৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে একটি অবিশ্বাস্য বিজয়ের মধ্যে দিয়ে চতুর্থবারের মত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। মাত্র ১২টি বাদে সবগুলো আসনই এবার পেয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট। যে চারটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতছেন তারাও কোনও না কোনওভাবে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত। পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে এবারই প্রথম এমন একটি সংসদ গঠিত হল যেখানে বিরোধী দলের মর্যাদা পাবার জন্য এককভাবে যে তিরিশটি আসন পাবার বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা কোনও দলই পায় নাই। অর্থাৎ,আইনগতভাবে এ সংসদে কোনও বিরোধী দল নেই।

এর পূর্বে ১৯৯৬সালের ফেব্রুয়ারিতে বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেখানে বিএনপি সংসদে ৩০০ আসনই পেয়েছিল। বিশ্বের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসেই এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা; এবং, নজিরবিহীনভাবেই ওই সরকার মাত্র বারো দিন টিকে ছিল।

এবারের নিরঙ্কুশ বিজয় বাংলাদেশের রাজনীতি যে একটা ভিন্ন ধারার দিকে যাচ্ছে সে ইঙ্গিত বহন করে, যার সূত্রপাত হয়েছিল ২০০৮ এর নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে। সেসময় থেকেই দেখা যাচ্ছে সংসদে একটি দলের অর্থাৎ,আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকছে এবং পরবর্তী নির্বাচনেই তাদের আসন এবং প্রাপ্ত ভোট বাড়ছে।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৩০ আসন। ২০১৪ এর বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩৪ এ। আর এবার সব দল অংশগ্রহণ করলেও আওয়ামী লীগের আসন আরো বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৭ তে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশে স্বাধীন হবার এবারই তারা সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ, প্রদত্ত ভোটের ৭৬ দশমিক ৮০ শতাংশ পেয়েছে। এর আগে কোনও নির্বাচনে তারা এত ভোট পায়নি।

তত্ত্বগতভাবে এর মানে দাঁড়ায় যতই সময় যাচ্ছে ক্ষমতাসীন থাকা সত্ত্বেও দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে, যদিও প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রে সাধারণত এর বিপরীতটা দেখা যায়। ক্ষমতাসীন দল সময়ের সাথে সাথে জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে যা বিরোধী দলের ক্ষমতায় আসবার পথ সুগম করে। যেকোনও সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানত দু’টি, ক্ষেত্র বিশেষে তিনটি দলের মাঝে ক্ষমতার পালা বদল চলে, যাতে কোনও একটি দল দীর্ঘসময় ক্ষমতাসীন থেকে স্বৈরাচারী না হয়ে উঠতে পারে।

তবে, সংসদীয় গণতন্ত্রেও কখনো কখনো একটি দলকে দীর্ঘসময় ক্ষমতাসীন থাকতে দেখা যায়। উদাহারণস্বরুপ ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেসের কথা বলা যায়। এ দলটি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত একটানা প্রায় তিরিশ বছর ক্ষমতায় ছিল। দীর্ঘসময় ক্ষমতাসীন থাকবার ফলে দলটির মাঝে স্বৈরাচারী প্রবণতা দেখা দেয়; বিশেষত, ইন্দিরা গান্ধীর সময়, যার ফলে ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে দলটি জনতা দলের কাছে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়।

দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলেও আন্দোলন করে কংগ্রেসকে কিভাবে নামাতে হবে এ বিষয় নিয়ে ভারতের জনগণকে কখনো মাথা ঘামাতে হয় নাই। কারণ,দেশটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ভারতের জনগণ জেনে আসছে সরকার পরিবর্তনের একটি মাত্র উপায় আছে, আর সেটি হলো নির্বাচন। তাই, ক্ষমতার বাইরে থাকলে বিরোধী দলগুলোর মূল লক্ষ্য থাকে কিভাবে আগামী নির্বাচনে ভোট বাড়ানো যাবে। অপরদিকে, সরকারী দল চেষ্টা করে নির্বাচনের মাধ্যমে কী করে ক্ষমতায় থাকা যাবে।

