৈতিক দলের পেছনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা থাকায় ছাত্ররাজনীতি বন্ধের ষড়যন্ত্রের ভাবনা বঙ্গবন্ধুর আমলে দেখা যায়নি, লড়াপেটা ছিল। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ বিরোধী দল জাসদ গঠনে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন ছাত্রলীগের একাংশের নেতারাই। হুট করে তা ঘটেওনি। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতেও ছাত্রসভায় দুই ধারার স্লোগান চালু ছিল আগে থেকেই।

জ্বলজ্বলে এই অভিজ্ঞতাই হয়তো রাজনীতিতে পা বাড়ানো সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানকে স্বাধীন ছাত্র সংগঠন গড়ায় আস্থা জোগায়নি। ছাত্র সংগঠন রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক আনুগত্যে অঙ্গসংগঠন হিসেবে বাঁধা পড়ে। এতে রাজনৈতিক দলের ক্ষতি না হলেও আপাত স্বাধীনতা হারায় ছাত্ররাজনীতি। অথচ এর বিরোধিতা করে কোনও ছাত্র আন্দোলন হতে দেখা যায়নি। গত সেনা সমর্থিত তত্ত্ববধায়ক সরকার গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। রাজনৈতিক দল ছাত্র সংগঠনকে অঙ্গসংগঠন করে রাখা থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। তবে দলগুলোর মতাদর্শিক বন্ধু ছাত্রসংগঠনগুলো এখনও মনোস্তাত্ত্বিক মুক্তি অর্জন করেনি, সাংগঠনিক তল্পিবাহক হয়েই রয়েছে। মতাদর্শিক আনুগত্যের বাইরে ছাত্রসংগঠনের সাংগঠনিক স্বাধীনতা কার্যকর না হওয়ার প্রভাব ডাকসু নির্বাচনে কি পড়েছে? ইস্যুভিত্তিক ছাত্র আন্দোলনের ‘স্বতন্ত্র’ নেতারা টপকে গেছে মতাদর্শ ভিত্তিক ছাত্রসংগঠনগুলোকে।

অবশ্য ‘সামাজিক ন্যায় বিচার’ ভিত্তিক ছাত্র আন্দোলন একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বে কেন জোরদার হচ্ছে, এই প্রেক্ষিতটিও ভাববার। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ছাত্র সমাজের আন্দোলন এই প্রেক্ষিতে সংগঠিত হতে দেখা যাচ্ছে, এসব রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা অনিশ্চিত যেমন, তেমনই এসব বিক্ষোভ বিপ্লবী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

জাতীয় পার্টির নেতা জিএম কাদের লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ছাত্র রাজনীতি বন্ধের উদ্যোগ নিলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন চাইতেন, তবে তা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্র সংগঠনের ভিত্তিতে নয়। এরশাদ আমলে পরপর দুবছর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ বামপন্থি ছাত্রনেতারা বিজয়ী হন। এই নির্বাচন এবং এরপর ছাত্রনেতাদের বিদেশ ভ্রমণের উদ্যোগের পেছনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফরের উৎসাহ ছিল। তবে এই ব্রিটিশ-চাল শেষ রক্ষা করাতে পারেনি।

শুরু থেকেই ছাত্র আন্দোলনে নাজেহাল ছিলেন সামরিক শাসক এরশাদ। ছাত্র সমাজকে নিয়ন্ত্রণে বারবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করতে হয়। ফলে চার বছরের শিক্ষাজীবন শেষমেশ আট বছরে গিয়ে ঠেকে। ছাত্র আন্দোলন দমনে ‘বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ’ ঘোষণার অস্ত্র প্রাচ্য-প্রতীচ্যে সবখানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ছাত্র আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন হয়। এর ঘাড়ে পা রেখে দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর আর ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি! এটা কি ছাত্ররাজনীতি দমন নয়?  দীর্ঘ ছাত্র জীবন ও দীর্ঘ বিরতিতে পরীক্ষার ইউরোপীয় পদ্ধতি ছাত্ররাজনীতির সহায়ক বলেই ধারণা সমাজবিজ্ঞানীদের। নির্বাচিত সরকারের আমলে একে একে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কোর্স পদ্ধতির বদলে নিবিড় তত্ত্বাবধানের আমেরিকান স্টাইল সেমিস্টার-ক্রেডিট পদ্ধতি চালু হয়। স্বাধীনতার পর গণধর্মী হয়ে ওঠা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হয়নি। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশে স্কুল পর্যায়েই নিবিড় পরীক্ষা ভিত্তিক শিক্ষার বিশাল কার্যক্রম গড়ে তোলা হয়েছে, যা শিশুদের ক্লাসের পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু করার সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। শিশুদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকরাও আটকে গেছেন এই চক্রে।

