ঊনিশ-বিশ বছর বয়সের এক যুবকের লেখা একটি কবিতা, সুরে রূপ নেয় সঙ্গীতে। গণ মানুষের ধমনী বয়ে ধ্বনিতে ধ্বনিতে রূপান্তরিত হয় গণসঙ্গীতে –

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’।

গানটির রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরী। ভাষা-শহীদ রফিকের (রফিক উদ্দিনের) রক্তাক্ত মৃত দেহ দেখে বিস্মিত হন রাজনৈতিকভাবে সচেতন গাফফার চৌধুরী। কবিতা লেখার যন্ত্রণা তাড়া করে তাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় বেদনার অনুভূতি দানা বাঁধাই স্বাভাবিক। তাই সেদিন তাৎক্ষণিক যে পংক্তি যুবকের কোমল মনে জন্ম নেয় তা –

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

                      আমি কি ভুলিতে পারি’।

না! শুধু ব্যক্তি গাফফার চৌধুরী নয়। পারে না জাতি ভুলতে। ‘একুশ’ একটি বিশেষ ‘ঘটনা’। আর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ একটি বিশেষ গান, যেখানে একটি মূহুর্তের ঘটনা, ‘চলমান-ঘটনা’ হয়ে রূপ নেয় জাতি সত্ত্বার আন্দোলনে। ‘ঘটনা’ আর ‘গান’ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আজ স্থান করে নিয়েছে বিশ্ব দুয়ারে। তাই ‘একুশ’ আজ আর শুধু বাংলা ভাষা দিবস নয়, ‘একুশ’ আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

‘একুশ’ নিয়ে রচিত হয়েছে বেশ কয়েকটি গান। সবগুলোই অত্যন্ত জনপ্রিয়। যেমন ‘রাষ্ট্র ভাষা গান’ শিরোনামে সেখ সামছুদ্দীনের লেখা গান –

‘রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন করিলি ও বাঙ্গালী – রে ভাইরে

ঢাকা শহর রক্তে ভাসালি –

…………………………………………….

রাষ্ট্র ভাষা বাংলা হবে এইতো তাদের গান

ন্যায্য দাবী করিয়া ভাইরে খুয়াইলি পরাণ’।

সম্ভবত, এটাই একুশের প্রথম গান। কথিত গানটি রচিত হয় ২৩ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ বাগেরহাটের ফতেহ্‌পুর গ্রামে (Shamsuddin: Lyricist of the first song on the Language Movement, Dhaka Tribune, 21st February, 2017)। সেখানেই এ গানের রচয়িতা সেখ সামছুদ্দীনের আবাসভুমি।

তারপর ভাষা সৈনিক গাজীউল হকের লেখা –

‘লাল ঢাকা রাজপথ,

    ভুলব না ভুলব না’।

সাধারণ মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে গানটি দ্রুত হয়ে ওঠে রাজপথের গানে।

আর আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর লেখা –

‘আজকে স্মরিও তারে,

ভাষা বাঁচাবার তরে প্রাণ দিল যারা’।

এ গানটি ১৯৫৩’র একুশের প্রভাতফেরির গান হিসেবে গাওয়া হয়। সেই সাথে আব্দুল লতিফের ১৯৫৩-তে রচিত –

‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’।

এ এক অনবদ্য সৃষ্টি। গানের শব্দ সুর ও ছন্দের উদ্দীপনায় আজও মেতে উঠে গ্রামবাংলার মানুষের হ্রদয়।

তবে একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে এযাবত যে গানটি প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে তা আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’। এ গানে দুটি স্বাতন্ত্র্যসূচক ধারা লক্ষ্য়ণীয়। ত্রিশ বাক্যে রচিত কবিতার প্রথম অংশ (প্রথম ছয় লাইন), দ্বিতীয় অংশ (অবশিষ্ট লাইন) থেকে ভাব ও ভাষায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে ব্যথা-বেদনার উপলব্ধি রূপ নিয়েছে শোকগাঁথায় –