ভারতের নির্বাচনে কী কারচুপি হয় না? হ্যাঁ, সেখানেও টাকা দিয়ে ভোট কেনা, পেশীশক্তির ব্যবহার, জাল ভোট দেয়া, প্রতিপক্ষের উপর হামলা ইত্যাদি সবই হয়। কিন্তু, যে বিষয়টা দেশটির প্রতিষ্ঠার সময় থেকে আজ পর্যন্ত হয় নাই তাহলো নির্বাচন কমিশনসহ প্রশাসন বা রাষ্ট্রযত্রের বিভিন্ন অংশ কোনও একটি দলের পক্ষ নেয়া। নির্বাচনে তারা সব সময়ই নিরপেক্ষ রেফারির ভূমিকা পালন করে এসেছে। ফলে,সেখানে সবাই জানে পর্যাপ্ত ভোট না পেলে সরকারী দলকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হবে।

সরকারী দল অনেকবারই সেখানে ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে। তাই, কংগ্রেস সেখানে একটানা তিরিশ বছর ক্ষমতায় থাকলেও কেউ এ বক্তব্য দেয় নাই যে দেশ থেকে গণতন্ত্র চলে গেছে।

তাহলে, বাংলাদেশে একটি দল তিনবারই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসলে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয় কেন? এর মূল কারণ বাংলাদেশের সাতচল্লিশ বছরের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনও দল বা সরকার ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হয়নি। মানুষ ধরেই নিয়েছে, যে দলের অধীনে নির্বাচন হবে তারাই জয়লাভ করবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি কেউই এ বোধটা তৈরি করতে সক্ষম হয় নাই যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও সরকারী দলের পরাজয় সম্ভব। বস্তুত, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সঙ্কটটা এখানেই।

একটি রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক কিনা তা অনেকগুলো উপদানের উপর নির্ভর করে। তবে,একটি রাষ্ট্র ন্যূনতম গণতান্ত্রিক এটা দাবি করতে হলে দুটো শর্ত পূরণ হওয়া অত্যাবশকীয়। প্রথমটি হলো প্রত্যেক নাগরিকের নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবার অথবা না দেবার স্বাধীনতা। দ্বিতীয়টি হলো, একটি রাষ্ট্রে সরকারী দলের নির্বাচনে পরাজয়ের ইতিহাস থাকা। কিন্তু, বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাসে-আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি–ক্ষমতাসীন এ তিনটি দলের কেউই ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনে পরাজয়ের নজির তৈরি করতে পারেনি। তেমনি, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে আজ পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নাই, যেখানে সব ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে।

তুলনামূলক বিচারে ১৯৭৩ সালে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অধিকতর সুষ্ঠু বলে মনে করা হয়। ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বাংলাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা তখন আকাশচুম্বী। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে এ বিষয়ে তখনো কারো দ্বিমত ছিল না, এখনো নেই।  কিন্তু, সে নির্বাচনেও কয়েকটি আসনে কারচুপির মাধ্যমে ফল পরিবর্তন করবার অভিযোগ উঠেছিল। এর একটি হলো, কারচুপির মাধ্যমে ফল পরিবর্তন করে খন্দকার মোশতাককে বিজয়ী ঘোষণা করা। উক্ত আসনে, জাসদ সমর্থিত আব্দুর রশীদ ইঞ্জিনিয়ার কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন বলে জাসদ এবং বিরোধী পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল।

এছাড়াও, অবধারিত জয়লাভ করবে জেনেও বাংলাদেশের অনেক আসনে তখন আওয়ামী লীগ কর্মীরা ব্যাপক জালভোট দিয়েছিল। ফলে, আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক এবং শুভানুধ্যায়ী স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ভোটটি নৌকা প্রতীকে দিতে চেয়েও দিতে পারেননি। এ বিষয়টা নিয়ে এখনো অনেক পুরানো আওয়ামী লীগ সমর্থক আফসোস করেন। আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা সেই উত্তাল জনসমর্থনের যুগেও কেন সব আসনে জনগণের ভোটের উপর আস্থা রাখতে পারল না অথবা নেতৃবৃন্দরাই বা কেন কর্মীদের ভোটের অনিয়ম থেকে দূরে রাখতে সচেষ্ট হন নাই সেটি নিঃসন্দেহে আরো আলোচনার দাবি রাখে।

