প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ-২০১৯ আবেদনের শর্ত নিয়ে আমার আগের লেখাতে কথা দিয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং সিস্টেম নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করবো। আপনারা অনেকেই অবগত আছেন যে, প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ-২০১৯ আবেদনের নূন্যতম যোগ্যতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, Times Higher Education (THE) অথবা Quacquarelli Symonds (QS) World University Rankings সিস্টেম অনুযায়ী ১ থেকে ৩০০ এর মধ্যে অবস্থিত যেকোনও একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে unconditional offer letter থাকতে হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং নিয়ে আমাদের দেশে বেশ কৌতুহল রয়েছে অনেক আগে থেকেই। প্রতি বছর এই র‍্যাংকিং প্রকাশ হয়, আর আমরা সেই ক্রমের মাঝে নিজেদের কোন বিশ্ববিদ্যালয় আছে কিনা তা খুঁজে ফিরি!

চলুন আজ দেখা যাক কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়সমুহের এই র‍্যাংকিং করা হয়। আলোচনার সুবিধার্থে “THE” এবং “QS” World University Ranking System এর মধ্যে মিথস্ক্রিয়া না ঘটিয়ে আমি শুধু QS World University Rankings System নিয়ে আলোচনা করব।

QS World University Ranking হলো বিশ্ববিদ্যালয়সমুহের ক্রম নির্ধারন করা একটি সংস্থা যা ছয়টি পৃথক সূচকে সাজানো একটি অসাধারণ পদ্ধতি যেটি অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ গঠন-কাঠামোর মাধ্যমে কার্যকরভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতিত্ব মূল্যায়ন করতে পারে। সূচক ছয়টি হলো:

১. শিক্ষক/গবেষকদের খ্যাতি
২. নিয়োগকর্তা/নিয়োগের খ্যাতি
৩. শিক্ষক/ছাত্রছাত্রী অনুপাত
৪. শিক্ষক/গবেষক প্রতি সাইটেশন (উদ্বৃতি) সংখ্যা
৫. আন্তর্জাতিক শিক্ষক/গবেষক অনুপাত, ও
৬. আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রী অনুপাত।

পৃথকভাবে উক্ত ছয়টি সূচকের প্রাপ্ত নম্বরের যোগফলের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়সমুহের র‍্যাংকিং করা হয় (উল্লেখ্য যে, সূচক ছয়টির সর্বমোট যোগফল ১০০ নম্বর)। নিম্নে প্রত্যেকটি পদ্ধতির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরছি।

১. শিক্ষক/গবেষকদের খ্যাতি (৪০ শতাংশ নম্বর)

উল্লেখিত ছয়টি সূচকের মধ্যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ (৪০ শতাংশ নম্বর)। অ্যাকাডেমিক জরিপের উপর নির্ভর করে এই সূচকের মান নির্ণয় করা হয়। জরিপের ক্ষেত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে বিভিন্ন বিষয়ের প্রায় ৮০ হাজার অভিজ্ঞ শিক্ষক-গবেষকদের কাছ থেকে শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালের অবস্থান সম্পর্কিত মতামত নেওয়া হয়। এই ৮০ হাজার শিক্ষক-গবেষকরা প্রত্যেকে নিজ দেশের সর্বোচ্চ দশটি ও সর্বোচ্চ ত্রিশটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা পাঠায়, যাঁরা মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উক্ত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহ শিক্ষা ও গবেষণায় খুব উন্নত মানের। তবে তারা কেউই নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তালিকাভুক্ত করতে পারেন না।

২. নিয়োগকর্তা/নিয়োগের খ্যাতি (১০ শতাংশ নম্বর)

এটা নির্ভর করে ছাত্রছাত্রীরা পাশ করে চাকরির ক্ষেত্রে কেমন সুযোগ-সুবিধা পায় তার উপর। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে একটা বিশ্ববিদ্যালয় চাকরির বাজারে সফলতার জন্য তাদের ছাত্রছাত্রীদের কিভাবে তৈরি করছে তার উপর এই সূচকের মান নির্ভর করে। এটি করার জন্য QS কর্তৃপক্ষ বিশ্বের ৪০ হাজারেরেরও বেশী চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জরিপ চালায়। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশকৃত ছাত্রছাত্রীরা তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন, উদ্ভাবনী চিন্তাসম্পন্ন ও কার্যকরী?

