দীর্ঘ তিন দশক পর ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)নির্বাচন। এ নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্রদল ও বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মাঝে যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তাহল ডাকসু নির্বাচনও ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মতো হবে কিনা।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরোধী দলসমূহ (বিএনপি এবং গণফোরাম) সম্মিলিতভাবে পেয়েছে মাত্র আটটি আসন। বাকি ২৯২টি আসন পেয়েছে আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থিত দল ও ব্যক্তিবর্গ। কয়েকটি আসন বাদে প্রায় সবগুলিতে আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থিতদের বিজয় ছিল নিরঙ্কুশ।

তবে, নির্বাচনে কারচুপি এবং অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগ উঠে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থকসহ জনগণের একটা বড় অংশই তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে নাই। সবাই ভোট দিতে পারলেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরাই বিপুল ভোটে জয়লাভ করতেন বলে অনেকে মনে করেন।

অপরদিকে, সরকারের ক্রমাগত চাপে থাকা বিএনপির সুবিধাবাদী এবং আয়েশী নেতৃত্ব এ নির্বাচনে অনিয়মের বিরুদ্ধে কিছু মৌখিক অভিযোগ করা ছাড়া সে অর্থে কোনও প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ এখন পর্যন্ত করেনি।

বস্তুত, জাতীয় নির্বাচনের এ বিষয়টাই ছাত্রলীগ বাদে বাকি ছাত্র সংগঠনগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। তাদের সামনে যে উদ্বিগ্নতা কাজ করছে তাহলো তারা এবং তাদের সমর্থিতরা এ নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কিনা। অথবা, সবাই ভোট দিতে পারলেও নির্বাচনে সরকার সমর্থিত ছাত্র লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় হবে কিনা।

একথা এখনই নির্ধিধায় বলা যায়, একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও ডাকসুতে ছাত্রলীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হবে, এটাই  হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের বাস্তবতা। এ বাস্তবতা বিরাজ করছে বাংলাদেশের প্রায় সব ক্যাম্পাসেই।

বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতির যে ধারা ১৯৪৭ পরবর্তী সময় থেকে চলে আসছিল তার একটি মৌলিক পরিবর্তন শুরু হয় নব্বই পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসক এরশাদের পতনের পর থেকে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতির মূল ধারা ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধী। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই ধরে নেয়া হতো সরকার বিরোধী ছাত্র সংগঠনের প্রাধান্য। পুরো পাকিস্তান আমলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাব বিস্তারকারী সংগঠন ছিল ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন। এ দুই সংগঠনই পাকিস্তানের মূল ভিত্তি দুই-জাতি তত্ত্ব এবং মুসলিম জাতীয়াতাবাদের বিরোধী ছিল।

অনেক চেষ্টা, অর্থ, অস্ত্র ব্যবহার করেও এনএসএফ বা ধর্মভিত্তিক ইসলামী ছাত্র শক্তি এবং শিবিরের পূর্বসূরি ছাত্র সঙ্ঘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা করে নিতে পারেনি। এখানে উল্লেখ্য যে, মুসলিম লীগ সমর্থিত এনএসএফ প্রথম সন্ত্রাস নির্ভর ছাত্র রাজনীতি শুরু করে, যা কিনা দেশ স্বাধীন হবার অব্যবহিত পর ছাত্র ইউনিয়ন বাদে অন্য সংগঠনগূলোও অনুসরণ করে।

দেশ স্বাধীন হবার পূর্বে ছাত্র রাজনীতিতে সন্ত্রাস হত মূলত ধারালো অস্ত্র দ্বারা। কিন্তু, স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্রলীগ এবং জাসদ ছাত্রলীগ আগ্নেয়াস্ত্র নির্ভর ছাত্র রাজনীতির জন্ম দেয়। ওইসময় ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধানের নেতৃত্বে মহসীন হলে সাত ছাত্র খুনের ঘটনা ঘটে। খুনের ঘটনার চার বছর পর যাবজ্জীবন দণ্ডিত প্রধানকে সামরিক শাসক জিয়া ক্ষমা করে দেন। এরপরে জাগপা গঠন করে প্রধান সারা জীবন আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২-৭৩ কালপর্বে দলটির জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনও দল ১৯৭২-৭৩ সময়কালীন আওয়ামী লীগ যে পরিমাণ জনপ্রিয় ছিল, সে পরিমাণ জনপ্রিয় হতে পারেনি। এমনকি আওয়ামী লীগও পরবর্তীতে আর কোনও সময়ই ওই মাত্রার  জনপ্রিয়তা পায়নি।