১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের যে পরিমাণ জনপ্রিয়তা ছিল ১৯৭৩ এ এসে তার কিছুটা হ্রাস পায়। ১৯৭৩ এর সমপর্যায়ের জনপ্রিয়তা দলটি আর কখনো পায়নি। নানাবিধ উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে এবং আস্থাবান বিরোধী দলের অভাবে জনগণের একটি বড় অংশ বর্তমানে মনে করে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আওয়ামী লীগের কোনও বিকল্প নেই। নানাবিধ জরিপেও বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবার সংসদে ফিরে আসবে সে আভাস দিয়েছিল।

জরিপে অনেক সময় সঠিকভাবে জনগণের মতামত প্রতিফলিত না হলেও একটি দলের জনপ্রিয়তার মোটামুটি একটা আভাস পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হলো নানাবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দলটি জনপ্রিয় থাকবার পরেও, আওয়ামী লীগে কেন তার জনপ্রিয়তার উপরে আস্থা রাখতে পারেনি? ১৯৭৩ এর মতো এবারের নির্বাচনেও কেন অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থককে দলকে ভোট দিতে না পারার আপসোস করতে হল?

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রাখবার কারণে ১৯৯১ সালের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসবে বলে দলটির নেতাকর্মীরা ভেবেছিলেন। কিন্তু, জনগণ সেবার বিএনপিকে নির্বাচিত করে। এ বিষয়টি পরবর্তীতে জরিপ বা জনগণের মনোভাবের (Public perception) উপর দলটিতে আস্থার সঙ্কট তৈরি করে।

নব্বই পরবর্তী সময়ে যে দু’বার বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, সে দুবারই তারা তত্ত্ববাধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে অস্বীকার করে। প্রথমবার, আওয়ামী লীগকে আন্দোলন করে বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হয়।

দ্বিতীয়বার, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিলেও বিএনপি আবার তাদের দলীয় লোকের (রাষ্ট্রপতি ইয়াজুদ্দিন আহাম্মদ) অধীনে নির্বাচন করবার উদ্যোগ নেয়, যার ধারাবাহিকতা হলো এক-এগারো। এর ফলে আওয়ামী লীগের মাঝে এই প্রতীতি জন্মলাভ করে যে বিএনপি যদি আবার ক্ষমতায় আসে তাহলে তারা কোনও অবস্থাতেই ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না।

২০০১-০৬ এ সময়টাতে আওয়ামী লীগকে কঠিন নিপীড়ণের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি মনে করতে থাকে তাদের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে হলে নিপীড়ণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে দুর্বল করে ফেলতে হবে। এ সময়টাতে ‘ধর্ম ভিত্তিক’ সন্ত্রাসবাদের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। সমস্ত সন্ত্রাসবাদী হামলার লক্ষ্যবস্তু হয় আওয়ামী লীগ ও বাম দলের সাথে যুক্ত নেতাকর্মীরা, সেকুলার হিসাবে পরিচিত ব্যক্তিবর্গ, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীরা, আহমদিয়া জামায়াত (কাদিয়ানী) এবং অমুসলিম সম্প্রদায়।

বিএনপি এ সমস্ত হামলা তাদের রাজনীতির জন্য সহায়ক বলে মনে করে। এছাড়া ২১ অগাস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা করা হয় শেখ হাসিনাকে হত্যা করবার উদ্দেশ্য নিয়ে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং তারেক রহমান এ হামলার সাথে যুক্ত বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়,যা একসময় ছিল কল্পনার অতীত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামায়াতের প্রতি কঠোর নীতি দলটিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রান্তীয় অবস্থানে ঠেলে দেয়। পাশাপাশি, দুই দুইবার পেট্রোল বোমা নির্ভর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সাথে বিএনপির সম্পৃক্ততা এবং অন্যান্য কারণে দলটিকে এক ধরনের চাপের মধ্যে রাখা হয়।

এর ফলে এ দুটি দলের কর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্রমাগত বলে যেতে থাকে তারা ভবিষ্যতে সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগের কয়েক লক্ষ নেতাকর্মীকে হত্যা করবে। এটি আস্তে আস্তে জনমনে প্রথিত হতে থাকে এবং দলমত নির্বিশেষে সবার এ বিশ্বাস জন্মে যায় যে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশে ব্যাপক রক্তপাত হবে।

