মাত্র কিছুদিন আগে ফেইসবুকে ফুড রেঞ্জার নামে কানাডিয়ান এক অভিযাত্রীর পুরান ঢাকায় খাদ্যাভিযানের একটা ভিডিও দেখে মনে মনে আত্মশ্লাঘা অনুভব করছিলাম। পুরান ঢাকার বৈচিত্র্য়ময়, মুখরোচক খাবার, কালের সাক্ষী আমাদের এই শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনন্য।

আমেরিকার নিউ অর্লিন্স শহরে ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টার বলে একটা ঐতিহাসিক জায়গা আছে ‘মার্ডি গ্রা’ ফেস্টিভ্যালের জন্য যা মূলত বিখ্যাত। পৃথিবীর দূর-দূরান্ত থেকে এখানে লোকে বেড়াতে আসে। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে ফরাসিদের হাতে এর গোড়াপত্তন, যদিও আমাদের পুরান ঢাকার প্রায় একশ বছর পরে ১৭১৮ সালে। ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টারে আসলেই আমার পুরান ঢাকার কথা মনে পড়ে আর একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে যায়। মনে মনে ভাবি, আমরাও পুরান ঢাকাকে ফ্রেঞ্চ কোয়ার্টারের মতো করে পৃথিবীর সামনে উপস্থাপন করতে পারতাম- এর ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণ করে, দালানকোঠাগুলো মেরামত করে, রাস্তাঘাট ঠিকঠাক ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে, মিসিসিপি নদীর মতো বুড়িগঙ্গার শোভাবর্ধন করে- একে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারতাম। ‘মার্ডি গ্রা’ ফেস্টিভ্যালের মতো আমাদের ’সাকরাইন’ ঘুড়ি উৎসব  দেখার  জন্য পৃথিবীর দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসতো।

কিন্তু বিধি বাম। আকাশে উড়ানো প্রত্যাশার বেলুন চুপসে যায় চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর মিছিল দেখে। এই ২০১৯ সালে বসে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য মেনে নেয়া যায় না। যেটুকু জানতে পারলাম, ভিড়ের মধ্যে থাকা একটি গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে এই অগ্নিকাণ্ডের শুরু, এরপর সেখান থেকে তা হোটেলের সামনে রাখা গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটায়, এরপর তা কারখানায় অবৈধভাবে রাখা রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে এলে আগুন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে, পরিণতিতে ৬৭ জনের মৃত্যু।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে দায় স্বীকার এবং সংশোধনের বদলে আমাদের যা সংস্কৃতি- সেই একে অন্যকে দোষারোপ চলছে, কিন্তু এই দুর্ঘটনা আদপে যা নির্দেশ করে তা হলো জনমানুষের নিরাপত্তার প্রতি কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা এবং আমাদের নগর পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি করুণ চিত্র। আজ থেকে একশ বছর আগে আমেরিকার অবস্থাও কিন্তু ভিন্ন কিছু ছিলো না। নিউ ইয়র্ক শহরে ২৫ মার্চ ১৯১১ সালে ট্রায়াঙ্গল শার্টওয়েইস্ট কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে ১৪৬ জন কর্মী নিহত হয়। এই ফ্যাক্টরির অবস্থা ছিল অনেকটা আমাদের রানা প্লাজার মতো। বহুতল ভবনের কয়েকটি ফ্লোরে গাদাগাদি করে মানবেতর পরিবেশে প্রায় ৫০০ কর্মী কাজ করতেন যাদের অধিকাংশই ছিলো গরীব অভিবাসী নারী।

ট্রায়াঙ্গল শার্টওয়েইস্ট ফ্যাক্টরি অগ্নিকাণ্ডে মানুষ দালান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে

আগুনের সূত্রপাত হয়েছিলো সামান্য একটা সিগারেট থেকে, বিল্ডিংয়ে ফায়ার হোস অকার্যকর ছিল, স্প্রিংকলার সিস্টেম না থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পরে, বিল্ডিংয়ের যে একমাত্র সরু ফায়ার এস্কেপ ছিলো মানুষের চাপে তা ভেঙে পড়েছিল, বিল্ডিংয়ে চারটা লিফটের মধ্যে তিনটাই ছিলো অকার্যকর, মানুষ আগুন থেকে বাঁচতে বিল্ডিং থেকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে মারা গিয়েছিল। বহুতল ভবনের জন্য তখন দমকলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও ছিল না। আগুন যে ফ্লোরে শুরু হয়েছিল দমকলের পানি সে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি।

আমেরিকার জন্য নিউ ইয়র্কের সেই ঘটনা ছিলো টার্নিং পয়েন্ট- এরপর কারখানায় স্প্রিংকলার সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা হয়, ফায়ার এস্কেপ, ফায়ার হোস, ফায়ার হাইড্রেন্ট ইত্যাদি বিষয়ে আইন-কানুন কড়াকড়িভাবে চালু ও প্রয়োগ করা শুরু হয়। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য যা বিস্ফোরক কিংবা ক্ষতিকারক এগুলোর জন্যও এখানে বিশেষ নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু আমাদের টার্নিং পয়েন্ট কোনটা হবে? চকবাজার অগ্নিকাণ্ড আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়, এর আগে সাভারে রানা প্লাজায় কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে অনেক হতাহত হয়েছে, তারও আগে ২০১০ সালে ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ জন নিহত হয়েছিলেন। আর কত মানুষ মারা গেলে আমরা ঘুরে দাঁড়াবো, আমাদের কর্তৃপক্ষ বলবেন যথেষ্ঠ হয়েছে- এবার আমরা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবো, আমাদের নগর-পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা যুগোপযোগী করে দেশের মানুষের জন্য বসবাসযোগ্য করবো?

