বছরটা শুরু হয়েছে বেশ কিছু ভাল খবরের মধ্যে দিয়ে। নির্বাচনের তর্ক-বিতর্ক পারদ গলিয়ে সরকারের মন্ত্রিপরিষদের যে পরিবর্তন এসেছে তা আমার মতো আশাবাদী মানুষদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে।
সরকারের সফলতা-ব্যর্থতার চিত্র অঙ্কনের দায়িত্ব আমার না হলেও গত ছয়-সাত বছর ধরে একটি বিষয়ে নিয়মিত সরকারের নীতি-নির্ধারকদের সমালোচনা করে এসেছি আর তাহলো মুমূর্ষু শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে।
এই নিয়ে আমরা অনেক লেখালেখি করার পরও কোন চিত্র পরিবর্তন হয়নি। পাবলিক পরীক্ষা আসলে যে স্লোগান দিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সীমাহীন লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিল আমাদের শিক্ষামন্ত্রণালয়।
নানা জনের নানা কথাকে উপেক্ষা করে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা কিছুতেই সরকার কিংবা সরকার সংশ্লিষ্টতা ঢাকতে পারেনি। এর ব্যর্থতার দায়ভার কেউ নিতে চায়নি।
কিন্তু কেন এমন হলো? তার হিসেব সবাই কষলেও অংক মেলানোর ক্ষেত্রে সবাই যোজন যোজন দূরত্বে সরে গিয়েছিল।
সেইসব খবর নিশ্চয় আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জানতেন। আমরা জানি তার স্বপ্ন কী, কেমন বাংলাদেশকে তিনি রেখে যেতে চান। আর সেই স্বপ্নগুলোকে ধরা দিতে তিনি যে তার সরকারের সাহসিকতার প্রমাণ দেয়ার চেষ্টা করছেন, তাতে আমাদের শুভকামনা ও সহযোগিতা অব্যহত থাকবে বৈ কি।
ভেঙ্গে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে তরতাজা করতে শিক্ষামন্ত্রণালয়ে অনেকটা চ্যালেঞ্জ  হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দিপু মনি ও উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাদের ‘অম্লপরীক্ষা’ শুরু হয়েছে। বলতে গেলে সরকারের নানা সমালোচনায় যারা মুখরিত থাকবে বা আছেন, তাদের কাছে এই শিক্ষার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার তাৎপর্যটা অনেক বড়।
শিক্ষার সর্বনাশ যে  সকল অর্জনকে যে ম্লান করে তার হিসেব আমরা করতে ভুলেই গেছি। জিপিএ-৫ এর পিছনে ছুটতে ছুটতে আমাদের অভিভাবকদের মনেও যে একধরনের উচ্চকাংক্ষা জন্ম নেয়, তা গত কয়েক বছর দেখেছি। সন্তানদের রাত জেগে পড়ানোর চেয়ে অনেক অভিভাবকই অনলাইনে প্রশ্নপত্র সংগ্রহের সহযোগিতার খবরও পত্র-পত্রিকায় চাওর হয়েছেিল বেশ।
একটি জাতির ভাগ্যে কতটা খারাপ হলে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হয় তা অতীতের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাগুলো আমাদের মনে করে দেয়। পড়াশুনার চেয়ে জিপিএ-৫ এর লোভে আমরা কী সর্বনাশটাই করেছি তা আমরা কয়েক বছর পর ঠিকই টের পাবো।
তবে সবচে মজার বিষয় হলো, গত ছয়/সাত বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার পরও এদেশের হর্তাকর্তারা স্বীকারই করেনি যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহাৎসব চলছে। কেউ বলেনি যে  প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।
সারাদেশে টানা প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরও এইদেশের কর্মকর্তারা কিভাবে স্বীয় পদে আধিষ্ট ছিল তা নিয়ে আমরা সব সময় প্রশ্ন করেছি নিজেদেও কাছে। এরা যে অপরাধ করছে, তা দেশের আইনে তো ফৌজদারি অপরাধ। আর এই অপরাধের দায়ে একেক জনের চাকুরিচ্যুত থেকে জেল পর্যন্ত হতে পারতো কিন্তু তা হয়নি।
মূলত অপরাধীদের শাস্তি ও আইনের কঠোরতার অভাবে ফাঁসকারীরা বুক ফুলিয়ে এই সমাজে খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়েছে। বুক ফুলিয়ে ফেইসবুকে বিনামূল্য প্রশ্নপত্রও ছেড়েছে তা আমরা বিগত বছরগুলোতে দেখতে পেয়েছিলাম।
