নিউজিল্যান্ডের ঘটনায় মানুষ আজ স্তব্ধ। যেন জানের বদলা জান নিতে নিতে সভ্যতা উজাড় করে দেয়া। মণীষিরা বলেছিলেন চোখের বদলা হিসেবে চোখ নিতে নিতে মানুষ একদিন অন্ধ হয়ে যাবে। যেন তার প্রতিচ্ছবি দেখলাম ক্রাইস্টচার্চে। কিউই-দের দেশ সাধারণত শান্তিপূর্ণ বলে পরিচিত। এর কারণও আমাদের জানা। যখন থেকে বুশ-ব্লেয়ার-সাদ্দাম-গাদ্দাফীর রাজনীতি শুরু তখন থেকে দুনিয়া অশান্ত।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা নিয়ে বুশ যখন ঘোষণা দিলেন- আমার সাথে না থাকলে তুমি দুশমনের দলে তখনও এই দেশ কারো দিকে যায় নি। আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এমনকি নেপথ্যে ইউরোপ যখন এক কাতারে তখন পাশ্চাত্যমুখী সমাজ ও উন্নত দেশ নিউজিল্যান্ড ঘোষণা দিয়েছিল তারা কোনও দলে নাই। সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্ক তার অবস্থান নিয়েছিলেন শান্তির শর্তে। তখন থেকে ধারণা করা হয়েছিল এই দেশ আর যাই হোক সন্ত্রাসের স্বীকার হবেনা। ‘ইসলামী জঙ্গি’ নামের কেউ সেদেশে হামলা করেনি বা করবে এমন কোনও পরিকল্পনাও শোনা যায় নি।

তাহলে সে দেশে কেন এই নির্মম হত্যাকাণ্ড? তাও মসজিদে। হত্যাকারী অবশ্য তার লিখিত ইশতেহারে বলে দিয়েছে কেন এই দেশকে বেছে নেওয়া হয়েছে। তার মতে এ কাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে হলে মিডিয়া ফোকাস পাবেনা। সেখানে মানুষ মারা, পাখি হত্যা সমান বিষয়। এ ঘটনাই প্রমাণ করে মানুষের জীবন কতো তুচ্ছ সেখানে। আর একটা বিষয় এই, মানুষের জীবন দুনিয়ার কোনও দেশে কোনও সমাজে আর নিরাপদে নাই। ধর্মের নামে দেশে দেশে তার জানমাল অনিরাপদ আর আক্রমণের মুখে। এমন একটা অল্প জনসংখ্যার দেশে এ জাতীয় বর্বর হত্যাকাণ্ড বলে দেয় দুনিয়ায় শান্তি বলে কিছু অবশিষ্ট নাই।

এবার আমরা অর্থাৎ বাংলাদেশিরাও আক্রান্ত হয়েছি। জান গেছে আমাদের দেশের মানুষের। যারা ছিলেন নিরপরাধ আর ধার্মিক। ধার্মিক হওয়াটা দোষের না। ধর্ম একসময় মানুষকে পথ দেখিয়েছিল সমাজ বিশ্লেষক আর ধর্ম নিয়ে গবেষণাকারীরা বলছেন, ষোড়শ শতাব্দীতে মানুষ যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে তেমন জানতো না তখন ধর্ম তাদের পথ দেখিয়েছিল। তাদের মতে, সপ্তাদশ শতাব্দী থেকে ধর্ম ও মানুষের মূল্যবোধ একদিকে যেমন একাত্ম হতে শুরু করেছিল, আরেকদিকে প্রশ্ন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল মনে। সে প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারা মানুষের সাথে ধর্মের ব্যবধান বাড়তে লাগলো অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে। এখন এ দুই সত্ত্বা যে মুখোমুখি তা আর বুঝিয়ে বলার দরকার পড়েনা।

