বাংলাদেশে সাইবার ক্রাইমের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে গুজব এবং অসৎ উদ্দেশ্যে ছড়ানো প্রোপাগান্ডা। বিএনপি-জামায়াত এবং অ্যান্টি-আওয়ামী অংশটির রাজনৈতিক চালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশও এগুলো যা আক্ষরিক অর্থে আজ পর্যন্ত আমাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনেনি।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ও আমরা তা দেখেছি। অচেনা লোকজন থেকে শুরু করে মোটামুটি চেনামুখের অভিনেত্রী বা স্বনামধন্য আলোকচিত্রী বা শিল্পানুরাগী ব্যক্তিও গুজব ছড়ানোর মাধ্যম হয়েছেন। হতাশাগ্রস্ত হবার মতই ব্যাপার। অনলাইনে রাতারাতি গজিয়ে ওঠা ভুঁইফোড় মিডিয়া, কখনও কখনও মেইনস্ট্রিম মিডিয়াও এদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে ডিএমপি কর্তৃক ব্যাচেলরদের বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া ভুয়া খবর ছড়িয়ে যাওয়া। কয়েক বছর আগে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সহিংসতা দমনের প্রেক্ষিতে হাজার হাজার হেফাজতি নিহত কিংবা সাইদী রাজাকারকে চাঁদে দেখতে পাওয়ার গুজবও বেশ পুরনো। গুজব, মিথ্যা প্রোপাগান্ডা বা ঘটনাকে রং চড়িয়ে উপস্থাপন কিংবা সত্যের সঙ্গে মিথ্যার মিশেলে পাবলিক ম্যানিপুলেশন সাধারণ মানুষকে সহজেই বিভ্রান্ত করে, তাৎক্ষণিক সত্যতা যাচাইয়ের চিন্তা মানুষের মাথায় আসে না, যাচাই করাও অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না। যাদের বিরুদ্ধে করা হয় তারা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় যারা এসব করে তাদের। নৈতিকতা প্রচণ্ড নড়বড়ে হলেই এটা সম্ভব। কিন্তু অসচেতনতার মাত্রা বেশি তাই তাদের এধরনের নেতিবাচক কাজ কিভাবে বুমেরাং হতে পারে তা নিয়ে ভাবেন না।

রাখালের বাঘের গল্প অনেকেরই পড়া আছে। প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার উদ্দেশ্যে গুজব বা মিথ্যা প্রোপাগান্ডা যারা ছড়ায় তারা অনেকটা সেই রাখালের চরিত্রকে ধারণ করে। একসময় মানুষ অভ্যস্ত হয়ে যায়। বাঘও চলে আসে এবং রাখালকে গলাধ:করণ করে। সেদিন তার চিৎকারে বিশ্বাস করে কেউ এগিয়ে আসে না। যারা শুধু প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যেই ঘটনাকে অন্যখাতে প্রবাহিত করেন কিংবা রং চড়িয়ে উপস্থাপন করে দেখতে চান পাবলিক কিভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, তারা ভয়ংকর অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী।

ধরা যাক, আপনি নিজে কিংবা আপনার সামনে সত্যিকার অর্থে ধর্ষণ হয়নি। কিন্তু গুজব ছড়ালেন। এতে প্রকৃত ভিকটিম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, ধর্ষণের ন্যায় খুবই গুরুতর অপরাধ নিয়ে মিথ্যাচারের দায়ে আপনি অভিযুক্ত হতে পারেন। এর বাইরে আরেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি প্রায়ই হতে হয়। যেকোনও স্থানে যে কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পক্ষগুলো একে অন্যের বিপরীতে গিয়ে নিজ নিজ পক্ষের হয়ে যুক্তি দিয়ে সেই ঘটনার সুবিধা নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। এতে বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, অপরাধের ওপর থেকে মূল ফোকাস সরে গিয়ে ঘটনা অন্যখাতে প্রবাহিত হয়।

