‘মি: স্পিকার !  আজ আমি আপনার সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়ে ইন্ডিয়ান আবাসিক স্কুলের তখনকার ছাত্রছাত্রীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি” – কানাডার সংসদে প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপারের বক্তৃতার অংশ, ১১ই জুন ২০০৮।

দেশ, জাতি ও সরকারের পক্ষ থেকে সংসদে ক্ষমা চাইতে হল প্রধানমন্ত্রীকে। ১৮৭০ সালের দিকে ফরাসি ও ব্রিটিশ শক্তি কানাডা দখলের পর আদিবাসী সব শিশুকে আবাসিক স্কুলের হোস্টেলে বন্দি করে  তারা নিজেদের বানানো সিলেবাস ছাড়া অন্য সব শিক্ষা অবৈধ ঘোষণা করে।  ইংরেজিতে ছাড়া নিজেদের ভাষায় কথা বলার অধিকার পর্য্যন্ত বাচ্চাদের ছিলনা।  সিলেবাস বদলের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক গণহত্যার সেই অবর্ণনীয় অত্যাচারের বিবরণ দিয়েছেন হ্যালিফ্যাক্সের গবেষক ফারহানা নাজ শম্পা – ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসিক স্কুল: কানাডার ইতিহাসে কালিমাময় এক অধ্যায়” – প্রথম আলো ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮।

একটা জাতিকে তার ইতিহাস ঐতিহ্য ভুলিয়ে দেওয়া তাকে খুন করার সমান, তার চেয়েও আত্মঘাতী হলো বাচ্চাদেরকে উল্টো ইতিহাস শেখানো।  ওই স্কুলগুলোর অধ্যক্ষেরা কোনো স্যুট-টাই পড়া ‘ভদ্দন্নোক’ ছিলেন না – তারা ছিলেন ধর্মগুরু পাদ্রী।  গণহত্যার মধ্যে হিংস্র ধর্মগুরুরা স্বর্গের সিঁড়ি খোঁজেন, এ থেকে শান্তিময় ধর্মগুরুরা জাতিকে রক্ষা করতে পারেন। আরেক উদাহরণ পাকিস্তান যার সাথে আমাদের রাজনৈতিক-ধর্মনৈতিক অতীত বর্তমান প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত। আজ হাতে গোনা কিছু পাকিস্তানি ছাড়া সবাই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে-

উদাহরণ ১ – একাত্তর আমাদের স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধ ছিলনা, ওটা ছিল ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ।

উদাহরণ ২ – মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ভারতের মুসলিমেরা  ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করে পাকিস্তান সৃষ্টি করেছে।

দুটোই ডাঁহা মিথ্যে।  এমন উল্টাপুরাণ তুঘলকি কাণ্ড কিভাবে সম্ভব হলো? পুরো জাতিকে ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার মুণ্ডু কিভাবে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেয়া সম্ভব হল? ইতিহাস থেকে এই বিচ্ছিন্নতার কারণেই জাতটা ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষাই নেবার সুযোগ পায়নি, এখনো মৌলবাদের খপ্পরে রক্তাক্ত হচ্ছে আর বেলুচিস্তানে আমাদের মতোই শোষিত বঞ্চিত স্বাধীনতাকামী বেলুচদের ওপরে ক্রমাগত গণহত্যা করছে।  আর আমরা? আমরা ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর লক্ষবাগ আমবাগানের যুদ্ধে মীরজাফরের ইতিহাস জানি বলেই পঁচাত্তরের মুশতাককে চিনতে আমাদের সময় লাগে এক সেকেণ্ড বা তারও কম।

জাতিকে ইতিহাস ভোলানোর অব্যর্থ অস্ত্র হলো শিক্ষা-সিলেবাস। বাচ্চারা তাদের প্রাইমারি থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গন পর্যন্ত যদি একই তথ্য শেখে, সেটা আবার পিতামাতা, শিক্ষক, টিভি-রেডিও, ম্যাগাজিন খবরের কাগজ,  রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের সভা সমিতির বক্তৃতায় ক্রমাগত শুনে বড় হয় তখন তাদের কাছে সেটাই মোক্ষ সত্য হয়ে দাঁড়ায়,  এর বাইরে কিছু তারা চিন্তাও করতে পারেনা। কি শিখেছে পাকিস্তানিরা ছোটবেলা থেকে?

