সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে আবু সালেক নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু দুদকের ভুলে আবু সালেকের বদলে তিন বছর ধরে কারাগারে কাটাতে হয়েছে টাঙ্গাইলের যুবক জাহালমকে। এ নিয়ে গত ২৮ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি সেদিন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের হাই কোর্ট বেঞ্চের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত। পরে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে। জাহালমের আটকাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, জানতে চাওয়া হয় রুলে। সেই সঙ্গে ‘ভুল আসামির’ কারাগারে থাকার ব্যাখ্যা জানতে দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি, মামলার বাদী দুদক কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্র সচিবের প্রতিনিধি ও আইন সচিবের প্রতিনিধিকে তলব করে হাই কোর্ট।

আদালতের নির্দেশ মতো পরের দিন তলবকৃতরা সবাই আদালতে হাজির হয়ে নিজ নিজ ভুলের ব্যাখ্যা আদালতকে দিয়েছেন। তখন মানবিক আদালত বলেন, “জাহালমের কারাবাসের মেয়াদ একদিন বাড়বে, তো আপনার (দুদক) ওপর কমপেনসেশন বাড়বে। কমপেনসেট করতে হবে। দুদক করুক বা ব্যাংক করুক। ‘ভুয়া তদন্তের’ কোনও সুযোগ নেই মন্তব্য করে আদালত বলেন, দুদককে অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে। যারাই এর সঙ্গে জড়িত তাদের অভ্যন্তরীণভাবে চিহ্নিত করতে হবে। তাহলে আমাদের ইন্টারফেয়ার করার সুযোগ থাকবে না। যদি না হয় তাহলে কিন্তু আমরা করব।”

শুনানির শেষ পর্যায়ে আদালতে উপস্থিত এক উপ-কারামহাপরিদর্শকে আদালত বলেন, “আপনারা আজই জাহালমকে রিলিজ করে দেবেন। দুদক এর খরচ দেবে।”

আদালতের নির্দেশ মোতাবেক ৪ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত একটার দিকে জাহালম তার দীর্য় তিন বছরের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান। দীর্ঘ তিন বছর বন্দিজীবন কাটানোর পর হতভাগ্য জাহালম এখন থেকে মুক্ত আকাশের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারবেন। তার এই মুক্তিতে আমাদের এতটা ভাল লাগছে তার কতখানি ভাল লাগছে এটা তো অনুমেয়।

বিজ্ঞ আদালত জাহালমকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি তাকে কমপেনসেশন বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও বলেছেন। দুদক কিংবা ব্যাংক যেকোনও পক্ষকে এই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দিতে হবে বৈকি, অবশ্যই দিতে হবে। একজন নিরাপরাধ মানুষ বিনাদোষে দীর্ঘ তিন বছর ধরে জেল খাটলেন। ৩৩টি মামলার ভার টানতে টানতে তার অসহায় পরিবারও পথে পথে হয়ে গেছে। মানবিক এই বাংলাদেশে এমন অবিচার কারো উপর হতে পারেনা। তিন বছর পর হলেও সত্যটা সামনে চলে এসেছে। জনকল্যাণে রাষ্ট্র প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহারকারীরা কি আদৌ এটা বুঝেন যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরাপরাধ কাউকে মামলায় ঠুকিয়ে দিলে কিংবা ফাঁসিয়ে দিলে ভুক্তভোগীর কী অবস্থা হয়। এমন অন্যায়গুলোকে কেবল ভুল হিসেবে দেখলে এসব অন্যায় রোধ করা যাবেনা। এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত তৈরি হওয়া উচিত বলে মনে করি। তবে এও সত্য যে, এই মামলার তদন্তের সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় কর্মকর্তার ভুল কিংবা অন্যায়ের কারণে সমগ্র প্রতিষ্ঠানকে ঢালাওভাবে দোষীসাব্যস্ত করা যায়না। তাছাড়া দুদক বলছে, যখন থেকে তারা সত্যটা জেনেছেন তখন থেকে তারা জাহালমের বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। যদিও বা মানবাধিকার কমিশন জাহালম যে নির্দোষ এ তথ্য আরো আট মাস আগে থেকে দুদককে সরবরাহ করেছিল। তাহলে তো এতটা গুরুত্ব দিলে জাহালম এতোদিন আটকে থাকার কথা নয়। পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখার জন্য দুদকের পক্ষ থেকে যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে আমরা আশা করবো তদন্ত কমিটি প্রকৃত সত্যটা তদন্তে তুলে আনবেন।

কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে একে একে ৩৩টি মামলা দায়ের করা, এসব মামলায় বিভিন্ন তদন্ত কর্মকর্তা মামলার তদন্ত করা, তার বিরুদ্ধে মামলার বাদীর মানিত বিভিন্ন সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রদান, এসবকিছু কেবল ভুলে কিংবা গাফিলতিতে হয়েছে বলে আমি মনে করিনা। এটা একটা সংঘবদ্ধ পর্যায়ের অপরাধ বলে প্রতীয়মান হয়। এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য ভেদ করা খুবই জরুরী। কারণ এ ঘটনা থেকে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করা না গেলে, ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের প্রতি একটা কড়া বার্তা যাবেনা। কড়া বার্তা না দিতে পারলে এমন অমানবিক ঘটনা রোধ করা যাবেনা। দেশে অতীতে রচিত ‘জজ মিয়া’ নাটকের অবতারণার কথা আমরা ভুলি নাই। এদেশের মানুষ ভুলেন নাই। এটাও সেরকম কিছু হল কিনা তা জানা আবশ্যক। যে কেলেংকারীর নেপথ্যে রয়েছে বিশাল অংকের টাকা সেই টাকার লোভে পড়ে এমন ঘটনা ঘটা অলিক কিছু নয়। যে অন্যায়টা দুদকের ভেতরে হয়েছে সেই অন্যায়ের রহস্য ভেদ করার দায়িত্বটাও দুদক নিয়েছে কিংবা দুদকের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখন দুদকের উচিত হবে পুরো ঘটনার প্রকৃত সত্যটা তুলে এনে জাতির কাছে তুলে ধরা। কোন প্রতিষ্ঠানের কোন ব্যক্তি বা কতিপয় ব্যক্তি অপরাধ সংঘটিত করলে এর দায় কেবল তাদের উপর বর্তাবে। সেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হবে যে বা যারা এই অপরাধ করেছেন তাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেওয়া। এখন দুদকের প্রধান কাজ হবে সংঘবদ্ধ এই চক্রকে চিহ্নিত করে চিহ্নিতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং জাহালমকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এই ক্ষতিপূরণ কেবল তার পূর্বের গড় আয় হিসাব করে করলে জাহালমকে ঠকানো হবে। জাহালমের পক্ষে রিটকারী আইনজীবীও আদালতের কাছে এই বিষয়ে আবেদন জানাতে পারেন। আদালত তা নির্ণয় করে দিতে পারেন।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রভাবশালীদের ক্ষমতা আর দাপট এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নিচে চাপা পড়ে থাকা সত্যটা তুলে এনে জাহালমকে তার উপর চলতে থাকা চরম অবিচার থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রতিবেদক, প্রথম আলো এবং রিটকারী আইনজীবিকে জানাই অফুরন্ত ভালবাসা আর অশেষ কৃতজ্ঞতা।

বোধহয় এজন্য সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ ও সমাজের দর্পণ এবং সাংবাদিককে জাতির বিবেক বলা হয়ে থাকে। এই স্তম্ভ যেন ভেঙ্গে না পড়ে, এই দর্পণ যেন কখনো ফ্যাঁকাশে না হয় আর এই বিবেক যেন আজীবন জেগে থাকে।

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুসম্পাদক, আমাদের রামু ডটকম ও মাসিক আমাদের রামু

Responses -- “একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং একজন নিরাপরাধ জাহালম এর কারামুক্তি”

  1. সৈয়দ আলি

    এসবকিছু কেবল ভুলে কিংবা গাফিলতিতে হয়েছে বলে আমি মনে করিনা। এটা একটা সংঘবদ্ধ পর্যায়ের অপরাধ বলে প্রতীয়মান হয়। – এ বক্তব্য সত্য। দুদক ও পুলিশের তদন্তকারীরা আবু সালেকের টাকা খেয়ে চোখ বন্ধ রেখেছিলো। দুদকের চেয়ারম্যান আট মাস আগে মানবাধিকার কমিশনের দেয়া তথ্য পেয়ে গা করেন নি, তিনিও একই অপরাধে অপরাধী।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—