সারা বাংলাদেশ যখন আওয়ামী লীগের পক্ষে সেসময় ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র/ছাত্রীরা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত করে যথাক্রমে সিপিবি সমর্থিত ছাত্র ইউনিয়নের মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং মাহাবুব জামানকে। অর্থাৎ,মূল স্রোত ধারায় থেকে সুবিধা প্রাপ্তির চিন্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রীরা তখন করেননি। আর এ সুবিধা প্রাপ্তির চিন্তা থেকে রাজনীতি না করবার ফলশ্রুতি হল ছাত্রলীগ ভেঙ্গে “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের” শ্লোগান দিয়ে জাসদ ছাত্রলীগের জন্ম দেয়া।

জাসদ ছাত্রলীগের জন্ম দেয়া নিঃসন্দেহে হটকারী সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু, সাধারণ ছাত্ররা সেসময় জাসদের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব মানুষের সম-অধিকার ভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের আহ্বানে প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়েছিল। এর চেয়েও বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল জাসদের মিলিট্যান্ট পন্থায় দ্রুত সমাজ বদলে দেবার শ্লোগানের প্রতি। বস্তুত,ছাত্র রাজনীতিতে জাসদ মিলিট্যান্ট চিন্তার জন্ম দেয়ার ফলেই ছাত্র ইউনিয়ন দ্রুত তার জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে।

সময়টা তখন বিশ্বব্যাপী বাম মিলিট্যান্ট রাজনীতির উত্থানের যুগ। বিশ্বব্যাপী ছাত্র সমাজের কাছে তখন আইকন চে গুয়েভারা, মাও সে তুঙ্গ, হো চি মিন, চারু মজুমদার। এসবের সূত্র ধরে “শ্রেণি শত্রু”র গলা কাটার রাজনীতির শ্লোগান দিয়ে ততদিনে সিরাজ সিকদার গড়ে তুলেছেন সর্বহারা পার্টি। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে ছাত্র যুব সমাজের মাঝে তখন প্রবল উত্তেজনা, অস্থিরতা এবং হতাশা। হাজার বছর ধরে চলে আসা শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা তারা এক নিমিষে ঘুচাতে চায়। আর শুধু ঘুচানোই নয়,শোষক নিপীড়কদেরও দিতে চায় চরম শাস্তি। রাষ্ট্র, সমাজ যেহেতু শোষক, নিপীড়কদের পক্ষে দাঁড়ায় তাই তারা প্রতিষ্ঠিত সব কিছুই ভেঙ্গে ফেলতে চায়। এমন পরিস্থিতিতে ছাত্র ইউনিয়নের শান্তিপূর্ণ, নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সমাজ বদলের রাজনীতির আবেদন ফুরিয়ে যায়।

পঁচাত্তর পরবর্তীতে সামরিক শাসক জিয়ার সময়ও এ ধারা অব্যাহত থাকে। পুরো বিএনপি শাসনামলে তিনটি নির্বাচনের দুইটিতেই আজকের বিএনপির সাথে ঐক্যফ্রন্টে থাকা মাহমুদুর রহমান মান্না ভিপি পদে জয়লাভ করেন। প্রথমবার ১৯৭৯ সালে জাসদ ছাত্রলীগ থেকে, দ্বিতীয়বার ১৯৮০ সালে বাসদ ছাত্রলীগ থেকে।