নির্বাচনের মাত্র একদিন পরেই নোয়াখালির সুবর্ণচরের একজন নারী ধর্ষণের ঘটনার নিউজ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। যথারীতি অনেকেই একে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। সেগুলোর সবই যে খুব ইতিবাচক তা বলা যাচ্ছে না। কেন -এর কারণ হিসেবে বলা যায়, ২০০১-এ বিএনপি-জামায়াতের নির্বাচনোত্তর সহিংসতাকে জাস্টিফাই করতে গিয়ে আওয়ামী সরকারের অধীনে নির্বাচনের পর এমন ঘটনা ঘটেছে এরকম বক্তব্য আসছে। সুবর্ণচরে ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি রাখে। ইতিমধ্যে ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে গ্রেপ্তার হয়েছে। এই ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নেওয়ার ব্যাপারেও সরকার থেকে বলা হয়েছে।

নির্বাচনের দ্বিতীয় দিনের মাথায় এধরনের ঘটনা এবং ঘটনা পরবর্তী বিশ্লেষণ যদি ২০০১-এর নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে কিছু কথা বলার আছে।

২০০১-এর নির্বাচনোত্তর সহিংসতার ব্যাপকতা এবং ভয়াবহতার মাত্রা সম্পর্কে যাদের ন্যুনতম ধারণা নেই তারাই পারেন দু’একটি ঘটনাকে সেই নিরিখে চিন্তা করতে দেখতে। ২০০১-এর অক্টোবরে নির্বাচনের দিন থেকেই শুরু হওয়া সহিংসতা ছিলো বিএনপি-জামায়াত জোটের পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত অপরাধ। হাজারো ধর্ষণ-খুন-লুটপাটের ঘটনার বিচার পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট তো করেইনি, উল্টো রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে সহিংসতার প্রসঙ্গ এলে তা অস্বীকার করেছেন; তাদের কর্মীদের নৃশংসতা কখনও হাসি-তামাশার বিষয়বস্তু হয়েছে । শুধু তাই নয়, ভিকটিমদের খবর যারা প্রকাশ করেছেন, তাদের হয়ে যারা বিচার চেয়েছেন তারাসহ ভিকটিমদের হুমকিধামকি দেওয়া হয়েছে। থানায় পুলিশ মামলা নেয়নি এমন উদাহরণ অজস্র। নির্যাতিতের প্রতীক পূর্নিমার ন্যায় অসংখ্য নারী আছেন যারা বিচার চাইতে গিয়ে প্রাণভয়ে দিন কাটিয়েছেন।

ভোলা -৩ সংসদীয় আসনে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট থেকে নির্বাচিত সাংসদ মেজর হাফিজ নিজে সন্ত্রাসীবাহিনীকে সঙ্গে করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধর্ষণ-হত্যার হুমকি দিয়ে এসেছেন। যারা নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন তারা জানেন, এবারের নির্বাচনের সেই মেজর হাফিজ বিএনপির হয়ে একই আসনের প্রার্থী ছিলেন। এধরনের লোকজন পুনরায় নির্বাচিত হলে কী ঘটতে পারতো, ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়।

কেমন ছিলো সেই সহিংসতা? ফিরে যাই ভোলার দৌলতখানে তখনকার ভয়াল জনপদে। সেখান থেকে ফিরে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত ২২ অক্টোবর ২০০১ তারিখে প্রকাশিত মামুনুর রশীদের প্রতিবেদন (যা পরবর্তীতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শ্বেতপত্রেও সংযুক্ত হয়েছে) নিচে তুলে দেওয়া হলো:

ভোলার দৌলতখান উপজেলার চরকুমারী গ্রামে ২ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত নটা থেকে তিনটা পর্যন্ত কি ঘটেছিল সে কথা বলতে গিয়ে মধ্য বয়সী যুবক নেপাল রায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় চরকুমারী তেলীবাড়িতে বসে তিনি শুধু বলেছেন, ধার্মিক মানুষ ফরিদ খলিফা পাড়ার সব বাড়ির হিন্দু কিশোরী, যুবতী, বয়োজ্যেষ্ঠ্য ৩০/৩৫ জন নারীকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে। সেখানেই রাত ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত তিনটি সশস্ত্র ক্যাডার গ্রুপের ৫০/৬০ জন সদস্য পাশবিক উন্মত্ততায় মেতে উঠেছিলো। শত চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি ধর্মীয় সংখ্যালঘু নারীদের। ষোড়শী সাগরিকে রক্ষা করতে গিয়ে ফরিদ খলিফা এবং তার স্ত্রী আহত হয়েছেন। নেপাল রায় বলেছেন, ’৭১-এর নির্যাতনকে হার মানিয়ে যুবতীদের শরীর কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে নরপশুরা। ভোলা সদর হাসপাতাল এবং বরিশাল মেডিকেলে গিয়ে চিকিৎসা না পেয়ে চলে এসেছে ঢাকায়। দুর্বৃত্তরা গোটা চরকুমারী, লেজপাতা, তেজপাতা এলাকায় লাখ লাখ টাকা চাঁদা নিয়ে গেছে। লূট করে সর্বস্ব নিয়ে গেছে। ঘরের পানির গ্লাস পরনের কাপড়টুকু পর্যন্ত নিয়ে গেছে। এলাকার পূজা মন্ডপগুলো খালি পড়ে আছে। যুবতী থেকে শুরু করে বয়োজেষ্ঠ্য নারীরা পর্যন্ত বাড়ি ছাড়া। পুলিশ প্রশাসন সব জানে। কিন্তু কোন মামলা হয়নি। এই হিন্দুদের কাউকেই ভোট দিতে দেয়া হয়নি। 

গত ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যা পৌনে ছটার দিকে চরকুমারী তেলীবাড়ির সামনে আমাদের মোটর সাইকেল থামাতেই বাড়ির লোকজন এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করে। ওদের ভয়-আতঙ্ক এখনও কাটেনি। তিনি গাড়ী থেকে নেমে বললেন, ভয় নেই, আমরা আপনাদের সাথে কথা বলতে এসেছি। বাড়ির ভিতরে গিয়ে কথা হয় নকুল চন্দ্র তেলীর সঙ্গে। কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বলেন, ভগবান প্রাণে বাঁচিয়ে রেখেছেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলতে থাকেন, তিন-চারদিন আগে থেকে বিএনপি নেতাকর্মীরা হুমকি দেওয়ার কারণে কন্যা লিপিকে নিরাপত্তার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছি ভোলা জেলা সদরে এক আত্মীয়র বাসায়। নির্বাচনের পর দিন মঙ্গলবার আঁচ করতে পারি সন্ধ্যার পর বাড়িতে হামলা হবে। অবস্থা দেখে কয়েকটি হিন্দু পরিবারের অভিভাবকরা ছুটে যান স্থানীয় বিএনপি নেতার বাড়িতে। বিশেষ ঐ ব্যক্তি কোন অসুবিধা হবে না বলে সবাইকে বাড়িতে পাঠায়। কিন্তু রাত পৌনে ৮টায় তিনটি বাহিনী এলাকায় প্রবেশ করে শুরু করে তান্ডব। প্রথম আক্রমণ করে বিজয় মন্ডলের বাড়ি ও সূর্যবালার বাড়ি। এক এক করে তারা পাড়ার পাঁচ ছয়টি বাড়িতে আক্রমণ চালিয়ে চাল, ডাল, সুপারি, পানের বরজ থেকে পান, বাড়ির আসবাবপত্র, ঘটিবাটি, কাপড় চোপড়, সব ভ্যানগাড়ি ভর্তি করে লুটে নিয়েছে। মহিলারা ঘর ছেড়ে সুপারির বাগানে পালাতে গেলে স্থানীয় ফরিদ খলিফা নিরাপত্তা দেয়ার জন্য ৩০/৩৫ জন মহিলাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আশ্রয় দেন। দুর্বৃত্তরা রাত ১২টা মালামাল লুটে নেয়ার পর হামলা চালায় ফরিদ খলিফা বাড়িতে। সেখানে আশ্রয় নেয়া অসহায় শঙ্কিত নারীদেও রাতভর গণনির্যাতন চালায়। সুধীর বাউলের বাড়িতে সুপারি বাগানে পলাতক মহিলাদেরও রেহাই দেয়নি তারা। হরিদাশ বাউল অন্ধ মানুষ, ভিক্ষা করে দুকেজি চাল এনেছিল তাও নিয়ে গেছে। নমিতা রানীর ভাতের পাতিল থেকে ভাত মাটিতে ফেলে রেখে পাতিল নিয়ে গেছে। পুকুরের ঘাটে লুকিয়ে রাখা পিতলের পিতলের জিনিসপত্র তুলে নিয়ে গেছে। লাকড়ির ঘর উল্টে পাল্টে লাকড়ি ফেলে দিয়ে সুপরির বস্তা নিয়ে গেছে। এক মাসের বাচ্চা কোলে নিয়ে বৃষ্টির মধ্য পানের বরজের ভিতর পালিয়ে থেকেও রক্ষা পাননি এক মহিলা। বাচ্চা কেঁদে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে সন্ত্রাসীরা। তার সম্ভ্রম লুটে নিয়ে তারা স্থান ত্যাগ করে।