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

                     আমি কি ভুলিতে পারি

  ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি

    আমি কি ভুলিতে পারি

 আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি

                    আমি কি ভুলিতে পারি’।

এই উপলক্ষে গবেষক নয়নিকা মুখার্জিকে উদ্ধৃতি দেওয়ার তাগিদ অনুভব করছি। তিনি লিখেছেন- ‘the melancholic is a “prominent idiom” in Bengali popular and high culture, which offers an alternative form of “enjoyment or pleasure” through the indulgence in sadness as a form of catharsis’ (Mookherjee, Nayanika, (2007) “The Dead and their Double Duties: Mourning, Melancholia and the Martyred Intellectual Memorials in Bangladesh”, Space and Culture, 10.2, 271-291)।

নি:সন্দেহে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ মুখার্জির উক্তির যতার্থতাই প্রমাণ করে। গানের এ অংশ সমষ্টিগত বিষণ্নতার (collective sadness)  এক গভীর অভিব্যক্তি।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় অংশ প্রতিবাদ মুখর। রচয়িতা এখানে শোনায় উদ্দীপনার বাণী –

‘জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা

             শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা’  

কিংবা –

‘আমার শহীদ ভাইয়ের আত্না ডাকে

      জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে’।

একজন সমাজ সচেতন যুবকের পক্ষে সামাজিক অবক্ষয় ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হাওয়া যতটা স্বাভাবিক, শোকগাঁথা রচনা হয়তো ততটা স্বাভাবিক নয়।

শোকগাঁথা আর উদ্দীপনা, এই দু’ধারার ফাঁকে গাফ্‌ফার চৌধুরী উন্মোচন করেন মানব ইতিহাসের এক কলুষিত দিক। মানুষের সরল, সুন্দর ও শান্তিময় মূহুর্তে আঘাত হানা, তারই চিত্র এঁকেছেন তিনি –

‘সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে

    রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;  

 পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,

   এমন সময় ঝড় এলো এক ক্ষ্যাপা বুনো’।

আজ যে সুরে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গাওয়া হয়, তার সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদ। সুর নাকি স্বর্গের; মানুষের নয়, বিধাতার সৃষ্টি (‘Where were you when I laid the earth’s foundation? While the morning stars sang together and all the angels shouted with joy?’ – Old Testament, Job 38, 1a, 4a, and 7)। হয়তো আলতাফ মাহমুদের এ সুর বিধাতার বাধঁনে বাঁধা! তাইতো, এতটাই  শ্রুতিমধুর। গির্জা-সঙ্গীতের সুরে বেঁধেছেন গানটি। গির্জায় কংগ্রেশনাল সঙ্গীতে ক্যান্টর যেমন গানের সুচনা করে, বাকি সবাই কয়েক মুহূর্ত পরে ধরে। গাওয়ার এ কায়দা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ তেও লক্ষণীয় – বিশেষ করে প্রভাতফেরিতে গাওয়ার সময়।

সমাজকে এক বিশেষ লক্ষ্যে ধাবিত করার জন্য বিপ্লবী বাণী কী সব সময় অপরিহার্য? হয়তো বা না। যেমন, দেখি একটি আন্তর্জাতিক গণসঙ্গীত – ‘We shall overcome’ এ। যা পরবর্তী পর্যায়ে সিভিল রাইট মুভমেন্টের একটি প্রধান গানে (এন্থেমে) পরিণত হয় –

‘We shall overcome,

We shall overcome,

someday

Oh, deep in my heart,

I do believe

we shall overcome

someday’

এখানে সংগ্রামের প্রকাশ্য কোনও ডাক নেই। আছে আত্মার কথা, আত্নবিশ্বাসের কথা। আছে সুকঠিন আত্নপ্রত্যয়ের অঙ্গিকার। এই গানের সুরে বিশ্ববাসী মানব-শিকল হয়ে হাঁটে অসত্য, অসুন্দর ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির অন্বেষণে। তেমনি, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’। এ গানের যে অংশটুকু (প্রথম ছয় লাইন) গাওয়া হয়, তাতেও বিপ্লবী ডাক নেই। এখানে শুধুই বেদনা দানা বেঁধে উদ্ভাসিত হয়েছে হৃদয়ের কয়েকটি পংক্তিতে। যার মাঝে জন্ম নিয়েছে মানুষে মানুষে হাতে হাত রেখে চলার বিশ্বাসে। যেখানে শোক রূপান্তরিত হয়েছে সুপ্ত শক্তিতে। তাইতো, ‘একুশ’ মুক্তির উৎস।

শামস রহমানঅস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—