তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক লোক খারাপ। তিনি অযথা শো অফ করেন। যেমন? তিনি পাবলিককে দেখানোর জন্য মোটরবাইকে করে অফিসে চলে যান। সেই বাইকে চড়ার ছবি আবার ফেইসবুকেও প্রকাশ করেন! শুধু তাই নয়, পলক মন্ত্রী হয়েও আইন ভাঙেন! শো অফ করতে গিয়ে যখন বাইকে চড়েন, তখন মাথায় হেলমেট পড়েন না! এরকম খারাপ মানুষকে, তাও আবার মন্ত্রী, এমনি এমনি ছেড়ে দেয়া যায়? যায় না। তাই বাংলার ফেইসবুকাররা তাকে তুলোধুনা করেন।

কারা? ফেইসবুকাররা। যারা রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে ভঙ্গি করে ছবি তুলে ফেইসবুকে দেন। যারা ক্লাসের ফাঁকে আড্ডা দিতে দিতে সেই ছবি ফেইসবুকে দেন। যারা যেকোনও বিষয়ে নিজের বিশেষজ্ঞ মতামত ফেইসবুকে প্রকাশ করেন। যারা যেকোনো অপরাধে ফেইসবুকে প্রতিবাদ জানান, তবে রাস্তায় নামেন না। এরকম তালিকা করতে থাকলে সেটা দীর্ঘ হতেই থাকবে।

২.

এই যে যেকোনও মুহূর্তের ছবি বা স্ট্যাটাস ফেইসবুকে দেয়া। কেন দেন তারা? কেন দেই আমরা? শো অফ করার জন্যই কি? ফেইসবুকে মানুষ তার ব্যক্তিজীবন মুহুর্মুহু প্রকাশ করে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দুনিয়া জুড়ে খোঁজা হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরেই।

ফেইসবুক ব্যক্তিকে সমষ্টির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। এই জুড়ে দেয়ার ভেতর দিয়ে সমাজে পারস্পরিক যোগাযোগের ধারণাটিকেই বদলে দিয়েছে। যোগাযোগের এই সহজলভ্যতার ভাল দিক যেমন আছে খারাপও আছে তেমন। একইসঙ্গে মানুষের রিকগনিশন পাওয়ার যে চিরকালীন আকাঙ্ক্ষা তার প্রকাশকে দিয়েছে উসকে। কবিতা/গল্প হোক না হোক, লিখে ফেইসবুকে ছেড়ে দিচ্ছে ব্যক্তি। সমাজ/রাজনীতি বুঝুক না বুঝুক নিজের মত ঝেড়ে দিচ্ছে, আত্মবিশ্বাসের সাথে।

এই যে ফেইসবুকের আমি। যখনই কিছু প্রকাশ করতে যাই আমার মাথায় থাকে যে এটা ফ্রেন্ডলিস্টের মানুষেরা দেখবে। এই লিস্টে বন্ধু থেকে শুরু করে অপরিচিত- সবাই আছে। ফেইসবুক সমষ্টির কাছে আমার কথা খুব সহজে পৌঁছে দিচ্ছে। সেই সুযোগ নিয়ে, সেই প্রযুক্তির ফাঁদে মনে-বদলে-যাওয়া আমি নিজের সবকিছুই ফ্রেন্ডদের সাথে শেয়ার করতে চাই, অর্থাৎ সমষ্টিকে জানাতে চাই আমার অস্তিত্ব।

আমাকে দেখাতে চাই। তাই স্ট্যাটাস দেই। তাই ছবি দেই। তাই ভিডিও দেই। আমার কোন গান শুনতে ভাল লাগে। আমার কোন চলচ্চিত্র দেখতে ভাল লাগে। আমার কোন খাবার খেতে ভাল লাগে। আমার মা-বাবা-ভাই-বোন-সন্তান-আত্মীয়-পরিচিত কে কেমন আছে। সমস্ত কিছু আমি শেয়ার করি ফেইসবুকে। কেন? ফ্রেন্ডরা জানবে। কতজন ফ্রেন্ড? সচরাচর হাজার হাজার, নিদেন পক্ষে শতশত।