জনগণের বড় একটা অংশকে এ বিষয়টা যেমন আতঙ্কিত করে তোলে, তেমনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাদের অতীত অভিজ্ঞতার ফলে এ বিষয়টা বিশ্বাস করতে শুরু করেন। অপরদিকে, বিএনপির তরফ থেকে এ আতঙ্ক দূর করবার কোনও উদ্যোগ না নিয়ে বরং তাদের নেতাদের মাঝে এ ধরণের বক্তব্যকে প্রশ্রয় দেবার মনোবৃত্তি দেখা যায়। ফলে, তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে এ ধারণা জন্মলাভ করে যে এবার যেকোনও পন্থাতেই হোক নির্বাচনে জিতে আসতে হবে, নাহলে তাদের উপর মহাবিপর্যয় নেমে আসবে।

এরই ফল হলো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই আওয়ামী লীগের সারা দেশে মাঠ দখল নিয়ে বিএনপিকে দাঁড়াতে না দেওয়া। এ ব্যাপারে তারা অনেক জায়গাতেই প্রশাসন এবং আইন শৃংখলা-রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তাও পেয়েছে। অপরদিকে, রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় বিভিন্ন দলছুট সুবিধাবাদী নেতৃত্ব নিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে গড়ে উঠা বিএনপি আন্দোলন সংগ্রামের কঠিন কাজটি তাদের হয়ে কেউ করে দিবেন এবং তারা এর ফল ভোগ করবেন- এ মনোবৃত্তি নিয়ে পরিচালিত। ফলে, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত এবং দলীয় প্রধানের কারাদণ্ডের ফলে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত কর্মীবাহিনীকে নিয়ে বিএনপির আয়েসি নেতৃত্ব এসব রুখে দাঁড়াবার কোনও চেষ্টাই করেননি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিএনপিই হচ্ছে একমাত্র দল যার নেতাকর্মীরা গত সাত-আট বছর যাবত ক্ষণে ক্ষণে সোশ্যাল এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে হাস্যকরভাবে বলে আসছেন পুলিশ তাদের মাঠে দাঁড়াতে দিচ্ছে না বলে তারা আন্দোলন করতে পারছে না। এমনকি, সামরিক শাসনজাত  জাতীয় পার্টির মতো দলও বিএনপির আমলে নিপীড়ণের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় এ ধরনের হাস্যকর কথা বলেনি।

মানসিকভাবে দুর্বল নেতৃত্বের অনুসারী কর্মীবাহিনীও মানসিকভাবে দুর্বল হবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে, ভোটের দিন যখন নানা অনিয়ম হচ্ছিল তা প্রতিরোধ করবার জন্য দলের কর্মীদের ভোটকেন্দ্রে তেমনভাবে দেখা যায়নি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বহু কেন্দ্রে তাদের কোনও নির্বাচনী এজেন্টও ছিল না। তারা ভয় পাচ্ছিলেন, যে এজেন্ট হলে আওয়ামী লীগ বা পুলিশ কর্তৃক হয়রানির শিকার হবেন। অর্থাৎ, হয়রানি মোকাবেলা করবার নৈতিক সাহসের প্রবল অভাব দলটির কর্মীদের মাঝে স্পষ্ট হয়েছে।

ভোট কেন্দ্র বা আন্দোলনের মাঠের চেয়ে তারা আপেক্ষিকভাবে নিরাপদ সোশাল মিডিয়ার ‘কমফোর্ট জোনে’ই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। সেখানে তারা নিজেদের মধ্যে একটা ফ্যান্টাসির জগত তৈরি করে দলের এ সঙ্কট থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজেছেন।

নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির অভিযোগ ছিল মূলত দুটো। প্রথমত, আওয়ামী লীগ তার শাসনামলে যথেষ্ট উন্নয়ন সাধন করা সত্ত্বেও ব্যাপক দুর্নীতি করেছে। দ্বিতীয়ত, এ কালপর্বে অনেককে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে।

এ দুটো অভিযোগ একটি দলের জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামাবার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু, বিএনপি এ অভিযোগ তোলার পরেও জনগণের সহানুভূতি সে মাত্রায় আদায় করতে পারেনি ২০০১-০৬ সময়কালে তাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবার জন্য। বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জনগণের একটি বড় অংশের কাছে প্রতিভাত হয়েছে বিএনপি র‍্যাব তৈরি করে এবং ‘অপারেশন ক্লিন হার্টের’ মাধ্যমে  যে ‘সংস্কৃতির’ জন্ম দিয়েছে আওয়ামী লীগ শুধু সেটাকেই অনুসরণ করে যাচ্ছে।