সে যাই হোক এবারের ঘটনাটি একদিকে যেমন ক্রোধের, আরেক দিকে চরম বেদনার। ক্রোধের কারণ মানুষের বিশ্বাস আর আচরণের ওপর আঘাত। এ কথা বলছি না দেশে দেশে উপাসনালয়ে আগে কোনও আক্রমণ হয়নি। এই যে ইমরান খান আগ বাড়িয়ে টুইট করলেন, আর তা নিয়ে আমরা মাতামাতি করছি- তার দেশে কি এমন ঘটনা বিরল? সেখানেও মসজিদে হামলা হয়। মানুষের জান যায়। এখন যা মানতে মানতে মানুষ বধির ও স্তব্ধ হয়ে গেছে। এটাই  ভয়ের।

মানুষের সাথে আর যে কোন প্রাণীর এটাই মৌল তফাৎ। মানুষ ভাবতে জানে। তার বিবেক আছে। সে বিবেক এখন বন্দুকের নলের ওপর ভর করে চলে। আর কারো বিবেক খসে পড়ে ঝরে যায় গুলির মুখে। খেয়াল করবেন, এই ঘটনাগুলো যারা ঘটায় তারা কোনভাবেই স্বাভাবিক মানুষ না। তাদের এই অস্বাভাবিকতা আর আক্রোশ কোনদিনও বাস্তবায়িত হতে পারতো না, যদি সমাজ দেশ বা আরো মানুষের ইন্ধন না থাকতো। একটা একলা মানুষ চাইলেই বন্দুক নিয়ে ঢুকে আক্রমণ করে কিছু নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে পারেনা, যদি তার পেছনে কোন অপশক্তি না থাকে। সাধারণ মনের প্রশ্ন একটাই কোথা থেকে আসে এত আগ্নেয়াস্ত্র? কোথায় পাওয়া যায় এগুলো চালানোর ট্রেনিং? তলে তলে যে হিংসা আর প্রতিশোধ জমা হয় এতো তারই প্রতিফলন। যা আমাদের সবাইকে বিপদে ফেলেছে।

নিউজিল্যান্ডের হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনির পরিচয় রাষ্ট্রীয়ভাবে সে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। আমরা থাকি সিডনিতে। যা এদেশের সবচেয়ে জনবহুল বড় শহর। এখন প্রতিশোধ যদি এদিকে হাত বাড়ায় তো কে আছে নিরাপদে? হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-ইহুদী, কারো নিরাপত্তা আছে আসলে? এই হানাহানি দুনিয়াকে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে যেখানে সরকার কোন ছাড়! বন্দুকধারী নিরাপত্তা কর্মী কোন ছাড়! সভ্যতার চূড়ান্ত বিকাশের এই স্তরে ধর্মের প্রয়োজনীয়তা আর ব্যবহার আজ আসলেই প্রশ্নের সম্মুখীন। এ নিয়ে কথা বলাও অনিরাপদ। বিশ্বাসী নামের মানুষরা এসব নিতে পারেন না। তাই এর সমাধান দিতে হবে তাদের যারা ধর্ম নিয়ে কাজ করেন। কিভাবে তারা তা পারবেন বলা মুশকিল। কিন্তু সবাই যখন মানেন মানুষের জীবনই মুখ্য তখন তাদের হাতেই সমাধান। অন্তত চেষ্টা করতে পারেন তারা। নিরাপত্তা কর্মী বা নিরাপত্তা বলয় নামের কোনও কিছু এই দায় নিতে অসমর্থ। সেগুলো ভেঙে পড়েছে। শুভবোধ বা মানুষের জাগরণ ছাড়া এই বিপদ থেকে দুনিয়া বের হতে পারবে না।

নিউজিল্যান্ডের দূর্ঘটনায় আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়েরা ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন। ধারণা করা যায়, গুগল দেখে বা ইন্টারনেট দেখে সময় ঠিক করাতেই এই বাঁচা। খুনি যদি আর একটু পরে ঢুকতো, আরও কয়েক শ মানুষ মারা যেতে পারতেন। আজ বাংলাদেশ হতে পারতো ক্রিকেট তারকাশূন্য এক দেশ। এটা কত ভয়াবহ আর জঘন্য ভাবলেও শরীর খারাপ হয়। আমাদের দেশের মিডিয়ায় দেখলাম মৃত নিহত বাংলাদেশিদের চাইতে ক্রিকেটারদের জান বাঁচার ঘটনাই পাচ্ছে প্রচার। এটা ঠিক মানতে পারছিনা। যেকোনও মানুষের জীবন ই মূল্যবান। বিশেষত একজন অধ্যাপকও নিহত হয়েছেন। সার্থক অধ্যাপক হওয়া বা জ্ঞান দিয়ে মানুষকে বড় করে তোলার কাজ অনেক বড়। তিনি তাই করেছেন সারাজীবন। তার এই আত্মাহুতিকে বড় করে তোলা মিডিয়ার দায়িত্ব। তবেই ছোটরা সাবধান হবে। জানবে মানুষের জীবন কেন এবং কতটা মূল্যবান।