এই আমির বাইরে রাজনীতিকরা ফেইসবুক ব্যবহার করেন তার কর্মকাণ্ড প্রচারের মাধ্যম হিসেবে। অবশ্য এ কাজে পশ্চিমা বিশ্বে টুইটারের ব্যবহার বেশি। বাংলাদেশেও গত ৪/৫ বছরে ফেইসবুকের রাজনৈতিক ব্যবহার গতি পেয়েছে। মন্ত্রী পলকও তার কর্মকাণ্ড প্রচারে ফেইসবুক ব্যবহার করেন।

৩.

পলক কেন মোটরবাইকে চড়লেন। কেন হেলমেট ছাড়াই চড়লেন। এসবের ব্যাখ্যা তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দিয়েছিলেন: “তাড়াহুড়ো করে যাওয়ার জন্য আমি যে বাইকের সাহায্য নিয়েছি, তার কাছে কোনো বাড়তি হেলমেট ছিল না। আর ওটা রাইড শেয়ারিংয়ের বাইকও ছিল না, ব্যক্তিগত বাইক ছিল।”

ওই বাইক যে রাইড শেয়ারিঙের নয় তা ছবি দেখেই যে কেউ বুঝতে পারার কথা। কারণ ঢাকায় যাত্রীর জন্য অতিরিক্ত হেলমেট নেই এমন রাইড শেয়ারিং বাইক এখন পাওয়া যায় না। এটা রাস্তায় চলাচলকারী সবাই জানে। তবু ফেইসবুকাররা একহাত নিয়েছে, নেবে। এটাই ইন্টারনেটের/ফেইসবুকের গণ-ক্ষমতায়ন: আমার ওয়ালে বা তোমার পাবলিক পোস্টে আমার মন যা চায় তাই আমি বলতে পারি!

কিন্তু পলক বাইকে চড়েছিলেন কেন? কারণ গাড়িতে জ্যামে বসে দেরিতে অফিসে যেতে চাননি তিনি। তাই রাস্তায় গাড়ি থেকে নেমে, পথচলতি এক মোটরবাইকের সাহায্য নেন তিনি। এবং ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছে যান।

পলক কি প্রতিদিন বা প্রায়ই এমন হেলমেট ছাড়া বাইকে চড়েন? সেটা আমরা জানি না। তবে একইদিন অফিস থেকে ফেরার পথে তিনি হেলমেট পরিহিত একটা ছবিও দেন ফেইসবুকে, জানা যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের খবর থেকেই। তাহলে তার হেলমেটবিহীন অফিসযাত্রা ছিল ব্যতিক্রম। প্রতিমন্ত্রীর এই অফিসযাত্রাকে এখনই স্টান্টবাজি বলে উড়িয়ে দেয়া ঠিক হবে? নাকি আরো কিছু মাস অপেক্ষা করে দেখাই শ্রেয়? সময়ই তা বলে দেবে।

হেলমেটবিহীন দিনটিতে পলকের অবশ্য আরো অন্তত একটি বিকল্প ছিল। তিনি যথারীতি গাড়িতে জ্যামে বসে থাকতে পারতেন। দেরিতে অফিসে পৌঁছাতেন। ১২টার সভা ১২:৩০ কি ১টায় শুরু হতো। সভার ছবি তুলে ফেইসবুকে দিতে পারতেন। বলতে পারতেন, জ্যামের কারণে নতুন বছরের প্রথম কর্মদিবসে অফিসে আসতে দেরি হলো।

সেই ছবিতেও হয়ত পলককে এক হাত নিতেন ফেইসবুকাররা। কারণ এখন ইন্টারনেটের গণ-ক্ষমতায়নের যুগ। ফেইসবুকের কল্যাণে ব্যক্তির ভ্রান্তিভরা আত্মবিশ্বাসের যুগ।

৪.

