“নদী কিছু চেয়েছিল, চেয়েও পায়নি, তাই তার / জল উঠে এসেছিল সীমানা ছাড়িয়ে।/ সবকিছু ভেঙেচুরে পেটের ভিতরে টেনে নিয়ে / সে তাই আবার / ফিরে গেছে নিজের নির্দিষ্ট সীমানায়।” –  সদ্য প্রয়াত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কোন নদীর কথা বলেছিলেন জানা নেই; তবে মাত্র গত হওয়া বছরে পদ্মা নদী এমন করেই নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল নড়িয়া উপজেলার শত শত কাঁচা-পাকা স্থাপনা।

পদ্মার ঢেউয়ের গোঙানি বহুবার বলে যায় এতটা ‘রাক্ষুসী’ সে নয়। তাকে ছন্নছাড়া করে দিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ বালু উত্তোলন, অপরিকল্পিত ড্রেজিং, তীরের মাটি কাটা, যত্রতত্র ভরাট আর দখল। আমরা যখন নদীর ভাষা বুঝিনা, পদ্মার তখন বৈরি হওয়া ছাড়া গতি কী আর?

সিন্ধু তীরে মহেঞ্জোদারো, নীল নদের পাড়ে মিশর, টেমস তীরে লন্ডন – নদী গড়েছে সভ্যতা। করতোয়া পাশে মহাস্থানগড়, বুড়িগঙ্গা পাড়ে ঢাকা – নদী গড়েছে নগর। তারপর অসভ্যের মত আমাদের নগর খেয়ে ফেলছে নদীকে।

“শুধুই দেয় না নদী, কিছু চায়, চিরকাল চায়।” – নদীর হয়ে নীরেন্দ্রনাথ কী বলেছিলেন? কী চায় নদী?

বছরের প্রথম দিন অসাধারণ একটি চিত্র ধরা পড়েছে আলোকচিত্রীর ক্যামেরায়। নৌকাযোগে নদী পার হওয়ার সময়  হাত উঁচু করে নতুন বই তুলে দেখাচ্ছে  চোখেমুখে এক নদী আনন্দে ভাস্বর স্কুলের ছেলেমেয়েরা। আমার নদী, আমার বই, আমার ভবিষ্যত – এক ফ্রেমে কি দারুণ বার্তা দিয়ে শুরু হলো ২০১৯।

কিন্তু এই শিশুদের ভবিষ্যত এগিয়ে আসতে আসতে নদী কি বর্তমান থাকবে ওদের জন্য?

২০১৫ সালে দুই ঢাকার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে আগে দৈনিক সমকালে লিখেছিলাম –  ‘বুড়িগঙ্গা বাঁচালেই যোগ্য মেয়র’। ভোটের আগে  সম্ভাব্য নগরপ্রধানদের ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতিতে নদীহীনতা দেখে প্রশ্ন রেখেছিলাম – একজন মেয়র, যার হাতে রয়েছে নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষমতা, বুড়িগঙ্গাকে এড়িয়ে তিনি ঢাকাকে কীভাবে উন্নত নগরীরূপে গড়বেন?

সাড়ে তিন বছর আগের ওই লেখায় প্রস্তাবনা ছিল ভোটের আগে গণমাধ্যমগুলো প্রার্থীদের নিয়ে নদীপাড়ে  ‘লাইভ’ করতে পারে। আজকাল অনেক চ্যানেলের নির্বাচনী আলাপে বা লাইভে ব্যাকড্রপ হিসেবে নদীতীর দেখতে পাওয়া আনন্দ দেয় ভীষণ।

ঢাকার দুই অংশের প্রতিনিধিত্বে আসা দুই মেয়র- প্রয়াত আনিসুল হক এবং সাঈদ খোকনকেও আমরা  পেয়েছিলাম তৃণমূল আর প্রজন্মকে নদী বাঁচাও আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে কাজ করা সংগঠন রিভারাইন পিপলের জাতীয় নদী অলিম্পিয়াড ২০১৬ আয়োজনে;  নদী বাঁচানোর আহ্বান আর আশ্বাস জানিয়েছিলেন তারা।

নগরপ্রধানই নদীবন্ধু হতে পারেন মনে করে এজন্যই স্লোগান ধরেছিলাম – নাগরিকের নগরপ্রধান হোক নদীমুখী।

একাদশ নির্বাচনে প্রতিটি দলের ইশতেহার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলেও পুরো চিত্রে নদী রয়ে গেছে অবহেলিত। দেশের নদীগুলো দখল-দূষণ মুক্ত করার ওয়াদা হারিয়ে গেছে অনেক অনেক প্রতিশ্রুতির ভিড়ে।

