১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের পরের দিন বেলা বারোটার ভেতর খুলনা-৬ আসনের ওই সময়ের বারোটি ইউনিয়নের মোট ফল জেনে যাই আমরা। তখন হিসেব করে দেখা যায়, বাকি ইউনিয়নগুলোর সব ভোটও যদি বিএনপি ক্যান্ডিডেট পায় তাহলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়ী থাকে। তাই সে সময়ের ছোট থানা বাজারে বিজয় মিছিলও করা হয়। তবে তখনও পর্যন্ত রেডিওতে (টেলিভিশন তখন ওই থানা শহরে কোথাও ছিল না) ওই আসনের ফল ঘোষণা করছিল না। এর পরে দুই দিন পার হয়ে গেলে তৃতীয় দিনে এসে দুপুরে রেডিও থেকে ঘোষণা হলো ওই আসনে বিএনপি প্রার্থী বিপুল ভোটে জয় লাভ করেছেন। অথচ বিএনপি প্রার্থী তার নিজ বাড়ির কেন্দ্রে বাস্তবে ভোট পেয়েছিলেন দুইশ-র কিছু বেশি আর দুই হাজারের বেশি পেয়েছিল নৌকা।

যাহোক, রেডিওতে ফল ঘোষণার পরে এক পুলিশ অফিসার আমাদের থানা শহর ছাড়তে বলেন। নইলে আমাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে। জিয়ার সেই কালো সামরিক শাসনের অধীনে নির্বাচন। যখন নীরবে রাজনৈতিক কর্মীরা হারিয়ে যেত। তার কোনও খবরও সংবাদপত্রে আসত না। তখন সংবাদপত্র মূলত এক ধরনের সরকারী প্রেসনোট ছিল। যাহোক, আমরা যারা নির্বাচনের কর্মী হিসেবে সেখানে ছিলাম, পুলিশ অফিসারের পরামর্শ মতো তারা নানানপথে এলাকা ছাড়া শুরু করি। তখন পথ-ঘাট বলতে ওই এলাকায় মাটির রাস্তা আর নদীপথ ছাড়া কিছুই ছিল না। থানা বাজার থেকে আমরা কয়েকজন হেঁটে রওনা দেই। উদ্দেশ্য মাইল সাতেক হেঁটে গ্রামের ভেতর থেকে একটি লঞ্চ ঘাট থেকে লঞ্চে উঠে খুলনা শহরে যাব। থানা স্টেশন থেকে লঞ্চে উঠতে গেলে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হবার সম্ভাবনা ছিল, সেটা এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত। দুপুর থেকে হেঁটে বিকেলের সূর্য ডোবার আগে আমরা একটা গ্রামের বেশ সমৃদ্ধ একটি এলাকায় এসে পৌঁছাই। রাস্তার পাশে বিশাল বিশাল কয়েকটি বাড়ি। অনেকগুলো বিল্ডিং ও টিন এবং কাঠের ঘর। বিল্ডিংগুলোর বয়স থেকে বোঝা যায় শত শত বছরের ধনী বাড়ি। বাড়ির সামনে পরীখা কাটা। তার ওপর দিয়ে কাঠের ব্রিজ এসে লেগেছে মাটির রাস্তায়। তাছাড়া কয়েকটা স্থান দিয়ে বাড়িতে ঢোকার পথও আছে। ওই মাটির রাস্তার ওপরে দেখি অন্তত পঞ্চাশ থেকে ষাট জন দরিদ্র মানুষ চটের বস্তা নিয়ে বসে আছে। আমাদের ভেতর থেকে একজন কৌতূহলী হয়ে ওদের বয়স্ক একজনের কাছে শোনে, তারা এখানে এভাবে কেন? তাদের বক্তব্য হলো যদি লুঠ হয় তাহলে তারা আগের থেকে ধান নেবে। তাদের ধারণা নির্বাচনের পরে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি লুঠ করা যায়। কারণ, তারা ‘৭১ সালেও করেছিল। এখন মুজিব মারা গেছে এখন আবার লুঠ করা যাবে।