এরপর, ১৯৮২ সালে যে নির্বাচন হয় সেবার বাসদ ছাত্রলীগ থেকে ভিপি পদে জয়লাভ করেন আজকে আওয়ামী লীগে থাকা আখতারুজ্জামান। তার সাথে জিএস হন একই সংগঠনের জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু, যিনি আজকে জাতীয় পার্টির অন্যতম নেতা। একজন বাম ছাত্র নেতার সামরিক শাসক এরশাদের দলে যোগদান সেসময় অনেককে বিস্মিত করেছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, মান্না যে দুইবার ভিপি ছিলেন তুখোড় বক্তা আখতারুজ্জামান সে দুইবার জিএস হয়েছিলেন।

মান্না, আখতারুজ্জামান এমন সময় ভিপি ছিলেন যখন সারা দেশে জিয়ার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। জাসদ সশস্ত্র পন্থায় বল প্রয়োগ করে ক্ষমতা দখল করবার জন্য তাদের নেতা কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে গণবাহিনী গঠন করেছিল। এ গণবাহিনী বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অভ্যুথান সংগঠিত করবার জন্য বিভিন্ন সেনানিবাসে সেনা সদস্যদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে ছোট ছোট সেল গড়ে তুলেছিল।দক্ষিণপন্থী জুনিয়র সামরিক অফিসারদের হাতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পরে তাহের সুযোগ খুঁজছিলেন আরেকটি সেনা অভ্যুথান সংগঠিত করে জাসদকে ক্ষমতায় আনবার। এরই ধারাবাহিকতায় তাহের ৭ নভেম্বর সেনা অভ্যুত্থান সংগঠিত করেন। কিন্তু, কিছু ভুল হিসাবের ফলে সে ক্ষমতা ডানপন্থী সামরিক অফিসার জিয়া কুক্ষিগত করে নেন।

জিয়া ক্ষমতায় এসে জাসদের নেতাকর্মীদের উপর ব্যাপক নিপীড়ন চালান এবং কর্নেল তাহেরকে সামরিক আদালতে দ্রুত গোপন বিচারে ফাঁসি দেন। কিন্তু, জিয়ার এ নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজ জাসদ ছাত্রলীগকে ডাকসুতে ক্ষমতায় আনে। এর অল্প কিছুদিন পরেই অর্বাচীনের মত নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আর ব্যক্তি স্বার্থে জাসদ ভেঙ্গে বাসদের জন্ম হয়। যদিও এ ভাঙনের একটা আদর্শিক রূপ দেবার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু বাস্তবতা হল সেসময় এ দুটো দলের মাঝে আদর্শিক তেমন কোনও তফাত ছিল না। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল প্রায় এক।

বাসদের জন্ম হলে মান্না, আখতারুজ্জমান, বাবলু, আলী রিয়াজ সহ প্রতিভাবান ছাত্র নেতৃত্ব বাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগে চলে আসেন। কিন্তু, বাসদ ছাত্রলীগও দ্রুত তার আবেদন হারায় যা বর্তমানে বিলুপ্ত প্রায় সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নেতৃত্বের কোন্দলে বাসদ প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মাঝেই দলে ভাঙ্গন ধরে। ১৯৮০ সালে খালেকুজ্জামান এবং আফম মাহবুবুল হকের নেতৃত্বে দুই বাসদের জন্ম হয়। সে ভাঙ্গনকেও আদর্শিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়। “দুর্জনেরা” অবশ্য এ  ভাঙ্গনের একজন নারীকে ঘিরে দুই বাসদ নেতার ত্রিভুজ প্রেমকে দায়ী করেন।

খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন বাসদ তাদের অঙ্গসংগঠন হিসাবে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট গড়ে তোলে। কোন সময় মূল ধারার সংগঠন হয়ে উঠতে না পারলেও ছাত্রফ্রন্ট সারা দেশেই ছাত্রদের একাংশের মাঝে কিছুটা আবেদন তৈরি করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর তুলনায় এ সংগঠনের কর্মীদের অত্যন্ত রেজিমেন্টেড জীবন যাপনের চর্চা করতে হত।