মাঝে মাঝে কিছু বোদ্ধাকে বলতে শুনি, বাংলাদেশ নাকি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উন্নত এবং পৃথিবীর অনেক দেশের এখান থেকে শিক্ষণীয় আছে। আমি আমেরিকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাথে সতের বছর ধরে জড়িত, এ বিষয়ে যারা এখানে পেশাদার কাজ করে তাদের অ্যাকাডেমিক বিষয়গুলো পড়াই। আমেরিকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও অনেক দুর্বলতা আছে, কিন্তু তারপরও এর সাথে যদি বাংলাদেশের তুলনা করি মাথা নুইয়ে আসে। যারা বলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উন্নত, তবে দেশের রাস্তায় অগ্নি নির্বাপক ফায়ার হাইড্র্যান্ট কেন নেই, কারখানায় স্প্রিংকলার সিস্টেম কেন বসানো হয় না, ফায়ার এস্কেপ কী পর্যাপ্ত রয়েছে, অগ্নিনির্বাপক গাড়ি যাওয়ার মতো রাস্তা কি আছে কিংবা বিস্ফোরক রাসায়নিক দ্রব্য কী এখানে নিয়মকানুন মেনে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়? একটা শহরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কারা আছে?

কিছুদিন আগে এক মন্ত্রী বলেছেন, ঢাকাকে নাকি উপর থেকে প্যারিস শহরের মতো লাগে। ঢাকার উড়াল শহরগুলো দেশের উন্নয়নের চিত্র! নগর পরিকল্পনার পরিভাষায় ঢাকার মতো শহরকে বলা হয় ‘প্রাইমেট সিটি’ – যে শহরের ওপর অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক বিবিধ কার্যক্রমের জন্য পুরো দেশ নির্ভরশীল থাকে। কোন দেশে প্রাইমেট শহরের অস্তিত্ব মূলত দেশটিতে উন্নয়নের ভারসাম্যহীনতাকেই নির্দেশ করে। আমাদের মতো জনসংখ্যাবহুল উন্নয়নশীল দেশে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাইমেট শহর সাধারণত বিপর্যয় ডেকে আনে- যা আমরা চকবাজার অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা দুর্ঘটনা ইত্যাদি নানাভাবে প্রত্যক্ষ করি। ঢাকাকে প্যারিস হতে হলে আসলে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আজকের প্যারিস নগরী এক সময় ছিলো পুরান ঢাকার মতোই ভগ্ন দালানকোঠা, সরু রাজপথ, গলি-তস্য গলি নিয়ে  জীর্ণ এক নগরী। ভলতেয়ার প্যারিসের বাণিজ্য এলাকা নিয়ে লিখেছিলেন- “…established in narrow streets, showing off their filthiness, spreading infection and causing continuing disorders.” প্যারিসকে এই ভগ্নদশা থেকে যিনি উদ্ধার করতে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি হলেন সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন। তিনি বুঝেছিলেন প্যারিসকে নতুনভাবে সাজাতে হলে দরকার একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ- যাকে তিনি খুঁজে বের করে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন ইতিহাসে তিনি বিখ্যাত ব্যারন হাউসম্যান নামে। প্যারিস নবায়নের জন্য হাউসম্যান যে বড় বড় প্রকল্প নিয়েছিলেন তার ব্যাপ্তি ছিলো বহু বছর- এমনকি তার চাকুরিচ্যুতি ও মৃত্যুর পরও অন্যরা তা সম্পন্ন করেছেন। আজকের আধুনিক শিল্পমণ্ডিত প্যারিস দাঁড়িয়ে আছে ব্যারন হাউসম্যানের দূরদর্শী পরিকল্পনার ওপর। আমাদের ঢাকা বা অন্যান্য নগরী ঢেলে সাজানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী কোনও বিশদ পরিকল্পনা কি কখনো নেয়া বা সম্পন্ন হয়েছে? এ শহরের কোন ব্যারন হাউসম্যানের কথা কি কখনো শুনেছি আমরা? ঢাকা কি তবে এমনি এমনি প্যারিস হয়ে যাবে কিছু ফ্লাইওভার আর হাতির ঝিল দিয়ে? মানুষকে আর কত বোকা ভাববো আমরা?

