ভয়ঙ্কর কথাটিও এই ভয়াবহ নারকীয়তার কাছে নিতান্তই মামুলি একটা শব্দ। নিউজ়িল্যান্ডের সন্ত্রাসী হামলাকে আমরা কোন অভিধায় অভিহিত করব? এটাও তো জঙ্গি হামলা! সাদা চামড়ার শ্রেষ্ঠত্বজাত সন্ত্রাস! না কোনো ভাবেই এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। কী ভাবে আপাত-শান্তিময় একটি দেশের অন্তঃস্থলে এত বিষাক্ত বিদ্বেষ লুকিয়ে ছিল, তা গোটা দুনিয়ার নতুন গবেষণার বিষয় হবে।

কিন্তু সময়টা নিছক গবেষণার সময় নয়, তত্ত্বের সময় নয়, এমনকি বিলাপবাক্য আওড়াবার সময়ও নয়। এখন স্তব্ধ হয়ে ভাববারও সময় যে, এই যদি মানুষের চিন্তা, ভাবনা ও কাজের নমুনা হয়, তা হলে মানুষ নামক ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক জীব থেকে মানুষকে রক্ষা করবার উপায় কী! মসজিদে নামাজ পড়বার জন্য যারা গিয়েছেন, নারী শিশু বৃদ্ধসহ সবাইকে পেছন থেকে বন্দুকের গুলি চালিয়ে মেরে ফেলাই কেবল এই ‘নৃশংস’ হামলার একমাত্র পরিচয় নয়, সঙ্গে সঙ্গে তার ‘লাইভ ভিডিও’ চালু করে সারা পৃথিবীর মানুষকে এই রক্ত-উৎসব দেখাবার ব্যবস্থা করাও এক ভয়ঙ্কর নৃশংসতা! হেলমেটের সঙ্গে ভিডিও ক্যামেরা ফিট করে তা চালু করে হামলার ভাবনাটিও অশ্রুতপূর্ব। বাস্তবিক, নিউজ়িল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার সর্বাপেক্ষা ত্রাস-ধরানো, স্তব্ধ করে দেবার বিষয় সম্ভবত এটাই। জঙ্গি হামলায় রক্ত দেখবার ও দেখাবার এই আশ্চর্য ‘খেলা’ মানবসভ্যতা এমন ভাবে আগে দেখেছে কি?

মুহূর্তে এই ঘটনা যে ভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় অসংখ্য মানুষের দেখার বিষয় হয়ে উঠল, তাও রক্ত শীতল করে দেয়। প্রযুক্তি আজ এমনই ক্ষমতা মানুষের হাতে দিয়েছে, আর মানুষ এমন ভাবেই তার অপব্যবহার শিখেছে। ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দ্রুত এই লাইভ স্ট্রিমিং বন্ধ করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বটে, কিন্তু আরও অনেক দ্রুততার সঙ্গে মানুষ বিশ্বের কোণে কোণে তা লুফে নিয়েছে। মানুষের সঙ্গে যে প্রযুক্তি পাল্লা দিতে পারে না, পারবে না, তার আর একটি দৃষ্টান্ত ক্রাইস্টচার্চে দেখা গেল। কেবল সন্ত্রাস নয়, এই রক্তলোলুপ ‘ডিজিটাল এজ’-কে নিয়েই বা মানুষ কী করবে, তাও গভীর দুঃখের সঙ্গে ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

দুঃখ, আতঙ্ক ও সমবেদনা, এই সবই আবার ক্রমে, ধীরে, এক ধরনের আশার প্রতিশ্রুতিতে নিয়ে যেতে পারে, যদি শুভবোধ জেগে থাকে। নিউজ়িল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা অ’ডুর্ন তার প্রমাণ। যে ভাবে তিনি ‘প্রত্যাখ্যান’-এর প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছেন, তা কেবল তার দেশকে নয়, বিশ্বের অপরাপর অনেক দেশকে— অনেক দেশের সন্ত্রাস-শোকাহত মানুষকে— স্বস্তির প্রলেপ দিবে। বহু দশক ধরে তার দেশ বহুত্বের পীঠভূমি হয়ে উঠেছে এবং হতে পেরেছে বলেই তার দেশকে এই আঘাত সহ্য করতে হলো, এই কথাটি এমন স্পষ্ট ও নির্ভীক ভাবে বলবার মধ্যে, এমনকি আপন পোশাক নির্বাচনের মধ্যে, বহুত্ব রক্ষার কঠিন প্রতিজ্ঞাটিও তিনি তুলে ধরলেন।  তিনি আর একটি কথাও মনে করিয়ে দিলেন। হিংসাকে কী ভাবে ‘প্রত্যাখ্যান’ করতে হয়, তা বিশ্ববাসীকে নিউজ়িল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর কাছে শিখতে হবে। শিখবার ইচ্ছে আছে কি না, তা অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন।

নিউজিল্যান্ডের ঘটনা আমাদের চোখের সামনে আরও একটি সত্য তুলে ধরেছে। এ ঘটনাটি অবশ্য নিউজিল্যান্ডের নয়, অস্ট্রেলিয়ার। হ্যাঁ, ক্রাইস্টচার্চের ঘটনা ঘটিয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এক জাত্যাভিমানী যুবক। সে এখন বিশ্বের কাছে এক ঘৃণ্য খল চরিত্রে পরিণত হয়েছে। পক্ষান্তরে এই ঘটনার পরোক্ষ জের ধরে এক অস্ট্রেলীয় কিশোর বিশ্ববাসীর কাছে ‘হিরো’ হয়ে উঠেছে। ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়ের একটা সর্বজনীন রূপ আছে, ক্ষোভ-বিক্ষোভেরও একটা স্বতন্ত্র ধরন আছে, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন ওই কিশোর।