সংগঠনের কর্মীদের প্রেম, বিয়ে, যৌন সম্পর্কে জড়ান ইত্যাদির উপরে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। দলীয় অফিসের মেঝেতে সবাই এক সাথে ঘুমাবার চর্চা যেমন তাদের করতে হতো; তেমনি, ছাত্র জীবনের অবসান ঘটবার পর চাকরির সন্ধান বা ব্যবসা না করে দলের সার্বক্ষণিক কর্মী হবার অনুশীলন করা হতো। দল তাদের ভরণ পোষণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারলেও সমাজ বদলের আদর্শিক রোমান্টিকতায় আক্রান্ত কেউ কেউ ফ্রন্টের মাঝে আশ্রয় খুঁজে পেলেও, নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে খালেকুজ্জামানের বাসদ ভেঙ্গে মার্কসবাদী বাসদের জন্ম হয়।

বর্তমানে ছাত্রফ্রন্ট অনেকটাই যেন অস্ত্বিত্বের জানান দিয়ে কোনও রকমে টিকে রয়েছে। অপরদিকে, আশির দশকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী সংগঠন হিসাবে টিকে ছিল মুশতাক হোসেন এবং শিরিন আখতারের নেতৃত্বে জাসদ ছাত্রলীগ। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে এ সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরশাদ পতনের পর এ সংগঠনের প্রভাব কমতে থাকে। বর্তমানে ক্ষমতাসীন মহাজোটের অংশ জাসদের অঙ্গ সংগঠন হিসাবে ছাত্রলীগের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই মুশকিল।

বাম ধারার সংগঠনগুলির মাঝে বর্তমানে ছাত্র ইউনিয়ন প্রধানতম ধারা হিসাবে বিরাজ করলেও জাতীয় বা ছাত্র রাজনীতির কোনটিতেই প্রভাব বিস্তার করবার মতো অবস্থায় তারা নেই। বস্তুত, ১৯৭২-৭৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের যে জনপ্রিয়তা ছিল এর ধারে কাছেও তারা আর কখনো যেতে পারেনি। ১৯৯০ পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং এরই ধারাবাহিকতায় সিপিবিতে ভাঙ্গনের রেশ ছাত্র ইউনিয়নের উপর এসে পড়ে। এ সমস্ত কিছু সত্ত্বেও বাংলাদেশের অধিকাংশ কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র ইউনিয়ন তার অস্তিত্ব কোনও রকমে টিকিয়ে রাখতে পেরেছে।

একসময়কার ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেড়ানো অন্যতম প্রধান ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের অবস্থাও বর্তমানে যেন অস্তিত্ব জানান দিয়ে কোনও রকমে টিকে থাকবার মতো। এক সময় যে সংগঠনের দাপটে অন্যদের টিকে থাকাই মুশকিল ছিল,কোথায়ও আজ তাদের কোনও কার্যক্রম আছে কিনা সেটা ঠাওর করাই যেন মুশকিল হয়ে পড়েছে।

জিয়া তার অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দান এবং ক্ষমতায় টিকে থাকবার জন্য কিছু সামরিক বেসামরিক আমলার সহায়তায় বিএনপি গঠন করেন। আর বিএনপির ছাত্র সংগঠন হিসাবে গড়ে তোলেন ছাত্রদল। মেধাবী ছাত্রদেরকে অর্থ এবং অস্ত্রের প্রলোভন দেখিয়ে দলে টানলেও তার বেঁচে থাকবার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তার ছাত্র সংগঠনটি জনপ্রিয়তা পায়নি। এর মূল কারণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা এবং অর্থ ও অস্ত্রের কাছে নিজের বিবেককে বিক্রি না করে দেবার মানসিকতার। তাই,সারা বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান জনপ্রিয় হলেও ছাত্র সমজের কাছে তার ছাত্র সংগঠনের তেমন গ্রহণযোগ্যতা ছিল না।

ছাত্রদল ছাত্র সমাজের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায় এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা পালন করবার মধ্য দিয়ে। ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নসহ অন্যান্য বাম সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এরশাদের বিরুদ্ধে প্রথম আন্দোলন গড়ে তোলে যার ধারাবিকতা ছিল ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে প্রথম হরতাল পালন করা। পরবর্তীতে ভিন্ন প্লাটফরম থেকে ছাত্রদলও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়।