একটি দল গণমানুষের কাছে ব্যাপক মাত্রায় জনপ্রিয়তা তখনই পায় যখন দলটি শাসক দলের চেয়ে ভালো কোনও বিকল্প কর্মসূচি জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে পারে। পাশাপাশি, তাদের অতীত ক্ষমতাসীনদের চেয়ে ভালো এটিও জনগণের সামনে পরিষ্কার করতে পারে। কিন্তু, বিএনপি এ দুটোর কোনওটাই করতে পারেনি।

এছাড়া, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকবার ফলে বিএনপি তার প্রতিষ্ঠা হবার পর থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে তিনটি অভিযোগ সব সময় করত, বিশেষত নির্বাচন আসবার পূর্বে তার কোনওটাই করতে পারেনি। অভিযোগ তিনটি হলো, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশে দুর্ভিক্ষ হবে, মসজিদ থেকে উলুধ্বনি শোনা যাবে এবং দেশ ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত হবে।

যে ভারত বিরোধী স্লোগান বিএনপির মূল নির্বাচনী অস্ত্র বিএনপি এবার বিস্ময়করভাবে তা থেকে বিরত থেকেছে। এক কাদের সিদ্দিকী ছাড়া ঐক্যফ্রন্টের কেউ এবার নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মকে ব্যবহার করেননি। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসাবে টুপি, ঘোমটা, হিজাব এর ব্যবহার এবার কোনও পক্ষেই দেখা যায়নি।

এ বিষয়গুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারার সূত্রপাতের দিকে ইঙ্গিত করে। এ ধারাটি হল বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রভাব ক্ষীণ হয়ে আসবার সম্ভাবনা। তবে,তাদের প্রভাব ক্রমশ কমে আসলেও হেফাজতের মতো সংগঠনগুলো থেকে সামাজিক বিষয়াদি নিয়ে কমবেশি একটা চাপ যেকোনও সরকারকে আরও দীর্ঘদিন  মোকাবেলা করতে হবে। এ পরিবর্তিত পরিস্থিতিগুলো হলো চীন রাশিয়ার উত্থান, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া এবং আমেরিকার ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নীতি থকে সরে যাওয়া ইত্যাদি।

আমেরিকার ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নীতি দ্বারা প্রভাবিত বাংলাদেশের সিভিল সমাজের অনেকের পক্ষেই এ বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন যে দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ক্রমশ প্রান্তীয় অবস্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সিভিল সমাজের এ অংশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচিতিটাই গড়ে উঠেছে ‘ইসলামপন্থা’র রাজনীতিকে হয় সমর্থন নতুবা বিরোধিতা করে। বাস্তবতা যাই হোক, এ দুই পক্ষই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ধর্মভিত্তিক’ রাজনীতির প্রাধান্যের বিষয়টাকে জিইয়ে রাখতে চাইবেন কেননা এ বিষয়টা একই সাথে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অস্তিত্বের সাথেও যুক্ত। কারও কারও পক্ষে এটা মেনে নেয়া কঠিন হলেও ‘ইসলামপন্থা’র রাজনীতির প্রভাব ক্ষীণ হয়ে আসবার প্রক্রিয়াটা বর্তমান নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়েছে।

নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত আমার একটি লেখায় আমি উল্লেখ করেছিলাম এবার সংসদে নিজস্ব প্রতীকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কারো নির্বাচিত হয়ে আসবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এবারের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বাশার মাইজভাণ্ডারী একমাত্র ধর্মভিত্তিক দলের প্রতিনিধি হিসাবে সংসদে এসেছেন। এ দলটি অনেক বিশ্লেষকের কাছে ‘মাজারপন্থী’ দল হিসাবে পরিচিত। এ দলের মামলার ফলেই জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। তারা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয় বরং সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেন।