বিগত তিন দশক ধরে চলা তারস্বরে রাজনীতির নিন্দায় সুশীল সমাজ, করপোরেট, তাদের গণমাধ্যম, রাষ্ট্রের এজেন্সি সবাইকেই কম-বেশি সামিল হতে দেখা যায়। এই সময়েই দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক বেসরকারিকরণ ঘটে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে না পারলেও প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটি থাকে ছাত্ররাজনীতি ‘মুক্ত’। ‘মানসম্পন্ন শিক্ষার’ প্রলোভন দেখিয়ে ইংরেজি শিক্ষা মাধ্যম গ্রাস করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে। পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতিতে ঘটে নানা বিভ্রম। শিক্ষা ব্যবস্থা বাণিজ্যিকীকরণের কালে ছাত্ররাজনীতি ব্যস্ত থাকে মূলতই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যিকীকরণ প্রতিরোধে, সেশন ফি বৃদ্ধি না করায়, যৌন নিরাপত্তা ইত্যাদি ইস্যুতে। আর সব চেয়ে বড় ভ্রান্তি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজকে শত্রু হিসেবে দেখায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন কাঠামো সরকারি আমলাদের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কের সুবিধাজনক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক সমাজের বেতন বৃদ্ধির দাবী না তুলেই শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্যিকীকরণ বিরোধী আন্দোলন গড়েছে।

অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মারামারি আর রাজনীতির দিকে আঙুল তুলে বাণিজ্যিকভাবে একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবীতে ডান-বাম কোনও ছাত্রসংগঠনকে আন্দোলন করতে দেখা যায়নি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট আরোপের বিরোধিতা হলেও টিউশন ফি গাত্রদাহ ঘটাচ্ছে না এখনও।

অথচ বিশ্বব্যাপী করপোরেট উচ্চশিক্ষাই ছাত্র সমাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমা দেশেও এর বিরুদ্ধ আন্দোলন যে নেই তা নয়। গত শতাব্দীর ছাত্র সমাজের রাজনৈতিক মেজাজ বেঁধে দিয়েছিল রুশ বিপ্লব। হেন কোনও দেশ নেই যেখানে ছাত্ররাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক চেতনা নিয়ামক শক্তি হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই মতাদর্শের প্রভাব স্তিমিত হয়ে এলেও বিলীন হয়ে যায়নি। তবে ঐতিহ্য ও ধর্মীয় চেতনা ছাত্ররাজনীতিতে জায়গা করতে শুরু করে- আফ্রিকাজুড়ে ইসলামপন্থি রাজনীতির ভিত্তি গড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজই বলছেন Revolt and Protest: Student Politics and Activism in Sub-Saharan Africa  এর লেখক লিও জাইলিগ। স্বাধীনতা উত্তর এই আফ্রিকায় ছাত্র সমাজ ইংরেজি-ফ্রেঞ্চ-পর্তুগিজ ভাষার বদলে শিক্ষাঙ্গনে মাতৃভাষা-সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়েছিল। ওহাবি ধর্মান্ধ দেশ হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবের জন্যও ‘জিহাদ’ স্বস্তির ব্যাপার নয়। যেদেশে  প্রাক ১৯৭৫ রেডিও-টিভির মতো মাধ্যমেরও বিরোধিতা উচ্চকিত ছিল, একবিংশ শতকে সেই সৌদি আরব থেকে সরকারিভাবেই লাখ লাখ ছেলেমেয়েকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ ৩৩টি দেশে পড়তে পাঠানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিরাজনীতিকরণের চেষ্টার মাঝেই ইসলামি রাজনীতির বিকাশ হতে থাকে- জেলার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই শুধু নয়, ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এর আখড়া হয়েছে। আফ্রিকার মতো এদেশেও মেধাবী ছাত্রদের টার্গেট করে এই কার্যক্রম পরিচালিত হতে দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি এই প্রবণতার বাইরে? মনে হয় না। সমালোচনামূলক বিচার অনুশীলন বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনের ভিত্তি বলে ধরা হয়, সেখানে কওমি মাদরাসার পঠনপাঠনের কোনও পর্যালোচনা ছাড়াই উচ্চশিক্ষা হিসেবে স্বীকৃত হয়ে গেছে! আমার দেখছি বছর বছর স্কুল সিলেবাসে সমালোচনামূলক বিচার অনুশীলনের ক্ষেত্র প্রস্তুতের বদলে বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেওয়া প্রবণতা হচ্ছে। এক ধরনের দমননীতির কারণে বিশ্বাস নির্ভর রাজনীতির উত্থানে ঠেকিয়ে রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই দমন অকার্যকর দুনিয়াব্যাপী তা প্রমানিত। ফলে বিরাজনীতিকরণ, শিক্ষা বাণিজ্যিকরণের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ও বাম ধারার ছাত্ররাজনীতি এই শক্তির মুখোমুখি হবে নাকি সহযোদ্ধা হবে? ইসলামি দেশগুলোর ইতিহাস কি বলে, অথবা বাংলাদেশেই সেক্যুলার লেখকদের প্রাণনাশের ঘটনাগুলো?  বাংলাদেশে বিচিত্র ধারার শিক্ষার বিকাশ রক্তক্ষরণের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, নাকি বাজার ব্যবস্থার মীমাংসায় বিলীন হবে?