ছাত্রসমাজের মাঝে প্রভাব বাড়বার সাথে সাথে অন্য সংগঠনগুলোকে দমন করবার নীতি হিসাবে ব্যাপক সন্ত্রাসের উপর নির্ভর করতে শুরু করে ছাত্রদল। এরশাদের সামরিক শাসনের পুরো সময়টিতে তাদের হাতে ছাত্রলীগসহ বাম ছাত্র সংগঠনসমূহের অনেক কর্মী নিহত এবং আহত হয়। একই সাথে তারা হল দখল, ক্যাম্পাসে প্রতিপক্ষ সংগঠন সমূহকে ঢুকতে না দেয়া, ভয়ভীতি দেখিয়ে ছাত্রদেরকে সংগঠনের সদস্য করা ইত্যাদি নানাবিধ কার্যক্রমে লিপ্ত হয়। ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশের কাছে ছাত্রদল একটি ভীতিকর সংগঠন হিসাবে আবির্ভূত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে অনেক ছাত্রদল নেতৃত্ব একই সাথে শীর্ষ ক্যাডার বা সন্ত্রাসী হিসাবেও পরিচিতি লাভ করে। এদেরই একজন বাবলু বোমা বানাতে যেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলে নিহত হন। আবার এ ক্যাডারদের মাঝে চূড়ান্ত সুবিধাবাদিতা বা টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যাবার প্রবণতাও ছাত্র সমাজ লক্ষ্য করে। এরশাদ পতনের কিছু পূর্বে নিহত বাবলুর ভাই নীরু, গোলাম ফারুক অভি (খুনের মামলায় দীর্ঘদিন যাবত পলাতক) প্রমুখ সামরিক শাসকের সাথে হাত মিলান। এর আগে ১৯৮৭ সালে সংগঠনের সভাপতি জালাল আহমেদ অস্ট্রেলিয়ায় কূটনীতিক হবার লোভে “বিক্রি” হয়ে যান।

বস্তুত,এ কালপর্বেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজের যে মূল বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা বা মূল স্রোতধারার বাইরে থাকা, এর পরিবর্তন পর্বটি শুরু হয়। ১৯৮৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বিজয়ী হলে ছাত্রদলের কর্মীরা নির্মমভাবে ছাত্রীদের বিজয় মিছিলে হামলা চালায় এবং অনেক ছাত্রীকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করে। তখন ক্যাম্পাসে অনেককেই বলতে শোনা গিয়েছিল ছাত্রদল যেহেতু এভাবে হামলা চালাতে পেরেছে, সেহেতু আগামী নির্বাচনে ছাত্রদলই বিজয়ী হবে, এবং হয়েছিলও তাই। তার চেয়েও যে বিষয়টা সবাইকে বিস্মিত করেছিল তাহল তখনকার দুটো ছাত্রী হলের দুটোতেই ছাত্রদলের জয়লাভ। অর্থাৎ,হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ না গড়ে তাদের সাথে আপস করাকেই ছাত্রছাত্রীরা তাদের স্বার্থের অনুকূল ভাবা শুরু করে; যা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা প্রতিরোধের সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

এ প্রতিরোধের সংস্কৃতিহীনতা বা এর দুর্বল উপস্থিতির ফলেই এরশাদের পতনের পর বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসে তখন প্রায় সব ক্যাম্পাসেই ছাত্রদল হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য।প্রতিরোধ হীনতার যে সংস্কৃতি বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ছাত্রদলকে সুবিধা দিয়েছিল,সেটিই তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে যায়,যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, বিশেষতঃ দ্বিতীয় কালপর্ব থেকে—যে পর্ব থেকে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে দলটি ক্ষমতায় আসীন রয়েছে। ফলে, ক্যাডার রাজনীতি দ্বারা ক্যাম্পাস কাঁপান ছাত্রদল অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে যায়, ছাত্রলীগের মত দীর্ঘ সময় এককভাবে প্রতিরোধের রাজনীতি করবার মানসিকতা কর্মীদের না থাকবার কারণে।

ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে একমাত্র ছাত্রলীগই তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে সাংগঠনিক প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছে। দীর্ঘ একুশ বছর একটানা আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল না তখনো বাংলাদেশের এমন কোন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছিল না যেখানে ছাত্রলীগ তার সরব উপস্থিতি জানান দিয়ে অবস্থান করেনি। সামরিক শাসক জিয়ার কঠিন নিপীড়ন কালে,এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বা খালেদা জিয়ার শাসনের দ্বিতীয় কালপর্বে আন্দোলনের মাঠে সবচেয়ে লড়াকু সৈনিক হিসাবে ভ্যানগার্ডের দায়িত্ব পালন করেছে ছাত্রলীগ।

দল ক্ষমতায় থাকার সময় অনেক “সুখের পায়রা” সংগঠনে ভিড় করলেও দলের কঠিন মুহূর্তে লড়াই করবার জন্য নিবেদিত কর্মীর অভাব ছাত্রলীগে কখনো হয়নি। বস্তুত, পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত এমন কোন আন্দোলন দেখা যায় নাই যে আন্দোলনের পুরোধা ছাত্রলীগ ছিল না। এটাই হল ছাত্রলীগের সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস, যা তাকে অন্য সংগঠনগুলো থেকে আলাদা করেছে।

তবে, ট্র্যাজেডি হলো আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে ছাত্রদলের মতো নানা অনাচারে এ সংগঠনের অনেক কর্মীকেও লিপ্ত হতে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকবার সময় যারা নিবেদিত হয়ে দলের জন্য লড়াই করেছে, সেই তারাই দল ক্ষমতায় আসলে ছাত্রদল, শিবির থেকে আসা “সুখের পায়রাদের” সংগঠনে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।

ক্ষমতায় বা ক্ষমতার বাইরে থাকা সব অবস্থাতেই ছাত্রলীগ তার নিজস্ব একটা বড় সমর্থন ভিত্তিকে ধরে রাখতে পেরেছে। এর বিপরীতে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল অন্য সংগঠনগুলোর অবস্থা অস্তিত্ব জানান দেবার চেয়ে বেশি কিছু নয়। শিবিরসহ ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো এ ক্যাম্পাসে কখনোই জায়গা করে নিতে পারেনি। ক্ষমতায় থাকাকালীনই অর্থ, পেশীশক্তি কোনও কিছুর বিনিময়েই এরশাদ তার ছাত্র সমাজকে দাঁড় করাতে পারেননি।

অন্য সংগঠনগুলোর চরম দুর্বলতার পাশাপাশি ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগকে অতিরিক্ত যে সুবিধা দিয়েছে সেটি হলো ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজের সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতি ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতা না করে তাদের কাছাকাছি থাকতে চায়, যে কোন মূল্যে কোনও না কোনওভাবে ক্ষমতার ভাগ নিতে চায়।

বর্তমানে দ্রুত বিকাশশীল অর্থনীতির বাংলাদেশে শিক্ষক সমাজসহ কিছু ব্যতিক্রম বাদে সব ছাত্রছাত্রীরা যেখানে মনে করছে ক্ষমতার বলয়ে যে কোনও ভাবে থাকতে পারাটাই মোক্ষ লাভের মূল মন্ত্র, সেখানে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনে ছাত্রলীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হবে না এমনটি না ভাবার কোনও কারণ নেই।

পরিশিষ্ট

প্রায় তিন দশক পরে ডাকসু নির্বাচন হলেও নির্বাচনী প্রচার,প্রচারণার ধরণ বাংলাদেশ যখন অ্যাানালগ ছিল তেমনই হবে বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ,জাতীয় নির্বাচনের মতো মিছিল, মিটিং, পোস্টার, লিফলেট বিতরণ, এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর কাছে ভোট চাওয়া হবে। এ থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং ছাত্র নেতৃবৃন্দের মাইন্ডসেট সেই অ্যানালগ বাংলাদেশে পড়ে আছে, যদিও সরকার দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলবার চেষ্টা করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়। সেই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাশ্চাত্যের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এভাবে প্রচারণা চালান হয় না। আজকে ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে শতভাগ উচ্চ শিক্ষিত ভোটারদের মাঝে কেন জাতীয় নির্বাচনী কায়দায় প্রচার চালাতে হবে সেটি বোধগম্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় নির্বাচনী প্রচার চালাবার জন্য ডিজিটাল প্লাটফরমই যথেষ্ট হবার কথা। পাশাপাশি, প্রার্থীদের জন্য করা যেতে পারে তিন-চারটি উন্মুক্ত বিতর্ক অনুষ্ঠান যার মধ্যে দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নিতে পারবেন। আশা করি আগামী নির্বাচনে ছাত্র নেতৃবৃন্দ এ বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন।