আমেরিকায় ট্রায়াঙ্গল শার্টওয়েইস্ট কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডের পরে নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ এমনি এমনি জননিরাপত্তামূলক আইন-কানুন তৈরি করে নি। এপ্রিলের ৫ তারিখ, ১৯১১ সালে অগ্নিকান্ডে নিহত সেই ১৪৬ জন কর্মীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মানুষ রাজপথে নেমে বিভোক্ষে ফেটে পড়েছিলো। প্রতিবাদে মুখর সাড়ে তিন লাখ মানুষ রাজপথে থেকে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেছিলো অগ্নিকাণ্ড নিরোধী আইন চালু ও কার্যকর করতে। চকবাজারের এই অগ্নিকান্ডে মারা যাওয়া এই ১১০ জন হতভাগ্য মানুষের শবযাত্রায় এদের পরিজন ছাড়া আদৌ কি কেউ শামিল হবে? রানাপ্লাজা দুর্ঘটনায় কি কেউ হয়েছিলো, কিংবা তার আগের অগ্নিকান্ডে বা তার আগের অগ্নিকান্ডে বা কোন দুর্ঘটনায়? আমাদের শিশুদেরও অন্তত বিবেকবোধ আছে, তাদের সহপাঠীদের মৃত্যুতে  তারা রাস্তায় নেমে আসে প্রতিবাদে। আমাদের সে বোধটুকুও নেই, আমরা শুধু একে অন্যকে দোষারোপ করে প্রতীক্ষা করতে পারি পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডের বা দুর্ঘটনার জন্য- যার শিকার হয়ত একদিন আমরা নিজেরাই হবো।

Responses -- “চকবাজার অগ্নিকাণ্ড- ঢাকা, প্যারিস ও আমাদের দুর্ভাগ্য”

  1. Bongo Raj

    “অপ্রাকৃতিক দুর্যোগ” আর “প্রাকৃতিক দুর্যোগ” এই দুই ব্যাপারকে মিলেমিশে একাকার করে ফেলেছেন জনাব তানভীর আহমেদ।
    বাংলাদেশ অপ্রাকৃতিক দুর্যোগ (Human made Disaster) ব্যবস্থাপনায় উন্নত এই কথাটা কোন পাগলেও বলবে না। এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না, আলোচনার ব্যাপারও হতে পারে না। এই কথাটা বলা হয়েছিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ(Natural Disaster) কে নিয়ে, বিশেষত “বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর সময় এই দেশের মানুষেরা যে ভাবে তা সামলায় সেটা যদি আমেরিকার সাইক্লোনের সময় আমেরিকানরা সামাল দিতে পারতো তাহলে ক্ষয়ক্ষতি আরও কম হতো” এই বিবেচনায় বলা হয়েছিল। এখানে একটা কথা না বললেই নয় তাহলো, সামলানোর ক্ষমতা বলতে এখানে মানুষের মনোবলের (enthusiasm)-এর কথা বলা হয়েছে
    মানুষের ঘটানো দুর্যোগ ব্যাবস্থাকে সামাল দিতে কিভাবে উন্নত হবে বাংলাদেশ, যেখানের আমরা সাধারন জনগণই এক একজন বড় দুর্যোগ।
    প্রমাণ চান? চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডটাকে একবার ফিরে দেখুন, সাধারন জনগণ ব্যাবস্থা নিতে দিচ্ছে না, সাধারন জনগণই রাসায়নিক ভরা গুদাম ব্যাবসায়ীকে বাঁচানোর জন্য গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের গল্প বানিয়ে রাস্তায় মিছিলও করছে!!

    Reply
  2. আসমা সুলতানা মিতা

    আমরা যেভাবে চাই সেভাবেই সাজাই আমাদের শহর, জীবন, মৃত্যু শুধু নিশ্চিত করে সেই চাওয়া।

    Reply
  3. Dr Reza Ali Rumi

    আপনার লেখাটি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়লাম, একেবারে মনের ভিতর উঁকি দেওয়া সব কিছুই যেন আছে।
    ঢাকা শহরের বহুতল আবাসিক বা অনাবাসিক যাই বলি না কেন কোথাও কি অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা আছে, এক কথায় নাই। যদি থেকেও থাকে বাক্তিগত পর্যায়ে আছে অনেকটা স্বপ্রোনোদিত হয়্ , বেচে থাকার জন্যে। যারা ঢাকাকে প্যারিস শহরের সাথে তুলনা করে তারাও কেন করে সেটা কেবল তারাই বলতে পারবে।
    এই দুর্ঘটনায় যাদের অকাল মৃত্যু হয়েছে, যেসব পরিবার গুলো অভিভাবক শুন্য হয়েছে কেউ কি আমরা ভাবি, বলেন।
    হয়তো আরেকটা ইস্যু এই ইস্যু আবার পূর্বের মতই ঢেকে যাবে।

    Reply
  4. raju

    আমেরিকার সাথে তুলনা কইরেন না। আমেরিকার চেয়ে আমাদের দেশ অনেক ভালো। পারলে দেশে আইসা দেশের উন্নয়নে হাত দেন।

    Reply
  5. সৈয়দ আলি

    কী মর্মান্তিক সময়েও স্তাবকতার ঘাটতি নেই। গত ন’বছরে যে সমাস্যাটির সমাধান হলো না,তার প্রাপ্য কি স্তাবকতা?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—