কয়েক বছর থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ছাত্রসংসদ নির্বাচন হচ্ছে। অথচ সদ্য সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কওমি মাদরাসা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এমন কোনও নির্বাচনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। কেন? ওখানকার ছাত্র সমাজের গণতন্ত্র অনুশীলনের কি প্রয়োজন নেই?

এই সব ঘটনার মধ্যেই নিরবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করে এক ধরনের বিরাজনীতিকরণ শক্তির বিরুদ্ধে ছাত্ররাজনীতির রেজিমেন্ট বিকাশের সুযোগ করেছে সরকার। বিরাজনীতিকরণের প্রভাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনেও ছায়া ফেলেছে-স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কোনও কোনও ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংগঠনের প্রার্থীদের টপকে গেছে। তারপরও ছাত্র সংগঠনগুলো মধ্যে প্রতিযোগিতার কর্ম চাঞ্চল্য রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক রেজিমেন্টকে শক্তিশালীই করবে, তবে তার অনেকটাই নির্ভর করছে সাংগঠনিকভাবে কতোটা স্বাধীন হয়ে কাজ করা যাচ্ছে তার ওপর।

মুজতবা হাকিম প্লেটোসাংবাদিক

Responses -- “ছাত্ররাজনীতির অবমুক্তি, ষড়যন্ত্র কি বন্ধ?”

  1. সৈয়দ আলি

    প্লেটো, ডাকসু নির্বাচনকে আপনি বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির অবমুক্তি অভিহিত করছেন? পরিষ্কার যেখানে ছাত্রলীগের অনুমতি সাপেক্ষে সব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যে তথাকথিত ‘নির্বাচনে’ শিক্ষকেরা রাতে ব্যালট বাক্সে সিল মেরে রাখে সেখানে ছাত্র রাজনীতি বলে কিছু আছে? যে কেউ শেখ হাসিনা বিরোধী একখানি পোস্টার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোন স্থানে দাঁড়াক, আপনার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও ভয়াবহ হাতুরিপেটা বা আরো ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে তা আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি।
    আপনার অতীতের নিরপেক্ষতা ফিরুক, আমার সেটাই কামনা। ধন্যবাদ।