৩. শিক্ষক/ছাত্রছাত্রী অনুপাত (২০ শতাংশ নম্বর)

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান নির্ণয়ের জন্য উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রছাত্রীর অনুপাতকে সূচক হিসেবে ধরা হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী প্রতি শিক্ষকের সংখ্যা যত বেশি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মানও তত উন্নত বলে ধরে নেওয়া হয়। বস্তুত ছাত্রছাত্রী কর্তৃক শিক্ষকদের শিক্ষা দান করার গুণগত মান নির্ণয় করা দুরূহ হওয়ার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এই অনুপাত বিবেচনা করা হয়। এক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয় যে, শিক্ষকের সংখ্যা বেশি হলে পড়ানোর ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়সমূহের ভাগাভাগির ফলে সকল শিক্ষকের উপর থেকেই চাপের পরিমাণ কমে যায়। ফলে তারা আরও মনোযোগের সাথে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি পড়াতে পারে। আর এভাবে শিক্ষার গুণগত মানও বৃদ্ধি পায়।

৪. শিক্ষক/গবেষক প্রতি সাইটেশন (উদ্বৃতি) সংখ্যা (২০ শতাংশ নম্বর)

একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং এর ক্ষেত্রে ক্লাসে পড়ানোর গুণগত মান যেমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ, তেমনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মানও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। QS কর্তৃপক্ষ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গবেষনার গুণগত মান নির্ণয় করে শিক্ষক/গবেষক প্রতি উদ্বৃতির (citation) সংখ্যা দিয়ে (উল্লেখ্য যে, এই উদ্বৃতির সংখ্যা “Scopus Database” থেকে নেওয়া হয়)। এক্ষেত্রে তারা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক/গবেষক কর্তৃক বিগত পাঁচ যাবত প্রকাশিত বিভিন্ন জার্নালের সর্বমোট উদ্বৃতি সংখ্যাকে সর্বমোট শিক্ষক/গবেষক সংখ্যা দ্বারা ভাগ করে এই সূচকের মান নির্ণয় করে। এখানে দেখুন, যদি কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী প্রতি শিক্ষকের অনুপাত বেশি থাকে, কিন্তু একই সাথে তাদের গবেষণা কার্যক্রম কম থাকে, তাহলে তিন নম্বর সূচকে (শিক্ষক-ছাত্রছাত্রী অনুপাত) বেশি স্কোর করতে পারলেও এইখানে এসে এই সূচকে স্কোর কমে যাবে। এই জন্য দেখবেন বিশ্বের সকল নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ টিচিং ইউনিট এবং রিসার্চ ইউনিটের মধ্যে সবসময় সমন্বয় করে থাকে। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ তদারকি করার জন্য সকল নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়েরই একটা আলাদা কৌশলগত তথ্য ও পরিকল্পনা বিভাগ থাকে।

এখানে না বললেই নয়, গবেষক সমাজে বহুল প্রচলিত জার্নালের ‘ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর’ এখানে প্রত্যক্ষভাবে কোনও ভূমিকাই পালন করে না। তবে পরোক্ষভাবে এর কিছুটা ভুমিকা রয়েছে। কারণ, কোনও জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর নির্ভর করে উক্ত জার্নালের এক বছরের গড় সাইটেশনের উপর। তাই বেশি ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নালে কোনও আর্টিকেল প্রকাশ হলে তার সাইটেশনের সংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। তবে বিষয়ভেদে এই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের (যেটা পরে সাইটেশনের উপর প্রভাব ফেলে) প্রচুর পার্থক্য আছে। যেমন, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমি পিএইচডি করেছি “Wear of Materials” এর উপর। সাধারণভাবে এই বিষয়ের আর্টিকেলগুলো “Wear” নামক জার্নালে সবাই প্রকাশ করার চেষ্টা করে যার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর মাত্র ২ দশমিক ৯৬। আবার যদি কেউ মেডিকেল সংশ্লিষ্ট বিষয়, যেমন নিউরোলোজি নিয়ে গবেষণা করেন, তবে তা কমপক্ষে এমন একটি জার্নালে প্রকাশ হবে যার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর খুবই উচ্চ, যদি “Lancet” নামক জার্নালে প্রকাশ হয় তবে তার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর ৫৩ দশমিক ২৫। সঙ্গত কারণেই তার সাইটেশন সংখ্যা যোজন যোজন বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাহলে তো মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালসমূহ তুলনামূলকভাবে সহজেই অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব র‍্যাংকিং এ প্রথম দিকে থাকবে!

