দুনিয়ার আর সব দেশের সাথে আমাদের রাজনীতির এটাই তফাৎ। আমাদের রাজনীতি এখনো মৌলিক বিষয়ে কলহ এড়াতে পারেনি। যে সব দেশ যুদ্ধ করে স্বাধীন হয় তারা যাদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের মিত্র করাটা ইহকালে সমীচীন মনে করেনা। যদিও ওপরে ওপরে একটা ভালো সম্পর্ক রাখে। গালভারী কথায় যাকে বলে- সবার সাথে বন্ধুত্ব।
আমি ভিয়েতনাম যাবার আগে  ট্রাভেল এজেন্টের সাথে বেশ সময় নিয়ে প্ল্যান করেছিলাম। সিডনি থেকে যাবো শুনে তারা দর্শনীয় স্থানগুলো বিশেষত যেগুলোর নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর প্রকৃতি মনোরম সেগুলো ঠিক করে রেখেছিল। নাম কা ওয়াস্তে কয়েকটা ঐতিহাসিক জায়গা। আমি বাধ সাধি। তাদের বুঝতে বাধ্য করি যে আমার কৌতুহল মূলত ইতিহাসে। পরে তারা উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেসব জায়গাগুলো ঠিক করে দেয় যার প্রাকৃতিক মূল্যের চাইতে ইতিহাসমূল্য অনেক বেশি।
যখন আমি উত্তরে যাই তখন আমার দেখা যুদ্ধ ময়দান, বাংকার বা অস্ত্র শস্ত্র যতটা নজর কেড়েছে তার চেয়ে বেশি মনে আছে সেখানে আমেরিকানদের ধ্বংসযজ্ঞ। দক্ষিণ ভিয়েতনামে দেখা সেই জাদুঘরটি এখনও আমার চোখে বিভীষিকাময়। নাপাম বোমার পর চারদিকে কুণ্ডলি পাকানো ধোঁয়ার ভেতর উলঙ্গ হয়ে রাস্তায় নেমে আসা ভিয়েতনামীদের ছবি আপনাকে হতবিহ্বল করবেই। চাইলেই কি তা ভোলা যায়?
আমি দেখেছি পর্যটকদের ভেতর আমেরিকানদের বিবর্ণ চেহারা। তারা জোর করে মুখে হাসি ঝুলিয়ে কথা বললেও, তাদের মনে মনে পরাজয়ের গ্লানি এখনো প্রবাহমান। অন্যদিকে বদলে যাওয়া ভিয়েতনামের নতুন প্রজন্মের ভেতর চীনের চেয়ারম্যানের চাইতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অনেক বেশি জনপ্রিয় হলেও তারা ইতিহাস ভোলেননি। তাদের জাতীয়তাবোধ আর জন্মপ্রক্রিয়া এখনও তাদের গর্ব। যা আমি কম্বোডিয়াতেও দেখেছি। পলপটের মতো গৃহশত্রুর বিরুদ্ধে তাদের কঠিন মনোভাব আজও সমান সক্রিয়।
একাত্তরে পরাজিত জামায়াত দমেনি। আমাদের যুদ্ধ কেবল পাকিস্তানিদের সাথে ছিলনা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের ঘরের দুশমন, দালাল-রাজাকারেরাও যুদ্ধ করেছিল। তারা নিজ দেশের মা বোনদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা, লুণ্ঠনে সহায়তা করার পাশপাশি দেশের সাথে বেঈমানি করতে ভুল করেনি। কোনও মাফ বা মার্জনায় কাজ হয়নি। সময় বুঝে তারা আধুনিক মুসলিম লীগ, বিএনপির সাথে মিলে এদেশকে আবার পাকিস্তান বানানোর ধান্দায় আছে। সময়, শেখ হাসিনা আর শাহবাগ তা হতে দেয়নি। সে কারণে তাদের ক্রোধ। তারা নানাভাবে অপকৌশল চালানোর চেষ্টা করে যদিও ব্যর্থ।
কিন্তু আজ আবার তাদের সামনে নিয়ে আসছে এককালের আওয়ামী লীগার নামে পরিচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেন। এ লজ্জা রাখার জায়গা নাই। তিনি মুখে যাই বলুন না কেন, নিজেই ভালো জানেন কোন এজেন্ডা বাস্তবায়নে তাকে সামনে আনা হয়েছে। গণতন্ত্র যদি বিষয় হতো তা তিনি নিজেই সামলাতে পারতেন। বিষয় ভিন্ন।
সে কারণে কামাল হোসেন আবার জামায়াত প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে এসেছেন। একটা বিষয় পরিষ্কার, নিবন্ধন বাতিল হোক, আর যাই হোক জামায়াত আছে।
এদিকে খবরে দেখলাম বিএনপি বলছে, তারা জামায়াতকে ছেড়ে যাবেনা। যদি না জামায়াত তাদের ছেড়ে যায়। আহারে পীরিতি! এ যেন মধুর প্রেমের টেস্ট। কে কাকে ছেড়ে যায় দেখি তো- এই  টাইপের। আসলে সবকিছুর মূলে হিসেব- ভোটের হিসেব। বাংলাদেশ যেকোনও সময়ই সবার মতে সঠিক, গ্রহণযোগ্য বা সর্বজন স্বীকৃত ভোট হলে এই হিসেবের দরকার পড়বে। বিএনপির আর আওয়ামী লীগের সাথে এঁটে ওঠার সময় নাই। দীর্ঘকাল গদির বাইরে, দেশ শাসনের বাইরে থাকাতে, তাদের অর্থবল কমে গেছে। জনবলও তাই কমতির দিকে। ক্যাডার বা দলের মারমুখো নেতারাও এখন ‘সাইজড’। এমন অবস্থায় তাদের রুখে দাঁড়ানো খালি মাইক্রোফোনে আর মিডিয়ায়। তাই তারা জামায়াতকে ছাড়বে এমন কথা জান গেলেও উচ্চারণ করবেনা।