সন্ধ্যা নেমে আসছিল তাই আমরা দ্রুত পা চালিয়ে নদীর ধারে পৌঁছাই। নদী পার হতে দেখতে পাই রাস্তায় অনেক উৎকণ্ঠিত মানুষ। পুরো এলাকাটা হিন্দু অধ্যুষিত। ওই এলাকার যুবকরা নদীর ধার দিয়ে উৎকণ্ঠিত অবস্থায় ঘোরা ফেরা করছে। তারা দুশ্চিন্তায় ভুগছে কোনরূপ হামলা বা লুঠ হয় কিনা? আমরা তাদের সঙ্গে খুব কোন কথা না বলে অনেকটা গা বাঁচিয়ে রাতের অন্ধকারে লঞ্চে উঠে বসি। ’৭৯-এর সংসদ নির্বাচনে একজন কর্মী হিসেবে দেখেছি। পরে ৮৬, ৮৮ ও ৯১-এর সংসদ নির্বাচন কাভার করেছি সাংবাদিক হিসেবে। প্রতিটি সময় নির্বাচনের আগে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভেতর একটা উৎকণ্ঠা দেখেছি। নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন স্থানে হেনস্তা হতে দেখেছি। যেমন- ’৯১-এর যে নির্বাচনের জন্য বিচারপতি শাহাবুদ্দীনকে অনেকে ঈশ্বরের আসনে বসিয়েছিলেন ওই নির্বাচনে একজন রিপোর্টার হিসেবে কেরানীগঞ্জের শুভ্যাড্ডার হিন্দু বাড়িগুলোর সামনে আমান উল্লাহ আমানের লোকদের পুলিশের সহায়তায় বোমা মারতে দেখেছি একের পর এক। ভোট দিতে আসার জন্য যে সব নারী পুরুষ বিলে নেমেছিলেন তাদের দিগ্বিদিক হয়ে ছুঁটতে দেখেছি। তবে ’৭১-এর পরে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা সব থেকে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে ২০০১ সালে।

২০০১ সালে নির্বাচনের সম্ভবত এক সপ্তাহ পরে পাবনার বেড়া থেকে অনুজ প্রতিম প্রবীর গোস্বামী বাবু একদিন সন্ধ্যায় ভয়ার্ত গলায় ফোন করে বলে, দাদা শিগগিরই কিছু করেন আমাদের বাড়ির চার পাশ দিয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিচ্ছে। আমাদের পালানোর কোন পথ নেই। শিগগির কিছু না করলে সবাই পুড়ে মারা যাব।

তাকে ফোন রাখতে বলে বিএনপি নেতা ভোলার শাহজাহান ভাইকে ফোন করি। তার সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ভদ্রলোক ব্যক্তিজীবনে খুবই অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। অনেক পুরনো নেতা। তাকে ফোন করে প্রবীরদের পরিবার বাঁচাতে বলতেই তিনি অনেকটা অসহায় স্বরে বলেন, তার কথা কেউ শুনবে না। দলে তার ওই ধরনের কোনও প্রভাব নেই। তাড়াতাড়ি মুন্সীগঞ্জের বিএনপি নেতা (তিনি সেবার শিল্প ও পরে তথ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন) শামসুল ইসলাম ভাইকে ফোন করি। ভদ্রলোক এম আর আখতার মুকুল ভাই ও আতাউস সামাদ ভাইয়ের বন্ধু, সে হিসেবে আমার সঙ্গেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাল ছিল। তিনিও সব শুনে অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন। বললেন, তার কথায় কোনও কাজ হবে না। তার সঙ্গে কথা শেষ হতেই দেখি শাহজাহান ভাই আবার ফোন করেছেন, বললেন আমি যেন মান্নান ভুঁইয়ার সঙ্গে কথা বলি। মান্নান ভুঁইয়া যখন তাঁতি দল করতেন। সম্ভবত তখন থেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ। তাছাড়া কেন যেন উনি আমার লেখা পছন্দ করেতন। অনেক লেখা পড়ে ফোন করতেন। তিনি চাইতেন বিএনপি একটা রাজনৈতিক দল হয়ে উঠুক। ’৯১-এর পরে আমি আমার অনেক লেখায় লিখেছিলাম বিএনপিকে এখন সামরিক উত্তারাধিকারের অতীত ছেড়ে একটা সেন্টার রাইট পলিটিকাল পার্টি হওয়া উচিত। বিএনপির এই সামরিক কালচার ও ফাররাইট পথ ছেড়ে দেয়া উচিত।