ঢাকাসহ বাংলাদেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাশ্চাত্যের যেসকল বিশ্ববিদ্যালয়কে মডেল মনে করে সেসব জায়গায় ছাত্র সংসদের নির্বাচন শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে হয় না। সেখানে ছাত্ররাই নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু, বাংলাদেশে শিক্ষকদের পরিচালনায় অনেকটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মত করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

শিক্ষকসহ অন্য কোন পেশাজীবীদের নির্বাচন অন্য কারও তত্ত্বাবধানে হয়না। তাহলে, এ প্রশ্ন উঠতেই পারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা কেন নিজেদের নির্বাচন নিজেরা করতে পারবেন না? নির্বাচন করবার জন্য কেন তাদের শিক্ষকদের সহায়তা লাগবে?

ডাকসুকে গণতান্ত্রিক চর্চার পাঠকেন্দ্র বলা হয়। কিন্তু, বাস্তবতা হল ডাকসুর  সাবেক নেতৃত্বরা পরবর্তীতে বৃহত্তর রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ করে উদারনৈতিক, গণতন্ত্রের চর্চার প্রতি কতটুকু নিবেদিত ছিলেন সেটি প্রশ্ন সাপেক্ষ।

শুধু নির্বাচিত হয়ে আসা গণতন্ত্রের মূল চর্চা নয়। গণতন্ত্রের মূল চর্চাটি হল নির্বাচিত হয়ে আসবার পর আরেকটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সক্ষম হওয়া এবং তাতে হেরে গেলে বিজয়ীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

আশা করি, ডাকসুতে নির্বাচিত হয়ে আসা নেতৃত্ব আগামীতে নিজেদের তত্বাবধানে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করে বিজয়ী পক্ষের কাছে নেতৃত্ব হস্তান্তর করবার ধারাটি শুরু করবার মাধ্যমে ডাকসুকে সত্যিকার গণতান্ত্রিক চর্চার পাঠকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবেন।

সাঈদ ইফতেখার আহমেদশিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিস, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

Responses -- “ডাকসু নির্বাচনও কি জাতীয় নির্বাচনের মতো হবে?    ”