এই সমস্যার সমাধানকল্পে QS কর্তৃপক্ষ পৃথক পদ্ধতিতে বিষয়ভিত্তিক (অনুষদভিত্তিক) সাইটেশনের সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করে যাতে অন্যান্য রিসার্চ ফিল্ডের কোনও জার্নাল এবং তার গবেষকরা বঞ্চিত না হন। এক্ষেত্রে তারা বিষয়ভিত্তিক (অনুষদ) সর্বমোট সাইটেশনকে আগে নরমালাইজ ফ্যাক্টর দ্বারা গুণ করে প্রশমিত করেন যাতে সকল বিষয়গুলিকে একই কাতারে তুলনা করা যায়। তবে বিষয়ভেদে এই নরমালাইজ ফ্যাক্টর ভিন্ন হয়। যেমন, সমাজ বিজ্ঞান বা ব্যবসা শিক্ষা অনুষদের সাইটেশন সাধারণত প্রকৌশল অনুষদের চেয়ে কম হয়। আবার প্রকৌশল অনুষদের সাইটেশন চিকিৎসা অনুষদের চেয়ে কম হয় (যেটা আগের উদাহরণে বলেছি)। তাই সমাজ বিজ্ঞান বা ব্যবসা শিক্ষা অনুষদের নরমালাইজ ফ্যাক্টর, প্রকৌশল অনুষদের চেয়ে বেশি হয়। একইভাবে, প্রকৌশল অনুষদের নরমালাইজ ফ্যাক্টর চিকিৎসা অনুষদের চেয়ে বেশি হয় (এই নরমালাইজ ফ্যাক্টর সম্পর্কে কারও কৌতুহল থাকলে scival.com এই ওয়েবসাইটে গিয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন)। সর্বোপরি, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অনুষদের সর্বমোট নরমালাইজড সাইটেশনকে সর্বমোট শিক্ষক/গবেষকের সংখ্যা দ্বারা ভাগ করে এই সূচকের মান নির্ণয় করা হয়।

৫. আন্তর্জাতিক শিক্ষক/গবেষক অনুপাত (৫ শতাংশ নম্বর)

কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কত সংখ্যক ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাকাল্টি মেম্বার (শিক্ষক/গবেষক) আছে তার উপর মূলত এই স্কোর দেওয়া হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্কলাররা এসে যদি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বা গবেষণায় যোগ দেন তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেবর/আন্তর্জাতিক পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। এতে করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান, সম্ভাব্য ভবিষ্যত ছাত্রছাত্রী, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অর্গানাইজেশন সহজেই উক্ত বিশ্ববিদ্যালের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্ব পরিমণ্ডলে নিজেদেরকে ব্র্যান্ডিং করতে সমর্থ হয়।

৬. আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীর অনুপাত (৫ শতাংশ নম্বর)

ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাকাল্টি মেম্বারের মতই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার উপর সাধারণত এই স্কোর করা হয়। আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশি হলে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আন্তর্জাতিক আবহ তৈরি হয়। ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে আদান-প্রদান ঘটে। এতে করে বৈশ্বিক সচেতনতা ও সহানুভূতি বৃদ্ধি পায়। আর এরকম আন্তর্জাতিক পরিবেশ থেকে পাশ করা ছাত্রছাত্রী খুব সহজেই যেকোনও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য নিজেদের অধিকতর যোগ্য করে তুলতে সক্ষম হয়।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়সমুহের র‍্যাংকিং করার এই প্রক্রিয়া বেশ জটিল, কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী। উপোরোক্ত সূচকসমূহের বর্ণনা থেকে এটা হয়তো আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যেদিকে যাচ্ছে তাতে করে আমাদের দেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অন্তত আমার জীবদ্দশায় বিশ্ব র‍্যাংকিং-এ ৩০০ এর মধ্যে প্রবেশ সম্ভব নয়। বাকিটা পাঠকের বিবেচনার উপর ছেড়ে দিলাম।

Responses -- “বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং সিস্টেম”

  1. Kamal M

    Everything is fine but there is a huge game to achieve the ranking. Malaysian Universities are competing desperately for ranking. They are improving. Interestingly, Malaysian Universities discriminate international lecturer badly. They have stopped all benefit even Gratuity. Most of the lecturers complain about promotion gambling.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—