উদাহরণ ১ – মুক্তিযুদ্ধের ওপরে তরুণ বলিষ্ঠ গবেষক আরিফ রহমানের “ত্রিশ লক্ষ শহীদ : বাহুল্য নাকি বাস্তবতা” বইয়ের ‘কেন আজও পাকিস্তানকে ঘৃণা করতে হয়’ – অধ্যায়ে দেখানো হয়েছে পাকিস্তানি শিশুরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কীভাবে পড়ছে – সূত্র – আজাদী, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৮।  (সংক্ষিপ্ত উদ্ধৃতি):-

“১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর ভারত পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের সহযোগিতায় সেখানকার অধিবাসীদের পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলে..১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করে।  ভারতের ষড়যন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তান পৃথক হয়ে যায়…..পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বহু সংখ্যক হিন্দু শিক্ষক ছিলেন..হিন্দু শিক্ষকেরা বাঙালিদের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে…….ভারত তাদের স্বার্থ বাস্তবায়নে এই হিন্দুদেরকে ব্যবহার করে…. অনেক হিন্দুই ভারতের চর হিসেবে কাজ করে ….মার্শাল ল কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ….. .ডিসেম্বর ৩, ১৯৭১ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়।  স্থানীয় জনগণের সমর্থনের অভাব, সামরিক বাহিনী ও সরঞ্জামাদি সরবরাহের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কারণে পাকিস্তানের সৈন্যরা ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্নসমর্পণে বাধ্য হয়।”   (উদ্ধৃতি শেষ)

২য় উদাহরণটাও মিথ্যে।  ১৯৪৬ সালে ভারতে “ইনফরম্যাল রেফারেণ্ডাম” নির্বাচন হয়েছিল। র্অথাৎ মুসলিম লীগ যদি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে জেতে তাহলে প্রমাণ হবে ভারতীয় মুসলিমেরা পাকিস্তান চায়।  সে নির্বাচনে মুসলিম লীগ পাঞ্জাবে ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে হেরে গিয়েছিল, শুধু সিন্ধু প্রদেশে সমানে সমান ভোট পেয়েছিল। সাংবিধানিক ক্ষমতায় স্পিকার তার ভোটটা মুসলিম লীগকে দিলে তবেই সেখানে সে সরকার গঠন করতে পেরেছিল।  আর বাংলায় মুসলিম লীগ ভূমিধ্বস জিতে সরকার গঠন করেছিল।  অর্থাৎ পাকিস্তানের বেশীর ভাগ জনগণই পাকিস্তান চায়নি, পাকিস্তান এনেছিলাম আমরাই।  অথচ ওখানকার বাচ্চারা সিলেবাসে উল্টো ইতিহাস শিখে বড়ো হয়েছে।

নিজের মা-বোন ধর্ষিতা না হলে নাকি অপরাধটা ধর্ষকের মাথায় ঢোকেনা।  সিলেবাস বাংলাদেশেও বদলানো হয়েছে।  ধর্মীয় শিক্ষার জন্য দেশে অসংখ্য মাদ্রাসা থাকার পরেও যারা সাধারণ শিক্ষা-সিলেবাসে ধর্ম ঢুকিয়ে দিয়েছেন তারা ভুলে যান যে বাংলাদেশের বাইরে বিশাল বিস্তীর্ণ দুনিয়া আছে, সেখানে এক ধর্মের উগ্রতা অন্য ধর্মের উগ্রতাকে শক্তিশালী করে।  তারা খেয়াল করেন নি যে তাদেরকে অনুসরণ করে ভারত ও পশ্চিমা বিশ্ব সিলেবাসে বেদ-পুরান-উপনিষদ-বাইবেল ঢুকিয়ে দিলে মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের কি ভয়ানক অবস্থা হবে।  পাকিস্তানের স্কুল কলেজে বাচ্চাদের ওপরে রাষ্ট্রের এই হিংস্রতা বহু আগে থেকেই চলছে।

বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে যদি সত্য হয় তাহলে যে প্রকৃতির শিক্ষাঙ্গন সেই প্রকৃতির সিলেবাস হওয়াই দরকার। আমাদের সিলেবাসের ঐতিহ্য ছিল সরকারী সিলেবাসে অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গনের সিলেবাসে ধর্মীয় শিক্ষা। পরে শুরু হয় সিলেবাসে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা।  সেই আটচল্লিশ বাহান্নতেই আরবী অক্ষরে বাংলা লেখার মতো উদ্ভট ও উৎকট চেষ্টা হয়েছিল, সম্ভবত: সরকারী অর্থায়নও করা হয়েছিল।  ফ্রন্টাল লাইনে সেই অপচেষ্টা বিফল হবার পর সেই একই উদ্দেশ্যে এখন সাইড লাইনে শুরু হয়েছে নুতন আক্রমণ।   অ-তে ‘অজগর’ এগুলো উবে গিয়ে হয়েছে – উদ্ধৃতি:- অ-তে ‘অজু করে পাক হও’, আ-তে ‘আজান শুনে জামাতে যাও’, ই-তে ‘ইসলাম চায় শান্তি’, ঈ-তে ‘ঈমান বাড়ায় শক্তি’, এ-তে ‘এক হও মুসলমান’, ঐ-তে ‘ঐশী বাণী আল কোরআন’….‘গ’-তে ‘গান শোনা ভালো নয়’…‘জেড’ বর্ণ দিয়ে শব্দ গঠন করা হয়েছে ‘জু’ আর বাক্য গঠনে লেখা হয়েছে, ‘চিড়িয়াখানাতে আল্লাহর কুদরত দেখো’…

৫০টি বর্ণের মধ্যে ২৯টি দিয়ে ধর্মীয় বাক্য গঠন করা হয়েছে। – কালের কণ্ঠ – কিন্ডারগার্টেনে কী পড়ানো হচ্ছে! ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৯।  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আয়াতুল্লাহ খোমেনি, মাওলানা আবদুর রহিম এমনকি মাওলানা মওদুদীর জীবনী ও দর্শনচিন্তা। অথচ মওদুদীর চিন্তাধারা পাকিস্তানে ধর্মীয় ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে খুনোখুনির ঘটনা ঘটিয়েছিল এবং এ চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হয়েই একশ্রেণীর তথাকথিত ধার্মিক আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করে হানাদার বাহিনীর দালালিতে লিপ্ত হয়েছিল। এ দেশের আল বদর, আল শামস ও রাজাকার বাহিনীর উৎপত্তি মওদুদীর চিন্তাধারারই ফসল – সমকাল সম্পাদকীয়, ২৪ জুন ২০০৮।

সিলেবাস পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী।  ত্রিশ চল্লিশ বছর পরে এর প্রভাব অনুভূত হবে যখন আমাদের বাচ্চারা বড়ো হয়ে দেশ-জাতির হাল ধরবে।  বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায় জাতির ইতিহাস স্কুল সিলেবাসে ঠিকমত অন্তর্ভুক্ত না করার ফলে তরুণ প্রজন্ম ইতোমধ্যেই ভয়াবহ জগাখিচুড়ী করে ফেলেছে শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবসের মধ্যে। অলক্ষ্যে অট্টহাসি হাসছে বাংলাদেশের নিয়তি, ধ্বনিত হচ্ছে ইঙ্গিত – আমরাও কি অসাম্প্রদায়িকতার শেকড়চ্যুত হয়ে পাকিস্তান মার্কা ভবিষ্যতের দিকে হাঁটছি?

দেশে এই সাংস্কৃতিক গণহত্যার বিরুদ্ধে আজ সোচ্চার অনেক মেধা, চিন্তা, কণ্ঠ ও লেখা, এর মধ্যে উঠে এসেছে মৌলিক এক অনন্য প্রতিরোধ।  কলমের বিরুদ্ধে চাপাতির হিংস্রতা নয়, কলমের বিরুদ্ধে কলম এবং বইয়ের বিরুদ্ধে বই।  এ বইয়ের নাম “বর্ণে বর্ণে বাঙালী”।  ২৪ পৃষ্ঠার এ বইতে প্রায় ৬০ জন বাঙালি মনীষীর মুখচ্ছবির সাথে রয়েছে ছড়া যাতে  বাচ্চারা অক্ষরের সাথে সাথে আমাদের আলোকিত বাতিঘরদের সাথেও পরিচিত হয়, তাদের মতো হবার উৎসাহ পায়।