অন্যদিকে ঝামেলায় আছেন কামাল সাহেব। সারাজীবন আওয়ামী লীগের খেয়েপড়ে শেষ বয়সে ব্যক্তিক্রোধ আর বঞ্চনার ঝাল মেটাতে সবার প্রিয় হবার জন্য যে পথ বেছে নিয়েছেন তার প্রথমপর্ব খতম। খামোশ বা সংলাপ কোনওটাই কাজে আসেনি। নিজে তো ভোটেই গেলেননা। যে দুজন জিতে এলো তাদেরও ঝুলিয়ে রেখেছেন। ড. কামাল হোসেনের মনে যাই থাক, মুখে তিনি জামায়াতের হয়ে কিছু বলতে পারেননা। বললে তার সাথে কাদের সিদ্দীকির আর কী তফাৎ থাকলো? কাজেই এই বয়সেও তিনি ‘ঝুট-কে সাচ্চা’ বলে চালাতে চাইছেন। একজন প্রবীণ বয়োবৃদ্ধ মানুষ কিভাবে বলেন যে তিনি জানতেন না- বিএনপির ছায়ায় জামায়াত ইলেকশন করেছিল বা করবে? না জানার কী কোনও কারণ আছে?
তারা তো দেখি প্রায় রোজই জরুরি মিটিং এ বসেন। সেগুলোতে কী আলোচনা হয় তবে? অনেকে এখন বলছেন, রিটায়ার্ড নেতাদের বিলাস আর হতাশাকেন্দ্র- এইসব আলোচনার ঘর। সেখানে তারা সময় কাটান। আর এমন সব কথা বলেন, যাতে মাঠ গরম থাকে। ড. কামাল হোসেন যে কারণেই হোক জামায়াত প্রসঙ্গ এনে আরও একবার মানুষের মনে প্রশ্ন আর বিরক্তি উসকে দিলেন । জবাব তাকেই দিতে হবে। একেই বলে শাঁখের করাত। সাফ সাফ বলতে না পারলে এমন তো হবেই। কেন আপনি মেরুদণ্ড সোজা করে বলতে পারছেন না, জামায়াত থাকলে আমরা নাই? আর যদি চান আপনার তরফ থেকে বিভেদরেখা মুছে যাক- তাই বলুন। তা না করলে এমন দোটানায় শেষে ব্যক্তি ইজ্জতও খোয়াবেন।
জামায়াত আছে কী নাই, এই প্রসঙ্গ বারবার ফিরে এসে প্রমাণ করে- আমাদের দেশে এখনও মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতির দিন শেষ হয় নাই। প্রমাণ করে, এখনো দেশবিরোধী স্বাধীনতা বিরোধীদের রক্তবীজ রয়ে গেছে। তাই থামার সুযোগ নাই। আছে সাবধানতা আর সতর্কতার প্রয়োজন। শেষ বয়সে ড. কামাল হোসেন কোনদিকে ডিগবাজী খেয়ে ইতি টানেন সেটাই এখন দেখার বিষয় ।
রাজনীতিতে আবারো জামায়াত প্রসঙ্গ কেন- এ নিয়ে কেউ তেমন কিছু বলেনা। কারণ সব দলের ভেতরই তাদের মানুষ আছে। জামায়াত  আদৌ নিষিদ্ধ হবে? বা  হলে কবে হবে- তাও অস্পষ্ট।  এই কুয়াশার কারণ তাদের দলগত ভিত্তি, শক্তি নাকি আমাদের দুর্বলতা?
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাংলাদেশের বাস্তবতা আর সত্য মেনে নিলে যেকোনও দলই রাজনীতি করতে পারে। তাদের অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য তারা কতটা অনুতপ্ত আর কতটা পরিবর্তিত সেটাই ভাবার বিষয়। সে দিকটা কেউ পরিষ্কার করে বলেনা। একদল খালি মুখে মুখে বিরোধিতা করে, আরেক দল চায় বগলে রাখতে। এখানেই যত বিপদ। ড. কামাল হোসেন ব্যক্তি জীবনে আধুনিক মানুষ। পোশাক, কথায় সাহেবী কায়দায় অভ্যস্ত। তিনি জিন্নাহ সাহেবের মতো ধর্মের রাজনীতি বা তাদের প্রমোটার হলেও, নিজে কখনো তা করবেন না। তাই মুখে তিনি তার সংশ্লিষ্টতার কথা না বলতেই পারেন।
এখনো ফতোয়া, এখনো নারীবিরোধী কথাবার্তা চলছে। নারীদের লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়ানোর হুকুম দেখছি আমরা। এরা কখনো সরকারের মিত্র, কখনো দুশমন। সব মিলিয়ে এসব  রাজনীতি যে বিষফোঁড়া সবাই মানেন। অন্যদিকে যেটুকু বাম আদর্শ আর প্রগতিশীলতা আমাদের শক্তি ছিল তা প্রায় নির্জীব। তাই আমাদের ভয় যায় না। বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রগতি সমার্থক না হলে তা টেকসই হবেনা । সরকার প্রধান শেখ হাসিনা এখন তুঙ্গে। তিনি যদি বলিষ্ঠ থাকেন তো কামাল হোসেনরা নুইয়ে পড়বেন। এটা নিশ্চিত। আর তা না হলে নানা ভেলকিবাজিতে কোনটা যে কোন সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বোঝা মুশকিল। সাধু সাবধান বৈকি।
অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