এই লেখা শেষ হওয়ার পর এক খবরে জানা গেল হেলমেট ঘটনায় যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কাছে ভুল স্বীকার করেছেন প্রতিমন্ত্রী পলক। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমেরই এক খবরে জানা গেল তার ভুল স্বীকারের তথ্য।

বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একথা জানান কাদের। তিনি বলেন, “আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম অ্যাজ জেনারেল সেক্রেটারি অফ পার্টি। হি এক্সপ্রেসড হিজ রিগ্রেট ফর ইট এবং সে বলেছে যে ‘ইটস এ মিসটেইক, আমি আর রিপিট করব না’।”

নিজের ভুল বুঝতে পারার জন্য প্রতিমন্ত্রী পলক সাধুবাদ পেতে পারেন। তবে এ কারণে ফেইসবুকের ‘মব জাস্টিস’ যৌক্তিক হয়ে যায় না। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, সমাজে দীর্ঘ সময় ধরে চলা অভ্যাস হঠাৎ একদিনে দূর হয়ে যায় না। এ কারণে হেলমেট ছাড়া অন্যের বাইকে উঠে পড়েন একজন প্রতিমন্ত্রী।

আর, পলকের কাছ থেকে না হয় ওবায়দুল কাদেরের মাধ্যমে ভুল স্বীকার পাওয়া গেল। কিন্তু ফেইসবুকীয় ভ্রান্তিভরা আত্মবিশ্বাসের যে ধারা ক্রমশ শক্ত হচ্ছে সমাজে তার পরিণতি কী? ভার্চ্যুয়াল আর রিয়ালের সীমা ভেঙে ফেইসবুক/ইন্টারনেট যে জীবন ব্যবস্থা তৈরি করছে সেখানে ব্যক্তির শেষ পরণতি কী? এখনো এর কোনো জবাব নেই।

Responses -- “হেলমেট, ফেইসবুক, ব্যক্তি”

  1. সেলিম

    আইন ভঙ্গ করে ভোট নেওয়া গেলে মোটর সাইকেলে চড়তে অসুবিধা কোথায়? ঠিকই বলেছেন আপনি।

    Reply
  2. আহাদ

    একবার রসূল সঃ এর কাছে এক লোক তাঁর ছেলেকে নিয়ে এসে বলল যে তার ছেলে অত্যাধিক মিস্টি খায়। রসূল যেন তার ছেলেকে এই ব্যপারে মানা করেন। রসূল তাকে ১ সপ্তাহ পরে তার কাছে ছেলেকে নিয়ে আসতে বললেন। যথাসময়ে ওই লোক তার ছেলেকে তাঁর কাছে নিয়ে গেলে রসূল ছেলেটিকে মিষ্টি খেতে বারন করলেন। তখন ওই ব্যক্তি প্রশ্ন করল ঃ আপনি তো এক সপ্তাহ আগেই এই উপদেশ দিতে পারতেন। তখন রসূল বললেন যে, মিষ্টি খেতে আমার ভালো লাগে এবং এই এক সপ্তাহের মধ্যে আমি নিজে মিষ্টি খাওয়া পরিত্যাগ করেছি। এখানে আদর্শ হচ্ছে আমি শাসক হলেও যে নিয়ম নিজে মানতে পারবো কেবল তাই অন্যের জন্য আইন বানাবো। আমাদের দেশে শাসকদের আইন না মানা একটি ফ্যশনে পরিণত হয়েছে, তারই সাথে যুক্ত হয়েছে চাটুকার গোষ্ঠীর নির্লজ্জ লেহন। প্রতিমন্ত্রি আইন মেনে হেলমেট পরলে যে তাঁর চেহারা মানুষজন দেখবেন না, মানুষ বুঝবে কি করে যে মন্ত্রীরা ( লোক দেখানো ) পাঠাও এ চড়তে পারে।

    Reply
  3. সৈয়দ আলি

    পলক ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেছেন, এটিই প্রথম কথা। তাঁকে আইনভঙ্গ করার সুপ্রমাণের ভিত্তিতে শাস্তি পেতে হবে। দেখি তো পলাশ দত্তের সতী আওয়ামী লীগ কেমন আইন মেনে চলে?