  1. শামস

    পুরো গালগল্প বানিয়ে ইতিহাস লিখেছেন,কিছুটা সত্য মিশিয়ে । সত্যটা হলো আগের জমানার ছাত্ররা সরকার বা প্রতিষ্ঠান বিরোধী ছিলো । বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী সন্ত্রাস করতো ছাত্রলীগ । ৭২-৭৫ ছিলো, তাদের রাম রাজত্ব । যাকে খুশি, তাকে তুলে নিয়ে যেতো । প্রথিতজশা লেখক আহমেদ ছফা পর্যন্ত এক কুখ্যাত ক্যাডারের জিপ বাহিনীর হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলো । জাসদ ছাত্রলীগের লোকজনও মুক্তিযাদ্ধা ছিলো, আবার সিরাজুল আলম খানকে সব জমা না দিয়ে কিছু অস্ত্র রেখে দিতে বলায়, তাদের কাছেও অস্ত্র থাকায়, সমানে ফাইট দিয়েছিলো ছাত্রলীগ-যুবলীগের সাথে । জিয়ার আমলে জাসদের একক আধিপত্য সৃষ্টি হয়েছিলো, ছাত্রলীগ রায়ের নীচে মাটি খোজায় ব্যস্থ ছিলো । জিয়ার প্রশ্রয়ে ছাত্রলীগ ৮০ সালের দিক থেকে দাঁড়াতে শুরু করেছিলো । ঐ সময় যেসব ছাত্রদলের ছাত্ররা ছাত্রদল করার কারনে ঢাকা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের মার খেয়েছিলো, পরে তারা সশস্ত্র হয়ে প্রতিহত করা শুরু করলো । জাসদ ছাত্রলীগের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা আস্তে আস্তে দাডিয়েছিলো । জিয়া মারা যাওয়ার পর গ্রাম থেকে আসা ছেলেরা সমানে ছাত্রদল করা শুরু করলো, ছাত্রলীগের নিপীড়ন স্বত্তেও । যদিও ঢাকা ছাডা বেশীরভাগ জায়গা তেমন বড় সংগঠন হয়নি । ছাত্রলীগ আবার বাকশাল ছাত্রলীগ হয়ে নিজেরা নিজেরা মারামারি করতো, আবার নানা নেতার নানা গ্রুপ এক একটা কলেজ দখলে রাখতে, যেখানে অন্য নেতার অনুসারীরাও সংগঠন করতে পারতো না, অন্য দল দূরে থাক । এরশাদ আমলে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে শিবির বিপুল বিক্রমে উত্থান হয়েছিলো । সব সংগঠন এক হয়ে শিবিরের বিরুদ্ধে ইলেকশন করেছিলো ৮৯-৯০ তে । এরশাদ আমলে ঢাবিতে দুইটা হল ছাডা সব ছাত্রদলের দখলে ছিলো নির্বাচনের মাধ্যমে, যা বিএনপি আমলেও ছিলো। কিন্তু ৯৬ তে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে ন্যাক্কারজনকভাবে সব হল দখল করেছিলো । যেটা বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির সহাবস্থানের পরিবেশ ধ্বংসের মূল । তার আগে যতই মারামারি হোক, পরে আবার আড্ডা দিতে দেখা যেতো । দখল করে কি লাভ হলো ? ২০০১ এর ইলেকশনে হারার পরদিন সব ক্যাডার হল ছেড়ে পালিয়ে গেলো। মাঝখানে ভদ্র সাধারন কর্মীদের বিপদে ফেললো । ২০০১-২০০৬ ছাত্রদল ও বিএনপি কেবল আওয়ামী লীগকে অনুকরন করে গেলো । জিয়ার রাজনীতির যে পার্থক্য তা মুছে গেলো । সাধারনের কাছে, একটা হলো আপদ, অন্যরা বিপদ ।

    Reply
  2. মোঃ হাবিবুর রহমান

    অবশ্যই, জাতীয় নির্বাচনের মতোই ডাকসু নির্বাচন হবে। শুধু ডাকসু নয়, পরবর্তী সকল নির্বাচনই একই হালে হবে।

    Reply
    • হাফিজ মোহাম্মেদ

      আমিও বিশ্বাস করি এই সরকারের আমলে যতো নির্বাচন হবে সেইগুলো এই ধরণেরই হবে, এতে আমাদের ভোট দেবার যে বিশ্বাস সেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কারণ আমি নিজেই আজকে ভোট দিতে গিয়ে যা দেখেছি তাতে আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করছি যে “ভোট দিতে গিয়ে কি লাভ !!?? ভোট তো দিয়েই দিচ্ছে কিছু ছেলেরা আমাকে কেনো কষ্ট করে রিক্সা ভাড়া করে যেতে হবে !!!!??????????? এর উত্তর কি আমি বা আমার মতন মানুষেরা পাবে? এটাই কি গণতন্ত্র? নাকি অন্য কিছু?

      Reply
  3. সৈয়দ আলি

    ডাকসু নির্বাচন নিয়ে একটি মৈমনসিংগ্যা প্রবাদ বলাযায়, আগের আল (হাল) যেবায় যায়, পিছের আলও হেইবায় যায়’ – এর কি ব্যত্যয় হবে? না।

    চমৎকার একটি ইতিহাসপঞ্জি। আপনাকে ধন্যবাদ।
    আপনার উল্লেখিত, ““শ্রেণি শত্রু”র গলা কাটার রাজনীতির শ্লোগান দিয়ে ততদিনে সিরাজ সিকদার গড়ে তুলেছেন সর্বহারা পার্টি।” তথ্যটি সঠিক নয়। সিরাজ সিকদারের পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির রাজনৈতিক লাইন ছিলো অর্ধসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করা, ‘শ্রেণিসংগ্রাম’ নয়। দুটো পৃথক বিষয়।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—