কিন্তু সেই চিরচেনা প্রশ্নপত্র ফাঁসের যুগের কিছুটা হলেও লাগাম পড়েছে বলে দৃশ্যমান হচ্ছে। গত কয়েকদিন যেভাবে পরীক্ষা হয়েছে, তাতে কোথাও প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনও অভিযোগ আসেনি কিংবা গণমাধ্যমেও কোনও প্রতিবেদন দেখা মেলেনি।
নিঃসন্দেহে এটা ভালো কিছুর ইঙ্গিতই বহন করছে। কেবলমাত্র দায়িত্বপ্রাপ্তদের সদিচ্ছায় পরীক্ষা হলের যে চিত্র এসেছে তাতে কিছুটা হলেও আমরা স্বস্তি প্রকাশ করতে পারি।
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোরতা পরিলক্ষিত হলেও বাঁধ সেজেছে কিছু বিতর্কিত কাজের। মাধ্যমিক পরীক্ষার শুরুতে ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছেন প্রায় ১৮টি কেন্দ্রের কয়েক হাজার পরীক্ষার্থী। বিষয়টি অনেক স্পর্শকাতর ও বেদনাদায়ক।
আবার যশোর শিক্ষাবোর্ডে আইসিটি পরীক্ষায় অন্য বিষয়ের প্রশ্ন ছাপা হয়েছে তার দায়ভার দেয়া হয়েছে বিজি প্রেসে।
একটি পরীক্ষা কেন্দ্রের দেড় হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে তো আর সবাই অনিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল না। তাহলে শিক্ষাবোর্ড কেন, ওই কেন্দ্রগুলোতে দেড় হাজার পুরাতন সিলেবাসের প্রশ্নপত্র পাঠালেন? আর আঠারটি কেন্দ্রের জন্য কেন সব প্রশ্ন পুরাতন সিলেবাসের প্রশ্নপত্র হলো?
এইসব দায়ে কেন্দ্র সচিবকে অব্যহতি দেয়ার খবর এসেছে, কিন্তু যেসব শিক্ষাবোর্ড কর্তারা প্রশ্নপত্র ছাপানোর দায়িত্বে ও বণ্টনে ছিলেন তাদের কোনও শাস্তির তথ্য আমরা দেখেনি।
একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের মাপকাঠি শিক্ষার দাঁড়িপাল্লায় নির্ণয় করা সম্ভব হয়। আমরা যে ভুলগুলো করেছি তা শুধরে উঠে আলোর পথে চলতে পারার মধ্যে সফলতার রহস্যারোপিত হয়।
আমি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চেয়ে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি দেশের শিক্ষার উন্নয়নে। যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যত উন্নত সেই দেশ কখনো গরীব হতে পারে না। যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যত নিম্নমানের সেই দেশ যদি সোনা দিয়ে মোড়ানোও থাকে তারপরও তা মূল্যহীন।
চোখের সামনে মেধাবীদের আত্মহত্যা আর জাতির স্বপ্নকে ভূলুণ্ঠিত করার দুঃসাহস যারা গত কয়েক বছর দেখিয়েছে তাদেরকে রুখবার অধিকার সবারই রয়েছে। আমরা  এই দেশটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। আমরা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে বাংলাদেশ হিসেবে পরিচয় করার লড়াই সদা প্রস্তত থাকি।
আমরা পরিশ্রমী জাতি। আমাদের দ্বারা যা সম্ভব তা বিশ্বের অনেক দেশের নাগরিকদের দ্বারা সম্ভব হয় না। আমরা যদি শিক্ষায় পোক্ততা দেখাতে পারি, দারিদ্র আমাদের ভয়ের কোনও কারণ হবে না। কাগজ নির্ভর সনদের চেয়ে মস্তিষ্কের উর্বরতা রক্ষা করা যে জরুরি তা সমাজের সকল স্তরের মানুষদের বুঝতে হবে।
শুধু শিক্ষামন্ত্রণালয় কিংবা প্রধানমন্ত্রীকে দোষারোপ করে লাভ নেই, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজানোর দায়িত্ব সবার।
তাই প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের নতুন চ্যালেঞ্জ তাদেরকে গ্রহণ করতেই হবে। আমরা আর কোথাও ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের’ শিরোনাম দেখতে চাই না। সম্পাদকীয় লিখে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণও করতে চাই না। আমরা ‘শিক্ষামন্ত্রীদের ধন্যবাদ’ জানিয়ে কিছু লিখতে চাই। আর সেটা সম্ভব হবে এই চলমান এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করা গেলেই আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো।
নাদিম মাহমুদজাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত

One Response -- “তবে কি প্রশ্নপত্র ফাঁসে লাগাম পড়ল?”