Responses -- “ঘুরে ফিরে সেই জামায়াত প্রসঙ্গ কেন মাথাচাড়া দেয়? ”

  1. হাসান মাহমুদ

    কারার ওই লৌহ কপাট – এখনো হয়নি লোপাট
    শক্ত জমাট – মৌলবাদীর পাষাণ বেদী,
    এখনো খোদার নামে – এদেশের গঞ্জে গ্রামে
    যম-গোলামে – খায় মা-বোনের বক্ষ ছেদী।

    ফতোয়ার ঘূর্ণিপাকে – মা ও বোন ঘোর বিপাকে
    দুর্বিপাকে – লক্ষ নুরজাহান ফিরোজা,
    ধর্মের ছদ্মবেশে যত অধর্ম এসে
    সোনার দেশে গাড়লো আসন ভুতের বোঝা।

    এখনো হিংস্র শকুন – মা-বোনের খায় চুষে খুন
    তপ্ত আগুন – বিষাক্ত তার ক্লিন্নকরে,
    এখনো মানুষ শিকার – উন্মাদ ধর্মবিকার
    দিকবালিকার – ছিন্নদেহ বিষ নখরে।

    এখনো তেঁতুল-লালা, বিবেকের বন্ধ তালা,
    আগুন জ্বালা পিছলামী ওই নষ্টনীড়ে,
    হান তুই হানরে আঘাত, হাতে নয় কর পদাঘাত
    যায় যদি যাক জীবন তাতে কষ্ট কি রে !!

    একি বিভৎস ছবি – মহাকাল দেখছে সবই
    দ্বীনের নবী – শিউরে উঠে চক্ষু বোঁজে,
    দানবের হিংস্র হাতে মানবের অশ্রুপাতে
    আর্ত মানবতার বাণী পানাহ খোঁজে ……
    – – – ফতেমোল্লা

    Reply
    • আহমেদ

      জনাব সৈয়দ আলি, জামাত জানতো আওয়ামী লীগ ওদেরকে কোলে নিলেও চুমো দিবেনা, তাই যারা চুমো দিবে তাদের কাছেই গেছে। বাংলা দেশের মানুষের কাছে ধর্ম কোন সমস্যা নয়, ধর্মের অপব্যবহারই সমস্যা। ধার্মিক হতে হলে পাকিস্তানকে অন্তরে লালন করতে হবে কেন? জামাতী হতে হবে কেন? বাংলাদেশকে ভালোবেসে কি ধার্মিক হওয়া যায়না?

      Reply
      • সৈয়দ আলি

        আহমেদ, চুমা কি কম দিয়েছে? চাচাকে ফোন, চাচার দোয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে প্রেরণ, এক আসনে বসে ঝালমুড়ি খেয়ে বিএনপি বিতাড়নের ফর্মুলা প্রণয়ন, এবং জামাতকে স্বাধীনতার পরে সবচাইতে বড় রাজনৈতিক স্বীকৃতি দান। আর কি লাগে? যখন কাজে লেগেছে তখন কতো ঢলাঢলি, রাজনৈতিক শয্যায় গমন। পরে শাহবাগের তরুণ ও জনগণের চাপে জামাতিদের ঝুলিয়েছে। আওয়ামী লীগের এ নিয়ে ফুটানি করার কিছু নেই। অতোই যদি সতী হয় আওয়ামী লীগ, ৭২ এর সংবিধানানুসারে জামাতকে নিষিদ্ধ করছে না কেন? আসলে হাতের পাঁচ রেখে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—