অ- তে অতুলপ্রসাদ সেন

বাংলা ভাষার গুণী শিল্পী, গানের মানুষ তিনি,

দেশের গান মানুষের গান গজল লিখেছেন যিনি।

আ- তে আলতাফ মাহমুদ

আলতাফ মাহমুদ গানের পাখী, দেশ রক্ষায় বীর,

ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধ, উন্নত তার শির।

এ- তে এস এম সুলতান

রঙ তুলিতে আঁকতেন ছবি, আঁকতেন দেশের মুখ,

বাংলাদেশের শিল্পী তিনি, গর্বে ভরে বুক ।

ঋ-তে ঋত্বিক ঘটক

বাঙালির পরম বন্ধু সিনেমা অন্ত:প্রাণ,

সিনেমার মাঝে গেয়ে গেছেন মানুষের জয়গান।

প্রকাশক রাকিবুল হাসানের ভাষায় – “যে বই শিশুকে তার শিক্ষাজীবনের সূচনায় ‘অজ’ বা ছাগল চেনাবে না, অজগরের ভয় দেখাবে না বা শিশুমনে ঢুকিয়ে দিবে না সাম্প্রদায়িকতা। এই বই শিশুদের পরিচয় ঘটাবে বাঙালি মনীষীদের সাথে।  শিশুরা চিনবে কাজী নজরুল, লালন, ক্ষুদিরাম, সুলতান, মেঘনাথ সাহা প্রমুখকে।  ওরা জানবে ভাষাশহীদ এবং বীরশ্রেষ্ঠদের সম্পর্কে। ওদের মনে তৈরি হবে অদম্য কৌতুহল এবং নানান প্রশ্ন।  প্রশ্নের উত্তর খুঁজে খুঁজে ঘটবে শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিকাশ”।

হোক পথ দু:সহ, দুর্গম, ভয়াবহ – দু’এক পথিক পথ চলবেই,

বোধের বন্ধদ্বারে, নিকষ অন্ধকারে – বিদ্রোহী কিছু দীপ জ্বলবেই !!

মাভৈ !

(মতামত বিভাগের বিধিনিষেধের জন্য বইটার বিস্তারিত দেয়া সম্ভব হলোনা, ইন্টারনেটে “বর্ণে বর্ণে বাঙালী” সার্চ করলে ফেসবুক সহ বিস্তারিত পাওয়া যাবে)

 

হাসান মাহমুদমুসলিম রিফর্ম মুভমেন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী, শারিয়া আইনের ওপর গবেষক, লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বক্তা।

Responses -- “অ-তে অতুলপ্রসাদ, আ-তে আলতাফ মাহমুদ!”

  1. সরকার জাবেদ ইকবাল

    ১৯৬৭ সাল। ক্লাস থ্রিতে পড়ি। স্কুলের নাম সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট প্রাইমারি স্কুল। স্কুলের অবস্থানটি ছিল মুরগির ফার্মের (বর্তমান সংসদ ভবন) উত্তর-পূর্ব দিকে। বর্তমানে এই স্কুলের কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। উর্দু ক্লাস নিতেন একজন অবাঙালি। পোশাকে-আশাকে চেহারা-সুরতে একদম জিন্নাহ্‌র ডুপ্লিকেট। ঘ্যান ঘ্যান করে উর্দু বর্ণমালা আর ছড়া মুখস্ত করতে হতো। একটি ছড়ার দু’টি লাইন এখনও মনে আছে, – ‘রাজা আয়া, টমটম লায়া’। আমাকে এই অদ্ভূত শিক্ষা কেন গ্রহণ করতে হয়েছিল এ বিষয়ে লেখক যদি কিছু লিখতেন তাহলে খুশি হতাম।

    Reply
  2. jahid

    ছোটবেলায় আমরা পড়েছি, অ- তে – অসৎ সংগ ত্যাগ করো, আ- তে – আলস্য … এটা চালু রাখলে সমস্যাটা কোথায়? কেউ একটু বলবেন ??? দয়া করে……..