বড় মন খারাপ আমাদের সবার। হঠাৎ করে একজন ঘাতকের কারণে নাই হয়ে যাওয়া অর্ধশত মানুষের জীবন কি কেবলই মুসলমান কারো জীবন? না এর সাথে আছে অমানবিকতা ও কাপুরুষতার পরিচয়? ক্রমে সভ্য হয়ে ওঠা মানুষকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসা মানুষদের জীবন আবার আমাদের আলোকিত করুক। সবার চেয়ে বড় কথা ধর্ম ও সম্প্রদায়ের নামে এই হত্যা এই বিভেদ আর নারকীয়তার অবসান হোক। মুসলমান হোক আর যে ধর্মেরই হোক জীবনের চাইতে বড় কিছু নাই। সকল আগ্রাসনের পেছনে এখন যে অন্ধ বিশ্বাস আর পৈশাচিকতা, তার কবল থেকে মুক্তির জন্য মানুষ জাগানোর কাজটি কবে শুরু হবে? রাজনীতি তা করবেনা। গণতন্ত্র ও মানবিকতার ধ্বজাধারী দেশগুলো এখন আর এসবের পরোয়া করেনা। তারা সেনা দিয়ে মোকাবেলা করায়। আরেকদিকে উগ্রবাদীরা নেয় জঙ্গী প্রতিশোধ। বাঁচার জন্য যে সুন্দর ধরণী তার শেষটুকুও কি হারিয়ে যাবে এদের জন্য? না মানুষই রুখে দাঁড়াবে?

নিউজিল্যান্ডের সকল নিহত ও আহত মানুষদের জন্য শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানিয়ে বলি, মানুষ আজ বড় কাঁদছে। তার প্রয়োজন অভিভাবক। তার দরকার শান্তির কোনও নতুন দূত। কোথায় সেই ভরসা?

অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

Responses -- “নিউজিল্যান্ডে নরক গুলজার: পরিত্রাণ কোথায়?”

  1. Not applicable

    i read another article for the thing. this article is more logical to me. white terrorists are really having psychological problem? i have seen dismemberment news in bus in Canada. I have seen boyfriend killed his own kids because his girlfriend was not faithful to him. there are many evidence to that. it became an international news it’s because it has some connection of religions. i just want to add one thing here. Bangladesh must include new Zealand as a unsafe country for our cricket team. this will give a great message to the cricket world.

    Reply
  2. Yousuf

    সুন্দর লেখা। বেঁচে যাওয়া ক্রিকেটার আর নিহত বাংলাদেশীদের বিষয়টিতে সম্পূর্ণ একমত।

    Reply
  3. সৈয়দ আলি

    মি. দাসের লেখাটিতে শ্বেতকায় সুপারমেসিস্টের নিন্দাটা কোথায় কেউ একজন দয়া করে দেখিয়ে দেবেন? ইনিয়ে বিনিয়ে কতো কথাই না তিনি বললেন, কিন্তু তিনি বললেন না যে একদা ইউরোপ থেকে কালাপানিতে পাঠানো ক্রিমিনালদের সন্তান তাঁর স্বদেশী এক শ্বেতপ্রভূত্বের সমর্থক হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। যাদের হত্যা করা হয়েছে তাঁরা সন্ত্রাসবাদী বলে পশ্চিমা বিশ্বের দেয়া রঙের সাথে মি. দাস একমত ও আনন্দিত বলেই মনে হয় খুনীর নিন্দা করেন নি। ভালো থাকুন মি. দাস।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—