আলী নগরের ধনাঢ্য পঙ্কজ চক্রবর্তী সর্বস্ব হারিয়ে এখন পাগল হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার বাড়ি থেকে ৩০ মণ সুপারি , ৯০ মণ চাল, ৮ বস্তা মুগ ডাল এবং সাত বস্তা খেসারির ডাল রুট করে নিয়ে গেছে। মালামাল নিয়ে যাবার পর পঙ্কজ চক্রবর্তীকে বেঁধে পরিবারের সদস্যদের ঘরের ভেতর আটকে রেখে আগুনে পোড়ানোর হুমকি দিলে পঙ্কজ চক্রবর্তী প্রাণভিক্ষা চান, কাকুতি মিনতি করেন। পরে তাকে ঠাকুর ঘরে বেঁধে রেখে পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয়া হয় তার বসত ঘরটি। সেই থেকে মানসিক ভারসম্য হারিয়ে ফেলেছেন পঙ্কজ চক্রবর্তী। এখন রাস্তায় প্রলাপ বকতে বকতে হাঁটছেন। তাকে ভোলা জেলা সদর হাসপাতালে তিনচার দিন চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু তিনি প্রলাপ বকতে বকতে হাসপাতাল ছেড়ে চলে এসেছেন। ঘন্টা দেড়েক পরে তেলিবাড়ি ফিরে গেলে দেখা যায় নেপাল রায়ের জ্ঞান ফিরেছে। তিনি বলছেন, লিখে আমাদের একেবারে প্রাণে মারার ব্যবস্থা করবেন না। তবে এলাকার অরাজনৈতিক মুসলমান পরিবারগুলোর সহযোগিতার কথা তারা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ কওে বলেছেন, তাঁদের কারণে এখনো প্রাণে বেঁচে আছি। তবে অনেক শান্ত নিরীহ মুসলমান পরিবারের লোকেরা রাজনৈতিক কর্মীদের ভয়ে কোন সহযোগিতা করছে না বলে তারা জানিয়েছে।

উপরে বর্ণিত প্রতিবেদনে ২০০১-এর নির্বাচনে জয়লাভের পর পরই বিএনপি-জামায়াত জোটের পাশবিক নির্যাতনের খুব ছোট একটি চিত্র। সারা বাংলাদেশই তখন নির্যাতন সয়েছে দৌলতখানের তুলনায় কিছুটা কম বা বেশি মাত্রায়। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী পরিবারের নারী সদস্যদের অনেকেই নিরাপত্তার জন্য দূরে আত্মীয়বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সাধারণ আওয়ামী সমর্থক পরিবারগুলোও সমানতালে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যারা এর সঙ্গে সুবর্ণচরের ঘটনাকে গুলিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তর সময়কে একই সমান্তরালে টেনে আনতে চাইছেন তারা দুটো ভিন্ন সময়ের ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যকার পার্থক্য ভুলে যাচ্ছেন।