বিকল্প ধারা ও যুক্তফ্রন্টের ইশতেহারে পরিবেশ নিয়ে বলা হয়েছে একজন বিশেষজ্ঞ টেকনোক্রেন্ট মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হবে। অতি সংক্ষিপ্ত এই ‘পরিবেশ’ পরিচ্ছেদে নদী উহ্য ছিল। তবে পররাষ্ট্র বিষয়ক নীতিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সড়ক, আকাশ, রেলের পাশাপাশি নদী পথেও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা বাড়ানোর কথা বলা আছে।

বামদল সিপিবির ইশতেহারের এক অংশে বলা আছে হাওরবাসীর সংগ্রামের দাবি বাস্তবায়ন, আরেক অংশে বলা আছে নদী পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণের কথা; যদিও কীভাবে তা করা হবে সে প্রস্তাবনা বা কর্মপরিকল্পনা নেই।

জাসদের ইশতেহারে অবশ্য পানিসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু প্রসঙ্গটি আলাদা আলাদা করে প্রাধান্য পেয়েছে। কীভাবে এবং কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা প্রস্তাব না করলেও ইশতেহারে নদী দূষণ ও দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সোচ্চার থাকার কথা জনগণকে জানানোর সৌজন্যতাটুকু দেখিয়েছে দলটি।

জাসদকে একটা বাড়তি ধন্যবাদ দিতে হয় ইশতেহারে পানিসম্পদ শিরোনামে একটি বরাদ্দ রাখায়। রাজনৈতিক দলগুলোর কারো ইশতেহারে নামকাওয়াস্তা পরিবেশ পর্ব এসেছে, কারোতে নেই, কারো কিছুটা বড় আকারে; কিন্তু নদী নিয়ে আলাদা শিরোনামে বরাদ্দ কেন জায়গা পায়নি বিভিন্ন দলের ইশতেহারে? নদীকে কেবল পররাষ্ট্র পর্বেই বা আটকে রাখা হচ্ছে কেন?

জাতীয় পার্টির ইশতেহারে চমকপ্রদ রাজনৈতিক-প্রশাসনিক কাঠামোর প্রস্তাবনা থাকলেও নদীর কথা বলতে কেন যেন ভুলেই গেছে দলটি।

দীর্ঘ ও বেশ খানিকটা বিস্তারিত ইশতেহারে নদী প্রসঙ্গে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি জায়গা পেয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের পররাষ্ট্রনীতিতে। এর বাইরে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ নিয়ে আলাদা করে অনেক কথা বলা হলেও নদী নিয়ে বড় কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি ঐক্যফ্রন্টের কাছ থেকে।

ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের সঙ্গে ভাববাচ্যে প্রচুর মিল থাকলেও বিএনপির ইশতেহারে  ‘পরিবেশ’ অংশটি একেবারে সংক্ষিপ্ত। অবশ্য পররাষ্ট্র অংশে আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা এসেছে দলটির পক্ষ থেকে।

সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞ দল আওয়ামী লীগের ইশতেহার বিন্যাসে অন্য যে কোনো দলের চেয়ে অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট হলেও আওয়ামী লীগের ইশতেহারে পররাষ্ট্র অংশে অভিন্ন নদীর বিষয়ে কোনো অর্জন তুলে ধরা হয়নি।

অবশ্য ‘নৌপথ ও বন্দর’ অংশে এর পরিকল্পনায় দলটি জানিয়েছে ঢাকার চারপাশের চারটি নদী ও খালগুলোকে দখল-দূষণমুক্ত করে নদীতীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির মাধ্যমে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।

পর পর দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার পরও নদী নিয়ে আওয়ামী লীগের সাফল্য ও অর্জন ইশতেহারে দেখাতে না পারাটা ছিল বেদনাদায়ক।

ঢাকা-৩ (কেরানীগঞ্জ) আসনের সাংসদ নসরুল হামিদ বিপু তার নির্বাচনী প্রচারে নদী ও খাল উদ্ধারের মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কেরানীগঞ্জের ১৭টি খাল উদ্ধারের কথা ঘোষণা করেছিলেন তিনি। এইরকম একটি মাস্টারপ্ল্যান যোগ করা হলে আওয়ামী লীগের ইশতেহারটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা যেত নির্দ্বিধায়।

আশা করি নৌকা নিয়ে জেতা সাংসদ নসরুল হামিদের নদী-খাল উদ্ধারের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তা অন্যান্য নদী পুনরুদ্ধারেও প্রয়োগ করবে আওয়ামী লীগ সরকার।

যেহেতু আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় তাই ইশতেহারে নদী থাকুক আর নাই থাকুক, নদী বাঁচাতে প্রত্যাশার কেন্দ্রে সরকারে থাকা আওয়ামী লীগকেই রাখতে হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় নদী পুনরুদ্ধারে জোর দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমেও নদী-খাল-বিলে পানি ধরে রাখার ওপর জোর দিয়ে ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী বেশ স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, নদীর গতি যেন ব্যাহত না হয়।

দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা মন্ত্রী-নেতাকর্মীরা বেশ আমলে নিয়েছেন। তাই আশা ধরে রাখতেই হয়, নদী পুনরুদ্ধারে শেখ হাসিনার নির্দেশ বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবে আওয়ামী লীগ সরকার।

কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কে হবেন সেই নদীদূত? কেবল ঢাকার চারটি নদীই নয়, দেশজুড়ে শত শত নদীর দুঃখগাথা কে তুলে ধরবেন? আর কোথায়ই বা তুলে ধরবেন?