    Reply
  2. MD LUTFUL KABIR

    এসবের মাঝে আবার যুক্ত হয়েছে সাইন্স, আর্টস, কমার্স নামের বৈষম্যমূলক শিক্ষা। শিক্ষা পলিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার পূর্ণ মদদদাতা। একজন ছাত্র সারাজীবনই ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, গণিত, বাংলা, ইংলিশ সব শুধু পড়বেন আর পড়বেনই; কষ্ট করবেন; জীবনের মূল্যবান সময় ইনভেস্ট করবেন; বাবা-মা সন্তানের পিছনে টাকাপয়সা খরচ করবেন; দিনশেষে শুধু এটা দেখার জন্য যে দেশে পর্যাপ্ত চাকুরির সুযোগ নাই; ইনফ্রাস্ট্রাকচার/অবকাঠামো নাই (তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সেই সক্ষমতাও নির্ণয় করা জরুরী); সম্মান ও সম্মানীও (বেতনকাঠামো) তুলনামূলক কম বা সামাজিকভাবে সন্তুষ্ট হবার মতো না; উপরন্তু, আপনার মধু অন্যজন খাচ্ছে; আপনি যা অর্জন করেছেন তার কানাকড়ি না করেও আপনার উপরে চলে যাচ্ছে শুধুমাত্র বৈষম্যমূলক শিক্ষা পলিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার কারণে। একজন সারাজীবন সবকিছু করবেন আর একজন কিছু না করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দেবেন, লাঠিয়াল বাহিনী বানাবেন, নেতা হবেন… আহা কি বৈষম্য।
    স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় যে মেধাকে লালন করে তা যতটা না ট্যালেন্ট তার থেকেও বেশি হচ্ছে অনেকগুলো মানবীয় ভালো গুণাবলীর সমষ্টি। বিষয়টি শুধু এমন নয় যে, একজন বিজ্ঞানের ছাত্র শুধু ফিজিক্স/কেমিস্ট্রি/গণিতের ভাষা বোঝে বরং এইসব জানার জন্য তিনি দিনে দিনে যে সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা, কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা, অন্যদের থেকে আলাদা (StandOut), মা-বাবা-শিক্ষকদের বিধিনিষেধ মানা প্রভুতি। এসব গুণাবলীর সবগুলই হয়তো সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে না কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা অন্যান্যগ্রুপের ছাত্রছাত্রীদের থেকে তুলনামুলকভাবে বেশি থাকার কথা এবং তা কারোরই অজানা থাকার কথা নয়।
    ^^^ পরিশেষে যে প্রশ্নটির জন্ম দেয় তা হলঃ তাহলে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মিশন-ভিশন কি? যদি তারা ভালো বিজ্ঞানী চায় তবে তার সুযোগ- সুবিধা নেই কেন? আর যদি তারা ভালো প্রশাসন ও নেতৃত্ব চায় তাহলে এতো এতো ভালো মানবীয় গুণাবলীর ছেলেমেয়েদের সেইভাবে গড়ে তুলে কাজে লাগানো গেলো না কেন? নাকি সারাজীবনই আমরা, ইউরোপ-আমেরিকার জন্য বিজ্ঞানী বানাবো? আর যদি সেটাও বানাই তাহলে প্রশ্ন হলঃ দেশ থেকে এক্সপোর্ট করা বিজ্ঞানী নাকি দেশের জন্য দক্ষ প্রশাসন ও নেতৃত্ব? কোনটি বেশি জরুরী?

    Reply
  3. আবুল কাশেম

    লেখাটি তথ্যপুর্ণ। তবে বিশাল স্প্যানে লিখতে গিয়ে প্রতিপাদ্য বিষয়টি অগোছালো মনে হতে পারে। আমার পিএইচডির বিষয় ছিলো ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস। অবশ্য তা বাংলাদেশের (১৯০৫-১৯৬৯)। ঐ সময় পৃথিবীর সব দেশের ছাত্র রাজনীতি/আন্দোলন বিষয়ে পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। পরে আল্টবাকের মত বিশেষজ্ঞদের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। তারাকেউ আর ঐ বিষয়ে লেখেন না বা ওটার চর্চা বাদ দিয়েছেন। পৃথিবীর অনেক দেশে বাংলাদেশের চেয়ে ভিরুলেন্ট ছাত্র রাজনীতি/আন্দোলনের ইতিহাস আছে। কিন্তু পোস্ট সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার পিরিয়ডে ঐ সকল দেশের পলিএিক্যাল ইন্টিটিউশনসমূহ শক্তিশালী হয়েছে। ফলে ঐ সকল দেশে রাজনীতির সহযোগী শক্তি হিসেবে ছাত্র রাজনীতির গুরুত্ব কমে গেছে। আরেকটি বিষয় বলি। পৃথিবীর সকল দেশেই কখনও না কখনও কোনো না কোনো ফর্মে ছাত্র রাজনীতির অস্তিত্ব ছিলো। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের তিন দেশ ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মত অন্য কোনো দেশে রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ছাত্র সংগঠনের স্বীকৃতি নাই।

    Reply
  4. saif shams

    ইতিহাসগুলো জেনে ভাল লাগল। কিন্তু, বাংলাদেশের বর্তমান প্রক্ষাপটে, ছাত্ররাজনীতির বিকাশের সুফল/কুফল নিয়ে আলোচনা করলে আরো ভাল লাগত।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—