একটি ইন্টেনশনাল ক্রাইমের বিপরীতে আস্ত একটি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অত্যন্ত ব্যাপক আকারে ঘটানো গণসন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কোনোদিক থেকেই যায় না। ২০০১ এবং ২০১৮ সম্পূর্ণ আলাদা। বরং সে চেষ্টা যদি এন্টি-আওয়ামী সেন্টিমেন্ট থেকে করা হয় তা যেমন অগ্রহণযোগ্য, তেমনি আওয়ামী লীগের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কেউ করতে চাইলেও সেখানে শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন।

বর্তমান নির্বাচনের পূর্বে শুরু থেকে ছাত্রসংগঠন এবং আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায় থেকেও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, নারীদের প্রতি সহিংসতা রোধে যথেষ্ট সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। উপরন্তু নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক ঠাকুরগাঁয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবার ঘটনা ঘটেছে। সেটাও সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় দ্রুত ব্যবস্থাগ্রহণের মাধ্যমে ঘরবাড়িছাড়া মানুষগুলোকে রক্ষা করা গেছে। ফরিদপুরেও বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। আওয়ামী সমর্থকদের শতাধিক ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে সারাদেশে যত সহিংসতা বিচ্ছিন্ন আকারে ঘটেছে তাতে বিএনপি-জামায়াতের থেকে আওয়ামীলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হতাহতের সংখ্যা বেশি।

ধর্ষণ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। একটি কিংবা এক হাজার বার ঘটলেও সেটা অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হবে। আওয়ামী-বিএনপি-জামাতের যে-ই ঘটাক, দলীয় পরিচয়ে অপরাধ লঘু হয়ে যায় না। অপরাধের গুরুত্ব এর ধরন অনুসারে হওয়া উচিত, প্রেক্ষিতকে কখনও মুড়ি-মুড়কি দরে এক করে ফেলতে নেই। যেমন, ১৯৭১-এ পাকিস্তানের সরাসরি নির্দেশে গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলো বাঙালি নারীরা। এর সাথে  ২০০১-এর নির্বাচনোত্তর সহিংসতার ঘটনাগুলোর সাদৃশ্য পাওয়া যায় যা একাত্তরকে মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু একাত্তর আমাদের ধারণাতীত। সুবর্ণচরের ঘটনা যেহেতু আওয়ামী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ঘটানো কোনো সন্ত্রাস নয় তাই একে বিএনপি-জামায়াত জোটের সরাসরি সমর্থনে ঘটানো সহিংসতার সঙ্গে তুলনা সহজভাবে নেওয়া যায় না। আমরা যারা ২০০১ দেখেছি তারা যদি সারা বাংলাদেশের এখনকার পরিস্থিতি বিবেচনায় আনি তাহলে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অন্যতম উদাহরণ হয়ে থাকবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সহিংসতায় বিএনপি-জামায়াতের দেখানো পথে আওয়ামীলীগ হাঁটেনি, ভবিষ্যতেও হাঁটবে না এমন প্রত্যাশা থেকেই যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত এবং সন্ত্রাসী বিএনপিকে মানুষ বর্জন করেছে। এই বাস্তবতা থেকে শেখার অনেককিছু আছে।

বিএনপির যত কর্মী গত দশ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ে বিভিন্ন সুবিধা পাবার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে দলে প্রবেশ করেছে, এমনকি নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগেও তাদের গণহারে আওয়ামী লীগের সমর্থক বনে যাওয়া যারপরনাই খানিকটা শঙ্কিত করে তোলে। এই দলে আদর্শিক রাজনীতি যারা দীর্ঘকাল করে এসেছেন বা আদর্শ ধারণ করেন তারা জানেন, বিএনপি এবং তার আড়ালে জামায়াত-শিবিরের আওয়ামী লীগে যোগদান তাদের ন্যায়বোধের উপলব্ধি থেকে নয়; আওয়ামী লীগ যেহেতু দীর্ঘকাল ক্ষমতায় এবং এই নির্বাচনেও ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেশি ছিল তাই রাজনৈতিক বিরোধ এড়াতে এবং ক্ষমতাসীন দলের একজন সদস্য হিসেবে ব্যক্তিগত লাভালাভের হিসেব কষেই তারা অনুপ্রবেশ করেছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে যারা তাদের গ্রহণ করেছেন তাদের কেউ কেউ হয়তো দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বির বিপক্ষে নিজস্ব দল ভারী হওয়াতে খুশি হয়েছেন, কেউ হয়তোবা একে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবেই বিবেচনা করছেন অর্থাৎ কোনও পয়েন্টে কম্প্রোমাইজ হচ্ছে সেটা পরিষ্কার নয়।

যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে সঙ্গী করে তারেক রহমানের মতো দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক একজন আসামীর প্রতিনিধিত্ব মেনে নিয়ে বিএনপি দলীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে ক্রমাগত নিজেদের ব্যর্থ প্রমাণ করে গেছে। দশ বছরে দলের বঞ্চিত নেতাকর্মীর সংখ্যাও বেড়েছে। তবে তারা যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে কখনও কথা বলেনি, তারেক রহমানের নেতৃত্বও অস্বীকার করেনি। কেবলমাত্র ‘না পাওয়া’ জনিত ক্ষোভ থেকে নির্বাচনের আগে বিএনপি ত্যাগ করে বিপুলসংখ্যক কর্মীর হঠাত আওয়ামীলীগের সমর্থক বনে যাওয়া নির্বাচনোত্তর সময়ে স্যাবোটাজের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ২০০১-এ নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় সক্রিয় সন্ত্রাসীরা থাকতে পারে। ২০১২ সালে রামুতে সহিংসতা, ২০১৩-তে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত রাজাকারদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিরোধিতা করে দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের বাড়িঘর পোড়ানো, খুন, ব্লগারদের হত্যায় সমর্থন, নাসিরনগর-অভয়নগরের সহিংসতা,পেট্রোল বোমায় মানুষ হত্যা, জঙ্গিদের সমর্থন, হুমকি দেওয়ার সঙ্গেও এরা জড়িত।

জোট হিসেবে জামায়াত-শিবিরের অপকর্মের সঙ্গী তারা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার প্রতি ঘৃণা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অশ্রদ্ধা এবং ক্ষমতা অপব্যবহারের যে রাজনীতিতে তারা এতকাল ধরে অভ্যস্ত সে চরিত্র দল পাল্টালেই বদলে যাবে বলে মনে করি না। দশ বছর দুই টার্মে যেহেতু ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ ছিলো তাই প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে সবচে বেশি। যারা বছরের পর বছর ধরে বিএনপি-জামায়াতের আদর্শ ধারণ করে শুধু রাজনৈতিক স্বার্থ ও লোভ থেকে দল ত্যাগ বা ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিয়ে তাদের খোঁজখবর রাখা, তাদের বিষয়ে সাবধান থাকা প্রয়োজন। যারা তাদের গ্রহণ করছেন তারা কেন করছেন সেটাও আওয়ামী লীগ হাইকম্যান্ড থেকে খতিয়ে দেখা হোক।

জয় বাংলা বনাম বাংলাদেশ জিন্দাবাদ/নারায়ে তাকবীর –এ আদর্শিক লড়াইয়ে যারা আছেন তারা নিশ্চয় জনপ্রতিনিধিদের অবিমৃষ্যকারিতার কারণে হেরে যেতে চাইবেন না।

ফিরে আসি সুবর্ণচরে নারী ধর্ষণ প্রসঙ্গে। একটি ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হয়েছে; ডেইলি স্টার-প্রথম আলো নিউজ করেছে। ভিডিও এবং নিউজ অনুযায়ী নির্যাতিতা নারীর স্টেটমেন্ট এসেছে। বিএনপি সমর্থনের কারণে ধর্ষণের ঘটনা ঘটানো হয়েছে – সেখানে এমন দাবি করা হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধীদের বিচার এবং সর্বোচ্চ শাস্তি দ্রুততম সময়ে নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাই।