মান্নান ভুঁইয়া আমার এ কথাগুলো পছন্দ করতেন। যে কারণে তার কাছে ফোনে দ্রুত একসেস ছিল। ফোন করতেই তিনি ফোন ধরে বিষয়টি শুনে অব দ্য রেকর্ড বললেন, তার দল যা করছে সে জন্য তিনি লজ্জিত এবং ভবিষ্যতে তার দলকে এ জন্য মাশুল দিতে হবে। যাহোক, তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেন এবং প্রবীরদের পরিবারটি পুড়ে মরার হাত থেকে বাঁচে।

ব্যক্তিগত যোগাযোগের কারণে এক প্রবীরের পরিবার হয়ত সেদিন বাঁচাতে পেরেছিলাম। কিন্তু গোটা দেশ বিশেষ করে ভোলা, বাগেরহাট, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থা কী হয়েছিল তা আজ আর নতুন করে লেখার কোনও দরকার নেই। সেদিন বরিশালের আগৈলঝরাতেই শত শত হিন্দু মেয়ে রেপ হয়েছিল। ডা. এস এ মালেককে সে সময়ে আমি বার বার কাঁদতে দেখেছি কোনও কিছু না করতে পারার জন্য। একদিন বেইলি রোডের রাস্তায় মফিদুল ভাইয়ের মুখোমুখি হতেই দেখি তার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। তিনি শুধু আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, কী বলব, কিছুই বলার নেই। তার চোখ ছল ছল করে ওঠে, আমিও নিজেকে সামলাতে পারিনি। যা হোক, মফিদুল ভাই, ড. আনিসুজ্জামান স্যারসহ অনেকেই ততদিনে বিভিন্ন হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে কাজ করছেন। আর শুরু থেকে শাহরিয়ার কবির ভাই, মুনতাসীর মামুন ভাই আর সর্বোপরি ওয়াহিদুল হক ভাই সেদিন যা করেছিলেন তা এদেশের প্রগতিশীলতার ইতিহাসে লেখা থাকবে। এর পরে ২০১৪-এর নির্বাচনের আগে, শুধু ২০১২ তেই বিএনপি-জামাত হিন্দুদের মন্দির ভাঙে ৯৬০টির মতো।

এবার নির্বাচনের আগে যখন ড. কামাল হোসেন বলতে শুরু করলেন, ‘চিনে রাখলাম’, আর মাত্র ১৬ দিন আছে তার পরে দেখে নেব। তার এসব কথা শুনে অতীতের এই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে ফোন করে জানতে চায় তারা অন্তত তাদের মেয়েদের ঢাকায় আত্মীয় বাড়িতে বা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেবে কিনা? কারণ, ড. কামাল যখন জামায়াত নেতার মতো কথা বলছিলেন তখন তারা ধরে নেয় এবার নির্বাচনে তারা জিতলে ২০০১ এর থেকে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। আর সব থেকে বেশি ধাক্কা গিয়ে পড়বে হিন্দুদের ওপর।

তাছাড়া দেশের প্রভাবশালী ও শীর্ষ দৈনিক বলে দাবিদার একটি পত্রিকা- এমন ভাবে প্রচার করছিল যেন ড. কামাল এবার জামায়াতও বিএনপি নিয়ে ক্ষমতায় এসে গেছেন আর কি! যা পুরোপুরি আতঙ্ক ছড়াচ্ছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে। নির্বাচনের দিন সারা দিনই দেশের নানান প্রান্ত থেকে ফোন পেয়েছি, অনেক উৎকণ্ঠিত গলা শুনেছি। তবে নির্বাচনের একদিন পরে আমার নিজের ভাইপোর মুখ থেকে একটি কথা শুনে চমকে উঠি।

