‘‘…বড় নদী এড়িয়ে ছোট ছোট নদী দিয়ে বরিশাল থেকে লঞ্চ যাচ্ছে বিক্রমপুর। রাতের আঁধারে প্রায় কিছুই দেখা যায় না। দাদা বলল, সারেঙ বলেছে বড় নদীতে বিপদ হতে পারে তাই ভিতর দিয়ে, ছোট নদী দিয়ে যাচ্ছে। আশ্চর্য, আজো মনে পড়ে সে রাতে আমরা দুপাশের গ্রামগুলোতে একটাও আলো দেখিনি, কোনো শব্দ শুনিনি। সব নিশ্চুপ। সে নিকষ কালো রাতে ঘুমন্ত গ্রামগুলোর পাশে কালো নদীতে শুধু জলের যাত্রার শব্দ আর দূর আকাশের নিষ্প্রভ তারাগুলোই কেবল আমাদের অস্তিত্ব মনে করিয়ে দিয়েছিল (পৃষ্ঠা ১৩)।’’

হ্যাঁ, এটা এক কিশোরীর যুদ্ধযাত্রার বর্ণনা। ১৯৭১ সালে এই কিশোরীর বয়স ছিল সাড়ে তের।  মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের অগণিত মানুষের সঙ্গে এই কিশোরীও দেশত্যাগ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন দেশত্যাগের সেই শ্বাসরুদ্ধকর যাত্রার অভিজ্ঞতা, কিশোরীর অনুভবে যুদ্ধদিনের বয়ান মুক্তিযুদ্ধকে নতুনভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক ধরনের বই রচিত হয়েছে। প্রত্যক্ষ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান, নানা বয়সী নারী-পুরুষের অসংখ্য আত্মজীবনীও রচিত হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালে একজন কিশোরীর দেশত্যাগের অভিজ্ঞতা, সেই সময়ের চিত্র এর আগে খুব একটা লেখা হয়নি। ‘এক কিশোরীর যুদ্ধযাত্রা’ সেই দৃষ্টিকোণ থেকে একেবারেই অভিনব এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের তালিকায় নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

দীর্ঘ নয়মাসের বিচিত্র অভিজ্ঞতা শেষে যখন দেশ স্বাধীন হলো, তখন এই কিশোরীও দেশে ফিরে এসেছেন। ঘটনাবহুল শরণার্থী জীবন শেষে দেশে ফিরে আসার প্রাক্কালে লেখিকা বলেছেন, ‘‘বিদায় কোলকাতা, বিদায় আগরতলা, খোয়াই, রাজবাড়ি ও বল্লা বর্ডারের শরণার্থী শিবির, ফিল্ড হাসপাতাল। স্বাগত জন্মভূমি, স্বাধীন বাংলাদেশ। আমাদের দুচোখে কান্না। সাথে জীবন ফিরে পাওয়ার আনন্দ!

মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সমস্ত দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। এ সময়কালে মৃত্যুভয়ে একবার বিক্রমপুর, একবার বরিশাল গিয়েছি। তারপর একমাস ধরে মাঠ-ঘাট-নদী-নালা-জঙ্গল-পাহাড় পেড়িয়ে, মিলিটারি আর রাজাকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট করে দেশত্যাগ করেছি, আগরতলা ও খোয়াইতে শরণার্থী হয়ে শিবিরে হাজার মানুষের সাথে বাঁশ-কাঠ-টিনের ঘর ও তাঁবুতে থেকেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ট্রেনিং নিয়ে বল্লা বর্ডারের ফিল্ড হাসপাতালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছি, আমি যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে দেশত্যাগী একজন কর্মী ছিলাম মনে ছাড়া তার কোনো স্মৃতি নেই। স্মৃতি আছে, ছবি নেই। সর্বোপরি সার্টিফিকেট নেই। সার্টিফিকেট যে নিতে হয় আমরা সে সময় তাইই জানতাম না। সেই স্মৃতি শুধুই আমার অন্তরে গাঁথা।

আগে ভাবতাম শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করলেই সে মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু যুদ্ধশেষে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পরে শুনলাম মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করলেও সে মুক্তিযোদ্ধা। সেই থেকে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ভেবে মনে মনে সুখ পাই। এ সুখেরও এক অন্যরকম আনন্দ আছে (পৃষ্ঠা ৬৪)।

আমাদের জন্যও এ অনুভূতি পাঠ একটা বিরল আনন্দ। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি বেদনাবিধুর। মুক্তিযুদ্ধ ছিল সর্বজনীন। নারী-পুরুষ, ধর্ম-মত নির্বিশেষে সকল পেশার সকল বয়সের মানুষ এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এই যুদ্ধে যেমন অংশগ্রহণ করেছেন ৫৫ বছরের বৃদ্ধ তেমনি অংশগ্রহণ করেছেন ১২-১৩ বছরের কিশোরী। এমনই এক কিশোরীর আত্মকথাই উঠে এসেছে ‘এক কিশোরীর যুদ্ধযাত্রা’ বইয়ে।