প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখছেন। এটা সাধুবাদ পাবার যোগ্য। সুবর্ণচরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন দেশের অন্য কোথাও না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্ষণ ঘটেছিলো একাত্তরে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো যেন বাঙালি নারীদের বেশি বেশি ধর্ষণ করা হয়। দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্ষণ ঘটে ২০০১-এ বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসীদের দ্বারা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিকে অশান্ত করে তুলতে পারে এমন যে কোনো চেষ্টা রুখে দিতে হবে। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে কম মাত্রায় রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। যারা হেরে গেছেন রাজনীতির মাঠে তারা নিজেদের প্রশ্ন করুন, কেন হেরে গেলেন খুঁজে বের করুন। যে কোনো অসৎ প্রোপাগান্ডা হেরে যাওয়াকে কখনও রোধ করতে পারে না। এর দ্বারা আর যাই হোক সুদূরপ্রসারী রাজনীতি সম্ভব নয়। ইতিহাস সে শিক্ষাই বার বার দিয়েছে।

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্যি, ইতিহাস থেকে শিক্ষা খুব কমই নেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের ইশহারের দ্বিতীয় পয়েন্টেই ছিলো দূর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা। দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রত্যাশা আছে যে আগামী পাঁচ বছর সফলভাবেই তা জারি থাকবে। যুদ্ধাপরাধের বিচার চলমান রাখার পাশাপাশি দূর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে সরকারের সাথে অংশগ্রহণ থাকুক দেশের প্রতিটি নাগরিকের। ‘জনগণ সরকারের অংশ’ – এই বিশ্বাস জনগণের ভেতরেই সবচে বেশি থাকা প্রয়োজন।

সন্ত্রাস দমনে আওয়ামী লীগ সকলের কাছে ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাক। যারা নারীদেরকে ‘জয় উদযাপন কিংবা হারের প্রতিশোধে’র লক্ষ্যবস্তু বানাতে চায়, যারা ২০০১-এর নির্বাচনোত্তর সহিংসতার আবহ ফিরিয়ে আনতে চায় তাদের বেলায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হোক। দেশের আনাচকানাচ পর্যন্ত সারভেইল্যান্সের আওতায় থাকুক যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। এমনকি আওয়ামী কর্মী দাবী করেও যে সন্ত্রাস ঘটানো যায় না, সেই মেসেজ তাদেরকে শক্তভাবে দেওয়ার কোনও বিকল্প নেই। এতে অতি উৎসাহী হয়ে অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা যেমন কমবে, তেমনি উড়ে এসে জুড়ে বসা কীটগুলোর দৌরাত্ম্যও থেমে যাবে। ধর্ষণ-লুটপাট ও হত্যা একাত্তরে পাকিস্তানী বাহিনী এবং তাদের সহযোগী রাজাকারদের কালচার, পরবর্তীতে জামায়াত-শিবির হিসেবে তারা এটা ধরে রেখেছে, বিএনপিও মাত্রা ছাড়িয়ে তাদের উপযুক্ত সঙ্গী হয়েছে। আওয়ামী লীগের কালচার এটা নয়, কখনওই হতে পারে না। সাধারণ মানুষ বিএনপি-জামায়াতের সাথে একই কাতারে আওয়ামী লীগকে দেখতে চায় না। তাই একেবারে তৃণমূলেও যাতে ক্ষমতার অপচর্চা দল ও সরকারকে সেদিকে নিয়ে না যায় তা লক্ষ্য রাখা এ মুহূর্তে ভীষণ জরুরী। নির্বাচনে বিশাল বিজয়ে আত্মহারা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধপন্থি দলটির নেতাকর্মীদের সবসময় মনে রাখতে হবে অমর বাণী, ‘With great power comes great responsibility.’ যে ক্ষমতা দায়িত্ববোধ জাগায় না, বরং বিলোপ ঘটায় তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। উদাহরণ দিই? না থাক।

Responses -- “নির্বাচনোত্তর সহিংসতা – ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত ও প্রাসঙ্গিকতা।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—