ধর্ম বিদ্বেষী মন্তব্যের প্রতিবাদে সিনেটরের মাথায় ডিম ফাটিয়েছেন। তার জেরে রাতারাতি তারকা বনে গেছেন অস্ট্রেলিয়ার সেই কিশোর। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার পাশে দাঁড়িয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। মুক্তহস্তে তার জন্য দান করেছেন। যাতে একদিনেই ২৮ লক্ষ টাকা উঠে এসেছে।

যে শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীর হামলায় নিউজিল্যান্ডের চার্চগেটে দু’টি মসজিদে প্রাণ হারান ৫০ জন নিরীহ মানুষ, সেই হামলাকারীর সমালোচনার বদলে, গোটা ঘটনার জন্য মুসলিম অভিবাসী ও শরণার্থীদেরই দায়ী করেন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের সিনেটর ফ্রেজার অ্যানিং। তাঁর মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়।

তার মধ্যেই শুক্রবার মেলবোর্নে সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হন ফ্রেজার অ্যানিং। সেই সময় পেছন থেকে তার মাথায় কাঁচা ডিম মারে উইল কনোলি নামের ওই কিশোর। মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় সেই ভিডিও। তাতে উইলকে দু’ঘা বসিয়ে দিতেও দেখা যায় ফ্রেজার অ্যানিংকে।

গোটা ঘটনায় উইল কনোলির পাশেই দাঁড়ান বিশ্বের কোটি কোটি সংক্ষুব্ধ মানুষ। সমালোচনা করেন ফ্রেজার অ্যানিংয়ের। এমনকি সিনেটর পদ থেকে তার অপসারণ চেয়ে ইতিমধ্যে পিটিশনেও সই করেছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। তবে ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। তাতে উইলকে আইনি ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। তাই তার জন্য ‘গো ফান্ড মি’ ওয়েবসাইটে ‘মানি ফর এগবয়’ নামের একটি দান তহবিল গড়ে তোলা হয়।

বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দুই লক্ষ টাকার মতো সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে ওই তহবিলটি গড়া হয়েছিল যদিও, যাতে উইলের আইনি খরচও উঠে আসে এবং আরও ডিম কেনা যায়। কিন্তু একদিনেই তাতে ২৮ লক্ষ টাকা জমা পড়ে। প্রায় তিন হাজার মানুষ উইলের জন্য মুক্তহস্তে দান করেছেন। ৩০ হাজার টাকার বেশিও জমা দিয়েছেন কেউ কেউ। তবে অত টাকা নিতে রাজি নয় বলে অষ্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে উইল। আইনি খরচ বাদ দিয়ে পুরো টাকাটাই ক্রাইস্টচার্চ হামলায় নিহতদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সে।

একদিকে সন্ত্রাস, অন্যদিকে প্রতিবাদ, মানবতা। নিউজিল্যান্ডের ওই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর কেউ যখন কোনো কিছু করতে না পেরে মাথা কুটছিলেন, তখনই যেন ওই ‘এগবয়’ সবার প্রতিবাদের সত্তা হয়ে দেখা দিলেন। সবার মন জয় করে নিলেন। বন্দুকের গুলিতে নিরীহ মানুষের শরীর ঝাঁঝড়া করে দেওয়ার মতো নরাধমকে আমরা যেমন দেখলাম, একই দেশের এক কিশোরকেও আমরা দেখলাম প্রতিবাদের ঝাণ্ডা তুলে দাঁড়াতে!

উইল কনোলি মোটেও ‘এগবয়’নয়, ওই তো হিরের টুকরো ছেলে, গোটাবিশ্বের ‘ডায়মন্ড বয়’! ওই তো আশার আলো। ক্ষমতালোভী মতলবি শাসকের মাথায় ডিম ভেঙ্গে, সন্ত্রাসী-দানবদের মুখে ঝামা ঘষে মানবতার ও সভ্যতার পতাকাকে উইল কনোলিই যেন অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

স্যালুট তোমায় ভাই আমার!

চিররঞ্জন সরকারকলামিস্ট।

Responses -- “মানুষ নামক ভয়ঙ্কর জীব থেকে মানুষকে রক্ষার উপায় কী!”

  1. Fazlul Haq

    বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তন করে জনগণের ক্ষমতায়ন বিশিষ্ট গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেখানে রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিটি বিভাগে( আইন প্রণয়ন, আইন প্রয়োগ তথা নির্বাহী এবং বিচার)জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহন থাকবে। তাহলে সমাজে অহিংসা পরম ধর্ম এবং জীবে দয়া করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর প্রভৃতি ধর্মের অমোঘ বাণী বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। প্রচলিত দলবাজির গণতন্ত্র বাদ দিতে হবে।

    Reply
  2. মাসুদ

    আমাদের ছেলেরা প্রতিবাদ করলে তারা হয় জামাত-শিবির, রাজাকার। হামলা, মামলা, গুম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার।

    Reply
  3. নোয়াখাইল্যা সুমন

    আঁই অ ত আঙ্গো দ্যাশের ন্যাতাগো (ক্ষমতালোভী মতলবি শাসক) মাতাত আন্ডা ভাইংতাম ছাই, জুতা মাইত্তাম ছাই। খালি ক্রসফায়ারের ডরে হারি না।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—