যে বয়সে খেলাধুলা-লেখাপড়া করে সময় সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে একজন কিশোরী দেশান্তরী হয়েছেন। হাজারো বাধাবিপত্তি পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-সুশ্রূষার দায়িত্ব পালন করেছেন।

বইটির আকর্ষণীয় দিক হলো একজন কিশোরীর চোখে মুক্তিযুদ্ধকে দেখা। সেই সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষের দেশত্যাগ, পাকসেনাদের বর্বরতা সব কিছুই শিশুমনে রেখাপাত করেছে। পূর্ণ বয়সে সেসবের ধারাবর্ণনাই তিনি দিয়েছেন।

‘‘…চেয়ারম্যান ও মাতব্বরেরা দলবল নিয়ে চলে যাওয়ার পর মনে হলো মামা ম্যালেরিয়া জ্বরের রোগীর মতো কাঁপছিলেন। ভেতরে ঢুকে মামা বললেন, আমারে বাতাস দে। মামীমাও উতলা হলেন।

তখন গ্রামে ও সমাজে মুক্তি শব্দটা সবাই বলছে। তার অর্থ যুদ্ধ ও যোদ্ধা দুইই। সবার কথা শুনে বুঝে আমরাও বুঝলাম, দেশে বিরাট ও ভয়ানক ধরনের কিছু একটা হচ্ছে।

সেদিন মামার মনের ভিতরে প্রশ্ন উঠেছিল, এ আমি কাদের দেখছি। এরাই আমার গ্রামবাসী? এদের সঙ্গেই আমরা বংশপরম্পরায় বাস করছি? এরাই আমাদের মাতব্বর, চেয়ারম্যান, মেম্বার? মামা বললেন, মনে হচ্ছে তাদের উপরে সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা ভেতরে তো পিশাচ (পৃষ্ঠা ১৬)।’’

‘‘….১৯৫০-এর দাঙ্গার কথা আমরা ছোটবেলায় জানতাম না, ১৯৬৪ দাঙ্গা বা ৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কথা এবং সে সময়টাও আমার মনে কোনো রেখাপাত করেনা। কিন্তু মায়ের পাংশু মুখখানি আজো মনে পড়ে। প্রায়ই রাতে দূরের গ্রামগুলোতে চেঁচাচেচি, চিৎকার, নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর শ্লোগান শুনেছি। মা-বাবার আতঙ্ক, চিন্তা, কথোপকথন শুনে ধীরে ধীরে বুঝেছি হিন্দুরা সে সময় পূর্ববঙ্গে নীলবর্ণ শৃগালে পরিণত হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬-৬৯ সময়কালে বিক্রমপুরের আমাদের গ্রামে মৃত্যুর দূত যেন দোড়গোড়ায় এসে হানা দিত, প্রতিরাত প্রতিদিন।

শেষপর্যন্ত জীবন বাঁচাতে আমরা বাঘিয়া গ্রামের বাড়ি ফেলে দেশ ত্যাগ করি (পৃষ্ঠা ১৮)।’’

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ভয়াল দিনগুলোর অভিজ্ঞতা এবং দেশত্যাগের অভিজ্ঞতা যেন ১৩ বছরের এই কিশোরীকে একজন পরিণত মানুষে করেছিল। সেই কিশোরী নিজেই বলেছেন, ‘‘….এখন বুঝি, যুদ্ধ মানুষকে পরিণত করে তোলে। …মনে হচ্ছিল আমি যেন হঠাৎ করে একটু বড় হয়ে গিয়েছি (পৃষ্ঠা ২২)।’’

সহজ-সরল বর্ণনায় নিজের চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধের সময়টাকে তিনি নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। টুকরো টুকরো গল্প বা ঘটনাগুলো আমাদের একাত্তরের বিভীষিকাময় দিনগুলোতে নিয়ে যায়। মূর্ত হয়ে উঠে সেই সময়। ‘‘…খাওয়া শেষ হওয়ার পর বারান্দা, উঠান, এখানে সেখানে সকলে বসে আছে। এমন সময় সহায়ক সুধীরবাবুর আগমন। তিনি এসে বয়স্ক মানুষদের ডেকে বললেন-সর্বনাশ হয়ে গেছে। যে বর্ডার দিয়ে আপনাদের নিয়ে যাব ভেবেছিলাম সেই বর্ডারে পাক বাহিনীর পতাকা উড়ছে।

আমরাও শুনলাম। আমরা নির্বাক (পৃষ্ঠা ৩০)।

‘‘….হঠাৎ একটা চাপা কোলাহল শুনে সবাই জেগে উঠি, দেখি আর একদল শরণার্থী এসেছে। এরা প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন। লক্ষ্য করে দেখি ওদের মধ্যে তিনটি মেয়ের গায়ে কালি মাখা, কথায় কথায় জানলাম মেয়ে তিনটি কাকাতো-জ্যাঠাতো বোন। শুনলাম, তারা অপূর্ব সুন্দরী বলে কালি মেখে কুৎসিৎ বানানো হয়েছে। দেখে খুব মজা পেলাম (পৃষ্ঠা ৩২)।