  1. zahir uddin mahmud

    লেখকের লেখা পড়ে মনে হলো পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর কোন ধারণা নেই । পরীক্ষা সংক্রান্ত বিধি এবং সঠিক তথ্য না জেনে লিখেছেন । তিনি লিখেছেন- ‘একটি পরীক্ষা কেন্দ্রের দেড় হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে তো আর সবাই অনিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল না। তাহলে শিক্ষাবোর্ড কেন, ওই কেন্দ্রগুলোতে দেড় হাজার পুরাতন সিলেবাসের প্রশ্নপত্র পাঠালেন? আর আঠারটি কেন্দ্রের জন্য কেন সব প্রশ্ন পুরাতন সিলেবাসের প্রশ্নপত্র হলো?’
    এ ধরণের ডাহা অসত্য সংবাদ তিনি কোথায় পেলেন?
    তাঁর সদয় অবগতির জানাচ্ছি বাংলাদেশের কোন পরীক্ষা কেন্দ্রে সব পুরাতন সিলেবাসের প্রশ্নপত্র প্রেরণ করা হয়নি। শিক্ষাবোর্ডের বিধিমতে কোনো কেন্দ্রে যে সিলেবাসের যত সংখ্যক পরীক্ষার্থী থাকে, সেই কেন্দ্রে সিলেবাস অনুযায়ী যত পরীক্ষার্থী থাকে সে সংখ্যা্র চাইতে ৫%–৭% বেশি প্রশ্নপত্র প্রেরণ করা হয়। কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব শিক্ষাবোর্ডের নির্দেশনা লংঘন করে নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের এক কক্ষে আসন ব্যবস্হা করায় পরীক্ষার হলে প্রশ্ন বিতরণের সময় কক্ষ পর্যবেক্ষকগণ ভুল করেছেন। এটা নতুন কোন ঘটনা নয়। প্রতি বছর কোন না কোন কেন্দ্রে কক্ষ পর্যবেক্ষকগণ এ ধরণের ভুল করে থাকেন। শিক্ষাবোর্ডের আইন ও পরীক্ষা সংক্রান্ত বিধানে এ ধরণের সমস্যা সমাধানের উপায় করা আছে। একটি পাবলিক পরীক্ষায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। দেশের যেকোন প্রান্তে যে কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দুর্যোগেও অনেক বড় সমস্যা হতে পারে। সব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষাবোর্ডের আইনে পথ রাখা আছে। পরীক্ষা সংক্রান্ত আইন বিধি, নীতিমালা না জেনে কথিত বিজ্ঞজনেরা নানা মন্তব্য করে সমাজে অযথা উদ্বেগ সৃষ্টি করেন । প্রসংগত উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের এইচএসসি এবং জেএসসি পরীক্ষায় দুর্বৃত্তরা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে পারেনি। এবারো পারবে না।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—