একবার আমার পরিচিত একজনকে বলেছিলাম তিনি রোমান হরফে বাংলা বানান করে লেখেন কেন। মানে ‘আমার’ না লিখে কেন `Amar’ লেখেন। সেই সহনাগরিক বলেছিলেন, ‘এটা সহজ’। তার উত্তরটাও বেশ সহজ। যাক এটা নিয়ে এখন কথা বাড়াবো না। কারণ এভাবে লেখার পক্ষে কম করে না হলেও এক লাখ মানুষ অনলাইন জগতে সর্বভূতে বিরাজমান। বিশাল সংখ্যার এই ভূতের মধ্যে কয়েকজন যদি আমার ঘাড়ে চাপেন তবে আমার ত্রাহি অবস্থা হবে।

‘আমারি বাংলা ভাষা’ বলে আর ক’দিন পরেই আমরা লাফিয়ে উঠবো। ফেব্রুয়ারি মাস যে! কবি কী লিখেছেন তাতে কী আসে যায়। যে, যা বোঝে তাই-ই সই। আমি যা বলবো, যেভাবে লিখবো তাই হবে। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা। ‘আমারি’ বললে সমস্যা কী! বাংলা ভাষারতো আমার। তাই না?” হ্যাঁ, আপনারইতো। তবে কী জানেন, ভাষাটা আপনার বাড়ির টয়লেটের কমোড নয়। এটা বুঝতে হবে।

কিন্তু কে বোঝে? আসলে তাই-ই হচ্ছে। অন্তত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর কিছু গণমাধ্যমে তো বটেই। নিজের বাড়ির টয়লেট মনে করছে ভাষাকে। কোনভাবেই নিয়মতো দূরের কথা সামান্য সৌজন্য পর্যন্ত রাখছে না। বলছে বাংলা, মনে হচ্ছে ইংরেজি। কোন বর্ণ কিভাবে উচ্চারণ হয় তাও ঠিক থাকে না। এখন বলতে পারেন কথ্য ভাষাতো অনেক কিছু হতে পারে। হ্যাঁ, পারে। অবশ্যই পারে। সব ভাষাতেই পারে। হয়ও তাই। সেকারণে ইংরেজি ভাষায় বেশ দক্ষ মানুষকেও দেখেছি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ‍বিপদে পড়তে। কারণ ওদের উচ্চারণ।

ইংরেজি ‘A’ বর্ণ অনেকসময় ‘অ্যা’ বা ‘আ’ এরমত উচ্চারণ হয়, শুনেছি। কিন্তু ‘O’ এর উচ্চারণ হতে শুনিনি। অথচ বঙ্গবাসী আমরা ‘র’ আর ‘ড়’ এক করে ফেলেছি। আবার কিছু ক্ষেত্রে নতুন বানান লেখা শুরু করেছি। আর অনেক শব্দের নতুন অর্থ করে পুরনো অর্থ বাদতো সেই কবেই দিয়ে ফেলেছি। এখন কোমল পানীয় বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানও আমাদের নতুন অর্থ শেখাচ্ছে। ভালোতো, ভালো না?

এসব কথা বলতে গেলে অনেকে প্রগতি বিরোধী বানিয়ে দেবে। হায়রে দুর্গতি! বাংলার ভাষার প্রগতিটার কী হবে? যাচ্ছেতাই যন্ত্র(ণা) অনুষঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া নিয়ে কথা বলেছিলাম বলে এক লেখক আমাকে খুব বকেছিলেন। কারণ? আমি প্রগতিবিরোধী। যাক সে কথা।

কিছু দিন আগে ফেইসবুকের মেসেঞ্জারে আমার এক বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, তিনি যে কাজটি দিয়েছিলেন সেটা কতদূর। আমি বললাম, “করছি।” সেই বন্ধু জানতে চাইলেন, কাজ শেষ হয়েছে অথচ তাকে জানাইনি কেন। আমি বললাম শেষ হয়নিতো। করছি কাজটা। তিনি তখন বললেন, “ও এখন করতাছো। সেইটা বলো।”

এই এক জ্বালা! ‘করছি’ আর ‘করেছি’ নিয়ে। কী আর করা যাবে, যুগধর্ম বলে কথা। সেই মতে না চললে আবার প্রগতিবিরোধী তকমা লাগবে। তাতে ভাষার বারোটা বাজুক কী একটা অবস্থা। সময়ের সাথে চলতে হবে। সেজন্যইতো একটি বেসরকারি টেলিভিশনে তাদের সংবাদ কর্মী সরাসরি সম্প্রচারে বলেছিলেন,“বৃষ্টি অসাংবিধানিক আচরণ করছে।” প্রিয় পাঠক, দয়া করে ভাববেন না ‘বৃষ্টি’ কোন ব্যক্তি। আর ওই অনুষ্ঠানটি কোন ‘কমেডি শো’ ছিলো না।

প্রথমে সহজ বিষয় নিয়ে একটু করে বলছিলাম। আসলে এই সহজের পিছনে ছুটতে ছুটতে আমাদের অবস্থা ওই সস্তার তিন অবস্থার মতো। যেটা নিয়ে একটু ভাবতে হয় বা ভাবা উচিত সেগুলো নিয়ে কথা বলতে এখন আমাদের খুব অনীহা। কেউ বললেও আমরা বিরক্ত হই। আর ভাষার ক্ষেত্রেও তাই। সেই স্কুলে যা শেখার শিখেছি। ভুলেও গিয়েছি। আবার নতুন করে কঠিন বিষয় কেন হে? সহজ যা চলছে চলুক না।

আমিও তাই বলি, চলুক না সহজ বিষয়। তাতে ভাষার কী ক্ষতি হলো তা দেখার দরকার নেই। শুধু অল্প কয়েকজন মানুষ ভাববেন বিষয়টা নিয়ে। যুগে যুগে তাই-ই হয়। অল্প কিছু মানুষই ভাবে। আর বাকিরা ‘মজা নেয়’। ভাগ্যিস পুরনো আমলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছিলো না। না হলে সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্ক্রিনশটের বিপত্তিতে পড়তে হতো।

One Response -- “সর্বভূতের ভাষা, ভেসে যাক”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—