সে আমাকে ফোন করে বলে, ‘খোকা, এই প্রথম একটা নির্বাচন হলো যে নির্বাচনের পরে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমালাম। বাংলাদেশ আসলে বদলে গেল এই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে।’ সে বলেছিল নির্বাচনের একদিন পরে। ২০০১ এর অভিজ্ঞতার কারণে নির্বাচনের পরে দেড় মাস অপেক্ষা করলাম। আর এখন ঠিকই বলা যায়, ১৯৭৩ এর পরে এই প্রথম কোন সংসদ নির্বাচন হলো বাংলাদেশে যে নির্বাচনের পরে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রতিটি রাত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। তাই এ নির্বাচন নিয়ে জামায়াত-বিএনপিও তাদের মুখপাত্র পত্রিকাগুলো যতই প্রশ্ন তুলক না কেন, একটি কথা নিশ্চয়ই বলা যায়- এই নির্বাচন দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষকে অসহায় করেনি। আব্রু নিয়ে চিন্তিত করেনি কয়েক লাখ মা-বোনকে।

এটা কি এ নির্বাচনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় বিজয় নয়? শেখ হাসিনা দেশকে আবার বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৩ এ ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন, তাই এ নির্বাচনে কোন ত্রুটি থাকলেও সে ত্রুটি মাথায় নিয়েও কি আবার বাঙালি বিজয়ী হলো না?

স্বদেশ রায়সাংবাদিক

Responses -- “এবারের নির্বাচন ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু”

  1. নাজিম

    অসাধারণ লেখা। অত্যন্ত সংবেদনশীল। দলীয় মনোভাবের কারণে আমরা এত গভীরভাবে চিন্তা করতে পারি না।

    Reply
  2. সৈয়দ আলি

    লেখক তার নিবন্ধে বিএনপির প্রতিটি বিজয়ের পরে হিন্দুদের (অন্য সংখ্যালঘুদের কথা তিনি লিখেননি) দুর্ভোগ (peril) তুলে ধরেছেন। আমরা তার অভিজ্ঞতার সত্যতায় সন্দেহ প্রকাশ করছি না। লেখকের বিবরণ থেকে জানা যাচ্ছে বিএনপির হাতে অত্যাচারিত হওয়ার আতঙ্কে হিন্দুরা বাক্স-প্যাটরা নিয়ে দেশত্যাগ করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। (যা তিনি সরাসরি লিখেননি তা হলো, নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এই হিন্দু মানুষেরা ভারতে চলে যাবেন)। বাংলাদেশে আইনহীনতা বা মুখ চিনে আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি স্বাধীনতার পরে থেকেই চালু আছে। বিএনপি এতে নুতন জ্বালানী যোগ করার অপরাধে অপরাধী মাত্র। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, হিন্দুরা সরকারী প্রভাবশালীদের অত্যাচারের আতঙ্কে লাফ দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যেতে পারেন, কিন্তু একই রকমভাবে প্রভাবশালীদের অত্যাচারে অত্যাচারিত মুসলমানেরা কোথায় যায়? কোথাওই না। তারা দেশেই থাকে এবং
    ‘নাহি ভর্ৎসে অদৃষ্টেরে, নাহি নিন্দে দেবতারে স্মরি,
    মানবেরে নাহি দেয় দোষ, নাহি জানে অভিমান,
    শুধু দুটি অন্ন খুঁটি কোনোমতে কষ্টক্লিষ্ট প্রাণ
    রেখে দেয় বাঁচাইয়া।’।
    লেখক খুব চোটেপাটে লিখে জানাচ্ছেন তার কতো যোগাযোগ, তিনি যে কাউকে ফোন করতে পারেন। আমরা কি জিজ্ঞেস করতে পারি, এবারের ২৯ ডিসেম্বরের ‘নির্বাচনে’র পরে নোয়াখালী ও অনত্র গণধর্ষণের ঘটনায় তিনি কাকে কাকে ফোন করেছেন?

    Reply

Leave a Reply to নাজিম Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—