এমন তো হতেই পারে যে একাদশ জাতীয় সংসদ নদী নিয়ে সরব থাকবে আগামী পাঁচটি বছর। প্রতিটি অধিবেশনে সরকারি-বিরোধী দল নদীর দখল-দূষণ নিয়ে বিতর্কে জড়াবে। নদীর দুঃখগাথা তুলে ধরবেন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। নদী ও নদীবর্তী মানুষদের নিয়ে উপযোগী আইন ও  বিধি-ধারা-নীতিমালা করবেন তারা।  তাহলে যাদের জনপ্রতিনিধি বলা হয়, তারাই তো আসল নদীপ্রতিনিধি।

বাংলাদেশের ওয়ান ডে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার নির্বাচনী প্রচারণার শুরুটা সাংসদদের নদীপ্রতিনিধি হিসেবে পাওয়ার সম্ভাবনায় ঢেউ দিল আরো। আজকের সাংসদ মাশরাফি ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে সিরিজ জয় শেষে ভোট চাইতে নিজের নির্বাচনী এলাকা নড়াইলের মাটিতে পা রেখেছিলেন নৌকাযোগে মধুমতি নদী পার হয়ে।

ঠিক এভাবেই সংসদ সদস্যরা নদীর সঙ্গে নিজেকে জুড়ে নিতে শুরু করলে নদীর দখল আর দূষণ কমে আসবেই।

সাংসদ, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট জনসভায় যোগ দিতে মাঝেমধ্যে যদি নদীপথ বেছে নেন তবে নদীগুলোর আর ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে না।

৩০০ আসন আর ৫০টি নারী আসনের প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ এলাকার একটি করে নদী বেছে নিয়ে বছর জুড়ে এর দখল, দূষণ, পরিবেশ, সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেন তবে সালতামামিতে তিনশতাধিক নদীকে ফিরে পাবার সাফল্য লিখে শেষ করা যাবে না।

যে প্রবৃদ্ধি আর উন্নয়ন বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যরা কাজ করবেন নিজ নিজ এলাকায় তা নদীশূন্য হতে পারে না। আর তাই ভোটের লড়াই শেষে কোন সাংসদ কতটা নদীবন্ধু সেই প্রীতি লড়াইটা সংসদের শুরু থেকেই শুরু হতে পারে। তো সাংসদদের মধ্যে কে হতে চান ‘সেরা নদীপ্রতিনিধি’?

One Response -- “সাংসদরা কি হবেন নদী প্রতিনিধি?”

  1. younusur rahman

    ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া গেলেই দেখা যাবে কিভাবে মেঘনা নদী আস্তে আস্তে বুড়িগঙ্গা বানানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দেশের ধনী কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতের জন্য একের পর এক ফসলের জমি কিনে রেখে দিচ্ছে। মেঘনা ব্রিজ এর পর সেখানকার মেঘনা নদীর এই পাড়ে জাহাজ বানানোর ফ্যাক্টরির কাজ পুরাদমে চলছে। এক সময় বুড়িগঙ্গার তীরে এরকম জাহাজ ফ্যাক্টরি ছিল ছোট বেলায় দেখছি। হয়তো এখনও আছে। আর অপর পাড়ে বলাকির চরে ‘আনোয়ারা গ্রুপ’ নদী থেকে বালু তুলে গ্রাম উচু করছে ফ্যাক্টরি করার জন্য। এভাবে অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু তুলে নেয়ার ফলাফল ভালো হয় না। জানি না তারা সেখানে কি ধরণের ফ্যাক্টরি বানাবে। এই ফ্যাক্টরিগুলি চালু হলেই এর অপ্রয়োজনীয় ফেলে দেয়া অংশ থেকেই একদিন এই নদীটার মৃত্যু হবে। এগুলি এখনই থামানো উচিৎ বলে মনে করি। দয়া করে এগুলো থামান। দেশের অন্য নদীর কথা তেমন জানি না। যা নিজের চোখে দেখেছি তাই লিখলাম। এভাবে একটা নদী হত্যা করে দেশের উন্নয়ন কিভাবে হয় তাও বুঝি না তবে এই সকল গ্রুপগুলি ধনী থেকে আরও ধনী হয় এইটা সত্যি কথা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—