বাম-রাজনীতির পটভূমি থেকে উঠে আসা মির্জা ফখরুল এ ধারাটি বুঝতে পেরেছেন বিধায় তার দলকে নির্বাচনে ভারত বিরোধিতা এবং ধর্মের ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে সচেষ্ট হয়েছেন। শুধু তাই নয়, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে কয়েকটি ছোট সেকুলার দলের সাথেও ঐক্যফ্রন্ট নাম দিয়ে জোট বেঁধেছেন।

ধর্মের ব্যবহার হ্রাসের পাশাপাশি রজনীতিতে আরেকটি যে উপাদান স্থায়ী আসন নিতে বসেছে সেটি হল বিরোধী দলবিহীন সংসদের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা, যার সূত্রপাত ২০১৪ এর নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়েছিল। বিরোধী দল যদি খুব দুর্বল বা সংসদ যদি বিরোধী দলবিহীন হয় তা আমেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পিতা জন অ্যাডামসের ভাষায় ‘সংখ্যা গরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র’ (Tyranny of the majority) কায়েমের বিপদের মধ্যে দেশকে ঠেলে দেয়— এমনকি তা যদি সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্যে দিয়েও হয়।

বিরোধী দলবিহীন সংসদের সাথে গত দশ বছরে ধীরে ধীরে আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোরই একটি মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এ পরিবর্তনকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘গভীর রাষ্ট্র’। বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোর এ ধরনের রূপান্তর পূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি। এ ধরনের ব্যবস্থায় দল, সরকার এবং রাষ্ট্র (সামরিক এবং বেসামরিক আমলাতন্ত্র) একটি অলিখিত চুক্তির বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং একে অন্যের স্বার্থ সংরক্ষণে সচেষ্ট থাকে।

‘গভীর রাষ্ট্রে’ প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার এক ধরনের আপাত স্বাধীনতা পরিলক্ষিত হলেও রাষ্ট্র এবং সরকারের সাথে মিডিয়ার এক ধরনের যোগাযোগ থাকে। ফলে, অনেক সময় স্বত:প্রণোদিত সেন্সরশিপ এবং ক্ষেত্র বিশেষে সরকার পক্ষে পক্ষপাতিত্ব পরিলক্ষিত হয়।

‘গভীর রাষ্ট্রে’ বিরোধী দল সমূহের রাজনীতি করা এবং মত প্রকাশের কোনও সমস্যা ততক্ষণ পর্যন্ত হয় না, যতক্ষণ না তা সরকারের ক্ষমতা কাঠামকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ‘গভীর রাষ্ট্র’ নতুন উপদান হলেও পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের দাবিদার অনেক দেশেও এ ধরনের রাষ্ট্র পরিলক্ষিত হয়।

এ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা এক ধরনের স্থিতিশীলতার জন্ম দেয়, যা কিনা আবার দ্রুত আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে। ফলে, সরকারের জনপ্রিয়তার একটা ভিত্তি তৈরি হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে মধ্য এবং উচ্চবিত্ত তরুণ সমাজের একটা বড় অংশ এ ধরনের উন্নয়নের সুবিধাভোগী। তাদের কাছে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার ইত্যাদির চেয়ে উন্নয়ন বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। এ শহুরে সুবিধাবাদী, ‘উন্নয়ন প্রজন্ম’ আওয়ামী লীগ সরকারের একটা বড় সমর্থন ভিত্তি, যা কিনা আগামী দিনগুলিতে উন্নয়নের সুবিধা বৃদ্ধির সাথে সাথে আরও বিস্তার লাভ করবে।

‘উন্নয়ন প্রজন্মে’র সমর্থনের পাশাপাশি  চীন, রাশিয়া, ভারত, আমেরিকা অর্থাৎ প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য এ দুই তরফ থেকে প্রাপ্ত সমর্থনও আগামী দিনগুলিতে বর্তমান সরকার পাবে। তেমনি, চীন-মার্কিন ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ এবং রুশ-মার্কিন ‘অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের’ সুবিধাভোগী হবে আওয়ামী লীগ। বিশ্ব রাজনীতিতে চীন-রাশিয়ার উত্থানের ফলে সব পক্ষের অবস্থানই এখন ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে।

‘ইসলামপন্থা’র রাজনীতির বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান আওয়ামী লীগকে সব পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য করেছে, এমনকি সৌদি আরবের মতো দেশের কাছেও। ফলে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে আওয়ামী লীগের যে একচ্ছত্র আধিপত্য তা ‘ইসলামপন্থা’ বা মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনীতির উপর ভিত্তি করে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।