    Reply
  3. রোমান

    অনেকের কাছে হয়ত প্রশ্ন ভাষা আন্দোলনের মত নির্দলীয়, নিরিহ একটা জাতীয় ঘটনা নিয়ে কেন আমরা প্রশ্ন তুলছি। প্রশ্ন তুলছি হিন্দি বিদ্বেষ বা উর্দু প্রীতির কারনে না। বস্তুত কোন ভাষার প্রতিই আমাদের বিরাগ নেই। আমরা দেখছি বাংলাভাষা প্রেমের নামে দুনিয়ার তাবত জ্ঞান, সাহিত্য থেকে আমরা বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছি। আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। বিষয়টার ভয়াবহতা পর্যবেক্ষণ করে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের গবেষক ও মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর বলেন,
    “…ভাষার দাবীতে এই অঞ্চলে, তৎকালীন পূর্ব বাঙলায়, এক ঐতিহাসিক আন্দোলন হয় যা আমাদের সকলেরই গর্বের বিষয়, আমাদের সাধারণ সংগ্রামের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এখানে লক্ষ্য করার বিষয় যে, মাতৃভাষা প্রেমের নামে এখানে অন্য সব ভাষার বিরোধিতা, বিশেষ করে উর্দু বিরোধিতা, এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যাতে বাঙলাদেশের সাধারণ সংস্কৃতি পরিণত হয়েছে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। স্বদেশ প্রেমের নামে, বাংলা ভাষার গৌরব রক্ষার নামে, মাতৃ ভাষায় শিক্ষা প্রদানের নামে উর্দু থেকে শুরু করে সকল ভারতীয় ভাষা,ইংরেজী এবং বিশ্বের অন্য সব ভাষা থেকেই বাংলা ভাষা চর্চা আজ এমনভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে যাতে বাঙলাদেশীদের বিশ্বভ্রমণ ও বিশ্বজোড়া যোগাযোগ সত্বেও একে তুলনা করা চলে এমন এক দ্বীপের সাথে যেখানে মহীরুহ ও ছোটবড়ো গাছপালার পরিবর্তে আছে ঝোপঝাড়, আগাছা এবং ভূমি মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া’’।(১)
    বিদেশে সব মিলিয়ে বিভিন্ন দেশে প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশী বসবাস করেন। এই লোকগুলো ব্যতিক্রম বাদে সব জায়গায় ভারতীয়, পাকিস্তানী ও শ্রীলঙ্কানদের থেকে পিছিয়ে। বাংলাদেশীরা আসলে ভাল কামলাও হতে পারেনা। কেননা বিদেশে গিয়ে ভাল কিছু করার জন্যও তো ভাষা জ্ঞান লাগে। ভারতীয়রা, পিলিপাইনের মেয়েরা বিভিন্ন দেশে নার্সিং, আই.টি ও ডাক্তারী পেশাগুলোতে এগিয়ে যাচ্ছে শুধু মাত্র শিক্ষা ও ইংরেজিতে ভাল হওয়ার কারণে। আমাদের এখানে এসব নিয়ে চলে রাজনীতি! আর এসব হয়েছে মাতৃভাষা প্রেমের নামে।
    আমরা যদি ভারতীয় হতাম তাহলে মাতৃভাষার পাশাপাশি হিন্দি/উর্দু এবং ইংরেজি ভাষা শিখতাম। আমার সন্তান যদি ব্রিটিশ হত তাহলে বাংলার পাশাপাশি, রাষ্ট্র ভাষা ইংরেজি আবশ্যিক ভাবে শিখত। পাশাপাশি ১-২ টি ইউরোপিয়ান ভাষা অতিরিক্ত শিখত, ধর্মীয় কারনে আরবী শিখত। আজ আমরা, আমাদের সন্তানেরা না পাড়ে ভাল বাংলা, না ভাল ইংরেজি। ভাষা হিসেবে কিন্তু হিন্দিও শিখছে না, শিখছে বলিউডি হিন্দি, নিচ্ছে কালচার। এটা আত্মঘাতী।

    Reply
  4. হাসান মাহমুদ

    “গান গাওয়া ভালো নয়” এটা মাথায় গেঁথে যে প্রজন্ম বড় হচ্ছে ভবিষ্যতে তারা দেশের হাল ধরতে পারলে প্রথমেই ধ্বংস করবে ছায়ানট, নজরুল একাডেমী সহ প্রতিটি সংগীত প্রতিষ্ঠান, দেশের বিশাল সংগীত ইন্ডাষ্ট্রি, ধ্বংস করবে বর্ষবরণ বসন্ত উৎসব ইত্যাদি। গল্পকথা নয়, নিদারুন বাস্তব। ২০০৩ সালে শারিয়াপন্থী দল মুত্তাহিদা মজলিস-এ আমল উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে নির্বাচনে জিতে প্রথমেই বন্ধ করে সঙ্গীত, বিজ্ঞাপন-পোস্টারে নারীর ছবি, বিচিত্রানুষ্ঠানে-রেডিও-টিভিতে মেয়েদের গান ও নাটক। তারা সঙ্গীত-শিল্পীদের মারপিট করে, সিনেমা হলগুলো বন্ধ করে এবং গানের সিডির সব দোকান ও প্রোডাকশন হাউস ধ্বংস করে। সেই সাথে “ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষার” নামে আইন পাশ করে, আল্ট্রাসাউণ্ড ও ইসিজি পরীক্ষায় রোগিণীরা পুরুষ টেকনিশিয়ানের কাছে যেতে পারবে না। অথচ সারা প্রদেশে নারী-টেকনিশিয়ান ইসিজি’র ছিল মাত্র একজন ও আল্ট্রাসাউণ্ডের একজনও ছিলনা ! সেখানে মা-বোনদের কি ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল ! বাংলাদেশে এই ভয়ংকর অবস্থা চাইনা আমরা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—