    Reply
  4. Kamran

    Due to huge development of the nation as well as Dhaka, why there is three hours of traffic jam which may cause late for office of our minister. Traffic jam presence everywhere in the world but in Dhaka it goes beyond patience level. All the policy maker is related to this haphazard.

    Reply
  5. ডাঃ সাইমন মোহাইমিন

    “কারা? ফেইসবুকাররা। যারা রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে ভঙ্গি করে ছবি তুলে ফেইসবুকে দেন। যারা ক্লাসের ফাঁকে আড্ডা দিতে দিতে সেই ছবি ফেইসবুকে দেন। যারা যেকোনও বিষয়ে নিজের বিশেষজ্ঞ মতামত ফেইসবুকে প্রকাশ করেন। যারা যেকোনো অপরাধে ফেইসবুকে প্রতিবাদ জানান, তবে রাস্তায় নামেন না। এরকম তালিকা করতে থাকলে সেটা দীর্ঘ হতেই থাকবে।”

    পলকের হেলমেট বিহীন মোটরসাইকেল যাত্রাকে সঠিক বলে কভার করার জন্য লেখক কিছু আলতু ফালতু কথা বললেন। প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামে না আপনাকে কে বলছে? সমসাময়িক যত আন্দোলনে মানুষ রাস্তায় জড় হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই ফেইসবুকের মাধ্যমে সূচনা হয়েছে।

    Reply
  6. আকতার হোসেন

    ওবায়দুল কাদের নিজেই হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেলে বসেছেন। সে ছবিও ফেসবুকে আছে।

    Reply
  7. Prodhan

    মন্ত্রী হয়ে উনি আইন মানবেন না ,,,আবার সেটার ছবি তুলে ফেসবুকে দিবেন ,,,কিন্তু সমালোচনা করা যাবে না ,,,, এটি কেমন কথা ,,,
    লজ্জা থাকলে উনার মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেয়া উচিত।
    সবাইকে এক রকম ভাববেন না ,,, ” ক্লাসের ফাঁকে আড্ডা ” আমিও দেই ,,,পেশায় আমি শিক্ষক।

    Reply
  8. শফিক আল্ কাজী

    মার্ক জাকারবার্গ একবার,খুব বেশীদিন আগে নয়,চীনের কোন এক শহরের রাস্তায় মুখে মাস্ক্ না বেঁধে হেঁটেছিলেন।এটার অনেক সমালোচনা হয়েছিল,কারন বায়ূ দুষনের কারনে মাস্ক্ ব্যবহার ওই শহরের দস্তুর।সমালোচনা সোস্যাল মিডিয়াতেই বেশী হয়েছিল। বলা হয়েছিল ওই শহরে দুষনের ব্যপকতার ব্যপারে লোকে ভুল মেসেজ পাবে এর ফলে।
    মন্ত্রী হেলমেট ব্যবহার না করার জন্য সমালোচিত হবারই কথা। কাজটা বে-আইনী।
    এবং মন্ত্রী নিজেও পরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তো এটাকে ডিফেন্ড করতে হবে কেন?
    এবং কারো মনে হতেই পারে যে কিছু প্রদর্শন করা হচ্ছে।
    কাদের সিদ্দীকির রিক্সাওয়ালাকে রিক্সায় বসিয়ে রিক্সা চালানর ছবি একবার পত্রিকায় এসেছিল এবং পাবলিক ব্যপক বিনোদন পেয়েছিল।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—