একাত্তরে এদেশের মানুষকে কী অসহনীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে, কী মর্মস্পর্শী বাস্তবতাকে অতিক্রম করতে হয়েছে, তাও ফুটে উঠেছে লেখিকার বর্ণনায়। তিনি লিখছেন, ‘‘….সুবলদার স্ত্রী ছিলেন আটমাসের গর্ভবতী। ….প্রায় চারঘণ্টা হাঁটার পরে…একটা বাড়িতে সুবলদা ও তার মা দ্রুত ঢুকে পড়েন। ঢুকতে ঢুকতেই হঠাৎ ওঁয়া ওঁয়া কান্নার আওয়াজ। একি কাণ্ড! বাচ্চা হয়ে গেল? একটা না পর পর দুইটা বাচ্চা।

…..আমি একফাঁকে দেখলাম বৌদির পেছন পেছন মাটিতে লক্ষ্মীর পায়ের মতো রক্তের পদচিহ্ন পড়ছে। কি দুর্ভাগ্য, যে সময় মায়ের বিশ্রাম করার কথা, সে সময় অন্ধকারে গ্রামের মেঠা পথে দুই সদ্যজাত শিশু নিয়ে প্রাণপণ হাঁটতে হচ্ছে। …প্রায় তিন কিলোমিটার হাঁটার পরে বোঝা গেল, ছেলেটি মারা গেছ। ছেলেটি সুবলদা কোলে ছিল, হয়তো হাঁটার সময় তিনি বে-খেয়ালে বাচ্চাটিকে বেশি চেপে ধরেছিলেন তখনই মারা গেছে। মেয়েটি বেঁচে রইল। অকালমৃত ছেলেশিশুটিকে কাঁথা জড়িয়ে পথেই ফেলে দিয়ে যেতে হলো।

এর নাম যুদ্ধ! হায় পাকিস্তান! হায় দেশত্যাগ (পৃষ্ঠা ৩৩)!

এমনি অসংখ্য ঘটনার নির্মোহ বর্ণনায় পুষ্ট হয়েছে ৬৪ পৃষ্ঠার বইটি। লেখিকার বর্ণনায় উঠে এসেছে যুদ্ধদিনের কথা। সে কী ভয়াবহ অবস্থা! চারদিকে আতঙ্ক। এই বুঝি পাকিস্তানি বাহিনীর সেনারা গ্রামে এসে গেল। কাকে যে কোথায় মেরে ফেলে ঠিক নেই। এমন অবস্থায় কি আর বাড়ি থাকা সম্ভব? যেতে হয় নিরাপদ আশ্রয়স্থল, ভারতে।

অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর সীমাহীন দুর্ভোগ শেষে ত্রিপুড়ায় পৌঁছে নানা বিড়ম্বনা শেষে এই কিশোরী যোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রুষার সুযোগ পায়। শুরু হয় তার অন্য যুদ্ধযাত্রা। তেমন কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না। ছিল অদম্য সাহস আর ইচ্ছাশক্তি। সেবা আর ভালোবাসা দিয়ে সে সুস্থ করে তুলেছেন আহত মুক্তিযোদ্ধাদের।

একজন কিশোরীর দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ দেখার অভিজ্ঞতার জন্যই এ বইটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়ের অনেক স্মৃতি, অনেক কথা, অনেক অভিজ্ঞতা যা মুক্তিযুদ্ধের কোনো ইতিহাসে স্থান পায়নি। তেমন কিছু অভিজ্ঞতার চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন তার বইতে। শুধু আন্দোলন সংগ্রাম আর যুদ্ধের কথা নয়, তার লেখনীতে উঠে এসেছে তৎকালীন সময়ের চিত্র। সামাজিক অর্থনৈতিক চিত্র। বিপদের সময় আত্মীয়-পরিজনও যে কতটা কঠোর ও নির্মম হতে পারে সে চিত্রও আমরা পাই এই বইয়ে। শরণার্থী জীবনের এ এক অনন্য দলিল।

অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের একাত্তরের স্মৃতিচারণ নিয়ে লেখা বইগুলো তথ্যনিষ্ঠ থাকে। একাত্তর নিয়ে এরকম স্মৃতিচারণমূলক বইয়ের সংখ্যা খুবই কম। বিশেষ করে একজন কিশোরীর যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার বর্ণনা আরও কম। এরকম অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।

এই বইটি নিঃসন্দেহে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকাশনায় একটি ভালো সংযোজন। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানাতে এই বইটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

এক কিশোরীর যুদ্ধযাত্রা

লেখক : কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়

প্রকাশক : বোধি প্রকাশালয় (তক্ষশিলার প্রকাশনা বিভাগ)

দাম: ১৫০ টাকা

প্রকাশকাল : ২০১৮

 

চিররঞ্জন সরকারকলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—