এ অবস্থায় সেকুলার, লিবারেল বা সোশ্যাল ডেমোক্রাট ধারার কোনও রাজনৈতিক শক্তি যদি উঠে আসতে পারে একমাত্র তাহলেই তা আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। আর সেটা না হওয়া পর্যন্ত বিরোধী রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেটা অব্যাহত থাকবে। প্রকৃতি দ্রুত শূন্যতা পরিহার করলেও রাজনৈতিক শূন্যতা অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর এ শূন্যতা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য তত অব্যাহত থাকবে।

সাঈদ ইফতেখার আহমেদশিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিস, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

Responses -- “একাদশ সংসদ নির্বাচন: কোন পথে বাংলাদেশ”

  1. হাসান মাহমুদ

    সুন্দর নিবন্ধ, ধন্যবাদ। লেখকের কাছ থেকে এরকম আরো বিশ্লেষণ দরকার।

    ১. “ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ক্রমশ প্রান্তীয় অবস্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছে” – এখন পর্যন্ত এটা বাস্তব। ওদিকে আমাদের প্রায় প্রত্যেক আলেম মওলানা বিস্তীর্ন গ্রামবাংলার অগণিত নাগরিককে ক্রমাগত ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। এই দুই বিপ্রতীপ স্রোতের মধ্যে আমাদের কলুষিত রাজনীতির প্রশ্রয়ে ভবিষ্যতে কোনটা শেষ হাসি হাসবে তা বলা কঠিন।

    ২. “বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে আওয়ামী লীগের যে একচ্ছত্র আধিপত্য তা ‘ইসলামপন্থা’ বা মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনীতির উপর ভিত্তি করে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না”। কথাটা সত্যি, বর্তমানে শক্তিশালী বাস্তব এটা। এটাও বাস্তব যে কোনো রাজনৈতিক দলই চিরকাল ক্ষমতায় থাকেনা। কোনোদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে রাতারাতি পাশা উল্টে যাবে। জনগণকে রাজনৈতিক ইসলামের ভয়াবহতা সম্বন্ধে শিক্ষিত করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের চেষ্টা তো দূরের কথা চিন্তাও আছে বলে মনে হয়না। উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর নেতারা ছিলেন রাষ্ট্রব্যবস্থায় “ইসলামপন্থা”র বিরুদ্ধে, যেমন পাকিস্তানের জিন্নাহ, মিসরের নাসের, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ন, ইরানের ড: মোসাদ্দেক, সেই সাথে তুর্কীস্তানের কামাল পাশাও। তাঁরা জনগণকে রাজনৈতিক ইসলামের ভয়াবহতা সম্বন্ধে শিক্ষিত না করে হয় গঠনতন্ত্র বা সেনাবাহীনি দ্বারা ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেটা ব্যর্থ হয়েছে, আজ ওই দেশগুলোর প্রত্যেকটিতে “ইসলামপন্থা”র প্রচণ্ড আধিপত্য। ইতিহাসের সেই পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশে হবার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায়না।

    Reply
  2. ইকবাল করিম হাসনু

    বিশ্লেষণটি অনেকটাই সঠিক। মনোযোগের দাবি রাখে বিশেষত যাঁরা বামপন্থী ধর্মবিযুক্ত রাজনীতির নতুন বিকল্প নিয়ে ভাবতে চান।

    Reply
  3. লতিফ

    আপনার লেখায় সবসময় ভুল তথ্য থাকে, এবারও আছে। বিরোধীদল হওয়ার জন্য ৩০ আসন পাওয়ার কোনো বিধান সংবিধানে নেই। এর সপক্ষে কোনো আইন কোথাও নেই। দ্বিতীয় ভুলটি মারাত্মক। ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসন পায়নি, তারা পেয়েছিল ২৮৯। ফ্রিডম পার্টি ১ এবং স্বতন্ত্র ১০টি আসন পায়। ফ্রিডম পার্টির মেজর খন্দকার রশিদ (বঙ্গবন্ধুর খুনি) বিরোধীদলের নেতা নির্বাচিত করেন স্পিকার মির্জা গোলাম হাফিজ। এর আগে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি বজলুল হুদাকেও এমপি বানানো হয়েছিল।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—